বিষয়বস্তুতে চলুন

গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/প্রথম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত


প্রথম পরিচ্ছেদ।

নটিংহামসায়ারে আমার বাবার একটু ছোট খাট জমিদারী ছিল। আমরা পাঁচ ভাই, আমি তাঁহাদের মধ্যে তৃতীয়। যখন আমার বয়স ১৪ বৎসর, আমার বাবা আমাকে কেম্বিজে “ইম্যানিউএল কলেজে” পাঠাইয়া দেন, আমি সেখানে তিন বৎসর কাল খুব মন দিয়া লেখাপড়া করি। তারপর লণ্ডনের একজন বিখ্যাত অস্ত্রচিকিৎসক জেম্‌স্ বেট্‌সের নিকট বাবা আমাকে শিক্ষানবিস করিয়া দেন। আমি তাঁহার নিকট চারি বৎসর কাজ শিখি। বাবা মধ্যে মধ্যে কিছু কিছু টাকা পাঠাইতেন; আমি সেই টাকা খরচ করিয়া নৌবিদ্যা এবং কিছু কিছু অঙ্কশাস্ত্র শিখিতাম। আমার মনে কে যেন সর্ব্বদাই বলিয়া দিত, দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করিয়াই আমার জীবনটা কাটিবে। মিষ্টার বেট্‌সের নিকট শিক্ষানবিসের কাল ফুরাইয়া গেলে, আমি বাবার নিকট চলিয়া গেলাম। সেখানে আমার বাবা, আমার কাকা এবং অন্যান্য কয়েকজন আত্মীয় আমাকে ৪০ পাউণ্ড জুটাইয়া দিলেন; এবং ভরসা দিলেন, প্রতি বৎসর ৩০ পাউণ্ড করিয়া দিবেন। এই টাকার উপর নির্ভর করিয়া আমি পদার্থবিদ্যা শিখিবার জন্য লীডেন সহরে গেলাম। সেখানে দুই বৎসর সাত মাস এই বিদ্যা অধ্যয়ন করি। লীডেন হইতে ফিরিয়া আসিবার পরেই মিষ্টার বেট্‌সের সুপারিসে “সোয়ালো” নামক জাহাজে আমার ডাক্তারির চাকুরী জুটিল। জাহাজের কাপ্তেন এব্রাহাম প্যানেলের নিকট আমি সাড়ে তিন বৎসর কাজ করিলাম। ফিরিয়া আসিয়া আমি মনে করিলাম, লণ্ডন সহরেই পসারের চেষ্টা করিব। ইহাতে আমার ভূতপূর্ব্ব মনিব বেট্‌স্ আমাকে যথেষ্ট উৎসাহ দিতে লাগিলেন এবং অনেক রোগীর নিকট আমাকে সুপারিস করিয়া দিলেন। আমি সহরের মধ্যে ছোট খাট বাসা করিলাম এবং বিবাহও করিলাম। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্যক্রমে দুই বৎসর পরেই বেট্‌স্‌ মারা পড়িলেন। আমার অন্য কেহ সহায় বা হিতার্থী বন্ধু ছিল না, কাজেই আমার পসার বাড়িতে পাইল না। অগত্যা স্ত্রী এবং কয়েকজন বন্ধুর সহিত পরামর্শ করিয়া স্থির করিলাম, আবার জাহাজে চাকুরী করিব। পর পর দুইখানি জাহাজে চাকুরী মিলিল। ছয় বৎসর ধরিয়া অনেকবার এসিয়া ও আমেরিকা অঞ্চলে জলযাত্রা করিলাম, সঙ্গে সঙ্গে অর্থেরও কিছু সাচ্ছল্য হইল। আমার অনেকগুলি পুস্তকের সংগ্রহ ছিল। কাজেই আমার অবসরকাল প্রাচীন ও নব্য বহুবিধ সদ্‌গ্রন্থ পাঠে বেশ কাটিত। জাহাজ যখন কোনও দেশে আসিয়া লাগিত, আমি তীরে নামিয়া সেই দেশের অধিবাসীদের আচার ব্যবহার লক্ষ্য করিতাম, আর তাহাদের ভাষা শিখিতাম। আমার স্মরণশক্তি প্রখর ছিল, কাজেই সহজেই ভাষা দখল করিতে পারিতাম। ষষ্ঠবার জলযাত্রায় অনেক রকম কষ্ট পাইতে হইয়াছিল। ইহাতে সমুদ্রের উপর আমার আস্থা কিছু কমিয়া গেল; এবং আমি সঙ্কল্প করিলাম, দেশে গিয়া স্ত্রী পুত্র লইয়া সুখে বাস করিব। এই ভাবিয়া সহরের যে অংশে নাবিকদের বসবাস, সেই দিকে বাসা লইলাম। আশা ছিল, নাবিকেরা আমাকে দিয়া চিকিৎসা করাইবে। এই আশায় তিন বৎসর কাটাইলাম, কিন্তু ব্যবসায়ের কিছুমাত্র উন্নতি হইল না; অগত্যা আবার জাহাজে চাকুরী লইতে হইল। এবার “এণ্টিলোপ্‌” জাহাজের কাপ্তেন উইলিয়ম প্রিচার্ডের সহিত আমেরিকা অঞ্চলে চলিলাম।

 ১৬৯৯ সালে ৪ঠা মে তারিখে ব্রিষ্টল হইতে আমাদের জাহাজ ছাড়িল। পথিমধ্যে যে কতবার কতরকম বিপদে পড়িলাম, তাহার সবিস্তার বর্ণনা করিয়া পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি করিতে চাহি না। একবার ভীষণ ঝড়ে আহত হইয়া প্রকৃত পথ হইতে বহুদূরে গিয়া পড়িলাম। অপরিমিত পরিশ্রম করিয়া ও উত্তম খাদ্য খাইতে না পাইয়া, নাবিকদের মধ্যে ১২ জন মরিয়াই গেল। যাহারা মরিল না তাহারা জীবন্মৃত হইয়া বাঁচিয়া রহিল। এই অবস্থায় ৫ই নভেম্বর তারিখে আমাদের জাহাজখানা ভীষণ ঝড়ের বেগে একটা পাহাড়ে ধাক্কা লাগিয়া ফাঁসিয়া গেল। আমি আর ৫ জন নাবিক কোনও গতিকে একখানি নৌকা ভাসাইয়া, ভগ্ন জাহাজ ও বিপজ্জনক পাহাড়ের হাত হইতে রক্ষা পাইলাম। আন্দাজ ৯ মাইল দাঁড় বাহিয়া যাইবার পর আমাদের শরীর অবসন্ন হইয়া আসিল; আর দাঁড় বাহিতে পারিলাম না। ভগবানের মনে যাহা আছে তাহাই হউক, এই ভাবিয়া আমরা দাঁড় ছাড়িয়া দিলাম।

 প্রায় আধ ঘণ্টা এই ভাবে ভাসিবার পর হঠাৎ একটা ঝাপ্‌টা আসিয়া আমাদের নৌকাখানি উল্টাইয়া দিয়া গেল। নৌকায় যে আর পাঁচ জন ছিল, তাহাদের কি দশা হইল, আমি বলিতে পারি না, কিন্তু আমার মনে হয় তাহারা সকলেই মারা পড়িল। এদিকে আমি প্রবল বাতাস আর প্রবল তরঙ্গের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিয়া সাঁতার দিতে লাগিলাম। কতবার পা ফেলিয়া দেখিলাম, তলা পাই কি না; কিন্তু কোন বারই তলা পাইলাম না। অবশেষে যখন আমি নির্জীব প্রায় হইয়া পড়িলাম, তখন সৌভাগ্যক্রমে তল পাইলাম। সেখান হইতে প্রায় একমাইল জলে হাঁটিয়া তবে আমি তীরে উঠিলাম; তখন রাত্রি আন্দাজ ৮টা।