কাব্যপরিক্রমা (১৯৫৮)/রাজা
রাজা
বাংলা সাহিত্যে যে-সকল উপন্যাস, ছোটো গল্প, কবিতা ও নাটক পড়া যায় তাহা হইতে বাঙালি পাঠকের মানসিক স্তর নির্ণয় করিবার জন্য কোনো গভীর গবেষণার প্রয়োজনমাত্র করে না। আমাদের ‘ডিমাণ্ড্’ অনুসারেই এ-সকল জিনিসের ‘সাপ্লাই’ হয় সত্য; কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এতদিনকার শিক্ষা সত্ত্বেও আমরা instinctএর স্তর বেশি দূর পর্যন্ত ছাড়াইয়া উঠিতে পারি নাই। সেইজন্য আমাদের রুচি যথেষ্ট শুচি হয় নাই, রসবোধ যথেষ্ট গভীর হয় নাই। আমরা যে-সকল স্থূল নিম্নপ্রবৃত্তিময় জীবনের নিতান্ত নিম্নরসের সৃষ্টি করিতেছি তাহাও আবার এমনি ছায়া-ছায়া ভাসা-ভাসা ও দুর্বল যে, মনে হয়, সে-সকল সৃষ্টিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্নায়বিক দৌর্বল্যের ফল বৈ আর কিছুই নয়। তাহাদেরও মধ্যে যদি এই শ্রেণীর ফরাসীস লেখকদের সজীবতা থাকিত তবে কথা ছিল না। কবিবর রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ যে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই-সকল অপূর্ব সৃষ্টির অন্তর্গত নয়, এ নাটকে যে কতগুলি নিতান্ত স্থূল মানুষের রাগদ্বেষপ্রণয়াদি হাসিকান্নার ব্যাপারের কৃত্রিম উত্তেজনাপূর্ণ চিত্র পাওয়া যাইবে না, এ যে একেবারেই সেই পুরানো শ্রেণীর নয়, বরং অত্যন্ত আধুনিক, আধুনিকতম শ্রেষ্ঠ নাটকগুলির সগোত্র, এই কথাগুলি বুঝাইবার জন্যই আমি আধুনিক নাটকের স্বরূপ সম্বন্ধে অন্যত্র আলোচনা করিয়াছি।[১] আধুনিক নাট্যসাহিত্যের মধ্যে ‘রাজা’ নাটকের স্থান কোথায়, ইহার আর্ট-রূপের কোনো বিশিষ্টতা আছে কি না, ইহার মধ্যে কোনো নূতন রস সৃষ্ট হইয়াছে কি না, মানবজীবনের কোন্ অংশকে ইহা উদ্ভাসিত করিয়া দেখাইয়াছে, ইহার সৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যে কোনো নূতনত্ব আছে কি না——এই আলোচনাগুলিতে প্রবৃত্ত হইবার জন্য আধুনিক নাট্যসাহিত্য সম্বন্ধে ঐ প্রবন্ধে একটু মুখবন্ধ করিয়া লওয়া দরকার বোধ করিয়াছি।
‘রাজা’ অধ্যাত্মরসের নাট্য। এ নাট্যের অনুরূপ কোনো সৃষ্টি সাহিত্যে আছে বলিয়া আমি জানি না। পশ্চিম—মহাদেশে থাকিলেও নাটকাকারে নাই, অন্য আকারে আছে। প্রাচীন কালের সেণ্ট্ অগস্টিনের Confessions বা দান্তের Vita Nuova এবং এ কালের ব্লেকের The Marriage of Heaven and Hell বা ফ্রান্সিস্ টম্প্সনের The Hound of Heaven—এ সকলের সঙ্গে এ নাট্যের বিষয়ের কতক কতক সাদৃশ্য আছে। তবে সে সাদৃশ কোনো কাজেরই নয় এইজন্য যে, সে—সকল গ্রন্থের অধ্যাত্মরসের সঙ্গে এ রসের প্রভেদ যথেষ্ট। শুধু যে ধর্মভেদের জন্য এই ভেদ ঘটিয়াছে তাহা আমি একেবারেই মনে করি না; কারণ, ধর্মের সঙ্গে ধর্মের মতগত ভেদ যেমনি থাক্, অধ্যাত্ম—অভিজ্ঞতার সাদৃশ্য সকল দেশের ধর্মসাধনার মধ্যেই পাওয়া যায়। সুতরাং ধর্মভেদের জন্য অধ্যাত্মরসের যে ভেদের কথা বলিতেছি তাহা ঘটে নাই। প্রধান যে কারণে ঘটিয়াছে তাহা বলি।
আর্টের সাধনার সঙ্গে অধ্যাত্মসাধনার এক জায়গায় গুরুতর রকমের প্রভেদ আছে। শিল্পসাধকের কাছে তাহার নিজের বিশেষ রূপটাই বড়ো; সমস্ত বিশ্বকে সেই রূপের ছাঁচে ঢালাই করিতে পারিলে তবেই তাহার তৃপ্তি। বিশ্ব তার জন্য, সে বিশ্বের জন্য নয়। বিশ্ব তার উপকরণ, সে যেমন খুশি তাহাকে গড়িবে ভাঙিবে। এইজন্যই তাহার কোথাও নিঃশেষে আত্মদান নাই, কেবলই আত্মগ্রহণ আছে। অর্থাৎ সে কেবলই আপনার আধারের মধ্যে বিশ্বকে গ্রহণ করে, বিশ্বকে বিশেষ করিয়া লয়।
অধ্যাত্মসাধকের পথ একেবারে ইহার উল্টা। তাহার কাছে বিশ্বই বড়ো; আপনাকে সেই বিশ্বের মধ্যে নিঃশেষিত করিতেই তাহার সমস্ত তৃপ্তি। সে বিশ্বের জন্য, বিশ্ব তার জন্য নয়। বিশ্বরূপের কাছেই তার আত্মদান সম্পূর্ণ হইলে তবেই তাহার সাধনার সম্পূর্ণতা।
তবে সে কালের অধ্যাত্মসাধনার পথ ঠিক এই পথ ছিল, এ কথা বলা যায় না। সে সাধনা প্রধানভাবে বিশ্বের মধ্যে বাড়া ছিল না, বিশ্বকে ছাড়া ছিল। আত্মদান এখনকার মতো তখনও তাহার লক্ষ্য ছিল বটে, কিন্তু সে হয় এক অনন্ত অনধিগম্য নিরুপাধি ঈশ্বরের কাছে আত্মদান, নয় এক সান্ত সাকার বিগ্রহের কাছে আত্মদান। সেইজন্যই রূপের সাধনার সঙ্গে অধ্যাত্মসাধনার ভেদ সে কালে মেলানো শক্ত ছিল। অবশ্য মধ্যযুগে ইউরোপে কিম্বা বৌদ্ধযুগে ভারতবর্ষে চীনে এবং জাপানে যেখানে যেখানে শিল্প ধর্মের সেবা করিয়াছে দেখা যায়, সেখানে সেখানে শিল্পসাধনা ও অধ্যাত্মসাধনা যে মিলিয়াছে, এমন কথা বলা যায় না। বরং সেখানে শিল্প নিজের স্বরূপ খর্ব করিয়া বিশেষভাবে ধর্মশিল্প বা religious art হইয়া উঠিয়াছে, ইহাই লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং শিল্প ও শিল্পসাধনা বলিতে আমরা এখন যাহা বুঝি, সে—সকল যুগের শিল্প ও শিল্পসাধনা একেবারেই তাহা নয়। তাহাদের স্বাতন্ত্র্য নাই; ধর্মের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুর মধ্যে তাহাদের সীমা বাঁধা। এই কারণেই ধর্মের আধিপত্য ছাড়াইয়া উঠিবার জন্য আর্টের প্রাণপণ প্রয়াস হয় এবং ক্রমশ ধর্ম আর্ট্কে তাহার স্বতন্ত্র পথে যাইতে না দিলে আর্টের রস বিকৃত হইতে থাকে এবং সেই রসবিকার তখন ধর্মের মধ্যেও বিকার ঘটায়। ইতালীর এবং ভারতবর্ষের রেনেসাঁসের যুগে ইহার যথেষ্ট উদাহরণ দেখা গিয়াছে। আর্টের সাধনা এবং অধ্যাত্মসাধনার মধ্যে যে পার্থক্য আছে বলিলাম তাহাকে ভুলিতে গেলেই, কোনো গতিকে দুই সাধনাকে এক করিতে গেলেই, ইহারা পরস্পর পরস্পরকে কাটে।
অথচ এ কালে আমরা দেখিতেছি যে, এই দুই সাধনার মধ্যে যে একান্ত ভেদ দাঁড়াইয়া গিয়াছে তাহা থাকিলে তো চলে না। এখন তো আর জীবনকে পায়রার বাসার মতো খোপে খোপে ভাগ করিয়া রাখা সম্ভব নয়। জীবন যে একবস্তু; তাহার মধ্যে এত ভাগ এত ভেদ কেমন করিয়া করা যায়? সুতরাং ভিন্ন ভিন্ন সাধনার ভেদগুলিকে অস্বীকার করিয়া নয়, বরং পুরামাত্রায় মানিয়া লইয়াই দেখিতে হইবে, সে—সমস্ত ভেদের মধ্যে অভেদ কোথায়, ঐক্যতত্ত্বটি কোনখানে? সেই ঐক্যতত্ত্বটি যেমনি বাহির হইবে অমনি তাহার রসও আর্টের ভিতর দিয়া প্রকাশ লাভ করিবে।
‘রাজা’ নাটকের নাট্যবস্তু এই রূপের সাধনা এবং অধ্যাত্মসাধনার ভেদ লইয়া, এবং এই ভেদজনিত সংঘাতের উপরেই এই নাটকের পত্তন। সুতরাং এ নাটকে যে—সকল রস ফুটিয়াছে তাহা একেবারে নূতন। এ—সকল রস যেমন নূতন, যে—সকল চরিত্রকে আশ্রয় করিয়া এই রসগুলি ফুটিয়াছে তাহাও নূতন। নাটকের প্রধান নায়িকা সুদর্শনা। রূপের সাধনার যে স্বরূপ বর্ণনা করিলাম তাহাই তাহার চরিত্রকে আশ্রয় করিয়া ফুটিয়াছে। নাটকের প্রধান পাত্র ঠাকুরদাদা। অধ্যাত্মসাধনার যে স্বরূপ বর্ণনা করিলাম তাহাই সেই চরিত্রকে আশ্রয় করিয়া প্রকাশ পাইয়াছে। আর, প্রধান অথচ অদৃশ্য নায়ক স্বয়ং রাজা তাঁহার সম্বন্ধে পরে কথা হইবে।
নাটকের গল্পটি একটি বৌদ্ধজাতক হইতে লওয়া হইয়াছে। মূল গল্পটি নাট্যে ঈষৎ পরিবর্তিত হইয়া যাহা দাঁড়াইয়াছে তাহা এই:
এক কুরূপ বা অরূপ রাজা—মানব হিসাবে ধরিলে কুরূপ, ঈশ্বরের হিসাবে ধরিলে অরূপ—তাঁহার ‘সুদর্শনা’ রানীকে এক অন্ধকার ঘরে আনাইয়া সেইখানে প্রত্যহ তাঁহার সহিত মিলিত হইতেন। তাঁহার প্রতি পরমভক্তিমতী তাঁহার এক দাসী ছিল, তাহার নাম সুরঙ্গমা; সে যৌবনে নষ্ট হইবার পথে গিয়াছিল, তার পর রাজার আশ্রয়ে আসিয়া সে রক্ষা পায়, রাজা তাহাকে সেই অন্ধকার ঘরের দাসী করিয়া দেন। রানীর মধ্যে রূপের তৃষ্ণা প্রবল, রাজাকে চক্ষে দেখিতে না পাইয়া রানীর মন অধীর হইয়া উঠিয়াছে। দাসী সুরঙ্গমার মতো অন্ধকার ঘরে রাজাকে ধ্যান করিয়া তাঁহার তৃপ্তি নাই। রানী শেষে রাজাকে ধরিয়া বসিলেন যে, রাজাকে একবার সব জিনিসের মাঝখানে বাইরে আলোয় দেখা দিতে হইবে। রাজা তাঁহাকে বলিলেন, বেশ, বসন্তপূর্ণিমার উৎসবে প্রাসাদের শিখরের উপর দাঁড়াইয়া রানী হাজার লোকের মাঝখানে রাজাকে দেখিবার চেষ্টা করিতে পারেন। রাজা তাঁহাকে সেই লোকের ভিড়ের মধ্যে সকল দিক হইতেই দেখা দিবেন।
সে দেশের লোকে কিন্তু রাজাকে কখনও চক্ষে দেখিতে পায় না— কারণ, রাজা যেমন রানীর কাছে দেখা দেন না তেমনি প্রজাদের কারও কাছেই দেখা দেন না। তাহাদের অনেকেরই তাই সংশয় যে রাজা মোটেই নাই। বসন্ত—উৎসবে অন্যান্য রাজারা আমন্ত্রিত, রাজার দেখা না পাইয়া তাহাদেরও মনে সেই সংশয়ই পাকা হইয়াছে। কেবল কাঞ্চীর রাজার মনে এ সম্বন্ধে কোনো সংশয় নাই— লোকটা সংশয়বাদীও নয়— একেবারে নাস্তিক ও বিদ্রোহী বলিলেই হয়।
ইতিমধ্যে বসস্ত—উৎসবে সুবর্ণ নামে এক ছদ্মবেশী এবং সুপুরুষ, এবং সেই কারণেই ভিতরে কাপুরুষ, ব্যক্তি সে দেশের রাজা বলিয়া নিজেকে চালাইবার জন্য চেষ্টা করিতেছে। কাঞ্চীরাজের কাছে তাহার ফাঁকি ধরা পড়িয়াছে। কাঞ্চীরাজ আসল রাজার অস্তিত্ব সম্বন্ধে যতই জোর করিয়া অবিশ্বাস করুক, নকল রাজার নকলটুকু তাহার চোখ এড়ায় না। কাঞ্চীরাজ সুদর্শনাকে লাভ করিবার লোভ রাখে; সুবর্ণকে তাহার সেই উদ্দেশ্য সফল করিবার জন্য সে হাতে রাখিল।
বসন্তপূর্ণিমার উৎসবে সেই সুরূপ সুবর্ণকে দেখিয়া সুদর্শনা রানী তাহাকেই রাজা বলিয়া ভ্রম করিল। সুরঙ্গমা তাহার কাছে ছিল না। রানী পদ্মপাতায় ফুল সাজাইয়া সুবর্ণকে রাজা—ভ্রমে অর্ঘ্য পাঠাইল। সুবর্ণ তাহার অর্থ কিছুই বুঝিতে পারিল না, কিন্তু কাঞ্চীরাজ বুঝিতে পারিয়া সুবর্ণের গলা হইতে মুক্তার একগাছি মালা নিজে খুলিয়া লইল এবং দাসীর হাত দিয়া মহারাজের মালা বলিয়া রানীকে পাঠাইয়া দিল। রাজার হাতের এই অগৌরব রানীকে বিধিল।
তার পরে অদৃশ্য রাজার প্রতি অবিশ্বাসী ও বিদ্রোহী কাঞ্চীরাজ সুদর্শনাকে পাইবার আশায় প্রাসাদের এক কোণে আগুন ধরাইয়া দিতে, সে আগুন দেখিতে দেখিতে এমন ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল যে, কাঞ্চী নিজে পলাইবার পথ পায় না। বেচারা সুবর্ণ তখন ভয়ে আকুল, রানী আগুন হইতে রক্ষা পাইবার জন্য তাহার শরণাপন্ন হইতেই সে তৎক্ষণাৎ কবুল করিল যে, সে রাজা নয়। লজ্জায় সুদর্শনা ম্রিয়মাণ হইল। তার পরে সেই প্রলয়ের দিনে আসল রাজার প্রচণ্ড ভয়ানক রূপ সে দেখিতে পাইল— ধূমকেতু—উঠা আকাশের মতো কালো রূপ। রাজা সেই রুদ্র ভীষণ রূপেই রানীকে প্রবৃত্তির প্রলয়দাহ হইতে রক্ষা করিলেন। তখন রানীর ভিতরে এক দিকে পাপের নিদারুণ দাহ ও লজ্জা, অন্য দিকে রূপের তীব্র নেশা। রাজার সেই ভীষণ রূপ সে সহ্য করিতে পারিল না। রাজার কাছ হইতে সে দূরে পলাইয়া যাইতে চাহিল।
সুদর্শনা রাজার কাছে থাকিল না। রাজা তাহাকে কোনো নিষেধ করিলেন না, তাহার উপর জোর করিলেন না। সুদর্শনার মনে তীব্র অভিমান জাগিয়া উঠিল। তাহার সেই বিদ্রোহের দিনে সুরঙ্গমা তাহার সঙ্গ লইল। সে বলিল, ‘তোমার পাপের আমিও ভাগী। আমি তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকিব।’
স্বাভিমানের সঙ্গ লইল নম্রতা।
সুদর্শনা তখন তাহার বাপের বাড়ি আসিল। রাজার সম্বন্ধে তাহার তখন তীব্র অভিমান; কারণ, বাপের বাড়িতে তাহার তো আর রানীর ঐশ্বর্য নাই, সেখানে তাহার অগৌরবের স্থান, সেখানে তাহাকে দাসী হইয়া থাকিতে হইতেছে। তাহার যে পতন হইয়াছে এবং সেইজন্য যে তাহার অহংকার পদে পদে ক্ষুণ্ণ হইতেছে, সে কথা বুঝিলেও মানিয়া লওয়া তাহার পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ। রূপলালসা তখনও তাহার মন হইতে সরে নাই; সুবর্ণ তখনও তাহার কাঙ্ক্ষিত, যদিচ তাহার ভীরুতার জন্য তাহার প্রতি সুদর্শনার ধিক্কার জন্মিয়াছে। পাপের বিদ্রোহের ভিতর একটা সাহস আছে, একটা উত্তেজনা আছে; সে উত্তেজনা প্রলয় ঘটাইবার উত্তেজনা। সেই উত্তেজনার ভিতর তীব্র আনন্দ। শেক্স্পীয়রের ‘অ্যাণ্টনি অ্যাণ্ড্ ক্লিয়োপেট্রা’র মধ্যে সেই প্রলয়ের তীব্র উত্তেজনার আনন্দের রূপ দেখিতে পাওয়া যায়। সুদর্শনার বিদ্রোহের মধ্যে সেই সাহস, সেই উন্মাদনা প্রচুর ও প্রবল রূপে জাগিয়াছে, কিন্তু যাহার জন্য সে সমস্ত ছাড়িল সে কোথায়? সে এমন ভীরু? সুদর্শনাকে জোর করিয়া কাড়িয়া লইবার সাহস তাহার নাই?
ইতিমধ্যে কাঞ্চীরাজ সুবর্ণকে বাহন করিয়া সুদর্শনাকে লইবার জন্য তাহার পিতার রাজ্যে উপস্থিত। দেখিতে দেখিতে কাঞ্চী ছাড়া আরও কয়েকজন রাজা আনিল। সেই সাত রাজার সঙ্গে তখন সুদর্শনার পিতার যুদ্ধ বাধিল এবং তিনি বন্দী হইলেন। সুদর্শনার জন্য স্বয়ম্বরসভা প্রস্তুত হইল। সেই সভায় কাঞ্চীরাজ সুবর্ণকে ছত্রধর করিয়া সিদ্ধিলাভের আশা করিল। রাজসভায় সুবর্ণকে দূর হইতে সেই অবস্থায় দেখিয়া তাহার প্রতি সুদর্শনার অত্যন্ত ঘৃণা জন্মিল। তখন তাহার ধ্রুব বিশ্বাস হইল, সুবর্ণ কিছুমাত্র সুন্দর নয়। সে স্থির করিল যে, এই সাত রিপুর সাত রাজার টানাটানির আয়োজনের মাঝখানে সেই স্বয়ম্বরসভায় বুকে ছুরি বসাইয়া সে আত্মঘাতিনী হইবে।
এইখানেই তাহার পাপের প্রায়শ্চিত্তের আরম্ভ। তাহার অর্ঘ্য যে সৌন্দর্যের অন্তরতর রিক্ত নির্মল ‘সবরূপ—ডোবানো রূপ’ এর কাছে না পৌঁছিয়া কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৌন্দর্যের ভোগলালসাপ্রদীপ্ত স্থূল রূপের মলিনতার মধ্যে গিয়া পৌঁছিয়াছে এবং ধুলায় লুটাইয়াছে, যে মুহূর্তে সে ইহা অনুভব করিতে পারিল সেই মুহূর্ত হইতেই তো তাহার প্রায়শ্চিত্তের শুরু, এবং মুক্তিরও সূত্রপাত। সৌন্দর্যবৃত্তির চরিতার্থতা—সাধন তো পাপ নয়; পাপ, যখন লালসা সৌন্দর্যবৃত্তির স্থান জুড়িয়া বসে। সে লালসা নিতান্ত ইন্দ্রিয়ের জিনিস—হৃদয়কে তাহা নষ্ট করিতে পারে না।
তার পর স্বয়ম্বরসভায় হঠাৎ রাজাদের আসন কাঁপিয়া উঠিল এবং যোদ্ধবেশে ঠাকুরদাদা প্রবেশ করিলেন। ইতিপূর্বে কাঞ্চীরাজ প্রভৃতি বসন্ত—উৎসবে ঠাকুরদাদাকে কতকগুলি দলবল লইয়া নাচিতে গায়িতে দেখিয়াছে। এখন ঠাকুরদা যখন বলিলেন, রাজা আসিয়াছেন এবং তাঁহার সেনাপতি তিনিই, তখন কাঞ্চীরাজ সে কথায় ভুলিল না। আরসকল রাজাই ভয়ে তখনি হার মানিল। কেবল কাঞ্চীরাজ শেষ পর্যন্ত লড়িবার জন্য প্রস্তুত হইল। সে বিদ্রোহী, সে পুরাপুরি অবিশ্বাসী।
সুদর্শনার অভিমান তখনও যায় নাই। কেবল মনটা ভিতরে গলিয়াছে, পাপের মলা বেদনার অশ্রুজলে ধুইয়াছে। তাহার বিশ্বাস রাজা তাহাকে নিশ্চয় ডাকিয়া লইবেন। সে ঠাকুরদার মুখে শুনিল, রাজা যুদ্ধ শেষ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। তাহাকে তিনি উদ্ধার করিলেন, কিন্তু ডাকিয়া লইলেন না।
তার পর শেষ দৃশ্যে পরাজিত কাঞ্চীরাজ, ঠাকুরদাদা, রানী, সুরঙ্গমা সকলেই পথে বাহির হইল। সে পথ যাত্রীর পথ, মুক্তির পথ, বিশ্বের পথ। সকল অভিমান ভাসাইয়া দিয়া সেই পথে রানী বাহির হইতেই রাজাকে যেন সেই পথেই পাইল। তখন তাহার দীনবেশ, তাহার রথ নাই, তাহার কোনো সমারোহ নাই। শেষে রাজার সঙ্গে দেখা মিলিতে রানী বলিল, ‘আমি তোমার চরণের দাসী, আমাকে সেবার অধিকার দাও।’ তাহার আত্মদান এতদিনে সম্পূর্ণ হইল।
রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আমাকে সইতে পারবে?’
রানী বলিল, ‘পারব।... প্রমোদবনে আমার রানীর ঘরে তোমাকে দেখতে চেয়েছিলুম বলেই তোমাকে এমন বিরূপ দেখেছিলুম— সেখানে তোমার দাসের অধম দাসকেও তোমার চেয়ে চোখে সুন্দর ঠেকে। তোমাকে তেমন করে দেখবার তৃষ্ণা আমার একেবারে ঘুচে গেছে— তুমি সুন্দর নও প্রভু, সুন্দর নও, তুমি অনুপম।’
রাজা বলিলেন, ‘তোমারই মধ্যে আমার উপমা আছে।’
সুদর্শনা বলিল, ‘যদি থাকে তো সেও অনুপম। আমার মধ্যে তোমার প্রেম আছে, সেই প্রেমেই তোমার ছায়া পড়ে; সেইখানেই তুমি আপনার রূপ আপনি দেখতে পাও—সে আমার কিছুই নয়, সে তোমার।’
তখন রাজা তাহাকে বলিলেন, ‘অন্ধকারের লীলা এবার শেষ হল। এখন বাইরে চলে এসো, আলোয়।’
নাটকের এইখানে সমাপ্তি।
আমি বলিয়াছি, রূপের সাধনা ও অধ্যাত্মসাধনার দ্বন্দ্বের উপরেই এই নাটকের ভিত্তি। সুদর্শনার ভিতর দিয়াই সেই দ্বন্দ্বের লীলা এ নাটকে আমরা দেখিতেছি। তাহার রূপের জন্য প্রবল তৃষ্ণা। প্রথম অবস্থায় সেই তৃষ্ণা তাহাকে অশুচি অসতী করিল, তাহার প্রমোদ—উদ্যানে আগুন লাগাইয়া দিল, তাহাকে প্রতিষ্ঠাচ্যুত করিয়া সাত রিপুর টানাটানি—হানাহানির মাঝখানে ফেলিয়া দিল, তাহার ভিতরে প্রবল আত্মাভিমান জাগাইল। দ্বিতীয় অবস্থায় অপমান এবং আঘাতের ভিতর দিয়া বাহ্যরূপের কামনা ক্রমে ক্রমে মরিয়া গিয়া ‘সবরূপ—ডোবানো রূপ’, অপরূপ রূপ, রানীর মনটিকে ক্রমশ অধিকার করিয়া তাহাকে মধুর করিল এবং পরিপূর্ণ আত্মদানে যখন তাহার আত্মাভিমানও নিঃশেষে বিলুপ্ত হইল তখনই রাজার সঙ্গে তাহার যথার্থ মিলন ঘটিল। সুদর্শনার পরিণতির ক্রমকে তিন ভাগে ভাগ করা যাইতে পারে। আদিতে, সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা; মধ্যে, সেই আকাঙ্ক্ষাকে পরিতৃপ্ত করিতে গিয়া নৈতিক অবনতি, লালসার অগ্নিকাণ্ড, প্রবৃত্তির বিদ্রোহ, শেষে, দ্বন্দ্বাবসানে মাধুর্যে আত্মদান এবং আত্মাভিমানে জলাঞ্জলি, ঐশ্বর্যের বদলে দৈন্যকে স্বীকার এবং নিখিল জগতের মধ্যে সেবার অধিকার—লাভ। সৌন্দর্য হইতে ধর্মনীতিতে এবং ধর্মনীতি হইতে আধ্যাত্মিকতায় এই—যে উত্তরণ, ইহা এমন ধাপে ধাপে না ঘটিলে আত্মার পক্ষে অন্ধকার হইতে আলোকে আসা কোনোমতেই সম্ভাবনীয় ছিল না। সুদর্শনার ইতিহাস আত্মার এই অন্তরঙ্গ জীবনের ইতিহাস এবং এই অভিনব soul dramaর প্রধান নাট্যবস্তু।
কিন্তু এই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে, যদি রাজার স্বরূপটি কী তাহা না দেখি। সে রাজা কি বেদান্তের অনন্ত অনধিগম্য নিরুপাধি ব্রহ্ম না বৈষ্ণবের সচ্চিদানন্দঘনস্বরূপ ভগবান? এ নাট্যে রাজার স্বরূপ কী তাহা না জানিলে রানীর এই আত্মার ইতিহাসের কোনো মূল্যই থাকে না।
একমাত্র লোক যিনি রাজাকে চেনেন তিনি ঠাকুরদাদা। সুতরাং তাঁহার উপলব্ধির মধ্যে রাজার স্বরূপের কোনো কোনো লক্ষণ ধরা পড়িতে বাধ্য।
একেবারে প্রথম দৃশ্যে যখন রাজার এই নূতন রাজ্যে পথিকের দল উপস্থিত তখন তাহারা প্রহরীকে উৎসবে যাইবার পথ জিজ্ঞাসা করিতেছে। প্রহরী উত্তর করে, ‘এখানে সব রাস্তাই রাস্তা। যে দিক দিয়ে যাবে ঠিক পৌঁছবে।’ এ খোলা রাস্তার দেশ, এ ‘Open Road’, এখানে কোনো মানা বা নিষেধ নাই। রাজাকে কেউ দেখে না, তাই কেউ ভয়ও করে না। রাজা কেন দেখা দেন না তার উত্তরে ঠাকুরদাদা বলিতেছেন, ‘সে যে আমাদের সবাইকেই রাজা করে দিয়েছে।’—
আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে,
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে।
আমরা যা খুশি তাই করি,
তবু তাঁর খুশিতেই চরি,
আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের রাজত্বে—
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে!
This new spirit, forming itself, as it were, upon the restless sea of humanity, will, without doubt, determine the future sense of God and destiny... Society, as a federal union, in which each individual and every form of human association shall find free and full scope for a more abundant life, will be the large figure from which is projected the conception of God in whom we live and move and have our being.
রবীন্দ্রনাথের রাজা এক দিকে সকলকে রাজা করিয়া দিয়া সমস্ত মানুষকে বিধিনিষেধহীন খোলা রাস্তার দেশে বাহির করিয়া দিয়াছেন, তিনি এই ডেমোক্র্যাটিক ভগবান। অন্য দিকে তিনি রানীর বা আত্মার একমাত্র স্বামী, একমাত্র প্রণয়ী। আত্মা তাঁহার ‘দ্বিতীয়’, আত্মা তাঁহার ‘উপমা’, আত্মা তাঁহারই ‘সুদর্শনা’ রূপ। তাই ঠাকুরদা ও তাঁহার দলের ভিতর দিয়া এই রাজার স্বরূপের এক পরিচয়, সুদর্শনা রানীর ভিতর দিয়া এই রাজার স্বরূপের অন্য পরিচয়। এই দুই পরিচয়ই সমান সত্য ও মূল্যবান। তিনি বিশ্বরূপ অথচ তিনি বিশেষরূপ। তিনি সমস্ত অথচ তিনি একক। রবীন্দ্রনাথের রাজার মধ্যে এই দুই স্বরূপের মিলন যেন বাস্তবিক পক্ষে পূর্বে এবং পশ্চিমে রাজার দুই ভিন্ন রকমের স্বরূপবোধের মিলন।
এইজন্য এই নাট্যে ঠাকুরদার প্রয়োজন আছে রানীকে; রানীর প্রয়োজন আছে ঠাকুরদাকে। ঠাকুরদা যতদিন রানীর ভিতর দিয়া রাজাকে দেখেন নাই ততদিন রাজাকে পুরা করিয়া, সমগ্র করিয়া দেখিতে পারেন নাই। আবার রানী রাজার অন্য স্বরূপ কোনোদিনই বুঝিতেন না, যদি রানীকেও পথে বাহির হইতে না হইত। এইরূপে অধ্যাত্মসাধনার প্রয়োজন ছিল রূপের সাধনাকে; রূপের সাধনার প্রয়োজন ছিল অধ্যাত্মসাধনাকে। যে ঠাকুরদাদা বিশ্বের মধ্যে আপনাকে বিলাইয়া দিয়াছেন তিনি জানেন নাই যে, ত্যাগের শেষেও একটি ভোগ আসে, একবার আপনার আধারে বিশ্বকে নিবিড় করিয়া পাওয়া দরকার। সেই আধার রূপের আধার। পক্ষান্তরে, যে রানী বিশ্বকে কেবলই বিশেষ রূপ দিয়া সেই আধারেই ভোগ করিয়াছে সে জানে নাই যে, সর্বস্বত্যাগ ভিন্ন ভোগের পূর্ণতা নাই, আপনাকে বিশ্বের মধ্যে নিঃশেষে বিলাইয়া চুকাইয়া দিলে তবেই ভোগের পূর্ণতা।
কেবল রাজার স্বরূপের মধ্যে একটি দিক পাই না। এ রাজা দুঃখময় ভগবান নন, suffering God নন। জীবাত্মা রানীর মুখ দিয়া রাজাকে যখন জিজ্ঞাসা করিল, ‘তুমি আমাকে কেমন ক’রে দেখতে পাও? কী দেখ?’ রাজা উত্তর করিতেছেন যে, তিনি মানুষকে বিশ্ব—অভিব্যক্তির চরমতম পূর্ণতম রূপ করিয়া দেখিতেছেন। কী আশ্চর্য, কী চমৎকার সেই জায়গাটি! রাজা বলিতেছেন, ‘দেখতে পাই যেন অনন্ত আকাশের অন্ধকার আমার আনন্দের টানে ঘুরতে ঘুরতে কত নক্ষত্রের আলো টেনে নিয়ে এসে একটি জায়গায় রূপ ধরে দাড়িয়েছে। তার মধ্যে কত যুগের ধ্যান, কত আকাশের আবেগ, কত ঋতুর উপহার।’ মানুষের এই সীমাবদ্ধ এতটুকখানি রূপের মধ্যে সমস্ত বিশ্বের রূপ, সমস্ত চন্দ্রসূর্যতারার রূপ যে ভরিয়া আছে এবং অরূপ ভগবান যে সেই রূপে মুগ্ধ, এমন কথা এমন আশ্চর্য ভাষায় পৃথিবীর আর কোন্ মহাকবি বলিয়াছেন আমি জানি না।
অথচ দেখি, সেই রাজা সুদর্শনার পতনের পর একেবারে নিশ্চল, নির্বিকল্প, নির্বিকার। যে সুদর্শনা তাঁহার হৃদয়ে তাঁহার দ্বিতীয়, সে তো দূর নয়, সে তো অন্য নয়। তাহার পাপভোগে কি তাঁহার কোনো ভোগ নাই, তাহার কোনো যন্ত্রণা নাই? রবীন্দ্রনাথের রাজা তো স্বতন্ত্র নির্লিপ্ত সুদূর ভগবান নন। অবশ্য রাজা সে সময়ে গোপনে সুদর্শনার বাতায়নের নীচে প্রেমের বীণা বাজাইয়া সুদর্শনার ভিতর হইতে তাহার মন গলাইবার চেষ্টা করিলেন এবং সাত রিপু বা সাত রাজার টানাটানির অপমান হইতে তাহাকে উদ্ধার করিলেন। কিন্তু জীবের মুক্তির জন্য কোথায় তাঁহার বেদনা, তাঁহার ব্যাকুলতা?
আমার মনে হয়, এক পক্ষে রাজার প্রেম এমনি নির্বিকার নিরুদ্বিগ্ন প্রেম বলিয়া অন্য পক্ষে সুদর্শনার প্রেমও প্রথম অবস্থায় প্রবৃত্তির অপেক্ষাকৃত নীচের স্তর ছাড়াইয়া খুব বেশি উঁচুতে উঠিতে পারে নাই। অভিমানের আগুনে যখন গলিল তখনও কোথায় সুদর্শনার প্রেমের গভীর শান্তি, রহস্যগম্ভীরতা, নিবিড় পরিপূর্ণতা, আত্মবিহ্বল রসপ্লাবন? নাটকের শেষের ভাগে এগুলির আভাস আছে বটে, কিন্তু আরও একটু পূর্ণতর স্ফুটতর প্রকাশ হইলে সুদর্শনার অধ্যাত্মপ্রেমের মাধুর্যপরিপ্লুত ভক্তিবিনম্র রূপটি আরও উজ্জ্বল হইয়া দেখা দিত।
সুদর্শনার পাশাপাশি রাজার দাসী সুরঙ্গমার চিত্রটি কী আশ্চর্য! ঠিক একটি ভক্ত সাধকের চিত্র। তাহার চরিত্রে কোনো জটিলতা নাই। একসময়ে সে পাপের পথে গিয়া ঘা খাইয়া ধর্মের পথে ফিরিয়াছে, তার পর ঐকান্তিক নিষ্ঠাতেই তাহার সমস্ত চরিত্র স্থিতি পাইয়াছে। সে বলিতেছে, রাজার ‘কী অবিচলিত নিষ্ঠুরতা!’ অথচ বলিতেছে, ‘এত অটল এত কঠোর ব’লেই এত নির্ভর, এত ভরসা।’ ক্রমে সেই নিষ্ঠার ভিতর দিয়া সে এক সময়ে অন্ধকার ছাড়িয়া আলোতেই আসিল। অর্থাৎ, আপনার ভিতরকার সাধনার নিভৃত বেষ্টনটি ছাড়াইয়া সমস্ত সংসারের ভিড়ের মধ্যেই আসিল। সুদর্শনা যখন রাজার উপর রাগ করিয়া দূরে চলিল তখন সে বলিল, ‘আমি তোমার সঙ্গে যাব।’ সুদর্শনা তাহাকে বলিল, ‘না, তোকে আমি নিতে পারব না— তোর কাছে থাকলে আমার বড়ো গ্লানি হবে—সে আমি সইতে পারব না।’ সুরঙ্গমা বলিল, ‘মা, তোমার সমস্ত ভালোমন্দ আমি নিজের গায়ে মেখে নিয়েছি।’—
আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী,
আমি সকল দাগে হব দাগী।
সুরঙ্গমা এইখানেই তাহার ভক্তিসাধনার চরম অবস্থায় গিয়া পৌঁছিল। এতদিন সে অন্ধকার ঘরের দাসী ছিল, সে আপনার ভিতরকার সাধনার নিষ্ঠার মধ্যেই স্থির হইয়া থাকিতে চাহিয়াছিল। এখন সে সংসারে আসিয়া সকলের কলঙ্কভাগী, সকলের পাপের দাহের অংশ গ্রহণ করিবার জন্য প্রস্তুত হইল। কারণ, তাহা না হইলে পাপ তো যায় না। পাপ যায় পাপের ভার গ্রহণ করিলে, অর্থাৎ পাপ যায় প্রেমে—কারণ, প্রেমেই ভার লয়, ভার বয়। তাই সুরঙ্গমা গাহিতেছে—
আমি শুচি—আসন টেনে টেনে
বেড়াব না বিধান মেনে,
যে পঙ্কে ঐ চরণ পড়ে
তাহারই ছাপ বক্ষে মাগি।
মানুষের পাপ সম্বন্ধে ঈশ্বরেরও তো ঠিক এই ভাব। নহিলে তাঁহারও প্রেমের মূল্য কী? সুরঙ্গমার এই প্রেম, এই অচল নিষ্ঠাই সুদর্শনাকে ভিতরে ভিতরে গলাইয়াছে। অবশ্য, সুদর্শনার পরিবর্তন তাহার মতো এমন সহজে ঘটিবারই নয়। কারণ, তাহার অভিমানের আয়োজন অত্যন্ত বিচিত্র, তাহার পক্ষে অভিমান ত্যাগ বড়ো কঠিন, তাই তাহার আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ঘটানোও কঠিন; সে যে অন্ধকারকেই চায় না, অর্থাৎ সে সাধকদের মতো অপরূপকে শুধু অন্তরের ধ্যানলোকের মধ্যে দেখিতে চায় না। সুরঙ্গমা বলে, ‘আমার মনে হয়, যেন আমার বুকের ভিতরে পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।... আমার বোঝবার জন্যে কিছুই দেখবার দরকার হয় না।’ সুদর্শনা ঠিক তার উল্টা কথা বলে, ‘যেখানে আমি গাছপালা পশুপাখি মাটিপাথর সমস্ত দেখছি সেইখানেই তোমাকে দেখব।’
সুদর্শনার মতো বিদ্রোহী কাঞ্চীর রাজা; যদিচ তাঁহার টাইপ স্বতন্ত্র। রাজাদের মধ্যে তাঁহারও পরিবর্তন ঘটানো তুল্য কঠিন। কারণ, আর সবাই মূঢ় সংস্কারের বশবর্তী—তাহারা রাজার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ করিলেও যেমনি শোনে যে রাজা আসিয়াছেন অমনি মাথা নিচু করে। কিন্তু কাঞ্চী শেষ পর্যন্ত অটল। এই বিদ্রোহ, আত্মশক্তির উপর ষোলোআনা নির্ভরের জন্য বিদ্রোহ। সুতরাং এ বিদ্রোহ প্রচণ্ড আঘাতে ভাঙে। শেষ দৃশ্যে যখন সকলেই ‘Pilgrim’s Progress’এর মতো রাজার দর্শনলাভের জন্য পথে চলিয়াছে তখন কাঞ্চী বলিতেছে, ‘যখন কিছুতেই তাকে রাজা বলে মানতেই চাই নি তখন কোথা থেকে কালবৈশাখীর মতো এসে এক মুহূর্তে আমার ধ্বজা পতাকা ভেঙে উড়িয়ে ছারখার করে দিলে, আর আজ তার কাছে হার মানবার জন্যে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি―তার আর দেখাই নেই।’
কাঞ্চীরাজার বিদ্রোহ সুদর্শনার চেয়ে ঢের জোরালো। সে রাজার রানীকেই জোর করিয়া পাইবার জন্য চেষ্টা করিয়াছে এবং সেজন্য কত কলকৌশলের অবতারণা করিয়াছে। সে ঈশ্বরকে চায় নাই, ঐশ্বর্যকে চাহিয়াছে। সে ঐশ্বর্যের প্রভু হইয়া ঈশ্বরের জায়গায় নিজেকে বসাইতে চাহিয়াছে। এ বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত লড়ে, তার পরে মরে।
এইবার ঠাকুরদার কথা এবং তাঁর দলের কথা বলিয়া এ নাটকের কথা শেষ করিব। গ্রীক নাটকে কোরামের যে কাজ ছিল, ঠাকুরদা ও তাঁহার দলের ঠিক সেই কাজ এ নাটকে দেখিতে পাই। এ নাটকে লিরিক-অংশের সন্নিবেশ ঐখানে।
রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ লিরিক কবি বলিয়া তাঁহার নাটকের মধ্যে, গল্পের মধ্যে, এমন-কি উপন্যাসের মধ্যেও মূল প্লটের সঙ্গে সঙ্গে একটা ছায়া-প্লট সর্বদাই গাঁথা থাকে—ড্রামার সঙ্গে সঙ্গে একটা গীত-অংশ দেখিতে পাওয়া যায়। রাজা-নাট্যে বসন্ত-উৎসবের অবতারণা এবং ঠাকুরদার দলের অবতারণা এ নাটকের সেই লিরিক-ভাগ এবং বোধ হয় সর্বোৎকৃষ্ট ভাগ।
গ্রীক কোরাসের আসল অর্থ ছিল নৃত্য কিম্বা নৃত্যের রঙ্গমঞ্চ। গ্রীক দেবতাদের উৎসবে নৃত্য একটা বিশেষ ধর্মানুষ্ঠান ছিল। এই নৃত্য হইতেই ক্রমে গ্রীক নাট্যের উৎপত্তি। গোড়ায় নৃত্যে কোনো কথা ছিল না, ক্রমে নাট্যের উৎপত্তি হইতে কোরাসের মুখে কথা জোগাইল। এই কোরাস গ্রীক নাট্যে একটা বিশেষ লিরিক-রস সঞ্চার করিয়াছিল।
গ্রীক ড্রামা হইতে এই কোরাসের ভাব লইয়া যে রবীন্দ্রনাথ রাজা নাট্যে ঠাকুরদার দলটিকে আনিয়াছেন তাহা বলি না। ইহা নাটকের একটি গভীরতর প্রয়োজন হইতে আসিয়াছে। গিলবার্ট্ মারে গ্রীক কোরাসের যে প্রয়োজনের কথা বলিয়াছেন তাহাও এখানে কতকটা খাটে। তিনি বলিয়াছেন:
It (chorus) will translate the particular act into something universal.
কোরাস একটা বিশিষ্ট ঘটনাকে বিশ্বব্যাপক করিয়া তাহার রূপ পরিবর্তিত করিয়া দেয়। কিন্তু তার চেয়ে বড়ো প্রয়োজন এই যে, সকল নাট্যদৃশ্যের পিছনে একটি অদৃশ্য সত্তার অস্তিত্বের প্রয়োজন আছে—সে স্রষ্টা, সে সাক্ষী। নাট্যের সমস্ত ঘাতপ্রতিঘাতের ভিতর দিয়া যে চরম পরিণাম বা climaxটি তৈরি হইয়া উঠিতেছে, সে তাহার সবটাই যেন জানে। তাহার কাছে যেন রঙ্গমঞ্চের সকল দৃশ্য, সম্মুখ ও পশ্চাদ্ভাগ, নেপথ্য পর্যন্ত অনাবৃত। নাটকের সেই বিচিত্র রসকে সে আপনার অখণ্ড দৃষ্টির দ্বারা এক-রস করিয়া লয়। মধ্যে মধ্যে তাই এই কোরাস আসাতে সেই অখণ্ড রসটি, অখণ্ড সুরটি, সকল বিচিত্রতার ভিতরে ভিতরে জাগিতে থাকে বলিয়া নাটক জিনিসটা নাটক থাকিয়াও একটি লিরিকের সম্পূর্ণতা লাভ করে।
ঠাকুরদা একটি মুক্ত আত্মা, সর্বদাই আনন্দিত। সকলের মধ্যে তাঁহার প্রবেশ অত্যন্ত স্বচ্ছ, অবাধ এবং সহজ, কারণ বিশ্বের কাছে তাঁহার আত্মদান একেবারে সম্পূর্ণ হইয়া গিয়াছে।—
হাসিকান্না হীরাপান্না দোলে ভালে,
কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে,
নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে—
তাতা—থৈথৈ তাতা—থৈথৈ তাতা—থৈথৈ।
কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ—
দিবারাত্রি নাচে মুক্তি, নাচে বন্ধ।
সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে—
তাতা—থৈথৈ তাতা—থৈথৈ তাতা—থৈথৈ।
বসন্তোৎসবে এই তাঁর নাচের গান। রাজা নাটকে এই কোরাসের গান।
অথচ, ঠাকুরদা বসন্তোৎসবে আনন্দ করিতেছেন বলিয়া দুঃখের কথা মোটেই বিস্মৃত নন। তাঁহাকে যখন কেহ আসিয়া ছেলের মৃত্যু-সংবাদ দিতেছে এবং রাজাকে সেইজন্য অবিশ্বাস করিতেছে তিনি তখন উত্তর দিলেন, ‘ছেলে তো গেলই, তাই বলে ঝগড়া করে রাজাকেও হারাব?’
সে ব্যক্তি বলিল, ‘ঘরে যাদের অন্ন জোটে না তাদের আবার রাজা কিসের!’
ঠাকুরদাদা বলিলেন, ‘ঠিক বলেছিস ভাই! তা, সেই অন্নরাজাকেই খুঁজে বের কর্। ঘরে বসে হাহাকার করলেই তো তিনি দর্শন দেবেন না।’ তার পর গাহিতেছেন—
বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা রে?
দেখিস নে কি শুকনো পাতা ঝরা ফুলের খেলা রে?
যে ঢেউ ওঠে তারি সুরে
বাজে কি গান সাগর জুড়ে?
যে ঢেউ পড়ে তাহারো সুর জাগছে সারা বেলা রে।
বসন্তে আজ দ্যাখ্ রে তোরা ঝরা ফুলের খেলা রে।
আমার প্রভুর পায়ের তলে
শুধুই কি রে মানিক জ্বলে?
চরণে তাঁর লুটিয়ে কাঁদে লক্ষ মাটির ঢেলা রে।
আমার গুরুর আসন-কাছে
সুবোধ ছেলে কজন আছে—
অবোধজনে কোল দিয়েছেন তাই আমি তাঁর চেলা রে।
উৎসবরাজ দেখেন চেয়ে ঝরা ফুলের খেলা রে।
এ গানের চেয়ে ‘ঝরা ফুলের মেলা’ এবং ‘লক্ষ মাটির ঢেলা’ পৃথিবীর ব্যর্থকাম অবোধজনদের সান্ত্বনার গান কি দুনিয়ায় আর কাহারও দ্বারা কোথাও রচিত হইয়াছে? এতবড়ো ভরসার কথা, পশ্চিমে ডেমোক্র্যাসির জয়গান যিনি করিয়াছেন সেই মহাকবি ওয়াল্ট্ হুইট্ম্যানের একটি কবিতার মধ্যেও নাই।
এখনকার কালের সভ্যতার বসন্ত-উৎসব যে এই ‘লক্ষ মাটির ঢেলা’ জনগণকে লইয়া। এই-যে সবাই চলিয়াছে খোলা রাস্তার দেশে পা ফেলিয়া ফেলিয়া। এ কালের ডেমোক্র্যাটিক স্টেটের ভাগ্যবিধাতা তো কোনো একজন মানুষও নয়, কোনো একদল মানুষও নয়। এই কারণে সকলেরই মনে কত সংশয় হয়, কত ভয় হয়। মনে হয়, ‘সবাই রাজা’ ভালো, না ‘এক রাজা’ ভালো? অথচ বিজ্ঞ অবিজ্ঞ, সুনীতিপরায়ণ দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থপর পরার্থপর, দেশহিতৈষী দেশ বিদ্রোহী, ভালো মন্দ মাঝারি, বাল বৃদ্ধ, নর নারী—এই সমস্ত স্তূপ মিলিত হইয়াই আজ তাহা ‘মানবভাগ্যবিধাতা’ হইয়াছে। এই স্তূপের ভিতরেই ভগবান, এই স্তূপ ভগবানের ভিতরে। ইহার মধ্যে কাহাকে বাদ দিবে, কাহাকেই বা অবজ্ঞা করিবে? বিবেকানন্দের ভাষায়, এ সমস্তই যে ব্রহ্ম, এ সবই যে নারায়ণ।
ঠাকুরদা তাই গাহিতেছেন, ভয় নাই, ভাবনা নাই—
কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ—
দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ।
ঠাকুরদার এই কোরাসের সুর আগাগোড়া সমস্ত নাটকটির ভিতর দিয়া প্রবাহিত। শেষ পর্যন্ত এই সুর।
আমি বলিয়াছি যে ঠাকুরদাদার প্রয়োজন ছিল সুদর্শনাকে, সুদর্শনার প্রয়োজন ছিল ঠাকুরদাদাকে।
সুদর্শনার পাপের মূলই তাহার আত্মাভিমানে। তাহার কাছে তাহার নিজের রূপটাই ছিল বড়ো, সে বিশ্বকে সেই রূপের ছাঁচে ঢালাই করিতে চাহিয়াছিল। সকল আর্টিস্ট্—প্রকৃতিই তাই চায়। সে তো রাজার কাছে কোনোদিনই আপনাকে নিঃশেষে দান করে নাই; সে রাজাকে ও আপনার রূপ দিয়া কল্পনা করিয়া লইয়া তাঁহাকে আপনার বিশেষ ভোগের সামগ্রী করিতে চাহিয়াছিল। আত্মাভিমানেই আত্মাভিমানের ক্ষয়। তাহার প্রবৃত্তির, তাহার ভোগলালসার, আগুন জ্বালাইয়া সে যখন রাজাকে দেখিল, দেখিল তিনি ‘ঝড়ের মেঘের মতো কালো, কূলশূন্য সমুদ্রের মতো কালো— তারই তুফানের উপরে সন্ধ্যার রক্তিমা’। তখন সে যে ‘ননীর মতো কোমল— শিরীষফুলের মতো সুকুমার— প্রজাপতির মতো সুন্দর’ সৌন্দর্যলোকটি, কল্পলোকটি তৈরি করিয়াছিল, তাহা টেনিসনের Palace of Art’এর মতো এক নিমেষে ধুলিসাৎ হইয়া গেল। সৌন্দর্যের মধ্যে এতদিন সে শুধু দেখিয়াছিল মনোহর অংশটুকু, এখন সৌন্দর্যের অস্তরতর প্রচণ্ড রুদ্র অংশকেও সে দেখিতে পাইল।
এই আত্মাভিমানটি জীবের কাছে ভগবানের সকলের চেয়ে বড়ো প্রার্থনার জিনিস। এইটিই পাত্র, যে পাত্রে তিনি অমৃত পান করেন; এইটিই দর্পণ, যে দর্পণে তিনি আপনার রূপ আপনি দেখেন। ঠাকুরদাদার এইটিই ছিল না, সেইজন্য সুদর্শনাকে দেখিবার আগে বসন্ত—উৎসবে হোলির মাতামাতির রাতে তিনি শ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন; তাঁর মন খুঁজিয়া বেড়াইতেছিল—
পুষ্প ফুটে কোন্ কুঞ্জবনে,
কোন্ নিভৃতে রে কোন্ গহনে?
তিনি অনুভব করিতেছিলেন যে—
কাটিল ক্লান্ত বসন্তনিশা
বাহির—অঙ্গন—সঙ্গী—সনে।
কিন্তু—
উৎসবরাজ কোথায় বিরাজে?
কে লয়ে যাবে সে ভবনে—
কোন্ নিভৃতে রে কোন্ গহনে?
সকল ত্যাগের শেষে যে একটি ভোগ আছে, নিজের আধারটি প্রস্তুত না থাকিলে সে ভোগ তো পূর্ণ হয় না। ঠাকুরদাকেও তাই শেষকালে পথে বাহির হইতে হইল, দলবল সব পিছনে পড়িয়া রহিল। সুদর্শনাকেও পথে বাহির হইতে হইল, কিন্তু সে পথে আরও সহযাত্রীর দল সঙ্গে চলিয়াছে। দুজনের দুরকমের মুক্তি।
১৩২৩
- ↑ ‘আধুনিক কাব্যের প্রকৃতি’, প্রবাসী, জ্যৈষ্ঠ ১৩২৩