বিষয়বস্তুতে চলুন

কালিদাস ও ভবভূতি (রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ)/সর্ব্বদমন ও লবকুশ

​ সর্ব্বদমন ও লবকুশ।— ঐ স্বর্গে ভগবান্ মারীচের আশ্রমে রাজা দুষ্মন্ত, পরিচারিকাদ্বয়-বেষ্টিত, দুরন্ত-সিংহ-শিশুর জটাকর্ষণে ব্যস্ত, মুগ্ধ-মূর্ত্তি বালককে দেখিয়া ভাবিতেছেন—“এ কা’র ছেলে? কার’ কুলের অবতংশ? একে দেখে আমার মন এমন করে কেন?”

 আজ নিজের ছেলেকে পুরুবংশের রাজা দুষ্মন্ত নিজে চিনিতে পারিতেছেন না। রেলে ডেলিপ্যাসেঞ্জার, সুতরাং দিনের বেলায় অদৃশ্য পিতাকে, নিশীথে, ঘুমন্ত শিশু জাগিয়া যেমন চিনিতে পারে না, “বাবা” বলিয়া ‘রেকগ্‌নাইজ’ই ​করে না, সেইরূপ দুষ্মন্তকেও আজ, তাঁহার শিশুপুত্ত্র ‘পিতা’ বলিয়া আমলে আনিতেছে না। কি সুন্দর চিত্র! কি মনোমোহন অঙ্কন!! ভবভূতি অগ্রসর হইয়া এ ভাবটুকু কুড়াইয়া লইলেন। এই ভাবের ‘ফ্রেমে’ এর চেয়েও সুন্দর জম্‌কালো ছবি আটিয়া দিলেন।

 সর্ব্বদমনত তিন চারিবছরের শিশু, দুধের ছেলে, ইহার চেনা না চেনায়, বা ‘রেকগনাইজ’ করা না করায়, ‘সত্যি ঘরের’ বাবার তত একটা কিছু আসে যায় না; কিন্তু যে ছেলের বাণের আঘাতে, চন্দ্রকেতু ও তদীয় সেনাগণ “চিত্রার্পিতারম্ভ” অজ্ঞান, যে ছেলের বীরদর্পে ক্ষত্ত্রিয় নরপতির গৌরব-কেতন অশ্বমেধ পণ্ডপ্রায়, ‘কিমক্ষত্রিয়া পৃথ্বী’ ‘কিং ব্যবস্থিত-বিষয়াঃ ক্ষত্রধর্ম্মাঃ’ বলিয়া সিংহের ন্যায় যে ছেলে অশ্বমেধের অশ্ববন্ধন করিয়াছে, সেই ছেলেকে, পিতা রাম চিনিতে পারিতেছেন না, বলিতেছেন ‘এ কে? কা’র ছেলে? একি—‘ত্রাতুং লোকানিব পরিণতঃ কায়বানস্ত্রবেদঃ’? না—‘সামর্থ্যানামিব সমুদয়ঃ সঞ্চয়ো বা গুণানাং’—অথবা একি—‘ক্ষাত্রোধর্ম্মঃ শ্রিত ইব ​তনুং ব্রহ্মকোষস্য গুপ্তৈ’? না—‘আবির্ভূয় স্থিত ইব জগৎ-পুণ্য-নির্ম্মাণ-রাশিঃ! একে দেখে আমার অবিরাম দুঃখেরও আজ একটু বিরাম হইতেছে! কেন এমন হয়? কোনই ত কারণ দেখি না?’ ‘অথবা—

‘ব্যতিষজতি পদার্থানান্তরঃ কোঽপি হেতুঃ
ন খলু বহিরুপাধীন্‌ প্রীতয়ঃ সংশয়ন্তে।
বিকসতি হি পতঙ্গস্যোদয়ে পুণ্ডরীকং
দ্রবতি চ হিম-রশ্মাবুদ্‌গতে চন্দ্রকান্তঃ।’

আহা! এর দিকে চাহিলেও আনন্দ!’ এই ভাবে একা একা ‘বিড় বিড়’ করিয়া রাম কত কি বলিতেছেন।

 যে দিন হইতে তাঁহার জীবনের শান্তি-প্রতিমা সংসারের লক্ষ্মী, সীতাকে বনে বিসর্জ্জন দিয়াছেন, সেই দিন—সেই অশুভ মুহূর্ত্ত হইতেই ত রামের সুখের স্বপন ভাঙ্গিয়াছে! তাই অজি অনেক দিন—অনেক বৎসর পরে, ক্ষণকালের জন্য একটু অপরিচিত, বহুকাল বিস্মৃত—সুখ পাইয়াই, রাম কত কি ভাবিতেছেন! বলিতেছেন ‘এর উপর ​আমার এত স্নেহ কেন?’ যখন লব চন্দ্রকেতুর মুখে ‘প্রিয় বয়স্য! ননু তাতপাদাঃ!’ বলিয়া রামের পরিচয় শুনিল, শুনিয়াই অমনি, ‘চত্বারঃ খলু ভবতামেবংব্যপদেশভাগিনস্তত্রভবন্তো রামায়ণকথাপুরুষাঃ, তৎ বিশেষং ব্রূহি” বলিয়া ‘ইনি তোমার চারিজন তাতগণের কোন্‌জন’ জিজ্ঞাসা করিল, চন্দ্রকেতু বলিলেন, ‘জ্যেষ্ঠতাত’, অমনি লব উল্লাসের সহিত ‘কথং রঘুনাথঃ? দিষ্ট্যা সুপ্রভাতমদ্য, যদয়ং দৃষ্টো দেবঃ’ বলিয়া ভক্তিনম্র উদাসীনের মত বিনয় বিস্ময় এবং কৌতুকের সহিত রামের দিকে তাকাইয়া রহিল; বাল্মীকির আশ্রমে, রামায়ণে, যে রামের অশেষ কীর্ত্তিবিবরণ এত দিন পড়িয়া আসিয়াছে, এই সেই রাম, এই রামায়ণের নায়ক রাম,—ভাবিয়া কৌতুকের সহিত, পরম আগ্রহের সহিত দেখিতে লাগিল, অনেক ক্ষণ এক-দৃষ্টে—অনিমেষলোচনে দেখিয়া শেষে প্রণাম করিল; তখন অমনি স্নেহের নির্ঝর রাম ‘অত কেন? এস এস’ বলিয়া লবকে কোলে টানিয়া লইলেন। পরিচয় অপরিচয়, সম্বন্ধ অসম্বন্ধ—সব ভুলিয়া বলিলেন ‘বৎস! ​অনেক বার গাঢ়ভাবে আমাকে আলিঙ্গন কর ত!’ রাম জানেন না কা’কে কোলে তুলিলেন, লব ও জানেন না যে, কা’র কোলে উঠিলেন!! এমন সময়ে দূর হইতে—যেন কা’র কণ্ঠস্বর রামের কাণে গেল। না না—“কাণের ভিতর দিয়া” যেন ‘মরমে পশিল’। রাম চমকিয়া উঠিলেন! সেই অবিজ্ঞাত অশ্রুত পূর্ব্বস্বরে রামের দেহ ‘নবনীলনীরধর-ধীর-গর্জ্জিত-ক্ষণবদ্ধ-কুট্মল-কদম্বতরুর’ ন্যায় রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। ক্রমে সেই— নিশীথ সময়ে বহুদূরাগত বীণাধ্বনির ন্যায়—স্বরে রামের মন-প্রাণ-দেহ—সব যেন ভরিয়া গেল, রাম এক মহান্ আনন্দ-বিভ্রমে পড়িয়া গেলেন। যাহার স্বরে রাম—উদ্ভ্রান্ত হইয়াছিলেন, ক্রমে সে নিকটে আসিল। লবকে কোলে করিয়া রাম একবার আস্বাদ পাইয়াছেন, সুতরাং এবার লোভ সংবরণ করা দায়,—তিনি কুশকেও কোলে লইলেন। পূর্ব্বে লবকে কোলে লওয়ায় যে আশার সুখতারা মিটি-মিটি জ্বলিতেছিল, কুশকে পাইয়া, তাহা সহসা ফুটিয়া উঠিল। কিন্তু হায়, অমনি আবার হৃদয়ে নিরাশার কালো

​মেঘ দেখা দিল, সব ঢাকিয়া গেল? মন আঁধারে ভরিয়া গেল—!!

 আবার পরক্ষণেই রাম আনন্দে, অধীরতায়, সংশয়ে, নির্ণয়ে যেন কেমনধারা হইয়া পড়িলেন। মনে আসিতে লাগিল—‘কিমপত্যময়ং দারকঃ?

অঙ্গাদঙ্গাৎ স্নত ইব নিজোদেহজঃ স্নেহসারঃ।
প্রাদুর্ভূয় স্থিত ইব বহিশ্চেতনাধাতুরেব।
সান্দ্রানন্দক্ষুভিত-হৃদয়-প্রস্রবেণেব সৃষ্টো
গাত্রং শ্লেষে যদমৃতরসস্রোতসা সিঞ্চতীব”।

ইত্যাদি নানা ভাবনার পর সূক্ষ্মভাবে দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন ‘অয়ে ন কেবলমস্মৎ-সংবাদিনী আকৃতিঃ!

‘অপি জনকসুতায়াস্তচ্চ তচ্চানুরূপ্যং
স্ফুটমিহশিশুযুগ্মে নৈপুণোন্নেয়মস্তি।
ননু পুনরিব তন্মে গোচরীভূতমক্ষ্ণো
রভিনবশতপত্রশ্রীমদাস্যং প্রিয়ায়াঃ॥’

ভাবিতে লাগিলেন —

 “সৈবৌষ্ঠমুদ্রা স চ কর্ণপাশঃ”—এইভাবে ক্রমে কত কথা মনে আসিতে লাগিল! সংশয় ক্রমেই ​বাড়িতে লাগিল। এ রকম ক্ষেত্রে—মানুষের মনে যাহা যাহা হয়—সব রামের মনে উদিত হইল। “তদেতৎপ্রাচেতসাধ্যুষিতমরণ্যং, যত্র কিল দেবী পরিত্যক্তা, ইয়ঞ্চানয়োরাকৃতির্বৎসয়োঃ”—ইত্যাদি কত কি ভাবের উদয় হইতে লাগিল!

 ক্রমে অসময়ের সাথী চোখের জল দেখা দিল। কচি ছেলে লব, তাহা দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তাত! একি?” অমনি কুশ ‘আগ’ বাড়াইয়া বলিলেন, “সে কি লব? উনি কাঁদিবেন না?”

‘বিনা সীতাদেব্যা কিমিব হি ন দুঃখং রঘুপতেঃ?
প্রিয়ানাশে কৃৎস্নং জগদিদমরণ্যং হি ভবতি।
স চ স্নেহস্তাবানয়মপি বিয়োগো নিরবধিঃ
কিমিত্যেবং পৃচ্ছস্যনধিগতরামায়ণ ইব?’

 কুশের এই তটস্থিত আলাপে রামের সব আশা ভরসা ফুরাইল! মনে মনে বলিতে লাগিলেন—‘আর কেন? আর প্রশ্নের দরকার নাই! দগ্ধ হৃদয়, কেন তোমার হঠাৎ এ দামোদরের বাণ!” বলিয়াই রাম মন ফিরাইতে যত্ন করিলেন। ​কিন্তু তা কি আর ফিরে? ক্রমে কত কথা হইল, ‘রামায়ণ’ কতদূর হৈয়াছে? কতদূর পড়িয়াছ? দু’ একটা শ্লোক বল না?’—ইত্যাদি বার্ত্তালাপে পুনরায় রাম অধীর হইয়া পড়িলেন। রামের সেই সীতাময় জীবনের সব কথাগুলি কবি, লবকুশকে দিয়া একটী একটী করিয়া মনে করাইয়া দিলেন! এই ভাবে কত কাণ্ডের পর—কত কান্না কাটির পর—অভিনয়দর্শনের ছলে পুত্ত্রবতী সীতার সহিত রামের পুনর্মিলন হইল। ‘সজঙ্গম-স্থাবর-জগৎ’ সে মিলনের সময়ে ‘নির্বাত নিষ্কম্প প্রদীপের’ ন্যায় স্থির হইয়া—বিস্ময়-বিমুগ্ধ হইয়া সে মিলন দেখিল। অনুমোদন করিল। রামসীতার পুনর্মিলন হইল। জগৎ আনন্দে বিভোর হইল, হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল!!!