গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/নবম পরিচ্ছেদ
নবম পরিচ্ছেদ।
পাঠকের স্মরণ আছে, আমার মুক্তির সন্ধিপত্রের একটা সর্ত্ত অনুসারে লিলিপুট্ রাজ্যকে ব্লেফুস্কু রাজ্যের অধিপতির আক্রমণ হইতে রক্ষা করিতে হইবে। কিন্তু যুদ্ধের কারণ ইত্যাদি সম্বন্ধে তখনও পর্য্যন্ত আমি কিছু মাত্র জানিতাম না।
আমার মুক্তি পাইবার প্রায় ১৪।১৫ দিন পরে, একদিন প্রাতঃকালে প্রধান মন্ত্রী মহাশয় সহসা আমার আবাসস্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন; এবং যুদ্ধের কারণ ইত্যাদি সমস্ত ব্যাপার আমায় বুঝাইয়া বলিলেন। আমি দাঁড়াইয়া থাকিলে, তাঁহার বলার অসুবিধা হইবে ভাবিয়া বলিলাম, “আমি শুইয়া পড়ি, আমার কাণের কাছে বলুন!” তিনি বলিলেন, “না, তাহা অপেক্ষা আপনি আমায় হাতে করিয়া তুলিয়া ধরুন।” আমি তাহাই করিলাম। তিনি বলিতে লাগিলেন:—
“দেখুন, আমাদের—দেশের শত্রু ও বাহিরের শত্রু দুই-ই আছে। প্রথমে আপনাকে দেশের শত্রুদের কথা বলি। আমাদের দেশে দুই দল লোক আছে, একদল উঁচুগোড়ালি জুতা পরে, তাহাদের নাম ‘ট্র্যামেক্স্যান’; আর একদল নীচুগোড়ালি জুতা পরে, তাহাদের নাম ‘স্যামেকস্যান্।’ প্রথম দলের লোকেরা আইনের বশীভূত থাকিয়া রাজ্যশাসন কার্য্যে সম্রাট্কে সাহায্য করিতে সর্ব্বদাই উৎসুক; কিন্তু সম্রাট্ কেবলমাত্র দ্বিতীয় দল হইতে মন্ত্রী ও কর্ম্মচারী নিযুক্ত করেন। এই লইয়া দুই দলে এমন বিষম বিদ্বেষ, যে তাহারা পরস্পরের সহিত পানাহার করে না, এমন কি কথাও কহে না।
রাজ্যের এই এক মহা বিপদ। তার উপর ব্লেফুস্কু রাজ্যের অধিপতি আমাদের লিলিপুট্ সাম্রাজ্য আক্রমণ করিবেন, তাহার উদ্যোগ করিতেছেন। সে যুদ্ধের ইতিহাস বলি শুনুন।
সৃষ্টির প্রারম্ভ অবধি লোকে যখন ডিম খায়, তখন মোটা দিক্টাই ভাঙ্গে—ইহাই চিরন্তন প্রথা। কিন্তু আমাদের বর্ত্তমান সম্রাটের পিতামহ যখন বালক ছিলেন, তখন এক দিন ডিম খাইবার জন্য মোটা দিকটা কাটিতে গিয়া, হাতের একটা আঙ্গুল কাটিয়া ফেলেন। সেই ঘটনার পরেই, তাঁহার পিতা কঠোর শাস্তির ভয় দেখাইয়া রাজ্যমধ্যে আদেশ প্রচার করিলেন যে, ভবিষ্যতে আর কেহ ডিমের মোটা দিক ভাঙ্গিতে পাইবে না, সকলকেই সরু দিকটা ভাঙ্গিতে হইবে। এই আইনে প্রজাবৃন্দ বড়ই অসন্তুষ্ট হইল। তদবধি এই আইন লইয়াই রাজ্যমধ্যে ছয় বার ঘোর বিদ্রোহানল জ্বলিয়া উঠিয়াছে। এক বিদ্রোহে একজন সম্রাট্ মারা পড়িয়াছেন, আর এক বিদ্রোহে একজন সম্রাট্ সিংহাসন-চ্যুত হইয়াছেন! বিদ্রোহী দল ব্লেফুস্কু-সম্রাটের নিকট হইতে সবিশেষ সাহায্য পায়; তাহাতেই তাহাদের এরূপ স্পর্দ্ধা। কত বিদ্রোহী যে তাঁহার রাজ্যে পলায়ন করিয়া প্রাণ বাঁচাইয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই; তথাপি, ধরা পড়িয়া প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছে, এরূপ বিদ্রোহীর সংখ্যাও একাল পর্য্যন্ত এগার হাজারের কম হইবে না! যাহা হউক, এই সকল পলাতক বিদ্রোহীর সাহায্য ও পরামর্শ পাইয়া, ব্লেফুস্কুরাজ উৎসাহের সহিত বিপুল নৌযুদ্ধের উদ্যোগ করিতেছেন। এ পর্য্যন্ত নৌযুদ্ধে আমাদের ৪০ খানি বৃহৎ রণপোত ও বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোত নষ্ট হইয়াছে, আর নাবিক ও সৈনিক লইয়া, মৃতের সংখ্যাও প্রায় ৩০ সহস্র হইবে। এবারে তাহারা যেরূপ বিরাট রণোদ্যোগ করিতেছে, না জানি, আমাদের রাজ্যের কি দশা হয়! সম্রাটের বিশেষ ভরসা আছে, আপনার যেরূপ বুদ্ধি ও বলবীর্য্য, তাহাতে, আপনি শত্রুপক্ষের রণপোতগুলির ধ্বংসসাধনে মনোযোগী হইলে, এ রাজ্যের আর কোনও বিপদই থাকিবে না।”
আমি প্রধান মন্ত্রী মহাশয়কে বিশেষরূপ ভরসা দিয়া ও সম্রাটকে আশ্বস্ত হইতে অনুরোধ করিয়া, মন্ত্রীমহাশয়কে বিদায় দিলাম; এবং ব্লেফুস্কু রাজ্যের সম্বন্ধে চিন্তা করিতে বসিলাম।