গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
রাজদূত আমার দক্ষিণ পদের উপর দিয়া বরাবর আমার মুখের নিকট উপস্থিত হইলেন; তাঁহার সঙ্গে ১২ জন অনুচর ছিল। তিনি রাজার মুদ্রাঙ্কিত সনন্দখানি আমার চক্ষুর নিকট খুলিয়া ধরিলেন; তারপর প্রায় ১০ মিনিট ধরিয়া বক্তৃতা করিলেন। সে বক্তৃতার মধ্যে ক্রোধ-চিহ্নের লেশমাত্রও দেখিলাম না। কেবল বিশেষ দৃঢ়তার সহিত বার বার সম্মুখের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিতে দেখিলাম। পরে বুঝিতে পারিলাম, মহারাজের আদেশক্রমে আধমাইল দূরবর্ত্তী রাজধানীতে আমাকে যাইবার হুকুম করিতেছেন। আমি অতি অল্প কথায় তাঁহার বক্তৃতার উত্তর দিলাম, এবং আমার যে হাতটী মুক্ত ছিল, তাহা দ্বারা দেহের সমুদায় বন্ধন দেখাইয়া, মুক্তি প্রার্থনা করিলাম। রাজদূত আমার অনুরোধ বেশ বুঝিতে পারিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি অসম্মতি জ্ঞাপন করিয়া মাথা নাড়িলেন, ও হাত নাড়িয়া বুঝাইয়া দিলেন, এই বন্দীভাবেই আমাকে রাজধানীতে যাইতে হইবে। যাহা হউক, তিনি দয়া করিয়া ইহাও জানাইলেন যে, আমাকে প্রচুর পরিমাণে আহার ও পান করিতে দেওয়া হইবে এবং আমার সহিত সদ্ব্যবহার করা হইবে। সহজে মুক্তি পাইবার আশা নাই দেখিয়া, আমার আর একবার বল প্রকাশ করিবার ইচ্ছা হইল, কিন্তু বাণবৃষ্টির ভয়ে তাহা হইতে বিরত হইলাম এবং ইঙ্গিতের দ্বারা তাঁহাকে জানাইলাম যে, আমার সম্বন্ধে তাঁহার যেরূপ অভিরুচি, করিতে পারেন।
ইহাতে যথেষ্ট বিনয় ও সন্তোষ প্রকাশ করিয়া ‘হার্গো’ সদলবলে চলিয়া গেলেন। অবিলম্বে “পেপ্লম্ সিলান্” এই কথা বলিয়া সকলে বারংবার উচ্চ চীৎকার করিতে লাগিল। তখনই একদল লোক আসিয়া আমার বাম পাশের বন্ধনগুলি এতটা শিথিল করিয়া দিল যে, আমি ডান পাশে ফিরিতে পারিলাম। আর, ইতিপূর্ব্বেই তাহারা একপ্রকার সুগন্ধি মলম আনিয়া আমার মুখে এবং দুই হাতে মাখাইয়া দিয়াছিল। তাহাতে আষাতের সকল যাতনা কমিয়া গিয়াছিল। আহারাদির পর আমার শান্তিবোধ হইতে লাগিল; সঙ্গে সঙ্গে বেশ ঘুম আসিল। আমি প্রায় ৮ ঘণ্টা ঘুমাইয়া ছিলাম। তাহার কারণ, চিকিৎসকগণ পিপার মদের সহিত ঘুমের ঔষধ মিশাইয়া দিয়াছিল।
তীরে উঠিয়া প্রথম যখন আমি ক্লান্তদেহে ঘুমাইয়া পড়ি, তখন প্রজাদের নিকট হইতেই রাজা আমার সংবাদ পান। পরে জানিয়াছি, এ রাজ্যের নাম “লিলিপুট্-রাজ্য।” লিলিপুট্-রাজের আদেশে সেই ঘুমন্ত অবস্থাতেই আমাকে বাঁধিয়া ফেলা হয় এবং শুধু তাই নহে, আমাকে রাজধানীতে আনিবার জন্য একটা যন্ত্র নির্মাণেরও আয়োজন করা হয়। রাজা এরূপ আদেশ দিয়া অতি সাহসের পরিচয় দিয়াছিলেন! সে সময় হঠাৎ আমি জাগিয়া উঠিলে, যাহারা আমাকে বাঁধিতে ‘আসিয়াছিল, তাহাদের কাহাকেও আর প্রাণ লইয়া ফিরিতে হইত না, ইহা নিশ্চিত।
অঙ্কশাস্ত্রে ইহাদের বিলক্ষণ ব্যুৎপত্তি ছিল, এবং রাজার সাহায্যে ও উৎসাহে ইহারা যন্ত্রপাতি নির্ম্মাণেও খুব উন্নতি লাভ করিয়াছিল। রাজা খুব বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। বড় বড় গাছ বা এরূপ ভারী দ্রব্য স্থানান্তর করিবার জন্য নানাবিধ যন্ত্র সর্ব্বদাই প্রাসাদে প্রস্তুত থাকিত। রাজা কখনও কখনও বনে গাছ কাটাইয়া, সেই খানেই বৃহৎ বৃহৎ যুদ্ধ জাহাজ প্রস্তুত করাইতেন। তাহাদের মধ্যে কোন কোনগুলি ৯ ফিট্ পর্যন্ত লম্বা! এই সমস্ত যন্ত্রের সাহায্যে সেই জাহাজগুলি জলে ভাসাইতে কোনই অসুবিধা হইত না; কিন্তু আমাকে বহন করিয়া লইয়া যাইবার জন্য যে যন্ত্র নির্ম্মিত হইল, তাহার অপেক্ষা বড় যন্ত্র প্রাসাদে ছিল না; এবং তাহা নির্ম্মাণ করিতে ৫০০ সূত্রধর ও অন্যান্য শিল্পী নিযুক্ত হইয়াছিল। এই যন্ত্রটী ৭ ফিট্ লম্বা, ৪ ফিট্ চওড়া একটী কাঠের ফ্রেম মাটী হইতে ৩ ইঞ্চি উঁচু এবং তাহার নীচে ২২ খানি চাকা। যখন এই কল আসিয়া পৌঁছিল, তখন সকলেই আনন্দে চীৎকার করিয়া উঠিয়াছিল। যন্ত্রটীকে আমার ঠিক পাশেই আনা হইল।
তিন ঘণ্টা অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের পর, নয় শত বলিষ্ঠ লোক, বিস্তর কপিকল ও দড়াদড়ির (অবশ্য সে দেশের লোকের শক্তির অনুযায়ী কপিকল ও দড়াদড়ি!) সাহায্যে আমাকে সেই রথে তুলিল; এবং রাজার অশ্বশালার বাছা বাছা দেড় হাজার—প্রত্যেকটা প্রায় ৫ ইঞ্চি করিয়। উঁচু—ঘোড়া সেই রথ টানিতে লাগিল। আমি এরূপ গাঢ় নিদ্রায় আচ্ছন্ন ছিলাম যে এ সকল কিছুই টের পাই নাই; হয় ত রাজধানীতে পৌঁছান পর্য্যন্ত কিছু টের পাইতাম না। কিন্তু পথিমধ্যে রথ সামান্য একটু বিকল হইয়া যাওয়ায় থামিতে বাধ্য হয়; সেই সময় কৌতূহলপরবশ হইয়া দুই চারিজন সাধারণ লোক রথে চড়িয়া আমায় দেখিতে লাগিল। তাহাদের মধ্যে একজনের হাতে একটা দীর্ঘ বর্শা ছিল; তাহার কেমন খেয়াল চাপিল, সেই বর্শাটা আমার নাকের মধ্যে চালাইয়া দিল। নাকে কাটি দিলে আমাদের সাধারণতঃ যেরূপ সুড়্সুড়ি লাগে ও আমরা যেন হাঁচি, আমার সেই ভাবে সুড়্সুড়ি লাগিয়া হাঁচি আসিল, আমি জাগিয়া উঠিলাম। ![]()
২নং
বাছা বাছা দেড় হাজার ঘোড়া রথ টানিতে লাগিল। তখনও কিন্তু আমার সেই পূর্ব্বের মতনই বন্ধনদশা! আমি জাগিবামাত্র সকলে পলাইয়া গেল, কাজেই তখন কারণটা জানিতে পারিলাম না।
তারপর, সমস্ত দিন ধরিয়াই, রাজধানীর পথে চলিলাম; পথ আর ফুরায় না, অথচ পথ আধ মাইলের বেশী নহে। রাত্রিতে, সেই রথের উপরেই শুইয়া কাটিল; আমার উভয় দিকে প্রায় সহস্র সশস্ত্র শাস্ত্রী, কেহ বা মশাল, কেহ বা তীরধনু লইয়া, আমায় পাহারা দিতে লাগিল।
পরদিন প্রাতঃকালে, সূর্য্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে, আবার আমরা চলিতে লাগিলাম। যখন মধ্যাহ্ন, তখন রাজবাড়ীর ফটকের নিকটে আসিয়া পৌছিলাম। সংবাদ পাইয়া, সম্রাট স্বয়ং, পারিষদবর্গ লইয়া আমাকে দেখিতে আসিলেন। কিন্তু তাঁহাদের পরামর্শ মতে, তিনি আমার দেহের উপর উঠিয়া বেড়াইতে নিরস্ত রহিলেন, পাছে তাঁহার কোনও রূপ বিপদ ঘটে।
যেখানে আমার রথ থামিল, তাহার নিকটেই এক পরিত্যক্ত পুরাতন দেবমন্দির ছিল; সে রাজ্যে তাহা অপেক্ষা বৃহৎ দেবালয় বা কোনও প্রকারের গৃহ ছিল না। এক সময় এই মন্দির মধ্যে কে একজন অপর একব্যক্তিকে নৃশংসরূপে হত্যা করিয়াছিল, সেই অবধি এ দেবালয়ের পবিত্রতা নষ্ট হইয়াছে, এবং সকলেই সাধারণ বাটীর ন্যায় ইহার ব্যবহার করে। এই মন্দির আমার বাসস্থান নির্দ্দিষ্ট হইল। মন্দিরের প্রধান ফটকটি প্রায় ৪ ফুট উঁচু ও ২ ফুট চওড়া; কাজেই এ ফটক দিয়া আমি কোনও প্রকারে মন্দির মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিলাম। ফটকের দুই ধারে ৬ ইঞ্চি পরিমাণ দুইটি জানালা ছিল। রাজার কারিকরেরা আসিয়া সেই জানালার গরাদের সঙ্গে লোহার শিকল দিয়া আমার বাঁ পা বাঁধিয়া রাখিল!
শুনিলাম, রাজা না কি ইতিমধ্যে কোন্ এক সময়ে আমাকে দেখিয়া গিয়াছিলেন, আমি কিন্তু তখন তাহা টের পাই নাই। আরও শত শত নগরবাসী আমায় দেখিতে আসিয়াছিল, এবং শাস্ত্রীদিগের নিষেধ সত্ত্বেও, সিঁড়ি লাগাইয়া আমার দেহের উপর উঠিয়া ছুটাছুটি করিয়াছিল। অবশেষে আমার উপর কৃপাপরবশ হইয়া রাজা ঘোষণা করিয়া দিলেন, ভবিষ্যতে যে কেহ আমাকে ঐ ভাবে উৎপীড়ন করিবে, তাহার প্রাণবধ করিবেন। অতঃপর আমি নিষ্কৃতি পাইলাম।
যখন রাজার লোকেরা দেখিল, আর আমার পলাইবার কোনও উপায় নাই, তখন তাহারা আমার দেহের সকল বন্ধন কাটিয়া দিল। আমি উঠিয়া দাঁড়াইতে ও চলিতে সক্ষম হইলাম। আমাকে উঠিতে দেখিয়া লোকেরা যে কি পর্য্যন্ত বিস্মিত হইল, ও কিরূপ চীৎকার করিতে লাগিল, তাহা বর্ণনা করা যায় না।
যে শিকল দ্বারা আমার পা বাঁধা ছিল, তাহা প্রায় ২ ফুট লম্বা। সুতরাং অল্প অল্প বেড়াইতে ও মন্দিরে প্রবেশ করিয়া, প্রয়োজনমত বিশ্রাম ও শয়ন করিতে আমার কোনও ব্যাঘাত ঘটিত না।