বিষয়বস্তুতে চলুন

কাব্যপরিক্রমা (১৯৫৮)/জীবনদেবতা

উইকিসংকলন থেকে

জীবনদেবতা

মানুষের ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল যখন ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যা বিশেষ বিশেষ জাতি বা সম্প্রদায়ের অধিকারের অন্তর্গত ছিল; বংশানুক্রমে তাহারাই সে বিদ্যার চর্চা করিত এবং তাহাকে নিজেদের বিশেষ সম্পত্তি বলিয়া কল্পনা করিত। এখন নাকি গণতন্ত্রের যুগ, এখন সকলেরই সব বিষয়ে অধিকার। সুতরাং ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যাকেও প্রত্যেককে প্রত্যেকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ মেলামেশা করিতে হইতেছে। ধ্যানের অভ্রভেদী শিখরে তাহারা আর অনধিগম্য হইয়া নাই, তাহারা এখন সমতলে নামিয়া আসিয়া ধারার সঙ্গে ধারাকে সম্মিলিত করিবার চেষ্টা করিতেছে। যেখানেই এইরূপ সংগম হইতেছে সেখানেই মানুষ তাহাদের মধ্যে একটি আশ্চর্য অভাবনীয় রূপ দেখিতেছে। সেখানেই তীর্থ, কারণ সেখানে স্বাতন্ত্র্যবোধ লুপ্ত হইয়া ঐক্যবোধ প্রত্যক্ষ প্রকাশমান হইতেছে।

 হুইট্ম্যানের একটি কবিতা আছে, তাহার নাম: There was a child went forth everyday— একটি শিশু প্রত্যহ বাহির হইত। কবি বলিতেছেন, সে যাহাই দেখিত তাহাই হইত। প্রভাতের সূর্যোদয়ের অরুণচ্ছটা, পুষ্পের সৌন্দর্য, বিহঙ্গের কাকলি, বৃক্ষলতা, সকল ঋতুর সকল আশ্চর্য দান, ফলশস্যের বিচিত্র সম্ভার, শহরের রাজপথের লোকারণ্য, গৃহের পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, পৌরবর্গ— সকল দৃশ্য, সকল শব্দ, সকল ভাব, সকল অনুভাব তাহার অঙ্গীভূত অংশীভূত হইয়া গিয়াছিল। সে প্রত্যহই এই—সমস্ত গ্রহণ করিত, সে প্রত্যহই বাহির হইত।

 কবি—কথিত এই শিশুটি কে? কে বাহির হইয়াছে? আধুনিক মানুষ। যে সব চায়। বিশ্বপ্রকৃতিতে যাহা—কিছু আছে, মানুষের সমাজে যাহাকিছু হইতেছে, সে—সমস্তই ‘আমার’ এই চিহ্নে সে চিহ্নিত করিয়া দিতে চায়। শুধু ‘আমার’ বলিয়া সে ক্ষান্ত নহে; সে—সমস্তই তাহার ‘আমি’, তাহারই ব্যাপ্তি, তাহারই বহিঃপ্রকাশ— এতবড়ো কথাটা না বলিলে তাহার চলে না। ‘আমার’ বলিলে সেগুলি বাহিরের বিষয়সম্পত্তির মতো মনে হয়, কিন্তু ‘আমি’ বলিলে আর তো কোনো কথা নাই। তখন তাহাকে বিভক্ত করিবে কে, খণ্ডিত করিবে কে?

 সমস্তকে যে নিজের চেতনার দ্বারা পরিব্যাপ্ত করিয়া দেখা চাই—এ ভাব এ যুগের মানুষের মধ্যে ফুটিল কেমন করিয়া? ফুটিল, যতই বিদ্যাদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ প্রশস্ততর হইতে লাগিল, বিজ্ঞানের সঙ্গে দর্শন, দর্শনের সঙ্গে শিল্পসাহিত্য যতই ক্রমশ সাহচর্যে ও ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দীক্ষিত হইতে লাগিল। প্রত্যেক বিদ্যার পন্থা, প্রকরণপদ্ধতি এবং আলোচ্য বিষয় স্বতন্ত্র হইলেও তাহাদের কাজ একই। মানুষের মনের ক্ষেত্রকে, চেতনার পরিধিকেই তাহারা বিস্তৃততর করিয়া দিতেছে। সুতরাং তাহারা যে যাহাই অন্বেষণ করুক এবং যে যাহাই সিদ্ধান্ত স্থির করুক, তাহারা মানুষের মনকেই নানা দিক দিয়া নাড়া দিয়া পরস্পরের সহযোগিতা করিতেছে, এবং সেজন্য প্রত্যেক বিষয়েই যে সেই মনঃশক্তির বল ও প্রসারই বাড়িয়া যাইতেছে, এ বিষয়ে আর সন্দেহ নাই।

 রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র ভাবের অনেক সাক্ষ্য যে আধুনিক বিজ্ঞানে ও দর্শনে পাওয়া যায়, অর্থাৎ এ আইডিয়াটা যে আধুনিক কালেরই একটি বিশেষ জিনিস, তাহাই দেখাইবার জন্য আজ আমি এই প্রবন্ধের অবতারণা করিয়াছি। আমি জানি যে, কবিতার মধ্যে দর্শনবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুসরণ করার বিশেষ কোনো সার্থকতা নাই। কারণ, কবিতা তো তত্ত্ব নয়, সে প্রকাশ। কবিতা তত্ত্বকে তো প্রমাণ করে না, সে তত্ত্বকে রূপ দান করে। সব সময় যে তাও করে তাহা নহে— তত্ত্ব হোক বা না হোক, একটা—কিছু যে—কোনো রসবস্তুকে সে আপনার কল্পনার ও ভাবের ছাঁচে ফেলিয়া একটি সুষমাময় রূপে গড়িয়া তুলিতে পারিলেই খুশি হয়। সে ভাবকে চায় না, অভাবনীয়কে চায়; নির্দিষ্ট তত্ত্বকে চায় না, অনির্বচনীয়কে চায়। এইজন্যই, সে যে রসরূপের সৃষ্টি করে তাহার মধ্য হইতে তাহার আসল ভাবটা কী তাহা উদ্ধার করা এত কঠিন হয়। মুখের মধ্যে যেমন মনের নানা ভাবের আলোছায়াপাত দেখা যায়, কবিতার মধ্যে তেমনি ভাবের নানা ইশারা ইঙ্গিত মাত্র দেখা যায়, কিন্তু তার বেশি নয়। সুতরাং দর্শন—বিজ্ঞানের সঙ্গে তাহাকে মিলাইতে গেলে অত্যন্ত অসংগত একটি কাণ্ড ঘটে।

 এ—সকল কথা মানিয়া লইলেও বলিতে হয় যে, কবিতার মধ্যেও সত্য আছে, সে যে কেবলই মায়ার সৃষ্টি তাহা নহে। আমাদের মনের নানান মহালে যে সত্যের নূতন নূতন রূপ। কোনোটা বা মস্তিষ্কের মহাল, কোনোটা বা হৃদয়ের মহাল, কিন্তু এই বিচিত্রতায় সত্য কিছু বিভিন্ন হইয়া যান না। ইশারায় বলিলেও সত্য, কূটতর্কের জালে আচ্ছন্ন করিয়া বলিলেও সত্য, প্রমাণপ্রয়োগের দ্বারা যন্ত্র দ্বারা দেখাইলেও সত্য। জগতের রূপ কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি, সুতরাং তাহা মিথ্যা, জগতের বাস্তবিক সত্তার মধ্যে রূপের কোনো সদ্ভাব নাই— এ কথা যত বড়ো দার্শনিকই বলুন না কেন, ইহা সত্য নয়। কারণ, রূপ শুধু চোখে দেখিবার ও ইন্দ্রিয় দিয়া অনুভব করিবার জিনিস হইলে মানুষ কখনোই বলিত না ‘জনম অবধি হম রূপ নেহারনু, নয়ন না তিরপিত ভেল।’ রূপের মধ্যেই যে অরূপের বাসা, সে যে ভিতরেরই বাহির, সত্তারই প্রকাশ। কবিতা শুধুই প্রকাশ, আর কিছুই নয়, এ কথা তেমনিই সত্য নহে— কারণ, কবিতাও সত্যেরই প্রকাশ। সুতরাং ‘জীবনদেবতা’র আইডিয়ার সঙ্গে যদি দর্শনবিজ্ঞানের কোনো তত্ত্বের সাদৃশ্য দেখা যায় তবে ইহাই বলিব যে, এ আইডিয়াটি সত্য, এ নিছক কল্পনা নয়। কবি এই সত্যকে অনুভূতির দিক হইতে উপলব্ধি করিয়াছেন, প্রমাণ সংগ্রহ করিবার জন্য ব্যস্ত হন নাই। তিনি ইঙ্গিত করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন, তত্ত্ব গড়েন নাই।

 এখন প্রস্তাবিত বিষয়ে অবতরণ করা যাক।

 একসময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁহার এক পত্রে লিখিয়াছিলেন—

 ‘বহুযুগ পূর্বে যখন তরুণী পৃথিবী সমুদ্র—স্নান থেকে সবে মাথা তুলে উঠে তখনকার নবীন সূর্যকে বন্দনা করছেন, তখন আমি এই পৃথিবীর নূতন মাটিতে কোথা থেকে এক প্রথম জীবনোচ্ছ্বাসে গাছ হয়ে পল্লবিত হয়ে উঠেছিলুম। .. তখন আমি এই পৃথিবীতে আমার সমস্ত সর্বাঙ্গ দিয়ে প্রথম সূর্যালোক পান করেছিলুম, নবশিশুর মতো একটা অন্ধজীবনের পুলকে নীলাম্বরতলে আন্দোলিত হয়ে উঠেছিলুম ... মূঢ় আনন্দে আমার ফুল ফুটত এবং নবপল্লব উদ্গগত হত। যখন ঘনঘটা করে বর্ষার মেঘ উঠত তখন তার ঘনশ্যাম ছায়া আমার সমস্ত পল্লবকে একটি পরিচিত করতলের মতো স্পর্শ করত। তার পরেও নব নব যুগে এই পৃথিবীর মাটিতে আমি জন্মেছি। আমরা দুজনে একলা মুখোমুখি করে বসলেই আমাদের সেই বহুকালের পরিচয় যেন অল্পে অল্পে মনে পড়ে।’

 সকলেই জানেন যে, কবির ‘জীবনদেবতা’—শীর্ষক কবিতাগুলিতে শুধু নয়, ‘বসুন্ধরা’ ‘প্রবাসী’ প্রভৃতি আরও অনেক কবিতায়, এই পত্রে যাহা ব্যক্ত হইয়াছে নেই ভাবের কথাই পাওয়া যায়। কবি বলেন যে, আমাদের এই বর্তমান জীবনের মধ্যে একটি চিরন্তন জীবন আছে। আমার যে জীবন কত যুগ পূর্ব হইতে কত বিচিত্র জীবনপর্যায়ের ভিতর দিয়া আমার এই বর্তমানতায় আসিয়া আজ পৌছিয়াছে, আমার সেই জীবনই আমার অন্তর্নিহিত চিরন্তন জীবন। কবি তাহারই আশ্বাসে পূর্ণ হইয়া বলেন, ‘যুগে যুগে আমি ছিনু তৃণে জ্বলে’ এবং ‘স্থলে জলে আমি হাজার বাঁধনে বাঁধা যে গিঠাতে গিঠাতে’। এবং এই ক্ষণিক জীবনের স্বল্পপরিসর চেতনার মধ্যে সেইজন্যই তিনি বিশ্বচেতনাকে এক একসময় অনুভব করিয়া থাকেন।

 ডারুইনের অভিব্যক্তিবাদে বলে যে, এক আদিম জীবকোষ হইতে এই নানা বিচিত্র জীবদেহ—সকল উদ্ভিন্ন হইয়া ক্রমে ক্রমে প্রকাশ পাইয়াছে, এবং সে কথা অধুনা সকলেই দেখিতেছি মানেন। আদিম অ্যামিবা (amoeba) এবং জটিল মানবদেহ একই উপাদানে গঠিত, একই জীবকোষ উভয়ের মধ্যেই বিদ্যমান। এই জীবকোষ বা প্রোটোপ্ল্যাজমিক সেল ক্রমেই জটিল হইতে জটিলতর ব্যূহ রচনা করিয়া জীবকে শ্রেষ্ঠ হইতে শ্রেষ্ঠতর শ্রেণীতে উন্নীত করিয়াছে। মানুষের শরীরে, বিশেষভাবে মানুষের মস্তিষ্কে, ইহার জাল যেরূপ ঘন এবং ক্রিয়া যেরূপ দ্রুত ও গতিশীল এমন অন্য জীবদেহে বা জীবমস্তিষ্কে নহে; আর সেইজন্যই মানুষ পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান জীব হইয়া উঠিয়াছে।

 ডারুইন, ওয়ালেস প্রভৃতি অভিব্যক্তিবাদের প্রতিষ্ঠাতৃগণের এইসকল সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে কাহারও আপত্তি লক্ষিত হয় না। মানুষ যে বিচিত্র জীবজন্মের মধ্য দিয়া সম্ভাবিত হইয়াছে, এ কথাটা সত্য বলিয়া মানা ভিন্ন গত্যন্তর নাই। সুতরাং ডারুইনের এই মত আশ্রয় করিয়া কেহ যদি বলেন যে ‘আমি এক সময় গাছ ছিলাম’ তবে শুনিতে যতই অদ্ভুত লাগুক, রাগ করা মৃঢ়তা এবং উপহাস করা ততোধিক মূঢ়তা।

 কিন্তু এ কথাটা যে অনেকের অদ্ভুত লাগে তাহার কারণ ইহা নয় যে, বৃক্ষজীবনের মধ্য দিয়া ক্রমে মনুষ্যজীবনের অভিব্যক্তি হইয়াছে এই সিদ্ধান্তটি কোনো মানুষ স্বীকার করিয়া লইয়াছেন। তাহার আসল কারণ এই যে, মানুষ বলিতেছে ‘আমি গাছ হয়ে উঠেছিলুম’— ‘আমি’ উঠেছিলুম এই বোধটা। আরও অধিক কারণ এই যে, সে কথাটা সেই মানুষের আবার ‘অল্প অল্প মনে পড়ে’।

 ‘আমি গাছ হয়ে উঠেছিলুম’ বলিলে বুঝায় যে ‘আমি’র ধারাটা যেন গাছ পর্যন্ত প্রবাহিত, অর্থাৎ গাছের মধ্যেও এই আমি—বোধটা কোনো—না—কোনো আকারে ছিল। অথচ তাহা কেমন করিয়া হয়? আমিবোধটা তো অচেতন বোধ নয়, সংস্কারমাত্র নয়, সে পূর্ণ সচেতন বোধ। প্রকৃতিরাজ্যে এ বোধের স্থান নাই; কারণ, সেখানে সমস্তই নিয়মে চলে, অন্ধ—সংস্কারের বশবর্তী হইয়া চলে। স্বাতন্ত্র্যবোধের কোনো স্থানই সেখানে নাই।

 তার পর সেই পরিচয়ের কথা ‘অল্প অল্প মনে পড়ে’— এ কথারই বা অর্থ কী? আমাদের স্মৃতি কতদূর পর্যন্ত যায়? এই কয়েক বৎসরের জীবনে আমাদের মধ্যে যত বস্তু, যত ভাব ও অনুভাব, যত কল্পনা প্রবিষ্ট হইয়াছে, তাহার বারো—আনা অংশ ভুলিয়াছি, এবং কেবল চারি—আনা অংশের সঙ্গে নিয়ত কারবার করিয়া আসিয়াছি বলিয়া বাল্যের সঙ্গে যৌবনকে, যৌবনের সঙ্গে বার্ধক্যকে অবিচ্ছিন্ন বলিয়া বোধ করিতে পারিতেছি। পৈতৃক নানা সংস্কার তো আমাদের মধ্যে আছে। কিন্তু তাহার সবগুলি কি আমাদের জ্ঞাত? যে—সকল স্মৃতির উপর সেই সংস্কারের ভিত্তি সে—সকল স্মৃতির কোনো বার্তাই কি আমরা জানি? পিতা গেলেন; তার পর পিতামহ—তখন তো আরও অজ্ঞাত। প্রপিতামহ আরও অজ্ঞাত। ক্রমে ঊর্ধ্বে আরও ঊর্ধ্বে গিয়া নিজের বংশের আদিপুরুষ পর্যন্ত পৌছিলাম। তারপর তাঁহাকে ছাড়াইয়া নিজের জাতির আদিপুরুষ পর্যন্ত গেলাম। ধরো প্রথম আর্যপুরুষ যিনি ছিলেন তাঁহার কথাই কল্পনা করি। তাঁহার সম্বন্ধে স্মৃতি তো দূরের কথা, তাঁহা হইতে আগত কোনো সংস্কারের সংবাদ কি আমি জানি? তার পর আরও যুগ যুগ পূর্বে প্রথম মানব, তার পর যুগ যুগ পূর্বে নানা জীবপর্যায়, তার পর আরও কত যুগ পূর্বে উদ্ভিদপর্যায়— তার পর সেই কোন্ আদিম যুগে সেই প্রথম তরুটি— তাহার কথা ‘অল্প অল্প মনে পড়ে’ এ কথাটা কি কেহ দিবালোকে বসিয়া কল্পনা করিতে পারে, না লিখিতে পারে? এক পুরুষের স্মৃতিই যখন থাকে না তখন যুগযুগান্তর পূর্বের স্মৃতি থাকে এ কথা কেমন করিয়া বলা যায়? তবে কবিত্বের মদ্য পান করিলে এবং কল্পনার গঞ্জিকা সেবন করিলে সমস্তই সম্ভব হয়। সাধে শেক্‌স্‌পীয়র

The lunatic, the lover and the poet
Are of imagination all compact

বলিয়াছেন? সুতরাং কবি যদি বলেন যে, আমি একসময়ে ‘গাছ হয়ে উঠেছিলুম’ এবং সে কথা আমার ‘অল্প অল্প মনে পড়ে’ তবে শেক্‌স্‌পীয়রের ঐ প্রথমোক্ত ব্যক্তির সঙ্গে তাঁহার সাদৃশ্য কল্পনা করিয়া কথাটাকে তলাইয়া ভাবিয়া দেখিবার কোনো আবশ্যকতাই থাকে না। ও আবার একটা কথা!

 অথচ অভিব্যক্তিবাদের আদিগুরু ডারুইন এবং তাঁহার পরবর্তী তাঁহার চেলারা, যাঁহারা পোস্ট-ডারুইনিয়ানস্ নামে খ্যাত তাঁহারা, এই কথাটাকেও যে স্থানে স্থানে আমল না দিয়াছেন এমন নয়। আমি বলিয়াছি যে, কবির কল্পনা বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক সমর্থন করেন, এমন ব্যাপার এ যুগের পূর্বে আর ঘটে নাই। এ যুগে হইলে মহাকবি শেক্‌স্‌পীয়র অমন নিশ্চিন্ত মনে কবির সম্বন্ধে তাঁহার মন্তব্যটি বলিতে পারিতেন কি না সন্দেহ। কারণ এ যুগের মহাকবি স্পষ্টই উলটা কথা লেখেন; তিনি বলেন—

A poet never dreams:
We prose folk do: we miss the proper duct
For thoughts on things unseen. —Browning

অতএব এ যুগের মহাকবির এই আশ্বাসবাক্যকেই শিরোধার্য করিয়া লইয়া দেখা যাক, কবিকথিত আদিম যুগে এই গাছ হইয়া উঠার ব্যাপার এবং সেই যুগান্তরের স্মৃতিকে বহন করিবার ব্যাপারের মধ্যে ডারুইন প্রভৃতি বৈজ্ঞানিকগণ কী সত্য নির্ধারণ করিতেছেন। ডারুইনের পরে ক্রমে অন্যান্য বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকের লেখার মধ্য হইতে এই ভাবের সমর্থনকারী কথা—সকল আমরা আলোচনা করিয়া দেখিব, তাহা প্রবন্ধারম্ভেই বলিয়াছি।

 প্রত্যেক মানুষ যে একটিমাত্র ব্যক্তি নয় কিন্তু অনেক ব্যক্তিত্বের সমষ্টি এবং এই প্রত্যেকটি ব্যক্তিত্বের যে স্বতন্ত্র বুদ্ধি ইচ্ছা স্মৃতি ও সংস্কার রহিয়াছে, আধুনিক মনস্তত্ত্ব এমনতর কথা বলিতে আরম্ভ করিয়াছে। ডারুইন এই কথাটিকে নানা স্থানেই মানিয়া লইয়াছেন দেখা যায়। তিনি বলেন—

 An organic being is a microcosm, a little universe, formed of a host of self—propagating organisms, inconcevably minute and numerous as the stars in heaven.

অর্থাৎ, বিচিত্র অঙ্গ—বিশিষ্ট দেহী একটি ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ডবিশেষ, তাহা স্ব—স্ব প্রধান বহু দেহের সমষ্টি দ্বারা গঠিত এবং সেই দেহগুলি এত সূক্ষ্ম যে তাহারা ধারণার অতীত এবং আকাশের তারার ন্যায় অগণিত।

 আর—এক জায়গায় তিনি বলিতেছেন, শরীরতত্ত্ববিদগণ সকলেই এ কথা স্বীকার করেন যে, আমাদের দেহের নানান অঙ্গ—সকলের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য আছে— প্রত্যেকটি জীবকোষের কর্ম সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন বলিয়া ধরা যাইতে পারে; সুতরাং তাঁহাদের সিদ্ধান্তের উপর ভর করিয়াই বলা যায় যে, প্রত্যেকটি জীবকোষ একটি স্বপ্রধান স্বতন্ত্র ব্যক্তি— ইত্যাদি।

 জীবকোষের স্বাধীন অস্তিত্বের মত বহু পূর্ব হইতেই বৈজ্ঞানিকসমাজে চলিয়া আসিতেছে; ইহা দেখা গিয়াছে যে, প্রত্যেকটি স্নায়ুকেন্দ্রে (nervous centre) স্মৃতি স্বতন্ত্রভাবে বিরাজ করে। যেমন, আঙুলে ঘা হইয়াছে, ঘা সারিয়া যাইবার পরে ক্ষতের চিহ্নিত স্থানটা শরীরের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায়। তাহার অর্থ এই যে, সেই চিহ্নিত অংশটুকুর মধ্যে ক্ষতের স্মৃতি জাগরূক হইয়া থাকে। এ তো একটা সহজ প্রমাণ, এরূপ নানা প্রমাণের দ্বারা শরীরতত্ত্ববিদ্গণ এই মতটিকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। এবং এই—সকল প্রমাণসহায় হইয়াই প্রত্যেকটি জীবকোষ যে একটি স্বপ্রধান স্বতন্ত্র ব্যক্তি ডারুইন এ মতটিও প্রকাশ করিবার সুযোগ পাইয়াছেন।

 আমাদের মধ্যে এই বহু ব্যক্তির সমাবেশের কারণ অনুসন্ধান করিতে গেলে আরও অনেক কথার আলোচনার মধ্যে যাইতে হয়। আমরা দেখিয়াছি যে, মনুষ্য যখন জন্মলাভ করে তখন হইতে তাহার সকল জীবনী—ক্রিয়া এমন সহজভাবে সম্পাদিত হয় যে তাহার কোনো চেষ্টা খাটাইবার বা বুদ্ধি খাটাইবার প্রয়োজনই হয় না। শিশু অনায়াসে নিশ্বাস গ্রহণ করে, মাতৃস্তন হইতে দুগ্ধ চুষিয়া লয় এবং গলাধঃকরণ করে, পরিপাক করে, কানে শোনে, চোখে দেখে ইত্যাদি—— কিন্তু এতগুলা কার্য সে যে আপনিই করিতে পারে ইহার কারণ কী? ইহার কারণ, এগুলি সংস্কাররূপে তাহার মধ্যে আসিয়াছে। আর আমরা ইহাও দেখিয়াছি যে, যখনই কোনো কার্য এরূপ অভ্যাসগত হইয়া যায় যে আর চেষ্টা বা চিন্তা প্রয়োগ করিবার প্রয়োজনমাত্র থাকে না তখনই তাহা যথার্থরূপে সুসম্পন্ন হয়। কিন্তু সেরূপ সংস্কার দাঁড় করানো কি এক—আধ দিনের কাজ? তাহার জন্য বহু বৎসর, হয়তো বহু যুগও লাগিতে পারে। অতএব শিশুর জীবনী—প্রক্রিয়া বহুকাল ধরিয়া হইয়া আসিয়াছে এবং সেই অনেক কালের অভ্যাসের ফলস্বরূপে সে পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হইবামাত্রই জীবনচেষ্টায় প্রবৃত্ত হইতে পারিয়াছে। এখন এই সংস্কারকে যদি পূর্বপুরুষের সংস্কার বল তবে তাহা অসংগত হয় না; যদিচ বৈজ্ঞানিকভাবে বলিতে গেলে এই কথাই বলা উচিত যে, তোমার বিশেষ বিশেষ জীবকোষ বহুকাল ধরিয়া এই এক ধরনের জীবনচেষ্টায় অভ্যস্ত হইয়াছে, সুতরাং এইসকল অভ্যাসের স্মৃতি তাহার মধ্যে সংস্কারের আকার ধারণ করিয়াছে।

 সুতরাং ডারুইন যখন বলিয়াছিলেন যে, আমাদের মধ্যে অগণ্য ব্যক্তিত্বের সমাবেশ বিদ্যমান, প্রত্যেক জীবকোষই এক—একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন ব্যক্তি, তখন তাহার অর্থ এই যে, প্রত্যেকটি জীবকোষ আপনার বিশিষ্টতার একটি ধারাকে তাহার আরম্ভকাল হইতে বহন করিয়া লইয়া চলিয়াছে। কিন্তু তাই বলিয়া এ কথা মনে করা ভুল হইবে যে, সেই বহুপূর্বেকার কোনো জীবকোষ এবং এখনকার জীবকোষ একই বস্তু, তাহাদের মধ্যে কোনো প্রভেদ ঘটে নাই। কত লক্ষ লক্ষ জন্মের স্রোতের মধ্য দিয়া তাহাকে প্রবাহিত হইতে হইয়াছে, বাহিরের কত অবস্থার বিপর্যয়, কত পরিবর্তনপরম্পরা তাহাকে আঘাত করিয়াছে, সুতরাং যে জীবকোষ সেই আদিম কোন্ যুগে আপনার জীবনলীলা শুরু করিয়াছিল সে যে আজিও সেই একইভাবে বর্তমান রহিয়াছে, এ কথা কেমন করিয়া বলা যায়?

 তথাপি অনেক পার্থক্য সত্ত্বেও জীবকোষের যে একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা রহিয়াছে এবং সে যে তাহার জীবনী—ক্রিয়ার একটি অখণ্ড সংস্কারকেও বহন করিয়া চলিয়াছে, যেজন্য তাহার প্রাণরক্ষিণী ক্রিয়া অত্যন্ত সহজ ও অনায়াসসাধ্য হইতেছে, সে বিষয়ে আর ভুল নাই।

 ইহার আর—একটি প্রত্যক্ষ জাজ্বল্যমান প্রমাণ ভ্রূণতত্ত্বে (embryology) পাওয়া যায়। একটি উন্নত জীব অভিব্যক্তির যে যে অবস্থা অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে, গর্ভে অবস্থান—কালে তাহার ভ্রূণ পরিণতির সঙ্গে সঙ্গে সেই সেই অবস্থার রূপ পরে পরে ধারণ করে। গোড়ায় তাহাকে অ্যামিবা বা মৎস্যজাতীয় জীবের ন্যায় দেখিতে হয়, তার পর সরীসৃপের মতো, তার পর পাখির মতো, এমনি করিয়া নানা আকারের ভিতর দিয়া সে নিজের বিশিষ্ট দেহ লাভ করে। এই মতটিকে সে শাস্ত্রে বলে recapitulation theory অর্থাৎ পুনরাবৃত্তির মত। এখন জিজ্ঞাস্য এই যে, কেন কোনো জীবের ভ্রূণ এই—সকল অবস্থার মধ্য দিয়া যাত্রা করিয়া ফুটিবার চেষ্টা করিবে? তাহার সে—সব পূর্বপুরুষের সঙ্গে তাহার তো শ্রেণীগত পার্থক্য হইয়া গিয়াছে। স্যামুয়েল বাট্লার নামক বিখ্যাত ডারুইন—শিষ্য ইহার উত্তরে বলিতেছেন

 If the germ of any animal now living is but part of the personal identity of one of the original germs of all life whatsoever, and hence, if any now living organism must be considered as being itself millions of years old, and as imbued with an intense though unconscious memory of all that it has done sufficiently often to have made a permanent impression, if this be so, we can answer the above question perfectly well. অর্থাৎ, এখনকার কোনো জীবিত প্রাণীর বীজকে যদি সেই বিশ্বজীবনধারার কোনো আদিম বীজের সঙ্গে আংশিকভাবে এক বলিয়া ধরা যায় এবং সেই হেতু যদি এই বর্তমান জীবিত প্রাণীকে কোটিবৎসর—বয়স্ক বলিয়া মনে করা যায় এবং মনে করা যায় যে, সে এই সুদীর্ঘকাল এমনসকল কাজ করিয়াছে যাহা তাহার মধ্যে চিরকালের মতো মুদ্রিত হইয়া আছে, আর সেই নিগূঢ় অথচ নিশ্চেতন স্মৃতিতে সে পরিপূর্ণ, তবেই ঐ উপরের প্রশ্নের কোনো সদুত্তর প্রদান করা যাইতে পারে।

 তার পরেই তিনি বলিতেছেন—

 I suppose, then, that the fish of fifty million years back and the man of to—day are one single living being in the same sense or very nearly so, as the octogenarian is one single living being with the infant from which he has grown.

অর্থাৎ, আমার তাই মনে হয় যে, পাঁচ কোটি বৎসর পূর্বের যে মৎস্য এবং আজিকার যে মানুষ সে একই অখণ্ড প্রাণী; যেমন অশীতি বৎসরের বৃদ্ধ তাহার আপনার শৈশবকালের শিশুর সঙ্গে একই ব্যক্তি।

 স্যামুয়েল বাট্‌লার ডারুইনের ঐ জীবকোষের স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন অস্তিত্বের মতটিকে এই দিক দিয়া মানেন যে, তাহার মধ্যে যেটা ইন্‌স্‌টি্ঙ্কট্ অর্থাৎ সংস্কার সে তাহার বহুযুগের সঞ্চিত স্মৃতি বই আর কিছুই নহে। তিনি ইন্‌স্‌টি্ঙ্কট্‌কে বলেন inherited memory এবং unconscious memory, অর্থাৎ পূর্বপুরুষাগত স্মৃতি এবং সুপ্ত স্মৃতি বই সংস্কার আর কিছুই নয়। ডারুইন দেখাইয়াছেন যে, যখন জীবকোষগণ কোনো বিশেষ শ্রেণীর প্রাণীকে আশ্রয় করিয়া এমন একটি সংস্কারের ধারা অনুসরণ করে যাহার সঙ্গে অন্য শ্রেণীর প্রাণীর সংস্কারের ধারার একেবারে মিল হয় না, তখন সেই ভিন্নশ্রেণীয় (species) প্রাণীদিগকে জোর করিয়া মিলাইলে তাহাতে অত্যন্ত কুফল দৃষ্ট হয়। কাছাকাছির মধ্যে বর্ণসংকর চলে, অত্যন্ত দূরবর্তীদের মধ্যে চলে না। স্যামুয়েল বাট্লার বলেন যে, তাহার কারণ, দূরবর্তীদের মধ্যে স্মৃতির ধারা উলটা ও বিপরীত, সেইজন্য তাহাদিগকে বলপূর্বক মিলাইলে স্মৃতিভ্রংশ হইয়া যায় এবং সেইরূপ দূরসংকরজাত জীব তাহার আদিম অপরিণত অবস্থা প্রাপ্ত হয়। যাহাই হউক, এই unconscious memory অথবা নিশ্চেতন স্মৃতির মতকে তিনি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দিয়া প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য বিশেষভাবে প্রযত্ন করিয়াছেন বলিয়াই স্যামুয়েল বাট্‌লারের নাম পশ্চিমদেশে বিখ্যাত।

 ডারুইন এবং তাঁহার শিষ্যবর্গের এই মতটির সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র ভাবের সম্পূর্ণ সাদৃশ্য আছে।

 বৈজ্ঞানিক চক্ষে ডারুইন দেখিলেন, প্রত্যেক জীবকোষের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব আছে, সুতরাং একই মানুষের মধ্যে অগণ্য ব্যক্তিত্বের সমাবেশ ঘটিয়াছে, অথচ তাহারা পরস্পরবিরুদ্ধ হয় নাই, একই অথণ্ড জীবনের মধ্যে বিধৃত হইয়া আছে। কবির অন্তর্দৃষ্টি এবং কল্পনা লইয়া রবীন্দ্রনাথ অনুভব করিলেন, বিশ্ব— অভিব্যক্তির নানা ধারায় তাঁহার যুগযুগান্তরের জীবন প্রবাহিত হইয়াছে, সেই নানা জীবনের নানা ব্যক্তিত্ব তাঁহার মধ্যে আসিয়া মিলিয়াছে; অথচ তাহারা পরস্পরবিরুদ্ধ হয় নাই— একই অখণ্ড ‘জীবনদেবতা’ তাহাদের সকলকে আপনার অন্তর্গত করিয়া লইয়াছেন।

আজ মনে হয়, সকলেরি মাঝে
তোমারেই ভালোবেসেছি,
জনতা বাহিয়া চিরদিন ধরে
শুধু তুমি আমি এসেছি।

 ডারুইন—শিষ্য স্যামুয়েল বাট্লার দেখিলেন, প্রত্যেক জীবকোষের অথণ্ড ধারা যে একই সংস্কারের পথ অনুসরণ করিয়া চলে, তাহা তাহার বহুযুগের অভ্যস্ত জীবনী—ক্রিয়ার স্মৃতি বই আর কিছুই নয় এবং জীবভ্রূণে অভিব্যক্তির নানা অবস্থার পুনরাবৃত্তির মধ্যেও সেই স্মৃতির সাক্ষ্য পাওয়া যায়; সুতরাং জীবকোষের ধারা একটি যুগযুগান্তরের অভ্যাসগত সুপ্ত স্মৃতিরই ধারা। কবি রবীন্দ্রনাথও অনুভব করিলেন যে, সেই নানা সুপ্ত স্মৃতি তাঁহার মধ্যে এক অপূর্ব বিশ্বৈক্যানুভূতির সৃজন করিয়াছে। এ অনুভূতি কল্পনা নয়, এ সত্য যে—

দেখি চারি দিক পানে
কী যে জেগে ওঠে প্রাণে।
তোমার আমার অসীম মিলন
যেন গো সকল খানে। ...
হে চিরপুরানো, চিরকাল মোরে
গড়িছ নূতন করিয়া,
চিরদিন তুমি সাথে ছিলে মোর
রবে চিরদিন ধরিয়া। ...
প্রাচীনকালের পড়ি ইতিহাস
সুখের দুখের কাহিনী
পরিচিতসম বেজে ওঠে সেই
অতীতের যত রাগিণী।
পুরাতন সেই গীতি
সে যেন আমারি স্মৃতি।
কোন্ ভাণ্ডারে সঞ্চয় তার
গোপনে রয়েছে নীতি।...

প্রাণে তাহা কত মুদিয়া রয়েছে
কত বা উঠিছে মেলিয়া—
পিতামহদের জীবনে আমরা
দুজনে এসেছি খেলিয়া।

 শুধু স্যামুয়েল বাট্‌লার যে এই সুপ্তস্মৃতির মত প্রচার করিয়াছেন তাহা নহে, আধুনিক মনস্তত্ত্বে subliminal consciousness অর্থাৎ মগ্নচৈতন্য বলিয়া একটা কথা বলে। অর্থাৎ, আমাদের চৈতন্যের সবটাই আমাদের কাছে প্রকাশ নয়, অনেকটাই অপ্রকাশ। অপ্রকাশ বলিয়াই যে তাহা অনুপস্থিত এবং তাহার কোনো কাজ নাই, এমন কথা বলা চলে না। এ কিরকম? না, উপমাচ্ছলে বলা যায় যে, সমুদ্রের তলে যে—সব দেশ তৈরি হইতেছে তাহারা যেমন অগোচর, এই মগ্নচৈতন্যও তেমনি অগোচর। দূর হইতে কুহেলিজড়িত বিশাল এক নগরের ক্ষীণাভাসে যেমন সবই অস্পষ্ট নয়, মধ্যে মধ্যে দুটা—একটা সমুচ্চ চূড়া, দুটা—একটা বড়ো বড়ো কীর্তিচিহ্ন যেমন দেখা যায়, অথচ আর সবই ছায়াময়, মগ্নচেতনার রাজ্য কতকটা সেইরূপ।

 যদি অভিব্যক্তিবাদ মানি, এবং যেরূপ দেখিলাম যদি জীবনের ও জীবনী—ক্রিয়ার অভ্যস্ত স্মৃতির অখন্তু ধারাকে মানি, এবং মানি যে, আমাদের মধ্যে নানা ব্যক্তিত্বের সমাবেশ সেই অভিব্যক্তির সূত্রে ঘটিতে পথ পাইয়াছে, তবে এ কথা না মানিয়া কোথায় যাইব যে আমাদের চেতনাও অনবচ্ছিন্ন? তার মানে আমাদের যেটুকু চেতনা স্বাধীনভাবে আপনার বুদ্ধি ও ইচ্ছা প্রয়োগ করিতেছে তাহার অপেক্ষা অনেক প্রকাণ্ড চেতনা পূর্বস্মৃতির সংস্কারকে বহন করিয়া আমাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন হইয়া আছে এবং প্রচ্ছন্নভাবেই কাজ করিয়া যাইতেছে। জন্ম মানেই একটা নূতন করিয়া আরম্ভ করা, সুতরাং সেই জন্মের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মগ্নচেতনার যুগযুগাস্তরগভীর অতলতার উপরে একটুখানি দ্বীপের বেষ্টনের মধ্যে সচেতন হইয়া জাগিয়া উঠি এবং সেই অল্প একটু সচেতনতাকে সমগ্র চেতনা বলিয়া ভ্রম করি। একজন লেখক বলিয়াছেন—

 Birth is the end of that time when we really knew our business, and the beginning of the days wherein we know not what we would do.

জন্ম হইতেছে একটা কালের শেষ যখন আমরা আমাদের কার্য কী তাহা জানিতাম এবং অন্য এক কালের আরম্ভ যখন আমরা জানি না আমরা কী করিব? সুতরাং জন্মের সঙ্গে সঙ্গে চিরন্তন জীবনধারার কথা, অথবা যাহা একই কথা, জীবনদেবতার কথাকে ভুলিয়া যদি বর্তমান জীবনকেই একান্ত করিয়া আমরা দেখি, তাহাতে আশ্চর্য কিছুই নাই।

 এই মগ্নচেতনার তত্ত্বকে মানিলে স্মৃতি সম্বন্ধেও আমাদের পূর্বের সংস্কারকে ভাঙিতে বাধ্য হইতে হয়। দেখা গিয়াছে যে, বহু পুরাতন স্মৃতিও একেবারে বিলুপ্ত হয় না, যদিচ বহুকাল পর্যন্ত তাহার অস্তিত্বের কোনো চিহ্নমাত্র থাকে না। হয়তো একটা গন্ধ একজন অশীতি বৎসরের বৃদ্ধকে বাল্যের এমন কোনো ঘটনা মনে করাইয়া দেয় যাহা তাহার মনে পড়িবার কোনো কারণই ছিল না। প্রত্যেকের জীবনের কতকগুলি বাঁধা অভ্যাস আছে এবং সেই বাধা অভ্যাসের স্মৃতি তাহার মধ্যে দিব্য জাগরূক থাকে। অথচ যখন এমন কোনো স্মৃতি মানুষের মনে পড়ে যাহা ভাবের অনুবন্ধিতার নিয়মে তাহার পরিচিত অভ্যাসের কোথাও ধরা দেয় না, তখন তাহা কোনো একটি ইঙ্গিতে (suggestion) মগ্নচেতনার রাজ্য হইতে উঠিয়া আসিয়াছে ছাড়া আর কী কারণ নির্দেশ করা যায়? সুতরাং স্মৃতি যে কত দীর্ঘকাল পর্যন্ত লুপ্তপ্রায় হইয়া আবার জাগ্রত হইতে পারে তাহা হিসাব করিয়া নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব বলিলেই হয়। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু জড়বস্তুর মধ্যেও স্মৃতির সাক্ষ্য লাভ করিয়াছেন। যে জায়গায় কোনো একটা ধাতুপদার্থ কসময়ে আঘাত পাইয়াছে, বহু বৎসর পরে সেই জায়গায় সেই আঘাতের স্মৃতির পরিচয় সে প্রদান করিয়া থাকে। ইহা যদি সত্য হয় তবে বুঝা যাইবে যে, জাগ্রৎ চেতনার রাজ্যেই যে স্মৃতির ষোলোআনা আধিপত্য তাহা নহে, লুপ্ত বা মগ্নচেতনালোকে তাহার আধিপত্য বড়ো সামান্য নহে। অর্থাৎ, জাগ্রতই বলি বা সুষুপ্তই বলি, সমস্ত চেতনাই এক অখণ্ড অনবচ্ছিন্ন চেতনা। যতদূর দেখা যাইতেছে, ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান এই কথাটা প্রমাণ করিবার দিকেই চলিয়াছে।

 বৈজ্ঞানিক জগতে ফেক্‌নার (Fechner) সর্বপ্রথমে এই সত্যটি ঘোষণা করিয়াছিলেন। বিশ্বজগতে সর্বত্র সর্ববিষয়ে সমধর্মতা বিরাজমান রহিয়াছে, ফেক্‌নারের ইহাই একমাত্র প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল। তিনি বলিতেন, যেমন চোখের সঙ্গে দৃষ্টি, ত্বকের সঙ্গে স্পর্শ সংযুক্ত রহিয়াছে, অথচ এই—সকল ইন্দ্রিয় বিভিন্ন, ইহাদের চেতনাও বিভিন্ন, যদিও আশ্চর্য এই যে আমাদের মনে এই ভেদ মিলিয়া গিয়া সমগ্র শরীরের এক চৈতন্য অনুভূত হয়—ঠিক তদ্রূপ আমার চৈতন্য, তোমার চৈতন্য, প্রত্যেক মানুষের চৈতন্য স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ও অবচ্ছিন্ন হইলেও এক অখণ্ড মানবচৈতন্যের মধ্যে মিলিয়া যায়। মানসচৈতন্য যেমন ঐন্দ্রিয়চৈতন্যের পার্থক্য—সকলকে মিলাইয়া লয়, মানবচৈতন্য তেমনি ব্যক্তিগত মানসচৈতন্যের পার্থক্যসকলকে মিলাইয়া লয়। মানবচৈতন্য আবার সেই একই প্রণালীতে পশুপক্ষী—বৃক্ষলতার জীবচৈতন্যে মিলিয়া যায়, জীবচৈতন্য সূর্য প্রভৃতি গ্রহমণ্ডলের বিশ্বচৈতন্যে পর্যবসিত হয়; এইরূপে চৈতন্য ‘from synthesis to synthesis and height to height, till an absolutely universal consciousness is reached’—সমন্বয় হইতে সমন্বয়ে, উচ্চ হইতে উচ্চতর সোপানে আরূঢ় হয়, যাবৎ বিশ্বচৈতন্যের অখণ্ড সমগ্রতা সে লাভ না করে।

 ফেক্‌নার চৈতন্যের ক্ষেত্রকে এইরূপ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডব্যাপ্ত করিয়া দেখিয়া— ছিলেন বলিয়া পৃথিবীকে তিনি জড়পিণ্ড মনে করিতেন না। তিনি পৃথিবীকে মানুষের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর প্রাণবান চেতনাবান সত্তা বলিয়া বোধ করিতেন। আমাদের শরীরের মধ্যে কত অসংখ্য জীবাণুর কী প্রচণ্ড আন্দোলন রহিয়াছে, অথচ আমাদের শরীর দেখিয়া তাহা কেন বোধগম্য হয় না? শরীর সেই অসংখ্য বৈচিত্র্যকে সরল করিয়া মিলিত করিয়া লইতে পারিয়াছে, ইহা ব্যতীত আর তো কোনো কারণ নাই। সেইরূপ এই অগণ্য জীবশরীরকে পৃথিবী আপনার বৃহৎ শরীরের অন্তর্গত করিয়া লইয়াছে, তাই সমগ্র পৃথিবীর শরীরে জীবনচাঞ্চল্য কিঞ্চিন্মাত্রও পরিলক্ষিত হয় না। আমাদের হস্তপদের দ্বারা অঙ্গসঞ্চালন আবশ্যক, পৃথিবীর সেরূপ আবশ্যকতা নাই, কারণ তাহার হস্তপদ সর্বত্রই; তাহার লক্ষ লক্ষ চক্ষু এবং কর্ণ, সে আপনার অংশবিশেষের অর্থাৎ মানুষের অসম্পূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুকরণ করিতে যাইবে কেন?

 ফেক্‌নারের এই চৈতন্যময় বিশ্বপুরুষের আইডিয়ার সঙ্গে গীতার ‘বিশ্বরূপ’এর এবং উপনিষদীয় ‘সর্বভূতান্তরাত্মা’র ভাবের সম্পূর্ণ মিল পাই। বিশ্ব যে সর্বত্র এক চেতনাবান পুরুষের সত্তা দ্বারা ওতপ্রোত এবং আমরা সকলেই যে তাহার অন্তর্গত, এ কথার আভাস উপনিষদের নানা শ্লোকের মধ্যে আছে। মুণ্ডকোপনিষদে আছে—

অগ্নির্মূর্ধা চক্ষুষী চন্দ্রসূর্যৌ
দিশঃ শ্রোত্রে বাগ্‌বৃত্তাশ্চ বেদাঃ।
বায়ুঃ প্রাণো হৃদয়ং বিশ্বমস্যপদ্ভ্যাং
পৃথিবীহ্যেষ সর্বভূতান্তরাত্মা।

অর্থাৎ, অগ্নি (দ্যুলোক) ইহার মস্তক, চন্দ্র ও সূর্য চক্ষুদ্বয়, দিক্‌সকল কর্ণদ্বয়। প্রকাশিত বেদসমূহ বাক্য, বায়ু প্রাণ, হৃদয় বিশ্ব, পাদদ্বয় হইতে পৃথিবী অর্থাৎ মাটি উৎপন্না হইয়াছে— ইনি সমুদয় প্রাণীর অন্তরাত্মা।

 এ কেবল কল্পনা মাত্র নহে, ইহাও বিশ্বকে সেইরূপ অখণ্ড চৈতন্যবান প্রাণবান সত্তারূপে উপলব্ধি, যাহা ফেক্নার করিয়াছেন দেখা গেল।

 ‘জীবনদেবতা’র ভাবের সঙ্গে ফেক্‌নারের যে তত্ত্বটি এতক্ষণ ধরিয়া আলোচনা করিলাম তাহার কি খুবই সাদৃশ্য নাই? জীবনদেবতা মানে একটি ‘ever—evolving personality’—ক্রমশ উদ্ভিদ্যমান ব্যক্তিত্ব। কোন্ আদিম যুগ হইতে এই ‘আমি’ নামক ব্যক্তিটির প্রথম সূচনা হইয়াছিল তাহা কে জানে! আমার বর্তমান দেহের জীবকোষসমূহের মধ্যে সেই বহু বহু প্রাচীন যুগের অভিব্যক্তির ভিতর দিয়া নানা জীব—জীবনযাত্রার সংস্কার সকল সুপ্তস্মৃতিরূপে আজিও বিদ্যমান, তাহা দেখা গেল। সেইজন্য সমস্ত বিশ্বজগতের সঙ্গে আমার আপনার এমন একটা অন্তরতম যোগ যে আমি ক্ষণে ক্ষণে অনুভব করিয়া থাকি, ইহা কল্পনা নয়; ইহা আমার দেহাভ্যন্তরের সমস্ত অব্যক্ত প্রাণের অনির্বচনীয় রহস্যময় স্মৃতি হইতে স্পন্দমান এক আশ্চর্য অনুভূতি।

 কিন্তু সেই যুগযুগান্তর হইতে প্রবাহিত এই জীবনধারার অন্তর্নিহিত সত্তাই যদি জীবনদেবতা হন তবে তাঁহাকে আমার বর্তমান আমিত্বের এই খণ্ডচেতনাটুকুর মধ্যে উপস্থিত করিবার এবং উপলব্ধি করিবার কোনো প্রয়োজন তো দেখা যায় না। আমি যে—সকল অবস্থা অতিক্রম করিয়া আসিয়াছি তাহা আবার অতিক্রম করিবার আমার আবশ্বক কী? তরুলতাপশুপক্ষীর সঙ্গে ঐক্যানুভূতির প্রয়োজন কী? তাহা আর কোনো কারণে নয়, কেবল এইজন্য যে, আমি যে মনে করিতেছি যে আমার বর্তমান জীবনের প্রয়োজনের সীমার মধ্যে আমার যেটুকু জাগ্রৎ চেতনা খেলিয়া বেড়াইতেছে তাহাই আমার সব চেতনা—তাহা প্রকৃতপক্ষেই ভুল। আমার চেতনার ক্ষেত্র যে কোন্ সুদূর অতীত হইতে কোন্ সুদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত প্রসারিত, সে কথাটা বুঝিতেই পারিব না। আমায় তাই এই কথাটি জানিতেই হইবে যে, সেই অখণ্ড— বিশ্বচৈতন্য—লাভ—প্রয়াসী একটি সত্তা আমার মধ্যে চিরকাল ধরিয়া কেবলি আমার জীবনকে গড়িতেছেন, কেবলি তাহাকে বিশ্বের সঙ্গে নানা সম্বন্ধসূত্রে বাঁধিয়া সকল ভেদসীমা দূর করিয়া দিতেছেন। আমাকে অভিব্যক্তির কত স্তরের মধ্য দিয়া তিনি লইয়া আসিয়াছেন; আমার মধ্যে সেই—সমস্ত জীবনযাত্রার অব্যক্ত সংস্কার মগ্নচেতনালোকে মজুত রহিয়াছে; এখনও এই জীবনেও, যেখানে আমার চেতনার প্রসার ব্যাহত সেইখানে, তাহাকে দূর করিবার জন্য তিনি ভিতর হইতে কেবলি আমাকে বিশ্বের সর্বত্র ঠেলা দিয়া বাহির করিতেছেন। ‘There was a child went forth everyday’ তিনিই তো জীবনদেবতা; তিনি চলিয়াছেন ‘from synthesis to synthesis and height to height, till an absolutely universal consciousness is reached’— সমন্বয় হইতে সমন্বয়ে, উচ্চ হইতে উচ্চতর সোপানে, যে পর্যন্ত না বিশ্বচৈতন্যের অখণ্ড সমগ্রতা লাভ করা যায়।—

হে চিরপুরানো, চিরকাল মোরে
গড়িছ নূতন করিয়া—
চিরদিন তুমি সাথে ছিলে মোর,
রবে চিরদিন ধরিয়া।

 ফেক্‌নার সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে প্রাণে ও চৈতন্যে পূর্ণ করিয়া অনুভব করিয়াছেন এবং আমাদের মানসচৈতন্য যে ক্রমে ক্রমে চক্র হইতে পরিবর্ধিত চক্রে আরোহণ করিয়া সেই বিশ্বচৈতন্যের সঙ্গে মিলিত হইবার জন্য যাত্রা করিতেছে, ইহাও তিনি দেখিতে পাইয়াছেন। অর্থাৎ অভিব্যক্তির আরম্ভ হইতে মানুষ পর্যন্ত, অসংহত জ্যোতিঃপিণ্ড ‘নেবুলা’ হইতে সুসভ্য মানুষের উদ্ভব পর্যন্ত, যে একটি ধারা চলিয়াছে, মানুষ সেই ধারাটিকেই পুনরায় অনুসরণ করিয়া আপনার সঙ্গে সমস্ত বিরাট বিশ্বের অখণ্ড যোগ অনুভব করিতে চাহিতেছে। যাহা সে হইয়া আসিয়াছে তাহা সজ্ঞানভাবে জানিবে এবং পূর্ণভাবে উপলব্ধি করিবে, ইহাই তাহার অভিপ্রায়। এইজন্য একসময়ে যাহাকে সে জড় বলিয়া অবজ্ঞা করিয়াছিল আজ তাহারই মধ্যে প্রাণের আশ্চর্য লীলা দেখিতেছে। যাহা বিস্মৃত বিলুপ্ত ছিল তাহা জাগ্রতক্ষেত্রে আসিয়া রহস্যে তাহাকে অভিভূত করিয়া দিতেছে। সমস্ত চেতনা যে এক অখণ্ড অনবচ্ছিন্ন চেতনা, এই তত্ত্বকে প্রত্যক্ষ করিবার দিকে বিজ্ঞান দর্শন সাহিত্য সমস্তই এখন প্রবলবেগে ধাবিত হইয়া চলিয়াছে।

 চেতনা সম্বন্ধে যেমন ফেক্‌নারের তত্ত্ব কী তাহা দেখা গেল তেমনি আধুনিক কালের দার্শনিক আঁরি বের্গ্‌সঁ সে সম্বন্ধে কী বলেন তাহা দেখা যাক। বের্গ্‌সঁ বলেন, চেতনা মানেই স্মৃতি। যে চেতনায় অতীতের কোনো সাক্ষ্য নাই সে চেতনাই নয়—সে তো প্রতিমুহূর্তেই জন্মিতেছে এবং মরিতেছে।

 অথচ চেতনার মধ্যে ভবিষ্যতের একটি প্রতীক্ষাও আছে। কিন্তু অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এত গায়ে গায়ে লাগাও যে, তাহাদের বিচ্ছিন্ন করা যায় না। যেমন ধর আমি যখন বলি ‘আমি ভালো আছি’ তখন একটু পূর্বেই ভালো ছিলাম এবং পরমুহূর্তেও ভালো থাকিব, এই দুইটা আশ্বাস ঐ কথার সঙ্গে সঙ্গে এমন অব্যবহিতভাবে যুক্ত হইয়া থাকে যে তাহাদের বিযুক্ত করা একপ্রকার অসম্ভব। বের্গ্‌সঁ সে সেইজন্য বলিয়াছেন যে ‘consciousness is a hyphen between past and future’—চেতনা অতীত এবং ভবিষ্যতের মধ্যে একটা হাইফেনের মতো। তিনি বলেন, জড়ের সঙ্গে চেতনার প্রভেদ এইখানে যে, চেতনার দ্বারা আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে, মুহূর্তের মধ্যে, জড়রাজ্যের লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ব্যাপার যাহা পরে ঘটিয়াছে তাহাকে ধারণার মধ্যে আয়ত্ত করিতে সমর্থ হই। এই মুহূর্তে আমি চক্ষু দ্বারা যে আলোককে দেখিতেছি তাহার মধ্যে কত সুদীর্ঘকালের ইতিহাস সংহতভাবে নিহিত হইয়া আছে; কত অর্বুদ অর্বুদ ঈথরের কম্পন— মালা, যাহা আমি গণনা করিতে গেলে আমার লক্ষ বৎসর লাগিবে। অথচ আমি একমুহূর্তে এতবড়ো কাণ্ডটা অনুভব করিতে পারিতেছি। দৃষ্টির ন্যায় অন্যান্য চেতনা সম্বন্ধেও এই একই কথা বলা যায়। সুতরাং বের্গ্সঁর মতে চেতনা মানেই অনেকখানি ব্যাপারকে একটুখানির মধ্যে ধরা, জড়রাজ্যে যাহা লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরিয়া সম্পাদিত হইতেছে তাহাকে একমুহূর্তের মধ্যে উপলব্ধি করা। তাহাকে বের্গ্সঁ নানা স্থানে কোথাও impulse অর্থাৎ প্রৈতি বলিয়াছেন, কোথাও intuition অর্থাৎ হৃদ্স্থিত সহজ ও অখণ্ড বুদ্ধি বলিয়াছেন— অর্থাৎ তাঁহার মতে চেতনা, বিশ্ব— অভিব্যক্তির মধ্যে সৃষ্টিরই প্রেরণা। এইজন্য বের্গ্সঁ Creative Evolution গ্রন্থ লিখিয়াছেন— অভিব্যক্তির মধ্যে যে একটি সৃজনীশক্তি চেতনারূপে লীলা করিতেছে ইহাই তিনি প্রমাণ করিবার জন্য উদ্যোগী। জড় এই সৃষ্টির প্রেরণার উপকরণ মাত্র। কোথাও কোথাও চেতনা জড়ের দ্বারা আক্রান্ত হইয়া জড়স্বভাবাপন্ন হইয়াছে, কিন্তু তাহার নিয়ত চেষ্টাই এই যে, সে উপকরণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া আপনার অনির্বচনীয় অবন্ধন রূপকে প্রকাশিত করিতে সমর্থ হইবে। এ যেন কবিতা— তাহার প্রাণই আসল, ভাষা তাহার উপকরণ; যেখানে তাহার প্রাণ পূর্ণ জাগ্রত সেখানে ভাষার দেহ সেই প্রাণে প্রাণিত, যেখানে প্রাণ সুপ্ত সেখানে ভাষাই সব হইয়া উঠিয়া গতিহীন নিশ্চলতা ও মৃত্যুর আকার ধারণ করে।

 বের্গ্সঁর সম্পূর্ণ মতটি এখানে প্রকাশ করিয়া বলা অসম্ভব, কারণ তাহা এক কথায় দু কথায় সারিয়া দিবার মতো নহে। তবে যতটুকু বলা গেল তাহাতে আমরা দেখিতেছি যে, বের্গ্সঁ চেতনাকে যে সৃষ্টির প্রেরণা বলিয়াছেন, জীবনদেবতার আইডিয়ার সঙ্গে তাহার বেশ মিল আছে। সমস্ত অভিব্যক্তির মধ্যে এই চেতনার ধারাই তো জীবনে জীবনে আমাকে সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে; সে কত কী আনিয়াছে, কত সংস্কার জমাইয়াছে, কত ফেলিয়াছে, কত গড়িয়াছে এবং আজ পর্যন্ত তাহার সেই সৃষ্টির কাজ ক্ষান্ত নাই। সে সমগ্র চেতনাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না লাভ করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে আপনাকে সৃষ্টি করিয়াই চলিবে। এক দিকে তাহার অনাদি অতীত, অন্য দিকে অনস্ত ভবিষ্যৎ।—

এখনি কি শেষ হয়েছে প্রাণেশ,
যা কিছু আছিল মোর?
ভেঙে দাও তবে আজিকার সভা,
আনো নব রূপ, আনো নব শোভা,
নূতন করিয়া লহো আরবার
চিরপুরাতন মোরে—
নূতন বিবাহে বাঁধিবে আমায়
নবীনজীবনডোরে।

 আমি যে জীবনদেবতা লইয়া এত বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক, প্রমাণপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করিলাম তাহা দেখিয়া অনেক কাব্যরসজ্ঞ ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হইতে পারেন। রসের দিক দিয়া কবিতার একপ্রকার উপভোগ আছে এবং তাহাই যে তাহার শ্রেষ্ঠ উপভোগ সে সম্বন্ধে আমার সন্দেহমাত্র নাই। কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি যে, কবিতা শুধুই রস কিন্তু সত্য নয়, এমন করিয়া দেখা আমি যথার্থ দেখা বলিয়া মনে করি না। তাহার মাহাত্ম্যই তাহার প্রকাশে, সেইখানেই তাহার রস, এবং তত্ত্বপদার্থ তাহার মধ্যে একেবারেই গৌণ—ইহা স্বীকার করিলেও, তাহাকে সত্তাবর্জিত প্রাণবর্জিত রূপমাত্র মনে করিয়া আমি কোনো সান্ত্বনা লাভ করি না। আমার বিশ্বাস এই এবং জীবনদেবতার আলোচনায় এ ক্ষেত্রে আমি স্পষ্টই দেখিতে পাইতেছি যে, বড়ো কবি মাত্রেই জানিয়া এবং না জানিয়া তাঁহার কালের সকল দিক্‌কার সকল প্রয়াসের মধ্যে সাধনার মধ্যে ও চিন্তার মধ্যে প্রবেশ লাভ করিয়া থাকেন। আমি যে—সকল চিন্তার ধারা অনুসরণ করিলাম, হইতে পারে যে রবীন্দ্রনাথ তাহাদের সঙ্গে যোগ রাখিয়াছিলেন বলিয়া এই জীবনদেবতার ভাব তাঁহার মধ্যে জাগিয়াছে, কিন্তু তাহা না হইলেও আপনা—আপনি আপনার কবিত্বের অন্তর্দৃষ্টি হইতেই এই ভাব তাঁহাকে অধিকার করিতে বাধ্য— যখন এই ভাবের বাষ্প সমস্ত আকাশে ছড়াইয়া আছে দেখিতে পাই। এইজন্যই বড়ো কবিকে seer বা দ্রষ্টা বলে— তিনি নদীর মতো তাঁহার কালের নিম্নস্তরে গভীরভাবে প্রবাহিত সকল ভাব—উৎস হইতে খাদ্য সংগ্রহ করিয়া পুষ্টিলাভ করিয়া থাকেন। যাহা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়াইয়া থাকে তাহাকে তিনি সংহত করিয়া এক করেন। আর এইজন্য বড়ো কবির সমগ্র জীবনের ভিতর হইতে সমুদ্ভূত কোনো আইডিয়াকে নিতান্ত কাল্পনিক বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া একমাত্র নির্বোধ ও প্রাকৃত জনের দ্বারাই সম্ভব। জীবনদেবতার রহস্য কিছু কিছু উদ্ঘাটিত হইলে তাহা খুবই আনন্দের বিষয় হইবে সন্দেহ নাই।[]

 ১৩১৯

  1. জীবনদেবতা প্রবন্ধে আমরা জীবতত্ত্বের যে সিদ্ধান্তের কথা বলিয়াছি তাহা পণ্ডিত—সমাজে এখন অগ্রাহ্য। জীবতত্ত্বে লামার্ক্ প্রভৃতির মত ছিল যে, এক আদিম জীবকোষই অভিব্যক্তির ফলে খাদ্য জলবায়ু ও পরিবেষ্টনের (environment) নানা বৈচিত্র্যের কারণে বিভিন্ন জীবশ্রেণীতে (species) ক্রমে পরিণত হইয়াছে। কিন্তু এখন দেখা যাইতেছে যে লামার্কের ‘gelatinous bodies’ অথবা হেকেলের (Haeckel) ‘moneron’, ইহারা কেহই আদিম জীবকোষ নহে। আদিম জীবকোষ এক নহে। গরিলা বা শিম্পাঞ্জি হইতে যে মানুষের উদ্ভব হইয়াছে বা জীবজন্তু উদ্ভিদ হইতে ক্রমবিকাশ লাভ করিয়াছে, এ মত এখন প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিকেরা অস্বীকার করিয়াছেন। এখন প্রায় সকলেই বলিতেছেন যে, বিভিন্ন শ্রেণীর প্রাণীর জীবকোষের মধ্যেই তার স্বাতন্ত্র্য বা বৈষম্যের কারণ বা বীজ সুপ্ত থাকে। কোথাও আমরা ইহা ধরিতে পারি, কোথাও পারি না।
     শুধু জীবতত্ত্ব নয়, মনস্তত্ত্বেও (Psychology) ঠিক এই রকম একটা মতের পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। কণ্ডিল্লাক (Condillac) মনে করিতেন যে আমাদের মনের বিচিত্র ভারসকল এক অখণ্ড আদিম চৈতন্য হইতে ক্রমে ধারাবাহিকরূপে বিকাশ লাভ করিয়াছে। এমন—কি বেইন (Bain) ইহা অস্বীকার করিয়া প্রমাণ করিয়াছেন যে, বুদ্ধি (intellect) ইচ্ছা (will) প্রভৃতির চিহ্ন গোড়াতেই আমাদের চৈতন্যের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করা যায়। অঁরি বের্গ্সঁ তো বলেন যে, বুদ্ধি (intellect) ও বোধি (intuition) চৈতন্যের প্রথম অবস্থা হইতেই বিভিন্ন। ক্রমশ সেই ভিন্নতা স্ফুটতর হয় মাত্র। বোধি হইতে কখনও বুদ্ধি বিকাশ লাভ করে না বা বুদ্ধি অভ্যাসগত হইয়া কখনও বোধি হইয়া পড়ে না।
     ক্রম—উদ্ভিন্ন বিভিন্ন শ্রেণী (species) ও বিভিন্ন মনোবৃত্তির (faculties) স্বাতন্ত্র্য যদি গোড়াতেই মানিয়া লই, তথাপি জীবনদেবতার মূল কথাটির সহিত তাহার বিশেষ কোনো বিরোধ আমি আশঙ্কা করি না। মানুষের চৈতন্যের বৈচিত্র্যের মধ্যেও যে এক পরম ঐক্য স্পষ্ট বিদ্যমান, ইহা তো কেহই কোনোরূপে অস্বীকার করিতে পারে না। বৈচিত্র্য যতই সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর হইবে, ঐক্যও ততই ব্যাপক ও গভীরতর হইয়া সেই— সমস্ত জটিল সূহ্মাতিসূক্ষ্ম বৈচিত্র্যকে এক চরম সমাধানের মধ্যে সার্থক করিবে।
     এক অনন্ত বিশ্বচৈতন্যই জড়ে উদ্ভিদে ও জীবে আত্মপ্রকাশ করিতেছেন। অভিব্যক্তির ফলে মানবাত্মা যতই এই বিশ্বাত্মা বা বিশ্বচৈতন্তের দিকে অগ্রসর হইতেছে ততই তার উপলব্ধির বৈচিত্র্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতেছে। রবীন্দ্রনাথের কবি—উপলব্ধি যে ক্রমে এই বিশ্ব—ব্যাপকতা লাভ করিয়া ফেক্‌নার—কথিত বিশ্বচৈতন্যের সহিত একটা প্রাণময় যোগ স্থাপন করিতে পারিয়াছে, তাহা আর অস্বীকার করিবার উপায় কী? বহুবিধ ব্যক্তিত্বের (multiple personality) বিচিত্র সমাবেশও এই কারণেই তাঁহার একব্যক্তিত্বের ভিতর দিয়া যে প্রকাশমান হইয়া উঠিয়াছে, ইহা তাঁহাকে মানিতেই হয়। সুতরাং জীবনদেবতার এই মূলতত্ত্বটির সঙ্গে বর্তমান জীবতত্ত্ব বা মনস্তত্ত্বের সিদ্ধান্তের কোথাও কোনো বিরোধ নাই।