কালান্তর/হিন্দুমুসলমান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

হিন্দুমুসলমান ভারতবর্ষের সকল প্রদেশের, সকল সমাজের ঐক্যে প্রতিষ্ঠিত এক মহাজাতিকে জাগিয়ে তুলে তার একচ্ছত্ৰ আসন রচনা করব ব’লে দেশনেতারা পণ করেছেন। ঐ আসন জিনিসটা, অর্থাং যাকে বলে কনস্টট্যুগুন, ওটা বাইরের, রাষ্ট্রশাসনব্যবস্থায় আমাদের পরস্পরের অধিকারনির্ণয় দিয়ে সেটা গড়েপিটে তুলতে হবে। তার নানা রকমের নমুনা নানা দেশের ইতিহাসে দেখেছি, তারই থেকে যাচাই বাছাই করে প্ল্যান ঠিক করা চলছে। এই ধারণা ছিল, ওটাকে পাকা করে খাড়া করবার বাধা বাইরে অর্থাৎ বর্তমান কর্তৃপক্ষদের ইচ্ছার মধ্যে। তারই সঙ্গে রক্ষা করবার, তক্রার করবার কাজে কিছু কাল থেকে আমরা উঠে পড়ে লেগেছি। যখন মনে হল কাজ এগিয়েছে, হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে দেখি, মন্ত বাধা নিজেদের মধ্যেই । গাড়িটাকে তীর্থে পৌছে দেবার প্রস্তাৰে সারণি যদি বা অধিরাজি হল ওটাকে আস্তাবল থেকে ঠেলে বের করবার সময় স্থল হল, এক্কা গাড়িটার দুই চাকায় বিপরীত রকমের অমিল, চালাতে গেলেই উণ্টে পড়বার জো হয়। যে বিরুদ্ধ মামুঘটার সঙ্গে আমাদের বাইরের সম্বন্ধ, বিবাদ করে এক দিন তাকে হটিয়ে বাহির করে দেওয়া দুঃসাধ্য হলেও নিতান্ত অসাধ্য নয়, সেখানে আমাদের হারজিতের মামলা । কিন্তু ভিতরের লোকের বিবাদে কোনো এক পক্ষ জিতলেও মোটের উপর সেটা হার, আর হারলেও শান্তি নেই। কোনো পক্ষকে বাদ দেবারও জে নেই, আবার দাবিয়ে রাখতে গেলেও উৎপাতকে চিরকাল উত্তেজিত করে রাখাই ৩২৭ কালান্তর হবে। ভান পাশের দাত বা পাশের দাতকে নড়িয়ে দিয়ে যদি বড়াই করতে চায় তবে অবশেষে নিজে অনড় থাকবে না । এত দিন রাষ্ট্রসভায় বরসজ্জাটার পরেই একান্ত মন দিয়েছিলুম, আসনটা কেমন হবে এই কথা ভেবেই মুগ্ধ। ওটা মহামূল্য ও লোভনীয়। প্রতিবেশীর যারা কিংখাবের আসন বানিয়েছে তাদের আসরের ঘটা দেখে ঈৰ্ষা হয়। কিন্তু হায় রে, স্বয়ং বরকে বরণ করবার আস্তরিক আয়োজন বহুকাল থেকে ভুলেই আছি। আজ তাই পণ নিয়ে বরযাত্রীদের লড়াই বাধে। শুভকর্মে অশুভ গ্রহের শাস্তির কথাটায় প্রথম থেকেই মন দিই নি, কেবল আসনটার মালমসলার ফর্দ নিয়ে বেলা বইয়ে দিয়েছি । রাষ্টিক মহাসন-নির্মাণের চেয়ে রাষ্ট্রক মহাজাতি-স্বষ্টির প্রয়োজন আমাদের দেশে অনেক বড়ো, এ কথা বলা বাহুল্য। সমাজে ধর্মে ভাষায় আচারে আমাদের বিভাগের অস্ত নেই। এই বিদীর্ণতা আমাদের রাষ্ট্রক সম্পূর্ণতার বিরোধী ; কিন্তু তার চেয়ে অশুভের কারণ এই যে, এই বিচ্ছেদে আমাদের মনুষ্যত্বসাধনার ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। মামুষে মামুষে কাছাকাছি বাস করে তবু কিছুতে মনের মিল হয় না, কাজের যোগ থাকে না, প্রত্যেক পদে মারামারি কাটাকাটি বেধে যায়, এটা বর্বরতার লক্ষণ । অথচ আমরা যে আত্মশাসনের দাবি করছি সেটা তো বর্বরের প্রাপ্য নয়। যাদের ধর্মে সমাজে প্রথায়, যাদের চিত্তবৃত্তির মধ্যে এমন একটা মজ্জাগত জোড়-ভাঙানে ছুৰ্যোগ আছে যে তারা কথায় কথায় একখানাকে সাতখানা করে ফেলে, সেই ছত্ৰভঙ্গের দল ঐকরাট্রিক সত্তাকে উদ্ভাবিত করবে কোন যন্ত্রের সাহায্যে ? যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্ত কোনো বঁাশনে তাকে বাধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ স্মৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে ०२b* কালান্তর আজ সেই সেই দেশেই প্রজা যথার্থ স্বাধীনতা পেয়েছে যে দেশে ধর্মমোহ মানুষের চিত্তকে অভিভূত ক’রে এক-দেশ-বাসীর মধ্যে পরস্পরের প্রতি ঔদাসীন্য বা বিরোধকে নানা আকারে ব্যাপ্ত করে না রেখেছে । হিন্দুসমাজে আচার নিয়েছে ধর্মের নাম। এই কারণে আচারের পার্থক্যে পরস্পরের মধ্যে কঠিন বিচ্ছেদ ঘটায় । মৎস্তাশী বাঙালিকে নিরামিষ প্রদেশের প্রতিবেশী আপন ব'লে মনে করতে কঠিন বাধা পায় । সাধারণত বাঙালি অন্ত প্রদেশে গিয়ে অভ্যস্ত আচারের ব্যতিক্রম উপলক্ষ্যে অবজ্ঞা মনের মধ্যে পোষণ করে। যে চিত্তবৃত্তি বাহ আচারকে অত্যন্ত বড়ো মূল্য দিয়ে থাকে তার মমত্ববোধ সংকীর্ণ হতে বাধ্য। রাষ্ট্রসন্মিলনীতেও এই অভাব কথায় কথায় ধরা পড়ে এবং দেখা যায়, আমরা যে অলক্ষ্য ব্যবধান সঙ্গে করে নিয়ে বেড়াই তা সংস্কারগত, অতি স্বল্প এবং সেইজন্ত অতি দুর্লঙ্ঘ্য । আমরা যখন মুখে তাকে অস্বীকার করি তখনো নিজের অগোচরেও সেটা অস্তঃকরণের মধ্যে থেকে যায় । ধর্ম আমাদের মেলাতে পারে নি, বরঞ্চ হাজারখানা বেড়া গড়ে তুলে সেই বাধাগুলোকে ইতিহাসের অতীত শাশ্বত বলে পাকা করে দিয়েছে । ইংরেজ নিজের জগতকে ইংরেজ বলেষ্ট পরিচয় দেয়। যদি বলত খৃস্টান তা হলে যে ইংরেজ বৌদ্ধ বা মুসলমান বা নাস্তিক তাকে নিয়ে রাষ্ট্রগঠনে মাথা-ঠোকাঠুকি বেধে যেত। আমাদের প্রধান পরিচয় হিন্দু বা মুসলমান। এক দলকে বিশেষ পরিচয়কালে বলি বটে হিন্দুস্থানি, কিন্তু তাদের হিন্দুস্থান বাংলার বাইরে । কয়েক বছর পূর্বে আমার ইংরেজ বন্ধু এওজকে নিয়ে মালাবারে ভ্রমণ করছিলুম। ব্রাহ্মণপল্লীর সীমানায় পা বাড়াতেই টিয়া-সমাজ-ভূক্ত একজন শিক্ষিত ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করে দৌড় দিলেন । এণ্ডজ বিক্ষিত হয়ে তাকে গিয়ে ধরলেন, এবং প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাতে Newరిe হিন্দুমুসলমান জানলেন, এ পাড়ায় তাদের জগতের প্রবেশনিষেধ । বলা বাহুল্য, ছিন্দুসমাজবিধি-অনুসারে এগুজের আচারবিচার টিয়া-ভদ্রলোকের চেয়ে অনেক গুণে অশাস্ত্রীয় । শাসনকর্তার জাত বলে তার জোর আছে, কিন্তু হিন্দু বলে হিন্দুর কাছে আত্মীয়তার জোর নেই। তার সম্বন্ধে হিন্দুর দেবতা পর্যন্ত জাত বাচিয়ে চলেন, স্বয়ং জগন্নাথ পর্যস্ত প্রত্যক্ষদর্শনীয় নন। বৈমাত্র সস্তানও মাতার কোলের অংশ দাৰি করতে পারে— ভারতে বিশ্বমাতার কোলে এত ভাগ কেন ? অনাত্মীয়তাকে অস্থিমজ্জায় আমরা সংস্কারগত করে রেখেছি, অথচ রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে তাদের আত্মীয়তা ন পেলে আমরা বিক্ষিত হই । শোনা গিয়েছে, এবার পূর্ববঙ্গে কোথাও কোথাও হিন্দুর প্রতি উৎপাতে নমপূদ্রর নির্দয়ভাবে মুসলমানদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল । ভাবতে হবে না কি, ওদের দরদ হল না কেন, আত্মীয়তার দায়িত্বে বাধা পড়ল কোথায় ? এই অনাস্ট্রীয়তার অসংখ্য অস্তরাল বহু যুগ ধরে প্রকাশ্বে আমাদের রাষ্ট্রভাগ্যকে ব্যর্থ করেছে এবং আজও ভিতরে ভিতরে আমাদের ছুঃখ ঘটাচ্ছে । স্কোর গলায় যেখানে বলছি, আমরা এক, স্বল্প স্বরে সেখানে অন্তৰ্যামী আমাদের মর্মস্থানে বলে বলছেন, "ধর্মে-কর্মে আচারে-বিচারে এক হবার মতে ঔদার্য তোমাদের নেই।” এর ফল ফলছে ; আর রাগ করছি ফলের উপরে, বীজ বপনের উপরে নয় । যখন ৰঙ্গবিভাগের সাংঘাতিক প্রস্তাব নিয়ে বাঙালির চিত্ত বিক্ষুব্ধ তখন বাঙালি অগত্যা বয়কট-নীতি অবলম্বন করতে চেষ্টা করেছিল । বাংলার সেই ছুদিনের সুযোগে বোম্বাই-মিলওয়ালা নির্মমভাবে তাদের মুনফার অঙ্ক বাড়িয়ে তুলে আমাদের প্রাণপণ চেষ্টাকে প্রতিহত করতে কুষ্ঠিত হন নি। সেই সঙ্গে দেখা গেল, বাঙালি মুসলমান সে দিন আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে দাড়ালেন। সেই যুগেই বাংলাদেশে হিন্দুমুসলমানে লজ্জাজনক কুৎসিত কাণ্ডের স্বত্রপাত ছল। অপরাধটা צ9אס\ কালান্তর প্রধানত কোন পক্ষের এবং এই উপদ্রব অকস্মাৎ কোথা থেকে উৎসাহ পেলে, সে তর্কে প্রয়োজন নেই। আমাদের চিস্তা করবার বিষয়টা হচ্ছে এই যে, বাংলা দ্বিখণ্ডিত হলে বাঙালিজাতের মধ্যে যে পঙ্গুতার স্বষ্টি হত সেট। বাংলাদেশের সকল সম্প্রদায়ের এবং বস্তুত সমস্ত ভারতবর্ষেরই পক্ষে অকল্যাণকর, এটা যথার্থ দরদ দিয়ে বোঝবার মতো একাত্মকতা আমাদের নেই ব’লে সে দিন বাঙালি হিন্দুর বিরুদ্ধে অনাত্মীয় অসহষোগিতা সম্ভব হয়েছিল। রাষ্ট্রপ্রতিমার কাঠামো গড়বার সময় এ কথাট। মনে রাখা দরকার। নিজেকে ভোলানোর ছলে বিধাতাকে ভোলাতে পারব না । এই ব্যাপারে সে দিন অনেকেই রাগারগি করেছিলেন। কিন্তু ফুটে৷ কলসীতে জল তুলতে গেলে জল যে পড়ে যায়, তা নিয়ে জলের উপরে বা কলসীর উপরে চোখ রাঙিয়ে লাভ কী ? গরজ আমাদের যতই থাক্, ছিদ্রট স্বভাবত ছিদ্রের মতোই ব্যবহার করবে। কলঙ্ক আমাদেরই আর সে কলঙ্ক যথাসময়ে ধরা পড়বেই, দৈবের কৃপায় লজ্জানিবারণ হবে না । কথা হয়েছে, ভারতবর্ষে একরাষ্ট্রশাসন না হয়ে যুক্তরাষ্ট্রশাসননীতির প্রবর্তন হওয়া চাই। অর্থাৎ একেবারে জোড়ের চিহ্ন থাকবে না এতটা দূর মিলে যাবার মতো ঐক্য আমাদের দেশে নেই, এ কথাটা মেনে নিতে হয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রসমস্তার এ একটা কেজো রকমের নিম্পত্তি বলে ধরে নেওয়া যাক। কিন্তু তবু একটা কঠিন গ্রন্থি রয়ে গেল, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভেদ ও বিরোধ। এই বিচ্ছেদটা নানা কারণে আন্তরিক হয়ে দাড়িয়েছে। বাইরে থেকে রাষ্ট্রনৈতিক প্রলেপ দিয়ে এর ফাটল নিবারণ করা চলবে না ; কোনো কারণে একটু তাপ বেড়ে উঠলেই আবার ফাটল ধরবে । যেখানে নিজেদের মধ্যে সত্যকার ভেদ সেখানেই রাষ্ট্রক ক্ষমতার HIR হিন্দুমুসলমান হিন্তা নিয়ে স্বতন্ত্র কোঠায় স্বতন্ত্র হিসাব চলতে থাকে । সেখানে রাষ্ট্রক সম্পদে সকলেরই অখণ্ড স্বার্থের কথাটা স্বভাবতই মনে থাকে না । এমন দ্বগ্রহে একই গাড়িকে ছটে ঘোড়া ত্ব দিকে টানবার মুশকিল বাধায় । এখন থেকেই অধিকারের ভাগ-বখরা নিয়ে হটগোল জেগেছে । রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়বুদ্ধির যোগে গোল-টেবিল পেরিয়েও এই গোল উত্তরোত্তর বাড়বে বই কমবে এমন আশা আছে কি ? বিষয়বুদ্ধির আমলে সহোদর ভাইদের মধ্যেও বচলা বেধে যায়। শেষকালে গুণ্ডাদের হাতেই লাঠিসড়কির যোগে যমের দ্বারে চরম নিম্পত্তির ভার পড়ে । এক দল মুসলমান সম্মিলিত নির্বাচনের বিরুদ্ধে, তার স্বতন্ত্র নির্বাচনরীতি দাবি করেন এবং তাদের পক্ষের ওজন ভারি করবার জন্তে নানা বিশেষ সুযোগের বাটখারা বাড়িয়ে নিতে চান। যদি মুসলমানদের সবাই বা অধিকাংশ একমত হয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচনরীতির দাবি করেন, এবং নিজেদের পক্ষের ওজন বাড়িয়ে নিতে চান, তা হলে এমনতরো দাবি মেনে নিয়েও আপোষ করতে মহাত্মাজি রাজি আছেন বলে বোধ হল। তা যদি হয়, তার প্রস্তাব মাথা পেতে নেওয়াই ভালো । কেননা, ভারতবর্ষের তরফে রাষ্ট্রক যে অধিকার আমাদের জয় করে নিতে হবে তার স্ব স্পষ্ট মূতি এবং সাধনার প্রণালী সমগ্রভাবে তারই মনে আছে। এ পর্যস্ত একমাত্র তিনিই সমস্ত ব্যাপারটাকে অসামান্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রবল বাধার ৰিব্ৰুদ্ধে অগ্রসর করে এনেছেন । কাজউদ্ধারের দিকে দৃষ্টি রাখলে শেষ পর্যন্ত তারই হাতে সারখ্যভার দেওয়া সংগত। তবু, এক জনের বা এক দলের ব্যক্তিগত সহিষ্ণুতার প্রতি নির্ভর করে এ কথা ভুললে চলবে না যে, অধিকার-পরিবেষণে কোনো এক পক্ষের প্রতি যদি পক্ষপাত করা হয় তবে সাধারণ মানবপ্রকৃতিতে সেই অবিচার সইবে না, এই নিয়ে একটা অশান্তি নিয়তই মারমুখো হয়ে থেকে যাবে। বস্তুত এটা পরস্পরের বিবাদ মেটাবার পন্থা নয় । \లిలం কালান্তর সকলেই যদি একজোট হয়ে প্রসন্নমনে এককোকা আপোষ করতে রাজি হয় তা হলে ভাবনা নেই । কিন্তু মানুষের মন । তার কোনো-একটা তারে যদি অত্যস্ত বেশি টান পড়ে তবে সুর যায় বিগড়ে, তখন সংগীতের দোহাই পাড়লেও সংগত মাটি হয় । ঠিক জানি না, কী ভাবে মহাত্মাজি এ সম্বন্ধে চিস্তা করছেন । হয়তো গোল-টেবিল বৈঠকে আমাদের সম্মিলিত দাবির জোর অক্ষুণ্ণ রাখাই আপাতত সব চেয়ে গুরুতর প্রয়োজন বলে তার মনে হতে পারে। দুই পক্ষই আপন আপন জিদে সমান অটল হয়ে বসলে কাজ এগোবে না, এ কথা সত্য। এ ক্ষেত্রে এক পক্ষে ত্যাগ স্বীকার করে মিটমাট হয়ে গেলে উপস্থিত রক্ষা হয়। একেই বলে ডিপ্লোম্যালি। পলিটিকৃলে প্রথম থেকেই ষোলো-আনা প্রাপ্যের উপর চেপে বসলে ষোলে। আনাই খোয়াতে হয়। যার অদূরদর্শী কৃপণের মতো অত্যন্ত বেশি টানাটানি না করে আপোষ করতে জানে তারাই জেতে। ইংরেজের এই গুণ আছে, নৌকোডুবি বাচাতে গিয়ে অনেকটা মাল ইংরেজ জলে ফেলে দিতে পারে । আমার নিজের বিশ্বাস, বর্তমান আপোষের প্রস্তাবে ইংরেজের কাছে আমরা যে প্রকাও ক্ষতিস্বীকার দাবি করছি সেটা যুরোপের আর-কোনে) জাতির কাছে একেবারেই খাটত না, তারা আগাগোড়াই ঘুষি উচিয়ে কথাটা সম্পূর্ণ চাপা দেবার চেষ্টা করত। রাষ্ট্রনৈতিক ব্যাপারে ইংরেজের সুবুদ্ধি বিখ্যাত ; ইংরেজ সবখালির দিকে তাকিয়ে অনেকখানি সহ করতে পারে। এই বুদ্ধির প্রয়োজন যে আমাদের নেই, এ কথা গোয়ারের কথা ; আখেরে গোয়ারের হার হয়ে থাকে। রাষ্ট্রক অধিকার সম্বন্ধে একগুঁয়েভাবে দর-কষাকষি নিয়ে হিন্দু-মুসলমানে মন-কষাকষিকে অত্যন্ত বেশি দূর এগোতে দেওয়া শত্রু পক্ষের আনন্দবর্ধনের প্রধান উপায় । আমার বক্তব্য এই যে, উপস্থিত কাজ-উদ্ধারের খাতিরে আপাতত లిలిg হিন্দুমুসলমান নিজের দাবি থাটো করেও একটা মিটমাট করা সম্ভব হয় তো হোক, কিন্তু তবু আসল কথাটাই বাকি রইল। পলিটিকসের ক্ষেত্রে बारेत् থেকে যেটুকু তালি-দেওয়া মিল হতে পারে সে মিলে আমাদের চির কালের প্রয়োজন টিকবে না। এমন কি পলিটিকলেও এ তালিটুকু বরাবর অটুট থাকবে এমন আশা নেই, ঐ ফকির জোড়টার কাছে বারে বারেই টান পড়বে। যেখানে গোড়ায় বিচ্ছেদ সেখানে অfগায় জল ঢেলে গাছকে চিরদিন তাজা রাখা অসম্ভব । আমাদের মিলতে হবে সেই গোড়ায়, নইলে কিছুতে কল্যাণ নেই। এত দিন সেই গোড়ার দিকে এক রকমের মিল ছিল। পরস্পরের তফাত মেনেও আমরা পরস্পর কাছাকাছি ছিলুম। সম্প্রদায়ের গণ্ডীর উপর ঠোকরখেয়ে পড়তে হত না,সেটা পেরিয়েও মামুষে মামুষে মিলের যথেষ্ট জায়গা ছিল। হঠাৎ এক সময়ে দেখা গেল, দুই পক্ষই আপন ধর্মের অভিমানকে উচিয়ে তুলতে লেগেছে। যত দিন আমাদের মধ্যে ধর্মবোধ সহজ ছিল তত দিন গোড়ামি থাকা সত্ত্বেও কোনো হাঙ্গাম বাৰে নি। কিন্তু এক সময়ে যে কারণেই হোক ধর্মের অভিমান যখন উগ্র হয়ে উঠল তখন থেকে সম্প্রদায়ের কাটার বেড়া পরম্পরকে ঠেকাতে ও খোচাতে শুরু করলে । আমরাও মসজিদের সামনে দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাবার সময় কিছু অতিরিক্ত জিদের সঙ্গে ঢাকে কাঠি দিলুম, অপর পক্ষেও কোরবানির উৎসাহ পূর্বের চেয়ে কোমর বেঁধে বাড়িয়ে তুললে, সেটা আপন আপন ধর্মের দাৰি মেটাবার খাতির নিয়ে নয়, পরস্পরের ধর্মের অভিমানকে আঘাত দেবার স্পর্ধ নিয়ে । এই-সমস্ত উৎপাতের শুরু হয়েছে শহরে, যেখানে মামুষে মামুষে প্রকৃত মেলামেশা নেই বলেই পরস্পরের প্রতি দরদ থাকে না । ধর্মমত ও সমাজরীতির সম্বন্ধে হিন্দু-মুসলমানে শুধু প্রভেদ নয়, বিরুদ্ধতা আছে, এ কথা মানতেই হবে । অতএব আমাদের সাধনার も○● কালান্তর বিষয় হচ্ছে, তৎসত্ত্বেও ভালো রকম করে মেলা চাই। এই সাধনায় সিদ্ধিলাভ আমাদের না হলে নয়। কিন্তু এর একাস্ত আবশুকতার কথা আমাদের সমস্ত হৃদয়মন দিয়ে আজও ভাবতে আরম্ভ করি নি। একদা খিলাফতের সমর্থন করে মহাত্মাজি মিলনের সেতু নির্মাণ করতে পারবেন মনে করেছিলেন। কিন্তু “এহ বাহ’ । এটা গোড়াকার কথা নয়, এই খেলাফত সম্বন্ধে মতভেদ থাকা অন্তায় মনে করি নে, এমন কি, মুসলমানদের মধ্যেই যে থাকতে পারে তার প্রমাণ হয়েছে। নানা উপলক্ষ্যে এবং বিনা উপলক্ষ্যে সর্বদ আমাদের পরস্পরের সঙ্গ ও সাক্ষাৎ-আলাপ চাই । যদি আমরা পাশাপাশি চলি, কাছাকাছি আসি, তা হলেই দেখতে পাব, মানুষ ব’লেই মানুষকে আপন ব’লে মনে করা সহজ । যাদের সঙ্গে মেলামেশা নেই তাদের সম্বন্ধেই মত প্রভৃতির অনৈক্য অত্যন্ত কড়া হয়ে ওঠে, বড়ো হয়ে দেখা দেয় । যখনই পরস্পর কাছাকাছি আনাগোনার চর্চা হতে থাকে তখনই মত পিছিয়ে পড়ে, মানুষ সামনে এগিয়ে আসে । শাস্তিনিকেতনে মাঝে মাঝে মুসলমান ছাত্র ও শিক্ষক এসেছেন, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো প্রভেদ অনুভব করি নি, এবং সখ্য ও স্নেহসম্বন্ধ -স্থাপলে লেশমাত্র বাধা ঘটে নি। যে-সকল গ্রামের সঙ্গে শাস্তিনিকেতনের সম্বন্ধ তার মধ্যে মুসলমান গ্রাম আছে। যখন কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা দূতসহযোগে কলকাতার বাইরে ছড়িয়ে চলেছে, তখন বোলপুর-অঞ্চলে মিথ্যা জনরব রাষ্ট্র করা হয়েছিল যে, হিন্দুর মসজিদ ভেঙে দেবার সংকল্প করছে। এই সঙ্গে কলকাতা থেকে গুণ্ডার আমদানিও হয়েছিল । কিন্তু, স্থানীয় মুসলমানদের শাস্ত রাখতে আমাদের কোনো কষ্ট পেতে হয় নি, কেননা তারা নিশ্চিত জানত আমরা তাদের আকৃত্রিম বন্ধু। আমার অধিকাংশ প্রজাই মুসলমান । কোরবানি নিয়ে দেশে যখন একটা উত্তেজনা প্রবল তখন হিন্দু প্রজারা আমাদের এলাকায় সেটা ○○● হিন্দুমুসলমান সম্পূর্ণ রহিত করবার জন্ত আমার কাছে নালিশ করেছিল। সে নালিশ আমি সংগত বলে মনে করি নি, কিন্তু মুসলমান প্রজাদের ডেকে যখন বলে দিলুম কাজটা যেন এমনভাবে সম্পন্ন করা হয় যাতে হিন্দুদের মনে অকারণে আঘাত না লাগে, তারা তখনি তা মেনে নিলে । আমাদের সেখানে এ পর্যন্ত কোনো উপদ্রব ঘটে নি। আমার বিশ্বাস তার প্রধান কারণ, আমার লঙ্গে আমার মুসলমান প্রজার সম্বন্ধ সহজ ও বাধাহীন । এ কথা আশা করাই চলে না যে, আমাদের দেশের ভিন্ন ভিন্ন সমাজের মধ্যে ধর্মকর্মের মতবিশ্বাসের ভেদ একেবারেই ঘুচতে পারে। তবুও মমুঝত্বের খাতিরে আশা করতেই হবে, আমাদের মধ্যে মিল হবে। পরস্পরকে দূরে না রাখলেই সে মিল আপনিই সহজ হতে পারবে। সঙ্গের দিক থেকে আজকাল হিন্দু মুসলমান পৃথক হয়ে গিয়ে সাম্প্রদায়িক অনৈক্যকে বাড়িয়ে তুলেছে, মনুষ্যত্বের মিলটাকে দিয়েছে চাপা । আমি হিন্দুর তরফ থেকেই বলছি, মুসলমানের ত্রুটিবিচারটা থাকৃ— আমরা মুসলমানকে কাছে টানতে যদি না পেরে থাকি তবে সেজন্তে যেন লজ্জা স্বীকার করি । অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে ব’লে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্তে ; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজার । এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মৰোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসন্মান নিয়ে কটুভাষা-ব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ । এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেক দূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে। অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাৰা বিস্তর। এই আস্তৱিক ৰিচ্ছেদ २२ \ף סאס কালাস্তুর যত দিন থাকবে তত দিন স্বার্থের ভেদ ঘুঢ়বে না এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক পক্ষের কল্যাণভার অপর পক্ষের হাতে দিতে সংকোচ অনিবাৰ্থ হয়ে উঠবে। আজ সম্মিলিত নির্বাচন নিয়ে যে দ্বন্দ্ব বেধে গেছে তার মূল তো এইখানেই । এই দ্বন্দ্ব নিয়ে যখন আমরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠি তখন এর স্বাভাবিক কারণটার কথা ভেবে দেখি না কেন ? ইতিমধ্যে বাংলাদেশে অকথ্য বর্বরতা বারে বারে আমাদের সহ করতে হয়েছে। জার-শাসনের আমলে এই রকম অত্যাচার রাশিয়ায় প্রায় ঘটত। বর্তমান বিপ্লবপ্রবণ পোলিটিক্যাল যুগের পূর্বে আমাদের দেশে এ রকম দানবিক কাণ্ড কখনো শোনা যায় নি। বৃটিশশাসিত ভারতে বহু গৌরবের law and order পদার্থটা বড়ো বড়ো শহরে পুলিসপাহারার জাগ্রত দৃষ্টির সামনে স্পর্ধাসহকারে উপরি উপরি অবমানিত হতে লাগল, ঠিক এই বিশেষ সময়টাতেই। মারের দুঃখ কেবল আমাদের পিঠের উপর দিয়েই গেল না, ওটা প্রবেশ করেছে বুকের ভিতরে । এটা এমন সময়ে ঘটল ঠিক যখন হিন্দু-মুসলমানে কণ্ঠ মিলিয়ে দাড়াতে পারলে আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হত, বিশ্বসভার কাছে আমাদের মাথা হেঁট হত না । এই রকমের অমামুষিক ঘটনায় লোকস্থতিকে চিরদিনের মতো বিষাক্ত করে তোলে, দেশের ডান হাতে বঁ। হাতে মিল করিয়ে ইতিহাস গড়ে তোলা দুঃসাধ্য হয় । কিন্তু, তাই বলেই তো হাল ছেড়ে দেওয়া চলে না ; গ্রস্থি জটিল হয়ে পাকিয়ে উঠেছে বলে ক্রোধের বেগে সেটাকে টানাটানি করে আরো আঁট করে তোলা মূঢ়ত । বর্তমানের কাজে ভবিষ্যতের বীজটাকে পর্যন্ত অফলা করে ফেলা স্বাঞ্জাতিক আত্মহত্যার প্রণালী। নানা আশু ও মুদুর কারণে, অনেক দিনের পুঞ্জিত অপরাধে, হিন্দু-মুসলমানের মিলনসমস্ত কঠিন হয়েছে ; সেইজন্তেই অবিলম্বে এবং দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে তার সমাধানে প্রবৃত্ত হতে হবে । অপ্রসন্ন ভাগ্যের উপর রাগ করে তাকে দ্বিগুণ হস্তে করে তোলা চোরের উপর রাগ করে vరి\రిy হিন্দুমুসলমান মাটিতে ভাত খাওয়ার মতো । বর্তমান রাষ্ট্রক উদযোগে বোম্বাই প্রদেশে আন্দোলনের কাজটা সব চেয়ে সবেগে চলতে পেরেছিল তার অন্ততম কারণ, সেখানে হিন্দুমুসলমানের বিরোধ বধিয়ে দেবার উপকরণ যথেষ্ট ছিল না। পালিতে হিন্দুতে ছুই পক্ষ খাড়া করে তোলা সহজ হয় নি। কারণ, পার্সি সমাজ সাধারণত শিক্ষিত সমাজ, স্বদেশের কল্যাণ সম্বন্ধে পার্সির বুদ্ধিপূর্বক চিস্তা করতে জানে, তা ছাড়া তাদের মধ্যে ধর্মোন্মত্ততা নেই। বাংলাদেশে আমরা আছি জতুগৃহে, আগুন লাগাতে বেশি ক্ষণ লাগে না। বাংলাদেশে পরের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে যখনই নামি ঠিক সেই সময়টাতেই নিজের ঘর সামলানো অসাধ্য হয়ে ওঠে। এই দুর্যোগের কারণটা আমাদের এখানে গভীর করে শিকড় গেড়েছে, এ কথাটা মেনে নিতেই হবে। এ অবস্থায় শান্তমনে বুদ্ধিপূর্বক পরস্পরের মধ্যে সন্ধি-স্থাপনের উপায়-উদভাবনে যদি আমরা অক্ষম হই, বাঙালিপ্রকৃতি-সুলভ হৃদয়াবেগের বেীকে যদি কেবলই জেদ জাগিয়ে স্পর্ধা পাকিয়ে তুলি, তা হলে আমাদের ছঃখের অস্ত থাকবে না এবং স্বাজাতিক কল্যাণের পথ একাস্ত দুর্গম হয়ে উঠবে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ চোখ বুজে বলেন, সবই সহজ হয়ে যাবে যখন দেশটাকে নিজের হাতে পাব। অর্থাৎ, নিজের বোঝাকে অবস্থাপরিবর্তনের কাধে চাপাতে পারব এই ভরসায় নিশ্চেষ্ট থাকবার এই ছুতো । কথাটা একটু বিচার করে দেখা যাক । ধরে নেওয়া গেল গেtল-বৈঠকের পরে দেশের শাসনভার আমরাই পাব । কিন্তু, দেশটাকে হাত-ফেরাফেরি করবার মাঝখানে একটা সুদীর্ঘ সন্ধিক্ষণ আছে। সিভিল-সাভিসের মেয়াদ কিছুকাল টিকে থাকতে বাধ্য। কিন্তু, সেইদিনকার সিভিল সাভিস হবে ঘা-খাওয়া নেকড়ে বাঘের মতো । মন তার গরম হয়ে থাকবার কথা। সেই \రి 9) কালান্তর সময়টুকুর মধ্যে দেশের লোক এবং বিদেশের লোকের কাছে কথাটা দেগে দেগে দেওয়া তার পক্ষে দরকার হবে যে, ব্রিটিশরাজের পাহারা আলগা হবা মাত্রই অরাজকতার কালসাপ নানা গর্ত থেকে বেরিয়ে চারি দিকেই ফণা তুলে আছে, তাই আমরা স্বদেশের দায়িত্বভার নিতে সম্পূর্ণ অক্ষম। আমাদের আপন লোকদেরকে দিয়েও এ কথা কবুল করিয়ে নেবার ইচ্ছা তার স্বভাবতই হবে যে, আগেকার আমলে অবস্থা ছিল ভালো। সেই যুগাস্তরের সময়ে যে যে গুছায় আমাদের আত্মীয়বিদ্বেষের মারগুলো লুকিয়ে আছে সেই সেইখানে খুব করেই খোচা খাবে। সেইটি আমাদের বিষম পরীক্ষার সময় । সে পরীক্ষা সমস্ত পৃথিবীর কাছে। এখন থেকে সর্ব প্রকারে প্রস্তুত থাকতে হবে যেন বিশ্বজগতের দৃষ্টির সামনে মূঢ়তায় বর্বরতায় আমাদের নূতন ইতিহাসের মুখে কালি না পড়ে। শ্রাবণ ১৩৩৮ ·වෑ) •