গল্পগুচ্ছ/অপরিচিতা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

গল্পগুচ্ছ 40학 অপরিচিতা আজ আমার বয়স সাতাশ মাত্র। এ জীবনটা না দৈঘ্যের হিসাবে বড়ো, না গণের হিসাবে। তব ইহার একটা বিশেষ মল্য আছে। ইহা সেই ফলের মতো যাহার বকের উপরে ভ্রমর আসিয়া বসিয়াছিল, এবং সেই পদক্ষেপের ইতিহাস তাহার জীবনের মাঝখানে ফলের মতো গুটি ধরিয়া উঠিয়াছে। সেই ইতিহাসটুকু আকারে ছোটো, তাহাকে ছোটো করিয়াই লিখিব। ছোটোকে যাহারা সামান্য বলিয়া ভুল করেন না তাঁহারা ইহার রস বুঝিবেন। কলেজে যতগলা পরীক্ষা পাস করিবার সব আমি চুকাইয়াছি। ছেলেবেলায় আমার সন্দের চেহারা লইয়া পণ্ডিতমশায় আমাকে শিমল ফল ও মাকাল ফলের সহিত তুলনা করিয়া বিদ্রপ করিবার সুযোগ পাইয়াছিলেন। ইহাতে তখন বড়ো লজা পাইতাম; কিন্তু বয়স হইয়া এ কথা ভাবিয়াছি, যদি জন্মান্তর থাকে তবে আমার মুখে সর্প এবং পণ্ডিতমশায়দের মুখে বিদ্রুপ আবার যেন এমনি করিয়াই প্রকাশ পায় । আমার পিতা এক কালে গরিব ছিলেন। ওকালতি করিয়া তিনি প্রচুর টাকা রোজগার করিয়াছেন, ভোগ করিবার সময় নিমেষমাত্রও পান নাই। মৃত্যুতে তিনি যে হাফ ছাড়িলেন সেই তাঁর প্রথম অবকাশ । আমার তখন বয়স অলপ। মার হাতেই আমি মানুষ। মা গরিবের ঘরের মেয়ে; তাই, আমরা যে ধনী এ কথা তিনিও ভোলেন না আমাকেও ভুলিতে দেন না। শিশুকালে আমি কোলে কোলেই মানষে—বোধ করি, সেইজন্য শেষ পর্যন্ত আমার পরোপুরি বয়সই হইল না। আজও আমাকে দেখিলে মনে হইবে, আমি অন্নপশোর কোলে গজাননের ছোটো ভাইটি। আমার আসল অভিভাবক আমার মামা। তিনি আমার চেয়ে বড়োজোর বছর ছয়েক বড়ো। কিন্তু, ফগর বালির মতো তিনি আমাদের সমস্ত সংসারটাকে নিজের অন্তরের মধ্যে শষিয়া লইয়াছেন। তাঁহাকে না খড়িয়া এখানকার এক গণ্ডষেও রস পাইবার জো নাই। এই কারণে কোনো-কিছর জন্যই আমাকে কোনো ভাবনা ভাবিতেই হয় না । কন্যার পিতা মাত্রেই স্বীকার কারবেন, আমি সৎপাত্র। তামাকটকু পৰ্যন্ত খাই না। ভালোমানুষ হওয়ার কোনো ঝঞ্জাট নাই, তাই আমি নিতান্ত ভালোমানুষ। মাতার আদেশ মানিয়া চলিবার ক্ষমতা আমার আছে—বস্তুত, না মানিবার ক্ষমতা আমার নাই। অতঃপরের শাসনে চলিবার মতো করিয়াই আমি প্রস্তুত হইয়াছি, যদি কোনো কন্যা স্বয়ম্বর হন তবে এই সলক্ষণটি স্মরণ রাখিবেন। অনেক বড়ো ঘর হইতে আমার সম্বন্ধ আসিয়াছিল। কিন্তু মামা, যিনি পথিবীতে আমার ভাগ্যদেবতার প্রধান এজেন্ট, বিবাহ সম্বন্ধে তাঁর একটা বিশেষ মত ছিল। ধনীর কন্যা তাঁর পছন্দ নয়। আমাদের ঘরে ষে মেয়ে আসিবে সে মাথা হে’ট করিয়া আসিবে, এই তিনি চান। অথচ টাকার প্রতি আসক্তি তাঁর অস্থিমজ্জায় জড়িত। তিনি এমন বেহাই চান বাহার টাকা নাই অথচ ষে টাকা দিতে কসর করিবে না। যাহাকে * Obs গল্পগুচ্ছ শোষণ করা চলিবে অথচ বাড়িতে আসিলে গড়গড়ির পরিবতে বাঁধা হংকার তামাক দিলে যাহার নালিশ খাটিবে না। o আমার বন্ধ হরিশ কানপরে কাজ করে। সে ছটিতে কলিকাতায় আসিয়া আমার মন উতলা করিয়া দিল। সে বলিল, "ওহে, মেয়ে যদি বল একটি খাসা মেরে আছে ।” কিছুদিন পবেই এম.এ. পাস করিয়াছি। সামনে যত দর পর্যন্ত দস্টি চলে ছয়টি ধ ধ করিতেছে; পরীক্ষা নাই, উমেদারি নাই, চাকরি নাই; নিজের বিষয় দেখিবার চিন্তাও নাই, শিক্ষাও নাই, ইচ্ছাও নাই— থাকিবার মধ্যে ভিতরে আছেন মা এবং বাহিরে আছেন মামা। o এই অবকাশের মরভূমির মধ্যে আমার হদয় তখন বিশ্বব্যাপী নারীরপের মরীচিকা দেখিতেছিল— আকাশে তাহার দটি, বাতাসে তাহার নিশ্বাস, তরমমরে তাহার গোপন কথা । এমন সময় হরিশ আসিয়া বলিল, “মেয়ে যদি বলে তবে—”। আমার শরীর-মন বসন্তবাতাসে বকুলবনের নবপল্লবরাশির মতো কাঁপিতে কাঁপতে আলোছায়া বানিতে লাগিল। হরিশ মানুষটা ছিল রসিক, রস দিয়া বর্ণনা করিবার শক্তি তাহার ছিল, আর আমার মন ছিল তৃষাত । আমি হরিশকে বলিলাম, “একবার মামার কাছে কথাটা পাড়িয়া দেখো।" হরিশ আসর জমাইতে অদ্বিতীয়। তাই সবারই তাহার খাতির । মামাও তাহাকে পাইলে ছাড়িতে চান না। কথাটা তাঁর বৈঠকে উঠিল। মেয়ের চেয়ে মেয়ের বাপের খবরটাই তাঁহার কাছে গরতর। বাপের অবস্থা তিনি যেমনটি চান তেমনি। এক কালে ইহাদের বংশে লক্ষীর মঙ্গলঘট ভরা ছিল। এখন তাহা শান্য বলিলেই হয়, অথচ তলায় সামান্য কিছর বাকি আছে। দেশে বংশমর্যাদা রাখিয়া চলা সহজ নয় বলিয়া ইনি পশ্চিমে গিয়া বাস করিতেছেন। সেখানে গরিব গহস্থের মতোই থাকেন। একটি মেয়ে ছাড়া তাঁর আর নাই। সুতরাং তাহারই পশ্চাতে লক্ষীর ঘটটি একেবারে উপড়ে করিয়া দিতে বিধা হইবে না। এ-সব ভালো কথা। কিন্তু, মেয়ের বয়স যে পনেরো, তাই শুনিয়া মামার মন ভার হইল । বংশে তো কোনো দোষ নাই ? না, দোষ নাই— বাপ কোথাও তাঁর মেয়ের যোগ্য বর খাজিয়া পান না। একে তো বরের হাট মহাঘ, তাহার পরে ধনক-ভাঙা পণ, কাজেই বাপ কেবলই সবর করিতেছেন–কিন্তু মেয়ের বয়স সবর করিতেছে না। যাই হোক, হরিশের সরস রসনার গণ আছে। মামার মন নরম হইল। বিবাহের ভূমিকা-অংশটা নিবিঘে সমাধা হইয়া গেল। কলিকাতার বাহিরে বাকি যে পথিবীটা আছে সমস্তটাকেই মামা আন্ডামান বীপের অন্তগত বলিয়া জানেন । জীবনে একবার বিশেষ কাজে তিনি কোন্নগর পর্যন্ত গিয়াছিলেন। মামা যদি মন হইতেন তবে তিনি হাবড়ার পল পার হওয়াটাকে তাঁহার সংহিতায় একেবারে নিষেধ করিয়া দিতেন। মনের মধ্যে ইচ্ছা ছিল, নিজের চোখে মেয়ে দেখিয়া আসিব। সাহস করিয়া প্রস্তাব করিতে পারিলাম না। কন্যাকে আশীবাদ করিবার জন্য যাহাকে পাঠানো হইল সে আমাদের বিনদাদা, আমার পিসততো ভাই। তাহার মত রচি এবং দক্ষতার পরে আমি ষোলো-আনা অপরিচিতা । ԳO:» নিভর করিতে পারি। বিনন্দা ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, “মন্দ নয় হে! খাঁটি সোনা বটে *ি বিনন্দাদার ভাষাটা অত্যন্ত অটি। যেখানে আমরা বলি চমৎকার সেখানে তিনি বলেন "চলনসই। অতএব বুঝিলাম, আমার ভাগ্যে প্রজাপতির সঙ্গে পঞ্চশরের কোনো বিরোধ নাই । ९ বলা বাহুল্য, বিবাহ-উপলক্ষে কন্যাপক্ষকেই কলিকাতায় আসিতে হইল। কন্যার পিতা শম্ভুনাথবাব হরিশকে কত বিশ্বাস করেন তাহার প্রমাণ এই যে, বিবাহের তিন দিন পবে তিনি আমাকে প্রথম চক্ষে দেখেন এবং আশীবাদ করিয়া যান। বয়স তাঁর চল্লিশের কিছ এ পারে বা ও পারে। চুল কাঁচা, গোঁফে পাক ধরিতে আরম্ভ করিয়াছে মাত্র। সপর্য বটে। ভিড়ের মধ্যে দেখিলে সকলের আগে তাঁর উপরে চোখ পড়িবার মতো চেহারা । আশা করি আমাকে দেখিয়া তিনি খুশি হইয়াছিলেন। বোঝা শক্ত, কেননা তিনি বড়োই চুপচাপ। যে দুটি-একটি কথা বলেন যেন তাহাতে পরা জোর দিয়া বলেন না। মামার মুখ তখন অনগ'ল ছয়টিতেছিল— ধনে মানে আমাদের পথান যে শহরের কারও চেয়ে কম নয়, সেইটেকেই তিনি নানা প্রসঙ্গে প্রচার করিতেছিলেন। শম্ভুনাথবাব এ কথায় একেবারে যোগই দিলেন না— কোনো ফাঁকে একটা হ: বা হাঁ কিছুই শোনা গেল না। আমি হইলে দমিয়া যাইতাম, কিন্তু মামাকে দমানো শক্ত। তিনি শম্ভুনাথবাবর চুপচাপ ভাব দেখিয়া ভাবিলেন লোকটা নিতান্ত নিজীব, একেবারে কোনো তেজ নাই। বেহাই-সম্প্রদায়ের আর যাই থাক, তেজ থাকাটা দোষের, অতএব মামা মনে মনে খুশি হইলেন। শম্ভুনাথবাব যখন উঠিলেন তখন মামা সংক্ষেপে উপর হইতেই তাঁকে বিদায় করিলেন, গাড়িতে তুলিয়া দিতে গেলেন না। পণ সম্বন্ধে দুই পক্ষে পাকাপাকি কথা ঠিক হইয়া গিয়াছিল। মামা নিজেকে অসামান্য চতুর বলিয়াই অভিমান করিয়া থাকেন। কথাবাতায় কোথাও তিনি কিছ ফাঁক রাখেন নাই। টাকার অন্তক তো স্থির ছিলই, তার পরে গহনা কত ভরির এবং সোনা কত দরের হইবে সেও একেবারে বাঁধাবধি হইয়া গিয়াছিল। আমি নিজে এ-সমস্ত কথার মধ্যে ছিলাম না ; জানিতাম না দেনা-পাওনা কী সিথর হইল। মনে জানিতাম, এই পথলে অংশটাও বিবাহের একটা প্রধান অংশ, এবং সে অংশের ভার যাঁর উপরে তিনি এক কড়াও ঠকিবেন না। বস্তুত, আশ্চৰ্য পাকা লোক বলিয়া মামা আমাদের সমসত সংসারের প্রধান গবে'র সামগ্রী । যেখানে আমাদের কোনো সম্প্রবন্ধ আছে সেখানে সবারই তিনি বধির লড়াইয়ে জিতিবেন, এ একেবারে ধরা কথা । এইজন্য আমাদের অভাব না থাকিলেও এবং অন্য পক্ষের অভাব কঠিন হইলেও জিতিব, আমাদের সংসারের এই জেদ— ইহাতে যে বীচুক আর যে মরকে। গায়ে-হলুদ অসম্ভব রকম ধম করিয়া গেল। বাহক এত গেল ষে তাহার আদম-সমারি করিতে হইলে কেরানি রাখিতে হয়। তাহাদিগকে বিদায় করিতে অপর পক্ষকে যে নাকাল হইতে হইবে, সেই কথা স্মরণ করিয়া মামার সঙ্গে মা একযোগে 8や శి'ృ0 গল্পগুচ্ছ বিস্তর হাসিলেন। , ব্যান্ড, বাঁশি, শখের কন্সট প্রভৃতি যেখানে যতপ্রকার উচ্চ শব্দ আছে সমস্ত একসঙ্গে মিশাইয়া ববীর কোলাহলের মত্ত হস্তী দ্বারা সংগীতসরস্বতীর পদমবন দলিত বিদলিত করিয়া আমি তো বিবাহ-বাড়িতে গিয়া উঠিলাম। আংটিতে হারেতে হইল। তাঁহাদের ভাবী জামাইয়ের মল্য কত সেটা যেন কতক পরিমাণে সবাঙ্গে পাট করিয়া লিখিয়া ভাবী শবশরের সঙ্গে মোকাবিলা করিতে চলিয়াছিলাম । মামা বিবাহ-বাড়িতে ঢকিয়া খুশি হইলেন না। একে তো উঠানটাতে বরযাত্রীদের জায়গা সংকুলান হওয়াই শক্ত, তাহার পরে সমস্ত আয়োজন নিতান্ত মধ্যম রকমের । ইহার পরে শম্ভুনাথবাবর ব্যবহারটাও নেহাত ঠাণ্ডা। তাঁর বিনয়টা অজস্র নয়। মনখে তো কথাই নাই। কোমরে চাদর বাঁধা, গলা ভাঙা, টাক-পড়া, মিশ-কালো এবং বিপল-শরীর তাঁর একটি উকিল-বন্ধ যদি নিয়ত হাত জোড় করিয়া, মাথা হেলাইয়া, নম্রতার সিমতহাস্যে ও গদগদ বচনে কন্সট পাটির করতাল-বাজিয়ে হইতে শর করিয়া বরকতাঁদের প্রত্যেককে বার বার প্রচুররাপে অভিষিক্ত করিয়া না দিতেন তবে গোড়াতেই একটা এসপার-ওসপার হইত। আমি সভায় বসিবার কিছুক্ষণ পরেই মামা শম্ভুনাথবাবকে পাশের ঘরে ডাকিয়া লইয়া গেলেন। কী কথা হইল জানি না, কিছুক্ষণ পরেই শশভূনাথবাব আমাকে আসিয়া বলিলেন, “বাবাজি, একবার এই দিকে আসতে হচ্ছে ।" ব্যাপারখানা এই —সকলের না হউক, কিন্তু কোনো কোনো মানুষের জীবনের একটা কিছল লক্ষ্য থাকে। মামার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, তিনি কোনোমতেই কারও কাছে ঠকিবেন না। তাঁর ভয় তাঁর বেহাই তাঁকে গহনায় ফাঁকি দিতে পারেন- বিবাহকায* শেষ হইয়া গেলে সে ফকির আর প্রতিকার চলিবে না। বাড়িভাড়া সওগাদ লোকবিদায় প্রভৃতি সম্বন্ধে ষেরকম টানাটানির পরিচয় পাওয়া গেছে তাহাতে মামা ঠিক করিয়াছিলেন-দেওয়া-থোওয়া সম্বন্ধে এ লোকটির শর্ধ মুখের কথার উপর ভর করা চলিবে না। সেইজন্য বাড়ির স্যাকরাকে সন্ধে সঙ্গে আনিয়াছিলেন। পাশের ঘরে গিয়া দেখিলাম, মামা এক তক্তপোষে এবং স্যাকরা তাহার দাঁড়িপাল্লা কটিপাথর প্রভৃতি লইয়া মেজেয় বসিয়া আছে। হইবার আগেই তিনি কনের সমস্ত গহনা যাচাই করিয়া দেখিবেন, ইহাতে তুমি কী বল ।” আমি মাথা হে’ট করিয়া চুপ করিয়া রহিলাম। মামা বলিলেন, “ও আবার কী বলিবে । আমি যা বলিব তাই হইবে।” শম্ভুনাথবাব আমার দিকে চাহিয়া কহিলেন, “সেই কথা তবে ঠিক ? উনি যা বলিবেন তাই হইবে ? এ সম্বন্ধে তোমার কিছুই বলিবার নাই?" আমি একটা ঘাড়-নাড়ার ইঙ্গিতে জানাইলাম, এ-সব কথায় আমার সম্পর্ণে অনধিকার। - “আচ্ছা তবে বোসো, মেয়ের গা হইতে সমস্ত গহনা খালিয়া আনিতেছি।” এই अर्वाव्णश्ना ठिनि छैठेिएलन । ठछाब्रिक्लिष्ठा 乌令° মামা বলিলেন, "অনুপম এখানে কী করবে। ও সভায় গিয়া বসাক।” শম্ভুনাথ বলিলেন, “না, সভায় নয়, এখানেই বসিতে হইবে।” কিছুক্ষণ পরে তিনি একখানা গামছায় বাঁধা গহনা আনিয়া তত্ত্বপোষের উপর মেলিয়া ধরিলেন। সমস্তই তাঁহার পিতামহীদের আমলের গহনা— হাল ফ্যাশানের সক্ষম কাজ নয়— যেমন মোটা তেমনি ভারী। স্যাকরা গহনা হাতে তুলিয়া লইয়া বলিল, “এ আর দেখিব কী। ইহাতে খাদ নাই —এমন সোনা এখনকার দিনে ব্যবহারই হয় না।” এই বলিয়া সে মকরমথো মোটা একখানা বালায় একট চাপ দিয়া দেখাইল তাহা বাঁকিয়া যায়। $ মামা তখনি তাঁর নোটবইয়ে গহনাগুলির ফদ টকিয়া লইলেন, পাছে যাহা দেখানো হইল তাহার কোনোটা কম পড়ে। হিসাব করিয়া দেখিলেন, গহনা যে পরিমাণ দিবার কথা এগুলি সংখ্যায় দরে এবং ভারে তার অনেক বেশি। গহনাগুলির মধ্যে একজোড়া এয়ারিং ছিল। শম্ভুনাথ সেইটে স্যাকরার হাতে দিয়া বলিলেন, “এইটে একবার পরখ করিয়া দেখো।” স্যাকরা কহিল, “ইহা বিলাতি মাল, ইহাতে সোনার ভাগ সামান্যই আছে।” শম্ভুবাব এয়ারিংজোড়া মামার হাতে দিয়া বলিলেন, “এটা আপনারাই রাখিয়া प्रिन्स !” মামা সেটা হাতে লইয়া দেখিলেন, এই এয়ারিং দিয়াই কন্যাকে তাঁহারা আশীবাদ করিয়াছিলেন । भाभान्न भाथ लाल श्हेब्रा उँठिल। मिब्रािप्त उौंशब्दक ठकाइँटङ झाश्त्व किन्ड्र उनि ঠকিবেন না এই আনন্দ-সভোগ হইতে বঞ্চিত হইলেন এবং তাহার উপরেও কিছর উপরি-পাওনা জটিল। অত্যন্ত মখ ভার করিয়া বলিলেন, “অনুপম, যাও, তুমি সভায় গিয়ে বোসো গে।” শম্প্ৰভুনাথবাব বলিলেন, "না, এখন সভায় বসিতে হইবে না। চলন, আগে আপনাদের খাওয়াইয়া দিই।” মামা বলিলেন, “সে কী কথা। লগুন--” শম্প্রচুনাথবাব বলিলেন, “সেজন্য কিছু ভাবিবেন না— এখন উঠন।” লোকটি নেহাত ভালোমান ষ-ধরনের, কিন্তু ভিতরে বেশ একটা জোর আছে বলিয়া বোধ হইল। মামাকে উঠিতে হইল। বরযাত্রদেরও আহার হইয়া গেল। আয়োজনের আড়ম্বর ছিল না। কিন্তু রান্না ভালো এবং সমস্ত বেশ পরিকার পরিচ্ছন্ন বলিয়া সকলেরই তৃপ্তি হইল। বরযাত্রদের খাওয়া শেষ হইলে শম্ভুনাথবাব আমাকে খাইতে বলিলেন। মামা বলিলেন, “সে কী কথা। বিবাহের পাবে বর খাইবে কেমন করিয়া।” এ সম্বন্ধে মামার কোনো মতপ্রকাশকে তিনি সম্পণে উপেক্ষা করিয়া আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “তুমি কী বল। বসিয়া বাইতে দোষ কিছর আছে ?” মাতিমতী মাতৃ-আজ্ঞা-স্বরপে মামা উপস্থিত, তাঁর বিরদ্ধে চলা আমার পক্ষে অসম্পভব । আমি আহারে বসিতে পারিলাম না। তখন শম্ভুনাথবাব মামাকে বলিলেন, “আপনাদিগকে অনেক কষ্ট দিয়াছি। আমরা ԳՏ Ջ গল্পগুচ্ছ ধনী নই, আপনাদের যোগ্য আয়োজন করিতে পারি নাই, ক্ষমা করিবেন। রাত হইয়া গেছে, আর আপনাদের কষ্ট বাড়াইতে ইচ্ছা করি না। এখন তবে—” # মামা বলিলেন, “তা, সভায় চলন, আমরা তো প্রস্তুত আছি।” শম্ভুনাথ বলিলেন, “তবে আপনাদের গাড়ি বলিয়া দিই?" মামা আশ্চর্ষ হইয়া বলিলেন, “ঠাট্টা করিতেছেন নাকি।” শম্ভুনাথ কহিলেন, “ঠাট্টা তো আপনিই করিয়া সারিয়াছেন। ঠাট্টার সম্পকটাকে সথায়ী করিবার ইচ্ছা আমার নাই।” মামা দই চোখ এত বড়ো করিয়া মেলিয়া অবাক হইয়া রহিলেন। শম্ভুনাথ কহিলেন, “আমার কন্যার গহনা আমি চুরি করিব এ কথা যারা মনে করে তাদের হাতে আমি কন্যা দিতে পারি না।” আমাকে একটি কথা বলাও তিনি আবশ্যক বোধ করিলেন না । কারণ, প্রমাণ হইয়া গেছে, আমি কেহই নই। তার পরে যা হইল সে আমি বলিতে ইচ্ছা করি না। ঝাড়লন্ঠন ভাঙিয়া-চুরিয়া, জিনিসপত্র লন্ডভন্ড করিয়া, বরযাত্রের দল দক্ষষজ্ঞের পালা সারিয়া বাহির হইয়া গেল । বাড়ি ফিরিবার সময় ব্যান্ড রসনচৌকি ও কন্সট একসঙ্গে বাজিল না এবং অভ্রের ঝাড়গুলো আকাশের তারার উপর আপনাদের কতব্যের বরাত দিয়া কোথায় ষে মহানিবাণ লাভ করিল সন্ধান পাওয়া গেল না। ෆ বাড়ির সকলে তো রাগিয়া আগন। কন্যার পিতার এত গমের! কলি যে চারপোয়া মেয়ের বিয়ে হইবে না এ ভয় যার মনে নাই তার শাসিতর উপায় কী। সমস্ত বাংলাদেশের মধ্যে আমিই একমাত্র পরিষে যাহাকে কন্যার বাপ বিবাহের আসর হইতে নিজে ফিরাইয়া দিয়াছে। এত বড়ো সৎপাত্রের কপালে এত বড়ো কলকের দাগ কোন নষ্টগ্রহ এত আলো জনালাইয়া, বাজনা বাজাইয়া, সমারোহ করিয়া অকিয়া দিল ? বরষাররা এই বলিয়া কপাল চাপড়াইতে লাগিল যে, বিবাহ হইল না অথচ আমাদের ফাঁকি দিয়া খাওয়াইয়া দিল-পাকযন্ত্রটাকে সমস্ত অন্নসদ্ধে সেখানে টান মারিয়া ফেলিয়া দিয়া আসিতে পারিলে তবে আফসোস মিটিত।’ বিবাহের চুক্তিভঙ্গ ও মানহানির দাবিতে নালিশ করিব বলিয়া মামা অত্যন্ত গোল করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। হিতৈষীরা বুঝাইয়া দিল, তাহা হইলে তামাশার যেটকু বাকি আছে তাহা পরা হইবে। বলা বাহুল্য, আমিও খাব রাগিয়াছিলাম। কোনো গতিকে শম্ভুনাথ বিষম জব্দ হইয়া আমাদের পায়ে ধরিয়া আসিয়া পড়েন, গোঁফের রেখায় তা দিতে দিতে এইটেই । কেবল কামনা করিতে লাগিলাম। কিন্তু, এই আক্লোশের কালো রঙের স্রোতের পাশাপাশি আর-একটা স্লোত বহিতেছিল যেটার রঙ একেবারেই কালো নয়। সমস্ত মন যে সেই অপরিচিতার পানে অপরিচিতা ԳՖՅ -י"ר-שי" - "ז झेल्ला शिश्नाश्ञ्जि-७थाना प्रय उाशएक किइएउद्दे छैनिम्ना शिद्धाइँटछ श्राद्ध ना। দেয়ালটকুর আড়ালে রহিয়া গেল গো। কপালে তার চন্দন অাঁকা, গায়ে তার লাল শাড়ি, মখে তার লজার রক্তিমা, হাদয়ের ভিতরে কী যে তা কেমন করিয়া বলিব । আমার কম্পলোকের কল্পলতাটি বসন্তের সমস্ত ফলের ভার আমাকে নিবেদন করিয়া দিবার জন্য নত হইয়া পড়িয়াছিল। হাওয়া আসে, গন্ধ পাই, পাতার শব্দ শনি— কেবল আর একটিমাত্র পা ফেলার অপেক্ষা—এমন সময়ে সেই এক পদক্ষেপের দরত্বটুকু এক মহাতে অসীম হইয়া উঠিল! এতদিন যে প্রতি সন্ধ্যায় আমি বিনদোদার বাড়িতে গিয়া তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিয়াছিলাম! বিনন্দার বর্ণনার ভাষা অত্যন্ত সংকীর্ণ বলিয়াই তাঁর প্রত্যেক কথাটি সফলিগের মতো আমার মনের মাঝখানে আগন জালিয়া দিয়াছিল। বঝিয়াছিলাম মেয়েটির রূপ বড়ো আশ্চৰ্য; কিন্তু না দেখিলাম তাহাকে চোখে, না দেখিলাম তার ছবি, সমস্তই অপস্ট হইয়া রহিল। বাহিরে তো সে ধরা দিলই না, তাহাকে মনেও আনিতে পারিলাম না— এইজন্য মন সেদিনকার সেই বিবাহসভার দেয়ালটার বাহিরে ভূতের মতো দীঘনিশ্বাস ফেলিয়া বেড়াইতে লাগিল। হরিশের কাছে শনিয়াছি, মেয়েটিকে আমার ফোটোগ্রাফ দেখানো হইয়াছিল। পছন্দ করিয়াছে বই-কি । না করিবার তো কোনো কারণ নাই। আমার মন বলে, সে ছবি তার কোনো-একটি বাক্সের মধ্যে লকোনো আছে। একলা ঘরে দরজা বন্ধ করিয়া এক-একদিন নিরালা দপুরবেলায় সে কি সেটি খালিয়া দেখে না। যখন ঝ:কিয়া পড়িয়া দেখে তখন ছবিটির উপরে কি তার মুখের দুই ধার দিয়া এলোচুল আসিয়া পড়ে না। হঠাৎ বাহিরে কারও পায়ের শব্দ পাইলে সে কি তাড়াতাড়ি তার সুগন্ধ অচিলের মধ্যে ছবিটিকে লুকাইয়া ফেলে না। দিন যায়। একটা বৎসর গেল। মামা তো লক্ষজায় বিবাহসম্বন্ধের কথা তুলিতেই পারেন না। মার ইচ্ছা ছিল, আমার অপমানের কথা যখন সমাজের লোকে ভুলিয়া যাইবে তখন বিবাহের চেষ্টা দেখিবেন। এ দিকে আমি শুনিলাম সে মেয়ের নাকি ভালো পাত্র জটিয়াছিল, কিন্তু সে পণ করিয়াছে বিবাহ করিবে না। শনিয়া আমার মন পলকের আবেশে ভরিয়া গেল । আমি কলপনায় দেখিতে লাগিলাম, সে ভালো করিয়া খায় না; সন্ধ্যা হইয়া আসে, সে চুল বাঁধতে ভুলিয়া যায়। তার বাপ তার মাখের পানে চান আর ভাবেন, আমার মেয়ে দিনে দিনে এমন হইয়া যাইতেছে কেন । হঠাৎ কোনোদিন তার ঘরে আসিয়া দেখেন, মেয়ের দুই চক্ষ জলে ভরা। জিজ্ঞাসা করেন, মা, তোর কী হইয়াছে বলা আমাকে। মেয়ে তাড়াতাড়ি চোখের জল মছিয়া বলে, কই, কিছই তো হয় নি বাবা।” বাপের এক মেয়ে যে—বড়ো আদরের মেয়ে। যখন অনাবটির দিনে ফলের কুড়িটির মতো মেয়ে একেবারে বিমষ হইয়া পড়িয়াছে তখন বাপের প্রাণে আর সহিল না। তখন অভিমান ভাসাইয়া দিয়া তিনি ছটিয়া আসিলেন আমাদের বারে। তার পরে ? তার পরে মনের মধ্যে সেই যে কালো রঙের ধারাটা বহিতেছে সে যেন কালো সাপের মতো রপ ধরিয়া ফোঁস করিয়া উঠিল। সে বলিল, বেশ তো, আরএকবার বিবাহের আসর সাজানো হোক, আলো জলকে, দেশ-বিদেশের লোকের নিমন্ত্রণ হোক, তার পরে তুমি বরের টোপর পায়ে দলিয়া দলবল লইয়া সভা ছাড়িয়া * >8 গল্পগুচ্ছ চলিয়া এসো। কিন্তু, যে ধারাটি চোখের জলের মতো শত্র সে রাজহংসের রাপ ধরিয়া বলিল, যেমন করিয়া আমি একদিন দময়ন্তীর পল্পবনে গিয়াছিলাম তেমনি করিয়া আমাকে একবার উড়িয়া যাইতে দাও- আমি বিরহিণীর কানে কানে একবার সখের খবরটা দিয়া আসি গে। তার পরে ? তার পরে দুঃখের রাত পোহাইল, নববর্ষার জল পড়িল, লান ফলটি মাখ তুলিল—এবারে সেই দেয়ালটার বাহিরে রহিল সমস্ত পথিবীর আর-সবাই, আর ভিতরে প্রবেশ করিল একটিমাত্র মানুষ। তার পরে ? তার পরে আমার কথাটি ফরালো। 8 কিন্তু, কথা এমন করিয়া ফরাইল না। যেখানে আসিয়া তাহা অফরান হইয়াছে সেখানকার বিবরণ একটুখানি বলিয়া আমার এ লেখা শেষ করিয়া দিই। মাকে লইয়া তীথে চলিয়াছিলাম। আমার উপরেই ভার ছিল । কারণ, মামা এবারেও হাবড়ার পল পার হন নাই। রেলগাড়িতে ঘুমাইতেছিলাম। ঝাঁকানি খাইতে খাইতে মাথার মধ্যে নানাপ্রকার এলোমেলো স্বপ্নের ঝুমঝুমি বাজিতেছিল। হঠাৎ একটা কোন স্টেশনে জাগিয়া উঠিলাম। আলোতে অন্ধকারে মেশা সেও এক বন। কেবল আকাশের তারাগুলি চিরপরিচিত— আর সবই অজানা অস্পষ্ট; স্টেশনের দীপ-কয়টা খাড়া হইয়া দাঁড়াইয়া আলো ধরিয়া এই পৃথিবীটা যে কত অচেনা এবং যাহা চারি দিকে তাহা ষে কতই বহন দরে তাহাই দেখাইয়া দিতেছে। গাড়ির মধ্যে মা ঘামাইতেছেন; আলোর নীচে সবুজ পদা টানা; তোরঙ্গ বাক্স জিনিসপত্র সমস্তই কে কার ঘাড়ে এলোমেলো হইয়া রহিয়াছে, তাহারা যেন স্বপনলোকের উলট-পালট আসবাব, সবুজ প্রদোষের মিটমিটে আলোতে থাকা এবং না-থাকার মাঝখানে কেমনএকরকম হইয়া পড়িয়া আছে। এমন সময়ে সেই অদ্ভুত পথিবীর অদ্ভুত রাত্রে কে বলিয়া উঠিল, “শিগগির চলে আয়, এই গাড়িতে জায়গা আছে।" মনে হইল, যেন গান শুনিলাম। বাঙালি মেয়ের গলায় বাংলা কথা যে কী মধর তাহা এমনি করিয়া অসময়ে অজায়গায় আচমকা শুনিলে তবে সম্পণে বঝিতে পারা যায়। কিন্তু, এই গলাটিকে কেবলমাত্র মেয়ের গলা বলিয়া একটা শ্রেণীভুক্ত করিয়া দেওয়া চলে না, এ কেবল একটি-মানুষের গলা; শুনিলেই মন বলিয়া ওঠে, এমন তো আর শনি নাই।’ চিরকাল গলার সবর আমার কাছে বড়ো সত্য। রপ জিনিসটি বড়ো কম নয়, কিন্তু মানুষের মধ্যে যাহা অন্তরতম এবং অনিবাঁচনীয়, আমার মনে হয় কণ্ঠস্বর যেন তারই চেহারা। আমি তাড়াতাড়ি গাড়ির জানলা খলিয়া বাহিরে মুখ বাড়াইয়া দিলাম, কিছই দেখিলাম না। পল্যাটফর্মের অন্ধকারে দাঁড়াইয়া গাড় তাহার একफकद जर्टन नाष्क्लिग्ना मिल, श्राप्लि काळाञ; आभि छानजाब्र काrछ दानग्ना ब्रांश्लाभ । আমার চোখের সামনে কোনো মতি ছিল না, কিন্তু হাদয়ের মধ্যে আমি একটি হদয়ের রপে দেখিতে লাগিলাম। সে যেন এই তারাময়ী রাত্রির মতো, আবত করিয়া ধরে কিন্তু তাহাকে ধরিতে পারা যায় না। ওগো সর, অচেনা কণ্ঠের সর, एमvद्भिक्लिष्ठा 4 ఫిడ; এক নিমেষে তুমি যে আমার চিরপরিচয়ের আসনটির উপরে আসিয়া বসিয়াছ। কী আশ্চর্য পরিপািণ তুমি-চঞ্চল কালের ক্ষুব্ধ হািদয়ের উপরে ফলটির মতো ফটিয়াছ, অথচ তার ঢেউ লাগিয়া একটি পাপড়িও টলে নাই, অপরিমেয় কোমলতায় এতটুকু দাগ পড়ে নাই। গাড়ি লোহার মদগে তাল দিতে দিতে চলিল; আমি মনের মধ্যে গান শনিতে শুনিতে চলিলাম। তাহার একটিমাত্র ধয়ো— গাড়িতে জায়গা আছে " আছে কি, জায়গা আছে কি। জায়গা যে পাওয়া যায় না, কেউ যে কাকেও চেনে না । অথচ সেই না-চেনাটুকু যে কুয়াশামাত্র, সে যে মায়া, সেটা ছিন্ন হইলেই যে চেনার আর অন্ত নাই। ওগো সন্ধাময় সর, যে হািদয়ের অপরপে রপ তুমি, সে কি আমার চিরকালের চেনা নয়। জায়গা আছে আছে— শীঘ্ৰ আসিতে ডাকিয়াছ, শীঘ্রই আসিয়াছি, এক নিমেষও দেরি করি নাই। রাত্রে ভালো করিয়া ঘমে হইল না। প্রায় প্রতি স্টেশনেই একবার করিয়া মাখ বাড়াইয়া দেখিলাম, ভয় হইতে লাগিল যাহাকে দেখা হইল না সে পাছে রাত্রেই নামিয়া যায়। পরদিন সকালে একটা বড়ো স্টেশনে গাড়ি বদল করিতে হইবে। আমাদের ফারস্ট ক্লাসের টিকিট—মনে আশা ছিল, ভিড় হইবে না। নামিয়া দেখি, পল্যাটফমে' সাহেবদের আদর্শলি-দল আসবাবপত্র লইয়া গাড়ির জন্য অপেক্ষা করিতেছে। কোনএক ফৌজের বড়ো জেনারেল-সাহেব ভ্রমণে বাহির হইয়াছেন। দই-তিন মিনিট পরেই গাড়ি আসিল। বুঝিলাম, ফারস্ট ক্লাসের আশা ত্যাগ করিতে হইবে। মাকে লইয়া কোন গাড়িতে উঠি সে এক বিষম ভাবনায় পড়িলাম। সব গাড়িতেই ভিড়। স্বারে বারে উকি মারিয়া বেড়াইতে লাগিলাম। এমন সময় সেকেন্ড ক্লাসের গাড়ি হইতে একটি মেয়ে আমার মাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, “আপনারা আমাদের গাড়িতে আসন-না— এখানে জায়গা আছে।” $ আমি তো চমকিয়া উঠিলাম। সেই আশ্চৰ্যমধরে কন্ঠ এবং সেই গানেরই ধয়া— জায়গা আছে।' ক্ষণমাত্র বিলম্ব না করিয়া মাকে লইয়া গাড়িতে উঠিয়া পড়িলাম । জিনিসপত্র তুলিবার প্রায় সময় ছিল না। আমার মতো অক্ষম দনিয়ায় নাই। সেই মেয়েটিই কুলিদের হাত হইতে তাড়াতাড়ি চলতি গাড়িতে আমাদের বিছানাপত্র টানিয়া লইল। আমার একটা ফোটােগ্রাফ তুলিবার ক্যামেরা স্টেশনেই পড়িয়া রহিল— গ্রাহাই করিলাম না। - তার পরে— কী লিখিব জানি না । আমার মনের মধ্যে একটি অখণ্ড আনন্দের ছবি আছে—তাহাকে কোথায় শরে করিব, কোথায় শেষ করিব ? বসিয়া বসিয়া বাক্যের পর বাক্য যোজনা করিতে ইচ্ছা করে না। এবার সেই সরেটিকে চোখে দেখিলাম ; তখনো তাহাকে সরে বলিয়াই মনে হইল। মায়ের মাখের দিকে চাহিলাম; দেখিলাম তাঁর চোখে পলক পড়িতেছে না। মেয়েটির বয়স ষোলো কি সতেরো হইবে, কিন্তু নবযৌবন ইহার দেহে মনে কোথাও যেন একটাও ভার চাপাইয়া দেয় নাই। ইহার গতি সহজ, দীপ্তি নিমল, সৌন্দষের শচিতা অপব, ইহার কোনো জায়গায় কিছ জড়িমা নাই। আমি দেখিতেছি, বিস্তারিত করিয়া কিছু বলা আমার পক্ষে অসম্ভব। এমন-কি, ৭১৬ গল্পগুচ্ছ - সে যে কী রঙের কাপড় কেমন করিয়া পরিয়াছিল তাহাও ঠিক করিয়া বলিতে পারিব না। এটা খুব সত্য যে, তার বেশে ভূষায় এমন কিছই ছিল না যেটা তাহাকে ছাড়াইয়া বিশেষ করিয়া চোখে পড়িতে পারে। সে নিজের চারি দিকের সকলের চেয়ে অধিক-রজনীগন্ধার শত্র মঞ্জরীর মতো সরল বাতটির উপরে দাঁড়াইয়া, যে গাছে ফটিয়াছে সে গাছকে সে ত্রকেবারে অতিক্ৰম করিয়া উঠিয়াছে সঙ্গে দটি-তিনটি ছোটো ছোটো মেয়ে ছিল, তাহাদিগকে লইয়া তাহার হাসি এবং কথার আর অন্ত ছিল না। আমি হাতে একখানা বই লইয়া সে দিকে কান পাতিয়া রাখিয়াছিলাম। যেটুকু কানে আসিতেছিল সে তো সমস্তই ছেলেমানষেদের সঙ্গে ছেলেমানষি কথা। তাহার বিশেষত্ব এই যে, তাহার মধ্যে বয়সের তফাত কিছুমাত্র ছিল না— ছোটোদের সঙ্গে সে অনায়াসে এবং আনন্দে ছোটো হইয়া গিয়াছিল। সঙ্গে কতকগুলি ছবিওয়ালা ছেলেদের গল্পের বই— তাহারই কোন-একটা বিশেষ গল্প শোনাইবার জন্য মেয়েরা তাহাকে ধরিয়া পড়িল । এ গল্প নিশ্চয় তারা বিশ-পচিশ বার শনিয়াছে। মেয়েদের কেন যে এত আগ্রহ তাহা বুঝিলাম। সেই সন্ধাকঠের সোনার কাঠিতে সকল কথা যে সোনা হইয়া ওঠে। মেয়েটির সমস্ত শরীর মন যে একেবারে প্রাণে ভরা, তার সমস্ত চলায় বলায় পশে প্রাণ ঠিকরিয়া ওঠে । তাই মেয়েরা যখন তার মুখে গলপ শোনে তখন, গল্প নয়, তাহাকেই শোনে ; তাহাদের হাদয়ের উপর প্রাণের ঝন ঝরিয়া পড়ে। তার সেই উদ্ভাসিত প্রাণ আমার সেদিনকার সমস্ত সযকিরণকে সজীব করিয়া তুলিল; আমার মনে হইল, আমাকে যে প্রকৃতি তাহার আকাশ দিয়া বেটন করিয়াছে সে ঐ তরণীরই অক্লান্ত অম্লান প্রাণের বিশ্বব্যাপী বিস্তার – পরের স্টেশনে পেশছিতেই খাবারওয়ালাকে ডাকিয়া সে খুব খানিকটা চানা-মঠ কিনিয়া লইল, এবং মেয়েদের সঙ্গে মিলিয়া নিতান্ত ছেলেমানষের মতো করিয়া কলহাস্য করিতে করিতে অসংকোচে খাইতে লাগিল। আমার প্রকৃতি যে জাল দিয়া বেড়া— আমি কেন বেশ সহজে হাসিমুখে মেয়েটির কাছে এই চানা একমঠা চাহিয়া লইতে পারিলাম না। হাত বাড়াইয়া দিয়া কেন আমার লোভ স্বীকার করিলাম না। মা ভালো-লাগা এবং মন্দ-লাগার মধ্যে দোমনা হইয়া ছিলেন । গাড়িতে আমি পরষমানুষ, তব ইহার কিছুমাত্র সংকোচ নাই, বিশেষত এমন লোভীর মতো থাইতেছে, সেটা ঠিক তাঁর পছন্দ হইতেছিল না; অথচ ইহাকে বেহায়া বলিয়াও তাঁর ভ্রম হয় নাই। তাঁর মনে হইল, এ মেয়ের বয়স হইয়াছে কিন্তু শিক্ষা হয় নাই। মা হঠাৎ কারও সঙ্গে আলাপ করিতে পারেন না। মানুষের সঙ্গে দরে দরে থাকাই তাঁর অভ্যাস। এই মেয়েটির পরিচয় লইতে তাঁর খুব ইচ্ছা, কিন্তু স্বাভবিক বাধা কাটাইয়া উঠিতে পারিতেছিলেন না। এমন সময়ে গাড়ি একটা বড়ো স্টেশনে আসিয়া থামিল । সেই জেনারেল-সাহেবের একদল অনসঙ্গী এই স্টেশন হইতে উঠিবার উদযোগ করিতেছে। গাড়িতে কোথাও জায়গা নাই। বারবার আমাদের গাড়ির সামনে দিয়া তারা ঘরিয়া গেল। মা তো ভয়ে আড়ম্বট, আমিও মনের মধ্যে শান্তি পাইতেছিলাম না। গাড়ি ছাড়িবার অলপকাল-পাবে একজন দেশী রেলোয়ে কমচারী নাম-লেখা দইখানা টিকিট গাড়ির দুই বেঞ্চের শিয়রের কাছে লটকাইয়া দিয়া আমাকে বলিল, অপরিচিতা at: “এ গাড়ির এই দুই বেষ্ট আগে হইতেই দুই সাহেব রিজাভা করিয়াছেন, আপনাদিগকে অন্য গাড়িতে যাইতে হইবে।” - আমি তো তাড়াতাড়ি ব্যস্ত হইয়া দাঁড়াইয়া উঠিলাম। মেয়েটি হিন্দিতে বলিল, “না, আমরা গাড়ি ছাড়িব না।” সে লোকটি রোখ করিয়া বলিল, “না ছাড়িয়া উপায় নাই।” কিন্তু, মেয়েটির চলিষ্ণতার কোনো লক্ষণ না দেখিয়া সে নামিয়া গিয়া ইংরেজ স্টেশন-মাস্টারকে ডাকিয়া আনিল। সে আসিয়া আমাকে বলিল, “আমি দুঃখিত, «-چrچf শনিয়া আমি কুলি কুলি করিয়া ডাক ছাড়িতে লাগিলাম। মেয়েটি উঠিয়া দই চক্ষে অনিবষণ করিয়া বলিল, "না, আপনি যাইতে পরিবেন না, যেমন আছেন বসিয়া থাকুন।" বলিয়া সে বারের কাছে দাঁড়াইয়া স্টেশন-মাস্টারকে ইংরেজি ভাষায় বলিল, “এ গাড়ি আগে হইতে রিজাভ করা, এ কথা মিথ্যা কথা ।” বলিয়া নাম লেখা টিকিটটি খালিয়া পল্যাটফমে ছড়িয়া ফেলিয়া দিল। দাঁড়াইয়াছে। গাড়িতে সে তার আসবাব উঠাইবার জন্য আদর্ণলিকে প্রথমে ইশারা করিয়াছিল। তাহার পরে মেয়েটির মুখে তাকাইয়া, তার কথা শুনিয়া, ভাব দেখিয়া, স্টেশন-মাস্টারকে একটু পশ করিল এবং তাহাকে আড়ালে লইয়া গিয়া কী কথা হইল জানি না। দেখা গেল, গাড়ি ছাড়িবার সময় অতীত হইলেও আর-একটা গাড়ি জড়িয়া তবে ট্রেন ছাড়িল । মেয়েটি তার দলবল লইয়া আবার একপত্তন চানা-মঠ শোভা দেখিতে লাগিলাম । কানপরে গাড়ি আসিয়া থামিল। মেয়েটি জিনিসপত্র বধিয়া প্রস্তুত—স্টেশনে একটি হিন্দপথানি চাকর ছটিয়া আসিয়া ইহাদিগকে নামাইবার উদ্যোগ করিতে লাগিল । মা তখন আর থাকিতে পারিলেন না। জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমার নাম কী মা।” মেয়েটি বলিল, “আমার নাম কল্যাণী ।” শুনিয়া মা এবং আমি দুজনেই চমকিয়া উঠিলাম। “তোমার বাবা--" “তিনি এখানকার ডাক্তার, তাঁহার নাম শম্ভুনাথ সেন।” তার পরেই সবাই নামিয়া গেল । উপসংহার আসিয়াছি। কল্যাণীর বাপ এবং কল্যাণীর সঙ্গে দেখা হইয়াছে। হাত জোড় করিয়াছি, মাথা হে’ট করিয়াছি; শৰ্ম্মভূনাথবাবর হদয় গলিয়াছে। কল্যাণী বলে, “আমি विश्वाझ् कुझिय ना ॥“ , , ,” “ , ●ゞげ গল্পগুচ্ছ আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কেন।” সে বলিল, “মাতৃ-আজ্ঞা।” কী সবনাশ। এ পক্ষেও মাতুল আছে নাকি । তার পরে বঝিলাম, মাতৃভূমি আছে। সেই বিবাহ-ভাঙার পর হইতে কল্যাণী মেয়েদের শিক্ষার ব্রত গ্রহণ করিয়াছে। কিন্তু, আমি আশা ছাড়িতে পারলাম না। সেই সরটি যে আমার হাদয়ের মধ্যে আজও বাজিতেছে—সে যেন কোন ওপারের বাঁশি—আমার সংসারের বাহির হইতে আসিল—সমস্ত সংসারের বাহিরে ডাক দিল। আর, সেই-যে রাত্রির অন্ধকারের মধ্যে আমার কানে আসিয়াছিল জায়গা আছে, সে যে আমার চিরজীবনের গানের ধয়া হইয়া রহিল। তখন আমার বয়স ছিল তেইশ, এখন হইয়াছে সাতাশ । এখনো আশা ছাড়ি নাই, কিন্তু মাতুলকে ছাড়িয়াছি। নিতান্ত এক ছেলে বলিয়া মা আমাকে ছাড়িতে পারেন নাই। তোমরা মনে করিতেছ, আমি বিবাহের আশা করি ? না, কোনো কালেই না। আমার মনে আছে, কেবল সেই এক রাত্রির অজানা কঠের মধরে সমরের আশা— জায়গা আছে। নিশ্চয়ই আছে। নইলে দাঁড়াব কোথায়। তাই বৎসরের পর বৎসর যায়— আমি এইখানেই আছি। দেখা হয়, সেই কণ্ঠ শনি, যখন সুবিধা পাই কিছল তার কাজ করিয়া দিই— আর মন বলে, এই তো জায়গা পাইয়াছি। ওগো অপরিচিতা, তোমার পরিচয়ের শেষ হইল না, শেষ হইবে না; কিন্তু ভাগ্য আমার ভালো, এই তো আমি জায়গা পাইয়াছি। কাতিক ১৩২১