কালান্তর/শক্তিপূজা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

শক্তিপূজা বাতায়নিকের পত্রে আমি শক্তিপূজার যে আলোচনা করেছি সে সম্বন্ধে সাময়িক-পত্রে একাধিক লোকে প্রতিবাদ লিখেছেন । আমাদের দেশে শিব এবং শক্তির স্বরূপ সম্বন্ধে ছুটি ধারা দেখতে পাই। তার মধ্যে একটিকে শান্ত্রিক এবং আর-একটিকে লৌকিক বলা যেতে পারে। শান্ত্রিক শিব যতী, বৈরাগী। লৌকিক শিব উন্মত্ত, উচ্ছৃঙ্খল। বাং৬ মঙ্গলকাব্যে এই লৌকিক শিবেরই বর্ণনা দেখতে পাই । এমন কি, রাজসভার কবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে শিবের যে চরিত্র বর্ণিত সে আর্যসমাজসম্মত নয়। শক্তির যে শান্ত্রিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায় আমি তা স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু বাংলা মঙ্গলকাব্যে শক্তির যে স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে সে লৌকিক, এবং তার ভাব অন্তরূপ । সংসারে যারা পীড়িত, যারা পরাজিত, অথচ এই পীড়া ও পরাজয়ের যারা কোনো ধর্মসংগত কারণ দেখতে পাচ্ছে না, তারা স্বেচ্ছাচারিণী নিষ্ঠুর শক্তির অন্যায় ক্রোধকেই সকল দুঃখের কারণ বলে ধরে নিয়েছে— এবং সেই ঈর্ষাপরায়ণ। শক্তিকে স্তবের দ্বারা, পূজার দ্বারা, শান্ত করবার আশাই এই-সকল মঙ্গলকাব্যের প্রেরণা | প্রচও দেবতার যথেচ্ছাচারের বিভীষিকা মানবজাতির প্রথম পূজার মূলে দেখতে পাওয়া যায়। তার কারণ মানুষ তখনো বিশ্বের মূলে বিশ্বনিয়মকে দেখতে পায় নি এবং তখন সে সর্বদাই ভয়বিপদের দ্বারা বেষ্টিত। তখন শক্তিমানের আকস্মিক ঐশ্বৰ্ষলাভ সর্বদাই চোখে পড়ছে, এবং আকস্মিকতারই প্রভাব মানবসমাজে সব চেয়ে উগ্রভাবে দৃপ্তমান। যে সময়ে কবিকঙ্কণ-চণ্ডী অন্নদামঙ্গল লিখিত হয়েছে সে সময়ে )●切 শক্তিপূজা মানুষের আকস্মিক উত্থানপতন বিস্ময়কর রূপে প্রকাশিত হত। তখন চার দিকেই শক্তির সঙ্গে শক্তির সংঘাত চলছে, এবং কার ভাগ্যে কোন দিন যে কী আছে তা কেউ বলতে পারছে না। যে ব্যক্তি শক্তিমানকে ঠিকমতো স্তব করতে জানে, যে ব্যক্তি সত্যমিথ্যা দ্যায় অন্যায় বিচার করে না, তার সমৃদ্ধিলাভের দৃষ্টাস্ত তখন সর্বত্র প্রত্যক্ষ । চণ্ডীশক্তিকে প্রসন্ন করে তাকে নিজের ব্যক্তিগত ইষ্টলাভের অমুকুল করা তখন অস্তত এক শ্রেণীর ধর্মসাধনার প্রধান অঙ্গ ছিল ; তখনকার ধনীমানীরাই বিশেষত এই শ্রেণীভুক্ত ছিল, কেননা তখনকার শক্তির ঝড় তাদের উচ্চ চূড়ার উপরেই বিশেষ করে আঘাত করত। শাস্ত্রে দেবতার যে স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে সেইটেই যে আদিম এবং লৌকিকটাই যে আধুনিক, এ কথা বিশিষ্ট প্রমাণ ব্যতীত মানা যায় না । আমার বিশ্বাস, অনার্যদের দেবতাকে একদিন আর্যভাবের দ্বারা শোধন ক’রে স্বীকার ক’রে নেবার সময় ভারতবর্ষে উপস্থিত হয়েছিল । সেই সময়ে যে-সব দেবতা ভারতবর্ষের সাধুসমাজে প্রবেশ করেছিল তাদের চরিত্রে অসংগতি একেবারে দূর হতে পারে নি ; তাদের মধ্যে আজও আর্য অনার্য দুই ধারা মিশ্রিত হয়ে আছে এবং লৌকিক ব্যবহারে সেই অনার্যধারারই প্রবলতা অধিক । খৃস্টধর্মের বিকাশেও আমরা এই জিনিসটি দেখতে পাই । য়িহুদির জিহোবা এক কালে মুখ্যত য়িহুদিজাতিরই পক্ষপাতী দেবতা ছিলেন। তিনি কিরকম নিষ্ঠুর ঈর্ষাপরায়ণ ও বলিপ্রিয় দেবতা ছিলেন তা ওল্ড, টেস্টামেণ্ট, পড়লেই বোঝা যায় । সেই দেবতা ক্রমশ য়িহুদি সাধুঋষিদের বাণীতে এবং অবশেষে যিশু খৃস্টের উপদেশে সর্বমানবের প্রেমের দেবতা হয়ে প্রকাশ পেয়েছেন । কিন্তু, তার মধ্যে আজও ষে দুই বিরুদ্ধতাৰ জড়িয়ে আছে তা লৌকিক ব্যবহারে স্পষ্ট দেখতে পাই। আজও তিনি যুদ্ধের দেবতা, ভাগাভাগির দেবতা, সাম্প্রদায়িক দেবতা । অঞ্চস্টানের Σ Ο δ কালান্তর প্রতি খৃস্টানের অবজ্ঞা ও অবিচার তার নামের জোরে যত সজীব হয়ে আছে এমন আর-কিছুতে নয় । * 卢 আমাদের দেশে সাধারণত শাক্তধর্মসাধনা এবং বৈষ্ণবধর্মসাধনার মধ্যে হুই স্বতন্ত্র ভাব প্রাধান্ত লাভ করেছে। এক সাধনায় পশুবলি এবং মাংসভোজন, অন্ত সাধনায় অহিংসা ও নিরামিষ আহার— এটা নিতান্ত নিরর্থক নয় । বিশেষ শাস্ত্রে এই পশু এবং অপরাপর মকারের যে ব্যাখ্যাই থাক, সাধারণ ব্যবহারে তা প্রচলিত নেই। এইজন্তেই শক্তি’ শব্দের সাধারণ যে অর্থ, যে অর্থ নানা চিহ্নে অনুষ্ঠানে ও ভাবে শক্তিপূজার মধ্যে ওতপ্রোত এবং বাংলাদেশের মঙ্গলকাব্যে যে অর্থ প্রচারিত হয়েছে আমি সেই অর্থই আমার রচনায় গ্রহণ করেছি। একটি কথা মনে রাখতে হবে, দসু্যর উপাস্ত দেবতা শক্তি, ঠগীর উপাস্ত দেবতা শক্তি, কাপালিকের উপাস্ত দেবতা শক্তি । আরো একটি ভাববার কথা আছে, পশুবলি বা নিজের রক্তপাত, এমন কি, নরবলি স্বীকার ক’রে মানত দেবার প্রথা শক্তিপূজায় প্রচলিত। মিথ্যা মামলায় জয় থেকে শুরু করে জ্ঞাতিশত্রুর বিনাশ কামনা পর্যন্ত সকল প্রকার প্রার্থনাই শক্তিপূজায় স্থান পায় । এক দিকে দেবচরিত্রের হিংস্রতা, অপর দিকে মানুষের ধর্মবিচারহীন ফলকামনা, এই ছষ্টয়ের যোগ যে পূজায় আছে, তার চেয়ে বড়ো শক্তিপূজার কথা কোনো বিশেষ শাস্ত্রে নিগুঢ় আছে কি না সেটা আমার আলোচ্য ছিল না। শক্তিপূজার যে অর্থ লৌকিক বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত সে অর্থকে অসংগত বলা যায় না ; কারণ লোকপ্রচলিত কাহিনী এবং রূপকচিহ্নে সেই অর্থই প্রবল এবং সভ্য ও বর্বর সকল দেশে সকল ভাবেই শক্তিপূজা চলছে— অন্যায় অসত্য সে পূজায় লজ্জিত নয়, লোভ তার লক্ষ্য, এবং হিংসা তার পূজোপচার। এই লোভ মন নয়, ভালোই ; হিংস্ৰশক্তি মনুষ্যত্বের পক্ষে অত্যাবশ্বক— এমন সকল তর্ক শক্তিপূজক যুরোপে স্পর্ধার সঙ্গে চলছে, XV e. যুরোপের ছাত্ররূপে আমাদের মধ্যেও চলছে- লে সম্বন্ধে আমার বা বলবার অন্তয় বলেছি; এখানে এইটুকু বক্তব্য যে, সাধারণ লোকের মনে শক্তিপূজার সঙ্গে একটি উলঙ্গ নিদারুণতার ভাব, মিজের উদ্দেশুসাধনের জন্ত বলপূর্বক বলকে বলি দেবার ভাব সংগত হয়ে আছে, বাতায়নিকের পত্রে আমি তারই উল্লেখ করেছি। কিন্তু তবু এ কথা স্বীকার করা উচিত যে, কোনো ধর্মসাধনার উচ্চ অর্থ যদি দেশের কোনো বিশেষ শাস্ত্র বা সাধকের মধ্যে কথিত বা জীবিত থাকে তবে তাকে সন্মান করা কর্তব্য। এমন কি, ভূরিপরিমিত প্রচলিত ব্যবহারের চেয়েও তাকে বড়ো বলে জানা চাই। ধর্মকে পরিমাণের দ্বারা বিচার না ক’রে তার উৎকর্ষের দ্বারা বিচার করাই শ্ৰেয় । স্বল্পমপ্যস্ত ধর্মত এয়িতে মহুতো ভয়াৎ । কাতিক ১৩২৬ 9. . ." כשאכי