বিষয়বস্তুতে চলুন

কাব্যপরিক্রমা (১৯৫৮)/জীবনস্মৃতি

উইকিসংকলন থেকে

জীবনস্মৃতি

ভালো আত্মজীবনীর বিশেষত্বই এই যে, তাহা জীবনকে কেবল বাহিরের কতকগুলি ঘটনার জড়সমষ্টির মধ্যে শৃঙ্খলিত কয়েদীর মতো করিয়া দেখায় না। তাহা জীবনের অন্তরতম স্থানের একটি গভীর অভিপ্রায়ের সূত্রে বাহিরের ঘটনাগুলিকে এমনি মালার মতন গাঁথিয়া তোলে যে, জীবনের সকল বৈচিত্র্যেরই একটি বড়ো তাৎপর্য দীপ্যমান হইয়া উঠে। জীবন যে বাহির হইতে কেবলই নিয়ন্ত্রিত নয়, কিন্তু ভিতর হইতে উচ্ছ্বসিত, সে যে বদ্ধ নয়, কিন্তু মুক্ত—এ কথা আমরা তখন সহজেই বুঝিতে পারি।

 কিন্তু এমন করিয়া আপনাকে উদ্ঘাটিত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কারণ, নিজের কথা বলিতে গেলেই মানুষ অতিসচেতন হইয়া পড়ে—তখন তাহার কথার মধ্যে স্বচ্ছতা থাকে না, দেখিতে দেখিতে মিথ্যা ও ভান আসিয়া দেখা দেয়। আপনাকে না ভুলিতে পারিলে, আপনাকে অন্য লোকের মতো করিয়া স্বতন্ত্র করিয়া না দেখিতে পারিলে, আত্মজীবনী লিখিতে পারা যায়, ইহা আমার বিশ্বাস নহে। কিন্তু সেই আপনাকে আপনা হইতে স্বতন্ত্র করা সকলের চেয়ে কঠিন-সাধনা-সাপেক্ষ। এই জন্য সাহিত্যে যথার্থ আত্মজীবনী লেখা সকলের চেয়ে শক্ত ব্যাপার। এখানে পদে পদে অহমিকা ও আত্মপ্রতারণার সম্ভাবনা আছে বলিয়াই ইহা এত দুরূহ।

 ইউরোপে বহুদিন হইতে অনেকে এই কার্য করিয়া আসিতেছেন। সেইজন্য দেখা যায় যে, মানুষ সেখানে আপনাকে অনেকটা পরিমাণে উদ্ঘাটিত করিয়া দেখাইতে অভ্যস্ত হইয়াছে। সেণ্ট অগস্টিনের কন্‌ফেশন্‌সে যে-সকল পাপের কাহিনী বিবৃত হইয়াছে তাহা আমাদের দেশের কোনো সাধু মহাত্মা অমন অসংকোচে বলিতে পারিতেন কি না সন্দেহ। কবি গ্যয়্‌টে তাঁহার আত্মজীবনী যেভাবে লিখিয়াছেন তাহা আমাদের দেশের কোনো কবির দ্বারা সম্ভাবনীয় বলিয়া মনে করি না। তাহার কারণ, মানুষের জীবন যে একটা অভিব্যক্তির লীলাক্ষেত্র সেই কথাটা আমাদের চেতনায় যথেষ্ট পরিমাণে উজ্জ্বল হইয়া উঠে নাই।

 কবি রবীন্দ্রনাথ যে ‘জীবনস্মৃতি’ লিখিয়াছেন, তাহার নামেই পরিচয় যে, তাহা আত্মজীবনী নহে। বাল্যজীবনস্মৃতিই এই গ্রন্থের চারি ভাগের তিন ভাগ স্থান জুড়িয়া বসিয়াছে। অর্থাৎ, জীবনের কথা যতদূর পর্যন্ত অত্যন্ত নিঃসংকোচে ও নির্ভয়ে বলা যায় ততদূর পর্যন্ত কবি অগ্রসর হইয়াছেন, তার পর শক্তির অভাবের দোহাই দিয়া বিদায় লইয়াছেন। আপনার কথা নিতান্ত সহজে আত্মবিস্মৃতভাবে বলা যে কত কঠিন তাহা কবি নিশ্চয় ভালোরূপেই জানেন। এই গ্রন্থের মধ্যেও তাহার প্রমাণ যে মধ্যে মধ্যে পাই নাই এমন কথাই বা কী করিয়া বলি। যেখানেই তাঁহার নিজের রচনার কথা আসিয়াছে সেখানেই কবি পরিহাসের পর্দার আড়ালে সরিয়া গিয়াছেন—বেচারা রচনা বাহিরের লোকের কৌতূহলী দৃষ্টির মধ্যে মাতা কর্তৃক পরিত্যক্ত শিশুর মতো অসহায় ও সকরুণ অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছে। ভানুসিংহের কবিতা, কবিকাহিনী, ভগ্নহৃদয়, সন্ধ্যাসংগীত, ছবি ও গান প্রভৃতি রচনার আলোচনা দেখিলেই এ কথার সত্যতা বুঝা যাইবে। এই সমালোচনাগুলি যে অসংগত বা অন্যায় হইয়াছে তাহা বলিতেছি না। কারণ, এ সমস্ত রচনাই এত কাঁচাবয়সের যে, সে সম্বন্ধে কবি যাহা লিখিয়াছেন, নিরপেক্ষ সমালোচক হয়তো তদপেক্ষা তীব্রতরভাবে লিখিতে পারিত। কিন্তু কবির যে-একটি সসংকোচ কৌতুকলীলা ইহার মধ্য দিয়া প্রকাশ পাইয়াছে তাহাতেই বেশ বুঝা যায় যে এটি তাঁহার প্রকৃতিগত―তিনি যদি আরও অগ্রসর হইতেন তবে পরিণত বয়সের রচনাগুলিরও অবস্থা অতদূর শোচনীয় না হোক, খুব আরামের হইত না বোধ হয়।

 কিন্তু যাহা পাই নাই তাহার জন্য আক্ষেপ থাকিলেও সে আক্ষেপ বৃথা। কবির ‘জীবনস্মৃতি’তে জীবনচরিতের স্বাদ না পাইলেও একটি জিনিস ইহার ভিতরে পাওয়া গিয়াছে, যাহা যে-কোনো ভাষায় অতুলনীয়। কবি গ্রন্থের আরম্ভে বলিয়াছেন যে, স্মৃতির পটে জীবনের যে ছবি অঙ্কিত হয় তাহা ইতিহাস নয়, অর্থাৎ যাহা বাহিরে ঘটিতেছে তাহার যথাযথ নকল নয়। তাহা ‘এক অদৃশ্য চিত্রকরের স্বহস্তের রচনা।’ জীবনের সেই নানা বিচিত্র স্মৃতিচিত্রের আনন্দরসে এই গ্রন্থখানি ভরপুর। সেইজন্য ইহা এমন আশ্চর্য। মানুষের জীবনের সকল প্রকারের স্মৃতির মধ্যে যে এমন অপূর্ব একটি চিত্ররস থাকিতে পারে, এই গ্রন্থ না পড়িলে তাহা মনে করাই সম্ভব হইত না।

 আমি দেখিয়াছি, সাহিত্যে অধিক কথার ভার চিত্ররসের পক্ষে ব্যাঘাতকর। নির্মল জলেই যেমন প্রতিবিম্ব পড়ে, সেইরূপ চিন্তার গুরুভারকে সরাইতে না পারিলে লেখা নানা চিত্রে প্রতিফলিত হইয়া বিচিত্র রাগে রঞ্জিত হইবার মতো স্বচ্ছতা লাভ করে না। কবির অনেক বড়ো বড়ো কাব্যে তিনি অনেক বড়ো বড়ো কথা বলিয়াছেন—কিন্তু ‘ক্ষণিকা’য় কোনো বড়ো কথা বলিবার ছিল না বলিয়া, ‘শুধু অকারণ পুলকে’ ক্ষণিক সৌন্দর্যের মধ্যে পরিপূর্ণ আনন্দে ডুব দিবার আয়োজন ছিল বলিয়া তাহা বাংলার গ্রাম্য প্রকৃতির অমন সুন্দর চিত্রমালা হইয়া উঠিয়াছিল। বাস্তবিক ক্ষণিকায়—

শত বরনের ভাব-উচ্ছ্বাস
কলাপের মতো করেছে বিকাশ।

রঙের এমন ছড়াছড়ি, ছন্দের এমন নৃত্যলীলা, কোনো কাব্যে কি কখনও দেখা গিয়াছে?

 এবারেও জীবনচরিত লিখিবেন না বলিয়াই কবি জীবনস্মৃতি লিখিতে বসিয়াছিলেন। তাই শুধু নিজের বাল্যজীবনের চিত্র নয়, বাড়ির চিত্র, পরিবারমণ্ডলীর চিত্র, তৎকালীন সমাজের চিত্র, নানা লোকচিত্র, ও প্রকৃতির দৃশ্যচিত্রে গ্রন্থখানি পূর্ণ করিয়া আমাদের হাতে আনিয়া দিয়াছেন।

 এই স্মৃতিচিত্রে যে রঙ পড়ে সে এমন একটি মোহ-মাখানো কল্পনার রঙ যে, আমার বিশ্বাস, কবি যদি চিত্রশিল্পী হইতেন তবে শুদ্ধমাত্র শব্দে সেই রঙ লাগাইয়া তিনি তৃপ্তিবোধ করিতেন না। কিন্তু চিত্র আঁকা তাঁহার আসে না বলিয়া ভাষাতেই চিত্রবিলাসকে মিটাইতে হয়। তথাপি নিপুণ শিল্পীর তুলিতে এই স্মৃতিচিত্রগুলি কী আকার ধারণ করিতে পারে তাহা শুধু কল্পনায় নয়, প্রত্যক্ষরূপে দেখিবার সুযোগ আমাদের ঘটিয়াছে। এই গ্রন্থে কবির সরস হাতের ভাষার চিত্রের সঙ্গে সঙ্গে নিপুণ চিত্রকর শ্রীযুক্ত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের অঙ্কিত চিত্র যুক্ত হইয়া মণির সঙ্গে কাঞ্চনের যোগের মতো অপূর্ব শোভা খুলিয়াছে। আমরা তো চিত্রশিল্প সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ; তথাপি গ্রন্থ পড়িতে পড়িতে বর্ণনার যে একটি মোহরস কল্পনাকে আবিষ্ট করিয়াছে, দেখিতেছি সেই মোহের স্বপ্নাঞ্জন তুলিকায় মাখাইয়া অনতিস্ফুট বিভাসে শিল্পী তাঁহার প্রত্যেকটি চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন। সকল চিত্রগুলিই আমাদের ভালো লাগিয়াছে— তবে কয়েকটি চিত্র সম্বন্ধে শুধু ভালো লাগিয়াছে বলিলে অত্যন্ত অল্প করিয়া বলা হয়। প্রথমত বাড়ির ভিতরের সেই বাগানের চিত্রটি, যাহা তরুণ বালকের নিকটে ‘স্বর্গের বাগান’ ছিল। সেখানে বেশি গাছপালা ছিল না, একটা বাঁধানো চাতাল মাত্র ছিল। কিন্তু দুইটি নবীন চক্ষুর নিকটে তাহাই পর্যাপ্ত ছিল। অঙ্কিত ছবিটিতে সেই অল্পের মধ্যে যে একটি ভরপুর বিস্ময় ও আনন্দ, একটি নিত্যজাগ্রত কৌতূহল, তাহা অস্পষ্ট ছায়াভাসে এমন স্বপ্নময় হইয়া উঠিয়াছে। তার পর সেই রাত্রে বারান্দায় বসিয়া দাসীদের সলিতা পাকানো ও বিশ্রম্ভালাপের চিত্র। একটুখানি অংশে জ্যোৎস্না আসিয়া পড়িয়াছে, বারান্দার অবশিষ্ট অন্ধকারময় অংশে তাহারা বসিয়াছে। চিত্রটি রাত্রির রহস্যে কী পরিপূর্ণ! জ্যোৎস্নালোক রাত্রির সকল আবরণ উন্মোচন করিতে পারে নাই—যে রহস্যভবনের ভিতরে কত কালের কত রূপকথা, কত স্বপ্ন, কত দূরদূরান্তরের কলগুঞ্জন নিবিড় হইয়া আছে, তাহারই এক প্রান্তে দাঁড়াইয়া জ্যোৎস্না উঁকি মারিতেছে। আমরাও তাহার সঙ্গে সঙ্গে ভিতরের দিকে দৃষ্টি ফেলিবার চেষ্টা করিতেছি। তার পর, সম্পূর্ণরূপে আইডিয়াল চিত্র যেগুলি, সেগুলিই বা কী চমৎকার! যেমন ‘হেলাফেলা সারাবেলা এ কী খেলা আপন সনে’ এই গানটির চিত্র। দুপুরবেলার আলস্য-জড়ানো যে একটি ঔদাস্য আছে, বহুদূরের স্বপ্ন যখন মনকে উতলা করিয়া তোলে—ঐ গানটিতে সেই উদাস ব্যাকুলতার একটি সুর আছে। গানটির কথার মধ্যে সেই সুরটিকে ধরা যায় না, কিন্তু গানটি দুপুরে গুন্ গুন্ করিয়া কেহ গাহিলেই তৎক্ষণাৎ মন তাহার অনুরণনে ঝংকৃত হইতে থাকে। এমন একটি সুরকে রূপে ধ্যান করা বড়ো সহজ ব্যাপার নহে। এই ছবিটি তাই কল্পছবি—মানসবনের লীলাপুষ্পের গন্ধ খচিত ছায়াছবি। সকল ছবিই এমনি অপরূপ ―তাহাদের পরিচয় দিতে যাওয়া বৃথা, তাহারা নিবিষ্টভাবে উপভোগের জিনিস। যেগুলি মানুষের চিত্র, যেমন শ্রীকণ্ঠ সিংহের, তাহাদের ভিতরেও অন্তরের প্রতিকৃতিটি কেমন সহজেই উঠিয়া আসিয়াছে। বাস্তবিক এই চিত্রগুলি এ গ্রন্থের বহুমূল্য অলংকার।

 আমি বলিয়াছি যে, ‘জীবনস্মৃতি’তে কবির বাল্যস্মৃতি গ্রন্থের চারি ভাগের তিন ভাগ স্থান অধিকার করিয়াছে। অনেক বয়স্ক পাঠক ইহাতে মনে মনে আপত্তি করিতে পারেন যে, ছেলেবয়সের কথার মধ্যে এত কী লিখিবার বিষয় থাকিতে পারে? বৃন্দাবনের গোষ্ঠলীলায় ভগবান বালকবেশে সখাদের সঙ্গে খেলা করেন, বৈষ্ণব সাহিত্যে তাহার বর্ণনা আছে। তার মানে ভগবান শিশুর সঙ্গে শিশু হইয়াই খেলা করেন—তাঁহার এত বড়ো বিপুল জগৎ একটি শিশুর খেলাঘর বৈ আর কিছুই নয়। সকল মানবের শৈশবের আনন্দলীলাকে যদি সেই অনন্তের মধ্যে পরিপূর্ণ করিয়া দেখা এ দেশে সত্য হইয়া থাকে এবং আমাদের হৃদয় তাহাকে সেইরূপেই যদি উপলব্ধি করিয়া থাকে, তবে কবির বাল্যজীবনের মাধুর্যময় চিত্ররস আমাদের উপভোগ্য হইবে না কেন? বুড়া বয়সে কবি নিজে যে সেই বাল্যের স্মৃতিগুলি আঁকিতেছেন, তাহার মধ্যে তাঁহার নিজের কি একটি নিগূঢ় উপভোগ নাই? সেই তাঁহার ‘সুকুমার আমি’টিকে তিনি কী করুণ, কী সুন্দর করিয়াই দেখিতেছেন। এক দিক দিয়া দেখিতে গেলে তাঁহার বাল্যজীবন কিছুমাত্র সুখকর ছিল না। ‘ভৃত্যরাজকতন্ত্রে’র শাসনে কত ক্লেশ ছিল, তখন বাড়ির বাহিরেও তাঁহার অবাধ গতিবিধি নাই, ভিতরেও নাই। কিন্তু সেই সুকুমার কিশোরটিকে সেই সকল ক্লেশে কি কিছুমাত্র ম্লান করিয়াছিল? সেই বাড়ির ধারের বাগান পুকুর ও বটগাছ দেখিয়াই কতদিন তাঁহার আনন্দে কাটিয়াছে। মধ্যাহ্নআকাশের খরদীপ্তি ও তাহার স্তব্ধতার মধ্যে চিলের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ও ফেরিওয়ালার করুণ হাঁক কী উন্মনা করিয়া দিয়াছে। সেই নারিকেল-তরুশ্রেণী লেবুগাছ ও অন্যান্য দু-একটা তরু-বিশিষ্ট বাড়ির ভিতরের বাগানটিই মানবের আদিম স্বর্গকাননের মতো ছিল, শরতের শিশিরস্নাত সোনালি প্রত্যুষে সেইখানেই কত আনন্দে, কত বিস্ময়ে, হৃদয় কম্পিত হইয়াছে। এই তো শৈশবলীলা—ইহা বৈষ্ণবী গোষ্ঠলীলার ন্যায় কিছুমাত্র ভাবগত জিনিস (idealised) নয়―কিন্তু সম্পূর্ণ বাস্তব হইয়াও চিত্ররসের মোহের জন্য ইহাকে পড়িতে কী অপরূপ কাব্যের মতো বোধ হয়। এ কাব্য বাল্য জীবনের কাব্য।

 আমার বিশ্বাস, পরিণত বয়সে কবি যে তাঁহার অপূর্ব ‘শিশু’ কাব্যখানি রচনা করিয়াছিলেন, সেও এই স্মৃতি অবলম্বনেই। জীবনস্মৃতির এই গোড়াকার অংশের সঙ্গে তাহার খুবই সাদৃশ্য আছে, তবে কবিতা বলিয়া তাহা খুঁটিনাটি বর্ণনা-বর্জিত। অথচ সেই খুঁটিনাটির জন্যই এই গ্রন্থে চিত্রগুলি এমন ভরাট হইয়াছে। ‘শিশু’ কাব্যটি শিশুদের জন্য রচিত হইয়াছে এই ধারণায় অনেক বয়স্ক পাঠক তাহা পড়েন না জানি। তাঁহাদেরও দোষ নাই—বড়ো বড়ো হরফে বালকদিগের পাঠের সুবিধার্থে কাব্যটি মুদ্রিত হইয়াছিল। কিন্তু প্রকাশকের আড়ালে এখানে আমরা পাঠকদিগকে বলিয়া রাখি যে, কাব্যটির পুরা রস বুড়া শিশুরাই ভালোরূপে আদায় করিতে পারিবেন। জীবনস্মৃতির সঙ্গে তাহাকে মিলাইয়া পড়িলে চিত্র ও কাব্য উভয়েরই রস একই কালে পাওয়া যাইবে।

 তার পর, ইস্কুল-নামক কলের মধ্যে পৃথিবীর কোনো বড়ো কবিই তৈরি হন না, সুতরাং কবির ছাত্রজীবনের কাহিনীতে বিশেষ উপভোগ্য কিছুই নাই। কিন্তু এই বালককালের পঠদ্দশার বিবরণের মধ্যে দুইটি চমৎকার চিত্র আমরা পাইয়াছি। একটি বৃদ্ধ শ্রীকণ্ঠ সিংহের চিত্র, অন্যটি কবির পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের। এই চিত্র দুইটি কবির জীবনের ভাবের এবং কল্পনার অঙ্গীভূত হইয়া গিয়াছে বলিলেও অসংগত হয় না। ইহাদের পরস্পরের মধ্যে একটি ভিতরকার যোগ আছে, সেইজন্য ইহারা কবির কল্পনাকে কেবল স্পর্শমাত্র করিয়া বিদায় লয় নাই, খুব গভীরভাবে আঘাত করিয়াছে। সমুদ্রের উপরিভাগের সঙ্গে সমুদ্রের তলদেশের সম্বন্ধের মতো এই দুইটি চিত্রের পরস্পরের সম্বন্ধ। একটি চঞ্চল, অপরটি স্তব্ধ; একটি আত্মবিহ্বল, অপরটি আত্মসমাহিত; একটি লীলাময়, অপরটি যোগমগ্ন; একটি সজন, অপরটি নির্জন। পূর্ণতার এই দুইটি দিকই কবির কাছে তুল্য আদরণীয়। অল্পবয়সের রচনায় পরিণত বয়সের চিত্র আঁকিবার বেলায় ইহাদের একটি দিকই পুনঃপুনঃ দেখা দিত—ঐ আনন্দবিহ্বল উদার উন্মুক্ত রসোচ্ছ্বসিত দিক। ‘বউঠাকুরানীর হাট’এর বসন্তরায় যেমন। কিন্তু অধিক বয়সের রচনায় ‘রাজা’ প্রভৃতি নাট্যের ঠাকুরদাদার চিত্রে ঐ দুইটি দিকের সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়—পূর্ণতা ও পরিণতির ঐ যেন স্বরূপ।

 এই একটি কারণ ব্যতীত, মহর্ষির যে চিত্র পাওয়া গিয়াছে তাহা অন্যান্য কারণের জন্যও ভালো করিয়া প্রণিধানযোগ্য। প্রথমত মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। সুতরাং সে সম্বন্ধে আমরা সকলেই কিছু-না-কিছু কৌতূহলী। তার পর, তাঁহার পুত্রগণের উপর তাঁহার চরিত্রের ও আদর্শের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব কতটা পড়িয়াছিল তাহাও জানিবার বিষয়। কিন্তু সকলের চেয়ে একটি কারণে এই চিত্রটি আমার মূল্যবান বলিয়া বোধ হয়, তাহারই কথা বলিতেছি।

 গ্রন্থ হইতে আমরা যে শিক্ষা লাভ করি তদপেক্ষা অনেক বেশি শিক্ষা যে মানুষের সঙ্গ হইতে লাভ করি, বোধ হয় এ কথাটা মহর্ষি খুব ভালো করিয়া বুঝিয়াছিলেন। সেইজন্য দেখিতে পাই যে, তাঁহার বাড়িটিকে তিনি সর্বপ্রকার শিক্ষা ও অনুশীলনের একটি আদর্শভূত প্রশস্ত ক্ষেত্র করিয়া তুলিয়াছিলেন। সর্বপ্রকারের গুণীব্যক্তিদিগের সেখানে সমাগম হইয়াছিল। তাঁহারা কেহ-বা পণ্ডিত, কেহ-বা ধর্মপ্রাণ, কেহ-বা গায়ক, কেহ-বা রসজ্ঞ, কেহ-বা সাহিত্যিক, কেহ বা দার্শনিক—কিন্তু সকলেই মহর্ষির নিকটে সম্মান ও সমাদর লাভ করিতেন বলিয়া তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। নিজের বাড়ির চতুর্দিকে এই প্রকারের একটা বড়ো আবহাওয়া সৃষ্টি হওয়ায়, তাহার শিক্ষাই কবি ও তাঁহার অগ্রজ ভ্রাতৃগণের জীবনে সর্বাপেক্ষা ফলপ্রদ হইয়াছিল দেখিতে পাওয়া যায়। অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজনারায়ণ বসু প্রভৃতি মনীষিগণ মহর্ষির বাড়িতে আপনার লোকের ন্যায় স্থান পাইয়াছিলেন। কবি বাল্যবয়সে বিহারীলাল, অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী প্রভৃতিকেই অবশ্য অধিক দেখিয়াছিলেন। আমার মনে হয় এই কারণেই সাহিত্য, দর্শন, সংগীত, কলাবিদ্যা, ধর্ম প্রভৃতি সকল বিষয়ের একটা সহজ বোধ এবং অনায়াস অধিকার মহর্ষিপরিবারের একটা বিশেষত্ব হইতে পাইয়াছে। কোনো কালেজি শিক্ষায় তাহা কদাচ হইতে পারিত না।

 এইরূপে বাড়ির মধ্যেই শিক্ষার বীজ প্রচুররূপে ছড়ানো হইয়াছিল বলিয়া, এই অনুকূল পরিবেষ্টনের মধ্যে কবির কাব্যজীবনটি ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হইতেছিল। কবি এই গ্রন্থের অনেক স্থানেই তাহা স্বীকার করিয়াছেন: ‘ছেলেবেলায় আমার একটা মস্ত সুযোগ এই ছিল যে, বাড়িতে দিনরাত্রি সাহিত্যের হাওয়া বহিত।··· বাংলার আধুনিক যুগকে যেন তাঁহারা সকল দিক দিয়া উদ্‌বোধিত করিবার চেষ্টা করিতেছিলেন। বেশে ভূষায় কাব্যে গানে চিত্রে নাট্যে ধর্মে স্বাদেশিকতায় সকল বিষয়েই তাঁহাদের মনে একটি সর্বাঙ্গসুন্দর জাতীয়তার আদর্শ জাগিয়া উঠিতেছিল।··· বাড়িতে কত আনাগোনা··· হাসি ও গল্পে বারান্দা এবং বৈঠকখানা মুখরিত হইয়া থাকিত।’ সুতরাং বাহির হইতে ও ভিতর হইতে কী কী কারণ একত্র হইয়া কবির চিত্তের বিকাশের পক্ষে সহায়তা করিতেছিল, এই গ্রন্থ হইতে তাহার ইতিহাসের নিদর্শনগুলি সংগ্রহ করা কঠিন হইবে না। সর্বদা বিচিত্র প্রকারের সাহিত্য-পাঠ ও আলোচনা-শ্রবণ, গীতচর্চা, নানা লোকের ঘনিষ্ঠ সঙ্গলাভের যে সুযোগ কবি লাভ করিয়াছিলেন এমন পৃথিবীর কয়জন কবির ভাগ্যে ঘটিয়াছে জানি না। এই বাড়ির শিক্ষাই তাঁহার জীবনে সকলের চেয়ে বড়ো শিক্ষা। পৃথিবীতে অনেক স্থানে অ্যাকাডেমি বা অন্য কোনোপ্রকার সংঘ বা সংগত হইতে অনেক ভালো জিনিস উৎপন্ন হইয়াছে, কিন্তু কেবল একটা পরিবার হইতে ধর্মে কর্মে সাহিত্যে চিত্রে সংগীতে দর্শনে স্বাদেশিকতায় সর্ব বিষয়ে এত বিচিত্র এবং আশ্চর্য উৎকর্ষ ও সফলতা বোধ হয় আর কোথাও দেখা যায় নাই। কিন্তু ইহা সেই মহাপুরুষের জন্য যিনি দেশের সকল শক্তিকে এমন সহজে আপনার চতুর্দিকে আকর্ষণ করিয়া আনিয়াছিলেন।

 অথচ, এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, কবির জীবন তাঁহার নিজের ভিতর হইতেই একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ—বাহির তাহাকে অল্পই সাহায্য করিয়াছে। সারালো জমিতে বৃক্ষের বাড়িবার পক্ষে সুবিধা হয় বটে, কিন্তু আপনার অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তির দ্বারাই সে বড়ো হইয়া উঠে। কবি ওয়ার্ড্‌স্‌ওয়ার্থ্ যে বলিয়াছেন যে ‘genius is the introduction of a new element in the intellectual universe’—প্রতিভা ভাবজগতে একটি নূতন বস্তুর ন্যায় আবির্ভূত হয়, তাহার দ্বারা ভাবজগৎ নূতন ভাবে গড়িয়া উঠে—রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সে কথা খুবই সত্য। দুঃখের বিষয়, যেখান হইতে সেই ‘new element’, নূতন বস্তুত্বের সূত্রপাত, সেইখানেই তাহার গ্রন্থের সূত্রও কবি ছিন্ন করিয়া দিয়াছেন। তাঁহার যৌবনবয়সের রচনা ভগ্নহৃদয়ের প্রসঙ্গে এই গ্রন্থে তিনি তাঁহার কালের ভাবজগৎ সম্বন্ধে একটুখানি আলোচনা করিয়াছেন—তাহা অল্পের মধ্যে সম্পূর্ণ একটি চিত্র হইয়াছে। কবি বলিতেছেন, তখনকার দিনে ইংরেজি সাহিত্য খাদ্যের পরিবর্তে মাদক জোগাইয়াছিল। হৃদয়াবেগের যে প্রবলতা ইংরেজি সাহিত্যে পাওয়া যাইত তাহার উদ্দীপনা ও মত্ততাকেই সাহিত্যরসভোগ বলিয়া সেই সময়ে কল্পনা করা হইত। ইউরোপে সাহিত্যের হৃদয়াবেগের উদ্দামতা সেখানকার ইতিহাস হইতে সাহিত্যে প্রতিফলিত হইয়াছিল, আমাদের দেশে সেই ইতিহাস পশ্চাতে না থাকায় উদ্দাম ভাবোচ্ছ্বাস অত্যন্ত অবাস্তব ও অসংযত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। সেকালের এক দিকে নাস্তিকতা, অন্য দিকে প্রতিমাপূজার ভাবরসসম্ভোগ, উভয়েরই বাস্তববিচ্ছিন্ন ভাবুকতাকে কবি বেশ চমৎকার করিয়াই দেখাইয়াছেন।

 এই বস্তুশূন্যতা ও অসুস্থ ভাবুকতা যে কবির রচনাকে প্রথমে অধিকার করিয়া বসিবে তাহাতে বিচিত্র কিছুই নাই। কিন্তু তাঁহার প্রতিভার ‘new element’, নূতন সৃজনী শক্তি, সে অবস্থাকে কাটাইয়া উঠিতে সমর্থ হইয়াছিল। জীবনস্মৃতি পাঠ করিয়া আমরা জানি যে, সেই হৃদয়ারণ্য হইতে নিষ্ক্রমণের একটি দ্বার কবির নিকট আবাল্যই উন্মুক্ত ছিল। সে দরজাটি বিশ্বপ্রকৃতির সৌন্দর্য। কবে একদিন হৃদয়ারণ্যের জটিলতায় পথ হারাইয়া সেই দ্বার খুলিতেই কেমন করিয়া অকস্মাৎ ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ হইল তাহার আশ্চর্য ইতিহাস এই গ্রন্থে আছে। কিন্তু নেই নবজাগ্রত নির্ঝর যখন লোকালয়ের মধ্যে আসিয়া পৌঁছিল তখনই জীবনস্মৃতির রচয়িতা তাঁহার চিত্রশালা রুদ্ধ করিয়া তাহার ভবিষ্যৎ বৈচিত্র্যময় গতিকে আর অনুসরণ করিতে দিলেন না।

 তার পর সে যে কেমন করিয়া আপনার জন্মসংস্কারগত বিশ্বানুভূতিকে নানা বাস্তব সত্যের সঙ্গে ক্রমশই সংযুক্ত করিয়া দেশীয় প্রকৃতি ও দেশীয় সাহিত্যের মধ্যে দীর্ঘকাল ভ্রমণ করিয়া বেড়াইয়াছে এবং একদা দেশের প্রাচীনতম সাধনার মূল ধারার সঙ্গে মিশিয়া বৃহৎ ও বিপুল হইয়া উঠিয়াছে, তাহার ইতিহাস এ গ্রন্থে লিখিত হয় নাই। ইংরেজি সাহিত্যের সেই অন্ধ অনুকরণের যুগ, মাঝখানের প্রবল প্রতিক্রিয়ার যুগ এবং আধুনিক কালের দেশীয়-প্রাণে প্রাণবান সাহিত্যকে সকল মানবের সভায় প্রতিষ্ঠিত করিবার গৌরবময় যুগ―ইহাদের একটা হইতে অন্যটার অভিব্যক্তির ক্রমগুলি কী এবং রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবনেই বা তাহা কী ভাবে অনুসরণ করিয়া দেখা যাইতে পারে—ভাবী কবিজীবন রচয়িতার জন্য এই কাজ অপেক্ষা করিয়া রহিল। কিন্তু কবির অন্তরতর জীবনের ‘ভাঙাগড়া-জয় পরাজয়ে’র ভিতর দিয়া যে-একটি বড়ো অভিপ্রায় বিকশিত হইয়া উঠিয়াছে, তাহার রহস্যোদ্ঘাটন কবি ভিন্ন কে করিবে? আম-দরবারে এই কালের মধ্যে তাঁহার প্রকাশ এক রকম করিয়া দেখিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে, কিন্তু খাস-দরবারে তাঁহার অন্তরের মধ্যে তিনি আপনাকে আপনি না দেখাইলে সেখানকার দরজা হয়তো চিরকাল বন্ধ থাকিয়াই যাইবে।

 ১৩১৯