গল্পগুচ্ছ/একটা আষাঢ়ে গল্প

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

একটা আষাঢ়ে গল্প দুর সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ। সেখানে কেবল তাসের সাহেব, তাসের বিবি টেক্কা এবং গোলামের বাস। দুরি তিরি হইতে নহল৷ দহলা পর্যন্ত আরও অনেক-ঘর গৃহস্থ আছে, কিন্তু তাহারা উচ্চজাতীয় নহে। টেক্কা সাহেব গোলাম এই তিনটেই প্রধান বর্ণ ; নহল। দহলারা অস্ত্যজ, তাহাদের সহিত এক পঙক্তিতে বসিবার যোগ্য নহে। কিন্তু, চমৎকার শৃঙ্খলা। কাহার কত মূল্য এবং মর্যাদা তাহ বহুকাল হইতে স্থির হইয়া গেছে, তাহার রেখামাত্র ইতস্তত হইবার জো নাই । সকলেই যথানির্দিষ্টমতে আপন আপন কাজ করিয়া যায়— বংশাবলিক্রমে কেবল পূর্ববর্তীদিগের উপর দাগা বুলাইয়া চলা । সে যে কী কাজ তাহ বিদেশীর পক্ষে বোঝা শক্ত । হঠাৎ খেলা বলিয়া ভ্রম হয় । কেবল নিয়মে চলাফেরা, নিয়মে যাওয়া-আসা, নিয়মে ওঠাপড়া । অদৃশু হস্তে তাহাদিগকে চালনা করিতেছে এবং তাহারা চলিতেছে। তাহাদের মুখে কোনো ভাবের পরিবর্তন নাই । চিরকাল একমাত্র ভাব ছাপ মারা রহিয়াছে। যেন ফ্যাল্‌-ফ্যাল ছবির মতো । মান্ধাতার আমল হইতে মাথার টুপি অবধি পায়ের জুতা পর্যন্ত অবিকল সমভাবে রহিয়াছে । কখনো কাহাকেও চিন্তা করিতে হয় না, বিবেচনা করিতে হয় না ; সকলেই মৌন নিজীবিভাবে নি:শব্দে পদচারণ করিষা বেড়ায় ; পতনের সময় নিঃশব্দে পড়িয়া যায় এবং অবিচলিত মুখশ্ৰী লইয়া চিৎ হইয়া আকাশের দিকে তাকাইয়া থাকে। * কাহারও কোনো আশা নাই, অভিলাষ নাই, ভয় নাই, নূতন পথে চলিবার চেষ্টা নাই, হাসি নাই, কান্না নাই, সন্দেহ নাই, দ্বিধা নাই । খাচার মধ্যে যেমন পাখি ঝটুপটু করে, এই চিত্ৰিতবং মূর্তিগুলির অস্তরে সেরূপ কোনোএকটা জীবন্ত প্রাণীর অশাস্ত আক্ষেপের লক্ষণ দেখা যায় না । অথচ এক কালে এই খাচাগুলির মধ্যে জীবের বসতি ছিল— তখন খাচা ফুলিত এবং ভিতর হইতে পাথার শব্দ এবং গান শুনা যাইত, গভীর অরণ্য একটা আষাঢ়ে গল্প לסל এবং বিস্তৃত আকাশের কথা মনে পড়িত। এখন কেবল পিঞ্জরের সংকীর্ণত এবং স্বশৃঙ্খল শ্রেণীবিন্যস্ত লৌহশলাকাগুলাই অনুভব করা যায়- পাখি উড়িয়াছে কি মরিয়াছে কি জীবনমৃত হইয়া আছে, তাহা কে বলিতে পারে। আশ্চর্য স্তব্ধতা এবং শান্তি। পরিপূর্ণ স্বস্তি এবং সন্তোষ। পথে ঘাটে গৃহে সকলই সুসংযত, সুবিহিত— শব্দ নাই, দ্বন্দ্ব নাই, উৎসাহ নাই, আগ্রহ নাই, কেবল নিত্য-নৈমিত্তিক ক্ষুদ্র কাজ এবং ক্ষুদ্র বিশ্রাম । সমুদ্র অবিশ্রাম একতানশব্দপূর্বক তটের উপর সহস্ৰ ফেনশুভ্র কোমল করতলের আঘাত করিয়া সমস্ত দ্বীপকে নিদ্রাবেশে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছেপক্ষীমাতার দুই প্রসারিত নীলপক্ষের মতো আকাশ দিগৃদিগন্তের শাস্তিরক্ষা করিতেছে। অতিদূর পরপারে গাঢ় নীল রেখার মতো বিদেশের আভাস দেখা যায়— সেখান হইতে রাগদ্বেষের দ্বন্দ্ব-কোলাহল সমুদ্র পার হইয়া আসিতে পারে না । ૨ সেই পরপারে, সেই বিদেশে, এক দুয়ারানীর ছেলে এক রাজপুত্র বাস করে। সে তাহার নির্বাসিত মাতার সহিত সমুদ্রতীরে আপন-মনে বাল্যকাল যাপন করিতে থাকে। সে একা বসিয়া বসিয়া মনে-মনে এক অত্যস্ত বৃহৎ অভিলাষের জাল বুনিতেছে। সেই জাল দিগৃদিগন্তরে নিক্ষেপ করিয়া কল্পনায় বিশ্বজগতেৰ নব নব রহস্যরাশি সংগ্ৰহ করিয়া আপনার দ্বারের কাছে টানিয়া তুলিতেছে । তাহার অশান্ত চিত্ত সমুদ্রের তীরে আকাশের সীমায় ওই দিগন্তরোধী নীল গিরিমালার পরপারে সর্বদ সঞ্চরণ করিয়া ফিরিতেছে— খুজিতে চায় কোথায় পক্ষীরাজ ঘোড়া, সাপের মাথার মানিক, পারিজাত পুষ্প, সোনার কাঠি, রুপার কাঠি পাওয়া যায়— কোথায় সাত সমূদ্র তেরো নদীর পারে দুর্গম দৈত্যভবনে স্বপ্নসম্ভবা অলোকস্বন্দরী রাজকুমারী ঘুমাইয়া রহিয়াছেন। রাজপুত্র পাঠশালে পড়িতে যায়, সেখানে পাঠাস্তে সদাগরের পুত্রের কাছে দেশ-বিদেশের কথা এবং কোটালের পুত্রের কাছে তাল-বেতালের কাহিনী শোনে । ১৩২ গল্পগুচ্ছ ঝুপ ঝুপ করিয়া বৃষ্টি পড়ে, মেঘে অন্ধকার হইয়া থাকে— গৃহদ্বারে মায়ের কাছে বসিয়া সমুদ্রের দিকে চাহিয়া রাজপুত্র বলে, “ম, একটা খুব দূর দেশের গল্প বলে ।” মা অনেক ক্ষণ ধরিয়া তাহার বাল্যশ্রত এক অপূর্ব দেশের অপূর্ব গল্প বলিতেন ; বৃষ্টির ঝরঝর শব্দের মধ্যে সেই গল্প শুনিয়া রাজপুত্রের হৃদয় উদাস হইয়া যাইত । একদিন সদাগরের পুত্র আসিয়া রাজপুত্রকে কহিল, “সাঙাত, পড়াশুনা তো সাঙ্গ করিয়াছি ; এখন একবার দেশভ্রমণে বাহির হইব, তাই বিদায় লইতে আসিলাম ।” রাজার পুত্ৰ কহিল, “আমিও তোমার সঙ্গে যাইব ।” কোটালের পুত্ৰ কহিল, “আমাকে কি এক ফেলিয়া যাইবে । আমিও তোমাদের সঙ্গী।" রাজপুত্র দুঃখিনী মাকে গিয়া বলিল, “মা, আমি ভ্রমণে বাহির হইতেছি— এবার তোমার দুঃখমোচনের উপায় করিয়া আসিব ।” তিন বন্ধুতে বাহির হইয়া পড়িল । \S) সমুদ্রে সদাগরের দ্বাদশতরী প্রস্তুত ছিল, তিন বন্ধু চড়িয়া বসিল । দক্ষিণের বাতাসে পাল ভরিয়া উঠিল, নৌকাগুলা রাজপুত্রের হৃদয়বাসনার মতে ছুটিয়া চলিল । শঙ্খ দ্বীপে গিয়া এক-নৌকা শঙ্খ, চন্দনদ্বীপে গিয়া এক-নৌকা চন্দন, প্রবালদ্বীপে গিয়া এক-নৌকা প্রবাল বোঝাই হইল । তাহার পর আর চারি বৎসরে গজদন্ত মৃগনাভি লবঙ্গ জায়ফলে যখন আরচারিটি নৌকা পূর্ণ হইল তখন সহসা একটা বিপর্যয় ঝড় আসিল । সব-কটা নৌকা ডুবিল, কেবল একটি নৌকা তিন বন্ধুকে একটা দ্বীপে জাছাড়িয়া ফেলিয়া থানখান হইয়া গেল । এই দ্বীপে তাসের টেক্কা, তাসের সাহেব, তাসের বিবি, তাসের গোলাম যথানিয়মে বাস করে এবং দহলা-নহলাগুলাও তাহাদের পদানুবর্তী হইয়া যথানিয়মে কাল কাটায়। একটা আষাঢ়ে গল্প ססצ 8 তাসের রাজ্যে এতদিন কোনো উপদ্রব ছিল না । এই প্রথম গোলযোগের সূত্রপাত হইল । এতদিন পরে প্রথম এই একটা তর্ক উঠিল— এই-ষে তিনটে লোক ইঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলায় সমুদ্র হইতে উঠিয়া আসিল, ইহাদিগকে কোন শ্রেণীতে ফেলা যাইবে । প্রথমত, ইহার কোন জাতি— টেক্ক, সাহেব, গোলাম ন দহলা-নহলা ? দ্বিতীয়ত, ইহারা কোন গোত্ৰ— ইস্কাবন, চিড়েতন, হরতন, অথবা রুহিতন ? এ-সমস্ত স্থির না হইলে ইহাদের সহিত কোনোরূপ ব্যবহার করাই কঠিন । ইহার কাহার অল্প খাইবে, কাহার সহিত বাস করিবে— ইহাদের মধ্যে অধিকারভেদে কেই বা বায়ুকোণে, কেই বা নৈঋত কোণে, কেই বা ঈশানকোণে মাথা রাখিয়া এবং কেই বা দণ্ডায়মান হইয়া নিদ্রা দিবে, তাহার কিছুই স্থির श्रुग्न नीं । এ রাজ্যে এত বড়ো বিষম দুশ্চিস্তার কারণ ইতিপূর্বে আর-কখনো ঘটে নাই । কিন্তু, ক্ষুধাকাতর বিদেশী বন্ধু তিনটির এ-সকল গুরুতর বিষয়ে তিলমাত্র চিস্তা নাই । তাহারা কোনো গতিকে আহার পাইলে বঁাচে । যখন দেখিল তাহাদের আহারাদি দিতে সকলে ইতস্তত করিতে লাগিল এবং বিধান খুজিবার জন্য টেক্কার বিরাট সভা আহবান করিল, তখন তাহারা যে যেখানে যে খাদ্য পাইল থাইতে আরম্ভ করিয়া দিল । এই ব্যবহারে দুরি তিরি পর্যন্ত অবাক । তিরি কহিল, “ভাই দুরি, ইহাদের বাচবিচার কিছুই নাই।” দুরি কহিল, “ভাই তিরি, বেশ দেখিতেছি ইহারা আমাদের অপেক্ষাও নীচজাতীয় ।” আহারাদি করিয়া ঠাণ্ড হইয়া তিন বন্ধু দেখিল, এখানকার মানুষগুলী কিছু নূতন রকমের। যেন জগতে ইহাদের কোথাও মূল নাই। ৰেন ইহাদের টিকি ধরিয়া কে উৎপাটন করিয়া লইয়াছে, ইহার একপ্রকার 〉○8 গল্পগুচ্ছ হতবুদ্ধিভাবে সংসারের স্পর্শ পরিত্যাগ করিয়া জুলিয়া দুলিয়া বেড়াইতেছে। যাহা-কিছু করিতেছে তাহা যেন আর-একজন কে করাইতেছে । ঠিক যেন পুংলাবাজির দোদুল্যমান পুতুলগুলির মতো। তাই কাহারও মুখে ভাব নাই, ভাবনা নাই, সকলেই নিরতিশয় গম্ভীর চালে যথানিয়মে চলাফের করিতেছে। অথচ সবমুদ্ধ ভারি অদ্ভুত দেখাইতেছে। চারি দিকে এই জীবন্ত নিজীবতার পরমগম্ভীর রকম-সকম দেখিয়া রাজপুত্র আকাশে মুখ তুলিয়া হা-হা করিয়া হাসিয়া উঠিল । এই আন্তরিক কৌতুকের উচ্চ হাস্যধ্বনি তাসরাজ্যের কলরবহীন রাঞ্জপথে ভারি বিচিত্র শুনাইল । এখানে সকলই এমনি একাস্ত যথাযথ, এমনি পরিপাটি, এমনি প্রাচীন, এমনি স্বগম্ভীর যে, কৌতুক আপনার অকস্মাৎ-উচ্ছ্বাসিত উচ্চ স্থল শব্দে আপনি চকিত হইয়া, স্নান হইয়া, নির্বাপিত হইয়া গেল— চারি দিকের লোকপ্রবাহ পূর্বাপেক্ষা দ্বিগুণ স্তব্ধ গম্ভীর অনুভূত হইল। কোটালের পুত্র এবং সদাগরের পুত্র ব্যাকুল হইয়া রাজপুত্রকে কহিল, “ভাই সাঙাত, এই নিরানন্দ ভূমিতে আর এক দণ্ড নয় । এখানে আর দুই দিন থাকিলে মাঝে মাঝে আপনাকে স্পর্শ করিয়া দেখিতে হইবে জীবিত আছি কিনা ।” রাজপুত্ৰ কহিল, “না ভাই, আমার কৌতুহল হইতেছে। ইহার মানুষের মতো দেখিতে— ইহাদের মধ্যে এক-ফোটা জীবন্ত পদার্থ আছে কিনা একবার নাড় দিয়া দেখিতে হইবে।” Q এমনি তো কিছুকাল যায়। কিন্তু, এই তিনটে বিদেশী যুবক কোনো নিয়মের মধ্যেই ধরা দেয় না। যেখানে যখন ওঠা, বসা, মুখ ফেরানো, উপুড় হওয়া, চিং হওয়া, মাথা নাড়া, ডিগ বাজি খাওয়া উচিত, ইহারা তাহার কিছুই করে না ; বরং সকৌতুকে নিরীক্ষণ করে এবং হাসে । এই-সমস্ত যথাবিহিত অশেষ ক্রিয়াকলাপের মধ্যে যে-একটি দিগগজ গাম্ভীর্ঘ আছে ইহারা তদ্বারা অভিভূত হয় না। একদিন টেক্কা সাহেব গোলাম আসিয়া রাজপুত্র, কোটালের পুত্র এবং একটা আষাঢ়ে গল্প 》○○ সদাগরের পুত্রকে হাড়ির মতো গলা করিয়া অবিচলিত গম্ভীরমুখে জিজ্ঞাসা করিল, “তোমরা বিধানমতে চলিতেছ না কেন ।” তিন বন্ধু উত্তর করিল, “আমাদের ইচ্ছা ।” হাড়ির মতো গল করিয়া তাসরাজ্যের তিন অধিনায়ক স্বপ্নাভিভূতের মতো বলিল, “ইচ্ছা ? সে বেটা কে ৷” ইচ্ছ। কী সেদিন বুঝিল না, কিন্তু ক্রমে ক্রমে বুঝিল । প্রতিদিন দেখিতে লাগিল, এমন করিয়া না চলিয়া অমন করিয়া চলা ও সম্ভব, যেমন এ দিক আছে তেমনি ও দিক ও আছে– বিদেশ হইতে তিনটে জীবস্ত দৃষ্টাস্ত আসিয়া জানাইয়া দিল, বিধানের মধ্যেই মানবের সমস্ত স্বাধীনতার সীমা নহে। এমনি করিয়া তাহারা ইচ্ছানামক একটা রাজশক্তির প্রভাব অস্পষ্ট ভাবে অমুভব করিতে লাগিল । ওই সেটি যেমনি অতু ভব করা অমনি তাসরাজ্যের আগাগোড়া অল্প অল্প করিয়া আন্দোলিত হইতে আরম্ভ হইল— গীতনিদ্র প্রকাগু অজগরসপের অনেক গুলা কুণ্ডলীর মধ্যে জাগরণ যেমন অত্যস্ত মন্দগতিতে সঞ্চালন করিতে থাকে সেই রূপ । ○ নিধিকারমূর্তি বিবি এতদিন কাহার ৪ দিকে দৃষ্টিপাত করে নাই, নিৰ্বাক লিঙ্কদবিগ্নভাবে আপনার কাজ করিয়া গেছে। এখন একদিন বসন্তের অপরাহে ইহাদের মধ্যে একজন চকিতের মতো ঘনকৃষ্ণ পক্ষ উর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত করিয়া রাজপুত্রের দিকে মুগ্ধ নেত্রের কটাক্ষপাত করিল । রাজপুত্র চমকিয়া উঠিয়া কহিল, “এ কী সর্বনাশ । আমি জানিতাম, ইহার এক-একটা মূর্তিবং– তাহ তো নহে, দেখিতেছি এ যে নারী ।” কোটালের পুত্র ও সদাগরের পুত্রকে নিভৃতে ডাকিয়া লইয়া রাজকুমার কহিল, “ভাই, ইহার মধ্যে বডো মাধুর্য আছে। তাহার সেই নবভাবোদীপ্ত কৃষ্ণনেত্রের প্রথম কটাক্ষপাতে আমার মনে হইল, যেন আমি এক নূতনম্বষ্ট জগতের প্রথম উষার প্রথম উদয় দেখিতে পাইলাম। এতদিন যে ধৈর্য ধরিয়া অবস্থান করিতেছি আজ তাহ! সার্থক হইল।” দুই বন্ধু পরম কৌতুহলের সহিত সহাস্তে কহিল, “সত্য নাকি, সাঙাত ।” ১৩৬ গল্পগুচ্ছ সেই হতভাগিনী হবৃত্তনের বিধিটি আজ হইতে প্রতিদিন নিয়ম ভুলিতে লাগিল। তাহার যখন যেখানে হাজির হওয়া বিধান, মুহুর্মুহু তাহার ব্যতিক্রম হইতে আরম্ভ হইল। মনে করে, যখন তাহাকে গোলামের পার্শ্বে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া দাড়াইতে হইবে তখন সে হঠাৎ রাজপুত্রের পার্শ্বে আসিয়া দাড়ায় ; গোলাম অবিচলিত ভাবে সুগম্ভীর কণ্ঠে বলে, “বিবি, তোমার ভুল হইল।” শুনিয়া হর্তনের বিবির স্বভাবত-রক্ত কপোল অধিকতর রক্তবর্ণ হইয় উঠে, তাহার নির্নিমেষ প্রশান্ত দৃষ্টি নত হইয়া যায়। রাজপুত্র উত্তর দেয়, “কিছু ভুল হয় নাই, আজ হইতে আমিই গোলাম।” নবপ্রস্ফুটিত রমণীহৃদয় হইতে এ কী অভূতপূর্ব শোভা, এ কী অভাবনীয় লাবণ্য বিস্ফুরিত হইতে লাগিল। তাহার গতিতে এ কী স্বমধুর চাঞ্চল্য, তাহার দৃষ্টিপাতে এ কী হৃদয়ের হিল্লোল, তাহার সমস্ত অস্তিত্ব হইতে এ কী একটি মুগন্ধি আরতি উচ্ছ্বাস উচ্ছসিত হইয়া উঠিতেছে। এই নব-অপরাধিনীর ভ্রমসংশোধনে সাতিশয় মনোযোগ করিতে গিয়া আজকাল সকলেরই ভ্রম হইতে লাগিল । টেক্কা আপনার চিরন্তন মর্যাদারক্ষার কথা বিস্তৃত হইল, সাহেবে গোলামে আর প্রভেদ থাকে না, দহলা-নহলা গুলা পর্যস্ত কেমন হইয়া গেল । এই পুরাতন দ্বীপে বসন্তের কোকিল অনেকবার ডাকিয়াছে, কিন্তু সেইবার যেমন ডাকিল এমন আর-কখনো ডাকে নাই । সমুদ্র চিরদিন একতান কলধ্বনিতে গান করিয়া আসিতেছে ; কিন্তু এতদিন সে সনাতন বিধানের অলঙ্ঘ্য মহিমা এক স্বরে ঘোষণা করিয়া আসিয়াছে— আঞ্জ সহসা দক্ষিণবায়ুচঞ্চল বিশ্বব্যাপী দুরন্ত যৌবনতরঙ্গরাশির মতো আলোতে ছায়াতে ভঙ্গীতে ভাষাতে আপনার অগাধ আকুলতা ব্যক্ত করিতে চেষ্টা করিতে লাগিল । 수 এই কি সেই টেক্ক, সেই সাহেব, সেই গোলাম। কোথায় গেল সেই পরিতুষ্ট পরিপুষ্ট স্বগোল মুখচ্ছবি। কেহ বা আকাশের দিকে চায়, কেহ বা সমুদ্রের ধারে বসিয়া থাকে, কাহারও বা রাত্রে নিদ্রা হয় না, কাহারও বা আহারে মন নাই। একটা আষাঢ়ে গল্প ১৩৭ মুখে কাহারও ঈর্ষা, কাহারও অম্বুরাগ, কাহারও ব্যাকুলত, কাহারও ংশয় । কোথাও হাসি, কোথাও রোদন, কোথাও সংগীত । সকলেরই নিজের নিজের প্রতি এবং অন্যের প্রতি দৃষ্ট পড়িয়াছে। সকলেই আপনার সহিত অন্তের তুলনা করিতেছে। টেক্কা ভাবিতেছে, "সাহেব ছোকরাটাকে দেখিতে নেহাত মন্দ না হউক কিন্তু উহার ঐ নাই— আমার চাল-চলনের মধ্যে এমন একটা মাহাত্ম্য আছে যে, কোনো কোনো ব্যক্তিবিশেষের দৃষ্টি আমার দিকে আকৃষ্ট না হইয়া থাকিতে পারে না ।” সাহেব ভাবিতেছে ‘টেক্কা সর্বদা ভারি টক্‌টক্‌ করিয়া ঘাড় বাকাইয়া বেড়াইতেছে ; মনে করিতেছে, উহাকে দেখিয়া বিবিগুলা বুক ফাটিয়া মারা গেল।’ বলিয়া ঈষৎ বক্র হাসিয়া দর্পণে মুখ দেখিতেছে। দেশে যতগুলি বিবি ছিলেন সকলেই প্রাণপণে সাজসজ্জা করেন আর পরম্পরকে লক্ষ্য করিয়া বলেন, ‘আ মরিয়া যাই । গর্বিণীর এত সাজের ধুম কিসের জন্য গে। বাপু । উহার রকম-সকম দেখিয়া লজ্জ করে ? বলিয়া দ্বিগুণ প্রযত্বে হাবভাব বিস্তার করিতে থাকেন। আবার কোথাও দুই সখায়, কোথাও দুই সখীতে গলা ধরিয়া নিভৃতে বসিয়া গোপন কথাবার্ত হইতে থাকে। কখনো হাসে, কখনো কঁাদে, কখনো রাগ করে, কখনো মান-অভিমান চলে, কখনো সাধাসাধি হয় । যুবকগুলা পথের ধারে বনের ছায়ায় তরুমূলে পৃষ্ঠ রাখিয়া, শুষ্কপত্ররাশির উপর পা ছড়াইয়া, অলস ভাবে বসিয়া থাকে । বালা সুনীল বসন পরিয়া সেই ছায়াপথ দিয়া আপন-মনে চলিতে চলিতে সেইখানে আসিয়া মুখ নত করিয়া চোখ ফিরাইয়া লয়— যেন কাহাকেও দেখিতে পায় নাই, যেন কাহাকেও দেখা দিতে আসে নাই, এমনি ভাব করিয়া চলিয়া যায় । তাই দেখিয়া কোনো কোনো থেপা যুবক দুঃসাহসে ভর করিয়া তাড়াতাড়ি কাছে অগ্রসর হয়, কিন্তু মনের মতো একটাও কথা জোগায় না; অপ্রতিভ হইয়া দাড়াইয়া পড়ে, অমুকুল অবসর চলিয়া যায় এবং রমণীও অতীত মুহূর্তের মতো ক্রমে ক্রমে দূরে বিলীন হইয়া যায়। মাথার উপরে পাখি ডাকিতে থাকে, বাতাস অঞ্চল ও অলক উড়াইয়া XHb” গল্পগুচ্ছ হু হু করিয়া বহিয়া যায়, তরুপল্লব ঝরঝর মর্মর করে এবং সমুদ্রের অবিশ্রাম উচ্ছসিত ধ্বনি হৃদয়ের অব্যক্ত বাসনাকে দ্বিগুণ দোদুল্যমান করিয়া তোলে। একটা বসন্তে তিনটে বিদেশী যুবক আসিয়া মরা গাঙে এমনি একটা ভরা তুফান তুলিয়া দিল । سb রাজপুত্র দেখিলেন, জোয়ার-ভাটার মাঝখানে সমস্ত দেশটা থমথম করিতেছে— কথা নাই, কেবল মুখ চাওয়াচাওয়ি ; কেবল এক পা এগোনে, দুই পা পিছনে ; কেবল আপনার মনের বাসনা শু,পাকার করিয়া বালির ঘর গড়া এবং বালির ঘর ভাঙা । সকলেই যেন ঘরের কোণে বসিয়া আপনার অগ্নিতে আপনাকে অস্থিতি দিতেছে, এবং প্রতিদিন কৃশ ও বাক্যহীন হইয়া যাইতেছে ; কেবল চোখ-দুটা জলিতেছে, এবং অস্তর্নিহিত বাণীর আন্দোলনে ওষ্ঠাধর বায়ুকম্পিত পল্লবের মতো স্পন্দিত হইতেছে। রাজপুত্র সকলকে ডাকিয়া বলিলেন, “বাশি আনো, তুরীভেরী বাজাও, সকলে আনন্দধ্বনি করো, হর্তনের বিবি স্বয়ম্বর হইবেন ।” তৎক্ষণাৎ দহলা নহল বঁাশতে ফু দিতে লাগিল, ছুরি তিরি তুরভেরী লইয়া পড়িল। হঠাৎ এই তুমুল আনন্দতরঙ্গে সেই কানাকানি চাওয়াচাওয়ি ভাঙিয়া গেল । উংসবে নরনারী একত্র মিলিত হইয়া কত কথা, কত হাসি, কত পরিহাস । কত রহস্তচ্ছলে মনের কথা বলা, কত ছল করিয়া অবিশ্বাস দেখানো, কত উচ্চহাস্তে তুচ্ছ আলাপ | ঘন অরণ্যে বাতাস উঠিলে যেমন শাখায় শাখায়, পাতায় পাতায়, লতায় বৃক্ষে, নানা ভঙ্গিতে হেলাদোলা মেলামেলি হইতে থাকে, ইহাদের মধ্যে তেমনি হইতে লাগিল । এমনি কলরব আনন্দোৎসবের মধ্যে বাঁশিতে সকাল হইতে বড়ো মধুব স্বরে সাহান বাজিতে লাগিল । আনন্দের মধ্যে গভীরতা, মিলনের মধ্যে ব্যাকুলত, বিশ্বদৃশ্বের মধ্যে সৌন্দর্য, হৃদয়ে হৃদয়ে প্রীতির বেদনা সঞ্চার করিল। যাহারা ভালো করিয়া ভালোবাসে নাই তাহারা ভালোবাসিল, যাহারা ভালোবাসিয়াছিল তাহারা আনন্দে উদাস হইয়া গেল । একটা আষাঢ়ে গল্প >○ হর্তনের বিবি রাঙা বসন পরিয়া সমস্ত দিন একটা গোপন ছায়াকুঞ্জে বসিয়া ছিল । তাহার কানেও দূর হইতে সাহানার তান প্রবেশ করিতেছিল এবং তাছার দুটি চক্ষু মুদ্রিত হইয়া আসিয়াছিল ; হঠাৎ এক সময়ে চক্ষু মেলিয়া দেখিল, সম্মুখে রাজপুত্র বসিয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া আছে ; সে অমনি কম্পিতদেহে দুষ্ট হাতে মুখ ঢাকিয়া ভূমিতে লুষ্ঠিত হইয়া পড়িল । রাজপুত্র সমস্ত দিন একাকী সমুদ্রতীরে পদচারণা করিতে করিতে সেই সন্ত্রস্ত নেত্রক্ষেপ এবং সলজ্জ লুণ্ঠন মনে মনে আলোচনা করিতে লাগিলেন । ఫి রাত্রে শতসহস্র দীপের আলোকে, মালার সুগন্ধে, বশির সংগীতে, অলংকৃত সুসজ্জিত সহাস্য শ্রেণীবদ্ধ যুবকদের সভায় একটি বালিকা ধীরে ধীরে কম্পিতBBB BBg gBB BBB BBBBBB BBB BBBB BBBBB BBDDBS অভিলষিত কণ্ঠে মালা ও উঠিল না, অভিলষিত মুখে চোখ ও তুলিতে পারিল না। রাজপুত্র তখন আপনি শির নত করিলেন এবং মাল্য স্খলিত হইয় তাহার কণ্ঠে পড়িয় গেল। চিত্ৰবং নিস্তব্ধ সভা সহসা আনন্দোচ্ছ্বাসে আলোড়িত হইয়া উঠিল । সকলে বরকতাকে সমাদর করিয়া সিংহাসনে লইয়া বসাইল । রাজপুত্রকে সকলে মিলিয়া রাজ্যে অভিষেক করিল। రి সমুদ্রপারের দুঃখিনী দুয়ারানী সোনার তরীতে চড়িয়া পুত্রের নবরাজ্যে আগমন করিলেন । ছবির দল হঠাৎ মাতুষ হইয়া উঠিয়াছে। এখন আর পূর্বের মতো সেই অবিচ্ছিন্ন শাস্তি এবং অপরিবর্তনীয় গা স্তীর্য নাই | সংসার প্রবাহ আপনার সুখদু:থ রাগদ্বেষ বিপদসম্পদ লইয়া এই নবীন রাজার নবরাজ্যকে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিল। এখন, কেহ ভালো, কেহ মন, কাহারও আনন্দ, কাহারও বিষাদ – এখন সকলে মাতুষ । এখন সকলে অলঙ্ঘ্য বিধান-মতে নিরীহ না হইয়া নিজের ইচ্ছামতে সাধু এবং অসাধু। আষাঢ় ১২৯৯ భ