বিষয়বস্তুতে চলুন

কালিদাস ও ভবভূতি (রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ)/উপসংহার, তুলনা

​ উপসংহার, তুলনা।— এতক্ষণে আমি আমার অদ্যকার প্রবন্ধের উপসংহার করিতেছি। কালিদাস ও ভবভূতি—উভয়কে এখন এক করিয়া দুই একটা কথা বলিলেই, আজকার মতন, সম্পাদক মহাশয়ের হুকুম তামিল করা হয়।

 প্রিয় বন্ধুগণ, কালিদাস ও ভবভূতি সম্বন্ধে, যে কয়েকটী কথায়, আমাকে মোহিত করিয়াছে, ​আমার এই সমস্ত প্রবন্ধটী যে ক’টা কথার ভাষ্য বা ব্যাখ্যা স্বরূপ—মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের গভীর-চিন্তা-পূর্ণ সেই কথা কয়েকটীর মর্ম্ম আমি আপনাদিগকে এখন সক্ষেপে শুনাইব—

 কালিদাস ও ভবভূতি সংস্কৃত কাব্যে সুপরিচিত। সংস্কৃত ভাষার চিরপ্রকাশ ভাস্কর। ইঁহারা দুই জনেই সুকবি, সুপণ্ডিত, সুরসিক। দু’জনেই ভাবুক-কুলচূড়ামণি। বাণীর বরপুত্ত্র। কবিতা রাজ্যের রাজরাজেশ্বর। ভগবান তাঁহাদিগকে প্রতিভা দিয়াছিলেন, এবং লোকে তাঁহাদের কবিতায় মুগ্ধ হইয়া বাহবা দিয়াছিল, বরাবর দিয়াছে এবং এখনও দিতেছে। যতদিন চন্দ্রসূর্য্য থাকিবে, তত দিন দিবেও।

 এই দুইজনের কেহই সকল লোক বিমোহিত করিবার জন্য কাব্য লিখেন নাই। কেবল শিক্ষিত সামাজিকদিগের জন্য, কবিতারসামোদীদিগের জন্য লিখিয়াছিলেন। তাঁহাদের আবির্ভাবের পূর্ব্বে সকল লোকমোহনের জন্য রামায়ণ মহাভারত ও পুরাণসমূহ রচিত পঠিত কীর্ত্তিত ও গীত হইয়া​ছিল। কিন্তু সামাজিক লোকের তাহাতে ষোল আনা মন উঠিত না। কেন না সে সকল বড় লম্বা। অনেক জায়গায় মাত্রা কিছু বেশী। কোথাও কল্পনার দৌড় খুব বেশী—খুব জাঁকালো কিন্তু তা’র পরক্ষণেই ‘লেঙচায়’—কল্পনায় টান ধরে। কোথাও বেশ ভাল কথা কিন্তু তা’র পরই আর এক রকম। কোথাও খুটাইয়া খুটাইয়া একটা জিনিষের বর্ণনায় ‘দিক’ করিয়া তুলিয়াছে। আবার কোথাও হয়ত, যে সকল কথা বলা নিতান্ত আবশ্যক, তাহা বলাই হইল না। বাস্তবিক ঐ সকল পুরাতন কাব্যে কবিত্ব আছে, রচনা আছে, উপদেশ আছে, আনন্দ আছে, সৌন্দর্য্য আছে—অথবা এক কথায় বলিতে গেলে সব আছে—কিন্তু নাই কেবল একটী জিনিষ,—ছাঁটা নাই। শিল্প আছে, কিন্তু সর্ব্বত্র সে শিল্পোচিত চমৎকারিত্ব নাই। আশানুরূপ ‘কারিগরি’ নাই। পরিমাণের জ্ঞান যেন একটু কম। তাই তখনকার শিক্ষিত লোকে—সামাজিক সমজ্‌দার লোকে, ঐ সমুদয় কাব্য অপেক্ষা ভাল জিনিষ চাহিতেন। উহাতে তাঁহাদের মন উঠিত না। ​আশা পূরিত না। ঋষি রচনার পরে—এইরূপে ক্রমে অন্যরকম রচনার প্রয়োজনীয়তা সমাজে অনুভূত হইতে লাগিল। সে রচনায় ঋষি রচনার সবগুণ থাকিবে। তার উপর, বেশ ছাটাছোটা ‘কারিগরী’ থাকিবে। ছোট হইবে। অল্পে পড়া যাইবে। অল্পে শুনা যাইবে। আর সকলের উপর চাই যে, একঘেয়ে হইবে না।

 ক্রমে পরে—আরও পরে—এমন সময় আসিল, যখন পড়া বা শুনার সময় নাই, অথবা শুনিয়া শুনিয়া—সেই—কল্পনার অমৃতহ্রদে—সেই ভাবের সমুদ্রে, ডুবিবার বা ডুবিয়া রসগ্রহ করিবার অবসর নাই। তাই তখন দেখা আবশ্যক হইল, দেখিয়া বুঝা আবশ্যক হইল। এইরূপে ক্রমে—দৃশ্য কাব্যের—নাটকের সৃষ্টি হইল। এই শ্রেণির কবিগণের মধ্যে কালিদাস ও ভবভূতিই অগ্রগণ্য। দুইজনেরই মালমসল্লা এক, রঙ্গ এক, ধরণও এক—কেবল ঢঙ্‌ আলাদা। এক জন কেবল সৌন্দর্য্য মাত্র দেখেন—আর কিছুই দেখেন না। পাছে ‘বেশী হইয়া পড়ে’ বলিয়া অতি গভীর ভাবও অল্পে অল্পে প্রকাশ করেন। বড় বড় ঘটনাও ​খুব সঙ্ক্ষেপ করেন। বড় বড় জিনিষ দু’কথায় বলিয়া ফেলেন। খুব বাহাদুরী! খুব নিপুণতা। গোটা হিমালয়টা ১৭ শ্লোকে, গোটা সমুদ্রটা ১৫ শ্লোকে, বসন্তটা ১৬ শ্লোকে, পত্নীবিয়োগের আর্ত্তনাদটা ১৮ শ্লোকে, পতিবিয়োগের কান্না ৩৩ শ্লোকে, রাজ বাড়ীর বরযাত্রীর ঘটাপটা ৮ শ্লোকে বর্ণনা করিয়া জমাইয়া তুলা অসাধারণ ক্ষমতার কথা। এপর্য্যন্ত তেমনটী জমাইতে আর কেই পারেন নাই। বোধ হয় আর—পারিবেনও না। অমন ছাঁট্‌ আর হইবে না! অমন ‘ওজন জ্ঞান’ আর হইবে না! এ সবই সত্য! কিন্তু একটী কথা আছে।

 মানুষের মন যখন মাতিয়া উঠে, প্রেমে হউক, শোকে হউক, স্নেহে হউক—মানুষ যখন ‘পাগল পারা’ হয়, তখন অতটা ছাঁট্‌লে ছুট্‌লে, অত ‘ছোব’ ‘ছোব’ করিলে সকলের ততটা পছন্দ সই হয় না। কেমন যেন ‘রুটিন’ ধরিয়া কান্নার মতন হয়। ও সবস্থলে একটু আধটু মাত্রা বেশীতে দোষ হয় না। প্রত্যুত সৌন্দর্য্যেয় বিকাশ আরও অধিকতর হয়। তাই ভাবুকপ্রবর ভবভূতি ঐ ​প্রকার স্থলে, প্রয়োজন মতে, একটু আধটু মাত্রা বেশী করিয়াছেন। তাই তাঁহার বাঁশরীর ঝঙ্কারে লোকের মন মাতিয়াছে বেশী। কালিদাস নিজে, থাকিলে হয়ত বলিতেন “ভায়া হে! মাত্রা চড়াইলে?” কিন্তু ভবভূতি ভাবিলেন, যে, ‘ইহাতে সৌন্দর্য্যের হানি না হইয়া বরং বাড়িয়াই যাইবে।’ তাই ঐ সকল স্থলে তিনি হাতটা একটু ‘দরাজ’ করিয়া দিলেন।

 ভবভূতি ও কালিদাসে আর একটু তফাৎ আছে—সেটুকু এই—কালিদাস যখন কবি, তখন ভারতবর্ষ এক রাজার অধীন, এক ছত্রের তলে— শান্তির অঞ্চলে সুপ্ত। তখন সমগ্র ভারতের সকল বিষয়ের হর্ত্তাকর্ত্তা এক জন রাজা। তাই কালিদাসের কবিতার বিষয় ভারতব্যাপী। রঘুরদিগ্‌বিজয়, ইন্দুমতীর স্বয়ংবর সভা তা’র অন্যতম প্রমাণ। তাঁহার সময়ে লেখা পড়ার চর্চ্চা খুব বেশী। ভারতের সর্ব্বত্রই লেখা পড়ার একটানা খর স্রোত প্রবাহিত। তখন ভারতে সুরসিক, সুপণ্ডিত সামাজিক অনেক। তখন বিদ্যার গৌরবে, শিল্পের গৌরবে, কলার গৌরবে—ভারত জগ​তের শীর্ষস্থানীয়। ওরকম সময়ে—ভারতের ও প্রকার জাঁকের দিনে, কোন রকম ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ করিলেই যে তাহা ধরা পড়িবে, এতত্ত্বটা কবিকুল রবি কালিদাস বেশ তলাইয়া বুঝিয়াছিলেন। সেই জন্যই কোনও স্থানে তিনি, অযথা ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ করিতে যান নাই। কোথাও ‘আগড়ম বাগ্‌ড়ম’ বকেন নাই। সর্ব্বত্রই হাত টান রাখিয়া চলিয়া গিয়াছেন। কালিদাসের সময়ে হিন্দুদিগের সর্ব্বাঙ্গীন উন্নতি, তাই তখনকার কল্পনাও সর্ব্বব্যাপিনী—সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী—ওজস্বিনী।

 ভবভূতির সময়ে ভারত-সাম্রাজ্য ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, ভারতের সে চরম উন্নতির তপন পশ্চিমে হেলিয়া পড়িয়াছে। আগে—উন্নতির দিনে—যে শিক্ষা দীক্ষা কল্পনা—গোটা ভারতবর্ষে এক ভাবে ছিল, এখন সেই সমগ্রভারত-ব্যাপিনী বিদ্যা— সমগ্রভারতব্যাপিনী কল্পনা, ছোট ছোট ভাঙ্গা ভাঙ্গা রাজ্যে ছোট্ট হইয়া পড়িয়াছে। তাই কালিদাসের ন্যায় ভবভূতির প্রতিভায়—সমগ্রভারতের ‘ফটো’ উঠে নাই। কালিদাসের প্রতিভার বিকাশস্থল ছিল সমগ্রভারত, আর ভবভূতির ​প্রতিভা মাত্র বিদর্ভের মধ্যেই আবদ্ধ, তাহার বাহিরে যায় নাই। তখন সামাজিক দিগের অভিমান বিলক্ষণ আছে, কিন্তু অভিমানোচিত পদার্থ নাই। সেই কত পূর্ব্বের অভিমানে বর্ত্তমান নবদ্বীপের— ন্যায়, তখনকার সামাজিকদিগের মনে একটা বিষম দেমাক ছিল,—কিন্তু হৃদয়ের প্রকৃত বিকাশ ছিল না। তখনকার তাঁহারা কতকটা গতানুগতিকে পড়িয়া গিয়াছেন। তাই কালিদাসের ন্যায় ভবভূতির ভাগ্যে ভাল সমজদার (Expert) সামাজিক জোঠে নাই। তাই ভবভূতি কালিদাসের পদানুসরণ করিয়াছেন। ভবভূতি বুঝিয়াছিলেন যে,—“আমি অসময়ে আসিয়াছি, এটা পূর্ণ বিকাশের সময় নহে।” তাই তিনি ‘মহাবীর চরিত’ লিখিয়া, বিষম ‘ধাক্কা’ খাইয়া ‘মালতীমাধবের’ সময়ে, গভীর ক্ষোভে, হৃদয়ের মর্ম্মস্থলের ব্রণের বেদনায় বলিয়াছিলেন—

“যে নাম কেচিদিহ নঃ প্রথয়ন্ত্যবজ্ঞা‍ং
জানন্তি তে কিমপি, তান্‌ প্রতি নৈষ যত্নঃ।
উৎপৎস্যতেঽস্তি মম কোঽপি সমানধর্ম্মা
কালোহ্যয়ং নিরবধির্বিপুলা চ পৃথ্বী॥”

​এটা তাঁহার অহঙ্কার বা স্পর্দ্ধার কথা নহে, এটা তাঁহার গভীর দুঃখের কথা! ‘আমি নিজে যে অমৃতে—যে অপার্থিবরসে—আত্মহারা হইয়াছি, তাহা, যাহাদিগকে ভাল বাসি, আমার সেই স্বদেশবাসী প্রিয় সামাজিকদিগকে আস্বাদন করাইতে গেলাম, আর তা’রা কি না মুখ বাঁকাইয়া লইল’——ইহাতে দুঃখ না হয় কা’র? ব্যথা না পায় কে? তাই ভবভূতি ব্যথা পাইয়া ঐ কথা বলিয়াছিলেন। গভীর আত্মবেদনায় ঐ কথা বলিয়াছিলেন। স্পর্দ্ধা করেন নাই।

 বুঝিবার শক্তি-রহিত, অথচ অভিমানী সামাজিকগণের মন আকর্ষণ করিবার জন্য, “যদ্বেদাধ্যয়ন” বলিয়া, তাঁহাকে খবরের কাগজের উপহারের ন্যায়,—উপহারেরও বিজ্ঞাপন দিতে হইয়াছিল। তাঁহার “অস্থানে পততামতীব মহতামেতাদৃশী দুর্গতিঃ”র চরম—হইয়াছিল!

 তাঁহার কাব্যে নূতন ব্যাপার, নূতন জিনিষ, নূতন নূতন ভাব খুব বেশী না হইলেও, তাঁহার কল্পনার গঠনপ্রণালী দেখিলে, তাঁহার উদার রমণীয় ভাববিন্যাসের সুকৌশল দেখিলে, তাঁহাকে ​অলৌকিক-শক্তিশালী বলিয়া মনে হয়। তাঁহার কাব্য যখনই হাতে লই—তখনই আত্মহারা হই, শ্রদ্ধা এবং ভক্তিতে, তাঁহার উদ্দেশে, মস্তক আপনিই নত হইয়া আইসে। তাঁহার রাম, তাঁহার সীতা, তাঁহার বাসন্তী, তাঁহার তমসা—সকলই দিব্য সকলই অনুপম। ঐ সকল চিত্রে তাঁহাকে অমর করিয়া রাখিয়াছে। তাঁহার কাব্য—

“দেখিলে জুড়ায় আখি,
ভাবিলে অন্তর সুখী,
নিখিল জগৎ করে সুখময় ধাম,
সুধাধারা ঢালে কাণে,
প্রাণে প্রাণ দিয়া টানে
কি যেন মোহিনী-মাখা”—অনুপম ঠাম!!!

সম্পূর্ণ