কালিদাস ও ভবভূতি (রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ)/ছায়া ও অভিজ্ঞান-শকুন্তল
ছায়া ও অভিজ্ঞানশকুন্তল।— অঙ্গুরীয় প্রাপ্তির পর শাপবিমুক্ত-স্মৃতিদুষ্মন্ত যখন শকুন্তলার উদ্দেশে কতপ্রকার বিলাপ, কত প্রকার অনুতাপ করিতেছেন,—তখন অন্তরালে থাকিয়া—শকুন্তলার গন্ধর্ব্ব-সখী সানুমতী সব দেখিতেছিল। মাঝে মাঝে দুষ্মন্তের কাতরতা দেখিয়া বলিতেছিল যে, ‘আহা, আমার প্রিয়সখী শকুন্তলা যদি আজ এখানে এমনিভাবে আমার মত লুকাইয়া থাকিত, তাহা হইলে সে দেখিত, তাহার প্রণয়ী—এক সময়ে যে তাহাকে চিনিতেও পারে নাই, সেই ব্যক্তি, আজ সেই ‘অপরিচিতার’ জন্য কিরূপ পাগল হইয়াছে। ইহা দেখিলে আমার সখীর মনে আর পতিকৃতপরিত্যাগের দুঃখ থাকিত না। সব দূর হইত।’ ইত্যাদি।
ভবভূতি কি—এ ভাব, এমন হৃদয়োন্মাদিনী কল্পনা ছাড়িতে পারেন। তিনি অমনি কালিদাসের ঐ টুকুমাত্র উপজীব্য করিয়া, সীতাকে আড়ালে রাখিয়া, উত্তর চরিতের তৃতীয়ে ‘ছায়াদর্শনে’, রামের সীতার জন্য আকুলতা উন্মাদ প্রভৃতি একে একে সব দেখাইলেন। জানকীর অরণ্য-বাস-সহচরী, বনদেবতা বাসন্তীর সেই—
‘অস্মিন্নেব লতাগৃহে
ত্বমভবস্তন্মার্গদত্তেক্ষণঃ,
সা হংসৈঃ কৃত-কৌতুকা
চিরমভূদগোদাবরী সৈকতে।
আয়াস্ত্যা পরিদুর্ম্মনায়িতমিব
ত্বাং বীক্ষ্য বদ্ধস্তয়া
কাতর্য্যাদরবিন্দ-কুট্মল-নিভো
মুগ্ধঃ প্রণামাঞ্জলিঃ॥’
‘এতত্তদেব কদলী-বন-মধ্যবর্তি
কান্তা-সখস্য শয়নীয়-শিলাতলং তে।
অত্র স্থিতা তৃণমদাদ্ বহুশো যদেভ্যঃ
সীতা, ততো হরিণকৈর্ন বিমুচ্যতে স্ম॥’
‘ত্বং জীবিতং ত্বমসি মে হৃদয়ং দ্বিতীয়ং
ত্বং কৌমুদী নয়নয়োরমৃতং ত্বমঙ্গে।
ইত্যাদিভিঃ প্রিয়শতৈরনুরুধ্য মুগ্ধাং
তামেব—শান্তমথবা, কিমিহোত্তরেণ?’
প্রভৃতি সকরুণ উক্তি শ্রবণে শোকোন্মত্ত রামের সেই—
‘হাহা দেবি! স্ফুটতি হৃদয়ং স্রংসতে দেহবন্ধঃ
শূন্যং মন্যে জগদবিরতজ্বালমন্তর্জ্বলামি।
সীদন্নন্ধে তমসি বিধুরো মজ্জতীবান্তরাত্মা
বিষ্বঙ্ মোহঃ স্থগয়তি কথং মন্দভাগ্যঃ করোমি?’
প্রভৃতি বিলাপ, মূর্চ্ছা, আর্তনাদ—একে একে সব, কবি সীতাকে দেখাইলেন। সীতা অন্তরালে থাকিয়া স্বচক্ষে সব দেখিলেন, দেখিয়া মজিলেন, বেশীর ভাগে, বনবাসের পূর্ব্বে রামের উপর সীতার যে অনুরাগ ছিল, এখন, তাহা কোটি গুণ বাড়িল। আনন্দে দুঃখে, হর্ষে বিষাদে, সীতাও মূর্চ্ছিত হইলেন। মূর্চ্ছাপগমে, পতিপ্রাণা সতী বলিলেন “উখ্খাণিদং পইচ্চ্যাঅ লজ্জা সল্লং মে অজ্জ উত্তেণ”। এ রকম কত দেখাইব? এই প্রকারে, লাইনে লাইনে ভবভূতি কালিদাসের কাছে ঋণী। কিন্তু এ ঋণে বাহাদুরী এই যে, কালিদাসের চেয়ে ভবভূতির ছবি খুলিয়াছে ভাল। তুলনা করিয়া পড়িলে, একথা সকলকেই স্বীকার করিতে হইবে।
আপনারা এ দিকে আবার দেখুন, ভবভূতি কালিদাসের আর একটা বীজ লইয়া, কেমন সুন্দর পত্র-পল্লব-স্নিগ্ধ, ফল-পুষ্প-শোভিত, দেব তরু নির্ম্মাণ করিয়াছেন।