গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
এইরূপে প্রায় দুই ঘণ্টাকাল আমার নিকট অতিবাহিত করিয়া, সম্রাট্, মহিষী ও অনুচরবর্গের সহিত প্রস্থান করিলেন। জনসাধারণের উৎপীড়ন হইতে আমায় রক্ষা করিবার জন্য, আমার নিকট শান্ত্রীদল নিযুক্ত হইল; তথাপি কেহ কেহ তীর ছুড়িয়া আমায় উৎখাত করিতে বিরত হইল না। একটা তীর আর একটু হইলে আমার বাম চক্ষুতে বিদ্ধ হইত, এমনও বিপদ গেল। ইহা দেখিয়া শান্ত্রীদলের অধিপতি অপরাধীদিগের মধ্যে ছয়জনকে ধরিয়া, তাহাদের হাত পা বাঁধিয়া, আমার হস্তে সমর্পণ করিয়া গেল। আমি ছয়জনকেই ডান হাতে ধরিয়া, পাঁচজনকে পকেটে পুরিলাম, আর ষষ্ঠজনকে হাতে রাখিয়া এমন ভাব করিতে লাগিলাম, যেন তাহাকে বা আস্তই গিলিয়া ফেলি! আহা, বেচারীর কি ভয়! কি কাতর চীৎকার! তার পরে যখন আমি চাকু ছুরি বাহির করিলাম, তখন তাহার ভয়ের ও কষ্টের সীমা রহিল না। কিন্তু আমি সদয়নেত্রে তাহার দিকে চাহিয়া, ছুরি দিয়া তাহার হস্তপদের সকল বন্ধন কাটিয়া দিলাম ও তাহাকে মাটীতে দাঁড় করাইয়া দিলাম! বেচারা পলাইয়া বাঁচিল। তারপরে একে একে অপর পাঁচটিকেও পকেট হইতে বাহির করিয়া ঐভাবে মুক্তি দিলাম। আমার দয়া দেখিয়া সকলেই আনন্দিত হইল, এবং আমার বিস্তর সুখ্যাতি করিয়া এ ঘটনা সম্রাটের কর্ণগোচর করিল।
রাত্রিকালে আমি কোনও গতিকে আমার বাসগৃহে প্রবেশ করিয়া শুইয়া থাকিতাম। মেঝে পাথরের; তাহাতে আমার কষ্ট হইত। কিন্তু সম্রাট এরূপ দয়াবান্ যে, বোধ হয় তাহা বুঝিতে পারিয়াই আমার জন্য শয্যা, আস্তরণ প্রভৃতি নির্ম্মাণ করিতে আদেশ দিলেন; যথাকালে সেগুলি প্রস্তুত হইয়া আমার ব্যবহারে আসিল।
আমার আগমনবার্ত্তা দেশমধ্যে যতই প্রচারিত হইতে লাগিল, ততই ছোট বড়, ধনী নির্ধন সকলেই দলে দলে আমাকে দেখিতে আসিতে লাগিল। লোকের আমাকে দেখিয়া দেখিয়া আকাঙ্ক্ষা মিটিত না। সে কারণে রাজধানীতে অসম্ভব লোক সমাগম হইতে লাগিল; আর বোধ হয়, পল্লীগ্রামে চাষ-বাস এবং গৃহস্থালী কার্য্যেরও অনেক ক্ষতি হইতে লাগিল। অবশেষে সম্রাট এই পরোয়ানা বাহির করিলেন যে, যাহারা আমাকে একবার দেখিয়াছে, তাহাদিগকে অবিলম্বে গৃহে ফিরিতে হইবে; এবং তাঁহার বিশেষ অনুমতি ব্যতীত কেহই আমার বাসস্থানের ১০০ হস্তের মধ্যে আসিতে পাইবে না।
আমাকে লইয়া রাজ্যমধ্যে একটা হুলস্থূল পড়িয়া গেল। সম্রাট্ এবং তাঁহার মন্ত্রিগণ কতপ্রকার পরামর্শই করিতে লাগিলেন। তাঁহারা কখনও ভয় করিতেন, আমি তাঁহাদের নাগপাশ ভেদ করিয়া কবে রাজ্যমধ্যে তুমুল বিপ্লব বাধাইয়া দিব। কখনও বা ভয় করিতেন, আমার এত রসদ তাঁহারা কতকাল যোগাইতে পারিবেন; সত্বরই বুঝি রাজ্যমধ্যে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে! কখনও তাঁহাদের মধ্যে পরামর্শ চলিত, আমাকে আহার না দিয়া মারিয়া ফেলা হউক। কখনও বা পরামর্শ হইত, বিষাক্ত তীর দিয়া মুখ ও হাত বিঁধিয়া আমার প্রাণবধ করা হউক। কিন্তু তখনই আবার তাঁহারা ভাবিতেন যে, এত প্রকাণ্ড একটা দেহকে পচিতে দিলে, সেই দুর্গন্ধে হয় ত সমস্ত রাজ্যমধ্যে একটা মারাত্মক মহামারী উপস্থিত হইতে পারে; সেই ভাবিয়া তাঁহারা ওরূপ পরামর্শ হইতে বিরত হইতেন।
এইরূপ পরামর্শ চলিতেছে, এমন সময় দুইজন সেনা পুরুষ রাজসভায় গিয়া, সম্রাট্ সমীপে ছয় জন অপরাধীর প্রতি আমার সদয় ব্যবহারের কথা নিবেদন করিল। শুনিবামাত্র সম্রাটের এবং মন্ত্রিগণের মন আমার প্রতি এরূপ প্রসন্ন হইল যে, আমাকে বধ করিবার অভিপ্রায় তাঁহারা সম্পূর্ণরূপে বিসর্জ্জন দিলেন। তখনই সম্রাটের নামে আদেশ বাহির হইল যে, রাজধানী হইতে ৯০০ গজের মধ্যে অবস্থিত পল্লীগ্রাম মাত্রেই, প্রত্যহ প্রাতে আমার আহারের জন্য ছয়টী গবাদি পশু, চল্লিশটী মেষ এবং ঐ পরিমাণে অন্যান্য খা্দ্য, রুটী ও মদ প্রভৃতি সরবরাহ করিবে এবং রাজকোষ হইতে ঐ সকলের মূল্য পাইবে। তভিন্ন সম্রাট ৬০০ ব্যক্তিকে আমার পরিচারকরূপে নিযুক্ত করিয়া দিলেন, এবং ৩০০ দর্জ্জিকে আদেশ দিলেন যে, তাহারা সেই দেশের প্রথা অনুযায়ী এক সুট পোষাক আমাকে অবিলম্বে প্রস্তুত করিয়া দেয়। সম্রাট্ আরও হুকুম দিলেন যে, ছয়জন বিজ্ঞতম পণ্ডিত আমাকে সেই দেশের ভাষা শিখাইতে প্রবৃত্ত হইবেন এবং সম্রাটের নিজের, আমির ওমরাহগণের এবং অশ্বারোহী সৈন্যদলের অশ্বগণ মধ্যে মধ্যে আমার সম্মুখে বেড়াইবে, যেন ভবিষ্যতে আমাকে দেখিয়া তাহারা না ক্ষেপিয়া উঠে।
সে দেশের ভাষা শিখিতে আমার বিলম্ব হইল না। অনেক সময় সম্রাট্ স্বয়ং আসিয়া আমার পড়াশুনার উন্নতির সম্বন্ধে তত্ত্ব লইতেন ও সন্তোষ প্রকাশ করিতেন। তাঁহার সহিত আমার মধ্যে মধ্যে কথাবার্ত্তা হইত। আমি কেবল আমার মুক্তি প্রার্থনা করিতাম। তিনিও আশ্বাস দিতেন, যথাসময়ে মন্ত্রীদিগের পরামর্শ লইয়া মুক্তির আদেশ দিবেন! আমার কোনও ভয়ের কারণ নাই, কেহ আমার সহিত অসদ্ব্যবহার করিবে না, ইত্যাদি!