গল্পগুচ্ছ/একরাত্রি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

একরাত্রি স্বরবালার সঙ্গে একত্রে পাঠশালায় গিয়াছি, এবং বউ-বউ থেলিয়াছি। তাহাদের বাড়িতে গেলে সুরবালার মা আমাকে বড়ে যত্ব করিতেন এবং আমাদের দুইজনকে একত্র করিয়া আপনা-আপনি বলাবলি করিতেন, “আহা, দুটিতে বেশ মানায় ।” ছোটো ছিলাম, কিন্তু কথাটার অর্থ একরকম বুঝিতে পারিতাম স্বরবালার প্রতি যে সর্বসাধারণের অপেক্ষ আমার কিছু বিশেষ দাবি ছিল, সে ধারণা আমার মনে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছিল। সেই অধিকারমদে মত্ত হইয়া তাহার প্রতি যে আমি শাসন এবং উপদ্রব না করিতাম তাহা নহে। সেও সহিষ্ণুভাবে আমার সকলরকম ফরমাশ থাটিত এবং শাস্তি বহন করিত। পাডায় তাহার রূপের প্রশংসা ছিল, কিন্তু বর্বর বালকের চক্ষে সে সৌন্দর্যের কোনো গৌরব ছিল না— আমি কেবল জানিতাম, মুরবালা আমারই প্রভুত্ব স্বীকার করিবার জন্য পিতৃগৃহে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, এইজন্য সে আমার বিশেষরূপ অবহেলার পাত্র । আমার পিতা চৌধুরী-জমিদারের নায়েব ছিলেন। র্তাহার ইচ্ছা ছিল, আমার হাতটা পাকিলেই আমাকে জমিদারি-সেরেস্তার কাজ শিখাইয়া একটা কোথাও গোমস্তাগিরিতে প্রবৃত্ত করাইয়া দিবেন। কিন্তু, আমি মনে মনে তাহাতে নারাজ ছিলাম। আমাদের পাড়ার নীলরতন যেমন কলিকাতায় পালাইয়া লেখাপড়া শিখিয়া কালেক্টার সাহেবের নাজির হইয়াছে, আমারও জীবনের লক্ষ্য সেইরূপ অত্যুচ্চ ছিল— কালেক্টরের নাজির না হইতে পারি তো জজ-আদালতের হেড ক্লার্ক হইব, ইহা আমি মনে-মনে নিশ্চয় স্থির করিয়া রাখিয়াছিলাম । সর্বদাই দেখিতাম, আমার বাপ উক্ত আদালতজীবীদিগকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন— নানা উপলক্ষে মাছটা-তরকারিট টাকাটা-সিকেটা লইয়। ষে তাহাদের পূজাৰ্চনা করিতে হইত তাহাও শিশুকাল হইতে আমার জানা ছিল , এইজন্ত আদালতের ছোটো কর্মচারী এমন-কি পেম্বাদাগুলাকে একরাত্রি ১২৩ পর্যন্ত হৃদয়ের মধ্যে খুব একটা সন্ত্রমের আসন দিয়াছিলাম । ইহারা আমাদের বাংলাদেশের পূজ্য দেবতা ; তেত্রিশ কোটির ছোটো ছোটো নূতন ংস্করণ । | সিদ্ধিলাভ সম্বন্ধে স্বয়ং সিদ্ধিদাতা গণেশ অপেক্ষা ইহাৱে প্ৰতি—লোকের ক নির্ভর Sts._°{4– BBi DDB BBg SBBB S BB LLLLS BY L SLLLS থাকেন 9 আমিও নীলরতনের দৃষ্টাস্তে উৎসাহিত হইয়া এক সময় বিশেষ সুবিধাযোগে কলিকাতায় পালাইয়া গেলাম। প্রথমে গ্রামের একটি আলাপী লোকের বাসায় ছিলাম, তাহার পরে বাপের কাছ হইতেও কিছু কিছু অধ্যয়নের সাহায্য পাইতে লাগিলাম। লেখাপড় যথানিয়মে চলিতে লাগিল । ইঙ্গর উপরে আবার সভাসমিতিতেও যোগ দিতাম। দেশের জন্য হঠাৎ প্রাণবিসর্জন করা যে আশু আবশ্যক, এ সম্বন্ধে আমার সন্দেহ ছিল না। কিন্তু, কী করিয়া উক্ত দুঃসাধ্য কাজ করা যাইতে পারে আমি জানিতাম ন, এবং কেহ দৃষ্টান্তও দেখাইত না । কিন্তু, তাহ বলিয়া উৎসাহের কোনো ক্রটি ছিল না। আমরা পাড়াগেয়ে ছেলে, কলিকাতার ইচড়ে-পাক ছেলের মতে সকল জিনিসকেই পরিহাস করিতে শিখি নাই ; সুতরাং আমাদের নিষ্ঠা অত্যস্ত দৃঢ় ছিল। আমাদের সভার কর্তৃপক্ষীয়েরা বক্তৃত৷ দিতেন, আর আমরা চাদার খাতা লইয়া না-খাইয়া দুপুর রৌদ্রে টো-টাে করিয়া বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করিয়া বেড়াইতাম, রাস্তার ধারে দাড়াইয়া বিজ্ঞাপন বিলি করিতাম, সভাস্থলে গিয়া বেঞ্চি চৌকি সাজাইতাম, দলপতির নামে কেহ একটা কথা বলিলে কোমর বাধিয়া মারামারি করিতে উদ্যত হইতাম । শহরের ছেলেরা এই-সব লক্ষণ দেখিয়া আমাদিগকে বাঙাল বলিত । নাজির সেরেস্তাদার হইতে আসিয়াছিলাম, কিন্তু মাৰ্টুগীনি গারিবালডি হইবার আয়োজন করিতে লাগিলাম। এমন সময়ে আমার পিতা এবং স্বরবালার পিতা একমত হইয়া স্বরবালার সহিত আমার বিবাহের জন্য উদযোগী হইলেন। আমি পনেরো বৎসর বয়সের সময় কলিকাতায় পালাইয়া আসি, তখন 2 338 গল্পগুচ্ছ স্বরবালার বয়স আট ; এখন আমি আঠোরো । পিতার মতে আমার বিবাহের বয়স ক্রমে উত্তীর্ণ হইয়া যাইতেছে। কিন্তু, এ দিকে আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, আজীবন বিবাহ না করিয়া স্বদেশের জন্য মরিব— বাপকে বলিলাম, বিদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ সমাধা না করিয়া বিবাহ করিব না। দুই-চারি মাসের মধ্যে খবর পাইলাম, উকিল রামলোচনবাবুর সহিত সুরবালার বিবাহ হইয়া গিয়াছে। পতিত ভারতের চাদা-আদায়কার্ধে ব্যস্ত ছিলাম, এ সংবাদ অত্যন্ত তুচ্ছ বোধ হইল। এনট্রেন্স পাস করিয়াছি, ফাস্ট, আর্টস দিব, এমন সময় পিতার মৃত্যু হইল। সংসারে কেবল আমি এক নই ; মাতা এবং দুটি ভগিনী আছেন। সুতরাং কালেজ ছাড়িয়া কাজের সন্ধানে ফিরিতে হইল। বহু চেষ্টায় নওয়াখালি বিভাগের একটি ছোটো শহরে এনট্রেন্স স্কুলের সেকেও, মাস্টারি পদ প্রাপ্ত छ्हेंलाभ । মনে করিলাম, আমার উপযুক্ত কাজ পাইয়াছি। উপদেশ এবং উৎসাহ দিয়া এক-একটি ছাত্রকে ভাবী ভারতের এক-একটি সেনাপতি করিয়া তুলিব । কাজ আরম্ভ করিয়া দিলাম। দেখিলাম, ভাবী ভারতবর্ষ অপেক্ষা আসন্ন এগ জামিনের তাড়া ঢের বেশি। ছাত্রদিগকে গ্রামার অ্যালজেব্রার বহির্ভূত কোনো কথা বলিলে হেডমাস্টার রাগ করে । মাস-দুয়েকের মধ্যে আমারও উৎসাহ নিস্তেজ হইয়া আসিল । দর মতো প্রতিভাহীন লোক ঘরে বসিয়া নানারূপ কল্পনা করে, অবশেষে কার্যক্ষেত্রে নামিয়া ঘাড়ে লাঙল বহিয়া পশ্চাৎ হইতে লেজ মলা খাইয়া নতশিরে সহিষ্ণুভাবে প্রাত্যহিক মাটি ভাঙার কাজ করিয়া সন্ধ্যাবেলায় এক-পেট জাবনা থাইতে পাইলেই সন্তুষ্ট থাকে ; লম্ফে ঝম্ফে আর উৎসাহ থাকে না ) অগ্নিদাহের আশঙ্কায় একজন করিয়া মাস্টার স্কুলের ঘরেতেই বাস করিত। আমি এক মানুষ, আমার উপরেই সেই ভার পড়িয়াছিল । স্কুলের বড়ে আটচালার সংলগ্ন একটি চালায় আমি বাস করিতাম । স্কুলঘরটি লোকালয় হইতে কিছু দূরে, একটি বড়ো পুষ্করিণীর ধারে। চারি দিকে স্বপারি নারিকেল এবং মাদারের গাছ, এবং স্কুলগৃহের প্রায় একরাত্রি ১২৫ গায়েই দুটা প্রকাও বৃদ্ধ নিম গাছ গায়ে গায়ে সংলগ্ন হইয়া ছায়া দান করিতেছে। একটা কথা এতদিন উল্লেখ করি নাই এবং এতদিন উল্লেখযোগ্য বলিয়া মনে হয় নাই। এখানকার সরকারি উকিল রামলোচন রায়ের বাস আমাদের স্কুলঘরের অনতিদূরে । এবং তাহার সঙ্গে তাহার স্ত্রী— আমার বাল্যসখী স্বরবালা— ছিল, তাহা আমার জানা ছিল । রামলোচনবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ হইল। স্বরবালার সহিত বাল্যকালে আমার জানাশোনা ছিল তাহ রামলোচনবাবু জানিতেন কিনা জানি না, আমিও নূতন পরিচয়ে সে সম্বন্ধে কোনো কথা বলা সংগত বোধ করিলাম না। এবং মুরবালা যে কোনো কালে আমার জীবনের সঙ্গে কোনোরূপে জড়িত ছিল, সে কথা আমার ভালো করিয়া মনে উদয় হইল না । একদিন ছুটির দিনে রামলোচনবাবুর বাসায় তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছি। মনে নাই কী বিষয়ে আলোচনা হইতেছিল, বোধ করি বর্তমান ভারতবর্ষের দুরবস্থা সম্বন্ধে । তিনি যে সেজন্ত বিশেষ চিস্তিত এবং ম্রিয়মাণ ছিলেন তাহা নহে, কিন্তু বিষয়টা এমন যে তামাক টানিতে টানিতে এ সম্বন্ধে ঘণ্টাখানেক-দেড়েক অনর্গল শখের দুঃখ করা যাইতে পারে। এমন সময়ে পাশের ঘরে অত্যন্ত মৃদু একটু চুড়ির টুংটং, কাপড়ের একটুখানি খস্থস্ এবং পায়েরও একটুখানি শব্দ শুনিতে পাইলাম ; বেশ বুঝিতে পারিলাম, জানালার ফাক দিয়া কোনো কৌতুহলপূর্ণ নেত্র আমাকে নিরীক্ষণ করিতেছে। তৎক্ষণাৎ দুখানি চোখ আমার মনে পড়িয়া গেল— বিশ্বাস সরলতা এবং শৈশবপ্রীতিতে ঢলঢল দুখানি বড়ে বড়ো চোখ, কালো কালো তারা, ঘনকৃষ্ণ পল্লব, স্থিরস্নিগ্ধ দৃষ্টি । সহসা হৃৎপিণ্ডকে কে যেন একটা কঠিন মুষ্টির দ্বারা চাপিয়া ধরিল এবং বেদনায় ভিতরটা টনটন করিয়া উঠিল । বাসায় ফিরিয়া আসিলাম, কিন্তু সেই ব্যথা লাগিয়া রহিল। লিখি পড়ি, যাহা করি, কিছুতেই মনের ভার দূর হয় না ; মনটা সহসা একটা বৃহৎ বোঝার ১২৬ গল্পগুচ্ছ মতো হইয়া বুকের শিরা ধরিয়া তুলিতে লাগিল । সন্ধ্যাবেলায় একটু স্থির হইয়া ভাবিতে লাগিলাম, এমনটা হইল কেন। মনের মধ্য হইতে উত্তর আসিল, তোমার সে সুরবালা কোথায় গেল । আমি প্রত্যুত্তরে বলিলাম, আমি তো তাহাকে ইচ্ছা করিয়া ছাড়িয়া দিয়াছি । সে কি চিরকাল আমার জন্য বসিয়া থাকিবে । মনের ভিতরে কে বলিল, তখন যাহাকে ইচ্ছা করিলেই পাইতে পারিতে এখন মাথা খুডিয়া মরিলেও তাহাকে একবার চক্ষে দেখিবার অধিকারটুকুও পাইবে না । সেই শৈশবের সুরবালা তোমার যত কাছেই থাকুক, তাহার চুড়ির শব্দ শুনিতে পাও, তাহার মাথাঘষার গন্ধ অনুভব কর, কিন্তু মাঝখানে বরাবর একখানি কবিয়া দেয়াল থাকিবে । আমি বলিলাম, তা থাক না, সুরবালা আমার কে । উত্তর শুনিলাম, সুরবালা আজ তোমাব কেহই নয়, কিন্তু সুরবালা তোমার কী না হইতে পারিত । সে কথা সত্য। সুরবালা আমার কী না হইতে পাবিত। আমার সব চেয়ে অন্তরঙ্গ, আমার সব চেয়ে নিকটবর্তী, আমার জীবনের সমস্ত সুখদুঃখভাগিনী হইতে পারিত— সে আজ এত দুর, এত পর, আজ তাহাকে দেখা নিষেধ, তাহার সঙ্গে কথা কওয়া দোষ, তাহার বিষয়ে চিন্তা করা পাপ । আর, একট। রামলোচন কোথাও কিছু নাই হঠাৎ আসিয়া উপস্থিত, কেবল গোটা-দুয়েক মুখস্থ মন্ত্ৰ পডিয়া মুরবালাকে পৃথিবীর আর-সকলের নিকট হইতে এক মুহূর্তে ছো মারিয়া লইয়া গেল ! আমি মানবসমাজে নুতন নীতি প্রচার করিতে বসি নাই, সমাজ ভাঙিতে আসি নাই, বন্ধন ছিড়িতে চাই না । আমি আমার মনের প্রকৃত ভাবটা ব্যক্ত করিতেছি মাত্র। আপন-মনে যে-সকল ভাব উদয় হয় তাহার কি সবই বিবেচনাসংগত । রামলোচনের গৃহভিত্তির আড়ালে যে সুরবালা বিরাজ করিতেছিল সে যে রামলোচনের অপেক্ষাও বেশি করিয়া অামার, এ কথা আমি কিছুতেই মন হইতে তাড়াইতে পারিতেছিলাম না । এরূপ চিন্তা নিতান্ত অসংগত এবং অন্যায় তাহা স্বীকার করি, কিন্তু অস্বাভাবিক নহে। এখন হইতে আর কোনো কাজে মনঃসংযোগ করিতে পারি না । একরাত্রি ›:ፃ দুপুরবেলায় ক্লাসে যখন ছাত্রেরা গুনগুন করিতে থাকিত, বাহিরে সমস্ত কী-বী করিত, ঈষৎ উত্তপ্ত বাতাসে নিম গাছের পুষ্পমঞ্জুরির স্বগন্ধ বহন করিয়া আনিত, তখন ইচ্ছা করিত— কী ইচ্ছা করিত জানি না— এই পর্যন্ত বলিতে পারি, ভারতবর্ষের এই সমস্ত ভাবী আশাম্পদদিগের ব্যাকরণের ভ্রম সংশোধন করিয়া জীবনযাপন করিতে ইচ্ছা করিত না । স্কুলের ছুটি হইয়া গেলে আমার বৃহৎ ঘরে একলা থাকিতে মন টিকিত না, অথচ কোনো ভদ্রলোক দেথা করিতে আসিলেও অসহ বোধ হইত। সন্ধাবেলায় পুষ্করিণীর ধারে সুপারি-নারিকেলের অর্থহীন মর্মরধ্বনি শুনিতে শুনিতে ভাবিতাম, মনুষ্যসমাজ একটা জটিল ভ্রমের জাল । ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করিতে কাহারও মনে পড়ে না, তাহার পরে বেঠিক সময়ে বেঠিক বাসনা লইয়া অস্থির হইয়া মরে । তোমার মতো লোক স্বরবালার স্বামীটি হইয়া বুড়াবয়ুস পর্যন্ত বেশ মুখে । থাকিতে পারিত ; তুমি কিনা হইতে গেলে গারিবালডি, এবং হইলে শেষে একটি পাড়াগেয়ে ইস্কুলের সেকেণ্ড, মাস্টার । আর, রামলোচন রায় উকিল, তাহার বিশেষ করিয়া সুরবালারই স্বামী হইবার কোনো জরুরি আবশ্বক ছিল না ; বিবাহের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তাহার পক্ষে স্বরবালাও যেমন ভবশংকরীও তেমন, সেই কিনা কিছুমাত্র না ভাবিয়া-চিন্তিয়া বিবাহ করিয়া, সরকারি উকিল হইয়া দিব্য পাচ টাকা রোজগার করিতেছে— যেদিন দুধে ধোয়ার গন্ধ হয় সেদিন মুরবালাকে তিরস্কার করে, যেদিন মন প্রসন্ন থাকে সেদিন স্বরবালার জন্য গহনা গড়াইতে দেয়। বেশ মোটাসোটা, চাপকান পরা, কোনো অসন্তোষ নাই ; পুষ্করিণীর ধারে বসিয়া আকাশের তারার দিকে চাহিয়া কোনোদিন হাহুতাশ করিয়া সন্ধ্যাযাপন করে না । রামলোচন একটা বড়ো মকদ্দমায় কিছুকালের জন্য অন্যত্র গিয়াছে। আমার স্কুলঘরে আমি যেমন একলা ছিলাম সেদিন সুরবালার ঘরেও স্বরবালা বোধ করি সেইরূপ এক ছিল। মনে আছে, সেদিন সোমবার । সকাল হইতেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া আছে। বেলা দশটা হইতে টিপ টপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতে আরম্ভ ծՀԵ গল্পগুচ্ছ করিল। আকাশের ভাবগতিক দেখিয়া হেডমাস্টার সকাল-সকাল স্কুলের ছুটি দিলেন। খণ্ড খণ্ড কালে মেঘ যেন একটা কী মহা আয়োজনে সমস্ত দিন আকাশময় আনাগোনা করিয়া বেড়াইতে লাগিল। তাহার পরদিন বিকালের দিকে মুষলধারে বৃষ্টি এবং সঙ্গে সঙ্গে ঝড় আরম্ভ হইল। যত রাত্রি হইতে লাগিল বৃষ্টি এবং ঝড়ের বেগ বাড়িতে চলিল। প্রথমে পূর্ব দিক হইতে বাতাস বহিতেছিল, ক্রমে উত্তর এবং উত্তরপূর্ব দিয়া বহিতে লাগিল । এ রাত্রে ঘুমাইবার চেষ্টা করা বৃথা । মনে পড়িল, এই দুর্যোগে স্বরবালা ঘরে একলা আছে। আমাদের স্কুলঘর তাহাদের ঘরের অপেক্ষা অনেক মজবুত। কতবার মনে করিলাম, তাহাকে স্কুলঘরে ডাকিয়া আনিয়া আমি পুষ্করিণীর পাড়ের উপর রাত্রিযাপন করিব। কিন্তু, কিছুতেই মন স্থির করিয়া উঠিতে পারিলাম না । রাত্রি যখন একটা-দেড়টা হইবে হঠাৎ বানের ডাক শোনা গেল— ' সমুদ্র ছুটিয়া আসিতেছে। ঘর ছাড়িয়া বাহির হইলাম। স্বরবালার বাড়ির দিকে চলিলাম। পথে আমাদের পুষ্করিণীর পাড়— সে পর্যন্ত যাইতে নাযাইতে আমার হাটুজল হইল। পাড়ের উপর যখন উঠিয়া দাড়াইলাম তখন দ্বিতীয় আর-একটা তরঙ্গ আসিয়া উপস্থিত হইল। আমাদের পুকুরের পাড়ের একটা অংশ প্রায় দশ-এগারো হাত উচ্চ হইবে । পাড়ের উপরে আমিও যখন উঠিলাম বিপরীত দিক হইতে আর-একটি লোকও উঠিল। লোকটি কে তাহ আমার সমস্ত অস্তরাত্মা, আমার মাথা হইতে পা পর্যস্ত বুঝিতে পারিল । এবং সেও যে আমাকে জানিতে পারিল তাহাতে আমার সন্দেহ নাই । আর-সমস্ত জলমগ্ন হইয়া গেছে, কেবল হাত-পাচ-ছয় দ্বীপের উপর আমরা দুটি প্রাণী আসিয়া দাড়াইলাম । - তখন প্রলয়কাল, তখন আকাশে তারার আলো ছিল না এবং পৃথিবীর সমস্ত প্রদীপ নিবিয়া গেছে— তখন একটা কথা বলিলেও ক্ষতি ছিল না— কিন্তু একটা কথাও বলা গেল না। কেহ কাহাকেও একটা কুশলপ্রশ্নও করিল না । কেবল দুইজনে অন্ধকারের দিকে চাহিয়া রহিলাম। পদতলে গাঢ় একরাত্রি ১২৯ কৃষ্ণবর্ণ উন্মত্ত মৃত্যুক্সোত গর্জন করিয়া ছুটিয়া চলিল । আজ সমস্ত বিশ্বসংসার ছাড়িয়া সুরবালা আমার কাছে আলিম্বী দাড়াইয়াছে। আজ আমি ছাড়া মুরবালার আর কেহ নাই। কবেকার সেই শৈশবে স্বরবাল, কোন-এক জন্মাস্তুর, কোন-এক পুরাতন রহস্তান্ধকার হইতে ভাসিয়া, এই স্বৰ্ষচন্দ্রালোকিত লোকপরিপূর্ণ পৃথিবীর উপরে আমারই পার্থে আসিয়া সংলগ্ন হইয়াছিল ; আর, আজ কত দিন পরে সেই আলোকময় লোকময় পৃথিবী ছাড়িয়া এই ভয়ংকর জনশূন্ত প্রলয়ান্ধকারের মধ্যে স্বরবাল একাকিনী আমারই পার্শ্বে আসিয়া উপনীত হইয়াছে। জন্মস্রোতে সেই নবকলিকাকে আমার কাছে আনিয়া ফেলিয়াছিল, মৃত্যুম্রোতে সেই বিকশিত পুষ্পটিকে আমারই কাছে আনিয়া ফেলিয়াছে— এখন কেবল আর-একটা ঢেউ আসিলেই পৃথিবীর এই প্রাস্তটুকু হইতে, বিচ্ছেদের এই বৃন্তটুকু হইতে, খসিয়া আমরা দুজনে এক হইয়া যাই । সে ঢেউ না আস্থক। স্বামীপুত্র গৃহধনজন লইয়া স্বরবালা চিরদিন মুখে থাকুক। আমি এই এক রাত্রে মহাপ্রলয়ের তীরে দাড়াইয়া অনস্ত আনন্দের আস্বাদ পাইয়াছি। রাত্রি প্রায় শেষ হইয়া আসিল— ঝড় থামিয়া গেল, জল নামিয়া গেল— সুরবালা কোনো কথা না বলিয়া বাড়ি চলিয়া গেল, আমিও কোনো কথা না বলিয়া আমার ঘরে গেলাম । ভাবিলাম, আমি নাজিরও হই নাই, সেরেস্তাদারও হই নাই, গারিবালডিও হই নাই, আমি এক ভাঙা স্কুলের সেকেও, মাস্টার, আমার সমস্ত ইহজীবনে কেবল ক্ষণকালের জন্য একটি অনস্তরাত্রির উদয় হইয়াছিল— আমার পরমায়ুর সমস্ত দিনরাত্রির মধ্যে সেই একটিমাত্র রাত্রিই আমার তুচ্ছ জীবনের একমাত্র চরম সার্থকতা । জ্যৈষ্ঠ ১২৯৯