বিষয়বস্তুতে চলুন

গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

লোকালয় পাইবার আশায় আমি আরও খানিক হাঁটিলাম। অবশেষে আর হাঁটিতে পারিলাম না। আমি অবসন্ন হইয়া ভূমিতে শুইয়া পড়িলাম! অল্পক্ষণ মধ্যেই গাঢ় নিদ্রা আসিয়া আমাকে আচ্ছন্ন করিল; এমন গাঢ় নিদ্রা বুঝি বা জন্মে কখনও হয় নাই। যখন নিদ্রা ভঙ্গ হইল, তখন সূর্য্যোদয় হইয়াছে। আমি উঠিবার চেষ্টা করিলাম; কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, উঠিতে পারিলাম না। আমি দেখিলাম, আমার হাত ও পা পার্শ্বের মাটিতে দৃঢ়ভাবে বদ্ধ রহিয়াছে। আর আমার লম্বা ঘন চুলগুলিও মাথার নীচের মাটির সঙ্গে বদ্ধ রহিয়াছে। আরও দেখিলাম, বগল হইতে আরম্ভ করিয়া উরু পর্য্যন্ত আমার সমস্ত দেহটা ক্ষীণ রজ্জুর সাহায্যে এদিক হইতে ওদিক পর্য্যন্ত আটকান। আমি চিৎ হইয়া শুইয়া ছিলাম; কাজেই কোন পাশে ফিরিতে পারিলাম না; বাধ্য হইয়া আকাশের দিকেই তাকাইয়া থাকিতে হইল। এদিকে বেলা বাড়িতেছে, সূর্য্যের তেজ প্রখর হইতেছে। আমার ভয়ানক কষ্ট হইতে লাগিল। তখন চারিদিকে মহাকোলাহল হইতেছিল; কিন্তু যে ভাবে শুইয়াছিলাম তাহাতে কোলাহলের কারণ কি, তাহা দেখিতে পাইলাম না। ক্ষণকাল পরে
১ নং
গলিভারের সর্ব্বাঙ্গ রজ্জুর দ্বারা বদ্ধ।
বোধ হইতে লাগিল, আমার বাম পায়ের উপর কি একটা চলিতেছে। সেটা বরাবর বুকের উপর দিয়া হাঁটিয়া আসিয়া, আমার চিবুকের কাছে দাঁড়াইল। তখন যতদূর পারিলাম ঘাড় তুলিয়া দেখি, সেটা একটা মানুষের মতনই জীব; কিন্তু ৬ ইঞ্চিও উচ্চ কি না সন্দেহ! তাহার হাতে তীর ও ধনু, আর পীঠে তূণীর। তাহার সঙ্গে সঙ্গে ঐরূপ প্রায় আরও ৪০ টি প্রাণী আমার দেহ বহিয়া আসিতে লাগিল।

 আমার ত বিস্ময়ের সীমা রহিল না। আমি এমন চীৎকারধ্বনি করিয়া উঠিলাম, যে ভয়ে সকলেই পলায়ন করিল। আমি পরে জানিতে পারিয়াছিলাম, পলায়নের সময়ে কেহ কেহ আমার বুক হইতে মাটিতে লাফাইয়া পড়িতে গিয়া গুরুতর আঘাত পাইয়াছিল! যাহা হউক, তাহারা আবার ফিরিয়া আসিল এবং তাহাদের মধ্যে একজন সাহস করিয়া অগ্রসর হইয়া, আমার মুখখানা নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিল। তাহার ভঙ্গী দেখিয়া আমার বোধ হইল, তাহার মনে বিস্ময় ও প্রশংসার ভাব জাগিয়া উঠিয়াছে। সে যত দূর সম্ভব উচ্চৈঃস্বরে “হেকিনা ডেগুল্” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। আর সকলে তাহার অনুকরণ করিয়া “হেকিনা ডেগুল্” বলিয়া শব্দ করিতে আরম্ভ করিল। কথা গুলির যে তাৎপর্য্য কি, তখন কিছুই বুঝিতে পারিলাম না।

 যেমন শায়িত অবস্থায় ছিলাম, এতক্ষণ সেইরূপই থাকিতে হইল, ইহাতে যে আমার খুবই যন্ত্রণা হইতেছিল, তাহা বলাই বাহুল্য। এখন এই বন্ধন-দশা হইতে মুক্ত হইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। যে সব দড়ি-দড়া ও খোঁটার সাহায্যে আমার বাম হাত মাটীতে বন্ধ ছিল, প্রথমে সেইগুলি ছিঁড়িয়া ও উপড়াইয়া ফেলিলাম। তারপর আর একবার একটু টানাটানির ফলে কিছু আঘাত লাগিল বটে, তথাপি মাথার বাম অংশের চুলগুলা বন্ধন হইতে মুক্ত হইল। এই ভাবে আমি যেন মাথাটা ইঞ্চি দুই ঘুরাইতে ফিরাইতে সমর্থ হইলাম।

 এইবার তাহাদের মধ্যে কয়েকটাকে ধরিবার চেষ্টা করিলাম; সকলেই পলাইয়া গেল, একটিকেও ধরিতে পারিলাম না। ইহাতে তাহাদের মধ্যে মহা আনন্দের কোলাহল পড়িয়া গেল! কোলাহল থামিয়া গেলে, শুনিলাম, একজন চীৎকার করিয়া বলিল, “টল্‌গো ফন্যাক্।” সঙ্গে সঙ্গে প্রায় একশতটা তীর আমার বাম অঙ্গে আসিয়া পড়িল, ঠিক যেন এক একটা ছূঁচ বিঁধিতে লাগিল! তা ছাড়া তাহারা শূন্যেও অসংখ্য তীর ছুড়িতে লাগিল। তাহার মধ্যে অনেক গুলা হয় ত আমার গায়েও পড়িয়া থাকিবে, আমি টের পাই নাই; কতকগুলা আমার মুখের উপর পড়িতে লাগিল; দেখিয়া, আমি বাম হাত দিয়া মুখ ঢাকিয়া রাখিলাম।

 এই বাণ-বৃষ্টির পর আমার যন্ত্রণার বৃদ্ধি হইল; তখন মুক্ত হইবার জন্য আর একবার চেষ্টা করিলাম। ফলে, প্রথমবারের অপেক্ষা ভীষণতর বাণবৃষ্টি আর একবার হইল! বেশীর ভাগ, কয়েকজন বর্শা আনিয়া আমার পাশে খুঁচাইতে চেষ্টা করিল। সৌভাগ্যের কথা যে, মোটা চামড়ার একটা কোট গায়ে পরা ছিল, সেজন্য বর্শার আঘাত লাগিল না।

 তখন ভাবিলাম, এইভাবে রাত্রি পর্য্যন্ত চুপ করিয়া শুইয়া থাকাই সর্ব্বাপেক্ষা নিরাপদ; বাম হস্ত ত মুক্ত থাকিল,; রাত্রি হইলে, অন্ধকারের সুযোগে, সহজেই নিজকে সম্পূর্ণ মুক্ত করিয়া লইতে পারিব। একবার মুক্তি পাইলে, এদেশের লোকদিগকে ভয় করিবার বিশেষ কোনও কারণ থাকিবে না; কেন না, যাহাকে নমুনাস্বরূপ দেখিলাম, সকলেই যদি উহারই মত হয়, তবে ওরূপ সহস্রটাও একসঙ্গে আসিলে আমার কিছুই করিতে পারিবে না,—মনে মনে এ ভরসা খুবই ছিল।

 যখন লোকগুলা দেখিল, আমি নিশ্চেষ্ট ভাবে পড়িয়া আছি, তখন তাহারা আর আমাকে উত্যক্ত করিল না। কিন্তু আমার চারিপাশে যেরূপ কলরব হইতে লাগিল, তাহা হইতে অনুমান করিলাম, বহুসংখ্যক লোকই সমবেত হইয়াছে। যেখানে আমি শুইয়াছিলাম, সেখান হইতে আন্দাজ ৪ ফুট দূরে, আমার ডান কাণের খুবই কাছে, ঘণ্টা খানেক ধরিয়া খটাখট্ শব্দ চলিতে লাগিল; বোধ হইতে লাগিল, যেন কত লোকই কাজ করিতেছে। ব্যাপারটা কি, দেখিবার জন্য কৌতূহল হইল। তখন দড়াদড়ি ও খোঁটা সত্ত্বেও যতখানি পারিলাম, মাথাটা ফিরাইয়া দেখি, মাটি হইতে এক হাত উঁচুতে একটা মঞ্চ খাটান হইয়াছে। সে মঞ্চে তাহাদের মত চার জন লোকের দাঁড়াইবার স্থান সংকুলান হয়, আর সেই মঞ্চে উঠিবার জন্য ২৷৩ টা সিঁড়িও লাগান হইয়াছে।