বিষয়বস্তুতে চলুন

গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ।

১৭০১ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর প্রাতে ৬টার সময় যাত্রা করিলাম। অনুকূল বায়ুভরে সমস্ত দিন সাগরে ভাসিয়া, সন্ধ্যা ৬টার সময় একটী দ্বীপে পৌঁছিয়া সেখানে নঙ্গর ফেলিলাম। দেখিলাম, দ্বীপটি নির্জ্জন, একেবারে জনপ্রাণী হীন। তথায় আহারাদি করিয়া রাত্রি যাপন করিলাম।

 প্রাতে, সূর্য্যোদয়ের পূর্ব্বেই নিদ্রাত্যাগ করিয়া, আহারাদি সমাপন করিলাম, এবং সুর্য্যোদয় হইবামাত্র নঙ্গর তুলিয়া, পকেট্‌-কম্পাসের সাহায্যে পূর্ব্বদিন যে পথে আসিয়াছিলাম, ঠিক সেই পথ ধরিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম। কিন্তু সেদিন কোনও রূপ স্থল দেখিতে পাইলাম না। পরদিন অপরাহ্ণ প্রায় তিনটার সময়, দূরে মাস্তলের ও পালের মতন একটা কিছু দেখিতে পাইলাম। উহা যে একখানি জাহাজ তাহাতে আর সন্দেহ রহিল না। আমি কতই উচ্চ চীৎকার করিলাম; কিন্তু কোনও প্রত্যুত্তর পাইলাম না। প্রাণপণ করিয়া নৌকা চালাইতে লাগিলাম। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে জাহাজের লোকেরা আমার নৌকা দেখিতে পাইয়া নিশান উড়াইয়া দিল, ও একটা তোপধ্বনি করিল। আবার স্বদেশে ফিরিব, আবার প্রিয়জনবর্গের মুখ দেখিতে পাইব—এই ভাবিয়া আমার যে কি আনন্দ হইতে লাগিল, তাহা বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। ২৬শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার সময় আমার নৌকা জাহাজের পার্শ্ববর্তী হইল। জাহাজ খানিতে ইংলণ্ডের পতাকা উড়িতেছে দেখিয়া, আমার আনন্দ যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিল।

 গরু ও মেষগুলিকে কোটের পকেটে লইয়া এবং খাদ্য-সামগ্রীগুলি জাহাজে তুলাইবার বন্দোবস্ত করিয়া, আমি জাহাজে উঠিয়া আসিলাম। সেখানি বাণিজ্যের জাহাজ; জাপান হইতে ফিরিতেছে; কাপ্তেন যেমন কার্য্যপটু, তেমনি বিনয়ী ও মিষ্টস্বভাব। জাহাজে সর্ব্বশুদ্ধ প্রায় পঞ্চাশজন লোক ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে তাঁহাদের মধ্যে আমার একজন পূর্ব্বপরিচিত বন্ধুও ছিলেন; তিনি কাপ্তেনের নিকট আমার চরিত্রের প্রশংসা করিলেন।

 কাপ্তেন সদয়ভাবে অভ্যর্থনা করিয়া, আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি কোথা হইতে আসিলাম ও কোথায় যাইব? উত্তর শুনিয়া সকলেই ভাবিলেন, আমার মাথা খারাপ হইয়া গিয়াছে, আমি উন্মত্তের ন্যায় প্রলাপ বকিতেছি! তাঁহাদের মনের ভাব বুঝিতে পারিয়া, আমি পকেট হইতে গরু ও ভেড়া বাহির করিয়া দেখাইলাম। তখন তাঁহাদের অবিশ্বাস দূর হইল ও বিস্ময় জন্মিল। ব্লেফুস্‌কুরাজের পূর্ণ-দেহের ছবি, এবং তাঁহার প্রদত্ত মুদ্রাগুলি, ও সেই দেশ হইতে নূতন নূতন আর যাহা কিছু আনিয়াছিলাম, একে একে সকলই কাপ্তেনকে দেখাইলাম; অধিকন্তু ৫০টী মণিব্যাগ হইতে ২টী তাঁহাকে উপহার দিলাম; এবং ইংলণ্ডে পৌঁছিলে, এক একটি গরু ও মেষ উপহার দিব বলিয়া অঙ্গীকার করিলাম।

পথে আমাদের কোনও রূপ বিঘ্ন বা বিপদ্ ঘটে নাই; কেবল দুঃখের মধ্যে, জাহাজের ইন্দুরগুলা আমার পকেট হইতে একটা মস্ত ষাঁড়কে ধরিয়া খাইয়া ফেলিয়াছিল!

 ১৭০২ সালের ১৩ই এপ্রিল তারিখে আমি পুনরায় ইংলণ্ডে ফিরিয়া আসিলাম। ব্লেফুস্‌কুর গরু ও ভেড়া দেখাইয়া আমি দেশে কত অর্থই না উপার্জ্জন করিলাম! অবশেষে ৯০০০ হাজার টাকায় সেগুলি বিক্রয় করিলাম! শুনিতে পাই, মেষগুলির শাবক-সংখ্যার ও বংশের খুবই বৃদ্ধি হইয়াছে; আমাদের দেশের পক্ষে মঙ্গলের কথা— কারণ, তাহাদের গায়ের পশম অতি উৎকৃষ্ট।

 স্ত্রী-পুত্র-কন্যা লইয়া দুই মাস সংসার করিয়াই, আমার আবার বিদেশ যাইবার বাসনা বলবতী হইয়া উঠিল, কিছুতেই দমন করিতে পারিলাম না। কিন্তু সে এত কথা, যে এই ক্ষুদ্র পুস্তকে বলিবার স্থান নাই; পরে আর একখানি পুস্তকে তাহা বর্ণনা করিতে চেষ্টা করিব।