গলিভারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত/সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
একদিন সম্রাট্ আদেশ দিলেন, আমার দেহের খানাতল্লাসী হইবে। তদনুসারে দুইজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী আসিলে, আমি ধীরে ধীরে তাঁহাদিগকে আমার একে একে সকল পকেটের মধ্যেই নামাইয়া দিলাম, কেবল বুক-পকেটের মধ্যে আমার চশমাটি ও একটি ছোট স্পাই-গ্ল্যাস্ ছিল বলিয়া, তাহাতে প্রবেশ করিতে দিলাম না। ভাবিলাম, এরূপ নির্দ্দোষ বস্তুগুলি সম্রাটের মাল-খানায় না পৌঁছিলেও, কাহারও কোন প্রকার বিপদের সম্ভাবনা নাই, অথচ আমার নিকট থাকিলে সেগুলি সত্য সত্যই ব্যবহারে লাগিবে। খানাতল্লাসীর ফলে আমার সকল দ্রব্যই সম্রাটের নিকট হাজির করা হইল। আমার ঘড়ি ও চেন ‘দেখিয়া সম্রাটের ও সভাসদগণের বিস্ময়ের অবধি রহিল না। চেনটা সকলে, চিনিতে ও বুঝিতে পারিল; কিন্তু ঘড়ির অবিরাম টিক্ টিক্ শব্দ ও মিনিটের কাঁটার গতি সকলের নিকটেই একটা দুর্ব্বোধ রহস্য বলিয়া বোধ হইতে লাগিল! সম্রাট্ সভা-পণ্ডিতদিগের মত জিজ্ঞাসা করিলেন। নানা মুনি নানা মত দিলেন। আমি বুঝিতে পারিলাম না বটে, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, বুঝিতে পারিলে বেশ আমোদের বিষয়ই হইত। আমার পকেটে রুমাল, একখানা ক্ষুর ও একখানা মাংস কাটিবার ছুরি ছিল, সেগুলির সম্বন্ধে কর্ম্মচারী দুই জনের বিশেষ কোনও সন্দেহ হয় নাই। অবশেষে তাঁহারা আমার নস্যদানিটায় উপস্থিত হইলেন। বীরপুরুষ-দ্বয়ের মস্তকে হঠাৎ কি একটা সন্দেহ প্রবেশ করিল, সেই প্রকাণ্ড ‘রৌপ্য-সিন্দুকটি’ খুলিতে তাঁহারা বিস্তর চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য্য না হইয়া, শেষে সেটী খুলিয়া দিবার জন্য আমাকে অনুরোধ করিলেন। তাঁহাদের নিতান্তই কুগ্রহ! তাই সেই “সিন্দুকের” মধ্যে সশরীরে প্রবেশ করিয়া “খানা তল্লাস” করার আগ্রহ দেখাইলেন! আমি এক এক জনকে ধরিয়া যেমন নামাইয়া দিয়াছি, অমনি তাঁহাদের দেহের অর্দ্ধেকেরও অধিক ভাগ নস্যে মগ্ন হইল, এবং চারিদিকে নস্য উড়িতে লাগিল। সেই ঝাঁঝে বেচারাদের হাঁচিতে হাঁচিতে জীবন অবসন্নপ্রায় হইয়া আসিল! তারপর আমার দিনের “রোজনামচা বহি” লইয়া পড়িলেন। উল্টাইয়া পাল্টাইয়া কতমতে দেখিলেন; অবশেষে প্রত্যেক অক্ষরটি যখন তাঁহাদের হাতের তেলোর মত লম্বা বলিয়া মনে হইল, তখন নিতান্তই একটা অস্বাভাবিক আওয়াজ করিয়া তাহা ছাড়িয়া দিলেন! তারপর আমার চিরুণির পালা। আগেই বলিয়াছি, এদেশের লোকদের সহজ বুদ্ধিটা খুব প্রবল; চিরুণীটা দেখিয়াই বুঝিতে পারিলেন, ইহাতে মাথা আঁচড়াই; অতএব ইহা নির্দ্দোষ। তারপর দুইটা পকেট-পিস্তল বাহির হইল। কর্ম্মচারীরা এগুলিকে “ফাঁপা লোহার থাম” বলিয়া রিপোর্ট দিয়াছিলেন; কিন্তু সম্রাটের বিশেষ কৌতূহল হওয়ায়, তিনি আমায় এগুলির ব্যবহার দেখাইয়া দিতে বলিলেন। আমি তাঁহাকে সাবধান হইতে বলিয়া ও সম্পূর্ণ অভয় দিয়া, একটা ফাঁকা আওয়াজ মাত্র করিলাম। রাজ্যমধ্যে কি একটা হুলস্থুলই না পড়িয়া গেল! কতশত ব্যক্তি শব্দ মাত্রেই মৃতবৎ ভূপতিত হইল! সম্রাটেরও বিভীষিকার অপনোদন হইতে কিছুক্ষণ লাগিয়াছিল! আমার পকেটে স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্র-—সকল প্রকার মুদ্রাই ছিল। সেগুলি লইয়া গেলেও সে অবস্থার আমার কিছুমাত্র ক্ষতিবোধ হইত না। মুদ্রাগুলি—বিশেষতঃ স্বর্ণমুদ্রাগুলি দেখিয়া তাঁহাদের আমোদের সীমা রহিল না; রৌপ্যমুদ্রা গুলি এত বড় যে, একজনে একটি তুলিতে পারিলেন না। স্বর্ণমুদ্রাগুলিও তাঁহাদের এক একজনের মস্তকের ন্যায় সু-বৃহৎ! আমার সঙ্গে বারুদ রাখিবার একটী “পাউচ্” ছিল; সেটীকে অতি সন্তর্পণে রক্ষা করিয়া সাঁতার দিয়া আসিয়াছিলাম, তাই বারুদ নষ্ট হইতে পায় নাই। তাহা ছাড়া ছট্রায় পূর্ণ একটা থলিও ছিল। সর্ব্বশেষে, তরবারিখানির পালা। সম্রাট্ দেখিতে ইচ্ছা প্রকাশ করায়, আমি উহা নিষ্কাশিত করিলাম। উজ্জ্বল সূর্য্যকিরণে উহা ঝক্মক্ করিতে লাগিল, প্রজাবৃন্দের নয়ন ঝল্সিয়া গেল! সম্রাট্ তখনই উহা কোষবদ্ধ করিতে আমার অনুজ্ঞা করিলেন। কিন্তু তিনি যতটা ভীত হইবেন ভাবিয়াছিলাম, ততটা হন নাই।
তরবারিখানি, পিস্তল দুইটি, বারুদের পাউচ ও ছট্রার থলি সরকারি মালখানায় চলিয়া গেল। আর সমস্ত আমি ফিরিয়া পাইলাম।