বিষয়বস্তুতে চলুন

কাব্যপরিক্রমা (১৯৫৮)/ডাকঘর

উইকিসংকলন থেকে

ডাকঘর

“We live within the shadow of a veil that no man’s hand can lift. Some are born near it, as it were, and pass their lives striving to peer through its web, catching now and again visions of inexplicable things; but some of us live so far from the veil that we not only deny its existence but delight in mocking those who perceive what we cannot.”

— Laurence Alma Tadema

 উপরের কয়েকটি ছত্র পাঠ করিয়া সমালোচনা লিখিতে আর ভরসা হয় না, কারণ veil—এর কাছাকাছি আছি এমন কথা তো বলিতে সাহস হয় না, অবগুণ্ঠনের ভিতরকার কথা তো কিছুই জানি না। তবে যাঁহারা জানেন তাঁহাদের পরিহাস করিতে আনন্দ পাই, এতবড়ো বর্বরতার অপবাদ ঘাড়ে করিতে রাজী নই।

 যাঁহারা উদ্ভিদ্তত্ত্ব শিক্ষা দেন তাঁহারা ফুলকে ছিঁড়িয়া তাহার অংশপ্রতাংশের কোন্‍টার কী কাজ তাহা বুঝাইয়া দেন। কিন্তু সাহিত্যের বাগানে যে ভাবের ফুলটি ফোটে তাহার সম্বন্ধে কি সেই একই প্রণালীতে তত্ত্ব খবর লওয়া যায়? সে বাগানে যাহারা যায় তাহারা কি তত্ত্বের জন্য যায় না আনন্দের জন্য যায়? অনেকগুলি দল যে একটি বাঁধনে ধরা দিয়া অখণ্ড একটি ফুল হইয়া উঠিয়াছে ইহাতেই তো আনন্দ, আবার যদি ছুরি ধরিয়া সেই অখণ্ডতাকে খণ্ড খণ্ড করা যায় তবে আনন্দ থাকে কেমন করিয়া?

 আমার মনে হয় যে, ভালো কাব্য বা সাহিত্যগ্রন্থ সম্বন্ধে এইটুকু বলাই পর্যাপ্ত যে, ইহা আমার খুব ভালো লাগিয়াছে বা ইহা পড়িয়া আমি বড়ো আনন্দ পাইয়াছি। কবির সৃষ্টির যে আনন্দ তাহাই পুনরায় নিজের মধ্যে সৃজন করিয়া তোলা, ইহারই নাম সমালোচনা। কবি যে ফুল ফোটান সমালোচক ঠিক তারই পাশে তারই অনুরূপ আর—একটি ফুল ফোটান, ভালো সমালোচনা সেইজন্যই এক রকমের সৃষ্টি। কিন্তু হায়, তেমন সমালোচনার শক্তি কিম্বা সুযোগ কোথায়? ইচ্ছা থাকিলেও ঠিক মনের আনন্দটুকু জ্ঞাপন করিয়া এখন বিদায় লওয়া যায় না। তাহার কারণ, কবির সঙ্গে পাঠকদের সঙ্গে এখন বোঝাপড়া নাই। কবির আসরে পাঠকেরা স্থান পায় না; কবি থাকেন ‘hidden in the light of his thought’—আপনার চিন্তার আলোকে আপনি আবৃত। কাজেই বেচারা সমালোচককে মধ্যস্থের কাজ করিতে হয়। একবার কবির দরবারে, একবার পাঠকদের আড্ডায়, দুই জায়গায় ঘুরিয়া তাঁহাকে সংবাদ বহন করিয়া বেড়াইতে হয়। যদি লেখকে পাঠকে কোনো ব্যবধান না থাকিত তবে সমালোচকও আপনার কাজ সহজে করিতে পারিতেন। অনেক কথার জঞ্জাল জড়ো করিবার উপদ্রব তাঁহাকে সহ্য করিতে হইত না।

 ‘ডাকঘর’ ও তাহার পূর্ববর্তী ‘রাজা’ যে ধরণের নাটক, এ ধরণের নাটক বঙ্গসাহিত্যে সম্পূর্ণরূপে নৃতন। বলা বাহুল্য এ দুইটিই হেঁয়ালি’— শ্রেণীভুক্ত। ইহার পূর্বে বোধ হয় ‘সোনার তরী’ এবং ‘পরশপাথর’ ধরণের কবিতা ছাড়া কবি আর এমন কিছুই লেখেন নাই যাহার জন্য তাঁহাকে লোকে দুর্বোধ বলিয়া অপবাদ দিয়াছে। ঐ কবিতাগুলিই ঠিক কোনো নির্দিষ্ট অর্থের মধ্যে ধরা দিতে নারাজ।

 অথচ সেই পূর্বের রূপকজাতীয় কবিতার সঙ্গে আর এখনকার এই নাটকগুলির সঙ্গে আমি ভারী একটি মিল এক জায়গায় দেখিতে পাই। আমার মনে হয়, ইহাদের মূল ভাব একই, কেবল রূপ স্বতন্ত্র। কতকগুলি রস যাহা কাব্যের বিষয়ীভূত বলিয়া নির্দিষ্ট আছে তাহাদের সম্বন্ধে আমরা নিশ্চিন্ত আছি, কিন্তু তাহাদের মধ্যেই যে মানুষের সমস্ত ইমোশন অর্থাৎ হৃদয়াবেগের প্রকাশ নিঃশেষিত হয় তাহা নহে। প্রেম ভক্তি করুণা সৌন্দর্যবোধ প্রভৃতি হৃদয়বৃত্তি যে রসোদ্রেক করে তাহার ধারণা আমাদের মনে সুস্পষ্ট, কিন্তু অনন্তের জন্য পিপাসা যে রসকে জাগায় তাহার ধারণা তো তেমন স্পষ্ট হইবার নহে। কারণ, সেই বিশেষ অনুভূতিটাই কোনো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ধরা দেয় না, সেই কারণে তাহাকে ভাষায় প্রকাশ করা আরও কঠিন হইয়া বসে। তখন symbol অথবা বিগ্রহকে আশ্রয় করিতে হয়, অর্থাৎ ইঙ্গিতে ইশারায় সেই রসের খানিকটা আভাস দিতে হয়।

 ‘সোনার তরী’ মানেই কোনো বিশেষ রূপ নয়, কিন্তু অপরূপ। কালিদাস বলিয়াছেন যে, ‘রম্যাণি বীক্ষ্য মধুরাংশ্চ নিশম্য শব্দান্’, রম্য দৃশ্য দেখিয়া এবং মধুরধ্বনি শ্রবণ করিয়া, মন যখন পর্যুৎসুক হয় তখন ‘জননান্তরসৌহৃদানি’, জন্মজন্মান্তরের ভালোবাসার কথা মনে পড়ে। এই যে একটি রস ইহাকে কী নাম দিব? উপলক্ষটা হয়তো কোনো বিশেষ রূপ বা বিশেষ ধ্বনি, কিন্তু তাহাকে ছাড়াইয়া মন যে উতলা হয় সে এমন একটি অপরূপ সুদূরের জন্য, যাহার কোনো নাম নাই, রূপ নাই। বর্ষার ভরা নদী হয়তো ‘সোনার তরী’র উপলক্ষ, কিন্তু সে যে বিরহকে জাগায় তাহা আর তাহাকে আশ্রয় করিয়া তো থাকে না।

 কিন্তু কেনই বা সিম্‌বল্ লইয়া এত বকাবকি করিতেছি? আমাদের দেশে এটা তো অপরিচিত জিনিস নহে। হিন্দুর ধর্মকর্ম, আচার—অনুষ্ঠান, শিল্প, সমস্তই ভাবের বিগ্রহে আগাগোড়া মণ্ডিত। হিন্দু তো এ কথা বলে না যে, ভাবকে কোনোদিন কেহ জানিয়া, ব্যবহার করিয়া, বলিয়া শেষ করিয়া দিতে পারে। সেইজন্যই তো সে চিহ্ন মানে, বিগ্রহ মানে— সে জানে যে, ভাব অসংখ্যরূপে আপনাকে ক্রমাগত লীলায়িত করিয়া প্রকাশ করিয়া থাকে এবং সেই—সমস্ত রূপরূপান্তরকে অনন্তগুণে অতিক্রম করিয়াও বিরাজ করে। হিন্দুর চিত্ত কেন না বলিবে যে, ‘সোনার তরী’ বল, ‘চিঠি’ বল, ‘পরশপাথর’ বল, ‘রাজা’ বল, ও সমস্তই ছল— অনন্ত সৌন্দর্যের বোধকে একটি মূর্তির মধ্যে ক্ষণকালের মতো বাঁধিবার আয়োজন; ও যে ছল এইটুকু উহাকে দিয়া বলানোই উহার চরম সার্থকতা।  আসল কথা, অনন্তের রসবোধ যখন সাহিত্যের দরবারে আসিয়া রূপ প্রার্থনা করে তখন সাহিত্যস্রষ্টাকে বিপদে পড়িতে হয়। তাহাকে পণ করিতে হয় কী করিয়া রূপ দিয়া ও রূপ না দেওয়া যায়। কারণ, রূপ যে সীমাবদ্ধ, সে এমন ভাবকে কী করিয়া প্রকাশ করিবে যাহা সীমায় ধরা দিবে না? তখন তাহার একমাত্র সম্বল হয় উপমা বা রূপক। উপমা খানিকটা বাঁধে, খানিকটা আলগা রাখে। সে বাঁধন এতই সুকুমার যে তাহার আবরণ সরাইয়া ভাবকে দেখা কিছুমাত্র কঠিন হয় না।

 আশা করি, আমি কেন পূর্ব পূর্ব কোনো কবিতা এবং আধুনিক নাটকগুলির মধ্যে সাদৃশ্য কল্পনা করিয়াছি তাহা পাঠকের নিকটে স্পষ্ট হইয়াছে। আমি বলিতে চাই এই যে, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে রূপের ভিতরে অপরূপকে দেখিবার জন্য একটা বেদনা আছে বলিয়াই তাঁহাকে অপরূপের ভাবটিকে এমন করিয়া প্রকাশ করিতে হইয়াছে যাহাতে সে নির্দিষ্ট না হইয়া উঠে। অর্থাৎ, তাহাকে সিম্‍ব‍ল্ আশ্রয় করিতে হইয়াছে।

 সিম্‌বল‍্ লইয়া এত ব্যাখ্যাবাহুল্য করিবার আর—একটু কারণ আছে। সিম্‌ব‍লে্র ঠিক অর্থটি হৃদয়ঙ্গম না করিয়া অনেকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করিয়া বসেন, তবে ‘সোনার তরী’টা কী, তাহার উদ্দিষ্ট মানুষটি কে? সোনার ধানটা কী? অমল কি তবে মানবাত্মা? চিঠি মানে কি মুক্তি? অর্থাৎ, তাঁহারা সমস্ত একেবারে সুনির্দিষ্ট করিয়া লইতে চান। আধ্যাত্মিক সতাকে এই—সকল লোকই বৈজ্ঞানিক সত্যের মতো পরিষ্কার না দেখিতে পারিলে অধীর হইয়া উঠেন এবং ধর্মকে কল্পনা বলিয়া উপহাস করিতে উদ্যত হন। ইঁহারা একটা কথা মনে রাখেন না যে বুদ্ধির উপরেও মানুষের একটা intuition, একটা সহজ প্রত্যয় আছে; বুদ্ধি যেখানে নাগাল পায় না সেই খানে তাহার শরণাপন্ন হইতে হয়।

‘ডাকঘর’কে সিম্‍বলিক্যাল অর্থাৎ বিগ্রহরূপী নাট্য নামকরণ করা গেল। এটা ঠিক নাম নয়, কিন্তু নির্দেশমাত্র। এখন দ্বিতীয় কথা এই যে, ইহা নাটিকা বটে, অথচ ইহার মধ্যে নাটকত্ব কিছুই নাই, ঘটনাও বড়ো নাই। তবে ইহাকে ‘সোনার তরী’ গোছের কবিতার মতো করিয়া লিখিলেই হইত, নাটিকা বলিয়। আড়ম্বর করিবার কী প্রয়োজন ছিল?

 একটি রুগ্ন বালকের সৌন্দর্যমুগ্ধ কল্পনাপীড়িত চিত্ত বিশ্বের মধ্যে বাহির হইয়া পড়িবার জন্য ব্যাকুল, শুধু এই ভাবটুকু যদি থাকিত তবে তাহা গীতে ব্যক্ত করা যাইত সন্দেহ নাই। কিন্তু অমলের সঙ্গে সঙ্গে মাধবদত্ত, ঠাকুরদা, মোড়ল, সুধা প্রভৃতি যে মানুষগুলিকে উপস্থিত করা হইয়াছে তাহাদের মধ্যে যে নানা বৈচিত্র্য আছে। কেহ—বা অনুকূল, কেহ—বা প্রতিকূল। সুতরাং ঐ মূলভাবটুকুকে সূত্রের মতো করিয়া এই—সকল বৈচিত্র্যকে তাহার সহিত সম্মিলিত করিয়া একটি স্ফাটিক ব্যূহ রচনা করিতে হইয়াছে। এই বিচিত্রতার সমাবেশেই তো নাট্যরস। শুধু একটিমাত্র ভাবের রস হইলে গীতিকবিতার রূপ গ্রহণ করা উচিত ছিল। সুতরাং এ নাটিকার শেষ পর্যন্ত না পড়িলে পুরা রসাস্বাদন হয় না, ইহা মাঝখানে পড়িয়া থামিবার জো নাই।

 ঘটনার পর ঘটনা সাজাইলেই কি সব সময়ে ঔৎসুক্য বেশি করিয়া জাগে? আমার তো মনে হয়, ভিতরের চিন্তা, কল্পনা ও অনুভূতির একটা ক্রমবিকাশের গতিবেগ, বাহিরের ঘটনাপুঞ্জের গতিবেগের চেয়ে অনেক বেশি প্রবল। যেমন ধরো ‘গোরা’ উপন্যাসটি। তাহার উপাখ্যান—অংশটুকু এক নিশ্বাসে শেষ করা যায়। কিন্তু মানবহৃদয়ের কী বেগবান প্রচণ্ড ঘাত—প্রতিঘাত ঐ উপন্যাসে তরঙ্গিত হইয়া চলিয়াছে— অধ্যায়ে অধ্যায়ে, এমন—কি ছত্রে ছত্রে, যে ঔৎসুক্য খাড়া হইয়া জাগিয়া থাকে এমন কোন্ ঘটনাবহুল উপন্যাসে থাকে আমি তো জানি না।

 এই নাটিকাটিতেও কবিজীবনের যে—সকল নিগূঢ় অভিজ্ঞতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে—সকল সূক্ষ্ম অনুভাব নানা স্থানে মূর্তিলাভ করিয়াছে, কল্পনাপ্রবণ ব্যক্তিমাত্রেই তাহা পাঠ করিতে করিতে পদে পদে বিস্ময় অনুভব করিতে থাকিবেন। ঠিক যেন একটি অজানা দেশের মতো। তাহার পথের প্রত্যেক মোড়ে, প্রত্যেক বাঁকে নব নব বিস্ময়— তাহা ছাড়া তাহার নানা গলিঘুঁজির তো কথাই নাই। সেই বিস্ময়ের আলোড়নেই সমস্ত নাটিকাটি সজীব হইয়া আছে।

মাধবদত্ত সংসারী লোক, সে তাহার স্ত্রীর গ্রামসম্পর্কে ভাইপো অমলকে পোষ্য লইয়াছে। ছেলেটি রুগ্ন—শরতের রৌদ্র আর হাওয়া যাহাতে ছেলেটি না লাগায়, সে বিষয়ে কবিরাজ মাধবদত্তকে সতর্ক করিয়া গিয়াছে। অমলের মন বাহিরে যাইতে না পারিয়া ছট্‌ফট্‌ করিতেছে। সে তাহার বাড়ির জানালার নিকট বসিয়া থাকে— দূরে পাহাড় দেখা যায়— পাহাড়ের নীচে ঝর্না, ঝর্নাতলায় ডুমুরগাছ। জানালার সামনেই রাজপথ— ফিরিওয়ালা সুর করিয়া ফিরি করে, রাজার প্রহরী মধ্যাহ্নের স্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ ঢং ঢং করিয়া ঘণ্টা বাজায়। ঐ দূর পাহাড়, ঐ ঝরনা, ঐ ফিরিওয়ালার সুর, ঘণ্টার ঢং ঢং তাহাকে আনমনা করিয়া দেয়— কোন্ সুদূরের একটি ডাক তাহার বুকের মধ্যে বহন করিয়া আনে।

 ‘জীবনস্মৃতি’ এবং ‘ডাকঘর’ প্রায় একই সময়ে বাহির হইয়াছে, সুতরাং এ দুয়ের মধ্যে সম্বন্ধ কল্পনা করিতে পারি না কি? সেই ফিরিওয়ালার ডাক, রাত্রে ঘণ্টার শব্দ, সেই কল্পনাভারাক্রান্ত মন— এ তো কোনোমতেই আমাদের অপরিচিত নয়।

 ‘ক্ষণিকা’য় ‘কবির বয়স’ কবিতায় কবি তাঁহার কেশে পাক ধরিয়াছে শুনিয়া মহা রাগ প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, তিনি সকলের সঙ্গে একবয়সী। প্রৌঢ় বয়সে তিনি যে কবিতা লিখিয়াছেন

আমি চঞ্চল হে,
আমি সুদূরের পিয়াসী!
দিন চলে যায়, আমি আনমনে
তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে—

তাহার সুরের সঙ্গে বাল্যজীবনস্মৃতির সুর মেলে এবং ডাকঘরেরও সুর মেলে। কবির বয়স যে চিরকাল সমানই থাকিয়া যায় তাহার প্রমাণ হাতে হাতে পাওয়া যায় বটে।

 বাস্তবিক এই সুদূরের জন্য ব্যাকুলতার ভাবটিই ডাকঘরের মূল ভাব।

 কবির মুখে অনেকবার শুনিয়াছি যে, তিনি অনেক সময় এই পৃথিবীর পরিচিত দৃশ্য শব্দ গন্ধকে এমন ভাবে অনুভব করিতে চেষ্টা করেন যেন এই পৃথিবীতে তিনি সদ্য আসিয়াছেন। এখানে সমস্তই যেন নূতন, কিছুই যেন তাঁহার পরিচিত নহে। এই-যে নিকটতম অভ্যস্ততম পরিচিততম জিনিসকে বহুদূরের একটি বিরলব্যাপ্ত সৌন্দর্যের মধ্যে ছাড়া দিয়া দেখা, ইহাতেই অভ্যাসের ও পরিচয়ের জড় আবরণ তাহার মুখের উপর হইতে সরিয়া যায়, সে আশ্চর্য সুন্দর হইয়া উঠে।

 এমন করিয়া দেখিলে সমস্তই কী রহস্যময়! দইওয়ালা যে রাস্তা দিয়া দই হাঁকিয়া চলিতেছে, সে তো একটি স্বতন্ত্র বিচ্ছিন্ন মানুষ নয়। তাহার চারি দিকে কত দূরদূরান্তরের কত সৌন্দর্য ঘিরিয়া আছে—সেই পাঁচমুড়া পাহাড়ের তলায় সৌন্দর্য, সেই শাম্‌লী নদীর সৌন্দর্য, সেখানকার সেই লাল মাটির রাস্তাটি, বড়ো বড়ো গাছের ছায়া, পাহাড়ের গায়ে যে গোরু চরিতেছে তাহাদের সৌন্দর্য, সেই যে গোপবধূরা ডুরেশাড়ি পরিয়া জল তুলিয়া লইয়া যাইতেছে তাহাদের সৌন্দর্য, সেই গ্রামের সমস্ত স্নেহ-প্রেম-মাধুর্যের কত সৌন্দর্য! এই-সবই সেই দইওয়ালাকে বেষ্টন করিয়া আছে। তাই তো সে এমন রমণীয়। তাই তাহার ফিরির সুরটিকে বিশ্ববাঁশির মতো সকরুণ করিয়া দিয়াছে। বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিলে তাহার কোনো মাহাত্ম্যই নাই।

 তেমনি ঐ-যে সম্মুখের পথটি, তাহারও রহস্য ঐখানে—সে যে বহু দূরের যাত্রীকে ক্ষণিকের মতো, চকিতের মতো, একবার ঐ একটি জায়গায় দাঁড় করাইয়া দেখাইতেছে; বলিতেছে, অনন্ত প্রবাহের একটিমাত্র পরিপূর্ণ মুহূর্তের ছবিখানি দেখো! অনন্ত সমুদ্রকে একটিমাত্র তরঙ্গের মধ্যে দেখো! ইহার পশ্চাতে অনন্ত সমুদ্র, ইহার সম্মুখে অনন্ত সমুদ্র, সেই-সমস্ত প্রবাহ যেন এই একটি তরঙ্গে থমকিয়া দাঁড়াইয়াছে।

 তার মানে কী? তার মানে এই যে, আমরা এখানে যাহা-কিছু দেখিতেছি বা পাইতেছি তাহা ক্রমাগতই চলিবার মুখে, সরিবার মুখে। আমরা তাহার আদিও জানি না, তাহার অন্তও জানি না, জানি শুধু তাহার মাঝখানের খণ্ড একটুখানি কালের কথা। সেই খণ্ডকালে যেটুকু যাহা দেখিতেছি তাহাকেই বাস্তব বলিয়া, সত্য বলিয়া যে আমরা চাপিয়া ধরি, তাহাতেই তাহাকে হারাই, তাহার যথার্থ সত্তাকে পাই না। যদি সেই খণ্ডকালের খণ্ড জিনিসের উপর তাহার অনাদি অতীত এবং অনন্ত ভবিষ্যতের একটি আলো ফেলিয়া সে খণ্ডের মধ্যে একটি অখণ্ডের পরিচয় পাই, তবেই সেই জিনিস আশ্চর্য অপরূপ বলিয়া প্রতিভাত হইবে। তাহা তখন এক দিকে ব্যক্ত, অন্য দিকে অব্যক্ত; এক দিকে সসীম, অন্য দিকে অসীম; এক দিকে রূপ, অন্য দিকে অপরূপ। তখন সে কী বিস্ময়, কে তাহা বর্ণনা করিবে?

 এ তত্ত্বের কথা নয়, কিন্তু দৃষ্টির কথা। এই দৃষ্টি লইয়াই কবি রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। বুদ্ধি যে মানুষের শেষ সম্বল নয়, তাহার সঙ্গে যে কেবল বহির্বিষয়মাত্রের যোগ, মানুষের অধ্যাত্মপ্রকৃতির গভীরতা পরিমাপ করিতে বুদ্ধি যে অক্ষম, এ-সকল কথা আধুনিক যুগে ইউরোপের তত্ত্বজ্ঞানীদল স্বীকার করিতেছেন দেখিতে পাই। দার্শনিকশ্রেষ্ঠ আঁরি বের্গ্‌স বলেন, ‘আমাদের বুদ্ধি এবং বাহিরের বিষয় পরস্পর পরস্পরের অপেক্ষা রাখে। চৈতন্যকে যদি বুদ্ধির গণ্ডী দিয়া ঘিরিয়া রাখ তবে তাহা বাহ্যবিষয়ের সঙ্গে জড়িত হইয়া পড়িবে।’ সুতরাং বুদ্ধির দৃষ্টি খণ্ডিত দৃষ্টি, আধ্যাত্মিক দৃষ্টির সমগ্রতা তাহার নাই। কিন্তু যাঁহারা মানবচিন্তা যে কতদূর অগ্রসর হইতেছে তাহার কোনো সংবাদ রাখেন না, তাঁহারা সকল বড়ো জিনিসকেই পরিহাস করিতে থাকিবেন। ইঁহাদেরই জন্য কি ম্যাথু আর্‌নল্ড্‌কে ‘ফিলিস্‌টাইন’ কথাটা উদ্ভাবন করিতে হইয়াছিল?

ডাকঘরের মূলভাব নাহয় বুঝা গেল, কিন্তু ‘ডাকঘর’ ‘চিঠি’ ‘রাজা’ প্রভৃতি ব্যাপার কী। এই-যে কল্পনাব্যাকুল সৌন্দর্যানুভূতিময় চিত্ত ইহাকে রুগ্ন করিয়া, ঘরে আবদ্ধ করিয়া রাখিবারই বা তাৎপর্য কী এবং রাজার চিঠির জন্য উৎকণ্ঠিত করিয়া তুলিবারই বা অর্থ কী।

 আমরা যে রুগ্ন এবং বদ্ধ কেন, তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করিবার কী প্রয়োজন আছে? আমরা বাহির হইতে চাই এ কথাটা যতখানি সত্য ততখানি সত্য এই কথাটাও যে, আমাদের অন্তরে বাহিরে নানা বাধা জড়াইয়া আছে। বারবার কি আমাদের বদ্ধ ঘরে অভিসারের বাঁশির ডাক আসে না? কিন্তু হায়, বাঁধন কি একটি, নিষেধ কি সামান্য? মাধব দত্ত-কবিরাজ-রূপী সংসার তো আছেই, সুধাও আসিয়া যে-আধখানা দরজা খোলা আছে তাহাও বন্ধ করিয়া দিতে চায়।—

ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর তুমি যে
বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি―
কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার
সে কথা যে যাই পাশরি!

 কিন্তু কল্পনা তো বাঁধ মানে না, সে যে পাখা মেলিয়া সর্বত্র উড়িতে চায়। তার পণ সে সব দেখিবে, সব-কিছুর আনন্দ সম্ভোগ করিবে। কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় তাহাকেও কুলায়ে ফিরিতে হয়। তখন বলিতে হয়—

অনেক দেখে ক্লান্ত এখন প্রাণ,
ছেড়েছি সব অকস্মাতের আশা।
এখন কেবল একটি পেলেই বাঁচি।

 এইরূপে কবির জীবন যখন গিয়া আধ্যাত্মিক জীবনে মিলিয়া যায় তখন ঐ একটিমাত্র ইচ্ছা প্রাণ জুড়িয়া বাজে যে, তাঁর চিঠি চাই—তিনি কবে আসিবেন? সেইখানেই যে সমস্ত বিচিত্রতার অবসান, সেইখানেই সমস্ত জীবনের পরিপূর্ণ পরিসমাপ্তি।

 নাটিকার মধ্যে এই-যে এক ভাব হইতে আর-এক ভাবে গিয়া পড়িতেছি, ইহাতেই তাহার মধ্যে একটি গতিসঞ্চার হইয়াছে। এখন আর পথের ধারে ‘অনেকের সনে দেখা’ নয়, এখন ঘরের মধ্যে চিঠির জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকা; এখন আর বহুবিচিত্রতাময় দিন নয়, এখন শীতল অন্ধকারপূর্ণ রাত্রি।

 নাটিকার পরিণামটা আমার স্পষ্টতই মৃত্যু বলিয়া মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতার পাঠক মাত্রেই জানেন যে তিনি জীবনকে এবং মৃত্যুকে স্বতন্ত্র করিয়া দেখেন না, তিনি মৃত্যুকে জীবনেরই পূর্ণতর পরিণাম বলিয়া মনে করেন। ‘সিন্ধুপারে’ কবিতাটিতে এই ভাব, ‘ঝর্নাতলা’ কবিতাটিতেও এই একই ভাব, যে, জীবনে যেটা ঝর্নারূপে সাত পাহাড়ের সীমানার মধ্যে রহিয়াছে, মৃত্যুর পরে তাহাই সেই সীমা অতিক্রম করিয়া নদী হইয়া বহিয়া গিয়াছে—মৃত্যু ছেদ নয়, সে পরিপূর্ণতা।

 শুধু তাই নয়। পূর্বের কোনো কোনো কবিতাতে কবি ‘মৃত্যুমাধুরী’র কথাও বলিয়াছেন।

পরান কহিছে ধীরে, হে মৃত্যু মধুর,
এই নীলাম্বর এ কি তব অন্তঃপুর?

 মৃত্যু যেন একটি পরিপূর্ণ সুদূর, সমস্তই তাহাতে বিলম্বিত হইয়া সীমা আবরণ উন্মোচন করিয়া মধুর হইয়া উঠে। আমরা একটু আগে ডাকঘরের যে মূল ভাবটির কথা আলোচনা করিয়াছি, মৃত্যুকে এমন পরিপূর্ণ ও মাধুর্যময় করিয়া দেখিলে সে ভাব মৃত্যুর সঙ্গে দিব্য সংগত হয়।

 কারণ, কিছুই যে থাকিবে না, সেইজন্যই তো বাস্তবিক সমস্তই এমন সকরুণ, এমন সুন্দর। মৃত্যু আছে বলিয়াই জগতের কোথাও কোনো ভার নাই। সমস্তই একটি সুদূরের ব্যাপ্ত বিষাদে বেদনার মতো বাজিতেছে। সুতরাং এখানে মৃত্যু যদি পরিণাম হয় তবে তাহাকে কোনোমতেই খাপছাড়া বা আকস্মিক বলা চলে না। কবি যে বলিয়াছেন—

সে এলে সব আগল যাবে ছুটে,
সে এলে সব বাঁধন যাবে টুটে!

মৃত্যু যেন একটি বন্ধনমোচনের আনন্দ হইয়া উঠিবে।

 তবে কি রাজার চিঠির জন্য অমলের যে ব্যাকুলতা সে এই মৃত্যুর জন্য ব্যাকুলতা? না। সে কথা বলিলে রাজার চিঠিকে অত্যন্ত ছোটো করিয়া দেখা হইবে

 রাজা যে অমলের মতো ছোটো মানুষের কাছে আসিতে পারেন এই কথাই তো মোড়ল-জাতীয় লোক বিশ্বাস করে না, তাহারা পরিহাস করিয়া উড়াইয়া দেয়। তাহারা জানে যে, তিনি রাজা, তিনি কেবল বড়ো বড়ো মানুষকেই দেখা দেন। কিন্তু তাঁহার যে-একটি আনন্দ ঐ ছোটো বালকের উপরেও অনস্ত হইয়া আছে, উহার নামে যে তিনি কোন্ অনাদিকাল হইতে পত্র প্রেরণ করিয়াছেন, কতবার যে সেই লিপির আহ্বান কত প্রভাতে সন্ধ্যায় বহিয়া গিয়াছে, তাহা কি মোড়লজাতীয় বুদ্ধিজীবী অবিশ্বাসীরা জানে, না মাধবদত্তের মতো ঘোর সংসারীরা জানে? একমাত্র লোক যে সেই বার্তা জানে সে ঠাকুরদা।

 ‘শারদোৎসব’ নাটকের সময় হইতেই এই ঠাকুরদাকে কবির প্রয়োজন হইয়াছে। এই একটি মুক্তপ্রাণ মানুষ, যে সকলের সঙ্গে সব হইয়া আছে, যে পরিপূর্ণ আনন্দকে জানে—ইহাকে নহিলে কবির কল্পনাগুলি সমর্থন পাইবে কেমন করিয়া? সোনার তরী, ক্রৌঞ্চদ্বীপ, হাল্কা দেশ প্রভৃতি ব্যাপার যে সত্য সত্যই আছে, সে কথার সাক্ষ্য ঠাকুরদা ভিন্ন দিবে কে? ফিলিস্টাইন-দলকে শাসাইয়া সংযত করিয়াই বা রাখিবে কে?

 ঠাকুরদা বলিতেছেন, ‘শুনেছি তো তাঁর চিঠি রওনা হয়ে বেরিয়েছে।’ কিন্তু কবে?—

আমার মিলন লাগি তুমি
আসছ কবে থেকে।

 অমল উত্তর করিতেছে, ‘তা আমি জানি নে। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পাই, মনে হয় যেন আমি অনেকবার দেখেছি—সে অনেক দিন আগে—কতদিন তা মনে পড়ে না। বলব? আমি দেখতে পাচ্ছি, রাজার ডাক-হরকরা পাহাড়ের উপর থেকে একলা কেবলই নেমে আসছে—বাঁ হাতে তার লণ্ঠন, কাঁধে তার চিঠির থলি। কত দিন কত রাত ধ’রে সে কেবলই নেমে আসছে। পাহাড়ের পায়ের কাছে ঝর্নার পথ যেখানে ফুরিয়েছে সেখানে থাকা নদীর পথ ধ’রে সে কেবলই চলে আসছে—নদীর ধারে জোয়ারির খেত, তারই সরু গলির ভিতর দিয়ে দিয়ে সে কেবলই আসছে; তার পর আখের খেত, সেই আখের খেতের পাশ দিয়ে উঁচু আল চলে গিয়েছে, সেই আলের উপর দিয়ে সে কেবলই চলে আসছে— রাতদিন একলাটি চলে আসছে; ·····যতই সে আসছে দেখছি, আমার বুকের ভিতরে ভারী খুশি হয়ে হয়ে উঠছে।’

 সুতরাং এ চিঠি কখনোই সে চিঠি নয় যে, ‘অমুক দিন অমুক সময়ে তোমার মৃত্যু ঘটিবে।’ এ চিঠি সেই চিঠি যে, ‘আমি তোমাকে বড়ো আদর করিয়া আমার এই আহ্বানলিপি পাঠাইলাম। তুমি আমার, তোমাতে আমার আনন্দ আছে।’

 আমি এই জায়গায় আমার পাঠকদিগকে রবীন্দ্রনাথের ‘চিঠি’ নামক কবিতাটি স্মরণ করিতে অনুরোধ করি। সে চিঠিখানিও বিশ্ব-চিঠি, তাহার লিখন কবি জানেন না, কে লিখিয়াছে তাহাও জানেন না—কিন্তু পাইয়াছেন এই স্বপ্নেই তিনি খুশী, তাঁহার বুকের ভিতরটা আনন্দিত হইয়া উঠিতেছে।

 অমল তাই ঠাকুরদাকে বলিতেছে যে, প্রথমে যখন তাহাকে ঘরে বসাইয়া রাখিয়াছিল তাহার মন ছট্‌ফট্ করিতেছিল, এখন ডাকঘর দেখিয়া অবধি প্রত্যহই তাহার ভালো লাগে, ‘ঘরের মধ্যে বসে বসেই ভালো লাগে।’ ‘একদিন আমার চিঠি এসে পৌঁছবে সে কথা মনে করলেই আমি খুশী হ’য়ে চুপ ক’রে বসে থাকতে পারি।’

এইবার পরিণামে আসা গিয়াছে। চিঠি পাইবার ভরসার পর পরিণাম সত্যই পরিণাম, পরিণাম পরিপূর্ণতা।

 প্রথমে আমরা বিশ্বে বাহির হইবার ব্যাকুলতা দেখিলাম, তার পর রাজার চিঠির প্রত্যাশার ঘরে চুপ করিয়া থাকিতেও ভালো লাগে দেখিলাম। এখন দেখি, ‘চোখের উপর থেকে থেকে অন্ধকার হয়ে আসছে। কথা কইতে আর ইচ্ছে করছে না। রাজার চিঠি কি আসবে না?’

 বোধ হয় জগতের কোনো কবিই মৃত্যুকে জীবনের বর বলিয়া কল্পনা করেন নাই, জীবনে মৃত্যুতে যে বিবাহের অতিনিবিড় সম্বন্ধ সে কথা বলেন নাই। রবীন্দ্রনাথের মাঝের বয়সের কবিতায় জীবন ছিল ‘বালিকা বধু’, তখন তাহার বরকে ভয় করিত—‘প্রতীক্ষা’ প্রভৃতি কবিতায় তাই তিনি আরও কিছুদিনের মতো খেলাধুলার ঘরের মধ্যে বাস করিবার অনুমতি চাহিয়াছিলেন। কিন্তু শেষবয়সের কবিতায় ক্রমাগতই তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইতেছেন।

ওগো আমার এই জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা,
মরণ, আমার মরণ, তুমি কও আমারে কথা।

সুতরাং রাজদূতকে তিনি যদি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে উপস্থিত করেন তাহাতে কিছুই আশ্চর্য নাই।

 তবু শেষমুহূর্ত পর্যন্ত সংশয় যায় না। বাহির হইতে মোড়লের অবিশ্বাসের পরিহাসের খোঁচাও আছে। কিন্তু যে অবিশ্বাসী সে সত্যকেই অবিশ্বাস করে কিনা, সে হাঁ’কেই না বলিতে চায় কিনা, তাই তাহার অবিশ্বাসই তাহার বিশ্বাসকে যথার্থরূপে পাইবার উপায় হইয়া দাঁড়ায়। সত্যকে সে যত আঘাত করে ততই তাহার নিজের অবিশ্বাসের প্রাচীর একটু একটু করিয়া ভাঙিয়া যায়, শেষে সে দেখে যে সে পরিহাসচ্ছলে যাহা বলিয়াছে তাহা সত্য সত্যই ঘটে। সে জানে না যে, অক্ষরশূন্য কাগজেই রাজার চিঠি আসে। কারণ, তাঁহার চিঠির তো বাহ্যিক কোনো নিদর্শন নাই, সে চিঠি আমাদের আশা এবং নির্ভরের ভিতরে আসিয়া যে পৌঁছায়। মুড়ি মুড়কি খাইতেও তিনি সামান্য লোকের ঘরেই আসেন—কারণ, তাঁহার আসা যে নিঃশব্দ গোপন—তিনি তো আগেভাগে জানাইয়া কাহাকেও দেখা দেন না। সে একেবারেই আচমকা হঠাৎ আবির্ভাব, তাহার জন্য কেহই কখনোই প্রস্তুত থাকে না। মোড়লের পরিহাসের মধ্যে ঠাকুরদা এই সত্যটিকেই দেখিতে পাইলেন। তিনি অমলকে ইহা পরিহাস বলিয়া বুঝিতেই দিলেন না। রাজারই চিঠি আসিয়াছে! রাজাই স্বয়ং আসিতেছেন! হাঁ, এই কথাই সত্য।

 তার পর রাজদূতের প্রবেশ এবং রাজ-কবিরাজের আগমন। দ্বার ভাঙিয়া গেল, প্রদীপ নিবিয়া গেল, ঘরের সমস্ত দরজা-জানালা এক নিমেষে খুলিয়া গেল; অর্ধরাত্রে রাজা আসিবেন শুনা গেল। অমল স্থির করিল যে, সে তাঁহার ডাক-হরকরার কাজটি প্রার্থনা করিবে। বাস্তবিক কবি কি সেই কাজই করেন না? শূন্য কাগজে অক্ষর পড়িয়া দেওয়াই তো তাঁহার প্রধান কাজ।

 নাটিকা সমাপ্ত হইল।

 রবীন্দ্রনাথের এইখানেই আশ্চর্য কৃতিত্ব যে, তিনি তাঁহার সমস্ত জীবননাট্যের নানা অঙ্কের বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলিকে এমন সরল একটি সূত্রের মধ্যে ভরিয়া তুলিতে পারিয়াছেন। তাঁহার কল্পনা, সৌন্দর্যব্যাকুলতা, আধ্যাত্মিক বেদনা, সংশয়, দ্বন্দ্ব, অপেক্ষা, শান্তি, সমস্তই এই নাটিকায় কোথাও হয়তো একটি ছত্রে বা আধখানি পংক্তিতে তিনি ছুঁইয়া ছুঁইয়া গিয়াছেন; কোথাও-বা সোজা পথ ছাড়িয়া গলিতে ঘুঁজিতে এমন-সব রহস্য ছড়াইয়াছেন যে, বিস্ময়ে একেবারে অভিভূত হইয়া পড়িতে হয়। যেমন সুধার কথা। সে অমলের আধখানা দরজা বন্ধ করিয়া দিতে চাহিয়াছিল। তাহার সেই ক্ষণিক মোহটুকু সে অমলের মৃত্যুর পরেও রাখিয়া গেল; সে বলিল, ও যখন জাগিবে তখন বোলো যে ‘সুধা তোমাকে ভোলে নি’। এই এতটুকুর মধ্যে সমস্ত নারীপ্রকৃতির একটি রহস্য কবি কৌশলে ছুঁইয়া গিয়াছেন। শেষ ক’টি কথা ব্রাউনিঙের Evelyn Hope-এর শেষ ছত্রগুলি মনে করাইয়া দেয়। মৃত এভেলিনের প্রণয়ী বলিতেছে, ‘এই একটি পল্লব আমি তোমার হাতের মধ্যে গুঁজিয়া দিলাম; ঘুমাও, যখন জাগিবে তখন তোমার মনে পড়িবে, তখন সব বুঝিতে পারিবে।’

 এমন ইঙ্গিত কতই আছে।

 ইউরোপেও বিগ্রহরূপী নাটকের যুগ শুরু হইয়াছে। স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথের এই নাটিকাটি মেটারলিঙ্কের নাট্যগুলি স্মরণ করাইয়া দেয়! লরেন্স অ্যালমা টেডেমা প্রভৃতি মেটারলিঙ্কের সমালোচকবর্গ তাঁহার নাটকের মধ্যে প্রাচীন ধর্মের জীর্ণ ভিত্তির উপর নূতন অধ্যাত্মবোধের প্রতিষ্ঠার প্রয়াস লক্ষ্য করিতেছেন।

 রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও কি সে চেষ্টা নাই? তিনিও আমাদের দেশের পরিপূর্ণ অধ্যাত্মদৃষ্টি লাভ করিবার জন্য ব্যাকুল। বৈষ্ণবতন্ত্রের সাধনায় সেই অধ্যাত্মবোধ যেমন অন্তর্নিগূঢ় হইয়াছিল তেমন বিশ্বানুপ্রবিষ্ট হয় নাই। সেইজন্য আমাদের দেশ ভেককে বিশ্বাস করে, বাস্তবকে করে না—স্বাভাবিকের চেয়ে অলৌকিককেই বেশি শ্রদ্ধা করে।

 সেই অন্তর্নিগূঢ় অধ্যাত্মবোধকে কোনো গোপন পন্থায় হারাইতে না দিয়া তাহাকেই বিশ্বের দিকে ব্যাপ্ত করিবার, সত্য করিবার জন্য কি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটি একান্ত প্রয়াস নাই?

 ১৩১৮