কালিদাস ও ভবভূতি (রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ)/কবিতা ও ইতিহাস
কবিতা ও ইতিহাস।—কোনও কবিকে ভাল করিয়া বুঝিতে হইলে বা কোনও কাব্যের সৌন্দর্য্য, নৈপুণ্য পূর্ণমাত্রায় অনুভব করিতে হইলে, সর্ব্বাগ্রে তাহার ইতিবৃত্ত কতকটা জানা আবশ্যক। কখন কোন দেশ সেই কবি অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন, কখন কোথায় সেই কাব্য প্রথমে লিখিত হয়, তখন তথাকার সামাজিক অবস্থা কি প্রকার ছিল—ইত্যাদি কতগুলি প্রয়োজনীয় বিষয় না জানিলে কবিত্ব বা কাব্যরস সম্যক্ অনুভূত হয় না। অবশ্য সৎ কবির শ্লোক শ্রবণ করিলেই মনে একটা অনির্ব্বচনীয় আনন্দ জন্মে, সত্য,— কিন্তু কেন, কি উপলক্ষে অথবা কখন কে সেই কবিতা গাহিয়াছিলেন—ইহা জানিলে সেই আনন্দ ষোল আনার স্থলে আঠারো আনা হয়। যেমন—
“ত্বং পীযূষমহো দিবোঽপি ভূষণ
মসি দ্রাক্ষে পরীক্ষেত কঃ?
মাধুর্য্যং তব বিশ্বতো হি বিদিতং
সাধ্বী চ মাধ্বীকতা।
কিন্ত্বেকং ত্বপরং ত্বরুন্তুদমিদং
ব্রূমো ন চেৎ কুপ্যসে
যঃ কান্তধরপল্লবে মধুরিমা
নান্যত্র কুত্রাপি স॥”
এই কবিতাটি পড়িলেই সংস্কৃতাভিজ্ঞ ব্যক্তির মনে একটী নির্ম্মল আনন্দ উপস্থিত হয়, কিন্তু যদি সেই অপরিচিত আনন্দ উদিত হইবার পূর্ব্বে জানা যায় যে, যখন সেই ‘কাণা পণ্ডিত’ রঘুনাথ শিরোমণি বাসুদেব সার্ব্বভৌমকে ত্যাগ করিয়া মিথিলার প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক পক্ষধরমিশ্রের নিকটে অধ্যয়ন করিতে যাইয়া পাঠ সমাপ্তির পর স্বদেশে প্রত্যাবৃত্ত হয়েন, তখন উপেক্ষিত বাসুদেব তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে—‘বাপু হে! পূর্ব্বেত আমারই কাছে পড়িয়াছ, পরে পক্ষধরের কাছেও পড়িলে, এখন সরল প্রাণে বল দেখি, কোথায় প্রকৃত অধ্যয়ন সুখ ভোগ করিলে?’ এই কথার উত্তরে কাণাভট্ট ঐ উপরি উক্ত শ্লোকটী পড়িয়া পূর্ব্বাধ্যাপক সার্ব্বভৌম মহাশয়কে বক্সীস বা গুরুদক্ষিণা দিয়াছিলেন!! এই ইতিবৃত্তটুকু জানিলে ঐ শ্লোকটী পাঠে যে কেমন একটা ফাঁকা ফাঁকা আনন্দ হইতেছিল মাত্র,—তাহা জমাট বাঁধে না কি? ষোল আনার স্থলে আনন্দ ভোগ আঠারো আনা হয় না কি? তাই বলিতেছিলাম যে, কোনও কবি বা তাঁহার কাব্যসম্বন্ধে কোনও কথা বলিবার পূর্ব্বে সেই কবি ও কাব্যের ইতিবৃত্ত জানা আবশ্যক। তাই সর্ব্বাগ্রে অদ্যকার আলোচ্য কবিদের ইতিবৃত্ত সংক্ষেপে উল্লেখ করিব।
প্রথমতঃ কালিদাস—