বিষয়বস্তুতে চলুন

গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

 দাঁড়াইতে পাইয়া প্রথমেই আমি একবার চারিদিকে তাকাইলাম। নগরটির দৃশ্য বড়ই মনোরন; চারিদিক এমন পরিষ্কৃত ও পরিচ্ছন্ন যে বোধ হইল সহরটী শুধু বাগানেই ভরা,—আর প্রত্যেক বাগান যেন এক একটি ফুলের কেয়ারী! মধ্যে মধ্যে বন জঙ্গলও ছিল; সর্ব্বাপেক্ষা উচ্চ যে গাছ, তাহা ৭ ফুটের কম নহে। রঙ্গমঞ্চের চিত্রপটে কোনও নগরের ছবি আঁকা থাকিলে যেরূপ দেখায়, এ নগরও অনেকটা সেইরূপ।

 কিছুক্ষণ মন্দির মধ্যে থাকিয়া হাঁফ লাগিতে লাগিল, বাতাসের জন্য বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইলাম। তখনই রাজাকে ঘোড়ায় চড়িয়া আমার দিকে আসিতে দেখিলাম। পর্ব্বত-পরিমাণ একটা দেহ তাহার সম্মুখে বিচরণ করিতে দেখিয়া, ঘোড়া হঠাৎ ভয়ে চঞ্চল হইয়া উঠিল। রাজা অশ্বারোহণে বড়ই পটু ছিলেন; সেই কারণে কোনও রূপ বিপদ্ ঘটিবার পূর্ব্বেই তিনি নামিয়া পড়িলেন।

 রাজা যথাসম্ভব দূরে থাকিয়া আমাকে দেখিতে লাগিলেন।

 রাজার আদেশক্রমে লোকজনেরা আমাকে যথেষ্ট খাদ্য ও পানীয় দিয়া গেল; আমি সেগুলি আহার করিয়া তৃপ্তিলাভ করিলাম।

 রাজা যখন ঘোড়ায় চড়িয়া আমার দিকে আসিতেছিলেন, তখন রাণী এবং রাজকুমার ও রাজকুমারীগণ কিছু দূরে চেয়ারে বসিয়াছিলেন; কিন্তু রাজার ঘোড়া যখন চঞ্চল হইয়া তাঁহার জীবন বিপদাপন্ন করিল, তখন সকলেই শশব্যস্তে রাজার নিকট উপস্থিত হইলেন।

 পাঠকের কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য আমি রাজ-পরিবারের কতক বর্ণনা করিব।

 রাজা দীর্ঘাকৃতি পুরুষ, অর্থাৎ সে দেশের লোকের সাধারণ আকৃতির হিসাবে তিনি দীর্ঘাকৃতি; কারণ তাঁহার যে কোনও পারিষদের অপেক্ষা তাঁহার দৈর্ঘ্য, আমার নখ যত চওড়া, ততটা অধিক; কাজেই, তাঁহাকে দেখিলেই তাঁহার প্রজাবৃন্দের মনে ভীতির সঞ্চার হয়। তাঁহার গঠন বলিষ্ঠ, নাসিকা বক্র, অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদি সৌষ্ঠবপূর্ণ, দেখিলেই তাঁহাকে “সম্রাট্” বলিয়া বোধ হয়। তিনি একুশ বৎসর বয়সে রাজ্যভার গ্রহণ করিয়া সুখে সাত বৎসর যাবৎ রাজত্ব করিতেছেন। যুদ্ধ-বিগ্রহে তিনি বড়ই সৌভাগ্যবান্ পুরুষ, সকল যুদ্ধেই তিনি জয়লাভ করিতেন। তাঁহার পরিচ্ছদের আড়ম্বর বা পরিপাটি কিছুমাত্র ছিল না। পোষাকের ভাব—কতকটা এসিয়াবাসীদের, কতকটা ইউরোপবাসীদের মতন। মস্তকে মণিখচিত স্বর্ণ-শিরস্ত্রাণ, ও হস্তে নিষ্কাশিত অসি। তরবারির দৈর্ঘ্য ৩ ইঞ্চি হইবে; কোষ, স্বর্ণে নির্ম্মিত ও হীরক-খচিত। স্বর তীক্ষ্ণ, ও সুস্পষ্ট; আমি দাঁড়াইয়া থাকিলেও তাহা শুনিতে বা বুঝিতে আমার একটুও অসুবিধা বা কষ্ট হইত না। সম্রাট্ অনেকবার আমাকে অনেক কথা বলিলেন, আমিও প্রতিবারে তাহার প্রত্যুত্তর দিলাম; কিন্তু আমাদের মধ্যে কেহই যে অপরের কথা বিন্দুমাত্র বুঝিতে পারে নাই, তাহা বলাই বাহুল্য।

 মহিষী ও তাঁহার সখীগণের পরিচ্ছদের জাঁকজমকই বা কত! যে স্থলে তাঁহারা ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, বোধ হইতে লাগিল, যেন স্বর্ণ ও রৌপ্যে মণ্ডিত একখানি গালিচা, সেস্থানে বিছান রহিয়াছে!

 সম্রাটের অনুচরবর্গের মধ্যে অনেক পুরোহিত ও উকিল, এটর্ণি প্রভৃতি ছিলেন। সম্রাট তাঁহাদিগকে অনুমতি করায়, সকলেই আমার সহিত অল্প বিস্তর বাক্যালাপ করিলেন। প্রত্যুত্তর দিতে, আমার যতগুলি ভাষার উপর অধিকার ছিল, সব ভাষারই প্রয়োগ করিয়া দেখিলাম; কিন্তু আমার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হইল।