বিষয়বস্তুতে চলুন

কালিদাস ও ভবভূতি (রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ)/চিত্র-দর্শন ও মহাবীর চরিত

​ চিত্রদর্শন ও মহাবীর-চরিত।— ভবভূতি রামচন্দ্রের চরিত্র উপজীব্য করিয়া দুই খানি কাব্য লিখিয়াছেন। বর্ত্তমানে এক মহাভারতের কৃষ্ণকে লইয়া যেমন কবিবর নবীনচন্দ্র রৈবতক, কুরুক্ষেত্র ও প্রভাস নামে তিনখানি কাব্য লিখিয়াছেন, ভবভূতিও সেইরূপ একমাত্র রামচরিত লইয়া দুইখানি বই লিখিয়াছেন—‘বীরচরিত’ ও ‘উত্তরচরিত’। ইহার মধ্যে রামায়ণের প্রথম ছয় কাণ্ডের বৃত্তান্ত লইয়া ‘বীরচরিত’, আর উত্তর কাণ্ডের ঘটনাবলী লইয়া ‘উত্তরচরিত’ ​রচিত। এক কথায় বলিতে গেলে বীরচরিত উত্তরচরিতের ‘প্রিফেস্’। কিন্তু তাহা হইলেও দুইখানি বইতে তফাৎ অনেক। ‘বীরচরিত’ কাঁচা হাতের লেখা, ‘উত্তরচরিত’ পাকা হাতের চিত্র। ‘বীরচরিত’ ভবভূতির কবিতার ‘মক্‌স’, আর ‘উত্তরচরিত’ তাঁহার হাতের অক্ষয়শিলালিপি। ‘বীরচরিতে’ তিনি রামকে যে ছাঁচে গড়িয়াছেন, রামায়ণের রামও সেই ছাঁচে গঠিত। সে রামে দোষ আছে, চরিত্রের কোথাও বা একটু আধটু ‘খুটিনাটি’ আছে। লঙ্কা সমর জয় করিয়া, জানকীকে লইয়া রামচন্দ্রের অযোধ্যায় ফিরিয়া আসিবার পরের ঘটনাবলী লইয়া ‘উত্তরচরিতের’ ব্যাপার। সুতরাং ‘উত্তর-চরিতের’ সামাজিকদিগকে, প্রতিপদেই রামের বাল্যজীবনের ঘটনাবলী মনে রাখিতে হইবে। অথবা রাখিতে হইবে কেন, বর্ষীয়ান্‌ রামের চরিত-দর্শনকালে নবীন রামের চরিতাবলী আপনিই আসিয়া মনে উদিত হইবে। সুতরাং সেই ‘বীরচরিতের’ রামের কথা নিয়তই তাঁহাদের মনে পড়িবে। সেই ঈষদসম্পূর্ণ রামের ছবি দর্শকগণের মানসপটে ভাসিয়া উঠিবে, ​নিপুণচূড়ামণি ভবভূতির সেটী অভিপ্রেত নহে। যে আদর্শ হইবে, তাহাতে কোনও প্রকার দোষ অমার্জ্জনীয়। বীরচরিতের রামে দোষ আছে, সে রামকে, কবি, সামাজিকদিগকে দেখিতে দিতে চান না। তিনি এমন ‘নিখুঁত’ রাম দেখাইবেন, যাহা রামায়ণে নাই, যাহা পৃথিবীতে নাই, যাহা কেহ কখনও কল্পনায়ও আনিতে পারে না। তাই কবিতারাজ্যের বিশ্বকর্ম্মা ভবভূতি, উত্তরচরিতের ১ম অঙ্কেই, উত্তরকাণ্ডের ঘটনাবলী রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হইবার পূর্ব্বেই সামাজিকদিগকে, চিত্র দর্শনচ্ছলে, রামের সেই শৈশবের ‘মাতৃভিশ্চিন্ত্যমান’ অবস্থা হইতে উত্তরজীবনের প্রারম্ভ পর্য্যন্ত ঝাঁ করিয়া দেখাইয়া দিলেন। রাম সম্বন্ধে সামাজিকদিগের মনে পাষাণের রেখার ন্যায় একটা রেখা টানিয়া দিলেন। ‘বীরচরিতে’র রামের সহিত উত্তরচরিতের রামের যেখানে যে ‘বেখাপ’ ‘বেমানান্‌টুকু’ অপরিহার্য্য হইত, তাহা শোধ্‌রাইয়া লইয়া, চিত্রদর্শনে, মাজা-ঘসা, নিখুঁত রামের ছবি সম্মুখে ধরিলেন। পার্থিরকে অপার্থিব দিয়া ঢাকিয়া ফেলিলেন। ইহা কি কম চাতুর্য্য! কম ​নৈপুণ্য! এ সমুদয় যখন ভাবি, তখন মল্লিনাথের সুরে উচ্চকণ্ঠে বলিতে ইচ্ছা হয় যে,—

‘বয়ঞ্চকৃতিনস্তৎ-সূক্তিসংসেবনাৎ॥’

 সভ্যগণ! আর একটী স্থল আমি না দেখাইয়া থাকিতে পারিতেছি না। সেটী এই—