গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।
মন্ত্রী মহাশয়কে বিদায় দিয়াই আমি আমার কর্তব্য স্থির করিয়া ফেলিলাম যে, তিন দিন উত্তীর্ণ হইবার পূর্ব্বেই আমি ব্লেফুস্কুরাজ্যে প্রস্থান করিব। সম্রাটের অনুমতি একবার লওয়া আছে; নূতন করিয়া লইবার প্রয়োজন দেখিলাম না। মন্ত্রীদের মধ্যে কেহই ভাবে নাই যে, তাহাদের গুপ্ত পরামর্শ আমার নিকট ব্যক্ত হইতে পারে। কাজেই কেহ কোনও রূপ সন্দেহ করিল না।
আমি বন্দরে গিয়াই, সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ জাহাজ খানিতে আমার ব্যবহারের উপযোগী দ্রব্যাদি রাখিয়া, টানিয়া লইয়া যাইতে আরম্ভ করিলাম। এই ভাবে কোথাও হাঁটিয়া, কোথাও সাঁতার দিয়া ব্লেফুস্কু বন্দরে পৌছিলাম।
আমি ব্লেফুস্কু-রাজ্যের ক্ষতি করিয়াছিলাম, কিন্তু সে রাজ্যের সকলেই যথেষ্ট আদরের সহিত আমার অভ্যর্থনা করিল। যে দুইজন আমাকে বন্দর হইতে রাজধানী পর্য্যন্ত পথ দেখাইয়া লইয়া যাইতে স্বীকৃত হইল, তাহাদিগকে আমি দুই হাতের উপর দাঁড় করাইয়া লইয়া চলিলাম, তাহারা আমায় পথ বলিয়া দিতে লাগিল। প্রাসাদ হইতে আন্দাজ দুই শত গজ দূর থাকিতে, আমি তাহাদিগকে নামাইয়া দিলাম। তাহারা সম্রাটকে আমার আগমন সংবাদ দিতে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা পরে তাহারা এই সংবাদ লইয়া আসিল যে, সম্রাট্ স্বয়ং মহিষী ও সভাসদগণসহ আমার অভ্যর্থনা করিতে আসিতেছেন। এই শুনিয়া আমি একশত গজ অগ্রসর হইলাম। আমায় দেখিয়া সম্রাট্ বা সভাসদ্গণের কেহ, এমন কি, মহিষী পর্য্যন্ত বিন্দুমাত্র ভীত বা বিচলিত হইলেন না, ইহা দেখিয়া আমি কিঞ্চিৎ বিস্মিত হইলাম। আমি মাটীতে শুইয়া সম্রাটের ও মহিষীর কর-চুম্বন করিলাম; এবং যথেষ্ট বিনয়ের সহিত বলিলাম, “আমার প্রভুর অনুমতি লইয়া, আপনার সেবা করিয়া ধন্য হইবার জন্যই আমি এ দেশে আসিয়াছি।” তাঁহাদিগকে জানিতে দিলাম না যে, আমি সম্রাটের বিরাগভাজন হইয়াছি, বা, সে দেশে আর ফিরিয়া না যাইতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিয়াছি।
সম্রাট আদর-যত্ন করিতে ত্রুটি করিলেন না। কিন্তু আমার ভাগ্যবশে সেখানে বাসস্থান মিলিল না, কম্বল জড়াইয়া যত্র-তত্র ভূমি-শয্যায় রাত্রি কাটাইতে হইল।
একদিন সমুদ্রতীরে বেড়াইতেছি, এমন সময় দেখিলাম, দূরে সমুদ্রের উপর যেন একখান নৌকা, উল্টান অবস্থায় ভাসিতেছে। জিনিসটা কি, ভাল করিয়া দেখার ঔৎসুক্য জন্মিল। জুতা মোজা খুলিয়া ফেলিয়া, দুই তিন শত গজ জল ভাঙ্গিয়া হাঁটিয়া গিয়া দেখি, বাস্তবিক সেখানা নৌকাই বটে। বোধ হইল, কোনও জাহাজ হইতে ঝড়ের বেগে সমুদ্রে পড়িয়া গিয়া থাকিবে। এই দেখিয়া আমার মনে যে কত কি আশার ছবি উঠিতে লাগিল, তাহা আর কি বলিব। আমি তৎক্ষণাৎ সম্রাটের নিকট কুড়ি খানি বৃহৎ জাহাজ ও তিন সহস্র নাবিকের সাহায্য চাহিলাম। তারপর সকলের সাহায্যে, প্রাণপণ করিয়া নৌকাখানিকে তীরের নিকটে আনিয়া উল্টাইয়া লইলাম। তখন দেখিলাম, নৌকার বিশেষ কোনও ক্ষতি হয় নাই।
এই অপরূপ যান দেখিবার জন্য লোকের কি ভিড়, ও কি আগ্রহ! আমি দিবারাত্রি পরিশ্রম করিয়া, নৌকাখানাকে সমুদ্রের উপযোগী করিবার জন্য, তাহার যে কিছু সরঞ্জামের প্রয়োজন, সকলই প্রস্তুত করিলাম। দাঁড়, হাল, মাস্তুল, পাল, আচ্ছাদন, নঙ্গর, রশারশি— প্রভৃতির কিছুই বাকী রহিল না। এমন কি, মাস্তলের উপর উড়াইবার জন্য নিশানটি পর্য্যন্ত ভুলিলাম না। সম্রাট্কে বুঝাইয়া বলিলাম, আমার মুক্তির জন্যই ভগবান্ এই নৌকাখানি তাঁহার রাজ্যে পাঠাইয়া দিয়াছেন। তিনি আমাকে বিশেষ দয়া করিয়া রাজ্যের যে কোনও প্রজার নিকট হইতে, যে কোনও সাহায্যের প্রয়োজন, তাহা লইতে অনুমতি দিলেন। রাজাদেশেও বটে এবং আমার প্রতি স্বাভাবিক অনুরাগবশেও বটে, সকলেই আমাকে স্বেচ্ছায় ও মুক্তহস্তে সাহায্য প্রদান করিতে লাগিল। এরূপ ভাবে কার্য্য করিয়াও আমার নৌকাখানিকে কার্য্যের উপযোগী করিয়া লইতে প্রায় এক মাস কাল লাগিল।
উদ্যোগ সম্পূর্ণ হইলে, আমি যথারীতি অভিবাদন ও কর-চুম্বন করিয়া সম্রাটের নিকট বিদায় লইলাম। সম্রাট্ বিদায়-চিহ্ন স্বরূপ আমাকে তাঁহার দেশের ২০০ স্বর্ণ মুদ্রায় পূর্ণ এরূপ পঞ্চাশটি মণিব্যাগ উপহার দিলেন, এবং অনুমতি দিলেন যে, আমার আহারের জন্য যত খাা লওয়া প্রয়োজন হইবে, তাহা লইতে পারিব। আর যে কোনও পশুপক্ষী যত ইচ্ছা লইতে পারিব। কিন্তু একথা আমায় বিশেষভাবে বলিয়া দিলেন যে, একটা প্রজাকেও যেন আমি সঙ্গে না লই; এমন কি, স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া কোনও প্রজা আমার সহিত যাইতে ইচ্ছুক থাকিলেও, আমি যেন তাহাকে না লই। সম্রাটের এই নিষেধ উক্তিতে আমি একটু দুঃখিত হইলাম, কারণ অন্ততঃ কয়েক জনকেও লইয়া যাইতে আমার নিতান্তই বাসনা ছিল। যাহা হউক সম্রাটের নিষেধের অমান্য করিলাম না। কেবলমাত্র ৬টী গাভী, ২টী ষাঁড় আর কতকগুলি মেষ ও মেষী সঙ্গে লইলাম। আহারের জন্য—চারিশত পাচকে মিলিয়া যতটা মাংস রন্ধন করিয়া দিতে পারিল তাহাই লইলাম; এবং অপক্ব অবস্থায়, একশত ষাঁড় ও তিনশত মেষের মাংস এবং প্রচুর পরিমাণে রুটী ও মদ দ্বারা নৌকা বোঝাই করিয়া লইলাম।