বিষয়বস্তুতে চলুন

গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

দেখিতে দেখিতে তাহাদের মধ্যে একজন সেই মঞ্চে উঠিয়া, আমাকে শুনাইয়া খুব একটা প্রকাণ্ড গোছের বক্তৃতা জুড়িয়া দিল। তাহাকে দেখিলে বোধ হয়, সে ঐ দেশের একজন উঁচুদরেরই লোক হইবে। বক্তৃতার বিন্দুবিসর্গও আমি বুঝিতে পারিলাম না বটে, কিন্তু বক্তৃতা আরম্ভ করিবার আগে তিনবার যে “ল্যাংগ্রো ডেহুল স্যান্” বলিয়া চীৎকার করিয়াছিল, তাহাতেই আমার যথেষ্ট উপকার হইল। কারণ, ঐ চীৎকার শুনিবামাত্র, প্রায় পঞ্চাশজন আসিয়া, আমার দেহের বাম ভাগের সকল বন্ধন কাটিয়া দিল। তখন আমি কতকটা স্বচ্ছন্দে ডান দিকে ফিরিয়া, বক্তার দেহ ও বক্তৃতার ভাবভঙ্গী দেখিতে পারিলাম।

 বক্তা মধ্যবয়স্ক এবং তাহার অনুচর তিনজনের অপেক্ষা কিছু দীর্ঘাক্বতি। তিনজনের মধ্যে একজন বক্তার পরিচ্ছদবাহী; অপর দুইজন বক্তার পার্শ্বচর। বলিবার ভাবভঙ্গী দেখিলে, তাহাকে বক্তা বলিতেই ইচ্ছা হয় বটে। বক্তৃতায় কোথাও বা আমায় কতমতে ভয় প্রদর্শন; কোথাও আমার নিকট কত প্রকারের অঙ্গীকার; কোথাও বা আমায় অনুগ্রহ ও দয়া প্রকাশ করা হইল! আমি ত বিন্দুবিসর্গও বুঝিতে পারিলাম না; কেবল নির্ব্বাক্ হইয়া দেখিতে ও শুনিতে লাগিলাম। বক্তৃতার অবসান হইলে, আমি অল্প কথায় তাহার উত্তর দিলাম। আমার কথায়, ভাবভঙ্গীতে যতদূর পারিলাম বিনয় ও বশ্যতা প্রকাশ করিলাম; আর, আমি যে বড়ই ক্ষুধার্ত্ত, ইহা বিশেষ ভাবে জানাইবার জন্য বারংবার মুখের দিকে অঙ্গুলি দিয়া দেখাইতে লাগিলাম।

 হার্গো (পরিশেষে শিখিয়াছিলাম, উচ্চপদস্থ লোককে ঐ দেশে “হার্গো” বলিয়া থাকে) আমার অভাব বুঝিতে পারিলেন। মঞ্চ হইতে নামিয়াই তিনি আদেশ দিলেন, যে অনেকগুলা সিঁড়ি আমার গাত্রে লাগান হউক। অবিলম্বে সিঁড়িগুলা বহিয়া, প্রায় একশত জন আমার মুখের দিকে অগ্রসর হইল। তাহাদের প্রত্যেকের হাতে মাংস ও অন্যান্য খাদ্যে পূর্ণ ঝুড়ি। মাংস নানাপ্রকার প্রাণীর বলিয়াই বোধ হইল; কিন্তু কোন্‌টা কোন্ জন্তুর মাংস তাহা আস্বাদে বুঝিতে পারিলাম না। রন্ধনও বেশ ভালই হইয়াছিল। মাংসের টুক্‌রাগুলা একটা ছোট মাছির ডানার চেয়েও ছোট, কাজেই এক এক গ্রাসে সেরূপ মাংসের টুকরা দশ পনের খানি করিয়া খাইতে লাগিলাম; রুটীগুলাও দেখিতে একটা একটা মাঝারী গোছের মটরের চেয়ে বড় নহে, কাজেই রুটীও ঐ সঙ্গে পাঁচ সাত খানা করিয়া এক একবারে মুখে পুরিতে লাগিলাম। পরিবেশনও, আহারের অনুরূপে, ক্ষিপ্র হইতে লাগিল; এবং আমার শরীরের ও ক্ষুধার পরিমাণ দেখিয়া পরিবেশকগণ যথেষ্ট আনন্দ অনুভব করিতে লাগিল।

 তারপর সঙ্কেত দ্বারা জানাইলাম যে, আমার তৃষ্ণা হইয়াছে, কিছু পানীয়ের প্রয়োজন। আমার খাওয়ার পরিমাণ দেখিয়াই তাহারা বুঝিয়াছিল, অল্প আনিলে চলিবে না! বুদ্ধি করিয়া, মদের বড় একটা পিপা আমার হাতের নিকট আনিয়া দিল ও মুখ খুলিয়া দিল। আমি এক চুমুকে পিপা নিঃশেষ করিয়া দিলাম—পিপাতে আধ পাইণ্টও ছিল কি না সন্দেহ। আর একটা পিপা আনিয়া দিল; সেটাও ঐ ভাবে শেষ করিয়া, আরো একটা আনিবার জন্য ইঙ্গিত করিলাম। কিন্তু আর তাহারা আনিল না; বোধ করি তাহাদের আর ছিল না। যে মদ খাইলাম, তাহা আমাদের দেশের বার্গেণ্ডি-মদেরই মতন; আস্বাদ আরও একটু ভাল।

 আমার আহারের পরিমাণ দেখিয়া তাহারা আহ্লাদে আমার বুকের উপর নৃত্য করিতে লাগিল এবং বারংবার “হেকিনা ডেগুল্‌” বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। তারপর তাহারা পিপা দুইটা নীচে ফেলিয়া দিতে, আমাকে ইঙ্গিতে অনুরোধ করিল এবং “বোরাক্ মোভেলা” বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে বার কতক চীৎকার করিয়া, নীচে যাহারা দাঁড়াইয়াছিল তাহাদিগকে সাবধান করিয়া দিল। পিপা দুইটী যখন গড়াইতেছিল, তখন সকলেই “হেকিনা ডেগুল্” বলিয়া আবার চীৎকার করিতে লাগিল।

 বলিতে কি, যখন লোকগুলা আমার শরীরের উপর দিয়া যাতায়াত করিতেছিল, তখন এক একবার ইচ্ছা হইতেছিল যে, গোটা ৪০৷৫০কে দুই মুঠায় ধরিয়া আছাড় দিয়া, মারিয়া ফেলি! কিন্তু প্রতি বারেই সে লোভ সম্বরণ করিয়া গেলাম। এই সকল ক্ষুদ্র মানবের সাহস দেখিয়া আমি মনে মনে খুবই বিস্মিত হইতে লাগিলাম। আমার এই প্রকাণ্ড দেহ, তাহার উপর, আমার অন্ততঃ একখানি হাতও মুক্ত আছে, ইহা দেখিয়াও তাহারা যে আমার শরীরের উপর চলিতেছে ফিরিতেছে, ইহা কম সাহসের কথা নহে! কিছুক্ষণ পরে, আমার খাওয়া প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে, এমন সময় সম্রাটের নিকট হইতে একজন উচ্চপদস্থ দূত আসিয়া দেখা দিলেন।