কালান্তর/হিন্দুমুসলমান (চিঠি)

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

হিন্দুমুসলমান শ্ৰীযুক্ত কালিদাস নাগকে লিখিত শাস্তিনিকেতন কল্যাণীয়েৰু ঘোর বাদল নেমেছে। তাই আমার মনটা মানব-ইতিহাসের শতাব্দীচিহ্নিত বেড়ার ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে। আকাশরঙ্গভূমিতে জলবাতাসের মাতনের যুগযুগান্তরবাহিত স্মৃতিস্পন্দন আজ আমার শিরায় শিরায় মেঘমল্লারের মীড় লাগিয়েছে । আমার কর্তব্যবুদ্ধি কোথায় ভেসে গেল, সম্প্রতি আমি আমার সামনেকার ঐ সারবনী শালতাল-মহুয়াছাতিমের দলে ভিড়ে গেছি। প্রাণরাজ্যে ওদের হল বনেদি বংশ, ওরা কোন আদিকালের রৌদ্রবৃষ্টির উত্তরাধিকার পুরোপুরি ভোগ করে চলেছে। ওরা মানুষের মতো আধুনিক নয়, সেইজন্তে ওরা চিরনবীন। মানবজাতির মধ্যে কেবল কবিরাই সভ্যতার অপব্যয়ের চোটে তাদের আদিকালের উত্তরাধিকার একেবারে ফুকে দিয়ে বসে নি। তাই তরুলতার আভিজাত্য কবিদের নিতাস্ত মানুষ ব’লে অবজ্ঞা করে না । এইজন্যেই বর্ষে বর্ষে বর্ষার সময় আমাকে এমন করে উতলা করে দেয়, আমাকে সকল দায়িত্ববন্ধন থেকে বিবাগি ক’রে প্রাণের খেলাঘরে ডাকতে থাকে— আমাদের মর্মের মধ্যে যে ছেলেমাকুব আছে, যে হচ্ছে আমাদের সব চেয়ে প্রাচীন পূর্বজ, সেই আমার কর্মশালাটি দখল করে বলে। সেইজন্তেই বর্ষা প’ড়ে অবধি আমি হাওয়ার সঙ্গে, বৃষ্টির সঙ্গে, গাছপালার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে বলে গেছি ; কাজকর্ম ছেড়ে গাল তৈরি করছি— সেই স্বত্রে মামুষের মধ্যে আমি সব চেয়ে কম মানুষ হয়েছি— আমার মন ঘাসের মতো কাপছে, পাতার মতে ঝিলমিল OY 8 হিন্দুমুসলমান করছে। কালিদাস এই উপলক্ষ্যেই বলেছিলেন : মেঘালোকে তৰতি মুখিনোইপ্যন্তৰাবৃত্তিচেতঃ । অগুথাবৃত্তি হচ্ছে মানববৃত্তির গণ্ডির বাইরের বৃত্তি। এই বৃত্তি আমাদের সেই সুদূর কালে নিয়ে যায় যখন প্রাণের খেলা চলছে, মনের মাস্টারি শুরু হয় নি— আজ যেখানে ইস্কুলের মোট খাম উঠেছে সেখানে যখন ঘাসের ফুলে ফুলে প্রজাপতি উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে । যাই হোক, এই সময়টাতে ঘন মেঘে মধ্যাহ্ন ছায়াবৃত, মাঠে মাঠে বাদল-হাওয়া ভে পু বাজিয়ে চলেছে, আর ছোটো ছোটো চঞ্চল জলধারা ইস্কুলছাড়া ছাত্রীদের আকারণ হাসির মতো চার দিকে খিল্‌খিল্‌ করছে । আজ ৭ই আষাঢ়, কৃষ্ণ একাদশী তিথি, আজ অম্বুবাচী আরম্ভ হল। নামটা সার্থক হয়েছে, সমস্ত প্রকৃতি আজ জলের ভাষায় মুখর হয়ে উঠল। ঘন মেঘের চজাতপের ছায়ায় আজ অম্বুবাচীর গীতিকবিতার আসর বসেছে ; তৃণসভার গায়েনের দল ঝিল্লিরাও নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে, আর তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে মত্তদাছুরি । এ আসরে আমার আসন পড়ে নি যে তা মনেও কোরো না । মেঘের ডাকের জবাব না দিয়ে চুপ ক’রে যাব, আমি এমন পাত্র নই। মেঘের পর মেঘের মতো আমারও গান চলেছে দিনের পর দিন ; তার কোনো গুরুত্ব নেই, কোনো উদ্দেশু নেই ; মেঘ যেমন ‘ধূমজ্যোতিঃসলিলমরুতাং সন্নিপাত:’, সেও তেমনি নিরর্থক উপাদানে তৈরি। ঠিক যখন আমার জানলার ধারে বসে গুঞ্জনধ্বনিতে গান ধরেছি— অাজ নবীন মেঘের সুর লেগেছে আমার মনে, আমার ভাবনা যত উতল হল আকারণে— ঠিক এমন সময় সমুত্রপার হতে তোমার প্রশ্ন এল, ভারতবর্ষে ছিন্দুমুসলমান-সমস্তার সমাধান কী। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, মানবসংসারে ●>総 কালান্তর আমার কাজ আছে— শুধু মেঘমল্লারে মেঘের ডাকের জবাব দিয়ে চলবে না, মানব-ইতিহাসের যে-সমস্ত মেঘমশ্র প্রশ্নাবলী আছে তারও উত্তর ভাবতে হবে। তাই অম্বুবাচীর আসর পরিত্যাগ করে বেরিয়ে আসতে হল । পৃথিবীতে ছুটি ধর্মসম্প্রদায় আছে অন্ত সমস্ত ধর্মমতের সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধতা অত্যুগ্র— সে হচ্ছে খৃস্টান আর মুসলমান ধর্ম। তারা নিজের ধর্মকে পালন করেই সন্তুষ্ট নয়, অন্য ধর্মকে সংহার করতে উদ্যত । এইজন্তে তাদের ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সঙ্গে মেলবার অন্ত কোনো উপায় নেই । খৃস্টানধর্মাবলম্বীদের সম্বন্ধে একটি সুবিধার কথা এই যে, তারা আধুনিক যুগের বাহন ; তাদের মন মধ্যযুগের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ নয়। ধর্মমত একান্তভাবে তাদের সমস্ত জীবনকে পরিবেষ্টিত ক'রে নেই। এইজন্তে অপরধর্মাবলম্বীদেরকে তারা ধর্মের বেড়ার দ্বারা সম্পূর্ণ বাধা দেয় না। যুরোপীয় আর খৃস্টান এই দুটো শব্দ একার্থক নয়। যুরোপীয় বৌদ্ধ’ বা ‘যুরোপীয় মুসলমান’ শব্দের মধ্যে স্বতোবিরুদ্ধতা নেই। কিন্তু ধর্মের নামে যে জাতির নামকরণ ধর্মমতেই তাদের মুখ্য পরিচয় । ‘মুসলমান বৌদ্ধ বা ‘মুসলমান খৃস্টান’ শব্দ স্বতই অসম্ভব । অপর পক্ষে হিন্দুজাতিও এক হিসাবে মুসলমানদেরই মতো। অর্থাৎ, তারা ধর্মের প্রাকারে সম্পূর্ণ পরিবেষ্টিত। বাহ প্রভেদটা হচ্ছে এই যে, অন্ত ধর্মের বিরুদ্ধতা তাদের পক্ষে সকর্মক নয়— অহিন্দু সমস্ত ধর্মের সঙ্গে তাদের non-violent non-co operation i fewn gá neretts warstvě s আচারমূলক হওয়াতে তার বেড়া আরো কঠিন । মুসলমানধর্ম স্বীকার ক’রে মুসলমানের সঙ্গে সমানভাবে মেলা যায়, হিন্দুর সে পথও অতিশয় ংকীর্ণ। আহারে ব্যবহারে মুসলমান অপর সম্প্রদায়কে নিষেধের দ্বারা প্রত্যাখ্যান করে না, হিন্দু সেখানেও সতর্ক। তাই খিলাফত উপলক্ষ্যে মুসলমান নিজের মসজিদে এবং অন্তর হিন্দুকে যত কাছে টেনেছে হিন্দু \లి $9 হিন্দুমুসলমান • মুসলমানকে তত কাছে টানতে পারে নি। আচার হচ্ছে মাছুষের সঙ্গে মামুষের সম্বন্ধের সেতু, সেইখানেই পদে পদে হিন্দু নিজের বেড়া তুলে রেখেছে। আমি যখন প্রথম আমার জমিদারি-কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলুম তখন দেখেছিলুম, কাছারিতে মুসলমান প্রজাকে বলতে দিতে হলে জাজিমের এক প্রাস্ত তুলে দিয়ে সেইখানে তাকে স্থান দেওয়া হত। অন্তআচার-অবলম্বীদের অশুচি ব'লে গণ্য করার মতো মামুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের এমন ভীষণ বাধা আর কিছু নেই। ভারতবর্ষের এমনি কপাল যে, এখানে হিন্দু-মুসলমানের মতো জুই জাত একত্র হয়েছে— ধর্মমতে হিন্দুর বাধা প্রবল নয়, আচারে প্রবল ; আচারে মুসলমানের বাধা প্রবল নয়, ধর্মমতে প্রবল। এক পক্ষের যে দিকে দ্বার খোলা, অন্ত পক্ষের সে দিকে দ্বার রুদ্ধ। এরা কী করে মিলবে ? এক সময়ে ভারতবর্ষে গ্রীক পারসিক শক নানা জাতির অবাধ সমাগম ও সন্মিলন ছিল। কিন্তু মনে রেখো, সে হিন্দু যুগের পূর্ববর্তী কালে। হিন্দুযুগ হচ্ছে একটা প্রতিক্রিয়ার যুগ – এই যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মকে সচেষ্টভাবে পাকা ক'রে গাথা হয়েছিল। ছলন্তব্য আচারের প্রাকার তুলে এ'কে ছুষ্প্রবেশু ক’রে তোলা হয়েছিল। একটা কথা মনে ছিল না, কোনো প্রাণবান জিনিসকে একেবারে আটঘাট বন্ধ ক’রে সামলাতে গেলে তাকে মেরে ফেলা হয়। যাই হোক, মোট কথা হচ্ছে, বিশেষ এক সময়ে বৌদ্ধযুগের পরে রাজপুত প্রভৃতি বিদেশীয় জাতিকে দলে টেনে বিশেষ অধ্যবসায়ে নিজেদেরকে পরকীয় সংস্রব ও প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ রক্ষা করবার জন্তেই আধুনিক হিন্দুধর্মকে ভারতবাসী প্রকাও একটা বেড়ার মতো করেই গড়ে তুলেছিল। এর প্রকৃতিই হচ্ছে নিষেধ এবং প্রত্যাখ্যান। সকল প্রকার মিলনের পক্ষে এমন স্থনিপুণ কৌশলে রচিত বাধা জগতে আর কোথাও স্বষ্টি হয় নি। এই বাধা কেবল হিন্দুমুসলমানে তা নয়। তোমার আমার মতো মামুব যারা আচারে ৩১৭ कॉब्लांस्छद्भ স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাই, আমরাও পৃথক, বাধাগ্রস্ত। সমস্ত তো এই, কিন্তু সমাধান কোথায় ? মনের পরিবর্তনে, যুগের পরিবর্তনে । যুরোপ সত্যসাধনা ও জ্ঞানের ব্যাপ্তির ভিতর দিয়ে যেমন ক’রে মধ্যযুগের ভিতর দিয়ে আধুনিক যুগে এসে পৌচেছে, হিন্দুকে মুসলমানকেও তেমনি গণ্ডির বাইরে যাত্রা করতে হবে। ধর্মকে কবরের মতো তৈরি করে তারই মধ্যে সমগ্র জাতিকে ভূতকালের মধ্যে সর্বতোভাবে নিহিত করে রাখলে উন্নতির পথে চলবার উপায় নেই, কারও সঙ্গে কারও মেলবার উপায় নেই। আমাদের মানসপ্রকৃতির মধ্যে যে অবরোধ রয়েছে তাকে ঘোচাতে না পারলে আমরা কোনো রকমের স্বাধীনতাই পাব না । শিক্ষার দ্বারা, সাধনার দ্বারা সেই মূলের পরিবর্তন ঘটাতে হবে— ডানার চেয়ে খাচা বড়ো এই সংস্কারটাকেই বদলে ফেলতে হবে— তার পরে আমাদের কল্যাণ হতে পারবে। হিন্দু-মুসলমানের মিলন যুগপরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এ কথা শুনে ভয় পাবার কারণ নেই, কারণ অন্ত দেশে মামুষ সাধনার দ্বারা যুগপরিবর্তন ঘটিয়েছে, গুটির যুগ থেকে ডানা মেলার যুগে বেরিয়ে এসেছে । আমরাও মানসিক অবরোধ কেটে বেরিয়ে আসব ; যদি না আসি তবে, নান্তঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায় । ইতি ৭ই আষাঢ় ১৩২৯ । শ্রাবণ ১৩২৯ \う〉bア