কারাকাহিনী/প্রথম বার

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

কারাকাহিনী।
[প্রথম বার]

 আমি ও আমার ভারতবাসী ভ্রাতৃবৃন্দ কিছুদিন কারাগারে বাস করিয়া আসিয়াছি। এই অল্পদিনে যে টুকু অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি তাহা অন্যের পক্ষে উপযোগী হইতে পারে, এবং অনেকে সে বিষয়ে জানিবার জন্য ঔৎসুক্য প্রকাশও করিয়াছেন। জেলের মধ্য দিয়া এখনও কতখানি অধিকার আমাদিগকে, ভারতবাসীগণকে, লাভ করিতে হইবে তাহা সকলেরই জানা উচিত—সকলেরই সেখানকার সুখদুঃখের সহিত পরিচয় থাকা উচিত। কারাদশার দুঃখ কতকটা কাল্পনিক, তাহার অধিকাংশেরই কোনও বাস্তব’ ভিত্তি নাই। সকল বিষয়েই যথার্থ জ্ঞান হিতকর বিবেচনায় মদীয় করাকাহিনী লিপিবদ্ধ করিলাম।

 ১৯০৮ সালের ১০ই জানুয়ারী দ্বিপ্রহরে দুই বার আমার জেলে যাওয়ার গুজব উঠে; শেষটায় বাস্তবিকই আমার ডাক পড়িল। আমার সঙ্গীগণকে ও আমাকে দণ্ড দেওয়ার পূর্ব্বে প্রিটোরিয়া (ট্রান্সভাল) হইতে টেলিগ্রাম আসিয়াছিল। তাহাতে লেখা ছিল, যদি ধৃত ভারতবাসিগণ নূতন আইন মানিতে রাজী না হয়, তবে তাহাদের অর্থদণ্ড ও তিনমাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া গেল। জরিমানা অনাদায়ে আরওঁ তিনমাস কারাদণ্ড ভোগ করিতে হইবে। এই কথা শুনিয়া হৃদয়ে ব্যথা পাইলাম। ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে গিয়া অধিক দণ্ড চাহিলাম, কিন্তু পাইলাম না। আমাদের সকলকে দুই মাস বিনাশ্রমে কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হইল। আমার সঙ্গী ছিলেন মিঃ পি কে নাইডু, মিঃ সি এম্‌ পিলাই, মিঃ কড়োয়া, মিঃ ঈষ্টন ও মিঃ ফোরটুন। শেষোক্ত ভদ্রলোক দুইটী চীনদেশীয়। দণ্ডাদেশ দেওয়ার পর আদালতের পিছনে হাজত ঘরে দুই চারি মিনিট আমাকে রাখা হইল। পরে অন্যের অজ্ঞাতে আমাদিগকে একটি গাড়ীতে বসান গেল। গাড়ী ছাড়িয়া দিল, আমার মনেও কত চিন্তাতরঙ্গ উঠিতে লাগিল। আমাকে সুদূরে কোথাও লইয়া গিয়া রাজনৈতিক বন্দিদের মত অবস্থায় ফেলিবে কি? না, অন্য সকল চাইতে দূরে রাখিবে? আমাকে কি জোহান্সবার্গ ছাড়া অন্য কোথাও লইয়া, যাইবে? এইরূপ কত চিন্তা এই সময়ে আমার হৃদয়ে উঠিতেছিল। আমার প্রহরায় যে সৈনিক নিযুক্ত ছিল সে আমার ক্ষমা ভিক্ষা করিতেছিল, তাহাকে বলিলাম—“ক্ষমা ভিক্ষার ত কোনও প্রয়োজনই নাই, আমাকে কারাগারে লইয়া যাওয়া ত তোমার কর্ত্তব্য।”

কারাগার।

 শীঘ্রই জানিতে পারলাম, আমার উদ্বেগের কোনও কারণ নাই। কারণ যেখানে অন্যান্য বন্দীকে লইয়া যাওয়া হইয়াছিল সেইখানে আমাকেও যাইতে হইল। অল্পক্ষণ পরে আরো সঙ্গী আসিয়া জুটিলেন—আমরা সকলে একত্র হইলাম। আমাদের সকলকে ওজন করা হইল, অঙ্গুলির ছাপ লওয়া হইল, তাহার পর উলঙ্গ করিয়া জেলের পোষাক দেওয়া হইল। আমরা পরিধেয় পাইলাম—কালরঙ্গের প্যান্ট, সার্ট, সার্টের উপরে পরিবার একটি যাত্রাবরণী (যাহাকে ইংরাজীতে বলে Japper), টুপী ও মোজা। পুরাণা কাপড় চোপড় রাখিবার জন্য এক একটি থলিও পাইলাম। এইবার আমাদিগকে নিজের নিজের কামরায় পাঠান হইল। তাহার আগে প্রত্যেককে আট আউন্স রুটীর টুকরা দিল। আমাদিগকে লইয়া যাওয়া হইল কিন্তু আফ্রিকার আদিম অধিবাসী কাফ্রিদের জেলে।

কাফ্রি ও ভারতবাসী।

 সেখানে আমাদের কাপড়ের উপর “N” ছাপ দেওয়া হইল, অর্থাৎ আমরা নেটীভ পঙ্‌ক্তিতে থাকিয়া গেলাম। আমি সকল দুঃখ সহিতেই প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমাদের অদৃষ্টে যে এত দুর্গতি আছে তাহা জানিতাম না। শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে রাখিল না, তাহাতে তেমন বিচলিত হই নাই, কিন্তু কাফ্রিদের সহিত থাকা বরদাস্ত করিতে পারিলাম না। ইহা দেখিয়া আমার মনে হইল, সত্যাগ্রহ সংগ্রাম যেরূপ মহৎ তেমনি ঠিক সময়ে তাহার আরম্ভ হইয়াছিল। তখন ইহাও প্রমাণ হইয়া গেল, যে আইন প্রণয়ন করা হইয়াছিল তাহা ভারতবাসীকে বিশেষভাবে লাঞ্ছিত করিবার মারাত্মক উপায় মাত্র। আমাদিগকে যে কাফ্রিদের সহিত একত্রে রাখা হইয়াছিল তাহাতে ভালই হইল। তাহাদের জীবন যাত্রার পদ্ধতি, রীতিনীতি ইত্যাদি জানিবার একটী প্রকৃষ্ট সুযোগ পাওয়া গেল। তাহা ছাড়া এ কথাও আমি কোনও মতেই সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে পারি না যে তাহাদের সহিত একত্রবাসে আমাদের নাকি অপমান হয়। তবুও সাধারণ রীতি অনুযায়ী বলিতে হয়, ভারতীয়গণকৈ পৃথক্‌ রাখাই উচিত। আমাদের কারাকক্ষের পার্শ্বেই কাফ্রিদের স্থান। তাহারা সেখানে ও বাহিরের মাঠে কান্নাকাটি করিতে থাকিত। আমরা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিলাম, অর্থাৎ আমাদের দ্বারা কোনও প্রকার কাজ করাইয়া লওয়া হইত না, তাই আমাদের আলাদা আলাদা রাখা হইয়াছিল। নতুবা আমাদেরও একসঙ্গে ঐ কুঠরীতেই ঠাসা হইত। সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত ভারতবাসীকে কাফ্রিদের সহিত একত্র রাখা হইত।

 ইহাতে বাস্তবিক কোনও অন্যায় হয় কি না সে বিচার ছাড়িয়া দিলেও একথা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে এরূপ ব্যবস্থা অন্যায়। কাফ্রিরা ছিল অধিকাংশই বন্য; জেলের কাফ্রিদের কথা ত’ বলা বাহুল্য। তাহারা অতিশয় কলহপ্রিয় ও অপরিষ্কার ছিল, এবং বন্য পশুর ন্যায় থাকিত। এক একটি কুঠরীতে প্রায় ৫০।৬০ জনকে ঠাসা হইত। কখনও কখনও তাহারা ঝগড়া চীৎকার করিত, কখনও বা নিজেদের মধ্যে মারামারি করিত। এই অবস্থার মধ্যে পড়িয়া বেচারী ভারতবাসীর কিরূপ দুর্দ্দশা হইত, পাঠকগণ তাহা সহজেই অনুমান করিতে পারেন।

ভারতীয় অন্যান্য বন্দীগণ।

 সমস্ত জেলে আমরা ছাড়া আরও দুই চারি জন ভারতীয় বন্দী ছিলেন। তাঁহাদিগকে কাফ্রিদের সহিত একত্রে বন্ধ থাকিতে হইত। তবুও দেখিয়া ছিলাম, তাঁহারা প্রসন্নচিত্ত ছিলেন, এবং জেলের বাহিরের অর্থাৎ জেলে আসিবার আগের চেয়ে তাঁহাদের স্বাস্থ্য ভাল হইয়াছিল। তাঁহাদের উপর প্রধান জেলরের কৃপাদৃষ্টি পড়িয়াছিল। তাঁহারা কর্ম্মক্ষম ও দক্ষ ছিলেন, তাই তাঁহাদের জেলের ভিতরেই কাজ দেওয়া হইত। যেমন, ষ্টোরে, ‘মেশিন’ দেখা ইত্যাদি। এ সব কাজে তাঁহাদের অভ্যাস ও আগ্রহ ছিল। তাঁহারা আমাদের অনেক সহায়তা করিয়াছিলেন।

আবাসস্থান।

 থাকিবার জন্য আমাকে একটি কুঠরী দেওয়া হইয়াছিল। সেখানে তেরজন লোকের থাকিবার স্থান ছিল। ঘরের উপর লেখা ছিল, ‘ঋণদায়ে দণ্ডিত কৃষ্ণবর্ণ কয়েদী।” সম্ভবতঃ সেখানে দেওয়ানী মোকর্দ্দমায় দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদীদের রাখা হইত। সেখানে আলোক ও বায়ু চলাচলের জন্য দুইটী ছোট গবাক্ষ ছিল, তাহাতে আবার লোহার শক্ত গরাদ দেওয়া। কক্ষে যে বাতাস আসিত, আমার মতে তাহা পর্য্যাপ্ত নহে। কক্ষের গাত্র টিন দিয়া ঢাকা ছিল, তাহাতে আধ ইঞ্চি করিয়া তিনটি ছিদ্র। জেলার অজ্ঞাতে আসিয়া তাহার ভিতর দিয়া দেখিতেন, কয়েদী কি করিতেছে। আমার কক্ষের সংলগ্ন কক্ষে কাফ্রি কয়েদী থাকিত। তাহার সহিত একত্রে দণ্ডিত কাফ্রি, চীনী ও ‘কেপখোয়’ কয়েদী ছিল। যাহাতে তাহারা পালাইয়া না যায় সেজন্য তাহাদের সকলকে একত্রে রাখা হইত।

 দিনে বেড়াইবার জন্য আমাদের একটী ছোট বারাণ্ডা ছিল। তাহার চারিপাশে প্রাচীর। বারাণ্ডা এতই স্বল্প পরিসর যে তাহাতে চলাফেরা পর্য্যন্ত কষ্টকর। রাজ্যের সীমান্তদেশবাসী কয়েদীদের প্রতি আদেশ ছিল, তাহারা বিনা অনুমতিতে বারাণ্ডার বাহিরে যাইবে না। স্নান ও পায়খানার ব্যবস্থাও ছিল এই বারাণ্ডায়। স্নানের জলের জন্য প্রস্তর নির্ম্মিত দুইটী বড় চৌবাচ্চা, স্নানের জন্য দুইটী স্থান, দুইটী পায়খানা এবং প্রস্রাব করিবার দুইটী স্থানও এই খানে। সেখানে আব্রুর কোনও ব্যবস্থা ছিল না। জেলের নিয়মেও ছিল যে পায়খানা এইরূপ হওয়া চাই যাহাতে কয়েদীরা আলাদা থাকিতে না পারে। সুতরাং দুই তিন জন কয়েদীকে মলত্যাগের জন্য একই লাইনে বসিতে হইত। স্নান ঘরেরও এই ব্যবস্থা। প্রস্রাব করিবার স্থানটি ত’ উন্মুক্ত জায়গায়। প্রথম প্রথম এগুলি আমাদের অসহ্য মনে হইত, অনেকে বড় ঘৃণা বোধ করিত, তাহদের কষ্ট ও হইত। তথাপি, গভীর ভাবে চিন্তা করিলে মনে হয়, কারাগারে ইহা ছাড়া অন্য কোনও ব্যবস্থা সম্ভবে না এবং এই নিয়ম পালনে সাহায্য করায় অন্যায় কিছুই নাই। সুতরাং ধৈর্য্য সহকারে অভ্যাস পরিবর্ত্তন করিয়া ফেলাই সুবিধা, এবং ইহাতে অস্থির হইয়া পড়ার বা ঘৃণা করার কোনও প্রয়োজন নাই।

 কুঠরীর ভিতরে শয়নের জন্য তিন ইঞ্চি উঁচু চারিপায়া কাঠের চৌকি দেওয়া হইত। প্রত্যেক কয়েদীকে, দুইখানি কম্বল, একটি ছোট বালিশ, এবং পাতিবার জন্য একটি ‘চাটাই’ দেওয়া হইল। কখনও বা তিনখানি কম্বল মিলিত,—তবে তাহা অনুগ্রহ হইলে। দেখা যাইত, এইরূপ শক্ত বিছানা দেখিয়া কেহ কেহ অস্থির হইয়া পড়িতেন। সাধারণতঃ যাঁহাদের নরম বিছানায় শোয়া অভ্যাস, তাঁহাদের পক্ষে এইরূপ শয্যা কষ্টকর। আয়ুর্ব্বেদে কিন্তু শক্ত শয্যাই ভাল বলা হইয়াছে। অতএব গৃহে যদি শক্ত শয্যায় শয়ন করার অভ্যাস থাকে তুবে আর ‘কারাশয্যা কষ্টদায়ক হইয়া উঠে না। ঘরে সর্ব্বদা এক ঘড়া জল ও রাত্রে প্রস্রাব করিবার জন্য একটু জল আলাদা রাখা হইত, কারণ রাত্রে কোনও কয়েদীই বাইরে যাইতে পারিত না। প্রত্যেক লোকের প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প একটু সাবান, মোটা সুতার একখানা তোয়ালে এবং একটী কাঠের চামচও দেওয়া হইত।

পরিষ্করণ।

 জেলে পরিষ্কার করাটা খুব ভাল হইত। কুঠুরীর মেঝে সর্ব্বদা ফিনাইল দিয়া ধোয়া হইত, এবং প্রত্যহই চুণ ছড়াইয়া দেওয়া হইত। সর্ব্বদাই মনে হইত—যেন সব নূতন। স্নানঘর ও পায়খানাও সাবান ও ফিনাইল দিয়া নিত্য পরিষ্কার করিত। এই পরিষ্কার করার কাজটা আমার নিজের খুব ভাল লাগিতা। যদি কোনও সত্যাগ্রহী কয়েদীর পেটের অসুখ হইতে, তবে আমি নিজে ফিনাইল দিয়া পায়খানা সাফ করিতাম। পায়খানা পরিষ্কার করিবার জন্য প্রত্যহ নয়টার সময় কত চীনী কয়েদী অসিত। ইহার পরে দিনে অন্য কোনও সময়ে পায়খানা পরিষ্কার করার প্রয়োজন হইলে নিজে হাতে করিতে হইত। প্রস্তর নির্ম্মিত চৌবাচ্চা সর্ব্বদা ধোওয়া হইত। শুধু একটা মুস্কিল ছিল, কয়েদীদের কম্বল ও বালিশ বদলাইয়া যাওয়ার খুব সম্ভাবনা ছিল, কারণ কম্বল বালিশ প্রত্যহ রৌদ্রে দিতে হইত। কয়েদীরা বোধ হয় এ নিয়ম প্রায়ই মানিয়া চলিত। জেলের বারাণ্ডাটি প্রত্যহ দুইবার পরিষ্কার করিয়া দেওয়া হইত।


কয়েকটী নিয়ম।

 জেলের কয়েকটী নিয়ম সকলেরই জানা উচিত। সন্ধ্যা ৫॥ টার সময় সমস্ত কয়েদীকে বন্ধ করিয়া রাখা হয়। রাত্রি ৮টা পর্য্যন্ত সকলে কথাবার্ত্তা বলিতে বা পড়াশুনা করিতে পারে। ৮ টার সময় সকলকেই শুইতে হয়। কথা বলিলে জেলের নিয়ম ভঙ্গ করা হয়। কাফ্রি কয়েদীরা এ নিয়ম যথাযথ পালন করে না। তাই রাত্রে তাহাদিগকে চুপ করাইবার জন্য প্রহরী ‘ঠুলা’, ‘ঠুলা’ বলিয়া চীৎকার করিয়া মাটিতে লাঠী ঠুকিত। কয়েদীদের ধূম পান নিষিদ্ধ ছিল। এই নিয়ম খুব কঠোরতার সহিত রাখিতে হইত। কিন্তু আমি দেখিতাম ধূম পানে অভ্যন্ত কয়েদীগণ লুকাইয়া এ নিয়ম ভঙ্গ করিত। সকালে সাড়ে পাঁচটার সময় শয্যা ত্যাগের ঘন্ট। পড়িত। এই সময়ে প্রত্যেক কয়েদীকে শয্যা ত্যাগ করিয়া হাত মুখ ধুইয়া বিছানা গুটাইয়া লইতে হইত। তারপর ছয়টার সময় কুঠুরীর দ্বার খোলা। এই সময়ে সকলে গুটান বিছানার পাশে আসিয়া কায়দা মত দাঁড়াইত। তখন রক্ষক আসিয়া সকল কয়েদীকে গুণতি করিতেন। এইরূপে কুঠুরী বন্ধ করিবার সময়েও (সন্ধ্যাকালে) প্রত্যেক কয়েদীকে বিছানার পাশে আসিয়া দাঁড়াইতে হইত। জেলের দ্রব্য ছাড়া বাহিরের কোন দ্রব্যই কয়েদীর কাছে থাকা নিয়ম বিরদ্ধ। কাপড় ছাড়া অন্য কোন জিনিসই গবর্ণরের অনুমতি ব্যতীত সঙ্গে রাখা নিষিদ্ধ ছিল। সকল কয়েদীরই খাটের উপর একটী ছোট পকেট সেলাই করা থাকিত। তাহাতে রাখা হইত কায়েদীর টিকিট। টিকিটে কয়েদীর নম্বর, দণ্ডের বর্ণনা, নাম ধাম ইত্যাদি লেখা থাকিত। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দিনে কুঠুরীতে থাকিবার অনুমতি ছিল না। যাহাদের কাজে যাইতে হইত তাহাদের ত’ কুঠুরীতে থাকা চলিতই না, এমন কি, বিনা শ্রমে দণ্ডিত নিষ্কর্ম্মা কয়েদীদের ও থাকিতে দেওয়া হইত না। তাহাদের বারাণ্ডায় থাকিতে হইত। আমার সুবিধার জন্য গবর্ণর একটী টেবিল ও দুইটী বেঞ্চ রাখিবার “অনুমতি দিয়াছিলেন; তাহাতে আমার অনেক কষ্টের লাঘব হইয়াছিল।

 নিয়ম ছিল যে দুই মাসের দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদীদের কেশ ও শ্মশ্রু মুণ্ডন করিতে হইবে। ভারতবাসীগণের প্রতি এই নিয়ম বিশেষ কঠোরতার সহিত চালান হইত না। যে আপত্তি করিত তাহার শ্মশ্রু রাখিয়া দেওয়া হইত। এ বিষয়ে একটী মজার কথা শুনুন। আমি নিজে জানিতাম যে কয়েদীদের চুল কাটা হইত; আরও শুনিয়াছিলাম যে কয়েদীদের আরামের জন্যই এরূপ হইত। আমি ত’ এ নিয়ম পালনে অভ্যস্ত ছিলাম। আমার কাছে এ নিয়ম উপযোগী বলিয়াই মনে হয়। জেলে চিরুণী ইত্যাদি চুল পরিস্কার রাখিবার উপকরণ ত পাওয়া যাইত না, আর চুল পরিষ্কার না রাখিতে পারিলে ফুসকুড়ি ইত্যাদি হইবার সম্ভাবনা ছিল। আবার গ্রীষ্মের দিনে চুলের বোঝা বহ। অসহ্য হইয়া পড়িত। কয়েদীদের আয়না জুটিত না। শ্মশ্রু ময়লা ও দুর্গন্ধ হইবার ও সম্ভাবনা ছিল। খাইবার সমস্ত রুমালও পাওয়া যাইত না। কাঠের চামচ দিয়া খাইতে বিরক্ত বোধ হইত। শ্মশ্রু বড় হইলে তাহার মধ্যে উচ্ছিষ্ট আট্‌কাইয়া থাকিত। আমার মনে হইত, জেলের সকল অভিজ্ঞতাই লাভ করা উচিত। তাই প্রধান দারোগাকে বলিলাম আমার চুল ও শ্মশ্রু কাটাইয়া দেওয়া হোক্‌, তিনি উত্তর দিলেন এ বিষয়ে গবর্ণরের কড়া নিবেধ আছে। আমি বলিলাম— আমি জানি যে গবর্ণর আমাকে এ বিষয়ে বাধ্য করিতে পারেন না। কিন্তু আমি তা নিজেই রাজি হইয়া চুল কাটাইতে চাই।” তাহার উত্তরে তিনি আমায় গবর্ণরের নিকট আবেদন করিতে বলিলেন। পরদিন গভর্ণর অনুমতি দিলেন কিন্তু বলিলেন- 'দুই মাসের এই ত’ সবে দুই দিন হইয়াছে, এরই মধ্যে তোমার চুল কাটানর,অধিকার আমার নাই। আমি বলিলাম —'তাহা আমি জানি। কিন্তু আমি নিজের আরামের জন্য স্বেচ্ছায় চুল কাটাইতে চাই'। তখন তিনি হাসিয়া নিষেধ প্রত্যাহার করিয়া লইলেন। পরে আমি জানিতে পারিয়ছিলাম যে, আমার অনুরোধের মধ্যে কোন রহস্য ছিল। কিনা সে বিষয়ে গবর্ণর সাহেবের অনেকখানি ভয় ও সন্দেহ হইয়াছিল। আমার শির মুণ্ডন করিলে ও শ্মশ্রু কাটলে কোন জোর জবরদস্তীর অভিযোগের গোলমাল আমা হইতে উঠিবে না ত? কিন্তু আমি বার বার বলিয়াছিলাম যে তাহ উঠিবে না, এমন কি ইহাও বলিয়াছিলাম যে আমি লিখিয়া দিতেছি যে আমি স্বেচ্ছায় চুল কাটিতেছি। তখন গবর্ণরের সন্দেহ দূর হয় এবং তিনি দারোগার প্রতি মৌখিক আদেশ দেন যে আমাকে যেন একটী কঁচি দেওয়া হয়। আমার সঙ্গী কয়েদী মিঃ পি, কে, নায়ডু চুল কাটিতে জানিতেন। আমিও নিজেও অল্প স্বল্প কিছু জানিতাম। আমাকে, চুল ও শ্মশ্রু কাটিতে দেখিয়া ও তাঁহার কারণ বুঝিতে পারিয়া অন্যান্য সকলেও তাঁহাই করিল। মিঃ নায়ডু ও আমি প্রত্যহ প্রায় দু’ ঘণ্টা করিয়া ভারতবাসিগণের চুল কাটিতাম। আমার ধারণা, ইহাতে আরাম ও সুবিধা দুইই আছে। এ ভাবে কয়েদীদের চেহারাও দেখিতে ভাল হইত। জেলে ক্ষুর রাখা একেবারে কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ছিল, শুধু কঁচি রাখা চলিত।

পর্য্যবেক্ষণ।

 কয়েদীদের পর্যবেক্ষণের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন কর্ম্মচারী আসিতেন, তীহাদের আসিবার সময় সকল কয়েদীকে এক পংক্তিতে দাড়াইতে হইত এবং কর্ম্ম চারী আসিলে টুপি উত্তোলন করিয়া অভিবাদন করিতে হইত। সকলেরই নিকট ইংরাজী টুপি ছিল সুতরাং সেগুলি উত্তোলন করার অসুবিধা বিশেষ কিছু ছিল না। টুপি তোলা শুধু যে কায়দামাফিক তা’ নয়, উচিত ও বটে। যখন কোন পর্যবেক্ষক আসিতেন তখন “ফল্ ইন্” (fall in) করিবার আদেশ দেওয়া হইত। আমার কানে এই শব্দটী একান্ত পরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। এই শব্দের অর্থ—ঠিক ভাবে এক পংক্তিতে দাঁড়াইয়া থাক। প্রতিদিন চার পাঁচ বার এরূপ হইত। একটী কর্মচারী— তাঁহাকে নায়েব দারোগা বলা হইত —একটু জবরদস্ত ছিলেন; তাই ভারতবাসীগণ তাঁহার নাম রাখিয়াছিলেন, জেনারেল স্মাট‍্স্......। প্রভাতে তিনি কতদিন খুব সকালে নীরবে আসিয়া পড়িতেন, মাঝে মাঝে সন্ধ্যার সময়ও একবার ঘুরিয়া যাইতেন। সকালে সাড়ে নয়টার সময় ডাক্তার আসিতেন, তিনি খুব দয়ালু ও ভাল লোক ছিলেন। সর্ব্বদাই খুব সহৃদয় ভাবে কুশল প্রশ্ন করিতেন। জেলের নিয়মানুযায়ী প্রথম দিন প্রত্যেক কয়েদীকে একেবারে উলঙ্গ হইয়া ডাক্তারকে আপনার শরীর দেখাইতে হইত, কিন্তু তিনি আমাদের প্রতি এ নিয়ম চালাইলেন না। যখন ভারতীয় কয়েদির সংখ্যা বেশী হইয়া উঠিল তখন বলিলেন যে যদি কাহারও চুলকানি বা পাঁচড়া ইত্যাদি হইয়া থাকে তবে তাঁহাকে যেন জানান হয়, তাহা হইলে তিনি তাহাকে একান্তে লইয়া গিয়া দেখিবেন।

 সাড়ে দশটা এগারটার সময় গভর্ণর ও প্রধান দারোগা আসিতেন। গভর্ণর খুব উপযুক্ত ন্যায়শীল ও শান্ত স্বভাব ছিলেন। তিনি সর্ব্বদাই এক প্রশ্ন করিতেন—তোমরা সকলে ভাল আছ তো? তোমাদের কোন্ জিনিষ দরকার? তোমাদের কোন নালিশ ত নাই? যদি কেহ কোন বিষয় অভিযোগ করিত বা কিছু চাইত, তবে খুব মনোযোগ সহকারে শুনিতেন এবং যতদূর সম্ভব তাহার ইচ্ছা পূর্ণ করিতেন। যে অভিযোগ তিনি সত্য বলিয়া মনে করিতেন তাহা পূর্ণ ভাবে দূর করিবার ব্যবস্থা করিতেন। কখনও বা ডেপুটি গভর্ণর ও আসিতেন, তিনিও বেশ সদাশয় ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু সকলের চেয়ে ভাল, সুশীল ও মিশুক ছিলেন আমাদের প্রধান দারোগা। তিনি নিজে খুব ধার্ম্মিক ছিলেন। তিনি আমাদের প্রতি খুব ভাল ও ভদ্র ব্যবহার করিতেন। তাই সকলেই মুক্ত কণ্ঠে তাহার গুণ গান করিত। কয়েদীরা যাহাতে তাহাদের অধিকার পুরাপুরি ভোগ করে সেদিকে তাঁহার সর্ব্বদাই দৃষ্টি ছিল এবং তাহাদের ছোট খাট অপরাধ তিনি মার্জ্জনা করিতেন। আমাদের নিরপরাধ বিবেচনা করিয়া আমাদের যথেষ্ট স্নেহ করিতেন। নিজের সহানুভূতি প্রকাশ করিবার জন্য তিনি কতবার আমার নিকটে আসিয়া কথাবার্ত্তা বলিয়া যাইতেন।

ভারতবাসী কয়েদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি

 বলিয়াছি যে প্রথমে আমরা পাঁচজন মাত্র সত্যাগ্রহী কয়েদী ছিলাম। ১৪ই জানুয়ারী মঙ্গলবার প্রধান পিকেট মিঃ থম্বী নায়ডু ও চায়নীজ অ্যাসোশিয়নের অধ্যক্ষ মিঃ কবীন জেলে আসিলেন। তাঁহাদের দেখিয়া সকলেই প্রীত হইল। ১৮ই জানুয়ারী আরও ১৪ জন আসিলেন। তাঁহাদের মধ্যে সমুন্দর খাঁও ছিলেন। তাঁহার দুই মাস কারাবাসের দণ্ড হইয়াছিল। বাকি ১৩০ জনের মধ্যে মান্দ্রাজী, কানমীয়া ও গুজরাতী হিন্দু ছিলেন। তাঁহারা বিনা লাইসেন্সে ফেরী করার অপরাধে ধৃত হইয়াছিলেন। তাঁহাদের ২ পাউণ্ড জরিমানা হইয়াছিল, এবং জরিমানা দাখিল না করিলে ১৪ দিন জেলের আদেশ হইবে এই নিয়ম ছিল। তাঁহারা সাহস করিয়া জরিমানা না দিয়া জেলে আসিলেন। ২১শে জানুয়ারী মঙ্গলবার আরও ৭৬ জন আসিলেন। তাঁহাদেরই মধ্যে নবাবখাঁও ছিলেন। তাঁহার প্রতি দুইমাস জেলের আদেশ হইয়াছিল। অন্যান্য সকলের ২পাউণ্ড জরিমানা বা ১৪ দিন কারাদণ্ডের আদেশ হইয়াছিল। তাদের মধ্যে কানমিয়া ও মাদ্রাজীও ছিলেন। ২২শে জানুয়ারী বুধবার আরও ৩৫ জন আসিয়া পড়িলেন। ২৩ শে ৩ জন, ২৪ শে ১ জন, ২৫ শে ২ জন, ২৮ শে সকালে ৬ জন ও সেই দিন সন্ধ্যার সময় আরও ৪ জন আসিলেন। ২৯ শে আরও চারজন কানমীয়া আসিয়া পড়িলেন অর্থাৎ ২৯ শে জানুয়ারী পর্যন্ত সর্ব্বশুদ্ধ ১৫৫ জন সত্যাগ্রহী কয়েদী ওখানে আসিয়া জুটিয়া ছিলেন। ৩০ শে জানুয়ারী বৃহস্পতিবার আমাকে প্রিটোরিয়ায় (ট্রান্সভালে) লইয়া যাওয়া হইল, আমার মনে হয় সেদিনও ৫৬ জন কয়েদী আসিয়া ছিলেন।

আহার।

 ভোজনের সমস্যা এমনি যে সকলেরই এ বিষয়ে বারবার চিন্তা করা উচিত। কিন্তু কয়েদিদের সম্বন্ধে বিশেষ করিয়া এবিষয়ে মনোযোগ দেওয়া উচিত। তাঁহাদের মধ্যে অধিকাংশেরই হয়ত জল খাওয়া অভ্যাস। খাওয়া সম্বন্ধে এই নিয়ম আছে বে জেলের ভিতর যাহা কিছু পাওয়া যায়, তাহাই খাইতে হইবে। বাহূিরের কিছু চলিবে না। সৈনিকদের যে খাদ্য মেলে, তাহাই খাইতে হয়। কিন্তু কয়েদী ও সৈনিকদের অবস্থায় যথেষ্ট পার্থক্য। সৈনিকদিগের ত তাহাদের ভ্রাতৃবন্ধুরা জিনিষ পাঠাইতে পারে এবং তাহা তাহারা গ্রহণ করিতেও পারে, সে সম্বন্ধে কোন নিষেধ নাই। কিন্তু কয়েদিরা অন্য কিছু লইতেই পারে না, কারণ সে বিষয়ে বিশেষ নিষেধ আছে। জেলে একটা প্রধান অসুবিধা-খাওয়ার কষ্ট। কথাবার্ত্তায় প্রায়ই জেলের অধ্যক্ষ বলেন, জেলে আবার মুখের স্বাদ কি? সুস্বাদু দ্রব্য জেলে দেওয়া হয় না। যখন জেলের ডাক্তারের সহিত আমার কথাবার্ত্তার সুযোগ ঘটিল, তখন আমি তাঁহাকে বলিলাম, রুটির সহিত চা অথবা ঘি বা অন্য কিছু পাওয়া উচিত। তখন উনি বলিলেন “তুমি ত ইহা মুখে স্বাদের জন্য চাহিতেছ, জেলে তাহা পাওয়া যাইবে না”।

 এইবার জেলের খাদ্যের কথা। জেলের নিয়ম অনুযায়ী ভারতীয় কয়েদিদের প্রথম সপ্তাহে নিম্নলিখিত খাদ্য দেওয়া হইত।

 সকালে—বার আউন্স ভুট্টার আটার লপ‍্সি, —ঘি বা চিনি না দেওয়া।

 দ্বিপ্রহরে—বার আউন্স চাউল ও এক আউন্স ঘি।

 সন্ধ্যায়—চার দিন ১২ আউন্স ভুট্টার আটার লপ‍্সি, ও তিন দিন ১২ আউন্স ভাজা চাল এবং

 নুন, কাফ্রিদের যে খাদ্য দেওয়া হইত, তাহার উপর এই ব্যবস্থা করা হইয়াছিল।

 শুধু এই প্রভেদ যে তাহাদের ধূলা মিশ্রিত ভুট্টা ও চর্ব্বি দেওয়া হইত,কিন্তু

 ভারতবাসীব তাহার পরিবর্ত্তে চাউল পাইত।

 দ্বিতীয় সপ্তাহে ও তাহার পরে সর্ব্বদাই ভুট্টার আটার সহিত দুই দিন সিদ্ধ আলু ও দুই দিন অন্য কিছু সব‍্জী কোহড়া প্রভৃতি দেওয়া হইত। যাহারা মাংস খাইত, দ্বিতীয় সপ্তাহ হইতে প্রতি শনিবার তাহারা তরকারির সহিত মাংস পাইত।

 যাঁহারা প্রথমে আসিয়াছিলেন তাহারা স্থির নিশ্চয় করিয়াছিলেন যে তাঁহারা সরকারের কাছে কোন প্রকার সুবিধা প্রার্থনা করিবেন না। যে খাওয়া পাওয়া যায় তাহতেই চালাইবেন। সকল দিক বিবেচনা করিলে পূর্ব্বোক্ত খাদ্য, ভারতবাসীর উপযুক্ত, এটা বলা যায় না। কাফ্রিদের ত ভুট্টা নিত্য খাদ্য ছিল, সুতরাং ইহাতে তাহাদের খুবই সুবিধা হইতে পারিত এবং তাহা খাইয়া তাহারা জেলে বেশ হৃষ্টপুষ্টই হইত। কিন্তু চাউল ছাড়া আর কিছুই ভারতবাসীর উপযোগী মনে হয় না। অতি অল্প ভারতবাসীই ভুট্টার আটা খায়। শুধু ভুট্টার আটা ও “বীন্” খাওয়ার অভ্যাস ত আমাদের মোটেই ছিল না, তাও আবার তরকারি না দিয়া। তাহা ছাড়া যে ভাবে তাহারা খাবার তৈরী করিত, তাহাও ভারতবাসীর পছন্দ হইত না। তাহারা ত তরকারি ধুইত না, আর কোন মশলাও দিত না। এমন কি, শ্বেতাঙ্গদের যে তরকারি তৈয়ারি হইত, তাহারই খোলা দিয়া কাফ্রিদের তরকারি হইত। লবণ ছাড়া তাহাতে আর কিছু দেওয়া হইত না, চিনির কথা ত ছাড়িয়াই দিন।

 সুতরাং খাওয়ার ব্যাপারটা সকলকেই কষ্ট দিতে লাগিল, কিন্তু আমরা স্থির করিয়াছিলাম যে আমরা, সত্যাগ্রহীরা, জেলের অধ্যক্ষদের কাছে কোন মতেই হাত জোড় করিব না। তাই এ বিষয়ে আমরা কোন প্রকার অনুগ্রহ ভিক্ষা করিলাম না। পূর্বোক্ত খাদ্যেই সন্তুষ্ট রহিলাম।

 গভর্ণর আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করিলে উত্তরে বলিলাম, “খাদ্য ভাল নয়, কিন্তু গভর্ণমেন্টের কাছে আমরা কোন প্রকার সুবিধা বা কৃপা ভিক্ষা করি না। সরকার যদি খাদ্যের ব্যবস্থা ভাল করেন ত ভাল কথা, না হইলে এই নিয়ম অনুযায়ী যাহা জুটিবে তাহাই আমরা খাইব”।

 কিন্তু এই মনোভাব বেশী দিন টিকিল না। যখন অন্যান্য সকলে আসিলেন তখন আমরা মনে করিলাম, খাওয়া দাওয়ার যে কষ্ট, আমাদের সঙ্গী হইয়া ইঁহারা সেই কষ্ট সহ্য করিবেন, তাহা ভাল নয়। জেলে যে আসিতে হইয়াছে ইহাই তাঁহাদের পক্ষে যথেষ্ট। ইঁহাদের জন্য সরকারের নিকট স্বতন্ত্র ব্যবস্থা চাওয়াই উচিত। এই বিবেচনায় গভর্ণরের সহিত এ বিষয়ে কথাবার্তা চালাইলাম। তাঁহাকে বলিলাম, আমাদের যেমন তেমন খাবার হইলেই চলে, কিন্তু যাঁহারা পরে আসিয়াছেন তাঁহারা এরূপ করিতে পারিবেন না। গভর্ণর বিবেচনা করিয়া উত্তর দিলেন যে, শুধু ধর্ম্ম রক্ষার জন্য যদি অন্যত্র রন্ধনের ব্যবস্থা করিতে চাহেন ত করিতে পারেন; কিন্তু খাদ্য যাহা এখন মিলিতেছে তাহাই পাইবেন। অন্য কিছু খাদ্য দেওয়ার অধিকার আমার নাই।

 ইতি মধ্যে পূর্ব কথিত আরও ১৪ জন ভারতীয় কয়েদি আসিয়া পড়িলেন। তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই ‘পূপূ’(লপ‍্সি) খাইতে অস্বীকার করিয়া আহার গ্রহণ না করিয়া দিন কাটাইতে লাগিলেন। তখন আমি জেলের নিয়ম পড়িলাম এবং জানিতে পারিলাম যে এ বিয়য়ে আবেদন Director of Prisons এর (কারা বিভাগের সর্বময় কর্তা) নিকট করিতে হইবে। তখন গভর্ণরের অনুমতি লইয়া নিম্নলিখিত আবেদন পাঠান হইল। “আমরা নিম্নে স্বাক্ষরকারী কয়েদিগণ আবেদন করিতেছি যে, আমরা ২১ জন এসিয়াটীক বর্তমানে কারাদণ্ড ভোগ করিতেছি তাহার মধ্যে ১৮ জন ভারতবাসী আর বাদ বাকী চীন দেশবাসী। ১৮ জন ভারতবাসীর খাদ্যে সকালে ‘পূপূ’ দেওয়া হয়। আর সকলের জন্য চাল ও ঘি, তিনবার বীন্, আর ৪ বার ‘পূপূ’ দেওয়া হয়। শনিবার আলু ও রবিবার সব‍্জি দেওয়া হয়। ধর্ম্ম অনুযায়ী আমরা কেহই মাংস ভক্ষণ করিতে পারি না। অনেকের ত মাংস ভক্ষণ ধর্ম্ম নিষিদ্ধই, অনেকের আবার শুদ্ধ মাংস ছাড়া অন্য মাংস খাওয়া ধর্ম্ম বিরুদ্ধ। চীনীদের চাউলের পরিবর্তে ভুট্টা দেওয়া হয়। আবেদনকারিদের মধ্যে অধিকাংশই ইউরোপীয় রীতি অনুযায়ী ভোজনে অভ্যস্ত, এবং তাঁহারা রুটি ও আটার তৈয়ারি অন্যান্য দ্রব্য গ্রহণ করেন।

 আমাদের মধ্যে অনেকের ‘পূপূ’ মোটেই সহ্য হইত না। ইহাতে অজীর্ণ হইত। আমাদের মধ্যে সাত জন ত সকালে কিছুই খাইত না। কেবল কোন কোন সময়ে চীনী কয়েদীরা দয়া করিয়া আপনাদের রুটী হইতে কয়েক টুক‍রা দিলে তাই খাইত। আমি গভর্ণরকে এ কথা জানাইয়াছিলাম। তিনি বলিলেন চীনী কয়েদিদের নিকট হইতে রুটী লওয়া অপরাধ বলিয়াই গণ্য হয়। আমাদের মনে হয় পূর্বোক্ত খাদ্য আমাদের পক্ষে ক্ষতিকর। এই কারণে আমরা আবেদন করিতেছি যে ‘পূপূ’ বন্ধ করিয়া আমাদের জন্য য়ুরোপীয় রীতি অনুসারে খাদ্য দেওয়া হউক, অথবা এরূপ খাদ্য দেওয়া হউক যাহা আমাদের পক্ষে হানিকর নহে। আমাদের যে খাদ্য দেওয়া হইবে তাহা আমাদের প্রকৃতি ও রীতি নীতি অনুযায়ী হওয়াই উচিত।

 এই কাজটী বিশেষ প্রয়োজনীয়, সুতরাং শীঘ্রই ইহার বিধান হওয়া প্রয়োজন। অতএব আবেদনকারিগণ প্রার্থনা করেন যে ইহার উত্তর আমাদিগকে যেন টেলিগ্রামে পাঠান হয়।”

 এই আবেদনে আমরা ২১ জন নাম স্বাক্ষর করিয়াছিলাম। স্বাক্ষর করা হইলে আবেদন পত্র পাঠান হইতেছিল, এমন সময়ে আরও ৭৬ জন ভারতীয় কয়েদী আসিয়া পৌঁছিলেন, তাঁহারাও ‘পূপূ’ খাইতে নারাজ। তাই আবেদন পত্রের নিম্নে লেখা হইল, “আরও ৭৬ জন কয়েদী আসিয়াছেন। পূর্ব্বোক্ত খাদ্য গ্রহণে তাঁহারাও অনিচ্ছুক। অতএব শীঘ্রই ব্যবস্থা করা প্রার্থনীয়।” টেলিগ্রাম পাঠাইবার জন্য গভর্ণর সাহেবকে অনুরোধ করিলাম তখন তিনি টেলিফোন যোগে ডিরেক্টারের অনুমতি লইয়া ‘পূপূ’র পরিবর্ত্তে চার আউন্স রুটি দেওয়ার হুকুম দিলেন। ইহাতে সকলে খুব খুশী হইল। তখন ২২ শে তারিখ হইতে সকালে চার আউন্স রুটি ও সন্ধ্যায় ‘পূপূ’ দেওয়ার পরে রুটি দেওয়া হইতে লাগিল। সন্ধ্যায় আট আউন্স রুটি দেওয়ার কথা ছিল। অন্য কোন হুকুম আসা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বজায় রহিল। এজন্য গভর্ণর একটি কমিটি নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাহাতে আটা, ঘি, চাউল ও দাল দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলিতেছিল। তাহারই মধ্যে আমাদের ছাড়িয়া দেওয়া হইল। সুতরাং ইহার পর আর কোন কথা উঠিল না।

 প্রথমে যখন আমরা আট জন মাত্র ছিলাম তখন আমরা কেহই রাঁধিতাম না। ভাত ভাল হইত না এবং তরকারি বরাদ্দের দিন তরকারি খুবই খারাপ হইত। তাহা আমরা রন্ধন করিয়া লইবার আজ্ঞাও গ্রহণ করিলাম। প্রথম দিন মিঃ কডবা রন্ধন করিতে গেলেন। তাহার পর মিঃ থম্বী নায়ড়ু ও মিঃ জীবন, ইঁহারা দুই জন রন্ধন করিতে যাইতেন। শেষাশেষি এই দুই ভদ্রলোককে প্রায় ২০০ জনের জন্য রন্ধন করিতে হইত। রন্ধন এক বেলাই হইত। সপ্তাহে দুই দিন তরকারির বার আসিত, তখন দুই বারই রন্ধন করিতে হইত। মিঃ থম্বী নায়ড়ু খুবই খাটতেন। সকলকে ভাগ করিয়া দিবার ও পরিবেশন করিবার ভার আমার উপর ছিল।

 পূর্বোক্ত আবেদন পত্রে, এমন কথা বলা হয় নাই যে শুধু আমাদেরই জন্য ভোজনের পৃথক ব্যধস্থ করা হউক, বরং ভারতবাসী সকল কয়েদীর জন্যই ব্যবস্থা করিবার প্রার্থনা তাহাতে জানান হইয়াছিল। গভর্ণরের সহিত এই কথাই হইয়াছিল এবং তিনি অনুমতিও দিয়াছিলেন। তখন আশা করা যাইতে পারে যে জেলে ভারতীয় কয়েদিদের আহারের পরিবর্ত্তন হইবে। তাহা ছাড়া, চীনা কয়েদী তিনজনের চাউলের পরিবর্ত্তে অন্য খাদ্য পাওয়া যাইত। তাহাতে অসন্তোষ বাড়িয়া উঠিত এবং ইহাও অনেকে মনে করিতেন যে চীনারা বুঝি আমাদের অপেক্ষা হীন। সুতরাং তাঁহাদের পক্ষ হইতে আমি গভর্ণর ও মিঃ প্লেফোর্ডের নিকট আবেদন করিলাম। শেষে অনুমতি পাওয়া গেল, যে চীনারাও ভারতীয়দের মত খাদ্য পাইবে।

 যুরোপীয়দের যেরূপ খাদ্য মিলিত এইবার সে কথা বলিব। তাঁহাদের সকলকে জল খাবারের জন্য আট আউন্স রুটী ও ‘পূপূ’ সকাল বেলায় দেওয়া হইত। দ্বিপ্রহরে আহারের সময় সর্ব্বদাই রুটী ও সুরুয়া(ঝোল) বা রুটী ও মাংস এবং আলু বা অন্য কোন তরকারি দেওয়া হইত। রাত্রে প্রত্যহই রুটী ও ‘পূপূ’, অর্থাৎ তাহারা তিনবার রুটী পাইতেন সুতরাং ‘পূপূ’র জন্য তাঁহাদের বড় বেশী আগ্রহ ছিল না। পাওয়া যায় তা ভাল, না পাওয়া যার ত ভাল, এই ভাব। তাহা ছাড়া তাঁহারা যে ঝোল ও মাংস পাইতেন তাহাও খুব বেশী পরিমাণে, তাঁহাদিগকে চা বা কোকো অনেক বার দেওয়া হইত। ইহাতে বোঝা যায় যে কাফ্রিদের কাফ্রিদের মত ও য়ুরোপীয়দের যুবোপীয়দের মতই আহার দেওয়া হইত। বেচারী ভারতীয়গণ মাঝখানে পড়িয়া ত্রিশঙ্কুর অবস্থায় ছিলেন। তাঁহাদের নিজেদের অভ্যাস অনুযায়ী খাবার পাইবার সৌভাগ্য কোন দিনই হইল না। তাঁহাদের য়ুরোপীয় খাদ্য দেওয়া হইলে শ্বেতাঙ্গেরা লজ্জা পাইতেন। ভারতীয়দিগকে অন্য কিরূপ খাদ্য দেওয়া যাইতে পারে তাঁহারা তখন তাহাই ভাবিতে লাগিলেন। তাই শেষ কাফ্রিদের মধ্যেই তাঁহাদিগকে ঢুকাইয়া দেওয়া হইল।

 এই অবিচার আজ পর্যন্ত চলিয়া আসিতেছে। চক্ষু মেলিয়া কেহ এখনও তাহার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছে না। সত্যাগ্রহের পক্ষে ইহা দুর্ব্বলতা, ইহাই আমার মনে হয়। কারণ একদিকে যেমন কয়েকজন ভারতবাসী কয়েদী চুরি করিয়া লুকাইয়া, যেমন করিয়া হউক, ভিক্ষা করিয়া আহার্য্য সংগ্রহ করিতেন এবং তাহাতে তাঁহাদিগকে কোন বিপদেও পড়িতে হইত না, তেমনিঅন্য দিকে কয়েকজন ভারতীয় কয়েদী যাহা দেওয়া হইত তাহাই খাইতেন এবং আপন বিপদের কথা বলিতে লজ্জা বোধ করিতেন। যাঁহারা বাহিরে বাহিরে ছিলেন তাঁহারা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। যদি আমরা সত্যভাবে কর্ম্ম গ্রহণ করি এবং অন্যায়কে আঘাত করি তবে এরূপ কষ্ট সহিতেই হয় না। স্বার্থ ছাড়িয়া পরমার্থের দিকে দৃষ্টি রাখিলে দুঃখের ঔষধ সহজেই পাওয়া যায়।

 কিন্তু এই প্রকার দুঃখের প্রতীকার যেমন প্রয়োজন তেমনি অন্য একটি কথা চিন্তা করাও অত্যন্ত আবশ্যক। কয়েদী হইলে নানা প্রকার কষ্ট সহ করিতে হয়। যদি কষ্টই না হইবে, তবে জেল কিসের জন্য? যে আপনার হৃদয়কে অধীনে রাখিতে পারে তাহার পক্ষে ত জেলেও আনন্দে বাস করা সম্ভব। তাই কয়েদী একথা কখনই ভোলে না যে, জেলখানায় কষ্ট পাইতে হইবে আর অন্যেরও একথা ভুলিলে চলিবে না। তাহা ছাড়া আমাদের আচার ব্যবহার এমনিভাবে গড়িয়া তুলিতে হইবে যে তাহাতে বেশী কিছু পরিবর্ত্তন করিতে না হয়। ‘যেমন দেশ তেমন বেশ’, এই কথা ত প্রচলিতই আছে। দুক্ষিণ আফ্রিকায় বাস করিয়া আমার অভ্যাস এমনি হওয়া চাই যে এখানকার অন্ন জল আমার সহিয়া যায়। ‘পূপূ’ গমের মতই ভাল সাদা সিধা খাদ্য, তাহার কোন স্বাদ নাই একথাও বলা চলে না। কখন কখনও ‘পূপূ’ গম অপেক্ষাও ভাল লাগে। আমার মতে যে দেশে থাকা যায়, তাহার প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া সেখানকার উৎপন্ন অন্ন (অবশ্য নিতান্ত মন্দ না হইলে) গ্রহণ করা উচিত। অনেক শ্বেতাঙ্গ ‘পূপূ’ পছন্দ করেন এবং সকালে নিত্য তাহাই খালা থাকেন। ‘পূপূ’র সহিত দুধ, চিনি বা ঘি দিলে ত তাহা খাইতে চমৎকার লাগে। এই কারণে এবং আমাদিগকে আবার এখনই জেলে যাইতে হইবে এই ভাবিয়া, ‘পূপূ’ খাওয়া অভ্যাস করা আমাদের উচিত। প্রত্যেক ভারতবাসীর পক্ষে এরূপ অভ্যাস করা একান্ত দরকার। এরূপ হইলে আবার কখনও ‘পূপূ’ খাইবার দরকার হইলে আর তাই খারাপ লাগিবে না। দেশের জন্য অনেক অভ্যাসই আমাদের ত্যাগ করিতে হইবে। ইহা ছাড়া উপায় নাই। যে যে জাতি বড় হইয়াছে তাহারা যাহা হানিকর নহে, তাহা বিশেষ মহত্বপূর্ণ না হইলেও স্বীকার করিয়া লইয়াছে। মুক্তি ফৌজের লোকদের (Salvation Army) দেখুন, তাহারা যে দেশে যায় সেই দেশের রীতি নীতি বেশ ভূষা যদি খারাপ না হয় তবে গ্রহণ করিয়া সেখানকার লোেকদের মন আকর্যণ করিয়া লয়।


রোগী।

 আমাদের দেড়শত কয়েদীর মধ্যে যদি একজনেরও অসুখ না হইত তাহা হইলে আশ্চর্য্য হইবার কথা হইত বটে। আমাদের মধ্যে মিঃ সমুন্দর খাঁ প্রথম রোগী। তিনি যখন জেলে আসিয়াছিলেন, তখনই তাঁহার অসুখ, তিনি হাসপাতালে গেলেন। মিঃ কডবার সন্ধিবাতের রোগ ছিল। তিনি অনেক দিন জেলের মধ্যেই মলম ইত্যাদি ঔষধ ডাক্তারের নিকট হইতে লইলেন। কিন্তু পরে তিনি হাঁসপাতালে গেলেন। দুইজন কয়েদীর মাথাঘোরা রোগ ছিল। তাহারাও হাসপাতালে গেলেন। সেখানকার বাতাস বড় গরম। কয়েদীদিগকে রৌদ্রে পড়িয়া থাকিতে হইত। তাহাতে কাহারও কাহারও মাথা ঘুরিত। তাহাদের সেবা শুশ্রুষা যথেষ্ট হইত। শেষাশেষি মি: নবাব খাঁও অসুখে পড়িলেন। ডাক্তার তাঁহাকে দুধ ইত্যাদি দিবার আজ্ঞা দিলেন। তখন তিনি কিছু সারিয়া উঠেন। যাহা হউক, আমাদের সত্যাগ্রহী কয়েদীদের স্বাস্থ্য মোটের উপর ভালই ছিল।

স্থানের অল্পতা।

 আমি প্রথমেই বলিয়াছি, যে কুঠুরীতে আমাদের রাখা হইয়াছিল তাহাতে মাত্র ৫১ জনের জন্য স্থান ছিল। বারান্দাও এতগুলি লোকের উপযুক্ত ছিল। কিন্তু যখন ৫১ জনের পরিবর্ত্তে ১৫১ জনেরও বেশী কয়েদী হইল তখন আমাদের অতি কষ্টে পড়িতে হইল। গভর্ণর বাহিরে ঘর তুলিয়া দিলে অনেক কয়েদী সেখানেই থাকিতে লাগিল। শেষাশেষি ১০০ জন বাহিরে শুইতে যাইত। কিন্তু তাহারা সকালে আবার ফিরিয়া আসিলে বারান্দা ভরিয়া যাইত। একটুও যায়গা থাকিত না। এই অল্প স্থানে কয়েদীদের থাকিতে অতি কষ্ট হইত। তাহা ছাড়া নিজ নিজ অভ্যাস মত লোকে এধারে ওধারে থুতুও ফেলিত। তাহাতে দুর্গন্ধ ছড়াইয়া পড়িত এবং অসুখ হইবার ভয়ও থাকিত। সৌভাগ্য এই যে আমি বুঝাইয়া দিলে লোকে শুনিত এবং বারান্দা পরিষ্কার করিবার সময় তাহারা আমাদের সহায়তা করিত। যাহাতে কাহারও রোগ না হয় সেই জন্য বারান্দা ও পায়খানা পরিষ্কার করার উপর আমাদের খুব সতর্ক দৃষ্টি ছিল। এতগুলি কয়েদীকে এই অল্প স্থানে রাখা সরকারের অন্যায়, ইহা সকলেই স্বীকার করিবেন। স্থান যখন অল্প তখন সরকারের কর্ত্তব্য ছিল যে সেখানে যেন এত কয়েদী না পাঠান হয়। যদি এই আন্দোলন বেশী দিন এবং বেশী জোরে চালান যাইত, তাহা হইলে সরকার কখনই বেশী কয়েদীদের একত্র জড় করিতে পারিতেন না।

পঠন পাঠন।

 আমি প্রথমেই বলিয়াছি যে গভর্ণর আমাদিগকে জেলে টেবিল দিবার হুকুম দিয়াছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে দোয়াত কলমও পাওয়া গিয়াছিল। জেলের সংশ্লিষ্ট একটা লাইব্রেরীও ছিল। কয়েদীরা সেখান হইতে পুস্তক পাইত। সেখান হইতে আমি কার‍্লাইলের গ্রন্থ এবং বাইবেল লইয়াছিলাম। এক জন চীনা দ্বিভাষী ছিলেন তিনি প্রথমেই ইংরেজী কোরাণ শরিফ; হক্সলের বক্তৃতা; বার্ণস, জন‍্সন্ এবং স্কটের জীবনী (কার‍্লাইলকৃত) এবং বেকনের নীতি বিষয়ক প্রবন্ধ লইয়া রাখিয়াছিলেন। আমার নিজের পুস্তকের মধ্যে নিম্নলিখিত পুস্তকগুলি আমার কাছে ছিল। মনিলাল নাথুভাই কৃত টীকাসমেত গীতা, কয়েকখানা তামিল পুস্তক, মৌলবী সাহেব প্রদত্ত উর্দ্দু পুস্তক, টলষ্টয়ের লেথাবলী, রাস্কিন ও সক্রেটিসের প্রবন্ধ। ইহার মধ্যে অনেক গ্রন্থই আমি জেলে প্রথমবার বা পুনর্ব্বর পড়ি। তামিল নিয়মিত ভাবে পড়া হইত। সকালে গীতা এবং দ্বিপ্রহরে কোরাণ সরিফ বেশী করিয়া পড়িতাম। সন্ধ্যায় মিঃ ফোরটুনকে বাইবেল পড়াইতাম। মিঃ ফোরটুন চীনা ক্রিশ্চান। তিনি ইংরাজী পড়িতে চাইতেন, তাই তাঁহাকে বাইবেলের সাহায্যে ইংরাজী পড়াইতাম। যদি পুরো দুই মাস জেলে থাকিতে হইত, তবে কার‍্লাইল ও রাস্কিনের পুস্তক অনুবাদ করিবার ইচ্ছা ছিল। হাঁ, আমাকে স্বীকার করিতে হইবে যে এই সব পুস্তকের মধ্যে আমি মগ্ন হইয়া থাকিতে পারিতাম। তাই যদি আমার আরও দুই মাসের কারাবাসের দণ্ড মিলিত তবে আমি শুধু যে দুঃখিত হইতাম না তাহা নহে, বরং ততদিন আমি আমার জ্ঞান অনেক খানি বাড়াইতে পারিতাম এবং পূর্ণ সুখে কাটাইতাম। আর আমি একথাও মানি যে, যাহারা ভাল ভাল পুস্তক পড়িতে চায় তাহাদের কোথাও অভাব হয় না। আমি ছাড়া কয়েদী ভাইদের মধ্যে পড়িতে ভাল বাসিতেন মিঃ সি, এম, পিল্লে, মিঃ নায়ডু এবং চীনা ভদ্রলোকগুলি। নায়ডু দুই জন গুজরাতী পড়িতে আরম্ভ করেন। পরে কয়েকখানা গুজরাতী গানের বই আসিল। অনেকে তাহা পড়িতে আরম্ভ করিল কিন্তু আমি এসব পড়িতে বলি না।

ড্রিল।

 জেলে ত আর সমস্ত দিন পড়া যায় না, আর তাহা সম্ভব হইলেও তাহাতে ক্ষতিই হইবার কথা। তাই অনেক হাঙ্গামা করিয়া গবর্ণর ও দারোগার নিকট হইতে আমরা যে ড্রিল ও ব্যায়াম করিতে পারি তাহার অনুমতি নিলাম। দারোগা লোকটী অতি ভাল ছিলেন। তিনি খুব আনন্দের সহিত সন্ধ্যাবেলায় আমাদিগকে ড্রিল শিখাইতেন। ইহাতে খুব লাভ হইত। ড্রিল শিখাইবার ব্যবস্থা বেশী দিন স্থায়ী হইলে আমাদের সকলের অনেক উপকার হইত। কিন্তু ভারতীয় কয়েদীর সংখ্যা বৃদ্ধি হইলে দারোগার কাজও বাড়িয়া গেল, বারান্দার যায়গাও কম হইল, এইজন্য ড্রিল করা বন্ধ হইল। তথাপি মিঃ নবাব খাঁ সঙ্গে ছিলেন, এই কারণে ঘরোয়া ভাবে তাঁহার নিকটেই ড্রিল শিক্ষা হইত। ইহা ছাড়া গভর্ণরের পরোয়ানা অনুসারে আমরা সেলাইয়ের কল চালাইবার কাজও আরম্ভ করিয়াছিলাম। আমরা কয়েদীদের ঝুলি বানাইতে শিখিয়াছিলাম। মিঃ টী, নায়ডু এবং মিঃ ইষ্টণ এই কর্ম্মে নিপুণ ছিলেন তাই তাঁহারা তাড়াতাড়ি শিখিয়া লইয়াছিলেন। কিন্তু আমি তেমন দক্ষতা লাভ করিতে পারি নাই, আমি ভাল করিয়া শিখিতে পাই নাই। একবার অনেক কয়েদী আসিয়া পড়িল, কাজের ভাগও অর্দ্ধেক কমিয়া গেল। ইহা হইতে পাঠক বুঝিতে পারিবেন মানুষ ইচ্ছা করিলে “জঙ্গলে মঙ্গল” অর্থাৎ বনে বসিয়াও ভাল কাজ করিতে পারে। এইরূপে এক কাজের পর অন্য কাজে হাত দিতে থাকিলে কোন কয়েদীরই জেলের ‘সময় কাটে না’ বলিয়া মনে হইবে না, এমন কি সে নিজের জ্ঞান ও শক্তি বৃদ্ধি করিয়া সেখান হইতে বাহির হইতে পারিরে। অনেক দৃষ্টান্ত দেখা গিয়াছে, জেলখানায় ভাগ্যবান লোকে অনেক বড় বড় কাজ করিয়া সারিয়াছেন। জন বানিয়ান গুরুতর কারাক্লেশ সহ্য করিয়া জগতে অমর গ্রন্থ “পিলগ্রীমস্ প্রগ্রেস্ বা যাত্রিকের গতি” লিখিয়া গিয়াছেন। ইংরাজেরা বাইবেলের পরে এই গ্রন্থেরই সমধিক আদর করে। লোকমান্য তিলক যখন বোম্বাইতে নয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করিতে ছিলেন তখনই “ওরায়ন” নামক পুস্তক লিখিয়াছিলেন। সুতরাং জেলেই হউক আর অন্যত্রই হউক, সুখ মিলিবে কি দুঃখ মিলিবে, সুস্থ থাকিবে কি রোগে ভুগিবে, তাহা অধিকাংশ স্থলে আমার নিজের মনের উপরেই নির্ভর করে।

দেখা সাক্ষাৎ।

 জেলে আমার সহিত দেখা করিবার জন্য অনেক ইংরাজ আসিতেন। এ বিষয়ে সাধারণ নিয়ম এই যে, প্রথম এক মাসের মধ্যে কেহই কোন কয়েদীর সঙ্গে দেখা করিতে পারিবে না। তাহার পর প্রতি মাসে এক রবিবার একজন আসিয়া দেখা করিয়া যাইতে পারে। বিশেষ কারণে এই নিয়মের পরিবর্ত্তন হইতে পারে। এবং মিঃ ফিলিপস্ এরূপ পরিবর্ত্তনে লাভবান হইয়াছিলেন। আমাদের জেলে যাওয়ার তিন দিনের দিন চীনা ক্রিশ্চান মিঃ ফোরটুনে সহিত দেখা করিবার জন্য মিঃ ফিলিপস্ অনুমতি প্রার্থনা করেন এবং অনুমতি তাঁহাকে দেওয়া হয়। মিঃ ফোরটুনের সহিত দেখা করিতে আসিয়া ভদ্রলোকটী আমার সহিত এবং অন্যান্য কয়েদীদের সহিতও দেখা করেন, এবং আমাদের সকলকে ধৈর্য্য ও সাহস অবলম্বন করিবার কথা বলিয়া নিজের রীতি অনুসারে ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করেন। এইরূপে মিঃ ফিলিপস‍ের সঙ্গে তিনবার দেখা হয়। মিঃ ডেভিস্ নামে অন্য একজন পাদরীও আমাদের সঙ্গে দেখা করিতে আসেন। মিঃ পোলক্ এবং মিঃ কোয়ান বিশেষ ভাবে অনুমতি নিয়া দেখা করিতে আসিয়াছিলেন। শুদ্ধ আফিসের কাজে আসিবার জন্য তাঁহাদিগকে এই অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল। যাহারা এইরূপে দেখা করিতে আসিত তাহাদের সঙ্গে জেল দারোগা থাকিতেন, এবং তাঁহার সম্মুখে সমস্ত কথাবার্ত্তা চালাইতে হইত। ট্রান্সভ্যাল লীডারের সত্বাধিকারী মিঃ কার্টরাইট বিশেষ অনুমতি নিয়া তিনবার আসিয়াছিলেন। তিনিও পরামর্শ করিবার জন্যই আসেন, এই কারণে দারোগার অনুপস্থিতিতে আমার সহিত কথাবার্তা বলিবার বিশেষ আদেশ তিনি পাইয়াছিলেন। প্রথমবার কার্টরাইট্ সাহেব জানিয়া গেলেন যে ভারতীয়েরা কি চায়? কোন্ সর্ত্তে তাহারা রাজি হইতে পারে। দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের সময় তিনি অন্যান্য ইংরেজ ভদ্রলোক সঙ্গে করিয়া আনেন। তাঁহার সঙ্গে ছিল একখণ্ড লেখা কাগজ— একতারনামা বা স্বীকার-পত্র। উহা আবশ্যকমত স্থানে স্থানে পরিবর্ত্তন করিয়া লইলে মিঃ কবী, মিঃ নায়ডু এবং আমি তাতে নাম স্বাক্ষর করিলাম। এই কাগজ এবং স্বীকার-পত্র বিষয়ে “ইণ্ডিয়ান ওপিনিয়ান” ও অন্যান্য কাগজে অনেক লেখালেখি হয়, সুতরাং এখানে সে বিষয়ে সবিস্তার বর্ণনা করিবার আবশ্যক নাই। চীফ‍্ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ প্লেফোর্ডও একবার দেখা করিতে আসেন। তাঁহারও সর্ব্বদাই দেখা করিবার অধিকার ছিল। তবে তিনি বিশেষ করিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন, কি আমাদের সকলকে জেলখানায় দেখিবার জন্য একবার আসিলেন, তাহা বলিতে পারা যায় না।

ধর্ম্মশিক্ষা।

 বর্তমান কালে পাশ্চাত্য দেশে কয়েদীদের ধর্মশিক্ষা দেওয়ার প্রথা দেখা যায়। জোহান্সবার্গ জেলে কয়েদীদের জন্য পৃথক গীর্জ্জাঘর আছে। তাহাতে শুধু শ্বেতাঙ্গ কয়েদীই যাইতে পারে। আমি নিজের জন্য এবং মিঃ ফোর্টুনের জন্য বিশেষ অনুমতি চাহিয়াছিলাম কিন্তু গভর্নর বলিলেন, এ গীর্জ্জাঘরে শুধু শ্বেতাঙ্গ ক্রিশ্চানেরই প্রবেশাধিকার আছে। প্রত্যেক ব্যবিবার শেতাঙ্গ কয়েদীরা সেখানে যায় এবং ভিন্ন ভিন্ন পাদরী ধর্ম্ম শিক্ষা দিতে থাকেন। কাফ্রিদের জন্যও বিশেষ অনুমতি লইয়া অনেক পাদরী আসেন। কাফ্রিদের নিজেদের কোন ধর্মমন্দির নাই, তাই তাহারা জেলের ময়দানেই বসিত। ইহুদিদের জন্য তাহাদের পাদরী আসিতেন। কিন্তু হিন্দুমুসলমানে জন্য কোন বন্দোবস্ত নাই। অবশ্য ভারতীয় কয়েদীর সংখ্যা এখানে বড় বেশীও নয়, তথাপি তাহাদের ধর্ম্মশিক্ষার জন্য জেলে কোনও বন্দোবস্ত নাই ইহা তাহাদের হীনতারই পরিচয়। যতক্ষণ একটীও ভারতীয় কয়েদী থাকে, ততক্ষণ এ বিষয়ে পরামর্শ করিয়া দুই জাতির ধর্ম শিক্ষার ব্যবস্থা করা চাই। যে মৌলবী ও যে হিন্দুধর্ম্মীগুরু এই কর্মে নিযুক্ত থাকিবেন তাদের পবিত্র হওয়া দরকার নতুবা শিক্ষার কুফল হওয়াই সম্ভব।

শেষকথা।

 যাহা কিছু জ্ঞাতব্য তাহার অধিকাংশই উপরে বর্ণনা করা হইয়াছে। জেলখানায় ভারতীয়দিগকে কাফ্রিদের সঙ্গে একত্র রাখা হয় এবং একত্র গোনা হয়, একথা ভাবিয়া দেখা দরকার। শ্বেতাঙ্গ কয়েদীদের শুইবার খাটিয়া জোটে, দাঁত মাজিবার দাঁতন, নাকমুখ সাফ্ করিবার তোয়ালেও তাহারা পায়। অন্যান্য কয়েদীদের ভাগ্যে এসব কেন জোটে না, তাহা খোঁজ করিয়া দেখা দরকার। “এ সব খবরে আমার কি প্রয়োজন, আমি মাথা ঘামাইতে যাই কেন” একথা মনে করা উচিত নয়। বিন্দু বিন্দু মিশিয়া সিন্ধু হয়। এই প্রবাদ অনুযায়ী বলিতে পারা যায়, অতি সামান্য কথায়ও নিজের মান বাড়ে এবং কমে। “যাহার মান নাই তাহার ধর্ম্মও নাই” আরবী গ্রন্থে এমনধারা একটা কথা আছে, আর ইহা সম্পূর্ণ সত্য।—ধীরে ধীরে নিজের মান বাড়িলে তবে জাতীয় মর্য্যাদা বাড়িতে পারে। মানের অর্থ উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। ভয় অথবা আলস্যের বশে আপন অভীষ্ট যেন না হারাই —মনের এইরূপ ভাব এবং সেই অনুযায়ী চেষ্টাকে প্রকৃত মান বলে। পরমেশ্বরে যাহার স্থির বিশ্বাস, ভগবান যাহার অবলম্বন সেই ব্যক্তিই এই মান পাইতে পারে। আমি শুধু বলিতে চাই এবং আমার কথা বাস্তবিক সত্যও বটে যে —যাহার মধ্যে প্রকৃত শ্রদ্ধা নাই, যে বাস্তবিক শ্রদ্ধাবান্ নয়, তাহার পক্ষে কোনও বিষয়ে সত্যজ্ঞান লাভ করা বা সত্য সত্য কোন কর্ম্ম সম্পাদন করা অসম্ভব।