বিষয়বস্তুতে চলুন

কালিদাস ও ভবভূতি (রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ)/শকুন্তলা ও সীতা

​ শকুন্তলা ও সীতা।— দুষ্মন্ত, মৃগয়া করিতে যাইয়া, গোপনে, একা একা শকুন্তলার সাম্রাজ্য অধিকার করিয়াছিলেন, হরিণ-বধে অকৃতকার্য্য হইয়া নিজেই শেষে নির্জ্জনে, বাণের আঘাতে জরজর হইয়াছিলেন, সুতরাং বিরহটাও তাঁহাকে একা একা ভুগিতে হইল। আর ​কেহ তাঁহার সাথে ভোগে নাই। আবার পরে পুনর্মিলনটাও তিনি একা একা ভোগ করিলেন। শকুন্তলার যাওয়া বা আসায়, থাকা বা না থাকায় প্রণয়ে বা বিরহে রাজ্যের আর কারও কিছু হয় নাই। কিন্তু সীতা ত আর শকুন্তলা নন বা রামও দুষ্মন্ত নন। সীতা সেই ধনুকভাঙ্গা পণে লব্ধ ‘সীতা’, সীতা—মিথিলাপতি রাজর্ষি জনকের প্রাণাধিক দুহিতা। সীতা যেমন রামের হৃদয়ের অধিদেবতা ছিলেন, তেমনি জগতেরও আরাধ্য দেবতা ছিলেন। সীতার সম্পর্কে শুধু রামের সংসার নহে, সারা ব্রহ্মাণ্ড পবিত্র ও আনন্দিত ছিল। সীতার বিরহেও, শুধু রামের সংসার নহে, শুধু অযোধ্যা বা মিথিলার রাজ সংসার নহে, সারা ভারতে দুঃখের ঝড়—শোকের ঝড় বহিয়াছিল, তাই আজ মিলনের দিনেও ‘সব্রহ্মক্ষত্রপৌরজানপদপ্রজা’, ‘সদেবাসুরতির্য্যগুরগনায়কনিকায়’ প্রভৃতি কি স্থাবর কি জঙ্গম—সমস্ত ‘ভূতগ্রাম’ উপস্থিত।

 সীতার বিয়োগে যাঁহারা যাঁহারা অতল-শোক সাগরে ডুবিয়াছিলেন, আজ তাঁহারা সকলেই ​আবার স্বপ্নাতীত, অচিন্তনীয় সুখভোগ করিবেন, তাঁহাদের নারী-কুল-দেবতা সীতা আজ ফিরিয়া আসিবেন। তাই সব এক জায়গায় সমবেত। কোথায় দুষ্মন্তের শকুন্তলার সহিত মিলন! আর কোথায় রামের সীতার সহিত মিলন! আকাশ-পাতাল প্রভেদ। অপ্‌সার মেয়ের (‘লভ্‌চাইল্ডের) প্রণয় বিরহও মিলন সম্মুখে রাখিয়া, হিন্দুর উপাস্য দেবতা রামসীতার প্রণয় বিরহ ও মিলনে ভবভূতি কি বাহাদুরীই দেখাইয়াছেন! রামের মত পিতাকেও লবকুশ চিনিতে পারিলেন না বা লবকুশের মত পুত্ত্ররত্নকে রাম চিনিতে পারিলেন না— নিরপরাধা সীতার নির্ব্বাসনের, বোধ হয়, এর চেয়ে বড় প্রায়শ্চিত্ত, রামের পক্ষে আর কিছুই হইতে পারে না। হিন্দুর চরম প্রায়শ্চিত্ত চতুর্ব্বিংশতি বার্ষিক প্রাজাপত্য প্রভৃতি এর কাছে কোন্ ছার!!

 দুষ্মন্তকে সর্ব্বদমনের না চেনা, আর রামকে বীরবর লবকুশের না চেনা—এতদুভয়ের মধ্যে কত প্রভেদ! ভবভূতি কেমন করিয়া কালিদাসের পাকা ঘরের ‘পঙ্খ’ করা দেওয়ালে ছবি ​আঁকিয়া বাহাদুরী লইলেন! কালিদাসের সুগঠিত প্রতিমার চালচিত্র করিয়া, রঙ্গ ফলাইয়া, প্রতিমার চক্ষুদান দিয়া—আসর মাৎ করিয়া দিলেন!!

 কালিদাসের উপর এ বাহাদুরী ভবভূতিরই সাজে, একমাত্র তিনিই পারেন! তাই কালিদাসের নামের সাথে তাঁহার নামও গাঁথা হইয়া গিয়াছে, ‘এ বলে’ আমায় দেখ্‌, ও বলে’ আমায় দেখ্‌’—হইয়াছে!!

 ক্রমে প্রবন্ধ বিস্তৃত সুতরাং বিরক্তিকর হইয়াছে। আর বাড়াবাড়ি করিব না; তবে বাকী রহিল ঢের, এক আনাও বলা হইল না। আশা করি—ছাত্রগণ বা অধ্যাপকগণের মধ্যে কেহ একবার এ বিষয়টীতে দৃষ্টিপাত করিবেন।