কালান্তর/স্বামী শ্রদ্ধানন্দ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

স্বামী শ্রদ্ধানন্দ আমাদের দেশে ধারা সত্যের ব্রত গ্রহণ করবার অধিকারী, এবং সেই ব্ৰতকে প্রাণ দিয়ে যারা পালন করবার শক্তি রাখেন, তাদের সংখ্যা অল্প বলেই দেশের এত দুৰ্গতি । এমন চিত্তদৈন্ত যেখানে সেখানে স্বামী শ্রদ্ধানদের মতে অত বড়ো বীরের এমন মৃত্যু যে কতদূর শোকাবহ তার বর্ণনায় প্রয়োজন নেই। এর মধ্যে একটি কথা এই আছে যে, তার মৃত্যু যতই শোচনীয় হোক, সে মৃত্যুতে তার প্রাণ, তার চরিত্র ততই মহীয়ান হয়েছে। বারে বারে ইতিহাসে দেখা যায়, নিজের সমস্ত দিয়ে ধারা কল্যাণব্ৰতকে গ্রহণ করেছেন, অপমান ও অপমৃত্যু তাদের ললাটে জয়তিলক এমনি করেই একেছে। মহাপুরুষরা আসেন প্রাণকে মৃত্যুর উপরেও জয়ী করতে, সত্যকে জীবনের সামগ্ৰী করে তুলতে। আমাদের খাদ্যদ্রব্যে প্রাণ দেবার যা উপকরণ রয়েছে তা বায়ুতে আছে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে ও আছে। কিন্তু, যত ক্ষণ তা উদ্ভিদে প্রাণীতে জৈব-আকার না ধারণ করে তত ক্ষণ প্রাণের পুষ্টি হয় না । সত্য সম্বন্ধেও সে কথা থাটে। শুধুমাত্র বাক্যের হাওয়া থেকে আকর্ষণ করে নিয়ে তাকে জীবনগত করবার শক্তি ক'জনারই বা আছে ? সত্যকে জানে অনেক লোকে, তাকে মানে সেই মামুষ যে বিশেষ শক্তিমান । প্রাণ দিয়ে তাকে মানার স্বারাই সত্যকে আমরা সকল মামুষের করে দিই। এই মানতে পারার শক্তিটাই মন্ত জিনিস। এই শক্তির সম্পদ যারা সমাজকে प्रशन उँट्नद्र मान यशश्णा । गट्ठात्र यडि ८गरे निाच्न चाझर्न वरुानम এই দুর্বল দেশকে দিয়ে গেছেন। তার সাধনা-পরিচয়ের উপযোগী ষে নাম তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেই নাম তার সার্থক। সত্যকে তিনি শ্রদ্ধা করেছেন। এই শ্রদ্ধার মধ্যে স্থষ্টিশক্তি আছে। সেই শক্তির ה. צלא কালান্তর দ্বারা তার সাধনাকে রূপমূর্তি দিয়ে তাকে তিনি সজীব করে গেছেন। তাই তার মৃত্যুও আলোকের মতো হয়ে উঠে তার শ্রদ্ধার সেই ভয়হীন ক্ষয়হীন ক্লাস্তিহীন অমৃতচ্ছবিকে উজ্জ্বল করে প্রকাশ করেছে। সত্যের প্রতি শ্রদ্ধার এই ভূমানন্দকে তার চরিত্রের মধ্যে আজ আমরা যেন সার্থক আকারে দেখতে পারি। এই সার্থকতা বাহ ফলে নয়, নিজেরই অকৃত্রিম বাস্তবতায় । অপঘাতের এই-যে আঘাত শুধু মহাপুরুষেরাই একে সহ করতে পারেন, শুধু তাদের পক্ষেই এর কোনো অর্থ নেই। যারা মরণকে ক্ষুদ্র স্বার্থের উর্ধ্বে তুলতে পেরেছেন, জীবন থাকতেই তারা অমৃতলোকে উত্তীর্ণ। কিন্তু, মৃত্যুর গুপ্তচর তো শ্রদ্ধানন্দের আয়ু হরণ করেই ফিরে যাবে না। ধর্মবিদ্রোহী ধর্মান্ধতার কাধে চড়ে রক্তকলুষিত যে বীভৎসতাকে নগরের পথে পথে সে বিস্তার করেছিল অনতিকাল পূর্বেই, সে তো আমরা দেখেছি। সে যাদের নষ্ট করেছে তাদের তো কিছুই অবশেষ থাকে নি। তাদের মৃত্যু যে নিরতিশয় মৃত্যু, তাদের ক্ষতি যে চরম ক্ষতি । তাদের ঘরে সস্তানহীন মাতার ক্ৰন্দনে সাস্বনা নেই, বিধবার দুঃখে শাস্তি নেই। এই-যে নিষ্ঠুরতা যা সমস্তকে নিঃশেষে চিতাভষ্মে সমাধা করে, তাকে তো সহ করতে পারা যায় না । দুর্বল স্বল্পপ্রাণ যারা, যাদের জনসাধারণ বলি, তারা এত বড়ো হিংসার বোঝা বইবে কী ক’রে ? এখন দেখতে পাচ্চি, আবার যমরাজের সিংহদ্বার উদঘাটিত হল, আবার প্রতিবেশীতে প্রতিবেশীতে হত্যার প্রতিযোগিতা আরম্ভ হল। এর দুঃখ লইবে কে ? বিধাতা যখন দুঃখকে আমাদের কাছে পাঠান তখন সে একটি প্রশ্ন নিয়ে আসে । সে আমাদের জিজ্ঞাসা করে, তোমরা আমাকে কী ভাবে গ্রহণ করবে। বিপদ আলবে না এমন হতে পারে না— সংকটের সময় ૭૨ ૦ স্বামী শ্রদ্ধানন্দ উপস্থিত হয়, আশু উদ্ধারের উপায় থাকে না, কিন্তু কী ভাবে বিপদকে আমরা ব্যবহার করি তারই উপরে প্রশ্নের সন্থত্তর নির্ভর করে । এইযে পাপ কালো হয়ে দেখা দিল, এর ভয়ে ভীত হব না এর কাছে মাথা নত করব ? না সে পাপের বিরুদ্ধে পাপকে দাড় করাব ? মৃত্যুর আঘাত, দুঃখের আঘাতের উপর রিপুর উন্মত্ততাকে জাগ্রত করব ? শিশুর আচরণে দেখা যায়, সে যখন আছাড় খায় তখন মেজেকে আঘাত করতে থাকে। যতই আঘাত করে মেজে ততই সে আঘাত ফিরিয়ে দেয় । এ শিশুর ধর্ম। কিন্তু, যদি কোনো বয়স্ক লোক হোচট খায় তবে সে চিস্তা করে, বাধাটা কোথায়— বাধা যদি থাকে তো সেট লঙ্ঘন বা সেটাকে অপসারণ করতে হবে। সচরাচর দেখতে পাই বাহির থেকে আকস্মিক আঘাতের চমকে মামুষের শিশুবুদ্ধি ফিরে আসে। সে তখন মনে করে, ধৈর্য অবলম্বন করাই কাপুরুষতা, ক্রোধের প্রকাশ পৌরুষ । আজকের দিনে স্বভাবতই ক্রোধের উদয় হয়ে থাকবে, সে কথা স্বীকার করি । মানবধর্ম তো একেবারে ছড়িতে পারি নে। কিন্তু ক্রোধ দ্বারা যদি অভিভূত হই তবে সেও মানবধর্ম নয়। আগুন লেগে পাড়। যদি নিরুপায়ে ভষ্ম হয়ে যায় তবে অfগুনের রুদ্রতা নিয়ে আলোচনা করা বৃথা । তখন যদি দোষ কাউকে দিতে হয় তো আগুনকে যেন না দিই। বিপদের কারণ সর্বত্রই থাকে, তার প্রতিকারের উপায় যারা রাখে না তারাই দোষী। যাদের ঘর পুড়েছে তারা যদি বলতে পারে যে “কূপ খনন করে রাখি নি সেই অপরাধের শাস্তি পেলেম', তা হলে ভবিষ্যতে তাদের ঘর পোড়ার আশঙ্কা কমে । আমাদেরও আজকে তাই বলতে হবে । অপরাধের গোড়ার কথাটা ভাবা চাই । শুনে হয়তো লোকে বলবে, না, এ তো ভালো লাগছে না ; একটা প্রলয়-ব্যাপার বাধিয়ে দিতে পারলে সাস্বনা পাওয়া যায়। ভারতবর্ষের অধিবাসীদের দুই মোট ভাগ, হিন্দু ও মুসলমান। যদি ー&> \రి:RS কালান্তর ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে এক পাশে সরিয়ে দিলেই দেশের সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তা হলে বড়োই ভুল করব । ছাদের পাচটা কড়িকে মানব, বাকি তিনটে কড়িকে মানবই না, এটা বিরক্তির কথা হতে পারে, কিন্তু ছাদ-রক্ষার পক্ষে স্ববুদ্ধির কথা নয়। আমাদের সব চেয়ে বড়ো অমঙ্গল, বড়ো দুৰ্গতি ঘটে, যখন মানুষ মামুষের পাশে রয়েছে অথচ পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ নেই অথবা সে সম্বন্ধ বিকৃত । বিদেশীর রাজ্যে রাজপুরুষদের সঙ্গে আমাদের একটা বাহ যোগ থাকে, অথচ আন্তরিক সম্বন্ধ থাকে না । বিদেশীয় রাজত্বে এইটেই আমাদের সব চেয়ে পীড়া দেয়। গায়ে-পড়। যোগটা দুর্বলতা ও অপমান আনে । বিদেশী শাসন সম্পর্কে যদি এ কথা খাটে তবে স্বদেশীয়দের সম্বন্ধে সে আরো কত সত্য । এক দেশে পাশাপাশি থাকতে হবে, অথচ পরস্পরের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্বন্ধ থাকবে না, হয়তো বা প্রয়োজনের থাকতে পারে— সেইখানেই যে ছিদ্ৰ— ছিদ্র নয়, কলির সিংহদ্বার। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে যেখানে এতখানি ব্যবধান লেখানেই আকাশ ভেদ করে ওঠে অমঙ্গলের জয়তোরণ। আমাদের দেশে কল্যাণের রথযাত্রায় যখনই সকলে মিলে টানতে চেষ্টা করা হয়েছে, কংগ্রেস প্রভৃতি নানা প্রচেষ্টা দ্বারা, সে রথ কোথায় এসে থেমে যায়, ভেঙে পড়ে ? যেখানে গর্তগুলো হা ক’রে আছে হাজার বছর ধরে । আমাদের দেশে যখন স্বদেশী আন্দোলন উপস্থিত হয়েছিল তখন আমি তার মধ্যে ছিলেম। মুসলমানরা তখন তাতে যোগ দেয় নি, বিরুদ্ধ ছিল। জননায়কের কেউ কেউ তখন ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ওদের একেবারে অস্বীকার করা যাক । জানি, ওরা যোগ দেয় নি । কিন্তু, কেন দেয় নি ? তখন বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এত প্রবল যোগ চয়েছিল যে সে আশ্চর্য। কিন্তু, এত বড়ো আবেগ শুধু হিন্দুসমাজের মধ্যেই আবদ্ধ রইল, মুসলমানসমাজকে স্পর্শ করল না । সে দিনও ७२२ স্বামী শ্রদ্ধানন্দ আমাদের শিক্ষা হয় নি । পরস্পরের মধ্যে বিচ্ছেদের ডোবাটাকে আমরা সমাজের দোহাই দিয়ে গভীর করে রেখেছি। সেটাকে রক্ষা করেও লাফ দিয়ে সেট পার হতে হবে, এমন আবদার চলে না। এমন কথা উঠতে পারে যে, ডোবা তে। সনাতন ডোবা, কিন্তু আজ তার মধ্যে যে দুশ্চিকিংস্ত বিভ্ৰাট ঘটছে সেটা তো নুতন, অতএব হাল-আমলের কোনো একটা ভূত আমাদের ঘাড় ভাঙবার গোপন ফন্দি করেছে ; ডোবার কোনো দোষ নেই, ওটা ব্ৰঞ্চার বুড়ো আঙুলের চাপে তৈরি। একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, ভাঙা গাড়িকে যখন গাড়িখানায় রাখা যায় তখন কোনো উপদ্রব হয় না । সেটার মধ্যে শিশুরা খেলা করতে পারে, চাই কি মধ্যাহের বিশ্রামাবাসও হতে পারে। কিন্তু, যখনই তাকে টানতে ষাই তখন তার জোড় ভাঙা অংশে অংশে সংঘাত উপস্থিত হয়। যখন চলি নি, রাষ্ট্রসাধনার পথে পাশাপাশি রয়েছি, গ্রামের কর্তব্য পালন করেছি, তখন তো নাড়া খাই নি। আমি যখন আমার জমিদারি সেরেস্তায় প্রথম প্রবেশ করলেম তখন এক দিন দেখি, আমার নায়েৰ তার বৈঠকখানায় এক জায়গায় জাজিম খানিকট তুলে রেখে দিয়েছেন । যখন জিজ্ঞেস করলেম, এ কেন, তখন জবাব পেলেম, ষেসব সন্মানী মুসলমান প্রজা বৈঠকখানায় প্রবেশের অধিকার পায় তাদের জন্ত ঐ ব্যবস্থা। এক তক্তপোষে বসাতেও হবে অথচ বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা পৃথক । এ প্রথা তো অনেক দিন ধরে চলে এসেছে ; অনেক দিন মুসলমান এ মেনে এসেছে, হিন্দুও মেনে এসেছে। জাজিমতোলা আসনে মুসলমান বসেছে, জাজিম-পাত আসনে অন্তে বলেছে। তার পর ওদের ডেকে এক দিন বলেছি, আমরা ভাই, তোমাকেও আমার সঙ্গে ক্ষতি স্বীকার করতে হবে, কারাবাস ও মৃত্যুর পথে চলতে হৰে ? তখন হঠাৎ দেখি অপর পক্ষ লাল-টক্টকে নতুন ফেজ মাথায় দিয়ে বলে, আমরা পৃথক । আমরা বিক্ষিত হয়ে বলি, রাষ্ট্র ব্যাপারে পরম্পর পাশে כ\sס\ কালান্তর এসে দাড়াবার বাধাটা কোথায় ? বাধা ঐ জাজিম-তোলা আসনে বহু দিনের মস্ত ফাকটার মধ্যে । ওটা ছোটো নয় । ওখানে অকুল অতল কালাপানি। বক্তৃতামঞ্চের উপর দাড়িয়ে চেচিয়ে ডাক দিলেই পার হওয়া যায় না । আজকের দিনে রাষ্ট্রশক্তির উদবোধন হয়েছে বলেই যত ভেদ, যত ফাক, সব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেইজন্তই মার খাচ্ছি। এই মার নানা রূপে আসে— কিন্তু, আজ বড়ো করে দেখা দিল এই মহাপুরুষের মৃত্যুতে। মহাপুরুষেরা এই মারকে বক্ষে গ্রহণ করে এর একান্ত বীভৎসতার পরিচয় দেন । তাতেই আমাদের চৈতন্ত হয়। এই-যে চৈতন্ত এসেছে, রিপুর বশবর্তী হয়ে কি এই শুভ অবসরকে নষ্ট করব না শুভবুদ্ধিদাতাকে বলব যেখানেই ভেদ ঘটিয়েছি সেখানেই পাপের বেদি গেখেছি, তার থেকেই বাচাও’ ? এই-যে রুদ্রবেশে পাপ দেখা দিল, এ তো ভালোই হয়েছে এক ভাবে । আজকে না ভেবে উপায় নেই যে, কী করে একে চিরকালের মতো পরাভূত করা যেতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে, আগু আমরা কোন উপায় অবলম্বন করব। সহসা এ প্রশ্নের একটা পাক-রকম উত্তর দিই এমন শক্তি আমার নেই। পরীক্ষা আরম্ভ করে ক্রমে ক্রমে সে উপায় এক দিন পাবই। আজকে সেই পরীক্ষা-আরম্ভের আয়োজন। আজকে দেখতে হবে, আমাদের হিন্দুসমাজের কোথায় কোন ছিদ্র, কোন পাপ আছে ; অতি নির্মমভাবে তাকে আক্রমণ করা চাই। এই উদ্দেশু মনে নিয়ে আজি হিন্দুসমাজকে আহবান করতে হবে ; বলতে হবে, "পীড়িত হয়েছি আমরা, লজ্জিত হয়েছি, বাইরের আঘাতের জন্ত নয়, আমাদের ভিতরের পাপের জন্ত। এলো আজ সেই পাপ দূর করতে সকলে মিলি। আমাদের পক্ষে এ বড়ো সহজ কথা নয় । কেননা, অস্তরের মধ্যে বহু কালের অভ্যস্ত ভেদবুদ্ধি, বাইরেও বহু দিনের গড়া অতি কঠিন ভেদের প্রাচীর। মুসলমান ૭૨ 8 স্বামী শ্রদ্ধানন্দ যখন কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে মুসলমানসমাজকে ডাক দিয়েছে, সে কোনো বাধা পায় নি— এক ঈশ্বরের নামে ‘আল্লাহে আকৃবর’ বলে সে ডেকেছে । আর আজ আমরা যখন ডাকৰ ‘হিন্দু এলো’, তখন কে আসবে ? অামাদের মধ্যে কত ছোটো ছোটো সম্প্রদায়, কত গওঁী, কত প্রাদেশিকতা— এ উৰ্ত্তীর্ণ হয়ে কে আসবে ? কত বিপদ গিয়েছে। কই একত্র তো হই নি । বাহির থেকে যখন প্রথম আঘাত নিয়ে এল মহম্মদ ঘোরী, তখন হিন্দুরা সে আসন্ন বিপদের দিনেতেও তো একত্র হয় নি। তার পর যখন মন্দিরের পর মন্দির ভাঙতে লাগল, দেবমূর্তি চুর্ণ হতে লাগল, তখন তারা লড়েছে, মরেছে, খণ্ড খণ্ড ভাবে যুদ্ধ করে মরেছে । তখনো একত্র হতে পারল না । খণ্ডিত ছিলেম বলেই মেরেছে, যুগে যুগে এই প্রমাণ আমরা দিয়েছি। কখনো কখনো ইতিহাস উদঘাটন করে অন্য প্রমাণ পাবার চেষ্টা করি বটে ; বলি, শিখরা তো এক সময় বাধা ঘুচিয়েছিল। শিখরা যে বাধা ঘুচিয়েছিল সে তো শিখধর্ম দ্বারাই। পাঞ্জাবের কোথাকার জাঠ, কোথাকার কোন জাতি সব, শিখধর্মের আহবানে একত্র হতে পেরেছিল ; বাধাও দিতে পেরেছিল, ধর্মকেও রক্ষা করতে এক হয়ে দাড়িয়েছিল। শিবাজি এক সময় ধর্মরাজ্যস্থাপনের ভিত গেড়েছিলেন । তার যে অসাধারণ শক্তি ছিল তদার তিনি মারাঠাদের একত্র করতে পেরেছিলেন । সেই সম্মিলিত শক্তি ভারতবর্ষকে উপক্রত করে তুলেছিল। অশ্বের সঙ্গে অশ্বারোহীর যখন সামঞ্জস্য হয় কিছুতেই সে অশ্ব থেকে পড়ে না ; শিবাজির হয়ে সে দিন যার লড়েছিল তাদের সঙ্গে শিবাজির তেমনি সামঞ্জস্ত হয়েছিল । পরে আর সে সামঞ্জস্ত রইল না, পেশোয়াদের মনে ও আচরণে ভেদবুদ্ধি, খণ্ড খও স্বার্থধুদ্ধি তীক্ষ হয়ে ক্ষণকালীন রাষ্ট্রবন্ধনকে টুকরো টুকরো করে দিলে। আমার কথা এই যে, আমাদের মধ্যে এই-যে পাপ পুবে রেখেছি এতে কি শুধু আমাদেরই অকল্যাণ ? সে পাপে কি আমরা প্রতিবেশীদের vరిషి 6 কালান্তর প্রতি অবিচার করি নে ? তাদের মধ্যে হিংসা জাগিয়ে তুলি নে ? যে ছবল সেই প্রবলকে প্রলুব্ধ করে পাপের পথে টেনে আনে। পাপের প্রধান আশ্রয় দুর্বলের মধ্যে। অতএব যদি মুসলমান মারে আর আমরা পড়ে পড়ে মার খাই, তবে জানৰ, এ সম্ভব করেছে শুধু আমাদের দুর্বলতা। আপনার জন্তেও, প্রতিবেশীর জন্তেও আমাদের নিজেদের দুর্বলতা দূর করতে হবে। আমরা প্রতিবেশীদের কাছে আপিল করতে পারি ‘তোমরা ক্রুর হোয়ে না, তোমরা ভালে হও, নরহত্যার উপরে কোনো ধর্মের ভিত্তি হতে পারে না”— কিন্তু সে আপিল যে দুর্বলের কান্না । বায়ুমণ্ডলে বাতাস লঘু হয়ে এলে ঝড় যেমন আপনিষ্ট আসে, ধর্মের দোহাই দিয়ে কেউ তাকে বাধা দিতে পারে না, তেমনি দুর্বলতা পুষে রেখে দিলে সেখানে অত্যাচার আপনিই আলে— কেউ বাধা দিতে পারে না । কিছু ক্ষণের জন্য হয়তো একটা উপলক্ষ্য নিয়ে পরস্পর কৃত্রিম বন্ধুতাবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি, কিন্তু চিরকালের জন্য তা হয় না। যে মাটিতে কণ্টকতরু ওঠে সে মাটিকে যত ক্ষণ শোধন না করা হয় তত ক্ষণ তো কোনো ফল হবে না। আপনার লোককেও যে পর করেছে, পরের সঙ্গেও যার আত্মীয়তা নেই, সে তো ঘাটে এসেছে, তার ঘর কোথায় ? আর তার শ্বাসই বা কত ক্ষণ ? আজ আমাদের অনুতাপের দিন— আজ অপরাধের ক্ষালন করতে হবে। সত্যিকার প্রায়শ্চিত্ত যদি করি তবেই শক্র আমাদের মিত্র হবে, রুদ্র আমাদের প্রতি প্রসন্ন হবেন । মাঘ ১৩৩৩