কাব্যপরিক্রমা (১৯৫৮)/ধর্মসংগীত
ধর্মসংগীত
কিছুদিন হইল ইংলণ্ডে কবি রবীন্দ্রনাথ সেখানকার সাহিত্যসমাজ কর্তৃক এক সান্ধ্য নিমন্ত্রণে যে সংবর্ধনা লাভ করিয়াছিলেন, তাহাতে আইরিশ কবি য়েট্স্ সভাপতি হইয়া রবীন্দ্রনাথের তিনটি ধর্মসংগীতের অনুবাদ পাঠ করেন এবং সে সম্বন্ধে তাঁহার অভিমত জ্ঞাপন করেন। কোন্ তিনটি গানের অনুবাদ তিনি পাঠ করিয়াছিলেন, তাহা আমরা জানিতে পারি নাই।[১] সংবাদপত্রে দেখিলাম যে, তাহাদের একটিতে ঈশ্বরকে পথিক বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে; আর একটি মৃত্যুর উপরে, যেখানে মাতৃস্তন হইতে শিশুকে কাড়িয়া লইবার উপমা আছে। মৃত্যু সেই এক স্তন হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া স্তনান্তরে মানবশিশুকে পুনরায় আশ্বস্ত করিবার পূর্বে ক্ষণকালীন বেদনা মাত্র—এ ভাবের কবিতা বোধ হয় ‘নৈবেদ্যে’ আমরা পড়িয়াছি। সুতরাং সম্ভবত গান নয়। পথিকরূপে ঈশ্বরকে দেখা তো বহু স্থানেই আছে, যেমন—
কূজনহীন কাননভূমি
দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে,
একেলা কোন্ পথিক তুমি
পথিকহীন পথের ’পরে।
হে একা সখা, হে প্রিয়তম,
রয়েছে খোলা এ ঘর মম—
সমুখ দিয়ে স্বপনসম
যেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে।
কবি য়েট্সের এই অভিমত পাঠ করিয়া, একদা কোনো ভক্তিভাজন ধর্মাচার্য রবীন্দ্রনাথের ধর্মসংগীত সম্বন্ধে কথাপ্রসঙ্গে সম্পূর্ণ বিভিন্ন কী অভিমত প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহাই আমার স্মরণে পড়িতেছে। তিনি বলিয়াছিলেন, যে গান আমাদের অন্তরে দুঃসহ পাপবোধ ও তজ্জনিত ব্যাকুলতা না জাগায় সে গান উপাসনাকে পরিপূর্ণ করিতে পারে না। কবিত্বের ভাষা শ্রুতিমধুর, সৌন্দর্যবোধকে সে তৃপ্তিদান করে বটে—কিন্তু তাহার সেই শরবৎ ঋজুগতি (directness) নাই যাহা একেবারেই গিয়া ঈশ্বরের চরণে উপনীত হয়। আমরা যে কত অকিঞ্চন, কত দীনহীন এবং ঈশ্বরের করুণা যে কী অপার—এই দুই ভাব যুগপৎ যে গানে ব্যক্ত হয় তাহাই শ্রেষ্ঠ ধর্মসংগীত। রবিবাবুর গানে কবিত্ব যথেষ্ট আছে, কিন্তু এই ব্যাকুলতার সুর নাই।
আর একজন ভক্তিমান ব্যক্তি আমায় বলিয়াছিলেন যে, পূর্বেকার গান, যেমন ‘বিষয়সুখে মন তৃপ্তি কি মানে’, যেমন ‘আমি হে তোমারি কৃপার ভিখারি’, কিম্বা সেই পূর্বেকার ভাবে অল্পবয়সে রবিবাবু নিজে যে-সকল গান বাঁধিয়াছিলেন—যেমন ‘শুনেছে তোমার নাম’ বা ‘অন্ধজনে দেহো আলো’ প্রভৃতি—তাহা তাঁহার আধুনিক গানগুলির চেয়ে অনেক বেশি মর্মস্পর্শী। তাঁহার এখনকার গান কানের উপর দিয়াই ভাসিয়া যায়, হৃদয় পর্যন্ত গিয়া পৌঁছায় না।
য়েট্সের মত এবং ইঁহাদের মতে যে পার্থক্য দেখা যাইতেছে তাহার ভিতরকার কারণটা আলোচনা করিয়া দেখা উচিত। য়েট্স যে শুধু কবিত্বের দিক হতে রবিবাবুর ধর্মসংগীতকে ভালো বলিয়াছেন আমার তাহা মনে হয় না। কারণ তাহা হইলে টমাস এ কেম্পিসের গ্রন্থের সঙ্গে এবং প্রাচীন হিব্রু ঋষিদের ভক্তি গাথার সঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথের এ-সকল গান ও কবিতার তুলনাই উত্থাপন করিতেন না। পক্ষান্তরে যে ধর্মাচার্যের কথা বলিলাম তিনি একজন ঈশ্বরনিষ্ঠ সাধক—তাঁহার হৃদয়কে যখন রবীন্দ্রনাথের আধুনিক ধর্মসংগীতগুলি ভরিয়া দেয় নাই তখন তাহার কারণটা কী তাহা অনুসন্ধান করিলে আমরা এ সম্বন্ধে একটা নিরপেক্ষ সত্যবিচারে গিয়া পৌঁছিতে পারিব বলিয়া ভরসা হয়।
এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, উপাসনার সময় পুনঃপুনঃ শুনিতে শুনিতে ভাবের অনুবন্ধিতাসূত্রে যে-সকল গান জড়িত হইয়া যায় সেগুলি কবিত্বহিসাবে উৎকষ্ট না হইলেও সাধকের মন সহজেই অধিকার করে। ইউরোপে ধর্মসংগীত এইজন্য এক বিশেষ ধরনের হয়—তাহার সুর কথা ভাব অত্যন্ত সাধারণ হইলেও বহুদিন ধরিয়া তাহার সঙ্গে মানুষ পরিচিত হইয়া আসিয়াছে বলিয়া গাহিবামাত্রই হৃদয়কে স্পর্শ করিতে তাহা তিলমাত্রও বিলম্ব করে না। তাহার স্থানে কোনো কবির রচিত খুব চমৎকার গান গাহিলে গির্জায় অধিকাংশ লোকের কখনোই ভালো লাগিবে না।
কিন্তু ইউরোপে তত্ত্বজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হওয়ায়, সেখানকার ধর্মসংগীত শুধু কেন, ধর্মসম্বন্ধীয় সকল প্রকারের আলোচনাই বড়ো বেশি প্রথাগত সংস্কারগত ও স্থূলধারণাপূর্ণ হইয়াছে। সেখানকার অধিকাংশ ধর্মসংগীতের বন্দনীয় ভগবান জিহোভা হইয়াছেন বটে, কিন্তু ব্রহ্ম হন নাই। তাঁহার শক্তি প্রতাপ ন্যায়দণ্ড করুণা প্রভৃতি সকলপ্রকার ভাবই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্থূল রূপকের দ্বারা আচ্ছন্ন। সেইজন্য পশ্চিমের ধর্মসংগীত শুনিলে হৃদয়ে একপ্রকার ভক্তিরস জাগে বটে, পাপবোধ উগ্র হয় এবং ঈশ্বরের করুণা ও ক্ষমার জন্য ব্যাকুলতার উদ্রেক হয়, কিন্তু আমাদের অন্তরস্থিত তত্ত্বজ্ঞানী মন তৃপ্ত হয় না। সে মাথা নাড়িয়া বলে—উঁহু, এ-সকল ভাবোচ্ছ্বাস সত্যপ্রতিষ্ঠ নয়।
ইউরোপের ন্যায় আমাদের দেশে কোনো উপাসকমণ্ডলীর মধ্যে ঐরূপ তত্ত্বাধারশূন্য ভাবুকতাপূর্ণ সস্তাদরের ধর্মগীত-প্রচলনের কোনো কারণ দেখি না, কারণ আমাদের দেশে অধ্যাত্মসাধনা তত্ত্বজ্ঞানকে আশ্রয় করিয়াছে; পক্ষান্তরে তত্ত্বজ্ঞান অধ্যাত্মসাধনার ভিতর হইতে সারসংগ্রহ করিয়াছে— দোঁহে দোঁহার অবলম্বন। উপনিষদকেই বলে বেদান্ত ও শ্রেষ্ঠবিদ্যা, তাহারই উপর ভর করিয়া সকল তত্ত্বশাস্ত্র ভারতবর্ষে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছে। অথচ তাহাকে সাধকের গভীরতম অধ্যাত্ম-উপলব্ধির অপূর্ব প্রকাশ করিয়া চিরদিনই ভারতবর্ষ শ্রদ্ধা করিয়া আসিয়াছে। ভগবদ্গীতা শ্রীমদ্ভাগবত প্রভৃতি সকল শাস্ত্র সম্বন্ধেই সেই এক কথা—তাহা হইতে এক ধারা গিয়াছে তত্ত্বজ্ঞানের দিকে, অন্য ধারা গিয়াছে কাব্য ও সংগীতের দিকে। এই উভয় ধারাই ভারতবর্ষে চিরকাল পরস্পর পরস্পরকে পরিপুষ্ট করিয়া আসিয়াছে। সেই জন্য ভারতের শ্রেষ্ঠ ধর্মসংগীতগুলি ইউরোপের ধর্মসংগীতের ন্যায় অকবিদের দ্বারা রচিত নহে। তাহা তত্ত্বদর্শী সাধক কবিদিগের রচনা।
তথাপি প্রবন্ধারম্ভে যাহার কথা উল্লেখ করিয়াছি সেই ভক্তিভাজন ধর্মাচার্য, রবীন্দ্রনাথের আধুনিক গীতগুলি উপাসনাকে পূর্ণ করিতে সমর্থ নহে এ কথা বলিলেন কেন? রবীন্দ্রনাথের পূর্বেকার ধর্মসংগীতগুলি প্রচলিত ব্রহ্মোপাসনার ভাব অবলম্বন করিয়াই রচিত। তখন কবির স্বকীয় কোনো অধ্যাত্ম-অনুভূতি জাগে নাই—তিনি আপনার অভিজ্ঞতাকে আপনি বাণীরূপে প্রকাশ করিতে আরম্ভ করেন নাই। সুতরাং তখনকার গানগুলি প্রচলিত উপাসনার সুরের সঙ্গে সুর মিলাইয়াছে। কিন্তু তাঁহার আধুনিক গানগুলি যে তাঁহার কাব্যজীবনেরই চরম পরিণতি স্বরূপে আবির্ভূত হইয়াছে। ইহারা তো প্রথাগত নহে, আত্মগত—দশের জিনিস নহে, একলার। তাহা হউক, ইহারা যে সত্য সে বিষয়ে তো সন্দেহ নাই। তবে এ ক্ষেত্রে প্রথাগত জিনিস স্বাধীন স্বকীয় জিনিসের চেয়ে চিত্তকে অধিক আকর্ষণ করিবে, এ কথার অর্থ কী? সেই আলোচনাতেই প্রবৃত্ত হওয়া যাক।
এই আমি যে বসিয়া লিখিতেছি, আমার সম্মুখে বর্ষার জলসিক্ত কাননে কত শুভ্র ফুলই ফুটিয়াছে দেখিতেছি। যেন শ্যামদুকূল-পরা ছোটো ছোটো বনকন্যাদের কপালে কেহ শ্বেতচন্দনের টিপ পরাইয়া দিয়াছে। আমি দেখিতেছি, ঐ প্রত্যেকটি পুষ্প যে তরুতে ফুটিয়াছে সেই সমস্ত তরুটিরই সে প্রতিমা। উহার দণ্ডটি তরুকাণ্ডেরই মতো, উহার দলে দলে কত শিরাউপশিরা ডালপালার মতো কত সূক্ষ্ম ভঙ্গিমায় আঁকিয়া বাঁকিয়া গিয়াছে। দলরাজি আবার পল্লবগুলিকে রূপান্তরিত করিয়া কোথা হইতে এক আশ্চর্য সৌরভ এবং বর্ণ লাভ করিয়াছে এবং আপনাদিগকে বৃক্ষ হইতে স্বতন্ত্র করিয়া কোন্ একটি ভাবী সফলতার বীজকোষকে গর্ভের মধ্যে আবৃত করিয়া একটির সঙ্গে একটি কেমন এক সুন্দর বন্ধনে মিলিত হইয়াছে! জীবনের মধ্যে ধর্মের প্রকাশও কি ঠিক এইরূপ নয়? সমস্ত জীবনের হাসিকান্না ভোগ চপলতা হইতে ধর্ম স্বতন্ত্র বটে, কিন্তু সে স্বাতন্ত্র্য কি বিচ্ছেদের স্বাতন্ত্র্য না পরিণামের স্বাতন্ত্র্য? আমার সমস্ত জীবন ভরিয়া আমি প্রকৃতির কত সৌন্দর্য দেখিয়া মুগ্ধ হইতেছি, কত নরনারীর প্রণয়বন্ধনে কত হাসিকান্নার ভিতর দিয়া যাইতেছি, আমার কর্মপ্রবৃত্তি আমাকে দিয়া কত কী করাইতেছে, কত কল্যাণ ও অকল্যাণের সৃষ্টি করিয়া জয়পরাজয়ের মধ্য দিয়া আমায় ঠেলিয়া লইয়া চলিয়াছে। সেই-সমস্ত অভিজ্ঞতার উপর, অনুভাবের উপর আমার ভাবনা আমার কল্পনা কত রঙ মিশাইতেছে, তত্ত্বজ্ঞান কত গভীরতর মূলে ইহাদের মধ্যে সত্যকে অনুসন্ধান করিতেছে। এই-যে দেখিতেছি আমার জীবনের লীলা—আমার ধর্মবোধ কি এই লীলার অন্তর্গত নয়? সে কি ইহাকে এক পাশে সরাইয়া দিয়া তবে প্রকাশ পাইবে? সে কি এই বিচিত্র ডালপালাময় জীবনতরুটিরই শাখাগ্রভাগে ফুলের মতো ফুটিবে না? এই সমস্তকেই রূপান্তরিত করিয়া ভগবৎপ্রসাদের একটি সুগন্ধ হিল্লোল এবং নানা রঙের এক আনন্দতরঙ্গ বহাইবে না?
অনেকেই জীবন হইতে ধর্মের স্বাতন্ত্র্যকে এইরূপ পরিণামের স্বাতন্ত্র্যরূপ দেখেন না, কিন্তু বিচ্ছেদের স্বাতন্ত্র্যরূপেই দেখিয়া থাকেন। তাঁহারা মুখে যতই অস্বীকার করুন, তাঁহারা সমস্ত জীবনের গান শুনিতে এবং শুনাইতে ভয় পান এবং জীবনটাকে অত্যন্ত কৃশমলিন, অত্যন্ত পাপজীর্ণ কল্পনা করিয়া তৃপ্তি বোধ করিয়াও থাকেন। জীবনের বিচিত্র রাগ—সৌন্দর্যবোধের রাগ, মাধুর্যের রাগ, কল্যাণের রাগ, কল্পনার রাগ, ভাবের রাগ—এ-সমস্ত রাগ এবং রাগিণীর কোনো সার্থকতা তাঁহাদের মধ্যে দেখা যায় না। তাঁহারা রাগবর্জিত রসবর্জিত নীতিবোধকে আশ্রয় করিয়া থাকেন। ব্রাহ্মণ শূদ্রের মতো, শ্বেতকায়-কৃষ্ণকায়ের মতো তাঁহাদের কাছে ভালো এবং মন্দ একেবারে সুনির্দিষ্ট। কারণ, কী যে ভালো এবং কী যে মন্দ তাহা কিনা কতকগুলি বাঁধা বাহিরের নিয়মের উপরই নির্ভর করে। জীবনের অভিব্যক্তিতে বাঁধা ভালো যে দেখিতে দেখিতে কোন্ মন্দের মুক্তক্ষেত্রে একেবারে মত্ত অশ্বের মতো রাশ-আলগা হইয়া ছুটিয়া যায় এবং মন্দও যে কী বিচিত্র উপায়ে ভালো হইয়া উঠে, মনুষ্য প্রকৃতির এ-সকল নিগূঢ় গুহাগতির মধ্যে তাঁহারা কোনোদিনই প্রবেশ করেন না। এ কথা মনেও আনেন না যে, প্রবৃত্তির ঝড় মানুষের মধ্যে অনিবার্যরূপেই জাগে, কিন্তু তাহারই ভিতর দিয়াই তো ভোগবিরত অচঞ্চল শান্তির মধ্যে মানুষ আবার উত্তীর্ণ হয়। পঙ্ককে দেখিয়া পঙ্কজকে নিন্দা করে সেই, যে মূর্খ—কারণ, যে আকাশে পঙ্ককে উদ্ভেদ করিয়া পঙ্কজ মাথা তোলে তাহা উজ্জ্বল নির্মল আকাশ, সেইখানেই সে আপনার সমস্ত সুরভিকে নিঃশেষে বিকীর্ণ করিয়া দেয়।
পাপবোধ ধর্মকে সেই জীবন হইতে বিচ্ছিন্ন করিবারই বোধ, জীবনকে ফুলে ফলে বিকশিত করিবার বোধ নয়। অবশ্য ধর্মজীবনে তাহার কোনো স্থান নাই এতবড়ো দুঃসাহসিকের কথা কোন্ মুখে বলিব, কিন্তু সে স্থান কেমনতর? এই বর্ষার পূর্বে যেমন উত্তপ্ত মাটি-ফাটা গ্রীষ্ম গিয়াছে, তাহারই মতো। গ্রীষ্মের শোষণই যে বর্ষার মেঘকে জন্মদান করিয়াছে। গ্রীষ্মের ঝড়ই যে তাহাকে দিগ্দিগন্তে চালিত করিয়া লইয়া বেড়াইতেছে, গ্রীষ্মের তাপ মাটির আগাছা পরগাছাকে শুকাইয়া, মাটির সমস্ত দূষিত বীজকে দগ্ধ করিয়া ভূমিকে ফলধারণযোগ্য করিয়া দিয়াছে। কিন্তু সেই গ্রীষ্মের পরিণামই যে বর্ষা, দারুণ গ্রীষ্মের মধ্যেও যেমন সে কথা আমাদের অত্যন্ত জানা, তেমনি পাপবোধের শোষণ ও দাহের সঙ্গে সঙ্গে যদি আনন্দ না জাগে, যদি না জানি যে এই জীবনের উপর আমার ফুল ফুটিবে, গন্ধ ছুটিবে, বর্ণ ধরিবে, মধুমক্ষিকার মেলা বসিবে, তবে তো মারা গেলাম! তবে যে দাহ দাহই থাকিল, বর্ষণের মেঘকে সে তৈরি করিল কোথায়? বৈরাগ্য এবং রাগ, পাপের দাহ এবং সান্ত্বনার সুধা একই সময়ে আসা চাই, তবেই প্রাণ বাঁচে। নহিলে সমস্তই কী ভয়ংকর কালো, কী শূন্য, কী অন্ধকারময়!
শুধু ‘না’র দিক দিয়া মানুষের কোনো ভালো করা যায় না—‘হাঁ’ চাই। খৃষ্টধর্ম এখন যে পরিবর্তনের দিকে চলিয়াছে তাহাতে সে এই ‘হাঁ’র দিকটাকেই বড়ো করিয়া তুলিতে প্রয়াস পাইতেছে। কিন্তু তাহার ইতিহাসে বরাবরই এই ভাবাত্মক দিকটার অভাব থাকিয়া গিয়াছিল। সে ‘প্রেমে মুক্তি’ বলিয়াছে, কিন্তু সেই প্রেমটার প্রকাশ সমস্ত জীবনের মধ্যে যে কিরকম তাহার কোনো আভাস দেয় নাই। ব্রাউনিং প্রভৃতি আধুনিক কবির কাব্যের মধ্যে বরং খানিকটা তাহার পরিচয় পাওয়া যায়, কারণ তাঁহারা ‘না’কে একেবারে অস্বীকার করিয়া জীবনের ভিতর হইতে ধর্মের ফুলকে ফুটাইয়াছেন—সমস্তকেই ‘হাঁ’ বলিয়া স্বীকার করিয়া লইয়াছেন। ‘Everlasting Yea’―চিরন্তন হাঁ। সেইজন্য ব্রাউনিঙের মধ্যে পাপবোধ যথেষ্ট নাই এমন অপবাদও কেহ কেহ দিতে ছাড়েন নাই। বস্তুতঃ খৃষ্টধর্ম লইয়া তুমুল আন্দোলনাদির মধ্যে এই কথাটাই সত্য যে, খৃস্টধর্মের সঙ্গে খৃস্টান মানুষের আজিও পুরা বনিবনাও হয় নাই। সে মানুষ জীবনের সম্ভোগে ভরপুর, আর তাহার ধর্ম জীবনের আনন্দকে, সৌন্দর্যভোগকে ডরাইয়া চলে। এই কারণে সে মানুষের মধ্যে ধর্ম এখনো প্রতি দিনের, প্রতি কাজের, প্রতি নিশ্বাসপ্রশ্বাসের, অত্যন্ত ব্যবহারের সামগ্রী হইয়া উঠে নাই। সে অনেকটা পরিমাণে রবিবারের এবং গির্জার জিনিস হইয়া আছে। অবশ্য সাহিত্য এবং শিল্প তাহাকে ক্রমাগত জীবনের ভিতরের দিক হইতে বিকশিত করিয়া তুলিবার জন্য সাধনায় রত রহিয়াছে।
আমার বিশ্বাস যে, কবিরাই জীবনের সঙ্গে ধর্মের বিচ্ছেদকে ঘুচাইয়া দেন। তাঁহারাই জীবনের সঙ্গে ধর্মের স্বাতন্ত্র্যকে ঐ পরিণামের স্বাতন্ত্র্যরূপে দেখান। তাঁহাদের চাপো আর মারো আর গাল দাও— জীবনের আনন্দকে বাদ দিয়া বৈরাগ্য প্রচার করিতে তাঁহারা কোনোমতেই পারিবেন না।—
নানা গান গেয়ে ফিরি নানা লোকালয়;
হেরি সে মত্ততা মোর বৃদ্ধ আসি কয়—
তাঁর ভৃত্য হয়ে তোর এ কী চপলতা!
কেন হাস্যপরিহাস, প্রণয়ের কথা!
কেন ঘরে ঘরে ফিরি তুচ্ছ গীতরসে
ভুলাস এ সংসারের সহস্র অলসে!
দিয়াছি উত্তর তারে, ওগো পক্ককেশ,
আমার বীণায় বাজে তাঁহারি আদেশ!
যে আনন্দে, যে অনন্ত চিত্তবেদনায়
ধ্বনিত মানবপ্রাণ, আমার বীণায়
দিয়াছেন তারি সুর, সে তাঁহারি দান;
সাধ্য নাহি নষ্ট করি সে বিচিত্র গান!
ইহারই জুড়ি কবিতা ব্রাউনিঙের ‘ফ্রা লিপ্পো লিপ্পি’। ফ্রা লিপ্পো লিপ্পি এক মধ্যযুগীয় চিত্রকর। তিনি সংসারবিরাগী সন্ন্যাসীদের সঙ্গে এক মঠে ছিলেন, কিন্তু তাঁহাদের অনুমতিক্রমে কেবল স্বর্গের দেবদূত পরী এবং অন্যান্য কাল্পনিক ছবি না আঁকিয়া মধ্যে মধ্যে জীবনের আনন্দে রাজপথের জীবন্ত নরনারীদের ছবি আঁকিয়া ফেলিতেন এবং মঠের পক্ককেশ সন্ন্যাসীদের এই উত্তরই দিতেন—
আমার তুলিতে সাজে তাঁহারি আদেশ।
আমাদের ভারতবর্ষে জীবনের সঙ্গে ধর্মের যে তেমনতর বিচ্ছেদ ঘটে নাই তাহারও প্রধান কারণ আমার এই মনে হয় যে, আমাদের সৌভাগ্যক্রমে আমাদের অনেক ধর্মপ্রবর্তক মহাপুরুষ একাধারে কবি এবং সাধক ছিলেন। বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম এবং তাহার অবসানকালে শক্তিপূজা যথেষ্ট পরিমাণে প্রভাব বিস্তার করিলেও বৈষ্ণবধর্মের ভাবপ্লাবনকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারে নাই। বাংলা গীতসাহিত্যে বৈষ্ণবই একা রাজত্ব করিতেছে।
বৈদিক ঋষিরা কবি, উপনিষদ্কারগণ কবি, কবীর নানক দাদূ অত্যন্ত উচ্চশ্রেণীর কবি— সুতরাং কেমন করিয়া আমাদের দেশের ধর্মসাহিত্য রূপরসের দাবিকে অগ্রাহ্য করিবে, বিশ্বসৌন্দর্যকে নির্বাসনদণ্ড দিবে? ব্রাহ্মধর্মের ইতিহাসেও খৃস্টধর্মের প্রভাবে এক সময়ে পাপবোধ সকল রস ও সৌন্দর্য হইতে ধর্মকে সরাইয়া লইয়া অত্যন্ত একদেশবর্তী শুষ্ক এক পদার্থ করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু এখানেও এক মহাকবির গান সেই ধর্মকে সেই একদেশের অতিপ্রভাব হইতে রক্ষা করিয়া তাহাকে ভারতের চিরন্তন রসসাধনা ভক্তিসাধনার ধারার সঙ্গে যুক্ত করিয়া দিতেছে।
ম্যাক্লিফ-সাহেব শিখধর্ম-নামক তাহার রচিত গ্রন্থে গুরু নানকের যে-সকল ভজন সংগ্রহ করিয়া ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়াছেন এবং ক্ষিতিমোহনবাবু ওয়েস্ট্কট প্রভৃতির উপর নির্ভর না করিয়া কবীরের যে বাক্যাবলী মূল হইতে উদ্ধার করিয়া বাংলায় অনুবাদ করিয়াছেন, তাহা পাঠ করিলে একটি কথা বেশ সুস্পষ্ট হইয়া উঠে যে, রবীন্দ্রনাথের ধর্মসংগীতের সঙ্গে এই ধর্মবাক্যগুলি ভাবে রসে প্রকাশে, এমন-কি অনেক সময় উপমা-অলংকারের সাদৃশ্যেও এক। রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন—
বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়।
অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ।
কবীর কহেন, তরুকে ছাড়িয়া যেমন বনকে খুঁজিয়া পাইবে না, তেমনি তিনি বিচ্ছিন্নভাবে মিলিবেন না।
কহৈঁ কবীর বিছুড় নহিঁ মিলিহো
জ্যো তরবর ছোড় বনমাধরী—
ঐ একই কথা!
কবীর নানক প্রভৃতি ভক্তদের গান পাপবোধের দ্বারা আক্রান্ত নয়। আমারই ভিতর সমস্ত বিশ্ব পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে, আমারই জীবনের মধ্যে সমস্ত বিশ্বসৌন্দর্য অবাধে ফুটিতেছে—তাহাদের গান এই আনন্দের সুরে বাঁধা।
য়া ঘট ভীতর চন্দ্রসূর হৈঁ য়াঁহী মে নৌলখতারা—আমারই মধ্যে চন্দ্রসূর্য, আমারই মধ্যে নব লক্ষ তারা প্রকাশিত।—কবীর
—রবীন্দ্রনাথ
—কবীর
—রবীন্দ্রনাথ
এইরূপে দেখা যাইবে যে ইঁহাদের গানের ভিতরকার তত্ত্বটিই এই যে, বিশ্বকে কোথাও বাদ দেওয়া নয়, রূপকে কোথাও অস্বীকার করা নয়, কিন্তু আত্মার আনন্দের দ্বারা সমস্তকে পূর্ণ করিয়া গ্রহণ করা। আশ্চর্য ইঁহাদের উপলব্ধি, পরিপূর্ণ ইঁহাদের আনন্দোদ্বোধন এবং রসানুভূতি—এমন আশ্চর্য ভক্তিকবিতা কোনো দেশে আছে কি না সন্দেহ।
কবি য়েট্স্ কেন, ইউরোপীয় কোনো ভাবুকই আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষের অধ্যাত্মসাধনার মধ্যে এই মধুর উৎসটির সংবাদ পান নাই। তাঁহারা সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের সংগীত পাইয়াই মুগ্ধ হইয়া গিয়াছেন এবং এক নূতন জ্যোতিষ্ক আবিষ্কারের যেমন আনন্দ তেমনি এক আনন্দে মাতিয়া উঠিয়াছেন। কিন্তু যে মানিক তাঁহাদের হাতে গিয়া পড়িয়াছে সে যে, একটি আধটি নয়, ভারতবর্ষের ভাবসমুদ্রের তলায় সে যে কত যুগযুগান্তর হইতে কত বিচিত্র রূপে সঞ্চিত হইয়া আছে, সে খবর যেদিন প্রকাশ হইয়া পড়িবে সেদিন বিশ্বসাহিত্যের ঐকতানসংগীতে এক নূতন সুরের আবির্ভাব ঘটিবে। হয়তো ঐকতানসংগীত যাহার অভাবে সম্পূর্ণ হইতে পারিতেছে না সেই সব মেলানো সব বেসুর-ডোবানো সুরই আসিয়া সকল বিচ্ছিন্ন গীতকে মিলিত করিয়া সকল মানবকে এক আনন্দসভায় আহ্বান করিবে। সেদিন দূরে নাই। বিবাহের প্রথম বাঁশিটি বাজিয়াছে—ঐ একটি সানাইয়ের করুণমধুর রাগিণী। পূর্বগগনকে প্লাবিত করিয়া, এখন জীবনের সায়াহ্নে পশ্চিমগগনের বিজয়গৌরবচ্ছটাকে সে সুধাস্নিগ্ধ করিতে গিয়াছে। রাত্রি আসন্ন, আবার অরুণোদয়ের অপেক্ষায় সবাই বসিয়া আছে, এ অরুণোদয়ে সমস্ত মানুষের সম্মিলিত জাগরণ, ইতিমধ্যে: Watchman, what of the night?
- ↑ কবি য়েট্স্ যে তিনটি কবিতার অনুবাদ পাঠ করিয়াছিলেন তাহার একটি গীতাঞ্জলিতে, একটি নৈবেদ্যে ও একটি খেয়াতে আছে। (১) ‘শ্রাবণঘনগহন মোহে’ (২) ‘জীবনের সিংহদ্বারে পশিনু যে ক্ষণে’ ও ‘মৃত্যুও অজ্ঞাত মোর’ এই দুইটি চতুর্দশপদী কবিতা একত্র। (৩) ‘অনাবশ্যক’ নামক খেয়ার একটি কবিতা। এই প্রবন্ধ লিখিবার কালে কবিতা-তিনটির নাম জানা যায় নাই।