কালান্তর/রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

‘রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত ধখন খবর পাই, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি সম্বন্ধে আমার বিশেষ মত কী তা আমার রচনা থেকে কেউ উদ্ধার করবার চেষ্টা করছেন, তখন নিশ্চিত জানি, আমার মতের সঙ্গে তার নিজের মত মিশ্রিত হবে ? দলিলের সাক্ষ্যের সঙ্গে উকিলের ব্যাখ্যা জড়িত হয়ে যে জিনিসটা দাড়ায় সেটাকে প্রমাণ বলে গণ্য করা চলে না । কেননা অন্ত পক্ষের উকিলও সেই একই দলিলকে বিপরীত কথা বলিয়ে থাকেন ; তার কারণ, বাছাই-করা বাক্যের বিশেষ অর্থ নির্ভর করে বিশেষরূপে বাছাই করার উপরেই। রাষ্ট্রনীতি সম্বন্ধে আমার মত আলোচনা করে সম্প্রতি ইংরেজি ভাষায় একখানি বই লেখা হয়েছে। ব্যক্তিগত দিক থেকে আমি লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞ ; তিনি আমার প্রতি অসম্মান প্রকাশ করবার চেষ্টা করেন নি, শ্রদ্ধা করেই লিখেছেন। আমার প্রতি তার মনের অমুকুল ভাব থাকাতেই, আমার মতকে অনেক অংশে প্রচলিত মতের অমুকুল করে সাজিয়ে আমাকে সাধারণের প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করবার চেষ্টা করেছেন । বইখানি আমাকে পড়তে হল। কেননা, আমার রাষ্ট্রনৈতিক মত কোনো পাঠকের কাছে কী রকম প্রতীত হয়েছে তা জানবার কৌতুহল সামলাতে পারি নি। আমি জানি, আমার মত ঠিক যে কী তা সংগ্ৰহ করা সহজ নয় । বাল্যকাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশের নানা অবস্থা এবং আমার নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘকাল আমি চিস্তা করেছি এবং Political Philosophy of Rabindranath by Sachindranath Sen ළු89 কালান্তর কাজও করেছি। যেহেতু বাক্য রচনা করা আমার স্বভাব সেইজন্তে যখন যা মনে এসেছে তখনি তা প্রকাশ করেছি। রচনাকালীন সময়ের সঙ্গে, প্রয়োজনের সঙ্গে সেইসব লেখার যোগ বিচ্ছিন্ন করে দেখলে তার সম্পূর্ণ তাৎপর্ব গ্রহণ করা সম্ভবপর হয় না। যে মানুষ মুদীর্ঘ কাল থেকে চিস্তা করতে করতে লিখেছে তার রচনার ধারাকে ঐতিহাসিকভাবে দেখাই সংগত। যেমন এ কথা বলা চলে না যে, ব্রাহ্মণ-আদি চারি বর্ণ স্বষ্টির আদিকালেই ব্ৰহ্মার মুখ থেকে পরিপূর্ণ স্বরূপে প্রকাশ পেয়েছে, যেমন স্বীকার করতেই হবে আর্যজাতির সমাজে বর্ণভেদের প্রথ। কালে কালে নানা রূপাস্তরের মধ্যে দিয়ে পরিণত, তেমনি করেই অন্তত আমার সম্বন্ধে জান চাই যে fরাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়ে কোনো বাধা মত একেবারে মুসম্পূর্ণভাবে কোনো-এক বিশেষ সময়ে আমার মন থেকে উৎপন্ন হয় নি, জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে নানা পরিবর্তনের মধ্যে তারা গড়ে উঠেছে সেই-সমস্ত পরিবর্তনপরম্পরার মধ্যে নিঃসন্দেছ একটা ঐক্যস্বত্র আছে। সেইটিকে উদ্ধার করতে হলে রচনার কোন অংশ মুখ্য, কোন অংশ গৌণ, কোনটা তংসাময়িক, কোনটা বিশেষ সময়ের সীমাকে অতিক্রম করে প্রবহমান, সেইটে বিচার করে দেখা চাই । বস্তুত সেটাকে অংশে অংশে বিচার করতে গেলে পাওয়া যায় না, সমগ্রভাবে অনুভব করে তবে তাকে পাই । বইখানি পড়ে আমি নিজের মতের ঠিক চেহারাট পেলুম না । মন বাধা পেল । বাধা পাবার অন্তান্ত কারণের মধ্যে একটা কারণ এই যে, এর মধ্যে অনেক তর্জমা আছে যার ভাষা অামার নয়, অথচ আমার যে নয় তার নিদর্শন নেই। ভাষার ইঙ্গিত অনেকখানি কথা কয়। সেট। ৰখন বাদ পড়ে তখন কথার অর্থ পাওয়া যায়, কিন্তু তার ব্যঞ্জন মারা পড়ে। আর যাই হোক, নিজের ভাষার দায়িত্ব নিজেকে নিতেই হয়, কিন্তু অন্তের ভাষার দায়িত্ব নেওয়া চলে না। f

  • 38 & রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত

তবু এই ক্রটিকেও উপেক্ষা করা চলে, কিন্তু এ কথা বলতেই হল যে, নানা লেখা থেকে বাক্য চয়ন করে আমার মতের যে-একটা মূর্তি দেওয়া হয়েছে তাতে অংশত হয়তো সব কথাই আছে কিন্তু সমগ্রত মোট কথাটা প্রকাশ পায় নি। এ রকম হওয়াটা বোধ করি অবশুভাৰী । কোন কথাটার গুরুত্ব বেশি, কোনটার কম, লেখক সেটা স্বভাৰত নিজের অভিমত ও রুচির দ্বারা স্থির করেন এবং সেই ভাবেই সমস্তটাকে গড়ে Cötび研F ] এই উপলক্ষ্যে আমার সমস্ত চিত্তার ক্ষেত্রের উপর নিজেকে একবার দৃষ্টিক্ষেপ করতে হল। ঐ রাষ্ট্রক সমস্ত সম্বন্ধে আমি কী ভেবেছি, কী বলতে চেয়েছি, তা নিজেই কুড়িয়ে এনে সংক্ষেপে অঁাটি বাধবার চেষ্টা করা ভালো মনে করি । এজন্তে দলিল ঘঁটিব না, নিজের স্মৃতির উপরিতলে স্পষ্ট হয়ে যা জেগে অাছে তারই অমুসরণ করব । ) বালককালের অনেক প্রভাব জীবনপথে শেষ পর্যন্ত সঙ্গী হয়ে থাকে ; প্রত্যক্ষ না থাকলেও তাদের প্রণোদনা থেকে যায়। আমাদের ব্রান্ধপরিবার আধুনিক হিন্দুসমাজের বাহ আচারবিচার ক্রিয়াকর্মের নানা আবপ্তিক বন্ধন থেকে বিযুক্ত ছিল । আমার বিশ্বাস, সেই কিছু-পরিমাণ দুরত্ব-বশতই ভারতবর্ষের সর্বজনীন সর্বকালীন অাদর্শের প্রতি আমার গুরুজনদের শ্রদ্ধা ছিল অত্যস্ত প্রৰল। সেই গৌরববোধ সে দিন নানা আকারে আমাদের বাড়ির অস্তঃপ্রকৃতি ও বাইরের ব্যবহারকে অধিকার করেছে। তখনকার দিনে প্রচলিত আনুষ্ঠানিক হিন্দুধর্মের প্রতি ধাদের আস্থা বিচলিত হ’ত, তাদের মনকে হয় যুরোপের অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশেষ ছাদের নাস্তিকতা অথবা খৃস্টানধর্মপ্রবণতা পেয়ে বসত। কিন্তু এ কথা সকলের জানা যে, লে কালে আমাদের পরিবারে ভারতেরই শ্রেষ্ঠ আদর্শের অনুসরণ করে ভারতের ধর্ম সংস্কার করবার উৎসাহ সর্বদা জাগ্রত ছিল। Wogo কালান্তর বলা বাহুল্য, বালককালে স্বভাবতই সেই উৎসাহ আমার মনকে একটি বিশেষ ভাবে দীক্ষিত করেছে। সেই ভাবটি এই যে, জীবনের যা কিছু মহত্তম দান তার পূর্ণ বিকাশ আমাদের অন্তঃপ্রকৃতির মধ্য থেকেই। আমাদের স্বভাবসীমার বাইরে শ্রেষ্ঠ জিনিসের অভাব নেই, লোভনীয় পদার্থ অনেক আছে, সে-সমস্তকে আমরা গ্রহণ করতে পারি নে যদি না আমাদের প্রকৃতির মধ্যে তাদের আত্মসাৎ করি। যখন আমরা বাইরের কিছুতে মুগ্ধ হই তখন লুব্ধ মন অমুকরণের মরীচিকা-বিস্তারের দ্বারা তাকে নেবার জন্তে ব্যগ্র হয়। অনুকরণ প্রায় অতিকরণে পৌছয় ; তাতে রঙ চড়াই বেশি, তার আওয়াজ হয় প্রবল, তার আস্ফালন হয় অত্যুগ্র ; অত্যন্ত জোর করে নিজের কাছে প্রমাণ করতে চেষ্টা করি জিনিসটা আমারই, অথচ নানা দিক থেকে তার ভঙ্গুরতা, তার আত্মবিরোধ প্রকাশ পেতে থাকে। বাইরের জিনিসকে যখন আপন অস্তরের করি তখন তার ভাবটা বজায় থাকতে পারে, তবু তার প্রকাশটা হয় নিজের মতো। কিন্তু যত ক্ষণ সেটা আমাদের বাইরে জোড় থাকে, ভিতরে মিলে না যায়, তত ক্ষণ সেটা হয় মোট কলমে দাগ বোলানো অক্ষরের মতো, মূলের চেয়ে আকারে বড়ো, কিন্তু একেবারে তার গায়ে গায় সংলগ্ন । তার থেকে স্বতন্ত্র হয়ে সে অক্ষর লেখকের আপন বাক্যে লেখকের অাপন চিস্তিত ভাবকে লিপিবদ্ধ করতে পারে না । আমাদের রাষ্ট্রীয় চেষ্টায়, বাইরে থেকে, ইস্কুলে পড়ার বই থেকে আমরা বা পেয়েছি তা আমাদের প্রাণে সর্বাঙ্গীন হয়ে ওঠে নি ব’লেই, অনেক সময় তার বাইরের ছাদটাকেই খুব আড়ম্বরের সঙ্গে রেখায় রেখায় মেলাবার গলদঘর্ম চেষ্টা করি— এবং সেই মিলটুকু ঘটিয়েই মনে করি, যা পাবার তা পেয়েছি, যা করবার তা করা হল । ‘সাধনা’ পত্রিকায় রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আমি প্রথম আলোচনা শুরু করি। \988 রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত তাতে আমি এই কথাটার উপরেই বেশি জোর দিয়েছি। তখনকার দিনে চোখ রাঙিয়ে ভিক্ষা করা ও গলা মোট করে গর্মেন্টকে জুজুর ভয় দেখানোই আমরা বীরত্ব ব'লে গণ্য করতেম। আমাদের দেশে পোলিটিকাল অধ্যবসায়ের সেই অবাস্তব ভূমিকার কথাটা আজকের দিনের তরুণেরা ঠিকমতে কল্পনা করতেই পারবেন না । তখনকার পলিটিকৃসের সমস্ত আবেদনটাই ছিল উপরওয়ালার কাছে, দেশের লোকের কাছে একেবারেই না। সেই কারণেই প্রাদেশিক রাষ্ট্রসন্মিলনীতে, গ্রাম্যজনমণ্ডলীসভাতে, ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করাকে কেউ অসংগত বলে মনে করতেই পারতেন না } রাজশাহী-সম্মিলনীতে নাটোরের পরলোকগত মহারাজা জগদিন্দ্রনাথের সঙ্গে চক্রাস্ত করে সভায় বাংলাভাষা প্রবর্তন করবার প্রথম চেষ্ট যখন করি, তখন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় প্রভৃতি তৎসাময়িক রাষ্ট্রনেতারা আমার প্রতি একান্ত ক্রুদ্ধ হয়ে কঠোর বিদ্রুপ করেছিলেন । বিদ্রুপ ও বাধা আমার জীবনের সকল কর্মেই আমি প্রচুর পরিমাণেই পেয়েছি, এ ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয় নি। পর বৎসরে রুগ্ন শরীর নিয়ে ঢাকা-কনফারেন্সেও আমাকে এই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হতে হয়েছিল। আমার এই হুষ্টিছাড়া উৎসাহ উপলক্ষ্যে তখন এমনতরো একটা কানাকানি উঠেছিল যে, ইংরেজি ভাষায় আমার দখল নেই ব’লেই রাষ্ট্রসতার মতো অজায়গায় আমি বাংলা চালাবার উদযোগ করেছি। বাঙালির ছেলের পক্ষে যে গালি সব চেয়ে লজ্জার সেইটেই সে দিন আমার প্রতি প্রয়োগ করা হয়েছিল, অর্থাৎ ইংরেজি আমি জালি নে । এত বড়ো ছঃসছ লাঞ্ছনা আমি নীরবে সহ করেছিলুম তার একটা কারণ, ইংরেজিভাষা-শিক্ষায় বাল্যকাল থেকে আমি সত্যই অবহেলা করেছি ; দ্বিতীয় কারণ, পিতৃদেবের শাসনে তখনকার দিনেও আমাদের পরিবারে পরম্পর পত্র লেখা প্রভৃতি ব্যাপারে ইংরেজিভাষা-ব্যবহার অপমানজনক বলে গণ্য হ’ত । \う8● কালান্তর ইতিমধ্যে কার্জন লাটের হুকুমে দিল্লির দরবারের উদযোগ হল। তখন রাজশাসনের তর্জন স্বীকার করেও আমি তাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলুম। সেই প্রবন্ধ যদি হলে আমলের পাঠকেরা পড়ে দেখেন তবে দেখবেন, ইংরেজের সঙ্গে ভারতবাসীর রাষ্ট্রক সম্বন্ধের বেদন ও অপমানটা যে কোথায়, আমার সেই লেখায় কতকটা প্রকাশ করেছি। আমি এই বলতে চেয়েছিলুম, দরবার জিনিসটা প্রাচ্য ; পাশ্চাত্য কর্তৃপক্ষ যখন সেটা ব্যবহার করেন তখন তার যেটা শূন্তের দিক সেইটিকেই জাহির করেন, যেটা পূর্ণের দিক সেটাকে নয়। প্রাচ্য অনুষ্ঠানের প্রাচ্যতা কিসে? সে হচ্ছে দুই পক্ষের মধ্যে আত্মিক সম্বন্ধ স্বীকার করা । তরবারির জোরে প্রতাপের যে সম্বন্ধ সে হল বিরুদ্ধ সম্বন্ধ, আর প্রভূত দাক্ষিণ্যের দ্বারা যে সম্বন্ধ সেইটেই নিকটের । দরবারে সম্রাট আপন অজস্র ঔদার্য প্রকাশ করবার উপলক্ষ্য পেতেন ; সেদিন তার দ্বার অবারিত, তার দান অপরিমিত । পাশ্চাত্য সকল দরবারে সেই দিকটাতে কঠিন কৃপণতা, সেখানে জনসাধারণের স্থান সংকীর্ণ, পাহারাওয়ালার অস্ত্রে শস্ত্রে রাজপুরুষদের সংশয়বুদ্ধি কণ্টকিত, তার উপরে এই দরবারের ব্যয়-বহনের ভার দরবারের অতিথিদেরই Pপরে । কেবলমাত্র নতমস্তকে রাজার প্রতাপকে স্বীকার করাবার জন্তেই এই দরবার। উৎসবের সমারোহ দ্বারা পরস্পরের সম্বন্ধের অন্তর্নিহিত অপমানকেই আড়ম্বর করে বাইরে প্রকাশ করা হয়। এই কৃত্রিম হৃদয়হীন আড়ম্বরে প্রাচ্যহৃদয় অভিভূত হতে পারে, এমন কথা চিন্তা করার মধ্যেও অবিমিশ্র ঔদ্ধত্য এবং প্রজার প্রতি অপমান । ভারতবর্ষে ইংরেজের প্রভূত্ব তার আইলে, তার মন্ত্ৰগৃছে, তার শাসনতন্ত্রে ব্যাপ্তভাবে আছে, কিন্তু সেইটেকে উংসবের আকার দিয়ে উৎকট করে তোলার কোনো প্রয়োজন মাত্রই নেই। বরঞ্চ এই রকম কৃত্রিম উৎসৰে স্পষ্ট করে প্রকাশ করে দেওয়া হয় W380 রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত যে, ভারতবর্ষে ইংরেজ খুব কঠিন হয়ে আছে কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের মানবসম্বন্ধ নেই, যান্ত্রিক সম্বন্ধ। এ দেশের সঙ্গে তার লাভের যোগ আছে, ব্যবহারের যোগ আছে, হৃদয়ের যোগ নেই। কর্তব্যের জালে দেশ আবৃত, সেই কর্তব্যের নৈপুণ্য এবং উপকারিতা স্বীকার করলেও আমাদের মানবপ্রকৃতি স্বভাবতই সেই প্রাণহীন শাসনতন্ত্রে পীড়। বোধ করে । g এই বেদনাই মনে নিয়ে আমার লেখায় আমি বিশেষ করে এবং বার বার করে বলেছি যে, ভারতবাসী যদি ভারতবর্ষের সকল প্রকার হিতকর দান কোনো একটি প্রবল শক্তিশালী যন্ত্রের হাত দিয়েই চিরদিন গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়, তা হলে তার সুবিধা সুযোগ যতই থাকৃ, তার চেয়ে দুৰ্গতি আমাদের আর হতেই পারে না । সরকারবাহন্থের-নামক একটা । অমানবিক প্রভাব ছাড়া আমাদের অভাবনিবারণের আর কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই, এই রকম ধারণা মনে বদ্ধমূল হতে দেওয়াতেই আমরা নিজের দেশকে নিজে যথার্থভাবে হারাই । আমাদের নিজের দেশ যে আমাদের নিজের হয় নি তার প্রধান কারণ এ নয় যে, এ দেশ বিদেশীর শাসনাধীনে। আসল কথাটা এই যে, ষে দেশে দৈবক্রমে জন্মেছি মাত্র সেই দেশকে সেবার দ্বারা ত্যাগের দ্বারা, তপস্ত। দ্বারা, জানার দ্বারা, বোঝার দ্বারা সম্পূর্ণ আত্মীয় করে তুলি নি ; একে অধিকার করতে পারি নি। নিজের বুদ্ধি দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, প্রেম দিয়ে যাকে গড়ে তুলি তাকেই আমরা অধিকার করি , তারই পরে অন্তায় আমরা মরে গেলেও সহ্য করতে পারি নে। কেউ কেউ বলেন, আমাদের দেশ পরাধীন ব’লেই তার সেবা সম্বন্ধে দেশের লোক উদাসীন। এমন কৰা শোনবার যোগ্য নয়। সত্যকার প্ৰেম অমুকুল প্রতিকূল সকল অবস্থাতেই সেবার ভিতর দিয়ে স্বতই আত্মত্যাগ করতে উষ্ঠত হয়। বাধা পেলে তার উত্তম বাড়ে বই কমে না। আমরা কন্‌গ্রেস করেছি, তীব্র ভাষায় হৃদয়াৰেগ \©ፀዋ কালান্তর প্রকাশ করেছি ; কিন্তু যে-সব অভাবের তাড়নায় আমাদের দেহ রোগে জীর্ণ, উপৰাসে শীর্ণ কর্মে অপটু, আমাদের চিত্ত অন্ধসংস্কারে ভারাক্রান্ত, আমাদের সমাজ শত খণ্ডে খণ্ডিত, তাকে নিজের বুদ্ধির দ্বারা, বিদ্যার দ্বারা, সংঘবদ্ধ চেষ্ট দ্বারা দূর করবার কোনো উদযোগ করি নি। কেবলই নিজেকে এবং অন্তকে এই ব’লেই ভোলাই যে, যে দিন স্বরাজ হাতে আসবে তার পরদিন থেকেই সমস্ত আপনিই ঠিক হয়ে যাবে। এমনি করে কর্তব্যকে মুদূরে ঠেকিয়ে রাখা, অকৰ্মণ্যতার শূন্তগর্ভ কৈফিয়ত রচনা করা, নিরুৎসুক নিরুদ্যম দুর্বল চিত্তেরই পক্ষে সম্ভব। আমাদের দেশকে সম্পূর্ণভাবে কেউই কেড়ে নিতে পারে না, এবং সেই দেশকে বাইরে থেকে দয়া করে কেউ আমাদের হাতে তুলে দেবে এমন শক্তি কারও নেই। দেশের পরে নিজের স্বাভাবিক অধিকারকে যে পরিমাণে আমরা ত্যাগ করেছি সেই পরিমাণেই অন্তে তাকে অধিকার করেছে । এই চিস্তা করেই এক দিন আমি ‘স্বদেশী সমাজ’ নাম দিয়ে একটি বক্তৃতা করেছিলুম। তার মর্মকথাটা আর-এক বার ংক্ষেপে বলবার প্রয়োজন আছে । চিরদিন ভারতবর্ষে এবং চীনদেশে সমাজতন্ত্রই প্রবল, রাষ্ট্রতন্ত্র তার নীচে । দেশ যথার্থভাবে আত্মরক্ষা করে এসেছে সমাজের সম্মিলিত শক্তিতে। সমাজই বিস্তার ব্যবস্থা করেছে, তৃষিতকে জল দিয়েছে, ক্ষুধিতকে অন্ন, পূজাৰীকে মন্দির, অপরাধীকে দও, শ্রদ্ধেয়কে শ্রদ্ধা ; গ্রামে গ্রামে দেশের চরিত্রকে রক্ষিত এবং তার ঐকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দেশের উপর দিয়ে রাজ্য-সাম্রাজ্যের পরিবর্তন হয়ে গেল, স্বদেশী রাজায় রাজায় নিয়তই রাজত্ব নিয়ে হাত-ফেরাফেরি চলল, বিদেশী রাজারা এসে সিংহাসন-কাড়াকড়ি করতে লাগল, লুঠপট অত্যাচারও কম হল না, কিন্তু তবু দেশের আত্মরক্ষা হয়েছে, যেহেতু সে আপন কাজ আপনি করেছে, তার অন্নবস্ত্র ধর্মকর্ম সমস্তই তার আপনারই হাতে । יל50\ ब्र६ौठनाएथंद्र ब्रांप्लेरेनडिरु भङ এমনি করে দেশ ছিল দেশের লোকের ; রাজ ছিল তার এক অংশে মাত্র, মাথার উপর যেমন মুকুট থাকে তেমনি । রাষ্ট্রপ্রধান দেশে রাষ্ট্ৰতন্ত্রের মধ্যেই বিশেষভাবে বদ্ধ থাকে দেশের মর্মস্থান ; সমাজপ্রধান দেশে দেশের প্রাণ সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে থাকে। রাষ্ট্রপ্রধান দেশের রাষ্ট্ৰতন্ত্রের পতনে দেশের অধঃপতন, তাতেই সে মারা যায়। গ্রীস রোম এমনি করেই মারা গিয়েছে। কিন্তু চীন ভারত রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ভিতর দিয়েই সুদীর্ঘকাল আত্মরক্ষা করেছে, তার কারণ সর্বব্যাপী সমাজে তার আত্মা প্রসারিত । 颅 পাশ্চাত্য রাজার শাসনে এইখানে ভারতবর্ষ আঘাত পেয়েছে। গ্রামে গ্রামে তার যে সামাজিক স্বরাজ পরিব্যাপ্ত ছিল, রাজশাসন তাকে অধিকার করলে । যখন থেকে এই অধিকার পাকা হয়ে উঠল তখন থেকে গ্রামে গ্রামে দিঘিতে গেল জল শুকিয়ে, জীর্ণ মন্দিরে শূন্ত অতিথিশালায় উঠল অশথ গাছ, জাল-জালিয়াতি মিথ্যা-মকদ্দমাকে বাধা দেবার কিছু রইল না, রোগে তাপে দৈন্তে অজ্ঞানে অধৰ্মে সমস্ত দেশ রসাতলে তলিয়ে গেল । 驅 সকলের চেয়ে বিপদ হল এই যে, দেশ দেশের লোকের কাছে কিছু চাইলে আর সাড়া পায় না। জলদান বিস্তাদান সমস্তই সরকার-বাছাছুরের মুখ তাকিয়ে। এইখানেই দেশ গভীরভাবে আপনাকে হারিয়েছে। দেশের লোকের সঙ্গে দেশ যথার্থভাবে সেবার সম্বন্ধস্বত্রে যুক্ত, সেইখানেই ঘটেছে মর্মান্তিক বিচ্ছেদ । আগে স্বরাজ পেলে তৰে সেই স্বাভাবিক সম্বন্ধের কাজ চলতে থাকবে এ কথা বলাও যা, আর, আগে ধন লাভ হবে তার পরে ছেলে মাকে স্বীকার করবে এ কথা বলাও তাই । দারিদ্র্যের মধ্যেও স্বাভাবিক সম্বন্ধের কাজ চলা উচিত— বস্তুত সেই অবস্থায় সম্বন্ধের দাৰি বাড়ে বই কমে না। স্বদেশী-সমাজে তাই আমি বলেছিলুম ইংরেজ আমাদের রাজা কিম্বা আর-কেউ আমাদের রাজা ○8為 কালীম্ভর 嘯 التي এই কথাটা নিয়ে বকাকি ক'রে সময় নষ্ট না-ক'রে সেৰা ৰাম, ত্যাগের দ্বারা নিজের দেশকে নিজে সত্যভাবে অধিকার করৰার ৯ে৯ সর্বাগ্রে করতে হবে। দেশের সমস্ত বুদ্ধিশক্তি ও কর্মশক্তিকে সংঘবদ্ধ আকারে কেমন করে দেশে বিস্তীর্ণ করা যেতে পারে, স্বদেশী-সমাজে আমি তারই আদর্শ ব্যাখ্যা করেছিলুম। খন্দর-পরা দেশই যে সমগ্র দেশের সম্পূর্ণ আদর্শ এ কথা আমি কোনোমতেই মানতে পারি নে ? যখন দেশের আত্মা সজাগ ছিল তখন সে যে কেবলমাত্র আপন তাতে বোন কাপড় আপনি পরেছে তা নয়, তখন তার সমাজে তার বহুধা শক্তি বিচিত্র স্বষ্টিতে আপনাকে সার্থক করেছে। আজ সমগ্রভাবেই সেই শক্তির দৈন্ত ঘটেছে, কেবলমাত্র চরকায় সুতো কাটবার শক্তির দৈন্ত নয়। আজ আমাদের দেশে চরকালাঞ্ছন পতাকা উড়িয়েছি। এ যে সংকীর্ণ জড়শক্তির পতাকা, অপরিণত যন্ত্রশক্তির পতাকা, স্বল্পবল পণ্যশক্তির পতাকা— এতে চিত্তশক্তির কোনো আহবান নেই। সমস্ত জাতিকে মুক্তির পথে যে আমন্ত্রণ সে তো কোনো বাহ প্রক্রিয়ার অন্ধ পুনরাবৃত্তির আমন্ত্রণ হতে পারে না। তার জন্তে আবশুক পূর্ণ মনুষ্যত্বের উদবোধন ; লে কি এই চরকা-চালনায় ? চিস্তাবিহীন মূঢ় বাহ অনুষ্ঠানকেই ঐছিক পরিত্রিক সিদ্ধিলাভের উপায় গণ্য করেই কি এত কাল জড়ত্বের বেষ্টনে আমরা মনকে কর্মকে আড়ষ্ট করে রাখি নি ? অামাদের দেশের সব চেয়ে বড়ো দুৰ্গতির কারণ কি তাই নয় ? আজ কি আকাশে পতাকা উড়িয়ে বলতে হবে, বুদ্ধি চাই নে, বিস্ত চাই নে, প্রতি চাই নে, পৌরুব চাই নে, আস্তর-প্রকৃতির মুক্তি চাই নে, সকলের চেয়ে বড়ো ক’রে একমাত্ৰ ক’রে চাই, চোখ বুজে, মনকে বুজিয়ে দিয়ে হাত চালানো, বহু সহস্ৰ বংলর পূর্বে যেমন চালানো হয়েছিল তারই অনুবর্তন ক’রে ? স্বরাজ-সাধন-যাত্রায় এই হল রাজপথ ? jএমন কথা বলে মাছুষকে Woot o রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত कि चनबान का इव ना ? বভক্ত যখন সমগ্রভাবে দেশের বুদ্ধিশক্তি কর্মশক্তি উত্তত থাকে তখন অন্ত দেশ থেকে কাপড় কিনে পরলেও স্বরাজের মূলে আঘাত লাগে ন। গাছের গোড়ায় বিদেশী সাৰু দিলেই গাছ বিদেশী ছয় না, যে মাটি তার স্বদেশী তার মূলগত প্রাধান্ত থাকলে ভাবনা নেই। পৃথিবীতে স্বরাজী এমন কোনো দেশই নেই যেখানে অন্ত দেশের আমদানি জিনিস বহুল পরিমাণে ব্যবহার না করে। কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গেই তারা নানা চেষ্টায় আপন শক্তিকে ও সার্থক করছে— কেবল এক দিকে নয়, কেবল বণিকের মতো পণ্য-উৎপাদনে নয়, বিস্তা-অর্জনে, বুদ্ধির আলোচনায়, লোকহিতে, শিল্পসাহিত্য-স্থষ্টিতে, মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশে । সে দিকে যদি আমাদের দেশে অভাব থাকে তবে নিজের হাত দুটোকে মনোবিহীন কল-আকারে পরিণত করে আমরা যতই স্বতে কাটি আর কাপড় বুনি আমাদের লজ্জা যাবে না, আমরা স্বরাজ পাব না । আমি প্রথম থেকেই রাষ্ট্রীয় প্রসঙ্গে এই কথাই বারম্বার বলেছি, যে কাজ নিজে করতে পারি সে কাজ সমস্তই বাকি ফেলে, অন্তের উপরে অভিযোগ নিয়েই অহরহ কর্মহীন উত্তেজনার মাত্রা চড়িয়ে দিন কাটানোকে আমি রাষ্ট্রীয় কর্তব্য বলে মনে করি নে। আপন পক্ষের কথাটা সম্পূর্ণ ভুলে আছি ব'লেই অপর পক্ষের কথা নিয়ে এত অত্যন্ত অধিক করে আমরা আলোচনা করে থাকি । তাতে শক্তিত্ত্বাস হয় । স্বরাজ হাতে পেলে আমরা স্বরাজের কাজ নির্বাহ করতে পারব, তার পরিচয় স্বরাজ পাবার আগেই দেওয়া চাই। সে পরিচয়ের ক্ষেত্র প্রশস্ত। দেশের লেবার মধ্যে দেশের প্রতি প্রীতির প্রকাশ কোনো বাহ অবস্থাগুরের অপেক্ষ করে না, তার নির্ভর একমাত্র আস্তরিক সত্যের প্রতি । আজ যদি দেখি সেই প্রকাশ অলল উদtলীন, তবে বাহিরের অনুগ্ৰছে বাহ স্বরাজ পেলেই অস্তরের সেই জড়তা দূর হবে, এ \రి( ) কালাস্তর কথা আমি বিশ্বাস করি নে। আগে আমাদের বাহিরের বাধা দূর হবে, তার পরে আমাদের দেশপ্রীতি অস্তরের বাধা ভেদ করে পরিপূর্ণ শক্তিতে দেশের সেবায় নিযুক্ত হবে, এমন আত্মবিড়ম্বনার কথা আমরা যেন না বলি।) যে মাহব বলে “আগে ফাউণ্টেন-পেল পাব তার পরে মহাকাব্য লিখব, বুঝতে হবে তার লোভ ফাউণ্টেন-পেনের প্রতিই, মহাকাব্যের প্রতি নয় । যে দেশাত্মবোধী বলে ‘আগে স্বরাজ পেলে তার পরে স্বদেশের কাজ করব, তার লোভ পতাকা-ওড়ানো উfদ-পরা স্বরাজের রঙকরা কাঠামোটার পরেই। একজন আর্টিস্টুকে জানি, তিনি অনেক দিন থেকে বলে এসেছিলেন, ‘রীতিমতো স্ট ডিয়ে আমার অধিকারে না পেলে আমি হাতের কাজ দেখাতে পারব না।’ তার স্ট ডিয়ে জুটল, কিন্তু হাতের কাজ আজও এগোয় না। যত দিন স্ট ডিয়ে ছিল না তত দিন ভাগ্যকে ও অন্ত সকলকে কৃপণ বলে দোষ দেবার সুযোগ তার ছিল ; স্ট ডিয়ো পাবার পর থেকে তার হাতও চলে না, মুখও চলে না স্বরাজ আগে আসবে, স্বদেশের সাধনা তার পরে, এমন কথাও তেমনিই সত্যহীন, এবং ভিত্তিহীন এমন স্বরাজ । অগ্রহায়ণ ১৩৩৬ \3& R