বিষয়বস্তুতে চলুন

গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/দশম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দশম পরিচ্ছেদ।

প্রথমেই স্থির করিলাম যে, ব্লেফুস্‌কু সাম্রাজ্যের কোন লোকই যখন এ পর্য্যন্ত আমায় দেখে নাই, তখন এরূপ সাবধানে থাকিব, যেন কেহ আমায় দেখিতে না পায়; কারণ আমায় সে রাজ্যে দেখিলে, তাহারা নিশ্চিতই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করিবে। অথচ রাজ্যের অবস্থা, রণপোতের অবস্থান, ইত্যাদি না দেখিলেও নয়।

 দুই রাজ্যের মধ্যে ৮০০ গজ প্রস্থ একটা সমুদ্র মাত্র ব্যবধান। অভিজ্ঞ নাবিকদিগকে ডাকাইয়া, তাহার গভীরতা কত জিজ্ঞাসা করিয়া লইলাম। জানিলাম, জোয়ারের সময় মধ্যস্থলের গভীরতা প্রায় ৪ হাত; অন্য অন্য স্থানে ২।৩ হাতের অধিক নহে! সৌভাগ্যের বিষয়, স্পাই গ্লাস্‌টী হস্তান্তর হইতে দিই নাই। ভাবিলাম, আজ এইটীর সাহায্যে সম্রাটের নিকট বিশেষ বাহাদুরী লইতে হইবে। এই ভাবিয়া গ্লাস্‌টী লইয়া, একদিন একটা পাহাড়ের আড়ালে বসিয়া, শত্রুদের দেশের ও রণপোতের অবস্থা যতদূর জানা সম্ভব, তাহা জানিয়া ও বুঝিয়া লইলাম।

 আমি গৃহে ফিরিয়াই আদেশ দিলাম যে, সে দেশের পক্ষে যতদূর সম্ভব মোটা রশারশি, লোহার দাণ্ডা ইত্যাদি আমাকে যথেষ্ট পরিমাণে দেওয়া হয়। আমি ঘুঁড়ীর মাঞ্জা-করা সুতার মতন মোটা দড়ি ও সেলাইয়ের সূচের মতন মোটা দাণ্ডা পাইলাম। সূতা তিনখাই করিলাম; ২।৩টা দাণ্ডাকে একত্র মুচড়াইয়া এক একটা করিলাম, ও সেই দাণ্ডার মুখগুলা মাছধরা বড়্‌সি বা হুকের মতন বাঁকাইয়া লইলাম।

 এইরূপ পঞ্চাশটী ‘হুকে’ পঞ্চাশগাছি রশি পরাইয়া, আমি সমুদ্রতীরে চলিলাম। সেখানে কোট, জুতা, মোজা ছাড়িয়া জলে নামিলাম। তখনও জোয়ার আসিতে আধ ঘণ্টা বিলম্ব ছিল। আমি যথাসম্ভব সত্বর চলিয়া, মধ্যস্থলে প্রায় ৩০ গজ পরিমাণ জলে সাঁতার দিয়া, ওপারে গিয়া পৌঁছিলাম। তারপর শত্রুপক্ষের নৌ-বাহিনীর নিকট আসিতে আমার অধিক বিলম্ব হইল না।

 আমাকে দেখিয়া শত্রুদল এমন ভয় পাইল যে, যে যেমনে পারিল জাহাজ হইতে লাফাইয়া সাঁতার দিয়া তীরে পলায়ন করিল। দেখিতে দেখিতে তীরে প্রায় ৩০ সহস্র লোক একত্র হইল। আমি ততক্ষণে প্রত্যেক জাহাজে একটী করিয়া হুক লাগাইতে লাগিলাম। শত্রুপক্ষ অনবরত বাণ বর্ষণ করিতে লাগিল; তাহাতে কাজের যথেষ্টই ব্যাঘাত হইয়াছিল। চোখে চসমা না থাকিলে, সে দিনের বাণবর্ষণের ফলে চক্ষু দুটী নিশ্চিতই নষ্ট হইত।

 হুক্‌ লাগান হইলে, আমি সবগুলি জাহাজ একসঙ্গে টানিতে চেষ্টা করিলাম। কিন্তু নঙ্গরে বদ্ধ ছিল বলিয়া একখানিও নড়িল না। তথন পকেট হইতে ছুরি বাহির করিয়া, একে একে প্রত্যেক জাহাজের নঙ্গরের দড়ি কাটিয়া ফেলিলাম। তারপর ৫০গাছি রশি মুঠায়
৪ নং
৫০ গাছি রশি ধরিয়া জাহাজ ৫০ খানি টানিয়া আনিলাম।
ধরিয়া, অবলীলাক্রমে জাহাজ পঞ্চাশখানি টানিয়া লিলিপুট্‌ দ্বীপের দিকে অগ্রসর হইলাম।

 এতক্ষণ পর্যন্ত ব্লেফুস্‌কুবাসিগণ আমার অভিপ্রায় না বুঝিতে পারিয়াও, আমাকে শত্রুজ্ঞানে বাণবিদ্ধ করিতেছিল। এক্ষণে তাদের যুদ্ধের সার অবলম্বন—জাহাজ পঞ্চাশখানিকে আমার পিছনে পিছনে চলিয়া আসিতে দেখিয়া, তাহাদের যে ভীষণ ক্রন্দনের রোল উঠিল, সেরূপ আমি জীবনে আর কখনও শুনি নাই।

 কিছু দূর চলিয়া আসিয়া যখন বুঝিলাম, শত্রুর তীর আর আমার গায়ে লাগিবে না, তখন আমি দাঁড়াইয়া একে একে তীরগুলি দেহ হইতে তুলিয়া ফেলিলাম এবং লিলিপুটবাসীরা যে মলম মাখাইয়া দিত, সেই মলম মাখিয়া জ্বালা নিবারণ করিলাম। তারপর, প্রায় একঘণ্টা অপেক্ষা করিয়া, জোয়ারের বেগ একটু কমিলে, শত্রুর জাহাজগুলি লইয়া লিলিপুটের বন্দরে পৌছিলাম।

 অর্দ্ধচন্দ্রাকারে পঞ্চাশখানি জাহাজ আসিতেছে, অথচ (আমি বুক পর্য্যন্ত জলে ডুবাইয়া আছি বলিয়া) আমায় দেখা যাইতেছিল না, ইহাতে সম্রাট্ ও মন্ত্রীবর্গ বড়ই ভীত হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, আমি হয় ত ডুবিয়াই গিয়াছি ও শত্রু-তরী রণোৎসাহে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে অগ্রসর হইতেছে! কিন্তু আমায় দেখিতে পাইয়াই, তাঁহাদের সকল সন্দেহ ও ভয়ের অবসান হইল। আমিও নিকটবর্ত্তী হইয়া, “লিলিপুটের মহামহিম সম্রাটের জয় হউক” বলিয়া অভিবাদন করিলাম!

সম্রাট্ কত আনন্দ ও কত সমাদর করিয়া যে আমার অভ্যর্থনা করিলেন, তাহা বলিতে পারি না। তদ্দণ্ডেই আমায় সর্ব্বাপেক্ষা গৌরবের ও সম্মানের উপাধিতে ভূষিত করিয়া, আমার উপর তাঁহার শ্রদ্ধা প্রকাশ করিলেন।

 এইরূপে শত্রুপক্ষকে খর্ব্ব করিয়াও সম্রাটের আকাঙ্ক্ষা মিটিল না! তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন যে, আমি আর একবার ব্লেফুস্‌কুরাজ্যে গিয়া, তাহাদের যুদ্ধের যাবতীয় আয়োজন নষ্ট করিয়া দিয়া আসি। তাহা হইলে তিনি ব্লেফুস্‌কুরাজ্যের অধীশ্বর হইয়া, পলাতক বিদ্রোহী প্রজাগণকে নিধন করিতে পারেন, ও পৃথিবীর একচ্ছত্র সম্রাট্ হইয়া, সকলকে ডিমের সরু দিকটা ভাঙ্গিয়া খাইতে বাধ্য করিতে পারেন! তাহা হইলেই তাঁহার জীবনের সকল সাধ পূর্ণ হয়! কিন্তু এ ভাবে একটা স্বাধীন জাতিকে স্বাধীনতাধন হইতে চিরবঞ্চিত করা আমার নিকট গর্হিত বলিয়া বোধ হইল; সেজন্য আমি সম্রাটের অনুরোধ রক্ষা করিতে অসম্মতি জানাইলাম। ইহাতে একদিকে সম্রাট্ আন্তরিক ক্রোধ করিলেন এবং কতকগুলি সভাসদও আমার প্রতি সাতিশয় বিরূপ হইল বটে; কিন্তু অপর দিকে আমার উচ্চ মনের পরিচয় পাইয়া, অনেকগুলি সভাসদই আমার প্রতি বিশেষ সন্তুষ্ট ও প্রীত হইলেন।

 ব্লেফুস্‌কু-রাজ দূত পাঠাইয়া সন্ধিস্থাপন করিলেন। আমার যত দূর সাধ্য, সন্ধিস্থাপন কার্য্যে দূতদিগকে সাহায্য করিলাম; তাঁহারাও আমার পরিচয় পাইয়া, নিকটে আসিয়া মিষ্টালাপ করিয়া, আমাকে তাঁহাদের রাজ্যে গমন করিবার জন্য সম্রাটের নামে নিমন্ত্রণ করিলেন। আমি যে দূতদিগের প্রতি সদয় ব্যবহার করিয়াছি ও তাঁহাদের দেশে যাইবার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়াছি, এ সংবাদ নানাপ্রকারে অতিরঞ্জিত হইয়া লিলিপুট্‌ সম্রাটের কর্ণগোচর হইল। ইহাতে আমার প্রতি তাঁহার অসন্তোষের ভাব আরও বাড়িয়া গেল। রাজসভা যে কতদূর কুটিল স্থান আমার বেশ জ্ঞান জন্মিতে লাগিল। যাহা হউক, আমি ব্লেফুস্‌কু রাজ্যে যাইবার জন্য সম্রাটের অনুমতি প্রার্থনা করিতে আসিলাম; সম্রাট্ অতি অনিচ্ছার সহিত ও বড়ই গম্ভীর ভাবে অনুমতি দিলেন। আমার শত্রুগণ এই বিষয় লইয়া আমার প্রাণনাশের জন্য খুবই চক্রান্ত করিয়াছিল, কিন্তু সে সকলই সৌভাগ্যক্রমে আমার হিতের জন্য হইল।