গল্পগুচ্ছ/খাতা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

v খাতা লিখিতে শিথিয়া অবধি উমা_বিষম উপদ্রব আরম্ভ করিয়াছে। বাড়ির প্রত্যেক ঘরের দেয়ালে কয়লা দিয়া বাক লাইন কাটিয়া বড়ো বড়ো কাচা অক্ষরে কেবলই লিখিতেছে— জল পড়ে, পাতা নড়ে। তাহার বউঠাকুরানীর বালিশের নীচে হরিদাসের গুপ্তকথা” ছিল, সেটা সন্ধান করিয়া বাহির করিয়া তাহার পাতায় পাতায় পেনসিল দিয়া লিথিয়াছে — কালে জল, লাল ফুল । বাড়ির সর্বদাব্যবহার্য নূতন পঞ্জিকা হইতে অধিকাংশ তিথিনক্ষত্র খুব বড়ো বড়ো অক্ষরে এক-প্রকার লুপ্ত করিয়া দিয়াছে। বাবার দৈনিক হিসাষের খাতায় জমাখরচের মাঝখানে লিথিয় রাখিয়াছে -শলেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই। এ প্রকার সাহিত্যচর্চায় এপর্যন্ত সে কোনো-প্রকার বাধা পায় নাই, অবশেষে এক দিন একটা গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটিল। উমার দাদা গোবিন্দলাল দেখিতে অত্যন্ত নিরীহ, কিন্তু সে খবরের কাগজে সর্বদাই লিথিয়া থাকে। তাহার কথাবার্তা শুনিলে তাহার আত্মীয়স্বজন কিম্বা তাহার পরিচিত প্রতিবেশীরা কেহ তাহাকে চিন্তাশীল বলিয়া কখনো সন্দেহ করে না । এবং বাস্তবিকও সে যে কোনো বিষয়ে কখনো চিন্তা করে এমন অপবাদ তাহাকে দেওয়া যায় না, কিন্তু সে লেখে ; এবং বাংলার কাংশ পাঠকের সঙ্গে তার মতের সম্পূর্ণ ঐক্য হয়। শরীরতত্ত্ব সম্বন্ধে যুরোপীয় বৈজ্ঞানিকমণ্ডলীর মধ্যে কতকগুল গুরুতর ভ্রম প্রচলিত আছে, সেগুলি গোবিন্দলাল যুক্তির কোনে সাহায্য অবলম্বন না করিয়াও কেবলমাত্র রোমাঞ্চজনক ভাষার প্রভাবে সতেজে খগুন-পূর্বক একটি উপাদেয় প্রবন্ধ রচনা করিয়াছিল। 最 উমা একদিন নির্জন দ্বিপ্রহরে দাদার কালিকলম লইয়া সেই প্রবন্ধটির উপরে বড়ো বড়ো করিয়া লিখিল— গোপাল বড়ো ভালো ছেলে, তাহাকে যাহা দেওয়া বায় সে তাহাই খায়। খাতা € సి. গোপাল বলিতে সে যে গোবিন্দলালের প্রবন্ধ-পাঠকদের প্রতি বিশেষ লক্ষ করিয়াছিল তাহা আমার বিশ্বাস হয় না, কিন্তু দাদার ক্রোধের সীমা ছিল না । প্রথমে তাহাকে মারিল, অবশেষে তাহার একটি স্বল্পাবশিষ্ট পেনসিল, আস্কোপাস্ত মসীলিপ্ত একটি ভোতা কলম, তাহার বহুযত্নসঞ্চিত যৎসামান্ত লেখ্যোপকরণের পুজি কাড়িয়া লইল - অপমানিত বালিকা তাহার এতাদৃশ গুরুতর লাঞ্ছনার কারণ সম্পূর্ণ বুঝিতে না পারিয়া, ঘরের কোণে বসিয়া ব্যথিতহৃদয়ে কাদিতে লাগিল । শাসনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হইলে পর গোবিন্দলাল কিঞ্চিৎ অমৃতপ্তচিত্তে উমাকে তাহার লুষ্ঠিত সামগ্ৰীগুলি ফিরাইয়া দিল এবং উপরন্তু একখানি লাইনটানা ভালো বাধানো খাতা দিয়া বালিকার হৃদয়বেদন দূর করিবার চে4 করিল। উমার বয়স তখন সাত বৎসর। এখন হইতে এই খাতাটি রাঞ্জিকালে উমার বালিশের নীচে ও দিনের বেলা সর্বদা তাহার কক্ষে ক্রোড়ে বিরাজ করিতে লাগিল । ছোটো বেণীটি ৰাধিয ঝি সঙ্কে রিয়া, যখন সে গ্রামের বালিকাঠিন্ধাঙ্গয়ে ” পড়িতে যাইত দেখিয়া মেয়েদের কাহারও বিস্ময়, কাহারও লোভ, কাহারও বা দ্বেষ হইত। প্রথম বৎসরে অতি যত্ব করিয়া খাতায় লিখিল- পাখি সব করে রব, রাতি পোহাইল। শয়নগৃহের মেঝের উপরে বসিয়া খাতাটি আঁকড়িয়া ধরিয়া চ্চৈ": স্বর করিয়া পড়িত এবং লিখিত। এমনি করিয়া অনেক গদ্য পদ্য ੀ । দ্বিতীয় বৎসরে মধ্যে মধ্যে দুটি-একটি স্বাধীন রচনা দেখা দিতে লাগিল ৮ অত্যস্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যস্ত সারবান— ভূমিকা নাই, উপসংহার নাই। ছুটএকটা উদ্ভূত করিয়া দেওয়া যাইতে পারে। খাতায় কথামালার ব্যাঘ্র ও বকের গল্পটা যেখানে কাপি করা আছে, তাহার নীচে এক জায়গায় একট লাইন পাওয়া গেল, সেটা কথামালা কিম্বt বর্তমান বঙ্গসাহিত্যের আর-কোথাও ইতিপূর্বে দেখা যায় নাই । সে লাইনটি এই– বশিকে আমি খুব ভালোবাসি । HS ෆ গল্পগুচ্ছ কেহ না মনে করেন, আমি এইবার একটা প্রেমের গল্প বানাইতে বসিয়াছি । যশি পাড়ার কোনো একাদশ কিম্বা দ্বাদশ-বর্ষীয় বালক নহে। বাড়ির একটি পুরাতন দাসী, তাহার প্রকৃত নাম যশোদা । কিন্তু, বশির প্রতি বালিকার প্রকৃত মনোভাব কী এই এক কথা হইতে তাহার কোনো দৃঢ় প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে যিনি বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস লিখিতে ইচ্ছা করিবেন, তিনি এই খাতাতেই ফু পাতা অন্তরে পূর্বোক্ত কথাটির সুস্পষ্ট প্রতিবাদ দেখিতে পাইবেন। এমন একটা-আধটা নয়, উমার রচনায় পদে পদে পরস্পরবিরোধিতা-দোষ লক্ষিত হয়। এক স্থলে দেখা গেল-- হরির সঙ্গে জন্মের মতো আড়ি । (হরিচরণ নয়, হরিদাসী, বিদ্যালয়ের সহপাঠিকা। ) তার অনতিদূরেই এমন কথা আছে যাহা হইতে সহজেই বিশ্বাস জন্মে যে, হরির মতো প্রাণের বন্ধু তাহার আর ত্রিভুবনে নাই। তাহার পর বৎসৱে ৰালিকার বয়স যখন নয় বৎসর, তখন এক দিন BBBBB DDBB BBBBB BBB BS BBBB BBBS BBD BDDDS BBu Bt BBBDDSeBBSBBBB BSS BBB BBB S বয়স যদিও অধিক নয় এবং লেখাপড়া কিঞ্চিৎ শেখা আছে, তথাপি নব্যভাব তার মনে কিছুমাত্র প্রবেশ করিতে পারে নাই। এইজন্ত পাড়ার লোকেরা তাহাকে ধন্য ধন্য করিত এবং গোবিন্দলাল তাহার অনুকরণ করিতে চেষ্ট করিত, কিন্তু সম্পূর্ণ কৃতকার্য হইতে পারে নাই। উমা বেনারসি শাড়ি পরিয়া, ঘোমটায় ক্ষুদ্র মুখখানি আবৃত করিয়া, কঁদিতে কঁাদিতে শ্বশুরবাড়ি গেল। মা বলিয়া দিলেন, "বাছা, শাশুড়ির কথা মানিয়া চলিস, ঘরকন্নার কাজ করিস, লেখাপড়া লইয়া থাকিল নে ৷” গোবিন্দলাল বলিয়া দিলেন, “দেখিস, সেখানে দেয়ালে আঁচড় কাটিয়া বেড়াস নে ; সে তেমন বাড়ি নয়। আর, প্যারীমোহনের কোনো লেখার উপরে খবর্দার কলম চালাস নে ৷” বালিকার হৃৎকম্প উপস্থিত হইল। তখন বুঝিতে পারিল, সে ৰেখানে বাইতেছে সেখানে কেহ তাহাকে মার্জনা করিবে না ; এবং তাহারা কাহাকে थांज्रों రి দোষ বলে, অপরাধ বলে, ক্রটি বলে, তাহ অনেক ভৎপনার পর অনেক দিনে শিথিয়া লইতে হইবে । সে দিন সকালেও সানাই বাজিতেছিল। কিন্তু, সেই ঘোমটা এবং বেনাৎসি শাড়ি এবং অলংকারে মণ্ডিত ক্ষুদ্র বালিকার কম্পিত হৃদয়টুকুর মধ্যে কী হইতেছিল তাহা ভালো করিয়া বোঝে এমন একজনও সেই লোকারণ্যের মধ্যে ছিল কী না সন্দেহ । ৰশিও উমার সঙ্গে গেল। কিছু দিন থাকিয়া উমাকে শ্বশুরবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত করিয়া সে চলিয়া আসিবে এমনি কথা ছিল । স্নেহশীলা যশি অনেক বিবেচনা করিয়া উমার খাতাটি সঙ্গে লইয়া গিয়াছিল। এই খাতাটি তাহার পিতৃভবনের একটি অংশ ; তোহার অতিক্ষণিক জন্মগৃহবাসের, স্নেহময় স্মৃতিচিহ্ন ) পিতামাতার অঙ্কস্থলীর একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, অত্যন্ত বাকাচোরা কাচা অক্ষরে লেখা । তাহার এই অকাল গৃহিণীপনার মধ্যে বালিকাস্বভাবরোচক একটুখানি স্নেহমধুর স্বাধীনতার স্বাদ । ত শ্বশুরবাড়ি গিয়া প্রথম কিছু দিন সে কিছুই লেখে নাই, সময়ও পায় নাই । গা,শষে কিছু দিন পরে যশি তাহার পূর্বস্থানে চলিয়া গেল। সেদিন উমা দুপুরবেলা শয়নগৃহের দ্বার রুদ্ধ করিয়া, টিনের বাক্স হইতে খাতাটি বাহির করিয়া, কঁাদিতে কঁাদিতে লিখিল— যশি বাড়ি চলে গেছে, আমিও মার কাছে যাব । আজকাল চারুপাঠ এবং বোধোদয় হইতে কিছু কাপি করিবার অবসর নাই, বোধ করি তেমন ইচ্ছাও নাই । সুতরাং আজকাল বালিকার ংক্ষিপ্ত রচনার মধ্যে মধ্যে দীর্ঘ বিচ্ছেদ নাই। পূর্বোদধুত পদটির পরেই দেখা যায় লেখা আছে– দাদা যদি একবার বাড়ি নিয়ে যায় তা হলে দাদার লেখা আর কখনো খারাপ করে দেব না । শুনা বায়, উমার পিতা উমাকে প্রায় মাঝে-মাঝে বাড়ি আনিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু, গোবিন্দলাল প্যারীমোহনের সঙ্গে যোগ দিয়া তাহার প্রতিবন্ধক क्ष्म्न । গোবিন্দলাল বলে, এখন উমার পতিভক্তি শিক্ষার সময়, এখন তাহাকে రి): গল্পগুচ্ছ মাঝে-মাঝে পতিগৃহ হইতে পুরাতন পিতৃস্নেহের মধ্যে আনয়ন করিলে তাহার মনকে অনর্থক বিক্ষিপ্ত করিয়া দেওয়া হয় । এই বিষয়ে সে উপদেশে বিদ্রুপে জড়িত এমন সুন্দর প্রবন্ধ লিখিয়াছিল যে, তাহার একমতবর্তী সকল পাঠকেই উক্ত রচনার অকাট্য সত্য সম্পূর্ণ স্বীকার না করিয়া থাকিতে পারে নাই । লোকমুখে সেই কথা শুনিয়াই উমা তাহার খাতায় লিথিয়াছিল— দাদা, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে একবার তোমাদের ঘরে নিয়ে যাও, আমি তোমাকে আর কখনো রাগীব না । এক দিন উমা দ্বার রুদ্ধ করিয়া এমনি কী একটা অর্থহীন তুচ্ছ কথা খাতায় লিখিতেছিল। তাহার ননদ তিলকমঞ্জরীর অত্যন্ত কৌতুহল হইল, সে ভাবিল বউদিদি মাঝে-মাঝে দরজা বন্ধ করিয়া কী করে দেখিতে হইবে । স্বারের ছিদ্র দিয়া দেখিল লিখিতেছে। দেখিয়া অবাক । তাহাদের অস্তঃপুরে কখনোই সরস্বতীর এরূপ গোপন সমাগম হয় নাই । তাহার ছোটো কনকমঞ্জরী, সেও আসিয়া একবার উকি মারিয়া দেখিল তাহার ছোটাে অনঙ্গমঞ্জরী সেও পদাঙ্গুলির উপর ভর দিয়া বহু কষ্টে ছি পথ দিয়া রুদ্ধগৃহের রহস্য ভেদ করিয়া লইল । t উমা লিখিতে লিথিতে সহসা গৃহের বাহিরে তিনটি পরিচিত কঃে খিলখিল হাসি শুনিতে পাইল। ব্যাপারটা বুঝিতে পারিল, খাতাটি তাড়াতা বাক্সে বন্ধ করিয়া লজ্জায় ভয়ে বিছানায় মুখ লুকাইয়া পড়িয়া রহিল। প্যারীমোহন এই সংবাদ অবগত হইয়া বিশেষ চিন্তিত হইল । পড়াশুনা আরম্ভ হইলেই নভেল-নাটকের আমদানি হইবে এবং গৃহধর্ম রক্ষা করা দায় হইয়া উঠিবে। তা ছাড়া, বিশেষ চিস্তা দ্বারা এ বিষয়ে সে একটি অতি স্বল্পষ্ঠত্ত্ব নির্ণয় করিয়াছিল। সে বলিত, স্ত্রীশক্তি এবং পুংশক্তি উভয় শক্তির সম্মিলনে পবিত্র দাম্পত্যশক্তির উদ্ভব হয় ; কিন্তু লেখাপড়া-শিক্ষার দ্বারা যদি স্ত্রীশক্তি পরাভূত হইয়া একান্ত পুংশক্তির প্রাদুর্ভাব হয়, তবে পুংশক্তির সহিত পুংশক্তির প্রতিঘাতে এমন একটি প্রলয়ুশক্তির উৎপত্তি হয় যদ্বারা দাম্পত্যশক্তি বিনাশশক্তির মধ্যে বিলীনসত্তা লাভ করে, স্বতরাং রমণী বিধবা হয়। এপর্যস্ত খাতা ల్ఫి లి এ তত্ত্বের কেহ প্রতিবাদ করিতে পারে নাই । প্যারীমোহন সন্ধ্যাকালে ঘরে আসিয়া উমাকে যথেষ্ট ভৎসনা করিল এবং কিঞ্চিং উপহাসও করিল; বলিল, “শামলা ফর্মাশ দিতে হইবে, গিরি কানে কলম গুজিয়া অাপিসে যাইবেন ।” উমা ভালো বুঝিতে পারিল না। প্যারীমোহনের প্রবন্ধ সে কখনো পড়ে নাই, এইজন্ত তাহার এখনও ততদুর রসবোধ জন্মে নাই। কিন্তু, সে মনে মনে একান্ত সংকুচিত হইয়া গেল ; মনে হইল, পৃথিবী দ্বিধা হইলে তবে সে লজ রক্ষা করিতে পারে । বহু দিন আর সে লেখে নাই । কিন্তু, একদিন শরৎকালের প্রভাতে একটি গায়িক ভিখারিনি আগমনীর গান গাহিতেছিল । উমা জানালার গরীদের উপর মুখ রাখিয়া চুপ করিয়া শুনিতেছিল। একে শরৎকালের রৌদ্রে ছেলেবেলাকার সকল কথা মনে পড়ে, তাহার উপরে আগমনীর গান শুনিয়া সে আর থাকিতে পারিল না। উমা গান গাহিতে পারিত না ; কিন্তু লিখিতে শিথিয়া অবধি এমনি তাহার অভ্যাস হইয়াছে যে, একটা গান শুনিলেই সেটা লিথিয়া লইয়া গান গাহিতে না পারার খেদ মিটাইত। আজ কাঙালি গাহিতেছিল পুৰবাসী বলে, উমার মা, তোর হারা তারা এল ওই । শুনে পাগলিনীপ্রায় অমনি রানী ধায়— কই, উমা, বলি কই । কেঁদে রানী বলে, আমার উমা এলে— একবার আয় মা, একবার আয় মা, একবার আয় মা, করি কোলে । অমনি দু বাহু পসারি, মায়ের গলা ধরি অভিমানে কঁাদি রানীরে বলে— কই মেয়ে বলে জানতে গিয়েছিলে । অভিমানে উমার হৃদয় পূর্ণ হইয়া চোখে জল ভরিয়া গেল। গোপনে গায়িকাকে ডাকিয়া গৃহদ্বার রুদ্ধ করিয়া বিচিত্র বানানে এই গানটি খাতায় গল্পগুচ্ছ লিখিতে আরম্ভ করিল। তিলকমঞ্জরী, কনকমঞ্জরী এবং অনঙ্গমঞ্জরী সেই ছিদ্ৰযোগে সমস্ত দেখিল এবং সহস করতালি দিয়া বলিয়া উঠিল, “বউদিদি, কী করছ আমরা সমস্ত দেখেছি ।” তখন উমা তাড়াতাড়ি দ্বার খুলিয়া বাহির হইয়া কাতরম্বরে বলিতে লাগিল, “লক্ষ্মী ভাই, কাউকে বলিস নে ভাই, তোদের দুটি পায়ে পডি ভাই— আমি আর করব না, আমি আর লিখব না।” অবশেষে উমা দেখিল, তিলকমঞ্জরী তাহার খাতাটির প্রতি লক্ষ করিতেছে । তখন সে ছুটিয়া গিয়া খাতাটি বক্ষে চাপিয়া ধরিল । ননদীরা অনেক বলপ্রয়োগ করিয়া সেটি কাড়িয়া লইবার চেষ্টা করিল ; কৃতকার্য না হইয়া, অনঙ্গ দাদাকে ডাকিয়া আনিল । প্যারীমোহন আসিয়া গম্ভীরভাবে খাটে বসিল । মেঘমন্দ্রস্বরে বলিল, “খাত দাও * আদেশ পালন হইল না দেখিয়া আরও দুই-এক সুর গলা মামাইয়া কহিল, “দণ্ড ।” বালিকা থাতাটি বক্ষে ধরিয়া একান্ত অনুনয়দুষ্টতে স্বামীর মুখের দিকে চাহিল। যখন দেখিল, প্যারীমোহন খাত কাড়িয়া লইবার জন্য উঠিয়াছে তখন সেটা মাটিতে ফেলিয়া দিয়া দুই বাহুতে মুখ ঢাকিয় ভূমিতে লুষ্ঠিত হইয়। পড়িল । প্যারীমোহন খাতাটি লইয়া বালিকার লেখাগুলি উচ্চৈঃস্বরে পড়িতে লাগিল ; শুনিয়া উমা পৃথিবীকে উত্তরোত্তর গাঢ়তর আলিঙ্গনে বদ্ধ করিতে লাগিল ; এবং অপর তিনটি বালিকা-শ্রোতা খিলখিল করিয়া হাসিয়া অস্থির ङ्हेंल । সেই হইতে উমা আর সে খাত পায় নাই। প্যারীমোহনেরও স্বগ্নতত্ত্বকণ্টকিত বিবিধপ্রবন্ধপূর্ণ একখানি খাতা ছিল, কিন্তু সেটি কাড়িয়া লইয়া ধ্বংস করে এমন মানবহিতৈষী কেহ ছিল না।