গল্পগুচ্ছ/জয়পরাজয়

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রাজকন্যার নাম অপরাজিতা । উদয়নারায়ণের সভাকবি শেখর তাহাকে কখনও চক্ষেও দেখেন নাই। কিন্তু যে দিন কোনো নূতন কাব্য রচনা করিয়া সভাতলে বলিয়া রাজাকে শুনাইতেন সে দিন কণ্ঠস্বর ঠিক এতটা উচ্চ করিয়া পড়িতেন যাহাতে তাহা সেই সমুচ্চ গৃহের উপরিতলের বাতায়নবর্তিনী অদৃশু শ্রোত্রীগণের কর্ণপথে প্রবেশ করিতে পারে। যেন তিনি কোনো-এক অগম্য নক্ষত্রলোকের উদ্দেশে আপনার সংগীতোচ্ছাস প্রেরণ করিতেন যেখানে জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর মধ্যে র্তাহার জীবনের একটি অপরিচিত শুভগ্রহ অদৃশু মহিমায় বিরাজ করিতেছেন। কখনো ছায়ার মতন দেখিতে পাইতেন, কখনো নূপুরশিল্পনের মতন গুনা বাইত ; বসিয়া বসিয়া মনে-মনে ভাবিতেন, সে কেমন দুইখানি চরণ বাস্থাতে সেই সোনার নূপুর বাধা থাকিয়া তালে তালে গান গাহিতেছে। সেই দুইখানি রক্তিম শুভ্র কোমল চরণতল প্রতি পদক্ষেপে কী সৌভাগ্য কী অনুগ্রহ কী করুণার মতো করিয়া পৃথিবীকে স্পর্শ করে। মনের মধ্যে সেই চরণদুটি প্রতিষ্ঠা করিয়া কবি অবসরকালে সেইখানে আসিয়া লুটাইয়া পড়িত এবং সেই নূপুরুশিয়নের স্বরে আপনার গান বাধিত। কিন্তু, যে-ছায়া দেখিয়াছিল, যে নূপুর শুনিয়াছিল, সে কাহার ছায়া, কাহার নূপুর, এমন তর্ক, এমন সংশয় তাহার ভক্তহৃদয়ে কখনো উদয় হয় নাই। রাজকন্যার দাসী মঞ্জরী যখন ঘাটে যাইত শেখরের ঘরের সন্মুখ দিয়া তাহার পথ ছিল । আসিতে যাইতে কবির সঙ্গে তাহার দুটা কথা না হইয়া বাইত না । তেমন নির্জন দেখিলে সে সকালে সন্ধ্যায় শেখরের ঘরের মধ্যে গিয়াও বসিত। যতবার সে ঘাটে ঘাইত ততবার যে তাহার আবশুক ছিল এমনও বোধ হইত না, যদিবা আবশুক ছিল এমন হয় কিন্তু ঘাটে বাইবার সময় উহারই মধ্যে একটু বিশেষ যত্ব করিয়া একটা রঙিন কাপড় এবং কানে দুইটা আম্রমুকুল পরিবার কোনো উচিত কারণ পাওয়া যাইত না । ›ፃ8 গল্পগুচ্ছ লোকে হাসাহাসি কানাকানি করিত। লোকের কোনো অপরাধ ছিল না । মঞ্জরীকে দেখিলে শেখর বিশেষ আনন্দলাভ করিতেন । তাহা গোপন করিতেও র্তাহার তেমন প্রয়াস ছিল না । তাহার নাম ছিল মঞ্জরী ; বিবেচনা করিয়া দেখিলে, সাধারণ লোকের পক্ষে সেই নামই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু শেখর আবার আরও একটু কবিত্ব করিয়া তাহাকে বসন্তমঞ্জরী বলিতেন। লোকে শুনিয়া বলিত, “আ সর্বনাশ !” আবার কবির বসন্তবর্ণনার মধ্যে "মঞ্জুলবঙুলমঞ্জরী এমনতর অনুপ্রাসও মাঝে মাঝে পাওয়া যাইত। এমন-কি, জনরব রাজার কানেও উঠিয়াছিল । রাজা তাহার কবির এইরূপ রসাধিক্যের পরিচয় পাইয়া বড়োই আমোদবোধ করিতেন— তাহা লইয়া কৌতুক করিতেন, শেখরও তাহাতে যোগ দিতেন । রাজা হাসিয়া প্রশ্ন করিতেন, "ভ্রমর কি কেবল বসন্তের রাজসভায় গান গায় ।” কবি উত্তর দিতেন, “না, পুষ্পমঞ্জরীর মধুও খাইয়া থাকে।” এমনি করিয়া সকলেই হাসিত, আমোদ করিত ; বোধ করি অন্তঃপুরে রাজকন্যা অপরাজিতাও মঞ্জরীকে লইয়া মাঝে মাঝে উপহাস করিয়া থাকিবেন । মঞ্জরী তাহাতে অসন্তুষ্ট হইত না । এমনি করিয়া সত্যে মিথ্যায় মিশাইয়া মানুষের জীবন এক রকম করিয়া কাটিয়া যায়— খানিকট বিধাতা গড়েন, খানিকট আপনি গড়ে, খানিকটা পাচজনে গড়িয়া দেয় । জীবনটা একটা পাচমিশালি রকমের জোড়াতাড়া— প্রকৃত এবং অপ্রকৃত, কাল্পনিক এবং বাস্তবিক । কেবল কবি যে গানগুলি গাহিতেন তাহাই সত্য এবং সম্পূর্ণ। গানের বিষয় সেই রাধা এবং কৃষ্ণ – সেই চিরন্তন নর এবং চিরন্তন নারী, সেই অনাদি দুঃখ এবং অনন্ত স্থখ । সেই গানেই তাহার যথার্থ নিজের কথা ছিল এবং সেই গানের যাথার্থ্য অমরাপুরের রাজা হইতে দীনদুঃখী প্রজা পর্যন্ত সকলেই আপনার হৃদয়ে হৃদয়ে পরীক্ষা করিয়াছিল। তাহার গান সকলেরই মুখে । জ্যোৎস্না উঠিলেই, একটু দক্ষিণ বাতাসের আভাস দিলেই, অমনি দেশের চতুদিকে কত কানন, কত পথ, কত নৌকা, কত বাতায়ন, কত জয়পরাজয় ›ፃፎ প্রাঙ্গণ হইতে র্তাহার রচিত গান উচ্ছ্বলিত হইয়া উঠিত— তাহার খ্যাতির আর সীমা ছিল না । এইভাবে অনেক দিন কাটিয়া গেল। কবি কবিতা লিখিতেন, রাজা শুনিতেন, রাজসভার লোক বাহব দিত, মঞ্জরী ঘাটে আসিত— এবং অস্তঃপুরের বাতায়ন হইতে কখনো কখনো একটা ছায়া পড়িত, কখনো কখনো একটা নূপুর শুনা যাইত । ९ এমন সময়ে দাক্ষিণাত্য হইতে এক দিগ্‌বিজয়ী কবি শার্দ লবিক্রীড়িত ছন্দে রাজার স্তবগান করিয়া রাজসভায় আসিয়া দাড়াইলেন। তিনি স্বদেশ হইতে বাহির হইয় পথিমধ্যে সমস্ত রাজকবিদিগকে পরাস্ত করিয়া অবশেষে অমরাপুরে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। রাজা পরম সমাদরের সহিত কহিলেন, “এহি এহি ।” কবি পুণ্ডরীক দম্ভভরে কহিলেন, “যুদ্ধং দেহি ।” রাজার মান রাখিতে হইবে, যুদ্ধ দিতে হুইবে ; কিন্তু, কাব্যযুদ্ধ যে কিরূপ হইতে পারে শেখরের সে সম্বন্ধে ভালোরূপ ধারণ ছিল না । তিনি অত্যন্ত চিন্তিত ও শঙ্কিত হইয়া উঠিলেন। রাত্রে নিদ্র হইল না। যশস্বী পুওরীকের দীর্ঘ বলিষ্ঠ দেহ, স্বতীক্ষ বক্র নাশা এবং দর্পোদ্ধত উন্নত মস্তক দিগ বিদিকে অঙ্কিত দেখিতে লাগিলেন। প্রাতঃকালে কম্পিতহদয় কবি রণক্ষেত্রে আসিয়া প্রবেশ করিলেন । প্রত্যুষ হইতে সভাতল লোকে পরিপূর্ণ হইয়া গেছে, কলরবের সীমা নাই ; নগরে অীর-সমস্ত কাজকর্ম একেবারে বন্ধ । কবি শেখর বহুকষ্টে মুখে সহ্যস্ত প্রফুল্লতার আয়োজন করিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী কবি পুণ্ডরীককে নমস্কার করিলেন ; পুওরীক প্রচও অবহেলাভরে নিতান্ত ইঙ্গিতমাত্রে নমস্কার ফিরাইয়া দিলেন এবং নিজের অম্বুবতী ভক্তবৃন্দের দিকে চাহিয়া হাসিলেন । শেখর একবার অন্তঃপুরের জালায়নের দিকে কটাক্ষ নিক্ষেপ করিলেন— বুঝিতে পারিলেন, সেখান হইতে আজ শত শত কৌতুহলপূর্ণ কৃষ্ণতারকার ›ዓ© গল্পগুচ্ছ ব্যগ্রন্থষ্টি এই জনতার উপরে অজস্র নিপতিত হইতেছে। একবার একাগ্ৰতাৰে চিত্তকে সেই উর্ধ্বলোকে উৎক্ষিপ্ত করিয়া আপনার জয়লক্ষ্মীকে বন্দনা করিয়া আসিলেন ; মনে-মনে কহিলেন, “আমার যদি আজ জয় হয় তবে, হে দেবী, হে অপরাজিত, তাহাতে তোমারই নামের সার্থকতা হইবে।” . তুরী ভেরি বাজিয়া উঠিল । জয়ধ্বনি করিয়া সমাগত সকলে উঠিয়া দাড়াইল। শুক্লবসন রাজা উদয়নারায়ণ শরৎপ্ৰভাতের শুভ্র মেঘরাশির স্যায় ধীরগমনে সভায় প্রবেশ করিলেন এবং লিংহাসনে উঠিয়া বসিলেন। পুণ্ডরীক উঠিয়া সিংহাসনের সম্মুখে আসিয়া দাড়াইলেন। বৃহৎ সভা স্তব্ধ হইয়া গেল । বক্ষ বিস্ফারিত করিয়া, গ্রীবা ঈষৎ উর্ধ্বে হেলাইয়া, বিরাটমূর্তি পুণ্ডরীক গম্ভীরস্বরে উদয়নারায়ণের স্তব পাঠ করিতে আরম্ভ করিলেন । কণ্ঠস্বর ঘরে ধরে না— বৃহৎ সভাগৃহের চারি দিকের ভিত্তিতে স্তম্ভে ছাদে সমূদ্রের তরঙ্গের মতো গম্ভীর মন্দ্রে আঘাত প্রতিঘাত করিতে লাগিল, এবং কেবল সেই ধ্বনির বেগে সমস্ত জনমণ্ডলীর বক্ষকবাট থৰ্ব থৰ্ব করিয়া স্পন্দিত হইয়া উঠিল। কত কৌশল, কত কারুকার্য, উদয়নারায়ণ নামের কতরূপ ব্যাখ্যা, রাজার নামাক্ষরের কত দিক হইতে কতপ্রকার বিন্যাস, কত ছন্দ, কত যমক ৷ পুগুরীক যখন শেষ করিয়া বসিলেন কিছুক্ষণের জন্ত নিস্তব্ধ সভাগৃহ তাহার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ও সহস্ৰ হৃদয়ের নির্বাক্ বিস্ময়রাশিতে গম গম্‌ করিতে লাগিল। বহু দূরদেশ হইতে আগত পণ্ডিতগণ দক্ষিণ হস্ত তুলিয়া উচ্ছসিত স্বরে ‘সাধু সাধু করিয়া উঠিলেন। তখন সিংহাসন হইতে রাজা একবার শেখরের মুখের দিকে চাহিলেন। শেখরও ভক্তি প্রণয় অভিমান এবং একপ্রকার সকরুণ সংকোচপূর্ণ দৃষ্টি রাজার দিকে প্রেরণ করিল এবং ধীরে ধীরে উঠিয় দাড়াইল । রাম যখন লোকরঞ্জনার্থে দ্বিতীয়বার অগ্নিপরীক্ষা করিতে চাহিয়াছিলেন তখন সীতা যেন এইরূপভাবে চাহিয়া এমনি করিয়া তাহার স্বামীর সিংহাসনের সম্মুখে দাড়াইয়াছিলেন । কবির দৃষ্টি নীরবে রাজাকে জানাইল, “আমি তোমারই। তুমি যদি বিশ্বসমক্ষে আমাকে দাড় করাইয়া পরীক্ষা করিতে চাও তো করে । কিন্তু-* তাহার পরে নয়ন নত করিলেন । জয়পরাজয় ১৭৭ পুণ্ডরীক সিংহের মতো দাড়াইয়াছিল, শেখর চারি দিকে ব্যাধবেষ্টিত হরিণের মতো দাড়াইল । তরুণ যুবক, রমণীর ন্যায় লজ্জা এবং স্নেহ -কোমল মুখ, পাণ্ডুবৰ্ণ কপোল, শরীরাংশ নিতান্ত স্বল্প— দেখিলে মনে হয়, ভাবের স্পর্শমাত্রেই সমস্ত দেহ যেন বীণার তারের মতে কঁাপিয়া বাজিয়া উঠিবে। শেখর মুখ না তুলিয়া প্রথমে অতি মৃদুস্বরে আরম্ভ করিলেন। প্রথম একটা শ্লোক বোধহয় কেহ ভালো করিয়া শুনিতে পাইল না । তাহার পরে ক্রমে ক্রমে মুখ তুলিলেন– যেখানে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেন সেখান হইতে যেন সমস্ত জনতা এবং রাজসভার পাষাণপ্রাচীর বিগলিত হইয়া বহুদূরবর্তী অতীতের মধ্যে বিলুপ্ত হইয়া গেল। স্বমিষ্ট পরিষ্কার কণ্ঠস্বর কঁাপিতে কঁাপিতে উজ্জল অগ্নিশিখার ন্যার উর্ধের্ব উঠিতে লাগিল । প্রথমে রাজার চন্দ্রবংশীয় আদিপুরুষের কথা আরম্ভ করিলেন। ক্রমে ক্রমে কত যুদ্ধবিগ্রহ, শৌর্যবীর্য, যজ্ঞদান, কত মহদমুষ্ঠানের মধ্য দিয়া তাহার রাজকাহিনীকে বর্তমান কালের মধ্যে উপনীত করিলেন। অবশেষে সেই দূরস্তুতিবদ্ধ দৃষ্টিকে ফিরাইয়া আনিয়া রাজার মুখের উপর স্থাপিত করিলেন এবং রাজ্যের সমস্ত প্রজাহৃদয়ের একটা বৃহৎ অব্যক্ত প্রতিকে ভাষায় ছন্দে মূর্তিমান করিয়া সভার মাঝখানে দাড় করাইয়া দিলেন– যেন দূর দূরাস্তর হইতে শতসহস্র প্রজার হৃদয়শ্রোত ছুটিয়া আসিয়া রাজপিতামহদিগের এই অতিপুরাতন প্রাসাদকে মহাসংগীতে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিল— ইহার প্রত্যেক ইষ্টককে যেন তাহারা স্পর্শ করিল, আলিঙ্গন করিল, চুম্বন করিল, উর্ধ্বে অস্তঃপুরের বাতায়নসম্মুখে উখিত হইয়া রাজলক্ষ্মীস্বরূপ প্রাসাদলক্ষ্মীদের চরণতলে স্নেহাৰ্দ্ৰ ভক্তিভরে লুষ্ঠিত হইয়া পড়িল, এবং সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে এবং রাজার সিংহাসনকে মহামহোল্লাসে শতশতবার প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল। অবশেষে বলিলেন, “মহারাজ, বাক্যেতে হার মানিতে পারি, কিন্তু ভক্তিতে কে হারাইবে।” এই বলিয়া কম্পিতদেহে বসিয়া পড়িলেন । তখন অশ্রুজলে-অভিষিক্ত প্রজাগণ ‘জয় জয়’ রবে আকাশ কাপাইতে লাগিল । সাধারণ জনমণ্ডলীর এই উন্মত্ততাকে ধিক্কারপূর্ণ হাস্তের দ্বারা অবজ্ঞা করিয়া পুওরীক আবার উঠিয়া দাড়াইলেন। দৃপ্ত গর্জনে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ৰাক্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কে ” সকলে এক মুহূর্তে স্তব্ধ হইয়া গেল। る守ケ গল্পগুচ্ছ তখন তিনি নানা ছন্দে অদ্ভূত পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিয়া বেদ বেদাস্ত আগম নিগম হইতে প্রমাণ করিতে লাগিলেন– বিশ্বের মধ্যে বাক্যই সর্বশ্রেষ্ঠ । বাক্যই সত্য, বাক্যই ব্রহ্ম। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর বাক্যের বশ, অতএব বাক্য তাহাদের অপেক্ষা বড়ে । ব্ৰহ্মা চারি মুখে বাক্যকে শেষ করিতে পারিতেছেন না ; পঞ্চানন পাচ মুখে বাক্যের অন্ত না পাইয়া অবশেষে নীরবে ধ্যানপরায়ণ হইয়া বাক্য খুজিতেছেন । এমনি করিয়া পাণ্ডিত্যের উপর পাণ্ডিত্য এবং শাস্ত্রের উপর শাস্ত্র চাপাইয়া বাক্যের জন্য একটা অভ্ৰভেদী সিংহাসন নির্মাণ করিয়া বাক্যকে মর্তলোক এবং স্বরলোকের মস্তকের উপর বসাইয়া দিলেন এবং পুনর্বার বজ্রনিনাদে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাক্যের অপেক্ষ শ্রেষ্ঠ কে ।” দর্পভরে চতুদিকে নিরীক্ষণ করিলেন ; যখন কেহ কোনো উত্তর দিল না তখন ধীরে ধীরে আসন গ্রহণ করিলেন । পণ্ডিতগণ সাধু সাধু ধন্য ধন্য’ করিতে লাগিল, রাজা বিস্মিত হইয়া রহিলেন এবং কবি শেখর এই বিপুল পাণ্ডিত্যের নিকটে আপনাকে ক্ষুদ্র মনে করিলেন । আজিকার মতো সভাভঙ্গ छ्हेल । ৩ পরদিন শেখর আসিয়া গান আরম্ভ করিয়া দিলেন— বৃন্দাবনে প্রথম বাশি বাজিয়াছে, তখনো গোপিনীরা জানে না কে বাজাইল, জানে না কোথায় বাজিতেছে। একবার মনে হইল, দক্ষিণপবনে বাজিতেছে ; একবার মনে হইল, উত্তরে গিরিগোবর্ধনের শিখর হইতে ধ্বনি আসিতেছে ; মনে হইল, উদয়াচলের উপরে দাড়াইয়া কে মিলনের জন্য আহবান করিতেছে ; মনে হইল, অস্তাচলের প্রাস্তে বসিয়া কে বিরহশোকে কাদিতেছে ; মনে হইল, যমুনার প্রত্যেক তরঙ্গ হইতে বাশি বাজিয়া উঠিল ; মনে হইল, আকাশের প্রত্যেক তারা যেন সেই বাশির ছিদ্ৰ— অবশেষে কুঞ্জে কুঞ্জে, পথে ঘাটে, ফুলে ফলে, জলে স্থলে, উচ্চে নীচে, অন্তরে বাহিরে বঁাশি সর্বত্র হইতে বাজিতে লাগিল— বাশি কী বলিতেছে তাহ কেহ বুঝিতে পারিল না এবং বাশির উত্তরে হৃদয় জয়পরাজয় ➢ ዓ: কী বলিতে চাহে তাহাও কেহ স্থির করিতে পারিল না ; কেবল ছুটি চক্ষু ভরিয়া অশ্রুজল জাগিয়া উঠিল এবং একটি অলোকসুন্দর শুামস্নিগ্ধ মরণের আকাঙ্ক্ষায় সমস্ত প্রাণ যেন উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিল। সভা ভুলিয়া, রাজা ভুলিয়া, আত্মপক্ষ প্রতিপক্ষ ভুলিয়া, যশ-অপযশ জয়পরাজয় উত্তরপ্রত্যুত্তর সমস্ত ভুলিয়া, শেখর আপনার নির্জন হৃদয়কুঞ্জের মধ্যে যেন একলা দাড়াইয়া এই বঁাশির গান গাহিয়া গেলেন। কেবল মনে ছিল একটি জ্যোক্তিময়ী মানসী মূর্তি, কেবল কানে বাজিতেছিল দুটি কমলচরণের নৃপুরধ্বনি। কবি যখন গান শেষ করিয়া হতজ্ঞানের মতো বসিয়া পড়িলেন তখন একটি অনির্বচনীয় মাধুর্যে, একটি বৃহৎ ব্যাপ্ত বিরহব্যাকুলতায় সভাগৃহ পরিপূর্ণ হইয়া রহিল— কেহ সাধুবাদ দিতে পারিল না। এই ভাবের প্রবলতার কিঞ্চিৎ উপশম হইলে পুণ্ডরীক সিংহাসনসম্মুখে উঠিলেন। প্রশ্ন করিলেন, “রাধাই বা কে, কৃষ্ণই বা কে । বলিয়া চারি দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন এবং শিষ্যদের প্রতি চাহিয়া ঈষৎ হাস্ত করিয়া পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, “রাধাই বা কে, কৃষ্ণই বা কে।” বলিয়া অসামান্ত পাণ্ডিত্য বিস্তার করিয়া আপনি তাহার উত্তর দিতে আরম্ভ করিলেন । বলিলেন, রাধা প্রণব ওঁকার, কৃষ্ণ ধ্যানযোগ, এবং বৃন্দাবন দুই ভ্রর মধ্যবর্তী বিন্দু। ইড়া, সুষুম্ন, পিঙ্গল, নাভিপদ্ম, হংপদ্ম, ব্রহ্মরন্ধ, সমস্ত আনিয়া ফেলিলেন। ‘রা’ অর্থেই বা কী, ধা’ অর্থেই বা কী, কৃষ্ণ শব্দের ‘ক’ হইতে মূর্ধন্ত 'ণ' পর্যন্ত প্রত্যেক অক্ষরের কত প্রকার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হইতে পারে, তাহার একে একে মীমাংসা করিলেন। একবার বুঝাইলেন, কৃষ্ণ যজ্ঞ, রাধিক অগ্নি ; একবার বুঝাইলেন, কৃষ্ণ বেদ এবং রাধিক বড় দর্শন ; তাহার পরে বুঝাইলেন, কৃষ্ণ শিক্ষা এবং রাধিক দীক্ষা । রাধিক তর্ক, কৃষ্ণ মীমাংসা ; রাধিক উত্তরপ্রত্যুত্তর, কৃষ্ণ জয়লাভ । এই বলিয়া রাজার দিকে, পণ্ডিতদের দিকে এবং অবশেষে তীব্র হাস্তে শেখরের দিকে চাহিয়া পুণ্ডরীক বসিলেন। রাজা পুগুরীকের আশ্চর্য ক্ষমতায় মুগ্ধ হইয়া গেলেন, পণ্ডিতদের বিস্ময়ের সীমা রহিল না এবং কৃষ্ণরাধার নব নব ব্যাখ্যায় বাশির গান, যমুনার কল্লোল, প্রেমের মোহ একেবারে দূর হইয়া গেল ; ষেন পৃথিবীর উপর হইতে কে Sbro গল্পগুচ্ছ একজন বসস্তের সবুজ রঙটুকু মুছিয়া লইয়া আগাগোড়া পবিত্র গোময় লেপন করিয়া গেল। শেখর আপনার এতদিনকার সমস্ত গান বৃথা বোধ করিতে লাগিলেন ; ইহার পরে তাহার আর গান গাহিবার সামর্থ্য রহিল না। সে দিন সভা ভঙ্গ হইল। 8 পরদিন পুওরীক ব্যস্ত এবং সমস্ত, দ্বিব্যস্ত এবং দ্বিসমস্তক, বৃত্ত, তার্ক্য, সৌত্র, চক্র, পদ্ম, কাকপদ, আদ্যুত্তর, মধ্যোত্তর, অস্তোত্তর, বাকোত্তর, শ্লোকোত্তর, বচনগুপ্ত, মাত্রাচু্যতক, চু্যতদত্তাক্ষর,অর্থগৃঢ়, স্তুতিনিন্দা, অপহ্ন তি, শুদ্ধাপভ্রংশ, শাদী, কালসার, গ্রহেলিকা প্রভৃতি অদ্ভুত শব্দচাতুরী দেখাইয়া দিলেন । শুনিয়া সভাসুদ্ধ লোক বিস্ময় রাখিতে স্থান পাইল না । শেখর যে-সকল পদ রচনা করিতেন তাহ নিতান্ত সরল— তাহা সুখে দুঃখে উৎসবে আনন্দে সর্বসাধারণে ব্যবহার করিত। আজ তাহারা স্পষ্ট বুঝিতে পারিল, তাহাতে কোনো গুণপনা নাই ; যেন তাহা ইচ্ছা করিলেই তাহারাও রচনা করিতে পারিত, কেবল অনভ্যাস অনিচ্ছা অনবসর ইত্যাদি কারণেই পারে না— নহিলে কথাগুলো বিশেষ নূতনও নহে দুরূহও নহে, তাহাতে পৃথিবীর লোকের নূতন একটা শিক্ষাও হয় না স্থবিধাও হয় না। কিন্তু, আজ যাহা শুনিল তাহ অদ্ভূত ব্যাপার, কাল যাহা শুনিয়াছিল তাহাতেও বিস্তর চিস্তা এবং শিক্ষার বিষয় ছিল । পুণ্ডরীকের পাণ্ডিত্য ও নৈপুণ্যের নিকট তাহদের আপনার কবিটিকে নিতান্ত বালক ও সামান্য লোক বলিয়া মনে হইতে লাগিল । মৎস্যপুচ্ছের তাড়নায় জলের মধ্যে যে গৃঢ় আন্দোলন চলিতে থাকে, সরোবরের পদ্ম যেমন তাহার প্রত্যেক আঘাত অনুভব করিতে পারে, শেখর তেমনি তাহার চতুর্দিকবর্তী সভাস্থ জনের মনের ভাব হৃদয়ের মধ্যে বুঝিতে পারিলেন । আজ শেষ দিন। আজ জয়পরাজয়-নির্ণয় হইবে। রাজা তাহার কবির প্রতি তীব্র দৃষ্টিপাত করিলেন। তাহার অর্থ এই, ‘আজ নিরুত্তর হইয়া জয়পরাজয় y beo. থাকিলে চলিবে না, তোমার যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে হইবে।” শেখর শ্রাস্তভাবে উঠিয়া দাড়াইলেন ; কেবল এইক’টি কথা বলিলেন, “বীণাপাণি, শ্বেতভূজ, তুমি যদি তোমার কমলবন শূন্ত করিয়া আজ মল্লভূমিতে আসিয়া দাড়াইলে তবে তোমার চরণাসক্ত যে ভক্তগণ অমৃতপিপাসী তাহাদের কী গতি হইবে।” মুখ ঈষৎ উপরে তুলিয়া করুণ স্বরে বলিলেন, যেন শ্বেতভুজ বীণাপাণি নতনয়নে রাজান্তঃপুরে জালায়নসম্মুখে দাড়াইয়া আছেন । তখন পুণ্ডরীক সশব্দে হাস্য করিলেন, এবং শেখর শব্দের শেষ দুই অক্ষর গ্রহণ করিয়া অনর্গল শ্লোক রচনা করিয়া গেলেন । বলিলেন, “পদ্মবনের সহিত থরের কী সম্পর্ক এবং সংগীতের বিস্তর চর্চাসত্ত্বেও উক্ত প্রাণী কিরূপ ফললাভ করিয়াছে । আর, সরস্বতীর অধিষ্ঠান তো পুওরীকেই, মহারাজের অধিকারে তিনি কী অপরাধ করিয়াছিলেন যে এ দেশে তাহাকে খরবাহন করিয়া অপমান করা হইতেছে । পণ্ডিতেরা এই প্রত্যুত্তরে উচ্চস্বরে হাসিতে লাগিলেন। সভাসদেরাও তাহাতে যোগ দিল— তাহাদের দেখাদেখি সভামুদ্ধ সমস্ত লোক, যাহারা বুঝিল এবং না-বুঝিল, সকলেই হাসিতে লাগিল । ইহার উপযুক্ত প্রত্যুত্তরের প্রত্যাশায় রাজা তাহার কবিসখাকে বারবার অস্কুশের ন্যায় তীক্ষ দৃষ্টির দ্বারা তাড়না করিতে লাগিলেন। কিন্তু, শেখর তাহার প্রতি কিছুমাত্র মনোযোগ না করিয়া অটলভাবে বসিয়া রছিলেন । তখন রাজা শেখরের প্রতি মনে-মনে অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া সিংহাসন হইতে নামিয়া আসিলেন এবং নিজের কণ্ঠ হইতে মুক্তার মালা খুলিয়া পুণ্ডরীকের গলায় পরাইয়া দিলেন– সভাস্থ সকলেই ‘ধন্য-ধন্য’ করিতে লাগিল। অস্তঃপুর হইতে এক কালে অনেকগুলি বলয় কঙ্কন নূপুরের শব্দ শুনা গেল— তাহাই শুনিয়া শেখর আসন ছাড়িয়া উঠিলেন এবং ধীরে ধীরে সভাগৃহ হইতে বাহির হইয়া গেলেন । & কৃষ্ণচতুর্দশীর রাত্রি। ঘন অন্ধকার। ফুলের গন্ধ বহিয়া দক্ষিণের বাতাস উদার বিশ্বৰন্ধর ন্তায় মুক্ত বাতায়ন দিয়া নগরের ঘরে ঘরে প্রবেশ করিতেছে। ১৮২ গল্পগুচ্ছ ঘরের কাঠমঞ্চ হইতে শেখর আপনার পুথিগুলি পাড়িয়া সম্মুখে শুপাকার করিয়া রাখিয়াছেন। তাহার মধ্য হইতে বাছিয়া বাছিয়া নিজের রচিত গ্রন্থগুলি পৃথক করিয়া রাথিলেন। অনেক দিনকার অনেক লেখা । তাহার মধ্যে অনেকগুলি রচনা তিনি নিজেই প্রায় ভুলিয়া গিয়াছিলেন। সেগুলি উলটাইয়া পালটাইয়া এখানে ওখানে পড়িয়া দেখিতে লাগিলেন। আজ র্তাহার কাছে ইহা সমস্তই অকিঞ্চিৎকর বলিয়া বোধ হইল । নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “সমস্ত জীবনের এই কি সঞ্চয় । কতকগুলা কথা এবং ছন্দ এবং মিল!” ইহার মধ্যে যে কোনো সৌন্দর্য, মানবের কোনো চির-আনন্দ, কোনো বিশ্বসংগীতের প্রতিধ্বনি, তাহার হৃদয়ের কোনো গভীর আত্মপ্রকাশ নিবদ্ধ হইয়া আছে— অজ তিনি তাহ দেখিতে পাইলেন না । রোগীর মুখে যেমন কোনো খাদ্যই রুচে না তেমনি আজ র্তাহার হাতের কাছে যাহা কিছু আসিল সমস্তই ঠেলিয়া ঠেলিয়া ফেলিয়া দিলেন। রাজার মৈত্রী, লোকের খ্যাতি, হৃদয়ের দুরাশা, কল্পনার কুহক— আজ অন্ধকার রাত্রে সমস্তই শূন্ত বিড়ম্বন বলিয়া ঠেকিতে লাগিল। তখন একটি একটি করিয়া তাহার পুথি ছিড়িয়া সম্মুখের জলন্ত অগ্নিভাণ্ডে নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। হঠাৎ একটা উপহাসের কথা মনে উদয় হইল । হাসিতে হাসিতে বলিলেন, "বড়ো বড়ো রাজার অশ্বমেধষজ্ঞ করিয়া থাকেন— আজ আমার এ কাব্যমেধযজ্ঞ ।” কিন্তু, তখনি মনে উদয় হইল, তুলনাটা ঠিক হয় নাই। “অশ্বমেধের অশ্ব যখন সর্বত্র বিজয়ী হইয়া ফিরিয়া আসে তখনি অশ্বমেধ হয়— আমার কবিত্ব যেদিন পরাজিত হইয়াছে আমি সেইদিন কাব্যমেধ করিতে বসিয়াছি- আরও বহুদিন পূর্বে করিলেই ভালো छ्ट्रेऊ |” একে একে নিজের সকল গ্রন্থগুলিই অগ্নিতে সমর্পণ করিলেন। আগুন ধুধু করিয়া জলিয়া উঠিলে কবি সবেগে দুই শূন্ত হস্ত শূন্তে নিক্ষেপ করিতে করিতে বলিলেন, “তোমাকে দিলাম, তোমাকে দিলাম, তোমাকে দিলাম, হে স্বন্দরী অগ্নিশিখা, তোমাকেই দিলাম। এতদিন তোমাকেই সমস্ত আহুতি দিয়া আসিতেছিলাম, আজ একেবারে শেষ করিয়া দিলাম । বহুদিন তুমি আমার হৃদয়ের মধ্যে জলিতেছিলে, হে মোহিনী ৰহিরুপিণী, যদি সোনা হইতাম তো জয়পরাজয় Σb"Θ উজ্জল হইয়া উঠিতাম— কিন্তু আমি তুচ্ছ তৃণ, দেবী, তাই আজ ভস্ম হইয়া গিয়াছি।” রাত্রি অনেক হইল। শেখর তাহার ঘরের সমস্ত বাতায়ন খুলিয়া দিলেন । তিনি যে যে ফুল ভালোবাসিতেন সন্ধ্যাবেল বাগান হইতে সংগ্ৰহ করিয়া আনিয়াছিলেন। সবগুলি সাদা ফুল— জুই বেল এবং গন্ধরাজ । তাহারই মুঠা মুঠা লইয়া নির্মল বিছানার উপর ছড়াইয়া দিলেন। ঘরের চারি দিকে প্রদীপ জালাইলেন । তাহার পর মধুর সঙ্গে একটা উদ্ভিদের বিষয়স মিশাইয়া নিশ্চিস্তমুখে পান করিলেন, এবং ধীরে ধীরে আপনার শয্যায় গিয়া শয়ন করিলেন । শরীর অবশ এবং নেত্র মুদ্রিত হইয়া আসিল । নুপুর বাজিল। দক্ষিণের বাতাসের সঙ্গে কেশগুচ্ছের একটা সুগন্ধ ঘরে প্রবেশ করিল। কবি নিমৗলিতনেত্ৰে কহিলেন, “দেবী, ভক্তের প্রতি দয়া করিলে কি । এত দিন পরে আজ কি দেখা দিতে আসিলে ।” একটি স্বমধুর কণ্ঠে উত্তর শুনিলেন, “কবি, আসিয়াছি।” শেখর চমকিয়া উঠিয়া চক্ষু মেলিলেন ; দেখিলেন শয্যার সম্মুখে এক অপরূপ রমণীমূর্তি । মৃত্যুসমাচ্ছন্ন বাষ্পাকুল নেত্রে স্পষ্ট করিয়া দেখিতে পাইলেন না । মনে হইল, তাহার হৃদয়ের সেই ছায়াময়ী প্রতিমা অন্তর হইতে বাহির হইয়া মৃত্যুকালে র্তাহার মুখের দিকে স্থিরনেত্রে চাহিয়া আছে। রমণী কহিলেন, “আমি রাজকন্যা অপরাজিত ।” কবি প্রাণপণে উঠিয়া বসিলেন । রাজকন্যা কহিলেন, “রাজা তোমার স্থবিচার করেন নাই । তোমারই জয় হইয়াছে, কবি, তাই আমি আজ তোমাকে জয়মাল্য দিতে আসিয়াছি।” বলিয় অপরাজিতা নিজের কণ্ঠ হইতে স্বহস্তরচিত পুষ্পমালা খুলিয়া কবির গলায় পরাইয়া দিলেন। মরণাহত কবি শয্যার উপরে পড়িয়া গেলেন । কার্তিক ১২৯৯ কাবুলিওয়াল আমার পাঁচ বছর বয়সের ছোটাে মেয়ে মিনি এক দণ্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না । পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া ভাষা শিক্ষা করিতে সে কেবল একটি বৎসর কাল রায়ু করিয়াছিল, তাহার পর হইতে যতক্ষণ সে জাগিয়া থাকে এক মুহূর্ত মৌনভাবে নষ্ট করে না । তাহার মা অনেক সময় ধমক দিয়া তাহার মুখ বন্ধ করিয়া দেয়, কিন্তু আমি তাহ পারি না। মিনি চুপ করিয়া থাকিলে এমনি অস্বাভাবিক দেখিতে হয় যে, সে আমার বেশিক্ষণ সহ হয় না। এইজন্য আমার সঙ্গে তাহার কথোপকথনটা কিছু উৎসাহের সহিত চলে । সকালবেলায় আমার নভেলের সপ্তদশ পরিচ্ছেদে হাত দিয়াছি এমন সময় মিনি আসিয়াই আরম্ভ করিয়া দিল, “বাবা, রামদয়াল দরোয়ান কাককে কেীয়া বলছিল, সে কিছু জানে না । না ?” আমি পৃথিবীতে ভাষার বিভিন্নতা সম্বন্ধে তাহাকে জ্ঞানদান করিতে প্রবৃত্ত হইবার পূর্বেই সে দ্বিতীয় প্রসঙ্গে উপনীত হইল। “দেখো বাবা, ভোলা বলছিল আকাশে হাতি শুড় দিয়ে জল ফেলে, তাই বৃষ্টি হয়। মা গো, ভোল৷ এত মিছিমিছি বকতে পারে ! কেবলই বকে, দিনরাত বকে ।” এ সম্বন্ধে আমার মতামতের জন্য কিছুমাত্র অপেক্ষ না করিয়া হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল, “বাবা, মা তোমার কে হয়।” মনে মনে কহিলাম তালিকা ; মুখে কহিলাম, ‘মিনি, তুই ভোলার সঙ্গে খেলা কর গে যা। আমার এখন কাজ আছে।” সে তখন আমার লিখিবার টেবিলের পাশ্বে আমার পায়ের কাছে বলিয়া নিজের দুই হাটু এবং হাত লইয়া অতিক্রত উচ্চারণে ‘আগডুম বাগডুম খেলিতে আরম্ভ করিয়া দিল । আমার সপ্তদশ পরিচ্ছেদে প্রতাপসিংহ তখন কাঞ্চনমালাকে লইয়া অন্ধকার রাত্রে কারাগারের উচ্চ বাতায়ন হইতে নিম্নবর্তী নদীর জলে বীপ দিয়া পড়িতেছেন। কাবুলিওয়ালা 4 שג আমার ঘর পথের ধারে। হঠাৎ মিনি আগডুম-বাগডুম খেলা রাখিয়া জানালার ধারে ছুটিয়া গেল এবং চীৎকার করিয়া ডাকিতে লাগিল, "কাবুলিওয়ালা, ও কাবুলিওয়ালা ।” ময়লা ঢিলা কাপড় পর, পাগড়ি মাথায়, ঝুলি ঘাড়ে, হাতে গোটাছুই-চার আঙুরের বাক্স, এক লম্বা কাবুলিওয়ালা_যুদ্ধমন্দ গমনে পথ দিয়া যাইতেছিল— তাহাকে দেখিয়া আমার কন্যারত্বের কিরূপ ভাবোদয় হইল বলা শক্ত, তাহাকে উর্ধ্বশ্বাসে ডাকাডাকি আরম্ভ করিয়া দিল । আমি ভাবিলাম, এখনই ঝুলি ঘাড়ে একটা আপদ আসিয়া উপস্থিত হইবে, আমার সপ্তদশ পরিচ্ছেদ আর শেষ হইবে ন! কিন্তু, মিনির চীৎকারে যেমনি কাবুলি"াল ক্লাসিয়ু মুখ ফুিরটু এবৃ; - আমাদের বাড়ির দিকে আসিতে লাগিল క్లిష్టీ দিল, তাহার আর চিহ্ন দেখতে পাওয়া গেল না। তাহার মনের মধ্যে একটা অন্ধ বিশ্বাসের ཝུ་ཏཱ་ཧཱ། ཧྥིག། যে, ওই ঝুলিটার ভিতর সন্ধান করিলে তাহার মতো দুটাে চারটি ঠি ੋ পাণ্ড-বাইতে পারে। এ দিকে কাবুলিওয়ালা আসিয়া ੋ 'আমাকে সেলাম ৰুবিয়া,াড়াইলআমি ভাবিলাম, বদিচ প্রতাপসিংহ এবং কাঞ্চনমালার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপ * তথাপি লোকটাকে ঘরে ডাকিয়া আনিয়া তাহার কাছ হইতে কিছু না কেনাট ভালো হয় না । কিছু কেনা গেল । তা পর ಕ! কথ মন্ট্রি পৃষ্টি । श्रांदमब्र द्रक्ष्यांम, ক্লস, ইংরেজ প্রভূতিকে লইয়া ຈິ່ຶງູຮ້ໍ সম্বন্ধে গল্প'চলিতে লাগিল । অবশেষে উঠিয়া যাইবার সময় সে জিজ্ঞাসা করিল, “বাবু, তোমার লড়কী কোথায় গেল।” আমি মিনির জুমুলক ভয় ভাঙাইয়া দিবার অভিপ্ৰায়ে তাহাকে অন্তঃপুর হইতে ডাকাইয়া আনিলামু-লে আমার গা ধেষিা কাবুলির মুখ এবং ঝুলির দিকে সৃষ্ট্ৰিঞ্চ নেত্রক্ষেপ S য়া রহিল। কাবুলি ঝুলির মধ্য হইতে কিসমিস খোবানি বাহির করিয়া তাহাকে দিতে 礫 .cन किङ्घ उहे जहेज ना, দ্বিগুণ সম্বেরে সহিত আমার হাটুর কাছে সংলগ্ন হইয়া বহিল। প্রথম পরিচয়টা এমনি ভাবে গেল। Y. W.

  • ... ." § ぐy^ ۱۳۷۲ به

र्थनर्शनं कर्षों कैश्विँ"हिंख्रह छबर কাবুলিওয়ালা তাহার তেলে বসিয়া ** A- ان / الكرم Xbూు গল্পগুচ্ছ YNÉ | s", & wo কিছুদিন পরে একদিন `ಜ್ಞ ఇRఫ్రో { ড়ি হইতে বাহির } x-سے امنیت ইবার সময় দেখি, আমার দুহিতাটি ধীরের সৃমীপস্থ বৈঞ্চির উপর বসিয়া از سمساس مصمیع مسی. f f * * > সহাস্তমুখে उर्मिलाई dवर भटश भटश প্রসঙ্গক্রমে র মতামতও ot محمي ب ". يمكن الأ فسكم لا يع ੇ দো-আঁশলা বাংলায় ব্যক্ত করিতেছে। মিনির পঞ্চবর্ষীয় জীবনের অভিজ্ঞতায় বাবা ছাড়া এমন ধৈর্যবান শ্রোতা সে কখনো পায় নাই । আবার দেখি, তাহার ক্ষুদ্র আঁচল বাদাম-কিস্মিসে পরিপূর্ণ। আমি কাবুলিওয়ালাকে কহিলাম, “উহাকে এ-সব কেন দিয়াছ . অমন আর দিয়ে না।" বলিয়া পকেট হইতে একটা তীর্থকে দিলাম। সে অসংকোচে আধুলি গ্রহণ করিয়া ঝুলিতে পুরিল । •s বাড়িতে ফুিরিয়া আসিয়া দেখি, সেই আধুলিটি লইয়া ੋਜ গোলবোর্গ বাধিয়া গেছে । i ィイ মিনির মা একটা শ্বেত চকচকে গোলাকার পদার্থ লইয়া ভংগনার স্বরে মিনিকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “তুই এ আধুলি কোথায় পেলি ।” মিনি বলিতেছে, “কাবুলিওয়ালা দিয়েছে।” তাহার মা বলিতেছেন, "কাবুলিওয়ালার কাছ হইতে আধুলি তুই কেন নিতে গেলি ।” মিনি ক্ৰন্দনের స్తో কহিল, “আমি চাই নি, সে আপনি ** سے ”fittan t ン("ヘrw r い আমি আসিয়া মিনিকে তাহার আসয় বিপদ হইতে উদ্ধার করিয়া বাহিরে লইয়া গেলাম। t সংবাদ পাইলাম, কালি" হিত নির এই : (ཧཱ་ཨེ་ཐཱ་ সাক্ষাৎ তায় "ইতুিখে ಫ್ಲಿ! আসিয়া পেস্তাবাদাম ঘুষ দিয়া মিনির ক্ষুদ্র বুদ্ধ হৃদয়টুকু অনেকটা অধিকার বরিয়া ইয়াছে। \ S. দেখিলাম, এই দুটি বন্ধুর মধ্যে গুটিকতক বাধা কথা এবং ঠাট্ট প্রচলিত আছে– বধ, রহমতকে দেখিবামাত্র আমার কষ্ট হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিত, “কাবুলিওয়াল, ও কাবুলিওয়ালা, তোমার ও ঝুলির ভিতর কী ” কাবুলিওয়ালা Xbrዓ 、擊 ‘‘’’ل ? اب مۃ .rcھی برہم ہرا রহমত একটা অনাবশ্বক চন্দ্রবিন্দু যোগ করিয়া হাসিতে হাসিতে উত্তর করিত, “হাতি ।” જwgঅর্থাৎ তার স্থলির ভিতরে মে একটা হৰী আছে এইট্রে পরিহাসের স্তন্ত্র মর্ম। খুব ৰে বুেলি স্বক্ষ তাহা বলা যায় না, ရွှံ့ *. পরিহাসে উভয়েই বেশ একটু কৌতুক অহুভব করিত— এবং শরৎকালের প্রভাতে একটি বয়স্ক এবং একটি প্রাপ্তবয়স্ক শিশুর সরল হাত দেখিয়া আমারও বেশ লাগিত । উহাদের মধ্যে আরো-একটা কথা প্রচলিত ছিল । রহমত মিনিকে বলিত "খোখী, তোমি সম্বরবাড়ি কুখুন্থ আবে !" বাঙালির ঘরের মেয়ে জয়কাল শ্বশুরবাড়ি শব্দটার সহিত পরিচিত, কিন্তু মুমূর কিছু "একেলে ধরনের লোক হওয়াতে শিশু মেয়েকে শুরবাড়ি সম্বন্ধে সজ্ঞান করিয়া তোলা হয় নাই। এইজন্য রহমতের অনুরোধটা সে পরিষ্কার বুঝিতে পারিত না, অথচ কথাটার একটা-কোনো জবাব না দিয়া চুপ

  1. * : . . . . " t } } করিয়া থাকা নিতান্ত তাছার স্বভাববিরুদ্ধ- সে উলটিয়া জিজ্ঞাসা করিত,

t o

তুমি ধগুয়াড়ি বে r. * _/লিং এ্যা - “ . রহমত কাল্পনিক শ্বশুরের প্রতি প্রকাও মোটামুটি স্বাক্ষালন করিয়া বলিত, “হামি সস্বরকে মারবে ।” % २ )९ •, { t८री ({{s , श" (० १ *> শুনি মিনি শ্বশুর-নামক কোনে-এক অপরিচিত জীবের দুরবস্থা কল্পনা } * " και * ، مر ప్తీ (f- $ করিয়া অত্যষ্ঠ হাসিত । أبر *・、Tい" 、1ィ、

  • * * * . .” - (え、。「・ ・バッ • ৫ a >-- - - ,

বাহির হইতেন । আমি কলিকাতা ছাড়িয়া কখনো কোথাও বাই নাই, কিন্তু সেইক্সপ্তই আমার মনটা পৃথিবীমৃদ্ধ যুক্তিযু বেড়ায়ু, আমি যেন আমার ঘরের င္တူ 门(邝 "ম্যু কেমন করে । একটা বিদেশের নাম শুনিলেই অমনি আমার চিত্ত ੇ। যায়, তেমনি বিদেশী লোক দেখিলেই অমনি নদী পর্বত অরণ্যের মধ্যে একটা কুটিরের দৃপ্ত মনে উদয় হয় এবং একটা উল্লাসপূর্ণ স্বাধীন জীবনযাত্রার কথা কল্পনায় জাগিয়া উঠে । -- ``

  • , $ ... 1 { ; エー w-- - 够 এখন শুভ্র শরৎকাল। প্রাচীনকালে এই সময়েই রাজারা গিবিজয়ে