কালান্তর/সত্যের আহ্বান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


সত্যের আহবান

 পরাসক্ত কীট বা জন্তু পরের রস রক্ত শোষণ করে বঁাচে, খাদ্যকে নিজের শক্তিতে নিজ দেহের উপকরণে পরিণত করবার দেহযন্ত্ৰ তাদের বিকল হয়ে যায়; এমনি করে শক্তিকে অলস করবার পাপে প্ৰাণি লোকে এই-সকল জীবের অধঃপতন ঘটে। মানুষের ইতিহাসেও এই কথা খাটে। কিন্তু পরাসক্ত মানুষ বলতে কেবল যে পরের প্রতি জড়ভাবে আসক্ত মানুষকেই বোঝায় তা নয়। চিরদিন যা চলে আসছে তার সঙ্গে যে আপনাকে জুড়ে রেখে দেয়, প্ৰচলিতের লোতের টানে যে হালছাড়া ভাবে আত্মসমৰ্পণ করে, সেও পরাসক্ত। কেননা বাহির আমাদের অন্তরের পক্ষে পর; সে যখন কেবল অ্যাসের তাগিদে অামাদের চালিয়ে নিয়ে যায় তখন আমাদের পরাসক্ত অন্তর নিরুদ্যম হয়ে ওঠে এবং মানুষের পরে অসাধ্যসাধন করবার যে ভার অাছে সে সিদ্ধ হয় না।

 এই হিসাবে জন্তুরা এ জগতে পরাসক্ত। তারা প্ৰচলিতের ধারায় গা-ভাসান দিয়ে চলে। তারা প্ৰাকৃতিক নিৰ্বাচনের শাসনে বঁাচে মরে, এগোয় বা পিছোয়। এইজন্যেই তাদের অন্তঃকরণটা বাড়তে পারল না, কেঁটে হয়ে রইল। লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরে মৌমাছি যে চাক তৈরি করে আসছে সেই চাক তৈরি করার একটানা বোক কিছুতেই সে কাটিয়ে বেরতে পারছে না। এতে ক’রে তাদের চাক নিখুত -মতো তৈরি হচ্ছে; কিন্তু তাদের অন্তঃকরণ এই চিরাভ্যাসের গণ্ডীর মধ্যে বন্ধ হয়ে আছে, সে আপনাকে নানা দিকে মেলে দিতে পারছে না। এই-সকল জীবের সম্বন্ধে প্ৰকৃতির যেন সাহসের অভাব দেখতে পাই। সে এদের নিজের আঁচলে ঢেকে চালায়; পাছে নিজে চলতে গেলে বিপদ বাধিয়ে বসে এই ভয়ে এদের অন্তরের চলৎশক্তিকে ছেটে রেখে দয়েছে । কালান্তর কিন্তু স্থষ্টিকর্তার জীবরচনা-পরীক্ষায় মানুষের সম্বন্ধে হঠাৎ খুব একটা সাহস দেখতে পাওয়া যায়। তিনি তার অন্ত:করণটাকে বাধা দিলেন না। বাহিরে প্রাণীটিকে সর্বপ্রকারে বিবস্ত্র নিরস্ত্র দুর্বল করে এর অন্ত:করণকে ছেড়ে দেওয়া হল । এই মুক্তি পাওয়ার আনন্দে সে বলে উঠল, “আমি অসাধ্য সাধন করব। অর্থাৎ, ‘যা চিরদিন হয়ে আসছে তাই যে চিরদিন হতে থাকবে সে আমি সইব না, যা হয় না তাও হবে ।’ সেইজন্তে মানুষ তার প্রথম যুগে যখন চার দিকে অতিকায় জন্তুদের বিকট লখদস্তের মাঝখানে পড়ে গেল তখন সে হরিণের মতো পালাতে চাইল না, কচ্ছপের মতো লুকোতে চাইল না, সে অসাধ্যসাধন করলে – চকমকি পাথর কেটে কেটে ভীষণতর নখদস্তের সৃষ্টি করলে । যেহেতু জন্তুদের নখদন্ত তাদের বাহিরের দান, এইজন্তে প্রাকৃতিক নির্বাচনের পরেই এই নখদস্তের পরিবর্তন বা উন্নতি নির্ভর করে । কিন্তু মামুষের নখদন্ত তার অন্ত:করণের স্বষ্টি ; এইজন্তে সেই পাথরের বর্শাফলকের পরেই সে ভর করে রইল না, তার সমস্ত হাতিয়ার পাথরের কোঠ থেকে লোহার কোঠায় এসে পৌছল। এতে প্রমাণ হয়, মামুষের অন্ত:করণ সন্ধান করছে; যা তার চারি দিকে আছে তাতেই সে আসক্ত হয়ে নেই, যা তার হাতের কাছে নেই তাকে হাতের তলায় আনছে । পাথর আছে তার সামনে, তাতে সে সন্তুষ্ট নয় ; লোহা আছে মাটির নীচে, সেখানে গিয়ে সে ধাক্কা দেয়। পাথরকে ঘষে-মেজে তার থেকে হাতিয়ার তৈরি করা সহজ ; কিন্তু তাতেও তার মন উঠল না, লোহাকে আগুনে গলিয়ে, হাতুড়িতে পিটিয়ে, ছাঁচে ঢালাই করে যা সব চেয়ে বাধা দেয় তাকেই আপনার সব চেয়ে অমুগত করে তুললে। মামুষের অন্তঃকরণের ধর্মই হচ্ছে এই, আপনাকে খাটিয়ে কেবল যে তার সফলতা তা নয়, তার আনন্দ ; সে কেবলই উপরিতল থেকে গভীরতলে পৌছতে চায়, প্রত্যক্ষ থেকে অপ্রত্যক্ষে, সহজ থেকে কঠিনে, পরাসক্তি থেকে >为9 সত্যের আহবান আত্মকর্তৃত্বে, প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বিচারের ব্যবস্থায় । এমনি করে সে • জয়ী হয়েছে। কিন্তু কোনো এক দল মানুষ যদি বলে 'এই পাথরের ফল আমাদের বাপ-পিতামহের ফলা, এ ছাড়া আর যা-কিছু করতে যাব তাতে আমাদের জাত নষ্ট হবে, তা হলে একেবারে তাদের মমুঝত্বের মূলে ঘা লাগে , তা হলে যাকে তারা জাতরক্ষা বলে তা হতে পারে, কিন্তু তাদের সব চেয়ে যে বড়ো জাত মনুষ্যজাত সেইখানে তাদের কৌলীন্ত মারা যায় । আজও যারা সেই পাথরের ফলার বেশি এগোয় নি মামুব তাদের জাতে ঠেলেছে, তারা বনে জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়ায়। তারা বহিরবস্থার কাছে পরাসক্ত, তারা প্ৰচলিতের . জিন-লাগামের টানে চোখে ঠুলি লাগিয়ে চলে ; তারা অস্তরের স্বরাজ পায় নি, বাহিরের স্বরাজের অধিকার থেকে তাই তারা ভ্রষ্ট। এ কথা তারা জানেই না যে, মানুষকে আপনার শক্তিতে অসাধ্যসাধন করতে হবে ; যা হয়েছে তার মধ্যে সে বদ্ধ থাকবে না, যা হয় নি তার দিকে সে এগোবে— তাল ঠুকে বুক ফুলিয়ে নয়, অন্তঃকরণের সাধনার বলে, আত্মশক্তির উদবোধনে । আজ ত্রিশ ৰংসর হয়ে গেল, যখন "সাধন।' কাগজে আমি লিখছিলুম তখন আমার দেশের লোককে এই কথাই বলবার চেষ্টা করেছি । তখন ইংরেজি-শেখ ভারতবর্ষ পরের কাছে অধিকার-ভিক্ষণর কাজে বিষম ব্যস্ত ছিল। তখন বারে বারে আমি কেবল একটি কথা বোঝাবার প্রয়াস পেয়েছি যে, মানুষকে অধিকার চেয়ে নিতে হবে না, অধিকার স্মৃষ্টি করতে হবে। কেননা মানুষ প্রধানত অস্তরের জীব, অস্তরেই সে কর্তা ; বাহিরের লাভে অস্তরে লোকসান ঘটে । আমি বলেছিলেম, অধিকারবঞ্চিত হবার স্থঃখভার আমাদের পক্ষে তেমন বোঝা নয় যেমন বোঝা আমাদের মাথার উপরে আবেদন আর নিবেদনের খালা’। তার পরে যখন আমার হাতে 'বঙ্গদর্শন’ এসেছিল S3 ) কালান্তর তখন বঙ্গবিভাগের ছুরি-শানানের শব্দে সমস্ত বাংলাদেশ উতলা । মনের ক্ষোভে বাঙালি সেদিন ম্যাঞ্চেস্টরের কাপড় বর্জন ক’রে বোম্বাই মিলের সদাগরদের লোভটাকে বৈদেশিক ডিগ্রিতে বাড়িয়ে তুলেছিল । যেহেতু ইংরেজ-সরকারের পরে অভিমান ছিল এষ্ট বস্ত্রবর্জনের মূলে, সেইজন্তে সেই দিন এই কথা বলতে হয়েছিল ‘এছ বাহ’ । এর প্রত্যক্ষ লক্ষ্য ইংরেজ, ভারতবাসী উপলক্ষ্য ; এর মুখ্য উত্তেজনা দেশের লোরের প্রতি প্রেম নয়, বিদেশী লোকের প্রতি ক্রোধ। সে দিন দেশের লোককে এই কথা বলে সাবধান করবার দরকার ছিল যে, ভারতে ইংরেজ যে আছে এটা বাইরের ঘটনা, দেশ যে আছে এটাই আমাদের ভিতরের কথা । এই ভিতরের কথাটাই হচ্ছে চিরসত্য, আর বাইরের ব্যাপারটা মায়া । মায়াকে তত ক্ষণ অত্যন্ত বড়ো দেখায় যত ক্ষণ, রাগেই হোক ཐུ] অমুরাগেই হোক, বাইরের দিক থেকে তার প্রতি সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে তাকিয়ে থাকি । তেড়ে গিয়ে তার পায়ে দাত বসিয়ে দেওয়া সেও একটা তীব্র আসক্তি, আর ভক্তিতে তার পা জড়িয়ে ধরা সেও তথৈবচ ; তাকে চাই নে বললেও তার ধ্যানে আমাদের সমস্ত হৃদয় রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে, আর চাই বললে তো কথাই নেই । মায়া জিনিসট। অন্ধকারের মতো ; বাইরের দিক থেকে কলের গাড়ি চালিয়েও তাকে অতিক্রম করতে পারি নে, তাকে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে চাইলে সাত’ সমুদ্র তেরো নদী শুকিয়ে যাবে । সত্য আলোর মতে, তার শিখাটা জলবা মাত্র দেখা যায়, মায়া নেই । এইজন্তেই শাস্ত্রে বলেছেন,— স্বল্পমপ্যস্ত ধর্মস্ত ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ । ভয় হচ্ছে মনের নাস্তিকতা, তাকে না’এর দিক থেকে নিকেশ করা যায় না ; উপস্থিতমতো তার একটা কারণ গেলেও রক্তবীজের মতো আর-একটা কারণরূপে সে জন্ম নেয়। ধর্ম হচ্ছে সত্য, লে মনের আস্তিকতা ; তার অল্পমাত্র আবির্ভাবে ই প্রকাও না’কে একেবারে মূলে * పె* সত্যের আহবান গিয়ে অভিভূত করে। ভারতে ইংরেজের আবির্ভাৰ নামক ব্যাপারটি বহুরূপী ; আজ সে ইংরেজের মূর্তিতে, কাল সে অন্ত বিদেশীর মূর্তিতে এবং তার পরদিন সে নিজের দেশী লোকের মূর্তিতে নিদারুণ হয়ে দেখা দেবে। এই পরতন্ত্রতাকে ধন্থর্বাণ হাতে বাইরে থেকে তাড়া করলে সে আপনার খোলষ বদলাতে বদলাতে আমাদের হয়ঃান করে তুলবে। কিন্তু, আমার দেশ আছে এইটি হল সত্য ; এইটিকে পাওয়ার দ্বারা বাহিরের মায়া আপনি নিরস্ত হয় । আমার দেশ আছে, এই অস্তিকতার একটি সাধনা আছে। দেশে জন্মগ্রহণ করেছি বলেই দেশ আমার, এ হচ্ছে সেই-সব প্রাণীর কথা যারা বিশ্বের বাহ ব্যাপার সম্বন্ধে পরাসক্ত। কিন্তু, যেহেতু মামুষের যথার্থ স্বরূপ হচ্ছে তার আত্মশক্তিসম্পন্ন অন্তরপ্রকৃতিতে, এইজন্ত যে দেশকে মানুষ আপনার জ্ঞানে বুদ্ধিতে প্রেমে কর্মে স্থষ্টি করে তোলে সেই দেশই তার স্বদেশ । ১৯• ৫ খৃস্টাব্দে আমি বাঙালিকে ডেকে এই কৰা বলেছিলেম যে, "আত্মশক্তির দ্বারা ভিতরের দিক থেকে দেশকে স্বষ্টি করে, কারণ স্বষ্টির দ্বারাই উপলব্ধি সত্য হয় ।” বিশ্বকৰ্ম আপন স্বষ্টিতে আপনাকেই লাভ করেন । দেশকে পাওয়ার মানে হচ্ছে দেশের মধ্যে আপনার আত্মাকেই ব্যাপক করে উপলব্ধি করা। আপনার চিস্তার দ্বারা, কর্মের দ্বারা, সেবার দ্বারা দেশকে যখন নিজে গড়ে তুলতে থাকি তখনই আত্মাকে দেশের মধ্যে সত্য করে দেখতে পাই। মামুষের দেশ মানুষের চিত্তের স্বষ্টি, এইজম্ভেই দেশের মধ্যে মামুষের আত্মার ব্যাপ্তি, আত্মার প্রকাশ । যে দেশে জন্মেছি কী উপায়ে সেই দেশকে সম্পূর্ণ আমার আপন করে তুলতে হবে, বহু কাল পূর্বে ‘স্বদেশী সমাজ’ নামক প্রবন্ধে তার বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সেই আলোচনাতে যে-কোনো ক্রটি থাকুক, এই কথাটি জোরের সঙ্গে বলা হয়েছে যে, দেশকে জয় করে নিতে సిరి ১৯৩ কালান্তর হবে পরের হাত থেকে নয়, নিজের নৈষ্কর্ম্য থেকে, ঔদাসীন্ত থেকে দেশের যে-কোনো উন্নতি-সাধনের জন্তে যে উপলক্ষে আমরা ইংরেজরাজসরকারের দ্বারস্থ হয়েছি সেই উপলক্ষেই আমাদের নৈষ্কৰ্য্যকে নিবিড়তর করে তুলেছি মাত্র। কারণ, ইংরেজ-রাজসরকারের কীর্তি আমাদের কীর্তি নয় ; এইজন্ত বাহিরের দিক থেকে সেই কীর্তিতে আমাদের যতই উপকার হোক, ভিতরের দিক থেকে তার দ্বারা আমাদের দেশকে আমরা হারাই, অর্থাৎ আত্মার মূল্যে সফলতা পাই। যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন— ন বা অরে পুত্রস্ত কামায় পুত্র: প্রিয়ো ভবতি । আত্মনস্তু কামায় পুত্র: প্রিয়ো ভবতি । দেশ সম্বন্ধেও এই কথা খাটে। দেশ আমারই আত্মা, এইজন্তই দেশ আমার প্রিয়— এ কথা যখন জানি তখন দেশের স্বষ্টিকার্যে পরের মুখাপেক্ষ করা সহই হয় না । আমি সেদিন দেশকে যে কথা বলবার চেষ্টা করেছিলুেম সে বিশেষকিছু নতুন কথা নয় এবং তার মধ্যে এমন কিছু ছিল না যাতে স্বদেশহিতৈষীর কানে সেটা কটু শোনায় । কিন্তু, আর-কারও মনে না থাকতে পারে, আমার স্পষ্টই মনে আছে যে, আমার এই-সকল কথায় দেশের লোক বিষম ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। যারা কটুভাষা-ব্যবসায়ী সাহিত্যিক গুও আমি তাদের কথা বলছি নে, কিন্তু গণ্যমান্ত এবং শিষ্টশাস্ত ব্যক্তিরাও আমার সম্বন্ধে ধৈর্য রক্ষা করতে পারেন নি । এর দুটি মাত্র কারণ— প্রথম ক্রোধ, দ্বিতীয় লোভ । ক্রোধের তৃপ্তিসাধন হচ্ছে এক রকমের ভোগমুখ ; সেদিন এই ভোগমুখের মাৎলামিতে আমাদের বাধা অতি অল্পই ছিল— আমরা মনের আনন্দে কাপড় পুড়িয়ে বেড়াচ্ছি, পিকেট করছি, যারা আমাদের পথে চলছিল না তাদের পথে কাটা দিচ্ছি এবং ভাষায় আমাদের কোনো আক্র >分8 সত্যের আহবান। রাখছি নে। এই-সকল অমিতাচারের কিছুকাল পরে একজন জাপানি আমাকে এক দিন বলেছিলেন, "তোমরা নিঃশব্দে দৃঢ় এবং গুঢ় ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করতে পার না কেন ? কেবলই শক্তির বাজে খরচ করা তো উদ্দেপ্তসাধনের সন্ধুপায় নয়।’ তার জবাৰে সেই জাপানিকে আমার বলতে হয়েছিল যে, উদ্দেশ্বসাধনের কথাটাই যখন আমাদের মনে উজ্জ্বল থাকে তখন মানুষ স্বভাবতই আত্মসংযম ক’রে নিজের সকল শক্তিকেই সেই দিকে নিযুক্ত করে। কিন্তু ক্রোধের তৃপ্তিসাধন যখন মত্ততার সপ্তকে সপ্তকে উদ্বেগুসাধনকে ছাড়িয়ে উঠতে থাকে তখন শক্তিকে খরচ করে দেউলে হতে আমাদের বাধা থাকে না । যাই হোক, সে দিন ঠিক যে সময়ে বাঙালি কিছু কালের জন্তে, ক্রোধতৃপ্তির সুখভোগে বিশেষ বিঘ্ন পাচ্ছিল না, সমস্তই যেন একটা আশ্চর্য স্বপ্নের মতো বোধ হচ্ছিল, সেই সময়ে তাকে অন্ত পথের কথা বলতে গিয়ে আমি তার ক্রোধের ভাজন হয়েছিলেম । তা ছাড়া আরো একটি কথা ছিল, সে হচ্ছে লোভ । ইতিহাসে সকল জাতি দুর্গম পথ দিয়ে দুৰ্লভ জিনিস পেয়েছে, আমরা তার চেয়ে অনেক সস্তায় পাব— হাত-জোড়করা ভিক্ষের দ্বারা নয়, চোখ-রাঙানে ভিক্ষের দ্বারা পাব, এই ফন্দির আনন্দে সে দিন দেশ মেতেছিল। ইংরেজ দোকানদার বাকে বলে reduced price sale, সে দিন যেন ভাগ্যের হাটে বাঙালির কপালে পোলিটিকাল মালের সেই রকম সস্তা দামের মৌসুম পড়েছিল। যার সম্বল কম, সস্তার নাম শোনব। মাত্র সে এত বেশি খুশি হয়ে ওঠে যে, মালট। যে কী আর তার কী অবস্থা তার খোজ রাখে না, আর যে ব্যক্তি সন্দেহ প্রকাশ করে তাকে তেড়ে মারতে যায় । মোট কথা, সে দিনও আমাদের লক্ষ্য ছিল, ধ্যান ছিল ঐ বাইরের মায়াটা নিয়ে । তাই তখনকার কালের একজন নেতা বলেছিলেন, ‘আমার এক হাত ইংরেজ সরকারের টুটিতে, আর-এক হাত তার পায়ে। অর্থাৎ কোমো হাতই >为够 কালান্তর বাকি ছিল না দেশের জন্ত। তৎকালে এবং তার পরবর্তীকালে এই দ্বিধা হয়তো অনেকের একেবারে ঘুচে গেছে, এক দলের দুই হাতই হয়তো উঠেছে সরকারের টুটিতে, আর-এক দলের দুই হাতই হয়তো নেমেছে সরকারের পায়ে, কিন্তু মায়া থেকে মুক্তিসাধনের পক্ষে দুইই হচ্ছে বাইরের পথ। হয় ইংরেজ সরকারের দক্ষিণে নয় ইংরেজ সরকারের বামে পোড়া মন ঘুরে বেড়াচ্ছে ; তার ই’ই বল আর না’ই বল, ছুইই হচ্ছে ইংরেজকে নিয়ে । সে দিন চারি দিক থেকে বাংলাদেশের হৃদয়াবেগের উপরেই কেবল তাগিদ এসেছে। কিন্তু শুধু হৃদয়াবেগ আগুনের মতো জালানি বস্তুকে খরচ করে, ছাই করে ফেলে— সে তো স্থষ্টি করে না। মামুষের অন্ত:করণ ধৈর্যের সঙ্গে, নৈপুণ্যের সঙ্গে, দূরদৃষ্টির সঙ্গে এই আগুনে কঠিন উপাদানকে গলিয়ে আপনার প্রয়োজনের সামগ্রীকে গড়ে তুলতে থাকে। দেশের সেই অন্ত:করণকে সে দিন জাগানো হল না, সেইজন্তে এত বড়ো একটা হৃদয়াবেগ থেকে কোনো একটা স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারল না । এমনটা যে হল তার কারণ বাইরে নেই, তার কারণ আছে আমাদের নিজেরই ভিতরে। অনেক দিন থেকেই আমাদের ধর্মে কর্মে এক দিকে আছে হৃদয়াবেগ, আর-এক দিকে আছে অভ্যস্ত আচার । আমাদের অন্ত:করণ অনেক দিন থেকে কোনো কাজ করে নি ; তাকে ভয়ে ভয়ে চেপে রাখা হয়েছে। এইজন্তে যখন আমাদের কাছ থেকে কোনো কাজ আদায় করার দরকার পড়ে তখন তাড়াতাড়ি হৃদয়াবেগের উপর বরাত দিতে হয় এবং নানারকম জাদুমন্ত্র আউড়িয়ে মনকে মুগ্ধ করবার প্রয়োজন ঘটে। অর্থাৎ সমস্ত দেশ জুড়ে এমন একটা অবস্থা উৎপাদন করা হয় যেটা অন্তঃকরণের কাজ করার পক্ষে বিষম প্রতিকূল । অন্তঃকরণের জড়তায় যে ক্ষতি সে ক্ষতিকে কোনো কিছুতেই পূরণ } e সত্যের আহবান করা যায় না। কোনোমতে যখন পূরণ করতে চাই তখন মোহকে সহায় করতে ইচ্ছা হয়, তখন অক্ষমের লোভ আলাদিনের প্রদীপের গুজব শুনলেই একেবারে লাফিয়ে ওঠে। এ কথা সকলকেই একবাক্যে স্বীকার করতে হবে যে, আলাদিনের প্রদীপের মতো এমন আশ্চর্য সুবিধার জিনিস আর নেই, কেবল ওর একটি মাত্র অসুবিধা এই ৰে ও জিনিস কোথাও পাওয়া যায় না । কিন্তু পাওয়া যে যায় না, এ কথা খুব জোরের সঙ্গে সে মাছুষ কিছুতেই বলতে পারে না যার লোত বেশি অথচ যার সামর্থ্য কম। এইজন্তে তার উদ্যম তখনি পুরোদমে জেগে ওঠে যখন তাকে কেউ আলাদিনের প্রদীপের আশ্বাস দিয়ে থাকে । সেই আশ্বাসকে হরণ করতে গেলে সে এমলি চীৎকার করতে থাকে যেন তার সর্বস্বাস্ত করা হল । সেই বঙ্গবিভাগের উত্তেজনার দিনে এক দল যুবক রাষ্ট্রবিপ্লবের দ্বারা দেশে যুগান্তর আনবার উদ্যোগ করেছিলেন। আর যাই হোক, এই প্ৰলয়হুতাশনে তারা নিজেকে আহুতি দিয়েছিলেন, এইজন্তে র্তারা কেবল আমাদের দেশে কেন সকল দেশেই সকলেরই নমস্ত । তাদের নিফলতাও আত্মার দীপ্তিতে সমুজ্জ্বল। তারা পরম ত্যাগে, পরম দুঃখে আজ একটা কথা স্পষ্ট জেনেছেন যে, রাষ্ট্র যখন তৈরি নেই তখন রাষ্ট্রবিপ্লবের চেষ্টা করা পথ ছেড়ে অপথে চলা ; পথের চেয়ে অপথ মাপে ছোটো, কিন্তু সেটাকে অমুসরণ করতে গেলে লক্ষ্যে পৌছনো যায় না, মাঝের থেকে পাদুটোকে কাটায় কাটায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন করা হয় । যে জিনিসের যা দাম তা পুরো না দিতে পারলে দাম তো যায়ই, জিনিসও জোটে না । সেদিনকার সেই দুঃসাহসিক যুবকেরা ভেবেছিলেন, সমস্ত দেশের হয়ে তারা কয়জন আত্মোৎসর্গ দ্বারা রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটাবেন ; তাদের পক্ষে এটা সর্বনাশ, কিন্তু দেশের পক্ষে এটা সন্ত । সমস্ত দেশের অন্তঃকরণ থেকে সমস্ত দেশের উদ্ধার জেগে ওঠে, তার ১৯৭ কালান্তর কোনো একটা অংশ থেকে নয়। রেলযানে ফাস্ট ক্লাস গাড়ির মূল্য এবং সৌষ্ঠব যেমনি থাকৃ, সে তার নিজের সঙ্গে সংযুক্ত থার্ড ক্লাস গাড়িকে কোনোমতেই এগিয়ে যেতে পারে না। আমার মনে হয় তারা আজ বুঝেছেন, সমগ্ৰ দেশ ব’লে একটি জিনিস সমস্ত দেশের লোকের স্থষ্টি ; এই স্বষ্টি তার সমস্ত হৃদয়বৃত্তি বুদ্ধিবৃত্তি ইচ্ছাশক্তির প্রকাশে । এ হচ্ছে ষোগলব্ধ ধন, অর্থাৎ যে যোগের দ্বারা মানুষের সকল বৃত্তি আপন স্থষ্টির মধ্যে সংহত হয়ে রূপলাভ করে। পোলিটিকাল যোগ বা ইকনমিক যোগ পূর্ণ যোগ নয়, সর্বশক্তির যোগ চাই। অন্ত দেশের ইতিহাস যখন লক্ষ্য করে দেখি তখন পোলিটিকাল ঘোড়াটাকে সকলের আগে দেখি, মনে মনে ঠিক করি ঐ চতুষ্পদটারই টানে সমস্ত জাত এগিয়ে চলেছে। তখন হিসাব করে দেখি নে— এর পিছনে দেশ বলে যে গাড়িটা আছে সেটা চলবার যোগ্য গাড়ি, তার এক চাকার সঙ্গে আর-এক চাকার সামঞ্জস্ত আছে, তার এক অংশের সঙ্গে আর-এক অংশের ভালোরকম জোড় মেলানো আছে। এই গাড়িটি তৈরি করে তুলতে শুধু আগুন এবং হাতুড়ি-করাত এবং কলকক্তা লেগেছে তা নয়, এর মধ্যে অনেক দিনের অনেক লোকের অনেক চিন্তা, অনেক সাধনা, অনেক ত্যাগ আছে । আরো এমন দেশ আমরা দেখেছি, সে বাহত স্বাধীন কিন্তু পোলিটিকাল বাহনটি যখন তাকে টানতে থাকে তখন তার ঝড় ঝড়, খড় খড়, শব্দে পাড়ার ঘুম ছুটে যায়, বাকানির চোটে সওয়ারির বুকে পিঠে খিল ধরতে থাকে, পথ চলতে চলতে দশবার করে সে ভেঙে ভেঙে পড়ে, দড়িদড়া দিয়ে তাকে বধিতে বাধতে দিন কাবার হয়ে যায়। তবু ভালো হোক আর মন হোক, স্কু আলগা হোক আর চাকা বাকা হোক, এ গাড়িও গাড়ি । কিন্তু যে জিনিসটা ঘরে বাইরে সাত টুকরো হয়ে আছে, যার মধ্যে সমগ্রতা কেবল যে নেই তা নয়, যা বিরুদ্ধতায় ভরা, তাকে উপস্থিতমতো ক্রোধ হোক বা লোভ হোক >2切 সত্যের আহবান । কোনো-একটা প্রবৃত্তির বাহ বন্ধনে বেঁধে হেই হেঁই শব্দে টান দিলে কিছু ক্ষণের জন্তে তাকে নড়ানো যায়, কিন্তু একে কি দেশদেবতার রথ-যাত্রা বলে ? এই প্রবৃত্তির বন্ধন এবং টান কি টেকসই জিনিস ? অতএব ঘোড়াটাকে আস্তাবলে রেখে আপাতত এই গড়াপেটার কাজটাই কি সব চেয়ে দরকার নয় ? যমের ফঁাসি-বিভাগের সিংহদ্বার থেকে বাংলাদেশের যে-সব যুবক ঘরে ফিরে এসেছেন তাদের লেখা প’ড়ে, কথা শুনে আমার মনে হয় তারা এই কথাই ভাবছেন । তারা বলছেন, সকলের আগে আমাদের যোগসাধন চাই, দেশের সমস্ত চিত্তবৃত্তির সন্মিলন ও পরিপূর্ণতা -সাধনের যোগ। বাইরের দিক থেকে কোনো অন্ধ বাধ্যতা দ্বারা এ হতেই পারে না, ভিতরের দিক থেকে জ্ঞানালোকিত চিত্তে আত্মোপলব্ধি দ্বারাই এ সম্ভব । যা-কিছুতে সমস্ত দেশের অন্তঃকরণ উদবোধিত হয় না, অভিভূত হয়, এ কাজের পক্ষে তা অন্তরায় । নিজের সৃষ্টিশক্তির দ্বারা দেশকে নিজের করে তোলবার যে আহবান সে খুব একটা বড়ো আহবান। সে কোনো-একটা বাহ অঙ্গুষ্ঠানের জন্তে তাগিদ দেওয়া নয়। কারণ, পূর্বেই বলেছি, মানুষ তো মৌমাছির মতো কেবল একই মাপে মৌচাক গড়ে না, মাকড়ষার মতো নিরস্তর একই প্যাটানে জাল বোনে না ; তার সকলের চেয়ে বড়ো শক্তি হচ্ছে তার :করণে— সেই অন্তঃকরণের কাছে তার পুরো দাৰি, জড় অভ্যাসপরতার কাছে নয়। যদি কোনো লোভে পড়ে তাকে আজ বলি তুমি চিস্তা কোরো না, কর্ম করো’, তা হলে যে-মোহে আমাদের দেশ মরেছে সেই মোহকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে। এত কাল ধরে আমরা আস্থশাসনের কাছে, প্রথার কাছে, মানবমনের সর্বোচ্চ অধিকার অর্থাৎ বিচারের অধিকার বিকিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে, অলস হয়ে বলে আছি। বলেছি, ‘আমরা সমুদ্রপারে যাব না, কেননা মন্থতে তার নিষেধ ; মুসলমানের পাশে বলে খাব না, কেননা শাস্ত্র তার বিরোধী। অর্থাৎ, যে প্রণালীতে চললে 33 ১ কালাম্ভর মাছুষের মন ৰ’লে জিনিসের কোনোই দরকার হয় না, যা কেবলমাত্র চিন্তাহীন অভ্যাসনিষ্ঠতার কাজ, আমাদের সংসারযাত্রার পনেরো আনা কাজই সেই প্রণালীতে চালিত। ষে মানুষ সকল বিষয়েই দাসের প্রতিনির্ভর করে চলে তার ষে রকম পঙ্গুত, যারা বাহ আচারের দ্বারাই নিয়ত চালিত তাদেরও সেই রকম। কেননা পূর্বেই বলেছি, অন্তরের মামুবই প্রভু, সে যখন একান্তভাবে বাহ প্রথার পরাসক্ত জীব হয়ে ওঠে তখন তার দুৰ্গতির সীমা থাকে না । আচারে-চালিত মানুষ কলের পুতুল, বাধ্যতার চরম সাধনায় সে উত্তীর্ণ হয়েছে। পরতন্ত্রতার কারখানাঘরে সে তৈরি ; এইজন্তে এক চালকের হাত থেকে তাকে নিস্কৃতি দিতে গেলে আর-এক চালকের হাতে তাকে সমর্পণ করতে হয় । পদার্থবিদ্যায় যাকে ইনশিয়া বলে, যে মানুষ তারই একাস্ত সাধনাকে পবিত্রত ব’লে অভিমান করে তার স্থাবরতাও যেমন জঙ্গমতাও তেমন, উভয়েই তার নিজের কর্তৃত্ব নেই। অন্ত:করণের ষে জড়ত্ব সর্বপ্রকার দাসত্বের কারণ, তার থেকে মুক্তি দেবার উপায় চোখে-ঠুলি-দেওয়া বাধ্যতাও নয়, কলের পুতুলের মতো বাহাদুষ্ঠানও নয়। বঙ্গবিভাগের আন্দোলনের পরে এবার দেশে যে আন্দোলন উপস্থিত হয়েছে তার পরিমাণ আরো অনেক বড়ে ; সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে তার প্রভাব । বহু দিন ধরে আমাদের পোলিটিকাল নেতারা ইংরেজি-পড়া দলের বাইরে ফিরে তাকান নি, কেননা তাদের দেশ ছিল ইংরেজিইতিহাস-পড়া একটা পুথিগত দেশ। সে দেশ ইংরেজি ভাষার বাষ্পরচিত একটা মরীচিকা, তাতে বার্ক, মাড স্টোন ম্যাটুলীনি গারিবালুভির অস্পষ্ট মূর্তি ভেসে বেড়াত। তার মধ্যে প্রকৃত আত্মত্যাগ বা দেশের মানুষের প্রতি যথার্থ দরদ দেখা যায় নি। এমন সময়ে মহাত্মা গান্ধি এসে দাড়ালেন ভারতের বহুকোটি গরিবের দ্বারে— তাদেরই আপন বেশে, এবং তাদের সঙ্গে কথা কইলেন তাদের আপন ভাষায় । এ & о о সত্যের আহবান একটা সত্যকার জিনিস, এর মধ্যে পুথির কোনো নজির নেই। এইজন্তে তাকে যে মহাত্মা নাম দেওয়া হয়েছে এ তার সত্য নাম । কেননা, ভারতের এত মানুষকে আপনার আত্মীয় করে আর কে দেখেছে ? আত্মার মধ্যে যে শক্তির ভাণ্ডার আছে তা খুলে যায় সত্যের স্পর্শমাত্রে। সত্যকার প্রেম ভারতবাসীর বহু দিনের রুদ্ধ দ্বারে যে-মুহূর্তে এসে দাড়ালে অমনি তা খুলে গেল। কারও মনে আর কার্পণ্য রইল না, অর্থাৎ সত্যের স্পর্শে সত্য জেগে উঠল। চাতুরি দ্বারা যে রাষ্ট্রনীতি চালিত হয় সে নীতি বন্ধ্যা, অনেক দিন থেকে এই শিক্ষার আমাদের দরকার ছিল । সত্যের বে কী শক্তি, মহাত্মার কল্যাণে আজ তা আমরা প্রত্যক্ষ দেখেছি ; কিন্তু চাতুরি হচ্ছে ভীরু ও দুর্বলের সহজ ধর্ম, সেটাকে ছিন্ন করতে হলে তার চামড়া কেটে ছিন্ন করতে হয়। সেইজন্তে আজকের দিনেও দেশের অনেক বিজ্ঞ লোকেই মহাত্মার চেষ্টাকেও নিজেদের পোলিটিকাল জুয়োখেলার একটা গোপন চালেরই সামিল করে নিতে চান। মিথ্যায় জীর্ণ তাদের মল এই কথাটা কিছুতেই বুঝতে পারে না যে, প্রেমের দ্বারা দেশের হৃদয়ে এই-ষে প্রেম উদবেলিত হয়েছে এট। একটা অবাস্তর বিষয় নয়— এইটেই মুক্তি, এইটেই দেশের আপনাকে পাওয়া ; ইংরেজ দেশে আছে কি নেই এর মধ্যে সে কথার কোনো জায়গাই নেই। এই প্রেম হল স্বপ্রকাশ, এই হচ্ছে ই ; কোনো না'এর সঙ্গে এ তর্ক করতে যায় না, কেনন তর্ক করবার দরকারই থাকে না । প্রেমের ডাকে ভারতবর্ষের হৃদয়ের এই-ষে আশ্চর্য উদবোধন, এর কিছু মুর সমুদ্রপারে আমার কানে গিয়ে পৌঁচেছিল। তখন ৰড়ে আনন্দে এই কথা আমার মনে হয়েছিল যে, এইবার এই উদবোধনের দরবারে আমাদের সকলেরই ভাক পড়বে, ভারতবাসীর চিত্তে শক্তির যে বিচিত্র রূপ প্রচ্ছন্ন আছে সমস্তই প্রকাশিত হৰে। কারণ, জামি २ ● 9 কালান্তর একেই আমার দেশের মুক্তি বলি ; প্রকাশই হচ্ছে মুক্তি। ভারতবর্ষে এক দিন বুদ্ধদেব সর্বভূতের প্রতি মৈত্রীমন্ত্র নিজের সত্যসাধনার ভিতর দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন ; তার ফল হয়েছিল এই যে, সেই সত্যের প্রেরণায় ভারতের মনুষ্যত্ব শিল্পকলায় বিজ্ঞানে ঐশ্বর্যে পরিব্যক্ত হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রশাসনের দিক থেকে সে দিনও ভারত বারে বারে এক হবার ক্ষণিক প্রয়াসের পর বারে বারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল ; কিন্তু তার চিত্ত মুপ্তি থেকে, অপ্রকাশ থেকে মুক্তিলাভ করেছিল। এই মুক্তির জোর এত যে, সে আপনাকে দেশের কোনো ক্ষুদ্র সীমায় বদ্ধ করে রাখতে পারে নি, সমুদ্রমরুপারেও যে দূরদেশকে সে স্পর্শ করেছে তারই চিত্তের ঐশ্বর্যকে উদঘাটন করেছে। অাজকের দিনের কোনো বণিক, কোনো সৈনিক এ কাজ করতে পারে নি । তারা পৃথিবীকে যেখানেই স্পর্শ করেছে সেইখানেই বিরোধ পীড়া এবং অপমান জাগিয়েছে, সেইখানেই বিশ্ব প্রকৃতির ঐ নষ্ট করে দিয়েছে। কেন ? কেননা লোভ সত্য নয়, প্রেমই সত্য। এইজন্ত প্রেম যখন মুক্তি দেয় সে একেবারে ভিতরের দিক থেকে । কিন্তু লোভ যখন স্বাতন্ত্র্যের জন্তে চেষ্টা করে তখন সে জবৰ্দ্দস্তির দ্বারা নিজের উদ্দেশ্য সাধন করতে অস্থির হয়ে ওঠে । বঙ্গবিভাগের দিনে এইটে আমরা লক্ষ্য করেছি – সেদিন গরিবদের আমরা ত্যাগন্ধুঃখ স্বীকার করতে বাধ্য করেছি প্রেমের দ্বারা নয়, বাইরে থেকে নানা প্রকারে চাপ দিয়ে। তার কারণ, লোভ অল্প সময়ের মধ্যে একটা বিশেষ সংকীর্ণ ফললাভের চেষ্টা করে ; প্রেমের যে ফল সে এক দিনের নয়, অল্প দিনের জন্তও নয়, সে ফলের সার্থকতা আপনার মধ্যেই । এত দিন পরে আমার দেশে সেই আনন্দময় মুক্তির হাওয়া ৰইছে, এইটেই আমি কল্পনা করে এলেছিলুম। এসে একটা জিনিস দেখে আমি হতাশ হয়েছি। দেখছি, দেশের মনের উপর বিষম একট চাপ । रै ● २ সত্যের আহবান বাইরে থেকে কিসের একটা তাড়নায় সবাইকে এক কথা বলতে, এক কাজ করাতে ভয়ংকর তাগিদ দিয়েছে । আমি যখন প্রশ্ন করতে যাই, বিচার করতে যাই, আমার হিতৈষীরা ব্যাকুল হয়ে আমার মুখ চাপা দিয়ে বলেন, ‘আজ তুমি কিছু বোলো না।’ দেশের হাওয়ায় আজ প্রবল একটা উৎপীড়ন আছে– সে লাঠি-সড়কির উৎপীড়ন নয়, তার চেয়ে ভয়ংকর, সে অলক্ষ্য উৎপীড়ন । বর্তমান প্রচেষ্টা সম্বন্ধে যাদের মনে কিছুমাত্র সংশয় আছে তারা সেই সংশয় অতি ভয়ে ভয়ে, অতি সাবধানে প্রকাশ করলেও পরমুহুর্তেই তার বিরুদ্ধে একটা শাসন ভিতরে ভিতরে উদ্যত হয়ে ওঠে। কোনো একটি খবরের কাগজে এক দিন কাপড় পোড়ানোর সম্বন্ধে অতি মৃদুমন্দ মধুর কণ্ঠে একটুখানি আপত্তির আভাসমাত্র প্রকাশ পেয়েছিল ; সম্পাদক বলেন, তার পরদিনই পাঠকমণ্ডলীর চাঞ্চল্য তাকে চঞ্চল করে তুললে । যে আগুনে কাপড় পুড়েছে সেই আগুনে তার কাগজ পুড়তে কত ক্ষণ ? দেখতে পাচ্ছি, এক পক্ষের লোক অত্যন্ত ব্যস্ত, আর-এক পক্ষের লোক অত্যন্ত ত্রস্ত । কথা উঠেছে সমস্ত দেশের বুদ্ধিকে চাপা দিতে হবে, বিস্তাকেও । কেবল বাধ্যতাকে অঁাকড়ে ধরে থাকতে হবে । কার কাছে বাধ্যতা ? মন্ত্রের কাছে, অন্ধবিশ্বাসের কাছে । কেন বাধ্যতা ? আবার সেই রিপুর কথা এসে পড়ে, সেই লোভ। অতি সত্বর অতিছুর্লভ ধন অতি সস্তায় পাবার একটা আশ্বাস দেশের সামনে জাগছে । এ যেন সন্ন্যাসীর মন্ত্রশক্তিতে সোনা ফলাবার আশ্বাস । এই আশ্বাসের প্রলোভনে মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধি অনায়াসে জলাঞ্জলি দিতে পারে এবং অন্ত যারা জলাঞ্জলি দিতে রাজি হয় না তাদের পরে বিষম ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। বাহিরের স্বাতন্ত্র্যের নামে মামুষের অস্তরের স্বাতন্ত্র্যকে এই রকমে বিলুপ্ত করা সহজ হয় । সকলের চেয়ে আক্ষেপের .বিষয় এই যে, সকলেই যে এই আশ্বাসে সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে তা নয় ২ e৩ कोङन्तोसुद्ध কিন্তু তারা বলে, এই প্রলোভনে দেশের এক দল লোককে দিয়ে একটা বিশেষ উদ্দেশু সাধন করিয়ে নেওয়া যেতে পারে। ‘সত্যমেব জয়তে নামৃতম্’ এটা যে ভারতের কথা সে ভারত এদের মতে স্বরাজ পেতেই পারে না। আরো মুশকিল এই যে, যে লাভের দাবি করা হচ্ছে তার একটা নাম দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সংজ্ঞ। দেওয়া হয় নি। ভয়ের কারণটা অস্পষ্ট হলে সে যেমন অতি ভয়ংকর হয়ে ওঠে, লোভের বিষয়টা অস্পষ্ট হলে তারও প্রবলতা বেড়ে যায়— কেননা তার মধ্যে কল্পনার কোনো বাধা থাকে না এবং প্রত্যেক লোকেই তাকে সম্পূর্ণ নিজের মনের মতো ক’রে গড়ে নিতে পারে । জিজ্ঞাসা দ্বারা তাকে চেপে ধরতে গেলে সে এক আড়াল থেকে আর-এক আড়ালে অতি সহজেই গা ঢাকা দেয়। এমনি করে এক দিকে লোভের লক্ষ্যটাকে অনির্দিষ্টতার দ্বারা অত্যন্ত বড়ো করে তোলা হয়েছে, অন্ত দিকে তার প্রাপ্তির সাধনাকে সময়ে এবং উপায়ে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এমনভাবে লোকের মনকে মোহাবিষ্ট করে তার পরে যখন তাকে বলা হয় তোমার বুদ্ধিবিদ্যা প্রশ্নবিচার সমস্ত দাও ছাই করে, কেবল থাক তোমার বাধ্যতা’, তখন সে রাজি হতে বিলম্ব করে না । কিন্তু কোনোএকটা বাহাদুষ্ঠানের দ্বারা অদূরবতী কোনো-একটা বিশেষ মাসের বিশেষ তারিখে স্বরাজ লাভ হবে, এ কথা যখন অতি সহজেই দেশের অধিকাংশ লোক বিনা তর্কে স্বীকার করে নিলে এবং গদা হাতে সকল তর্ক নিরস্ত করতে প্রবৃত্ত হল, অর্থাৎ নিজের বুদ্ধির স্বাধীনতা বিসর্জন দিলে এবং অন্তের বুদ্ধির স্বাধীনতা হরণ করতে উদ্যত হল, তখন সেটাই কি একটা বিষম ভাবনার কথা হল না ? এই ভূতকেই ঝাড়াবার জন্তে কি আমরা ওঝার খোজ করি নে ? কিন্তু, স্বয়ং ভূতই যদি ওঝা হয়ে দেখা দেয় তা হলেই তো বিপদের আর সীমা রইল না। মহাত্মা তার সত্যপ্রেমের দ্বারা ভারতের হৃদয় জয় করেছেন, সেখানে ३० 8 সত্যের আহবান আমরা সকলেই তার কাছে হার মানি । এই সত্যের শক্তিকে আমরা প্রত্যক্ষ করলুম এজন্ত আজ আমরা কৃতার্থ। চিরস্থন সত্যকে আমরা পুথিতে পড়ি, কথায় বলি, যে ক্ষণে তাকে আমরা সামনে দেখি সে আমাদের পুণ্যক্ষণ। বহু দিনে অকস্মাৎ আমাদের এই সুযোগ ঘটে। কনগ্রেস আমরা প্রতিদিন গড়তে পারি, প্রতিদিন ভাঙতে পারি, ভারতের প্রদেশে প্রদেশে ইংরেজি ভাষায় পোলিটিকাল বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানোও আমাদের সম্পূর্ণ সাধ্যায়ভ, কিন্তু সত্যপ্রেমের যে সোনার কাঠিতে শত বৎসরের সুপ্ত চিত্ত জেগে ওঠে সে তো আমাদের পাড়ার স্তাকরার দোকানে গড়াতে পারি নে। যার হাতে এই দুর্লভ জিনিস দেখলুম তাকে আমরা প্ৰণাম করি । i কিন্তু, সত্যকে প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও সত্যের প্রতি আমাদের নিষ্ঠা যদি দৃঢ় না হয় তা হলে ফল হল কী ? প্রেমের সত্যকে প্রেমের দিকে যেমন মানি, বুদ্ধির সত্যকে বুদ্ধির দিকে তেমনি আমাদের মানতে হবে। কন্‌গ্রেস প্রভৃতি কোনো রকম বাহাদুষ্ঠানে দেশের হৃদয় জাগে নি, মহং অস্তরের অকৃত্রিম প্রেমের স্পর্শে জাগল। আস্তরিক সত্যের এই প্রভাব যখন আমরা আজ এমন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তখন স্বরাজলাভের বেলাতেই কি সেই সত্যকে আর আমরা বিশ্বাস করব না ? উদবোধনের পালায় যাকে মানলুম, অনুষ্ঠানের পালায় তাকে বিসর্জন দিয়ে বলৰ ? মনে করে, আমি বীণার ওস্তাদ খুঁজছি। পূর্বে পশ্চিমে আমি নানা লোককে পরীক্ষা করে দেখলুম, কিন্তু হৃদয়ের তৃপ্তি হল না। তার শব্দ করে খুব, তারা কৌশল জানে বিস্তর, তারা রোজগার করে যথেষ্ট, কিন্তু তাদের বাছাছুরিতে মনে প্রশংসা জাগে, প্রেম জাগে না । অবশেষে হঠাৎ একজনকে খুঁজে পাওয়া গেল, তিনি তার তারে ছুটি-চারটি মীড় লাগাবা মাত্র অন্তরের আনন্দ-উৎসের মুখে এত দিন যে পাথর চাপা ছিল সেট যেন এক মুহুর্তে গেল গ’লে। এর কারণ কী ? এই ওস্তাদের R 6 & কালান্তর মনে যে আনন্দময়ী শক্তি আছে সে একটি সত্যকার জিনিস, লে আপন আনন্দশিখা থেকে অতি সহজেই হৃদয়ে হৃদয়ে আনন্দশিখাকে জালিয়ে তোলে। আমি বুঝে নিলুম, তাকে ওস্তাদ বলে মানলুম। তার পর আমার দরকার হল একটি বীণ। তৈরি করানো । কিন্তু, এই বীণা-তৈরির বিদ্যায় যে সত্যের দরকার সে আর-এক জাতের সত্য। তার মধ্যে অনেক চিস্তা, অনেক শিক্ষা, অনেক বস্তুতত্ত্ব, অনেক মাপজোখ, অনেক অধ্যৰসায় । সেখানে আমার ওস্তাদ যদি আমার দরিদ্র অবস্থার প্রতি দয়া ক’রে হঠাৎ ব’লে বসেন ‘বাবা, বীণা তৈরি করাতে বিস্তর আয়োজনের দরকার, সে তুমি পেরে উঠবে না, তুমি বরঞ্চ এই কাঠির গায়ে একটা তার বেঁধে ঝংকার দাও, তা হলে অমুক মাসের অমুক তারিখে, এই কাঠিই বীণা হয়ে বাজতে থাকবে, তবে সে কথা খাটবে না। আসলে আমার গুরুর উচিত নয় আমার অক্ষমতার প্রতি দয়া করা । এ কথা তার বলাই চাই, এ-সব জিনিস সংক্ষেপে এবং সস্তায় সারা যায় না। তিনিই তো আমাদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দেবেন যে, বীণার একটি মাত্র তার নয়, এর উপকরণ বিস্তর, এর রচনাপ্রণালী স্বল্প, নিয়মে একটুমাত্র ক্রটি হলে বেসুর বাজবে, অতএব জ্ঞানের তত্ত্বকে ও নিয়মকে বিচারপূর্বক সযত্বে পালন করতে হবে। দেশের হৃদয়ের গভীরতা থেকে সাড়া বের করা এষ্ট হল ওস্তাদজির বীণা-বাজানো— এই বিদ্যায় প্রেম যে কত বড়ো সত্য জিনিস সেই কথাটা আমরা মহাত্মীজির কাছ থেকে বিশুদ্ধ করে শিখে নিতে বলেছি, এ সম্বন্ধে তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ণ থাকৃ। কিন্তু, স্বরাজ গড়ে তোলবার তত্ত্ব বহুবিস্তৃত, তার প্রণালী দুঃসাধ্য এবং কালসাধ্য, তাতে যেমন আকাজক্ষা এবং হৃদয়াবেগ তেমনি তথ্যাঙ্গুসন্ধান এবং বিচারবুদ্ধি চাই । তাতে যারা অর্থশাস্ত্রবিৎ র্তাদের ভাবতে হবে, যন্ত্রতত্ত্ববিৎ তাদের খাটতে হবে, শিক্ষাতত্ত্ববিৎ রাষ্ট্রতত্ত্ববিং সকলকেই ধ্যানে এবং কৰ্মে লাগতে হবে। অর্থাৎ দেশের З e b সত্যের আহবান অস্তঃকরণকে সকল দিক থেকে পূর্ণ উদ্যমে জাগতে হবে। তাতে দেশের লোকের জিজ্ঞাসাবৃত্তি যেন সর্বদ নির্মল ও নিরভিভূত থাকে, কোনো গুঢ় বা প্রকাশু শাসনের দ্বারা সকলের বুদ্ধিকে যেন ভীরু এবং নিশ্চেষ্ট করে তোলা না হয়। এই-যে দেশের বিচিত্র শক্তিকে তলব দেওয়া এবং তাকে নিজের নিজের কাজে লাগানো, এ পারে কে ? সকল ডাকে তো দেশ সাড়া দেয় না, পূর্বে তো বারম্বার তার পরীক্ষা হয়ে গেছে। দেশের সকল শক্তিকে দেশের স্বষ্টিকার্যে আজ পর্যস্ত কেউ যোগযুক্ত করতে পারেন নি ব’লেই তো এত দিন আমাদের সময় বয়ে গেল। তাই এত কাল অপেক্ষা করে আছি, দেশের লোককে ডাক দেবার যার সত্য অধিকার আছে তিনিই সকলকে সকলের আত্মশক্তিতে নিযুক্ত করে দেবেন। এক দিন ভারতের তপোবনে আমাদের দীক্ষাগুরু তার সত্যজ্ঞানের অধিকারে দেশের সমস্ত ব্ৰহ্মচারীদের ডেকে বলেছিলেন— যখাপ: প্রবতায়স্তি যথা মাসা অহর্জরম্। এবং মাং ব্ৰহ্মচারিণো ধাত আয়ন্ধ সর্বতঃ স্বাহা ॥ জলসকল যেমন নিম্নদেশে গমন করে, মাসসকল যেমন সংবৎসরের দিকে ধাবিত হয়, তেমনি সকল দিক থেকে ব্ৰহ্মচারিগণ আমার নিকটে আমুন, স্বাহা । সেদিনকার সেই সত্যদীক্ষার ফল আজও জগতে অমর হয়ে আছে এবং তার আহবান এখন ও বিশ্বের কানে বাজে । আজ আমাদের কর্মগুরু তেমনি করেই দেশের সমস্ত কর্মশক্তিকে কেন আহবান করবেন না ? কেন বলবেন না ‘আয়ত্ত্ব সর্বত: স্বাহা, তারা সকল দিক থেকে আমুক’ ? দেশের সকল শক্তির জাগরণেই দেশের জাগরণ, এবং সেই সর্বতোভাবে জাগরণেই মুক্তি। মহাস্থাজির কণ্ঠে বিধাতা ডাকবার শক্তি দিয়েছেন, কেননা তার মধ্যে সত্য আছে ; অতএব এই তো ছিল আমাদের শুভ অবসর। কিন্তু তিনি ডাক দিলেন একটিমাত্র সংকীর্ণ ক্ষেত্রে। তিনি বললেন, ‘কেবলমাত্ৰ সকলে মিলে সুতো কাটো, কাপড় ૨૦ ૧ কালান্তর । বোলো।’ এই ডাক কি সেই আয়ত্ত্ব সর্বতঃ স্বাহা’ ? এই ডাক কি নবযুগের মহাস্থষ্টির ডাক ? বিশ্বপ্রকৃতি যখন মৌমাছিকে মৌচাকের ংকীর্ণ জীবনযাত্রায় ডাক দিলেন তখন লক্ষ লক্ষ মৌমাছি সেই আহবানে কর্মের সুবিধার জন্তে নিজেকে ক্লীব করে দিলে ; আপনাকে খর্ব করার দ্বারা এই-যে তাদের আত্মত্যাগ এতে তারা মুক্তির উণ্টো পথে গেল । যে দেশের অধিকাংশ লোক কোনো প্রলোভনে বা অমুশাসনে অন্ধভাবে নিজের শক্তির ক্লীবত্ব সাধন করতে কুষ্ঠিত হয় না, তাদের বন্দিদশা যে তাদের নিজের অস্তরের মধ্যেই। চরকা কাটা এক দিকে অত্যন্ত সহজ, সেইজন্তেই সকল মানুষের পক্ষে তা শক্ত । সহজের ডাক মামুষের নয়, সহজের ডাক মৌমাছির । মামুষের কাছে তার চূড়ান্ত শক্তির দাবি করলে তবেই সে আত্মপ্রকাশের ঐশ্বর্য উদঘাটিত করতে পারে । স্পাট বিশেষ লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে মামুষের শক্তিকে ংকীর্ণ করে তাকে বল দেবার চেষ্টা করেছিল, স্পার্টার জয় হয় নি ; এথেন্স, মামুষের সকল শক্তিকে উন্মুক্ত করে তাকে পূর্ণতা দিতে চেয়েছিল, এথেন্সের জয় হয়েছে – তার সেই জয়পতাকা আজও মানবসভ্যতার শিখরচুড়ায় উড়ছে। য়ুরোপে লৈনিকাবাসে কারখানাঘরে মানবশক্তির ক্লীবত্বসাধন করছে না কি ? লোভের বশে, উদ্দেপ্তসাধনের খাতিরে, মামুষের মনুষ্যত্বকে সংকীর্ণ করে ছেটে দিচ্ছে না কি ? অার এইজন্তেই কি যুরোপীয় সমাজে আজ নিরানন ঘনীভূত হয়ে উঠছে না ? বড়ো কলের দ্বারাও মানুষকে ছোটো করা যায়, ছোটো কলের দ্বারাও করা যায়। এঞ্জিনের দ্বারাও করা যায়, চরকার দ্বারাও। চরকা যেখানে স্বাভাবিক সেখানে সে কোনো উপদ্রব করে না, বরঞ্চ উপকার করে ; মানবমনের বৈচিত্র্যবশতই চরকা যেখানে স্বাভাবিক নয় সেখানে চরকায় স্থত কাটার চেয়ে মন কাটা যায় অনেকখালি । মন জিনিসটা স্বতার চেয়ে কম মূল্যবান নয়। २ ebञ्” সত্যের আহবান একটি কথা উঠেছে এই যে, ভারতে শতকরা আশিজন লোক চাষ করে এবং তারা বছরে ছয় মাস বেকার থাকে, তাদের স্বত্য কাটতে উৎসাহিত করবার জন্তে কিছু কাল সকল ভদ্রলোকেরই চরকা ধরা দরকার। প্রথম আবশ্যক হচ্ছে যথোচিত উপায়ে তথ্যাঙ্গুসন্ধান দ্বারা এই কথাটি প্রতিপন্ন করা। অর্থাৎ, কী পরিমাণ চাষ কত দিন পরিমাণ বেকার থাকে। যখন চাষ বন্ধ তখন চাষার কোনো উপায়ে যে পরিমাণ জীবিকা অর্জন করে, সুতা কাটার দ্বারা তার চেয়ে বেশি অর্জন করবে কি না। চাব ব্যতিরেকে জীবিকার একটিমাত্র উপায়ের স্বারা সমস্ত কৃষাণকে বদ্ধ করা দেশের কল্যাণের পক্ষে উচিত কি না, সে সম্বন্ধেও সন্দেহ আছে। কিন্তু মূল কথা এই যে, কারও মুখের কথায় কোনো অনুমানমাত্রের উপর নির্ভর ক’রে আমরা সর্বজনীন কোনো পন্থা অবলম্বন করতে পারব না ; আমরা বিশ্বাসযোগ্য প্রণালীতে তথ্যামুলঙ্কান দাবি করি । তার পরে উপায়ের যথাযোগ্যতা সম্বন্ধে বিছার করা সম্ভবপর। আমাকে কেউ কেউ বলেছেন, দেশের চিত্তশক্তিকে আমরা তো চিরদিনের জন্তে সংকীর্ণ করতে চাই নে, কেবল অতি অল্প কালের জন্তে । কেনই বা অল্প কালের জন্তে ? যেহেতু এই অল্প কালের মধ্যে এই উপায়ে আমরা স্বরাজ পাব ? তার যুক্তি কোথায় ? স্বরাজ তো কেবল নিজের কাপড় নিজে জোগানো নয়। স্বরাজ তো একমাত্র আমাদের বস্ত্রস্বচ্ছলতার উপর প্রতিষ্ঠিত নয় । তার যথার্থ ভিত্তি আমাদের মনের উপর, সেই মন তার বহুধাশক্তির দ্বারা এবং সেই আত্মশক্তির উপর আস্থা দ্বারা স্বরাজ স্থষ্টি করতে থাকে। এই স্বরাজস্থষ্টি কোনো দেশেই তো শেষ হয় নি; সকল দেশেই কোনো না কোনো অংশে লোভ বা মোহের প্ররোচনায় বন্ধনদশা থেকে গেছে। কিন্তু, সেই ৰন্ধনদশার কারণ মামুষের চিত্তে । সে-সকল দেশে নিরস্তর এই চিত্তের উপর দাবি করা > 8 3 е? 兽 হচ্ছে। আমাদের দেশেও সেই চিত্তের বিকাশের উপরেই স্বরাজ দাড়াতে পারবে । তার জন্তে কোনো বাহ ক্রিয়া, বাহ ফল নয়, জ্ঞান বিজ্ঞান চাই। দেশের চিত্তপ্রতিষ্ঠিত এই স্বরাজকে অল্পকাল কয়েক দিন চরকা কেটে আমরা পাৰ, এর যুক্তি কোথায় ? যুক্তির পরিবর্তে উক্তি তো কোনোমতেই চলবে না। মামুষের মুখে যদি আমরা দৈববাণী শুনতে আরম্ভ করি, তা হলে আমাদের দেশে যে হাজার রকমের মারাত্মক উপসর্গ আছে এই দৈববাণী ষে তারই মধ্যে অন্ততম এবং প্রবলতম হয়ে উঠবে। একবার যদি দেখা যায় যে, দৈববাণী ছাড়া আর-কিছুতেই আমাদের দেশ নড়ে না, তা হলে আশু প্রয়োজনের গরজে সকালে সন্ধ্যায় দৈববাণী বানাতে হবে, অন্ত সকল রকম বাণীই নিরস্ত হয়ে যাবে। যেখানে যুক্তির অধিকার সেখানে উক্তি দিয়ে যাদের ভোলাতে হবে, তাদের পক্ষে, যেখানে আত্মার অধিকার সেখানে কোনো না কোনো কর্তার আসন পড়বেই। তারা স্বরাজের গোড়া কেটে বসে আছে, আগায় জল ঢেলে কোনো ফল হবে না । এ কথা মানছি, আমাদের দেশে দৈববাণী, দৈব ঔষধ, বাহ ব্যাপারে দৈবক্রিয়া, এ-সবের প্রভাব খুবই বেশি ; কিন্তু সেইজন্তেই আমাদের দেশে স্বরাজের ভিতপত্তন করতে হলে দৈববাণীর আসনে বিশেষ করে বুদ্ধির বাণীকে পাকা করে বসাতে হবে। কেননা, আমার পূর্বের প্রবন্ধে বলেছি, দৈব স্বয়ং আধিভৌতিক রাজ্যে বুদ্ধির রাজ্যাভিষেক করেছেন । তাই আজ বাইরের বিশ্বে তারাই স্বরাজ পাবে এবং তাকে রক্ষণ করতে পারবে যারা আত্মবুদ্ধির জোরে আত্মকর্তৃত্বের গৌরব উপলব্ধি করতে পারে, যারা সেই গৌরবকে কোনো লোতে কোনো মোহে পরের পদানত করতে চায় না। এই-ষে আজ বস্ত্রাভাবে লজ্জাকাতরা মাতৃভূমির প্রাঙ্গণে রাশীকৃত ক’রে কাপড় পোড়ানো চলছে, কোন বাণীতে দেশের কাছে আজ তার তাগিদ আসছে ? সে কি ঐ দৈববাণীতে নয় ? কাপড় ব্যবহার বা বর্জন ই ১০ সত্যের আহবান ব্যাপারে অর্থশান্ত্রিক তত্ত্বের ঘনিষ্ঠ যোগ আছে, এ সম্বন্ধে সেই তত্ত্বের ভাষাতেই দেশের সঙ্গে কথা কইতে হবে ; বুদ্ধির ভাবা মান্ত করা যদি বহু দিন থেকে দেশের অভ্যাসবিরুদ্ধ হয়, তবে আর-সব ছেড়ে দিয়ে ঐ অনভ্যাসের সঙ্গেই লড়াই করতে হবে। কেননা এই অনভ্যাসই আমাদের পক্ষে গোড়ায় গলদ, original sin । সেই গলদটারই থাতিরে, সেই গলদকেই প্রশ্রয় দিয়ে আজ ঘোষণা করা হয়েছে, ‘বিদেশী কাপড় অপবিত্র, অতএব তাকে দগ্ধ করো। অর্থশাস্ত্রকে বহিস্কৃত করে তার জায়গায় ধর্মশাস্ত্রকে জোর করে টেনে আনা হল। অপবিত্র কথাটা ধর্মশাস্ত্রের কথা, অর্থের নিয়মের উপরের কথা । মিথ্যাকে বর্জন করতে হবে কেন, মিথ্যা অপবিত্র কেন, তার দ্বারা আমাদের প্রয়োজন সিদ্ধ হয় না বা নষ্ট হয় ব’লেই যে তা নয়। হোক বা না হোক, তার দ্বারা আমাদের আত্মা মলিন হয় । অতএব এ ক্ষেত্রে অর্থশাস্ত্র ব! রাষ্ট্রশস্ত্রের কথা খাটে না, এখানে ধর্মশাস্ত্রেরই বাণী প্রবল। কিন্তু, কোনো কাপড় পরা বা না-পরার মধ্যে যদি কোনো ভুল থাকে তবে সেটা অৰ্থতত্ত্বের বা স্বাস্থ্যতত্ত্বের বা সৌন্দৰ্যতত্ত্বের ভুল, এটা ধর্মতত্ত্বের ভুল নয়। এর উত্তরে কেউ কেউ বলেন, যে ভুলে দেহমনের দুঃখ আনয়ন করে সেইটেই অধৰ্ম । আমি তার উত্তরে এই বলি, ভুলমাত্রেই ছঃখ আছে— জিয়োমেটুির ভূলে রাস্তা খারাপ হয়, ভিত বাকা হয়, সাকো-নির্মাণে এমন গলদ ঘটে ষে তার উপর রেলগাড়ি চললে ভয়ংকর দুর্ঘটনা অবশুম্ভাবী । কিন্তু, এই ভুলের সংশোধন ধর্মশাস্ত্রের মতে হয় না। অর্থাৎ, ছেলেরা যে খাতায় জিয়োমেটির ভুল করে, অপবিত্র ব’লে সেই খাতা নষ্ট করে এ ভুলের সংশোধন হয় না ; জিয়োমেট্রি রই সত্য নিয়মে সেই খাতাকে সংশোধন করতে হবে। কিন্তু মাস্টারমশায়ের মনে এ কথা উঠতে পারে যে, ভুলের খাতাকে অপবিত্র যদি না বলি তা ছলে এরা 象》> কালাস্তর ভুলকে ভুল বলে গণ্য করবে না । তা যদি সত্য হয়, তা হলে অন্ত-সব কাজ ছেড়ে সকল প্রকার উপায়ে এই চিত্তগত দোষকে সংশোধন করতে হবে, তবেই এ ছেলেরা মানুষ হতে পারবে । কাপড় পোড়ানোর হুকুম আজ আমাদের পরে এসেছে। সেই হুকুমকে হুকুম ব’লে আমি মানতে পারব না ; তার প্রথম কারণ হচ্ছে এই যে, চোখ বুজে হুকুম মানার বিষম বিপত্তি থেকে দেশকে উদ্ধার করবার জন্তে আমাদের লড়তে হবে— এক হুকুম থেকে আর-এক হুকুমে তাকে ঘুরিয়ে হুকুমসমুদ্রের সাত ঘাটে তাকে জল খাইয়ে মারতে পারব না। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে এই যে, যে কাপড় পোড়ানোর আয়োজন চলছে সে আমার কাপড় নয়, বস্তুত দেশবাসীদের মধ্যে যাদের আজ কাপড় নেই এ কাপড় তাদেরই। ও কাপড় আমি পোড়াবার কে ? যদি তারা বলে ‘পোড়াও', তা হলে অন্তত আত্মঘাতীর পরেই আত্মহত্যার ভার দেওয়া হয়, তাকে বধ করবার ভার আমাদের উপর পড়ে না । যে মানুষ ত্যাগ করছে তার অনেক কাপড় আছে আর যাকে জোর করে ত্যাগছুঃখ ভোগ করাচ্ছি কাপড়ের অভাবে সে ঘরের বার হতে পারছে না । এমনতরো জবৰ্দ্দস্তির প্রায়শ্চিত্তে পাপক্ষালন হয় না । বার বার বলেছি, আবার বলব, বাহ ফলের লোভে আমরা মনকে খোয়াতে পারব না। যে কলের দৌরাত্ম্যে সমস্ত পৃথিবী পীড়িত মহাত্মাজি সেই কলের সঙ্গে লড়াই করতে চান, এখানে আমরা তার দলে । কিন্তু, যে মোহমুগ্ধ মন্ত্ৰমুগ্ধ অন্ধ বাধ্যতা আমাদের দেশের সকল দৈন্ত ও অপমানের মূলে, তাকে সহায় করে এ লড়াই করতে পারব না। কেননা তারই সঙ্গে আমাদের প্রধান লড়াই, তাকে তাড়াতে পারলে তৰেই আমরা অস্তরে বাহিরে স্বরাজ পাব । বাপড় পোড়াতে আমি রাজি আছি, কিন্তু কোনো উক্তির তাড়নায় নয়। বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির যথেষ্ট সময় নিয়ে যথোচিত উপায়ে প্রমাণ ૨ છે ૨ সত্যের আহবান সংগ্রহ করুন এবং স্বযুক্তি দ্বারা আমাদের বুঝিয়ে দিন যে, কাপড় পরা সম্বন্ধে আমাদের দেশ অর্থনৈতিক যে অপরাধ করেছে অর্থনৈতিক কোন ব্যবস্থার দ্বারা তার প্রতিকার হতে পারে। বিনা প্রমাণে ৰিন যুক্তিতে কেমন করে নিশ্চিত বলব যে, বিশেষ একটা কাপড় প’রে আমরা আর্থিক যে অপরাধ করেছি কাপড়টাকে পুড়িয়ে সেই অপরাধের মূলটাকে আরো বিস্তারিত করে দিচ্ছি নে, ম্যাঞ্চেস্টারের র্কাস তাতে পরিণামে ও পরিমাণে আরো কঠিন হয়ে উঠবে না ? এ তর্ক আমি বিশেষজ্ঞভাবে উত্থাপিত করছি নে, কেননা আমি বিশেষজ্ঞ নই, আমি জিজ্ঞামুভাবেই করছি। বিশেষজ্ঞ যা বলেন তাই যে বেদবাক্য আমি তা বলি নে । কিন্তু সুবিধা এই যে, বেদবাক্যের ছন্দে তারা কথা বলেন না । প্রকাশু সভায় তারা আমাদের বুদ্ধিকে আহবান করেন । একটি কথা আমাদের মনে ভাববার দিন এসেছে, সে হচ্ছে এই— ভারতের আজকের এই উদবোধন সমস্ত পৃথিবীর উদবোধনের অঙ্গ । একটি মহাযুদ্ধের তুর্ষধ্বনিতে আজ যুগারম্ভের দ্বার খুলেছে। মহাভারতে পড়েছি, আত্মপ্রকাশের পূর্ববতী কাল হচ্ছে অজ্ঞাতবাসের কাল। কিছু কাল থেকে পৃথিবীতে মানুষ যে পরস্পর কিরকম ঘনিষ্ঠ হয়ে এসেছে সে কথাটা স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও অজ্ঞাত ছিল । অর্থাৎ, ঘটনাটা বাইরে ছিল, আমাদের মনে প্রবেশ করে নি। যুদ্ধের আঘাতে এক মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ যখন বিচলিত হয়ে উঠল, তখন এই কথাটা আর লুকোনো রইল না । হঠাৎ এক দিনে আধুনিক সভ্যতা অর্থাৎ পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত কেঁপে উঠল। বোঝা গেল, এই কেঁপে ওঠার কারণটা স্থানিক নয় এবং ক্ষণিক নয়— এর কারণ সমস্ত পুথিবী জুড়ে। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্বন্ধ এক মহাদেশ থেকে আর-এক মহাদেশে ব্যাপ্ত, তার মধ্যে সত্যের সামঞ্জস্ত যত ক্ষণ না ঘটবে তত ক্ষণ এই কারণের নিবৃত্তি হবে না। এখন থেকে যে-কোনো জাত নিজের ર છે૭ কালান্তর দেশকে একান্ত স্বতন্ত্ৰ ক’রে দেখবে, বর্তমান যুগের সঙ্গে তার বিরোধ ঘটবে, সে কিছুতেই শাস্তি পাবে না। এখন থেকে প্রত্যেক দেশকে নিজের জন্তে যে চিস্তা করতে হবে তার সে চিস্তার ক্ষেত্র হবে জগৎজোড়া। চিত্তের এই বিশ্বমুখী বৃত্তির চর্চা করাই বর্তমান যুগের শিক্ষার সাধনা। কিছু দিন থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতরাষ্ট্রশাসনে একটা মূলনীতির পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মূলে আছে ভারতরাষ্ট্রসমস্তাকে বিশ্বসমস্তার অন্তর্গত করে দেখবার চেষ্টা । যুদ্ধ আমাদের মনের সামনে থেকে একটা পর্দা ছিড়ে দিয়েছে — যা বিশ্বের স্বার্থ নয় তা যে আমাদের নিজের স্বার্থের বিরোধী এই কথাকে মানুষ, পুথির পাতায় নয়, ব্যবহারের ক্ষেত্রে আজ দেখতে পাচ্ছে ; এবং সে বুঝছে, যেখানে অন্তায় আছে সেখানে বাহ অধিকার থাকলেও সত্য অধিকার থাকে না । বাহ অধিকারকে খর্ব ক'রেও যদি সত্য অধিকার পাওয়া যায় তবে সেটাতে লাভ ছাড়া লোকসান নেই। মানুষের মধ্যে এই-যে একটা বুদ্ধির বিরাট পরিবর্তন ঘটছে, তার চিত্ত সংকীর্ণ থেকে ভূমার দিকে যাচ্ছে, তারই হাত এই ভারতরাষ্ট্রনীতি-পরিবর্তনের মধ্যে কাজ করতে আরম্ভ করেছে। এর মধ্যে যথেষ্ট অসম্পূর্ণতা ও প্রভূত বাধা আছে– স্বার্থকুদ্ধি শুভবুদ্ধিকে পদে পদে আক্রমণ করবেই – তাই ব’লে এ কথা মনে করা অন্যায় যে, এই শুভবুদ্ধিই সম্পূর্ণ কপটতা এবং স্বাৰ্থবৃদ্ধিই সম্পূর্ণ অকৃত্রিম । আমার এই বাট বৎসরের অভিজ্ঞতায় একটি কথা জেনেছি যে, কপটতার মতে দুঃসাধ্য অতএব স্থলভ জিনিস আর নেই । খাটি কপট মানুষ হচ্ছে ক্ষণeন্মা লোক, অতি অকস্মাৎ তার আবির্ভাব ঘটে । আসল কথা, সকল মামুষের মধ্যেই কম বেশি পরিমাণে চারিত্র্যের দ্বৈধ আছে । আমাদের বুদ্ধির মধ্যে লজিকের যে কল পাতা তাতে দুই বিরোধী পদার্থকে ধরানো কঠিন ব'লেই ভালোর সঙ্গে যখন মঙ্গকে দেখি তখন তাড়াতাড়ি ঠিক করে নিই, এর মধ্যে ૨ છે 8 সত্যের আহবান ভালোটাই চাতুরি। আজকের দিনে পৃথিবীতে সর্বজনীন যে-সকল প্রচেষ্টা চলছে তার মধ্যে পদে পদে মামুষের এই চারিত্র্যের দ্বৈধ দেখা যাবে। সে অবস্থায় তাকে যদি তার অতীতযুগের দিক থেকে বিচার করি তা হলে তার স্বাৰ্থ বুদ্ধিকে মনে করব খাটি ; কারণ, তার অতীতের নীতি ছিল ভেদবুদ্ধির নীতি। কিন্তু তাকে যদি আমাদের আগামীকালের দিক থেকে বিচার করি তা হলে বুঝব শুভবুদ্ধিটাই খাটি। কেননা ভাবী যুগের একটা প্রেরণা এসেছে মামুষকে সংযুক্ত করবার জন্তে । যে বুদ্ধি সকলকে সংযুক্ত করে সেই হচ্ছে শুভবুদ্ধি। এই-বে লীগ অফ নেশনস -প্রতিষ্ঠা বা ভারতশাসনসংস্কার, এ-সব হচ্ছে ভাৰী যুগ সম্বন্ধে পশ্চিমদেশের বাণী । এ বাণী সত্যকে যদি বা সম্পূর্ণ প্রকাশ না করে এর চেষ্ট হচ্ছে সেই সত্যের অভিমুখে । আজ এই বিশ্বচিত্ত-উদবোধনের প্রভাতে আমাদের দেশে জাতীয় কোনো প্রচেষ্টার মধ্যে যদি বিশ্বের সর্বজনীন কোনো বাণী না থাকে তা হলে তাতে আমাদের দীনতা প্রকাশ করবে। আমি বলছি নে, আমাদের আগু প্রয়োজনের যা-কিছু কাজ আছে তা আমরা ছেড়ে দেব। সকালবেলায় পাখি যখন জাগে তখন কেবলমাত্র আহার-অন্বেষণে তার সমস্ত জাগরণ নিযুক্ত থাকে না, আকাশের আহবানে তার স্থই অক্লান্ত পাখা সায় দেয় এবং আলোকের আনন্দে তার কণ্ঠে গান জেগে ওঠে। আজ সর্বমানবের চিত্ত আমাদের চিত্তে তার ডাক পাঠিয়েছে ; আমাদের চিত্ত আমাদের ভাষায় তার সাড়া দিক, কেননা ডাকের যোগ্য সাড়া । দেওয়ার ক্ষমতাই হচ্ছে প্রাণশক্তির লক্ষণ। একদা যখন পরমুখাপেক্ষী পলিটিক্সে সংসঙ্ক ছিলুম, তখন আমরা কেবলই পরের অপরাধের তালিকা আউড়ে পরকে তার কর্তব্যক্রটি স্মরণ করিয়েছি ; আজ যখন আমরা পরপরায়ণতা থেকে আমাদের পলিটিক্স কে ছিন্ন করতে চাই, আজও সেই পরের অপরাধ-জপের দ্বারাই আমাদের বর্জননীতির 》《: কালাস্তর পোষণপালন করতে চাচ্ছি। তাতে উত্তরোত্তর আমাদের যে মনোভাব প্রবল হয়ে উঠছে সে আমাদের চিত্তের আকাশে রক্তবর্ণ ধুলো উড়িয়ে বৃহৎ জগৎ থেকে আমাদের চিস্তাকে আবৃত করে রাখছে। প্রবৃত্তির দ্রুত চরিতার্থতার দিকে আমাদের উত্তেজনা সে কেবলই বাড়িয়ে তুলছে। সমস্ত বিশ্বের সঙ্গে যোগযুক্ত ভারতের বিরাট রূপ চোখে না পড়াতে আমাদের কর্মে ও চিস্তায় ভারতের যে পরিচয় আমরা দিতে প্রবৃত্ত হয়েছি সে অতি ছোটো, তার দীপ্তি নেই ; সে আমাদের ব্যবসায়ৰুদ্ধিকেই প্রধান করে তুলছে। এই বুদ্ধি কখনো কোনো বড়ে জিনিসকে হুষ্টি করে নি। আজ পশ্চিমদেশে এই ব্যবসায় বুদ্ধিকে অতিক্রম করে শুভবুদ্ধি জাগিয়ে তোলবার জন্তে একটা আকাঙ্ক্ষা এবং উদ্যম দেখা দিয়েছে। সেখানে কত লোক দেখেছি যারা এই সংকল্পকে মনের মধ্যে নিয়ে আজ সন্ন্যাসী । অর্থাৎ যারা স্বাজাত্যের বাধন কেটে ঐক্যের সাধনায় ঘরছাড়া হয়ে বেরিয়েছে, যারা নিজের অস্তরে মামুষের ভিতরকার অদ্বৈতকে দেখেছে। সেই-সব সন্ন্যাসীকে ইংরেজের মধ্যে অনেক দেখেছি ; তারা তাদের স্বজাতির আত্মম্ভরিতা থেকে দুর্বলকে রক্ষা করবার সাধনায় স্বজাতির কাছ থেকে আঘাত ও অপমান স্বীকার করতে কুষ্ঠিত হন নি। সেই রকম সন্ন্যাসী দেখেছি ফ্রান্সে, যেমন রোম্য রলা— তিনি তার দেশের লোকের দ্বারা বঞ্জিত। সেই রকম সন্ন্যাসী আমি যুরোপের অপেক্ষাকৃত অখ্যাত দেশের প্রাস্তে দেখেছি । দেখেছি য়ুরোপের কত ছাত্রের মধ্যে ; সর্বমানবের ঐক্যসাধনায় তাদের মুখচ্ছবি দীপ্যমান। তারা ভাবী যুগের মহিমায় বর্তমান যুগের সমস্ত আঘাত ধৈর্যের সঙ্গে বহন করতে চায়, সমস্ত অপমান বীর্যের সঙ্গে ক্ষমা করতে চায়। আর আমরাই কি কেবল, যেমন ‘পঞ্চকন্তাং স্বরেল্লিত্যং’ তেমনি করে আজ এই শুভদিনের প্রভাতে কেবল পরের অপরাধ স্মরণ করব, এবং আমাদের জাতীয় হুষ্টিকার্য একটা কলহের উপর প্রতিষ্ঠিত ২১ণ্ড সত্যের আহবান করতে থাকব ? আমরা কি এই প্রভাতে সেই শুভবুদ্ধিদাতাকে স্মরণ করব না, য একঃ, যিনি এক ; অবর্ণ, যিনি বর্ণহীন, যার মধ্যে সাদা কালো নেই ; বহুধাশক্তিযোগাৎ বর্ণাননেকান নিহিতার্থে দবাতি, যিনি বহুধা শক্তির যোগে অনেক বর্ণের লোকের জন্ত তাদের অন্তর্নিহিত প্রয়োজন বিধান করেছেন— আর তারই কাছে কি প্রার্থনা করব না, ‘স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনত্ত, তিনি আমাদের সকলকে শুভবুদ্ধি দ্বারা সংযুক্ত করুন' ? কাতিক ծՎՉՀԵ

➢ ዓ