গল্পগুচ্ছ/খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন প্রথম পরিচ্ছেদ রাইচরণ যখন বাবুদের বাডি প্রথম চাকরি করিতে আসে তখন তাহার বয়স বারো। যশোহর জিলায় বাডি। লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শুামচিকণ ছিপছিপে বালক। জাতিতে কায়স্থ । তাহার প্রভুরাও কায়স্থ । বাবুদের এক-বৎসর-বয়স্ক একটি শিশুর রক্ষণ ও পালন -কার্ষে সহায়তা করা তাহার প্রধান কর্তব্য ছিল । সেই শিশুটি কালক্রমে রাইচরণের কক্ষ ছাড়িয়া স্কুলে, স্কুল ছাডিয়া কলেজে, অবশেষে কলেজ ছাড়িয়া মুন্সেফিতে প্রবেশ করিয়াছে। রাইচরণ এখনও র্তাহার তৃত্য। তাহার আর-একটি মনিব বাড়িয়াছে ; মাঠাকুরানী ঘরে আসিয়াছেন ; স্বতরাং অমুকুলবাবুর উপর রাইচরণের পূর্বে যতটা অধিকার ছিল তাহার অধিকাংশই নূতন কত্রীর হস্তগত হইয়াছে। কিন্তু কত্রী যেমন রাইচরণের পূর্বাধিকার কতকটা হ্রাস করিয়া লইয়াছেন তেমনি একটি নূতন অধিকার দিয়া অনেকটা পূরণ করিয়া দিয়াছেন। অমুকুলের একটি পুত্রসস্তান অল্পদিন হইল জন্মলাভ করিয়াছে— এবং রাইচরণ কেবল নিজের চেষ্টা ও অধ্যবসায়ে তাহাকে সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করিয়া লইয়াছে । তাহাকে এমনি উৎসাহের সহিত দোলাইতে আরম্ভ করিয়াছে, এমনি নিপুণতার সহিত তাহাকে দুই হাতে ধরিয়া আকাশে উৎক্ষিপ্ত করে, তাহার মুখের কাছে আসিয়া এমনি সশব্দে শিরক্ষালন করিতে থাকে, উত্তরের কোনো প্রত্যাশ না করিয়া এমন-সকল সম্পূর্ণ অর্থহীন অসংগত প্রশ্ন স্বর করিয়া শিশুর প্রতি প্রয়োগ করিতে থাকে যে, এই ক্ষুদ্র আমুকৌলবটি রাইচরণকে দেখিলে একেবারে পুলকিত হইয় উঠে । অবশেষে ছেলেটি যখন হামাগুডি দিয়া অতি সাবধানে চৌকাঠ পার হইত এবং কেহ ধরিতে আসিলে খিলখিল হাস্যকলরব তুলিয়। দ্রুতবেগে নিরাপদ স্থানে লুকাইতে চেষ্টা করিত, তখন রাইচরণ তাহার অসাধারণ খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন S> চাতুর্ধ ও বিচারশক্তি দেখিয়া চমৎকৃত হইয়। যাইত। মার কাছে গিয়া সগৰ্ব সবিস্ময়ে বলিত, “মা, তোমার ছেলে বড়ো হলে জজ হবে, পাচ হাজার টাকা রোজগার করবে ।” পৃথিবীতে আর-কোনো মানবসন্তান যে এই বয়সে চৌকাঠ-লঙ্ঘন প্রভৃতি অসম্ভব চাতুর্যের পরিচয় দিতে পারে তাহ রাইচরণের ধ্যানের অগম্য, কেবল ভবিষ্যৎ জজেদের পক্ষে কিছুই আশ্চর্য নহে। অবশেষে শিশু যখন টলমল্‌ করিয়া চলিতে আরম্ভ করিল সে এক আশ্চর্য ব্যাপার, এবং যখন মাকে মা, পিসিকে পিচি, এবং রাইচরণকে চর বলিয়া সম্ভাষণ করিল, তখন রাইচরণ সেই প্রত্যয়াতীত সংবাদ যাহার-তাহার কাছে ঘোষণা করিতে লাগিল । সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ”মাকে মা বলে, পিসিকে পিসি বলে, কিন্তু আমাকে বলে চয়।” বাস্তবিক, শিশুর মাথায় এ বুদ্ধি কী করিয়া জোগাইল বলা শক্ত। নিশ্চয়ই কোনো বয়স্ক লোক কখনোই এরূপ অলোকসামান্ততার পরিচয় দিত না, এবং দিলেও তাহার জজের পদপ্রাপ্তিসম্ভাবনা সম্বন্ধে সাধারণের সন্দেহ উপস্থিত হইত। কিছুদিন বাদে মুখে দড়ি দিয়া রাইচরণকে ঘোড়া সাজিতে হইল। এবং মল্ল সাজিয়া তাহাকে শিশুর সহিত কুস্তি করিতে হইত— আবার পরাভূত হইয়া ভূমিতে পড়িয়া না গেলে বিষম বিপ্লব বাধিত। এই সময়ে অমুকুল পদ্মাতীরবর্তী এক জিলায় বদলি হইলেন। অমুকুল র্তাহার শিশুর জন্য কলিকাতা হইতে এক ঠেলাগাডি লইয়া গেলেন। সাটিনের জামা এবং মাথায় একটা জরির টুপি, হাতে সোনার বালা এবং পায়ে দুইগাছি মল পরাইয়া রাইচরণ নবকুমারকে দুই বেলা গাড়ি করিয়া হাওয়া খাওয়াইতে লইয়া যাইত । বর্ষাকাল আসিল । ক্ষুধিত পদ্মা উদ্যান গ্রাম শস্তক্ষেত্র এক-এক গ্রাসে মুখে পুরিতে লাগিল। বালুকাচরের কাশবন এবং বনবাউ জলে ডুবিয়া গেল। পাড়-ভাঙার অবিশ্রাম ঝুপ ঝাপ, শব্দ এবং জলের গর্জনে দশ দিক মুখরিত হইয়া উঠিল, এবং দ্রুতবেগে ধাবমান ফেনরাশি নদীর তীব্রগতিকে প্রত্যক্ষগোচর করিয়া তুলিল । ৬২ গল্পগুচ্ছ অপরাহ্লে মেঘ করিয়াছিল, কিন্তু বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা ছিল না। রাইচরণের খামখেয়ালি ক্ষুদ্র প্রভু কিছুতেই ঘরে থাকিতে চাহিল না। গাড়ির উপর চড়িয়া বসিল । রাইচরণ ধীরে ধীরে গাড়ি ঠেলিয়া ধান্তক্ষেত্রের প্রাস্তে নদীর তীরে আসিয়া উপস্থিত হইল। নদীতে একটিও নৌকা নাই, মাঠে একটিও লোক নাই— মেঘের ছিদ্র দিয়া দেখা গেল, পরপারে জনহীন বালুকাতীরে শব্দহীন দীপ্ত সমারোহের সহিত স্বর্যাস্তের আয়োজন হইতেছে। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে শিশু সহসা এক দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, “চন্ন, ফু।” অনতিদূরে সজল পঙ্কিল ভূমির উপর একটি বৃহৎ কদম্ববৃক্ষের উচ্চশাখায় গুটিকতক কদম্বফুল ফুটিয়াছিল, সেই দিকে শিশুর লুব্ধ দৃষ্টি আকৃষ্ট হইয়াছিল। দুই-চারিদিন হইল, রাইচরণ কাঠি দিয়া বিদ্ধ করিয়া তাহাকে কদম্বফুলের গাড়ি বানাইয়া দিয়াছিল, তাহাতে দড়ি বাধিয়া টানিতে এত আনন্দ বোধ হইয়াছিল যে, সেদিন রাইচরণকে আর লাগাম পরিতে হয় নাই ; ঘোড়া হইতে সে একেবারেই সহিসের পদে উন্নীত হইয়াছিল । কাদা ভাঙিয়া ফুল তুলিতে যাইতে চয়র প্রবৃত্তি হইল না— তাড়াতাড়ি বিপরীত দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, “দেখো দেখো ও—ই দেখো পাখি, ওই উড়ে—এ গেল। আয় রে পাখি, আয় আয় ।” এইরূপ অবিশ্রান্ত বিচিত্র কলরব করিতে করিতে সবেগে গাড়ি ঠেলিতে লাগিল । কিন্তু যে ছেলের ভবিষ্যতে জজ হইবার কোনো সম্ভাবনা আছে তাহাকে এরূপ সামান্ত উপায়ে ভুলাইবার প্রত্যাশা করা বৃথা— বিশেষত চারি দিকে দৃষ্টিআকর্ষণের উপযোগী কিছুই ছিল না এবং কাল্পনিক পাখি লইয়া অধিকক্ষণ কাজ চলে না । রাইচরণ বলিল, “তবে তুমি গাড়িতে বসে থাকো, আমি চটু করে ফুল তুলে আনছি। খবরদার, জলের ধারে যেয়ে না।” বলিয়া হাটুর উপর কাপড় তুলিয়া কদম্ববৃক্ষের অভিমুখে চলিল । কিন্তু ওই-যে জলের ধারে যাইতে নিষেধ করিয়া গেল, তাহাতে শিশুর মন কদম্বফুল হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া সেই মুহূর্তেই জলের দিকে ধাবিত হইল । দেখিল, জল খলখল ছলছল করিয়া ছুটিয়া চলিয়াছে ; যেন দুষ্ট্রামি করিয়া, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন ৬৩ কোন এক বৃহৎ রাইচরণের হাত এড়াইয়া এক লক্ষ শিশুপ্রবাহ সহাস্য কলস্বরে নিষিদ্ধ স্থানাভিমুখে দ্রুত বেগে পলায়ন করিতেছে। তাহাদের সেই অসাধু দৃষ্টাস্তে মানবশিশুর চিত্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল। গাড়ি হইতে আস্তে আস্তে নামিয়া জলের ধারে গেল— একটা দীর্ঘ তুণ কুড়াইয়া লইয়৷ তাহাকে ছিপ কল্পনা করিয়া ঝু কিয়া মাছ ধরিতে লাগিল— দুরন্ত জলরাশি অক্ষুট কলভাষায় শিশুকে বার বার আপনাদের খেলাঘরে আহবান করিল। একবার ঝপ করিয়া একটা শব্দ হইল, কিন্তু বর্ষার পদ্মাতীরে এমন শব্দ কত শোনা যায়। রাইচরণ আঁচল ভরিয়া কদম্বফুল তুলিল। গাছ হইতে নামিয়া সহাস্যমুখে গাড়ির কাছে আসিয়া দেখিল, কেহ নাই। চারি দিকে চাহিয়া দেখিল, কোথাও কাহারও কোনো চিহ্ন নাই । মুহূর্তে রাইচরণের শরীরের রক্ত হিম হইয়া গেল। সমস্ত জগৎসংসার মলিন বিবর্ণ ধোয়ার মতো হইয়া আসিল । ভাঙা বুকের মধ্য হইতে একবার প্রাণপণ চীৎকার করিয়া ডাকিয়া উঠিল, “বাৰু— খোকাবাবু— লক্ষ্মী দাদাবাবু আমার ” কিন্তু চম্ন বলিয়া কেহ উত্তর দিল না, দুষ্টামি করিয়া কোনো শিশুর কণ্ঠ হাসিয়া উঠিল না ; কেবল পদ্মা পূর্ববৎ ছলছল খলখল করিয়া ছুটিয়া চলিতে লাগিল, যেন সে কিছুই জানে না, এবং পৃথিবীর এই-সকল সামান্ত ঘটনায় মনোযোগ দিতে তাহার যেন এক মূহূর্ত সময় নাই। সন্ধ্যা হইয়া আসিলে উৎকণ্ঠিত জননী চার দিকে লোক পাঠাইয়া দিলেন । লণ্ঠন হাতে নদীতীরে লোক আসিয়া দেখিল, রাইচরণ নিশীথের ঝোড়ো বাতাসের মতো সমস্ত ক্ষেত্রময় “বাৰু— খোকাবাবু আমার” বলিয়া ভগ্নকণ্ঠে চীংকার করিয়া ৰেডাইতেছে। অবশেষে ঘরে ফিরিয়া রাইচরণ দড়াম করিয়া মাঠাকরুনের পায়ের কাছে আসিয়া আছাড় খাইয়া পড়িল । তাহাকে যত জিজ্ঞাসা করে সে র্কাদিয়া বলে, “জানি নে, মা ।” যদিও সকলেই মনে মনে বুঝিল পদ্মারই এই কাজ, তথাপি গ্রামের প্রান্তে যে একদল বেদের সমাগম হইয়াছে তাহদের প্রতিও সন্দেহ দূর হইল না। এবং মাঠাকুরানীর মনে এমন সন্দেহ উপস্থিত হইল যে, রাইচরণই বা চুরি করিয়াছে ; এমনকি তাহাকে ডাকিয়া অত্যন্ত অহনয়পূর্বক বলিলেন, “তুই W38 গল্পগুচ্ছ আমার বাছাকে ফিরিয়ে এনে দে– তুই যত টাকা চাস তোকে দেব।” শুনিয়া রাইচরণ কেবল কপালে করাঘাত করিল। গৃহিণী তাহাকে দূর করিয়া তাড়াইয়া দিলেন । অমুকুলবাবু তাহার স্ত্রীর মন হইতে রাইচরণের প্রতি এই অন্যায় সন্দেহ দুর করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন ; জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, রাইচরণ এমন জঘন্ত কাজ কী উদ্দেশ্বে করিতে পারে। গৃহিণী বলিলেন, “কেন। তাহার গায়ে সোনার গহনা ছিল ।” দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ রাইচরণ দেশে ফিরিয়া গেল। এতকাল তাহার সন্তানাদি হয় নাই, হইবার বিশেষ আশাও ছিল না। কিন্তু দৈবক্রমে বৎসর না যাইতেই তাহার স্ত্রী অধিকবয়সে একটি পুত্রসস্তান প্রসব করিয়া লোকলীলা সম্বরণ করিল। এই নবজাত শিশুটির প্রতি রাইচরণের অত্যন্ত বিদ্বেষ জন্মিল । মনে করিল, এ যেন ছল করিয়া খোকাবাবুর স্থান অধিকার করিতে আসিয়াছে। মনে করিল, প্রভুর একমাত্র ছেলেটি জলে ভাসাইয়া নিজে পুত্রমুখ উপভোগ করা যেন একটি মহাপাতক । রাইচরণের বিধবা ভগ্নী যদি না থাকিত তবে এ শিশুটি পৃথিবীর বায়ু বেশিদিন ভোগ করিতে পাইত না । আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই ছেলেটিও কিছুদিন বাদে চৌকাঠ পার হইতে আরম্ভ করিল, এবং সর্বপ্রকার নিষেধ লঙ্ঘন করিতে সকৌতুক চতুরতা প্রকাশ করিতে লাগিল। এমনকি, ইহার কণ্ঠস্বর হাস্যক্ৰন্দনধ্বনি অনেকটা সেই শিশুরই মতে । এক-একদিন যখন ইহার কান্না শুনিত, রাইচরণের বুকটা সহসা ধড়াস করিয়া উঠিত ; মনে হইত, দাদাবাবু রাইচরণকে হারাইয়া কোথায় কঁদিতেছে । ফেলনা— রাইচরণের ভগ্নী ইহার নাম রাখিয়াছিল ফেলনা— যথাসময়ে পিসিকে পিসি বলিয়া ডাকিল। সেই পরিচিত ডাক শুনিয়া একদিন হঠাৎ রাইচরণের মনে হইল— ‘তবে তো খোকাবাবু আমার মায়া ছাড়িতে পারে নাই । সে তো আমার ঘরে আসিয়াই জন্মগ্রহণ করিয়াছে।’ খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন ぐと? এই বিশ্বাসের অমুকুলে কতকগুলি অকাট্য যুক্তি ছিল। প্রথমত, সে যাইবার অনতিবিলম্বেই ইহার জন্ম । দ্বিতীয়ত, এতকাল পরে সহসা যে তাহার স্ত্রীর গর্তে সন্তান জন্মে এ কখনোই স্ত্রীর নিজগুণে"হইতে পারে না। তৃতীয়ত, এওঁ হামাগুড়ি দেয়, টলমল করিয়া চলে, এবং পিসিকে পিসি বলে। যে-সকল লক্ষণ থাকিলে ভবিষ্যতে জজ হইবার কথা তাহার অনেকগুলি ইহাতে বতিয়াছে। তখন মাঠাকরুনের সেই দারুণ সন্দেহের কথা হঠাৎ মনে পড়িল— আশ্চর্য হইয়া মনে মনে কহিল, ”আহ, মায়ের মন জানিতে পারিয়াছিল তাহার ছেলেকে কে চুরি করিয়াছে।” তখন, এতদিন শিশুকে যে অধত্ব করিয়াছে সেজন্য বড়ো অনুতাপ উপস্থিত হইল। শিশুর কাছে আবার ধরা দিল । এখন হইতে ফেলনাকে রাইচরণ এমন করিয়া মানুষ করিতে লাগিল যেন সে বড়ো ঘরের ছেলে। সাটিনের জামা কিনিয়া দিল। জরির টুপি আনিল । মৃত স্ত্রীর গহনা গলাইয়া চুড়ি এবং বালা তৈয়ারি হইল। পাড়ার কোনো ছেলের সহিত তাহাকে খেলিতে দিত না— রাত্রিদিন নিজেই তাহার একমাত্র খেলার সঙ্গী হইল। পাড়ার ছেলেরা সুযোগ পাইলে তাহাকে নবাবপুত্র বলিয়া উপহাস করিত এবং দেশের লোক রাইচরণের এইরূপ উন্মত্তবং আচরণে আশ্চর্য হইয়া গেল । ফেলনার যখন বিদ্যাভ্যাসের বয়স হইল তখন রাইচরণ নিজের জোতজমা সমস্ত বিক্রয় করিয়া ছেলেটিকে কলিকাতায় লইয়া গেল। সেখানে বহুকষ্টে একটি চাকরি জোগাড় করিয়া ফেলনাকে বিদ্যালয়ে পাঠাইল । নিজে যেমনতেমন করিয়া থাকিয়া ছেলেকে ভালো খাওয়া, ভালো পর, ভালো শিক্ষা দিতে ক্রটি করিত না । মনে মনে বলিত, ‘বংস, ভালোবাসিয়া আমার ঘরে আসিয়াছ বলিয়া যে তোমার কোনো অযত্ব হইবে, তা হইবে না।’ এমনি করিয়া বারো বৎসর কাটিয়া গেল । ছেলে পড়ে-শুনে ভালো এবং দেখিতে-শুনিতেও বেশ, হৃষ্টপুষ্ট উজ্জ্বল শু্যামবর্ণ- কেশবেশবিন্যাসের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি, মেজাজ কিছু মুখী এবং শৌখিন। বাপকে ঠিক বাপের মতো মনে করিতে পারিত না । কারণ, রাইচরণ স্নেহে বাপ এবং সেবায় ভৃত্য ছিল, এবং তাহার আর-একটি দোষ ছিল— সে যে ফেলনার বাপ এ কথা ৬৬ গল্পগুচ্ছ সকলের কাছেই গোপন রাখিয়াছিল। যে ছাত্রনিবাসে ফেলনা বাস করিত সেখানকার ছাত্রগণ বাঙাল রাইচরণকে লইয়া সর্বদা কৌতুক করিত, এবং পিতার অসাক্ষাতে ফেলুনাও যে সেই কৌতুকালাপে যোগ দিত না তাহ বলিতে পারি না । অথচ নিরীহ বৎসলস্বভাব রাইচরণকে সকল ছাত্রই বড়ো ভালোবাসিত ; এবং ফেলনাও ভালোবাসিত, কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি, ঠিক বাপের মতো নহে, তাহাতে কিঞ্চিৎ অনুগ্রহ মিশ্রিত ছিল । রাইচরণ বৃদ্ধ হইয়া আসিয়াছে। তাহার প্রভু কাজকর্মে সর্বদাই দোষ ধরে । বাস্তবিক তাহার শরীরও শিথিল হইয়া আসিয়াছে, কাজেও তেমন মন দিতে পারে না, কেবলই ভুলিয়া যায়— কিন্তু যে ব্যক্তি পুরা বেতন দেয় বাধক্যের ওজর সে মানিতে চাহে না । এ দিকে রাইচরণ বিষয় বিক্রয় করিয়া যে নগদ টাকা সংগ্ৰহ করিয়া আনিয়াছিল তাহাও নিঃশেষ হইয়া আসিয়াছে। ফেলনা আজকাল বসনভূষণের অভাব লইয়া সর্বদা খুংখুখ করিতে আরম্ভ করিয়াছে । তৃতীয় পরিচ্ছেদ একদিন রাইচরণ হঠাৎ কর্মে জবাব দিল এবং ফেলনাকে কিছু টাকা দিয়া বলিল, “আবশ্বক পড়িয়াছে, আমি কিছুদিনের মতো দেশে যাইতেছি।” এই বলিয়া বারাসতে গিয়া উপস্থিত হইল। অমুকুলবাবু তখন সেখানে মুন্সেফ ছিলেন । অমুকুলের আর দ্বিতীয় সস্তান হয় নাই, গৃহিণী এখনো সেই পুত্ৰশোক বক্ষের মধ্যে লালন করিতেছিলেন । একদিন সন্ধ্যার সময় বাবু কাছারি হইতে আসিয়া বিশ্রাম করিতেছেন এবং কত্রী একটি সন্ন্যাসীর নিকট হইতে সস্তানকামনায় বহুমূল্যে একটি শিকড় ও আশীৰ্বাদ কিনিতেছেন- এমন সময়ে প্রাঙ্গণে শব্দ উঠিল, “জয় হোক, মা ।” বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে রে ।” রাইচরণ আসিয়া প্রণাম করিয়া বলিল, “আমি রাইচরণ ।” বৃদ্ধকে দেখিয়া অমুকুলের হৃদয় আর্দ্র হইয়া উঠিল। তাহার বর্তমান খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন هونا অবস্থা সম্বন্ধে সহস্র প্রশ্ন এবং আবার তাহাকে কর্মে নিয়োগ করিবার প্রস্তাব করিলেন । রাইচরণ স্নান হাস্ত করিয়া কহিল, “মাঠাকরুনকে একবার প্রণাম করিতে চাই ।” অমুকুল তাহাকে সঙ্গে করিয়া অস্তঃপুরে লইয়া গেলেন। মাঠাকরুন রাইচরণকে তেমন প্রসন্নভাবে সমাদর করিলেন না— রাইচরণ তৎপ্রতি লক্ষ না করিয়া জোড়হস্তে কহিল, “প্ৰভু, মা, আমিই তোমাদের ছেলেকে চুরি করিয়া লইয়াছিলাম। পদ্মাও নয়, আর কেহও নয়, কৃতঘ্ন অধম এই আমি—” অতুকূল বলিয়া উঠিলেন, “বলিস কী রে । কোথায় সে।” “আজ্ঞা, আমার কাছেই আছে, আমি পরশ্ব আনিয়া দিব।” সেদিন রবিবার, কাছারি নাই। প্রাতঃকাল হইতে স্ত্রীপুরুষ দুইজনে উন্মুখভাবে পথ চাহিয়া বসিয়া আছেন। দশটার সময় ফেলনাকে সঙ্গে লইয়া রাইচরণ আসিয়া উপস্থিত হইল । অমুকুলের স্ত্রী কোনো প্রশ্ন কোনো বিচার না করিয়া তাহাকে কোলে বসাইয়া, তাহাকে স্পর্শ করিয়া, তাতার আঘ্ৰাণ লইয়া, অতৃপ্তনয়নে তাহার মুখ নিরীক্ষণ করিয়া, কাদিয়া হাসিয়া ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন । বাস্তবিক ছেলেটি দেখিতে বেশ– বেশভূষা আকারপ্রকারে দারিদ্র্যের কোনো লক্ষণ নাই। মুখে অত্যন্ত প্রিয়দর্শন বিনীত সলজ্জ ভাব। দেখিয়া অমুকুলের হৃদয়েও সহসা স্নেহ উচ্ছসিত হইয়া উঠিল। তথাপি তিনি অবিচলিত ভাব ধারণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোনো প্রমাণ আছে ?” রাইচরণ কহিল, “এমন কাজের প্রমাণ কী করিয়া থাকিবে । আমি যে তোমার ছেলে চুরি করিয়াছিলাম সে কেবল ভগবান জানেন, পৃথিবীতে আর কেহ জানে না ।” অমুকুল ভাবিয়া স্থির করিলেন যে, ছেলেটিকে পাইবামাত্র তাহার স্ত্রী যেরূপ আগ্রহের সহিত তাহাকে আগলাইয়া ধরিয়াছেন এখন প্রমাণসংগ্রহের চেষ্টা করা স্বযুক্তি নহে ; যেমনই হউক, বিশ্বাস করাই ভালো । তা ছাড়া, Qb" গল্পগুচ্ছ রাইচরণ এমন ছেলেই বা কোথায় পাইবে। এবং বৃদ্ধ ভূত্য র্তাহাকে অকারণে প্রতারণাই বা কেন করিবে । ছেলেটির সহিতও কথোপকথন করিয়া জানিলেন যে, সে শিশুকাল হইতে রাইচরণের সহিত আছে এবং রাইচরণকে সে পিতা বলিয়া জানিত, কিন্তু রাইচরণ কখনো তাহার প্রতি পিতার ন্যায় ব্যবহার করে নাই, অনেকটা ভূত্যের ভাব ছিল । অনুকুল মন হইতে সন্দেহ দূর করিয়া বলিলেন, “কিন্তু রাইচরণ, তুই আর আমাদের ছায়া মাড়াইতে পাইবি না।” রাইচরণ করজোড়ে গদগদ কণ্ঠে বলিল, “প্ৰভু, বৃদ্ধবয়সে কোথায় যাইব ।” কত্রী বলিলেন, “আহা, থাক। আমার বাছার কল্যাণ হউক। ওকে অামি মাপ করিলাম।” ন্যায়পরায়ণ অমুকুল কহিলেন, “যে কাজ করিয়াছে উহাকে মাপ করা যায় না।” রাইচরণ অমুকুলের পা জড়াইয়া কহিল, “আমি করি নাই, ঈশ্বর করিয়াছেন।” নিজের পাপ ঈশ্বরের স্বন্ধে চাপাইবার চেষ্টা দেখিয়া অমুকুল আরও বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “যে এমন বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করিয়াছে তাহাকে আর বিশ্বাস করা কর্তব্য নয় ।” রাইচরণ প্রভুর পা ছাড়িয়া কহিল, “সে আমি নয়, প্রভু।” “তবে কে ।” “আমার অদৃষ্ট।” কিন্তু এরূপ কৈফিয়ুতে কোনো শিক্ষিত লোকের সন্তোষ হইতে পারে না । রাইচরণ বলিল, “পৃথিবীতে আমার আর কেহ নাই ।” ফেলনা যখন দেখিল, সে মুসেফের সস্তান, রাইচরণ তাহাকে এতদিন চুরি করিয়া নিজের ছেলে বলিয়া অপমানিত করিয়াছে, তখন তাহার মনে মনে কিছু রাগ হইল। কিন্তু তথাপি উদারভাবে পিতাকে বলিল, “বাবা, উহাকে মাপ করো। বাড়িতে থাকিতে না দাও, উহার মাসিক কিছু টাকা বরাদ कद्रेिब्र! & * খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন ®პა ইহার পর রাইচরণ কোনো কথা না বলিয়া একবার পুত্রের মুখ নিরীক্ষণ করিল, সকলকে প্রণাম করিল ; তাহার পর দ্বারের বাহির হইয়া পৃথিবীর অগণ্য লোকের মধ্যে মিশিয়া গেল। মাসাস্তে অমুকুল যখন তাহার দেশের ঠিকানায় কিঞ্চিৎ বৃত্তি পাঠাইলেন তখন সে টাকা ফিরিয়া আসিল । সেখানে কোনো লোক নাই । অগ্রহায়ণ ১২৯৮