বিষয়বস্তুতে চলুন

গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

সম্রাটের পরামর্শমতে আমি প্রজাবৃন্দের প্রিয়পাত্র হইতে ও সর্ব্বদা তাহাদের চিত্তবিনোদন করিতে, বিধিমতে চেষ্টা করিতাম, এবং সৌভাগ্যক্রমে কৃতকার্য্যও হইয়াছিলাম। পুরুষেরা যখন তখন আসিয়া, পাঁচ সাত জনে দলবদ্ধ হইয়া, আমার মাথায় চড়িয়া নৃত্য করিত; ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা আমার চুলের মধ্যে লুকাচুরি খেলিত। আর নানাবিধ ক্রীড়া-কৌতুকে আমাকে প্রফুল্ল রাখিত। সে দেশের যে কেহ সরকারি কার্য্যে নিযুক্ত হইতে চাহে, তাহাকেই নানাপ্রকার ব্যায়াম-কৌশল দেখাইতে হয়; এমন কি, যে সর্ব্বাপেক্ষা এ বিষয়ে পটু বলিয়া প্রমাণ দিতে পারে, তাহারই কার্য্যপ্রাপ্তির সম্ভাবনা সর্ব্বাপেক্ষা অধিক। এই কারণে রাজ্যের প্রায় সকলেরই অঙ্গচালনায় বিশেষ পটুতা ছিল। রাজকোষাধ্যক্ষ সকলের অপেক্ষা ১ ইঞ্চি অধিক লাফাইতে পারিতেন। তাঁহার পরেই প্রধান মন্ত্রী। এরূপ ব্যায়াম-কৌশল প্রদর্শনে যে কখনও কখনও দুর্ঘটনা না ঘটিত, তাহা নহে; তথাপি ইহা সে দেশের লোকের পক্ষে একটা আনন্দের ও গৌরবের বিষয়; কাজেই তাহারা বিরত হইত না। সম্রাট্ কখনও কখনও স্বয়ং এই সকল প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকিয়া, স্বহস্তে বীরত্বের পুরস্কার বিতরণ করিতেন। একদিন আমি আমার রুমালের চারি কোণে চারিটি খোঁটা বাঁধিয়া, সেগুলি মাটীতে পুতিলাম, এবং সম্রাটের অশ্বারোহীদিগের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা সাহসী কয়েকজনকে অশ্বসহ সেই রুমালে তুলিয়া দিলাম! তাঁহারা বেশ স্ফুর্ত্তির সহিতই সেই রুমালের উপর অশ্বচালনার কৌশল দেখাইতে লাগিলেন! সম্রাট্ ও উপস্থিত সকলে তাহা দেখিয়া আনন্দ উপভোগ করিলেন। ক্রীড়া সমাপ্ত হইলে আমি একে একে সকলকেই অশ্বসহ আবার ভূতলে নামাইয়া দিলাম।

 একদিন সম্রাটের কি খেয়াল হইল, আমায় পা ফাঁক করিয়া দাঁড়াইতে বলিয়া, তাঁহার একদল সৈন্যকে সেই ফাঁকের মধ্য দিয়া যাইতে আদেশ দিলেন। দলে দলে নিশান উড়াইয়া, বাদ্য বাজাইয়া, তিন সহস্র পদাতী সৈন্য ও এক সহস্র অশ্বারোহী সৈন্য, সগৌরবে সদর্পে আমার পায়ের ফাঁক দিয়া পার হইয়া গেল! এক এক সময় আমি মাটীতে হাত পাতিয়া থাকিতাম, আর সুশিক্ষিত অশ্বগণ আরোহী পৃষ্ঠে করিয়া, লাফাইয়া তাহা পার হইয়া, বাহাদুরী লইত! একদিন আমি দাড়াইয়া আছি, এমন সময়ে একজন সৈনিকপুরুষ অশ্বপৃষ্ঠে আসিয়া, আমার জুতাশুদ্ধ পা লাফাইয়া গেলেন! অশ্বের ও আরোহীর এরূপ নিপুণতা
৩ নং
৩৷৪ হাজার পদাতী ও অশ্বারোহী সৈন্য আমার পায়ের ফাঁক দিয়া পার হইয়া গেল।
দেখিয়া প্রজাবৃন্দের যে মহোল্লাস সে দিন দেখিলাম, তাহা দেখিবার ও উপভোগ করিবার বিষয়ই বটে!

 এইরূপে আমার মুক্তির পথ ক্রমে ক্রমে পরিষ্কৃত হইয়া আসিতে লাগিল। প্রধান মন্ত্রী আমার উপর বড় সদয় ছিলেন; কিন্তু জানি না কেন, কোষাধ্যক্ষ মহাশয় আমার প্রতি বড়ই বিরূপ ছিলেন। প্রধান মন্ত্রীর মুখে শুনিয়াছি, সভাস্থলে যতবার আমায় ছাড়িয়া দিবার কথা উঠিত, কোষাধ্যক্ষ ততবারই ঘোরতর আপত্তি তুলিতেন। অবশেষে আমি যে প্রকৃত পক্ষে রাজ্যের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, এ বিষয়ে যখন কাহারও কোনও সন্দেহ রহিল না, তখন একদিন সভায় স্থির হইয়া গেল, আমাকে যথারীতি একটা সন্ধির সর্ত্তে আবদ্ধ করিয়া, মুক্তি দেওয়া হইবে। আমার প্রিয়বন্ধু প্রধান মন্ত্রীমহাশয় আসিয়া আমাকে এই আনন্দের সংবাদ দিয়া গেলেন। কোষাধ্যক্ষ মহাশয় চেষ্টা করিয়া সম্রাটের নিকট অনুমতি লইলেন যে, সন্ধির সর্ত্তগুলি তিনি লিখিবেন। অতএব বলা বাহুল্য, কতকগুলি সর্ত্ত আমার পক্ষে নিতান্তই অমর্য্যাদাকর হইল। পাঠকের কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য সর্ত্তগুলির নমুনা দিলাম:—

 (১) সম্রাটের অনুমতি ব্যতীত, আমি (এখানে বলিয়া রাখি, সে দেশের লোকে আমাকে ‘মানব-পর্ব্বত’ বলিয়া জানিত) রাজ্যত্যাগ করিতে পাইব না; অথবা রাজধানীর মধ্যে প্রবেশ বা ভ্রমণ করিতে পাইব না।

 (২) কোনও শস্যক্ষেত্রে কদাচ পদার্পণ করিতে পাইব না।

 (৩) সরকারী কার্য্যে আবশ্যক হইলে, রাজদূতকে আমার পকেটে করিয়া কার্য্যস্থলে পৌছাইয়া দিতে এবং কার্য্যান্তে রাজধানীতে ফিরাইয়া আনিতে হইবে।

 (৪) ব্লেফুস্কু দ্বীপের অধিপতি লিলিপুট্‌ রাজ্যের শত্রু। সম্প্রতি তিনি এ রাজ্য আক্রমণ করিবার অভিপ্রায়ে যুদ্ধ-জাহাজ সংগ্রহ ও সজ্জিত করিতেছেন। অতএব আমায় তাঁহার অনিষ্টসাধন করিতে হইবে।

 (৫) রাজ্যে যখনই কোনও অট্টালিকা প্রস্তুত হইবে, আবশ্যক হইলে, ভারী প্রস্তর প্রভৃতি তুলিতে এবং কারিকর ও মিস্ত্রীদিগকে সাহায্য করিতে আমি বাধ্য থাকিব।

 (৬) এক মাস কালের মধ্যে লিলিপুট দ্বীপের জরিপ শেষ করিয়া, নক্সা প্রস্তুত করিয়া দিতে বাধ্য থাকিব।

 (৭) উপরি লিখিত সর্ত্তসকল যথারীতি পালন করিলে ও করিতে থাকিলে, সেই রাজ্যের ১৭২৮ জন অধিবাসীর আহারের উপযুক্ত মাংস, পানীয় ইত্যাদি আমি প্রত্যহ পাইব।

 বলা বাহুল্য, আমি সন্তুষ্ট চিত্তে এই সন্ধিপত্রে নাম সাক্ষর করিলাম। তৎক্ষণাৎ আমার পায়ের শৃঙ্খল খুলিয়া দেওয়া হইল! আমি আবার মুক্ত পুরুষ হইলাম!

 সর্ত্ত গুলির মধ্যে একটী আমার বিশেষ বিস্ময় উৎপন্ন করিয়াছিল। ১৭২৮ ব্যক্তির খোরাকে আমার দিন চলিবে, এ হিসাব সম্রাট্ কোথা হইতে পাইলেন? অনুসন্ধানে অবগত হইলাম, সম্রাটের বিজ্ঞ পরামর্শদাতৃগণ আমার দেহের উচ্চতা এবং আমার ও তদ্দেশবাসীর দেহের পরিমাণ লইয়া, বিজ্ঞানানুযায়ী প্রথায় তুলনা ও গণনা করিয়া, উক্ত হিসাব ধার্য্য করিয়া দিয়াছেন। ইহা হইতে বুঝিতে পারা যায়, সে দেশের বৈজ্ঞানিকগণের বুদ্ধির গভীরতা কত বেশী!

 মুক্তি পাইয়াই আমার প্রথম ইচ্ছা হইল, নগরটা কিরূপ দেখিয়া বেড়াই। সন্ধির সর্ত্ত অনুসারে সম্রাটের অনুমতি লইতে হইল। আমি মানুষ-পর্ব্বত, নগর দেখিতে বাহির হইব—এই সংবাদ রাষ্ট্র হইবামাত্র, সকলেই রাস্তা ছাড়িয়া গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিল। আমি কোট্‌টি খুলিয়া রাখিয়া বাহির হইলাম। কারণ, যখন বাড়ীর ছাদ্‌ ডিঙ্গাইয়া বেড়াইতে হইবে, তখন কোট পরা থাকিলে, হয় ত কত বাড়ীর ছাদ কোটের কোণের ধাক্কা লাগিয়া ভাঙ্গিয়া যাইতে পারে! সৌভাগ্যের কথা যে, এমন একটাও দুর্ঘটনা ঘটে নাই। আমি চারিদিক দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়া গৃহে ফিরিলাম।