কালান্তর/নারী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

নারী মামুষের সৃষ্টিতে নারী পুরাতনী। নরসমাজে নারীশক্তিকে বলা যেতে পারে আস্তাশক্তি। এই সেই শক্তি বা জীবলোকে প্রাণকে বহন করে, প্রাণকে পোষণ করে । পৃথিবীকে জীবের বাসযোগ্য করবার জন্তে অনেক যুগ গেছে ঢালাইপেটাই-করা মিস্ত্রির কাজে । সেটা আধখানা শেষ হতে না হতেই প্রকৃতি গুরু করলেন জীবহুষ্টি, পৃথিবীতে এল বেদন । প্রাণসাধনার সেই আদিম বেদন প্রকৃতি দিয়েছেন নারীর রক্তে, নারীর হৃদয়ে। জীবপালনের সমস্ত প্রবৃত্তিজাল প্রবল ক’রে জড়িত করেছেন নারীর দেহুমনের তত্ত্বতে তন্তুতে। এই প্রবৃত্তি স্বভাবতই চিত্তবৃত্তির চেয়ে হৃদয়বৃত্তিতেই স্থান পেয়েছে গভীর ও প্রশস্ত ভাবে। এই সেই প্রবৃত্তি নারীর মধ্যে যা বন্ধনজাল গাখছে নিজেকে ও অন্তকে ধরে রাখবার জন্তে— প্রেমে, স্নেহে, সকরুণ ধৈর্যে । মানবসংসারকে গড়ে তোলবার, বেঁধে রাখবার এই আদিম বাধুনি। এই সেই সংসার বা সকল সমাজের, সকল সভ্যতার মূল ভিত্তি। সংসারের এই গোড়াকার বাধন না থাকলে মানুষ ছড়িয়ে পড়ত আকারপ্রকারহীন বাম্পের মতো ; সংহত হয়ে কোথাও মিলনকেন্দ্র স্থাপন করতে পারত না । সমাজবন্ধনের এই প্রথম কাজটি মেয়েদের। প্রকৃতির সমস্ত সৃষ্টিপ্রক্রিয় গতীর গোপন, তার স্বতঃপ্রবর্তন দ্বিধাবিহীন। সেই আদিপ্রাণের সহজ প্রবর্তন নারীর স্বভাবের মধ্যে। সেইজন্ত নারীর স্বভাবকে মানুষ রহস্তময় আখ্যা দিয়েছে। তাই অনেক সময়ে অকস্মাৎ নারীর জীবনে যে সংবেগের উচ্ছ্বাস দেখতে পাওয়া যায় তা তর্কের অতীত— তা প্রয়োজন-অমুসারে বিধিপূর্বক খনন করা ૨૭ や● ● কালান্তর खणtej८ब्रद्म ਬਣਾ নয়, তা উৎসের মতো যার কারণ আপন অহৈতুক রহস্তে নিহিত । প্রেমের রহস্ত, স্নেহের রহস্ত অতি প্রাচীন এবং দুর্গম । সে আপন সার্থকতার জন্তে তর্কের অপেক্ষা রাখে না । যেখানে তার সমস্তা সেখানে তার দ্রুত সমাধান চাই। তাই গৃহে নারী যেমনি প্রবেশ করেছে কোথা থেকে অবতীর্ণ হল গৃহিণী, শিশু যেমনি কোলে এল মা তখনই প্রস্তুত । জীবরাজ্যে পরিণত বুদ্ধি এসেছে অনেক পরে। সে আপন জায়গা খুজে পায় সন্ধান ক’রে, যুদ্ধ করে। দ্বিধা মিটিয়ে চলতে তার সময় যায়। এই দ্বিধার সঙ্গে কঠিন বন্দ্বেই সে সবলতা ও সফলতা লাভ করে । এই দ্বিধাতরঙ্গের ওঠাপড়ায় শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যায়, সাংঘাতিক ভ্ৰম জমে উঠে বার বার মামুষের ইতিহাসকে দেয় বিপর্যন্ত ক’রে । পুরুষের স্বষ্টি বিনাশের মধ্যে তলিয়ে ধায়, নূতন ক'রে বাধতে হয় তার কীতির ভূমিকা। পালটিয়ে পালটিয়ে পরীক্ষায় পুরুষের কর্ম কেবলই দেহপরিবর্তন করে । অভিজ্ঞতার এই নিত্যপরিক্রমণে যদি তাকে অগ্রসর করে তবে সে বেঁচে যায়, যদি ক্রটিসংশোধনের অবকাশ না পায় তবে জীবনবাহনের ফাটল বড়ো হয়ে উঠতে উঠতে তাকে টানে বিলুপ্তির কবলের মধ্যে । পুরুষের রচিত সভ্যতার আদিকাল থেকে এই রকম ভাঙাগড়া চলছে । ইতিমধ্যে, নারীর মধ্যে প্রেয়সী, নারীর মধ্যে জননী প্রকৃতির দৌত্যে স্থিরপ্রতিষ্ঠিত হয়ে আপন কাজ করে চলেছে । এবং প্রবল আবেগের সংঘর্ষে আপন সংসারের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে অগ্নিকাও করে ও আসছে। সেই প্রলয়াবেগ যেন বিশ্বপ্রকৃতির প্রলয়লীলারই মতো, ঝড়ের মতো, দাবদাহের মতো— আকস্মিক, আত্মঘাতী । পুরুষ তার আপন জগতে বারে বারে নূতন আগন্তুক। আজ পর্বস্ত কত বার সে গড়ে তুলেছে আপন বিধিবিধান । বিধাতা তাকে তার Q& 8 নারী জীবনের পথ বধিয়ে দেন নি ; কত দেশে কত কালে তাকে আপন পথ বানিয়ে নিতে হল। এক কালের পথ বিপথ হয়ে উঠল আর-এক কালে, উলুটিয়ে গেল তার ইতিহাস। করলে সে অস্তধান । নব নব সভ্যতার উলট-পালটের ভিতর দিয়ে নারীর জীবনের মূল ধারা চলেছে এক প্রশস্ত পথে । প্রকৃতি তাকে যে হৃদয়সম্পদ দিয়েছেন নিত্যকৌতুহলপ্রবণ বুদ্ধির হাতে তাকে নূতন নূতন অধ্যবসায়ে পরখ করতে দেওয়া হয় নি । নারী পুরাতনী। পুরুষকে নানা দ্বারে নানা আপিলে উমেদারিতে ঘোরায় । অধিকাংশ পুরুষই জীবিকার জন্তে এমন কাজ মানতে বাধ্য হয় বার প্রতি তার ইচ্ছার, তার ক্ষমতার সহজ সন্মতি নেই। কঠিন পরিশ্রমে নানা কাজের শিক্ষা তার করা চাই— তাতে বারে আন পুরুষই যথোচিত সফলতা পায় না। কিন্তু গৃহিণীরূপে, জননীরূপে মেয়েদের যে কাজ সে তার আপন কাজ, সে তার স্বভাবসংগত । নানা বিশ্ন কাটিয়ে অবস্থার প্রতিকূলতাকে বীর্যের দ্বারা নিজের অমুগত করে পুরুষ মহত্ত্ব লাভ করে। সেই অসাধারণ সার্থকতায় উত্তীর্ণ পুরুষের সংখ্যা অল্প । কিন্তু হৃদয়ের রসধারায় আপন সংসারকে শস্তশালী করে তুলেছে এমন মেয়েকে প্রায় দেখা যায় ঘরে ঘরে। প্রকৃতির কাছ থেকে তারা পেয়েছে অশিক্ষিতপটুত্ব ; মাধুর্যের ঐশ্বর্য তাদের সহজে লাত করা । যে মেয়ের স্বভাবের মধ্যে দুর্ভাগ্যক্রমে সেই সহজ রসটি না থাকে, কোনো শিক্ষায়, কোনো কৃত্রিম উপায়ে সংসারক্ষেত্রে সে সার্থকতা পায় না । যে সম্বল অনায়ালে পাওয়া যায় তার বিপদ আছে। বিপদের এক কারণ অন্তের পক্ষে তা লোভনীয়। সহজ-ঐশ্বর্যবান দেশকে বলবান নিজের একান্ত প্রয়োজনে আত্মসাৎ করে রাখতে চায়। অমুর্বর দেশের *एक वारीौन पाक गझ्छ । cय भाषिद्र छांना शश्वद्र ७ क♚चत्व बधूब \O& Co কালান্তর তাকে খাচায় বন্দী করে মানুষ গর্ব অনুভব করে ; তার সৌন্দর্য সমস্ত অরণ্যভূমির, এ কথা সম্পত্তিলোলুপরী ভুলে যায়। মেয়েদের হৃদয়মাধুর্য ও সেবানৈপুণ্যকে পুরুষ সুদীর্ঘকাল আপন ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে কড়া পাহারায় বেড়া দিয়ে রেখেছে। মেয়েদের নিজের স্বভাবেই বাধন-মানা প্রবণতা আছে, সেইজন্তে এটা সর্বত্রই এত সহজ হয়েছে। বস্তুত জীৰপালনের কাজটাই ব্যক্তিগত । সেটা নৈর্ব্যক্তিক তত্ত্বের কোঠায় পড়ে না, সেই কারণে তার আনন্দ বৃহৎ তত্ত্বের আনন্দ নয় ; এমন কি মেয়েদের নৈপুণ্য যদিও বহন করেছে রস, কিন্তু স্থষ্টির কাজে আজও যথেষ্ট সার্থক হয় নি। তার বুদ্ধি, তার সংস্কার, তার আচরণ নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার দ্বারা বহু যুগ থেকে প্রভাবান্বিত । তার শিক্ষা, তার বিশ্বাস বাহিরের বৃহৎ অভিজ্ঞতার মধ্যে সত্যতা লাভ করবার সম্পূর্ণ সুযোগ পায় নি। এইজন্তে নির্বিচারে সকল অপদেবতাকেই সে অমূলক ভয় ও অযোগ্য ভক্তির অর্ঘ্য দিয়ে আসছে। সমস্ত দেশ জুড়ে যদি দেখতে পাই তবে দেখা যাবে এই মোহমুগ্ধতার ক্ষতি কত সর্বনেশে, এর বিপুল ভার বহন করে উন্নতির দুর্গম পথে এগিয়ে চলা কত দুঃসাধ্য। আবিলবুদ্ধি মূঢ়মতি পুরুষ দেশে যে কম আছে তা নয়, তারা শিশুকাল থেকে মেয়ের হাতে গড়া এবং তারাই মেয়েদের প্রতি সব চেয়ে অত্যাচারী। দেশে এই-যে সব আবিল মনের কেন্দ্রগুলি দেখতে দেখতে চারি দিকে গড়ে উঠছে, মেয়েদের অন্ধ বিচারবুদ্ধির উপরেই তাদের প্রধান নির্ভর। চিত্তের বন্দীশালা এমনি করে দেশে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ছে, এবং প্রতিদিন তার ভিত্তি হয়ে উঠছে দৃঢ় । এ দিকে প্রায় পৃথিবীর সকল দেশেই মেয়েরা আপন ব্যক্তিগত সংসারের গণ্ডি পেরিয়ে আসছে। আধুনিক এলিয়াতেও তার লক্ষণ দেখতে পাই। তার প্রধান কারণ সর্বত্রই সীমানা ভাঙার যুগ এসে \రి&&9 নারী পড়েছে । যে-সকল দেশ আপন আপন ভৌগোলিক ও রাক্টিক প্রাচীরের মধ্যে একাস্ত বদ্ধ ছিল তাদের সেই বেড়া আজ আর তাদের তেমন করে ধিরে রাখতে পারে না— তারা পরস্পর পরম্পরের কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। স্বতই অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র প্রশস্ত হয়েছে, দৃষ্টিসীমা চিরাভ্যস্ত দিগগু পেরিয়ে গেছে । বাহিরের সঙ্গে সংঘাতে অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে, নূতন নূতন প্রয়োজনের সঙ্গে আচারবিচারের পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ছে । আমাদের বাল্যকালে ঘরের বাইরে যাতায়াতের আবশুকে মেয়েদের ছিল পান্ধির যুগ । মানী ঘরে সেই পাস্কির উপরে পড়ত ঘেটাটোপ। বেথুন স্কুলে যে মেয়েরা সবপ্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন তার মধ্যে অগ্রণী ছিলেন আমার বড়দিদি । তিনি দ্বারখোলা পাস্কিতে ইস্কুলে যেতেন, সেদিনকার সন্ত্রাস্তবংশের আদর্শকে সেট। অল্প পীড়া দেয় নি। সেই একবস্ত্রের দিনে সেমিজ পরাট নির্লজ্জতার লক্ষণ ছিল । শালীলতার প্রচলিত রীতি রক্ষা করে রেলগাড়িভে যাতায়াত করা সহজ ব্যাপার ছিল না । আজ সেই ঢাকা পান্ধির যুগ বহু দূরে চলে গেছে । মৃদ্ধপদে বায় নি, দ্রুতপদেই গেছে। বাইরের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ পরিবর্তন আপনিই ঘটেছে— এ নিয়ে কাউকে সভাসমিতি করতে হয় নি । মেয়েদের বিবাহের বয়স দেখতে দেখতে এগিয়ে গেল, সেও হয়েছে সহজে । প্রাকৃতিক কারণে নদীতে জলধারার পরিমাণ যদি বেড়ে যায় তবে তার তটভূমির সীমা আপনিই হটে যেতে থাকে। মেয়েদের জীবনে আজ সকল দিক থেকেই স্বতই তার তটের সীম দূরে চলে যাচ্ছে । নদী উঠছে মহানদী হয়ে । এই-যে বাহিরের দিকে ব্যবহারের পরিবর্তন এ তো বাইরেই থেকে বায় না । অস্তরপ্রকৃতির মধ্যেও এর কাজ চলতে থাকে। মেয়েদের \ot a কালান্তর । যে মনোভাব বদ্ধ সংসারের উপযোগী, মুক্ত সংসারে সে তো অচল হয়ে থাকতে পারে না। আপনিই জীবনের প্রশস্ত ভূমিকায় দাড়িয়ে তার মন বড়ো করে চিস্তা করতে, বিচার করতে আরম্ভ করে । তার পূর্বতন সংস্কারগুলিকে যাচাই করার কােজ আপনিই শুরু হতে থাকে। এই অবস্থায় লে নানা রকম ভুল করতে পারে, কিন্তু বাধায় ঠেকতে ঠেকতে সে ভুল উত্তীর্ণ হতে হবে। সংকীর্ণ সীমায় পূর্বে মন যে রকম করে বিচার করতে অভ্যস্ত ছিল সে অভ্যাস অঁাকড়ে থাকলে চারি দিকের সঙ্গে পদে পদে অসামঞ্জস্য আনতে থাকবে । এই অভ্যাস-পরিবর্তনে দুঃখ আছে, বিপদও আছে ; কিন্তু সেই ভয় ক’রে আধুনিক কালের স্রোতকে পিছনের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না । গৃহস্থালির ছোটো পরিধির মধ্যে মেয়েদের জীবন যখন আবদ্ধ ছিল তখন মেয়েলি মনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলি নিয়ে সহজেই তাদের কাজ চলে যেত। এজন্তে তাদের বিশেষ শিক্ষার দরকার ছিল না বলেই এক দিন স্ত্রীশিক্ষা নিয়ে এতই বিরুদ্ধতা এবং প্রহসনের স্বষ্টি হয়েছে । তখন পুরুষেরা নিজে যে-সব সংস্কারকে উপেক্ষা করত, যে সব মত বিশ্বাস করত না, যে-সকল আচরণ পালন করত না, মেয়েদের বেলায় সেগুলিকে সযত্নে প্রশ্ৰয় দিয়েছে। তার মূলে তাদের সেই মনোবৃত্তি ছিল যে মনোবৃত্তি একেশ্বর শাসনকর্তাদের । তারা জানে, অজ্ঞানের অন্ধ সংস্কারের আবহাওয়ায় যথেচ্ছ শাসনের সুযোগ রচনা করে ; মমুন্মোচিত স্বাধিকার বিসর্জন দিয়েও সস্তুষ্টচিত্তে থাকবার পক্ষে এই মুগ্ধ অবস্থাই অমুকুল অবস্থা । আমাদের দেশের অনেক পুরুষের মনে আজও এই ভাব আছে। কিন্তু কালের সঙ্গে সংগ্রামে তাদের হার মানতেই হবে । কালের প্রভাবে মেয়েদের জীবনের ক্ষেত্র এই-যে স্বতই প্রসারিত হয়ে চলেছে, এই যে মুক্ত সংসারের জগতে মেয়ের আপনিই এসে পড়ছে, এতে ক’রে আত্মরক্ষণ এবং আত্মসম্মানের জন্তে তাদের বিশেষ V2倉b* নারী ক'রে বুদ্ধির চর্চা, বিস্তার চর্চা, একান্ত আবগুক হয়ে উঠল। তাই দেখতে দেখতে এর বাধা দূর হয়ে চলেছে। নিরক্ষরতার লজ্জা আজ ভদ্র মেয়েদের পক্ষে সকলের চেয়ে বড়ো লজ্জা, পূর্বকালে মেয়েদের ছাতা জুতো ব্যবহারের যে লজ্জা ছিল এ তার চেয়ে বেশি ; বাটনা-বাট কোটনা-কোটা সম্বন্ধে অনৈপুণ্যের অখ্যাতি তার কাছে কিছুই নয়। অর্থাৎ, গার্হস্থ্য বাজার-দরেই মেয়েদের দর, এমন কথা আজকের দিনে বিয়ের বাজারেও ষোলো আন খাটছে না। যে বিস্তার মূল্য সার্বভৌমিক, যা আগু প্রয়োজনের ঐকাস্তিক দাবি ছাড়িয়ে চলে যায়, আজ পাত্রীর মহার্বতা যাচাইয়ের জন্তে অনেক পরিমাণে সেই বিস্তার সন্ধান নেওয়া হয় । এই প্রণালীতেই আমাদের দেশের আধুনিক মেয়েদের মন ঘরের সমাজ ছাড়িয়ে প্রতিদিন বিশ্ব সমাজে উত্তীর্ণ হচ্ছে । প্রথম যুগে এক দিন পৃথিবী আপন তপ্ত নিশ্বাসের কুয়াশায় অবগুষ্ঠিত ছিল, তখন বিরাট আকাশের গ্রহমণ্ডলীর মধ্যে আপন স্থান সে উপলব্ধি করতেই পারে নি। অবশেষে এক দিন তার মধ্যে স্থৰ্যকিরণ প্রবেশের পথ পেল। তখনই সেই মুক্তিতে আরম্ভ হল পৃথিবীর গৌরবের যুগ । তেমনি এক দিন আৰ্দ্ৰ হৃদয়ালুতার ঘন বাম্পাবরণ আমাদের মেয়েদের চিত্তকে অত্যন্ত কাছের সংসারে আবিষ্ট করে রেখেছিল। আজ তা ভেদ ক’রে সেই আলোকরশ্মি প্রবেশ করছে যা মুক্ত আকাশের, বা সর্বলোকের । বহু দিনের যে-সব সংস্কারজড়িমাজালে তাদের চিত্ত আবদ্ধ বিজড়িত ছিল, যদিও আজ তা সম্পূর্ণ কেটে ষায় নি তবু তার মধ্যে অনেকখানি ছেদ ঘটেছে। কতখানি যে, তা আমাদের মতো প্রাচীন বয়স যাদের তারাই জানে । আজ পৃথিবীর সর্বত্রই মেয়ের ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বিশ্বের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এলে দাড়িয়েছে। এখন এই বৃহৎ সংসারের দায়িত্ব তাদের NՉԸ 2 কালান্তর স্বীকার করতেই হবে , নইলে তাদের লজ্জা, তাদের অকৃতার্থতা । আমার মনে হয়, পৃথিবীতে নূতন যুগ এসেছে। অতি দীর্ঘকাল মানবসভ্যতার ব্যবস্থাভার ছিল পুরুষের হাতে। এই সভ্যতার রাষ্ট্রতত্ত্ব অর্থনীতি সমাজশাসনতন্ত্র গড়েছিল পুরুষ। মেয়েরা তার পিছনে প্রকাশহীন অন্তরালে থেকে কেবল করেছিল ঘরের কাজ । এই সভ্যতা হয়ে ছিল এককোকা । এই সভ্যতায় মানবচিত্তের অনেকটা সম্পদের অভাব ঘটেছে ; সেই সম্পদ মেয়েদের হৃদয়ভাণ্ডারে কৃপণের জিন্মায় আটকা পড়ে ছিল। আজ ভাণ্ডারের দ্বার খুলেছে। তরুণ যুগের মামুষহীন পৃথিবীতে পঞ্চস্তরের উপর যে অরণ্য ছিল বিস্তৃত সেই অরণ্য বহুলক্ষ বৎসর ধরে প্রতিদিন স্বর্যতেজ সঞ্চয় করে এসেছে আপন বৃক্ষরাজির মজ্জায় । সেই-সব অরণ্য ভূগর্ভে তলিয়ে গিয়ে রূপান্তরিত অবস্থায় বহুযুগ প্রচ্ছন্ন ছিল। সেই পাতালের দ্বার যে দিন উদঘাটিত হল, অকস্মাৎ মানুষ শত শত বৎসরের অব্যবহৃত স্থৰ্যতেজকে পাথুরে কয়লার আকারে লাভ করল আপন কাজে ; তখনই নুতন বল নিয়ে বিশ্ববিজয়ী আধুনিক যুগ দেখা দিল । এক দিন এ যেমন ঘটেছে সভ্যতার বাহিরের সম্পদ নিয়ে, আজ তেমনি অস্তরের সম্পদের একটি বিশেষ খনিও আপন সঞ্চয়কে বাহিরে প্রকাশ করল । ঘরের মেয়েরা প্রতিদিন বিশ্বের মেয়ে হয়ে দেখা দিচ্ছে । এই উপলক্ষে মামুষের স্বষ্টিশীল চিত্তে এই-যে নুতন চিত্তের যোগ, সভ্যতায় এ আর-একটি তেজ এনে দিলে। আজ এর ক্রিয়া প্রত্যক্ষে অপ্রত্যক্ষে চলছে। এক পুরুষের গড়া সভ্যতায় যে ভারসামঞ্জস্তের অভাব প্রায়ই প্রলয় বাধাবার লক্ষণ আনে, আজ আশা করা যায় ক্রমে সে যাবে সাম্যের দিকে। প্রচও ভূমিকম্প বার বার ধাক্কা লাগাচ্ছে পুরাতন সভ্যতার ভিত্তিতে। এই সভ্যতায় বিপত্তির কারণ অনেক দিন থেকে সঞ্চিত হয়ে উঠছিল, অতএব ভাঙনের কাজ কেউ বন্ধ করতে vరిe e নারী পারবে না। একটিমাত্র বড়ে আশ্বাসের কথা এই যে, কল্পাস্তের ভূমিকায় নূতন সভ্যতা গড়বার কাজে মেয়ের এসে দাড়িয়েছে— প্রস্তত হচ্ছে তারা পৃথিবীর সর্বত্রই। তাদের মুখের উপর থেকেই যে কেবল ঘোমটা খসল তা নয়— যে ঘোমটার আবরণে তারা অধিকাংশ জগতের আড়ালে পড়ে গিয়েছিল সেই মনের ঘোমটাও তাদের খসছে। যে মানবসমাজে তার জন্মেছে সেই সমাজ আজ সকল দিকেই সকল বিভাগেই মুস্পষ্ট হয়ে উঠল তাদের দৃষ্টির সম্মুখে । এখন অন্ধ সংস্কারের কারখানায় গড়া পুতুলগুলো নিয়ে খেলা করা আর তাদের সাজবে না। তাদের স্বাভাবিক জীবপালিনী বুদ্ধি, কেবল ঘরের লোককে নয়, সকল লোককে রক্ষার জন্তে কায়মনে প্রবৃত্ত হবে । আদিকাল থেকে পুরুষ আপন সভ্যতাদুর্গের ইটগুলো তৈরি করেছে নিরস্তর নরবলির রক্তে— তার নির্মমভাবে কেবলই ব্যক্তিবিশেষকে মেরেছে কোনো-একটা সাধারণ নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে । ধনিকের ধন উৎপন্ন হয়েছে শ্রমিকের প্রাণ শোষণ করে ; প্রতাপশালীর প্রতাপের আগুন জালানো রয়েছে অসংখ্য দুর্বলের রক্তের আহুতি দিয়ে ; রাষ্ট্রস্বার্থের রথ চালিয়েছে প্রজাদের তাতে রজুবদ্ধ করে । এ সভ্যতা ক্ষমতার দ্বারা চালিত, এতে মমতার স্থান অল্প । শিকারের আমোদকে জয়যুক্ত ক’রে এ সভ্যতা বধ করে এসেছে অসংখ্য নিরীহ নিরুপায় প্রাণী ; এ সভ্যতায় জীবজগতে মানুষকে সকলের চেয়ে নিদারুণ করে তুলেছে মামুষের পক্ষে এবং অন্ত জীবের পক্ষে । বাঘের ভয়ে বাঘ উদবিগ্ন হয় না, কিন্তু এ সভ্যতায় পৃথিবী জুড়ে মামুষের ভয়ে মানুষ কম্পান্বিত। এই রকম অস্বাভাবিক অবস্থাতেই সভ্যতা আপন মুঘল আপনি প্রসব করতে থাকে। আজ তাই শুরু হল । সঙ্গে সঙ্গে ভীত মামুব শাস্তির কল বানাবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত, কিন্তু কলের শাস্তি তাদের কাজে লাগবে না শাস্তির উপায় যাদের অস্তরে নেই। ব্যক্তি-হননকারী el 3 কালান্তর একটা নাড়াচাড়া ঘটাতে গেলে মন্দিরের ভিত হবে বিদীর্ণ। প্রাণবান হুষ্টির ধারাকে বাচিয়ে রেখেও বড়ো রকম বিপর্যয় সাধন করবার যোগ্য অসামান্ত চারিত্রশক্তি এ দেশে সম্প্রতি কোথাও দেখা যাচ্ছে না, সে কথা স্বীকার করতেই হবে । দেশের যে-একটা মস্ত মিলনতীর্থ মহাত্মাজির শক্তিতে গড়ে উঠেছে এখনো সেটাকে তারই সহযোগিতায় রক্ষা করতে ও পরিণতি দান করতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তুমি জান আমার স্বভাবটা একেবারেই সনাতনী নয়— অর্থাৎ খুটিগাড়া মত ও পদ্ধতি অতীত কালে আড়ষ্ট ভাবে বদ্ধ হয়ে থাকলেই যে শ্রেয়কে চিরন্তন করতে পারলে, এ কথা আমি মানি নে। বর্তমান কনগ্রেস যত বড়ো মহং चकूर्च्छांनहे হোক না কেন তার সমস্ত মত ও লক্ষ্য যে একেবারে দৃঢ়নির্দিষ্ট ভাবে নির্বিকার নিশ্চল হয়ে গেছে, তাও সত্য হতেই পারে না। কোনো দিনই তা না হোক, এই আকাঙ্ক্ষা করি। কিন্তু এই কন্‌গ্রেসের পরম মূল্য যখন উপলব্ধি করি এবং এ কথাও যখন জানি এই কংগ্রেস একটি মহৎ ব্যক্তিস্বরূপের স্বষ্টি, তখন হঠাৎ একে সজোরে নাড়া দেবার উপক্রম দেখলে মন উৎকণ্ঠিত না হয়ে থাকতে পারে না । তখন এই কথাই মনে হয়, এর পরিণতি ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এর ভিতর থেকেই সঞ্চারিত করতে হবে । বাইরে থেকে কাটাছেড়া করে নয় । ইতিপূর্বে কনগ্রেসনামধারী যে প্রতিষ্ঠান ভারতবর্ষে আন্দোলন জাগিয়েছিল তার কথা তো জানা আছে। তার আন্দোলন ছিল বাইরের দিকে। দেশের জনগণের অস্তরের দিকে সে তাকায় নি, তাকে জাগায় নি, স্বদেশের পরিত্রাণের জন্তে সে করুণ দৃষ্টিতে পথ তাকিয়ে ছিল বাইরেকার উপরওয়ালার দিকে। পরবশতার ধাত্রীক্রেড়েই তার স্বাধীনতা আশ্রয় নিয়ে আছে, এই স্বপ্ন তার কিছুতে ভাঙতে চায় নি। সেদিনকার হাতজোড়-করা দোহাই-পাড়া মুক্তি \ごや8 কনগ্রেস so ফৌজের চিত্তদৈন্তকে বার বার ধিক্কার দিয়েছি, সে তুমি জান। হঠাৎ সেই তামসিকতার মধ্যে দেশের মুগু প্ৰাণে কে ছুইয়ে দিলে সোনার কাঠি, জাগিয়ে দিলে একমাত্র আত্মশক্তির প্রতি ভরসাকে, প্রচার করলে অহিংস্ৰ সাধনাকেই নিভাক বীরের সাধনারূপে । নব জীবনের তপস্তার সেই প্রথম পর্ব আজও সম্পূর্ণ হয় নি, আজও এ রয়েছে তারই হাতে যিনি একে প্রবর্তিত করেছেন। শিবের তপোণ্ডুমিতে নন্দী দাড়িয়ে ছিলেন ওষ্ঠ্যধরে তর্জনী তুলে, কেননা তপস্তা তখনো শেষ হয় নি— বাইরের অভিঘাতে তাকে ভাঙতে গিয়ে অগ্নিকাও হয়েছিল । এই তো গেল এক পক্ষের কথা, অপর পক্ষের সম্বন্ধেও ভাবনার কারণ প্রবল হয়ে উঠেছে। কনগ্রেস যত দিন আপন পরিণতির আরম্ভযুগে ছিল, তত দিন ভিতর দিক থেকে তার আশঙ্কার বিষয় অল্পই ছিল। এখন সে প্রভূত শক্তি ও খ্যাতি সঞ্চয় করেছে, শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে স্বীকার করে নিয়েছে সমস্ত পৃথিবী । সে কালের কনগ্রেস ষে রাজদরবারের রুদ্ধ দ্বারে বৃথা মাথা খোড়াখুড়ি করে মরত আজ সেই দরবারে তার সম্মান অবারিত, এমন কি সেই দরবার কনগ্রেসের সঙ্গে আপোষ করতে কুণ্ঠ বোধ করে না । কিন্তু মমু বলেছেন, সন্মানকে বিষের মতো জানবে। পৃথিবীতে যে দেশেই যে-কোনো বিভাগেই ক্ষমতা অতিপ্রভূত হয়ে সঞ্চিত হয়ে ওঠে সেখানেই সে ভিতরে ভিতরে নিজের মারণবিষ উদ্ভাবিত করে। ইম্পিরিয়ালিজম বলে, ফাসিজম বলো, অস্তরে অস্তরে নিজের বিনাশ নিজেই স্বষ্টি করে চলেছে। কনগ্রেসেরও অস্তঃসঞ্চিত ক্ষমতার তাপ হয়তো তার অস্বাস্থ্যের কারণ হয়ে উঠেছে ব’লে সন্দেহ করি । যারা এর কেন্দ্র স্থলে এই শক্তিকে বিশিষ্ট ভাবে অধিকার করে আছেন, সংকটের সময় তাদের ধৈর্যচুতি হয়েছে, বিচারবুদ্ধি সোজা পথে চলে নি। পরস্পরের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও সৌজন্ত, বে বৈধতা রক্ষা করলে বখাৰ্থ ভাবে কনগ্রেসের বল ও সন্মান রক্ষা হত, \ONo Go