গল্পগুচ্ছ/নিশীথে

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

গল্পগুচ্ছ 象尊心 নিশীথে “ড়াঙ্কার ; ডাঙ্কার ”ি জবালাতন করিল। এই অধোক রায়ে-- চোখ মেলিয়া দেখি আমাদের জমিদার দক্ষিণাচরণবাব। ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া পিঠভাঙা চৌকিটা টানিয়া আনিয়া তাঁহাকে বসিতে দিলাম এবং উদবিগুনভাবে তাঁহার মখের দিকে চাহিলাম। ঘড়িতে দেখি, তখন রান্ত্রি আড়াইটা। দক্ষিণাচরণবাব বিবর্ণমখে বিসফারিতনেয়ে কহিলেন, “আজ রাত্রে আবার সেইরূপ উপদ্রব আরম্ভ হইয়াছে—তোমার ঔষধ কোনো কাজে লাগিল না।” আমি কিঞ্চিৎ সসংকোচে বলিলাম, “আপনি বোধ করি মদের মাত্রা আবার বাড়াইয়াছেন।” দক্ষিণাচরণবাব অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “ওটা তোমার ভারি প্রম। মদ নহে; আদ্যোপাত বিবরণ না শুনিলে তুমি আসল কারণটা অনুমান করিতে পারবে ना ।” কুলুঙ্গির মধ্যে ক্ষুদ্র টিনের ডিবায় লানভাবে কেরোসিন জবলিতেছিল, আমি তাহা উকাইয়া দিলাম; একটখানি আলো জাগিয়া উঠিল এবং অনেকখানি ধোঁয়া বাহির হইতে লাগিল। কোঁচাখানা গায়ের উপর টানিয়া একখানা খবরের-কাগজ-পাতা প্যাকবাক্সের উপর বসিলাম। দক্ষিণাচরণবাব বলিতে লাগিলেন— আমার প্রথম পক্ষের পল্লীর মতো এমন গহিণী অতি দলেভ ছিল। কিন্তু আমার তখন বয়স বেশি ছিই না, সহজেই রসাধিক্য ছিল, তাহার উপর আবার কাব্যশাম্মটা ভালো করিয়া অধ্যয়ন করিয়াছিলাম, তাই অবিমিশ্র গহিণীপনায় মন উঠিত না। কালিদাসের সেই শ্লোকটা প্রায় মনে উদয় হইত— - গহিণী সচিবঃ সখী মিথঃ প্রিয়শিয্যা ললিতে কলাবিধোঁ । কিন্তু আমার গহিণীর কাছে ললিত কলাবিধির কোনো উপদেশ খাটিত না এবং সখীভাবে প্রণয়সম্ভাষণ করিতে গেলে তিনি হাসিয়া উড়াইয়া দিতেন। গঙ্গার স্রোতে যেমন ইন্দ্রের ঐরাবত নাকাল হইয়াছিল, তেমনি তাঁহার হাসির মখে বড়ো বড়ো কাব্যের টুকরা এবং ভালো ভালো আদরের সম্ভাষণ মহাতের মধ্যে অপদস্থ হইয়া ভাসিয়া যাইত। তাঁহার হাসিবার আশচষ ক্ষমতা ছিল। তাহার পর, আজ বছর চারেক হইল আমাকে সাংঘাতিক রোগে ধরিল। ওঠয়ণ হইয়া, জরবিকার হইয়া, মরিবার দাখিল হইলাম। বাঁচিবার আশা ছিল না। একদিন এমন হইল যে, ডাক্তার জবাব দিয়া গেল । এমন সময় আমায় এক আত্মীয় কোথা হইতে এক ব্রহমচারী আনিয়া উপস্থিত করিল; সে গব্য ঘাতের সহিত একটা শিকড় বটিয়া আমাকে খাওয়াইয়া দিল। ঔষধের গুণেই হউক বা আদষ্টরুমেই হউক সে যাত্রা বাঁচিয়া গেলাম । - রোগের সময় আমার পল্লী অহমিশি এক মহতের জন্য বিগ্রাম করেন নাই। ૨છ8 গল্পগুচ্ছ সেই কটা দিন একটি অবলা স্মীলোক, মানুষের সামান্য শক্তি লইয়া, প্রাণপণ ব্যাকুলতার সহিত, বারে সমাগত যমদতগলার সঙ্গে অনবরত যন্ধ করিয়াছিলেন। তাঁহার সমস্ত প্রেম, সমস্ত হদয়, সমস্ত যত্ন দিয়া আমার এই অযোগ্য প্রাণটাকে যেন বক্ষের শিশর মতো দই হতে ঝাঁপিয়া ঢাকিয়া ৰাখিয়াছিলেন। আহার ছিল না, নিদ্রা ছিল না, জগতের আর-কোনো-কিছর প্রতি দটি ছিল না। যম তখন পরাহত ব্যান্ত্রের ন্যায় আমাকে তাঁহার কবল হইতে ফেলিয়া দিয়া চলিয়া গেলেন, কিন্তু যাইবার সময় আমার সন্ত্রীকে একটা প্রবল থাবা মারিয়া গেলেন। আমার দী তখন গভবতী ছিলেন, অনতিকাল পরে এক মত সন্তান প্রসব করিলেন। তাহার পর হইতেই তাঁহার নানাপ্রকার জটিল ব্যামোর সত্রপাত হইল । তখন আমি তাঁহার সেবা আরম্ভ করিয়া দিলাম। তাহাতে তিনি বিব্রত হইয়া উঠিলেন। বলিতে লাগিলেন, “আঃ করো কী। লোকে বলিবে কী । অমন করিয়া দিনরাত্ৰি তুমি আমার ঘরে যাতায়াত করিয়ো না।” যেন নিজে পাখা খাইতেছি, এইরুপ ভাণ করিয়া রাত্রে যদি তাঁহাকে তাঁহার জনরের সময় পাখা করিতে যাইতাম তো ভারি একটা কাড়াকড়ি ব্যাপার পড়িয়া যাইত। কোনোদিন যদি তাঁহার শশ্রেষা-উপলক্ষে আমার আহারের নিয়মিত সময় দশ মিনিট উত্তীণ হইয়া যাইত, তবে সেও নানাপ্রকার অননয় অনুরোধ অন্যযোগের কারণ হইয়া দাঁড়াইত। স্বল্পমাত্র সেবা করিতে গেলে হিতে বিপরীত হইয়া উঠিত। তিনি বলিতেন, “পরষমানুষের অতটা বাড়াবাড়ি ভালো নয়।” আমাদের সেই বরানগরের বাড়িটি বোধ করি তুমি দেখিয়াছ। বাড়ির সামনেই বাগান এবং বাগানের সমখেই গঙ্গা বহিতেছে। আমাদের শোবার ঘরের নীচেই মতো একটকরা বাগান বানাইয়াছিলেন। সমস্ত বাগানটির মধ্যে সেই খণ্ডটিই অত্যন্ত সাদাসিধা এবং নিতান্ত দিশি । অথাৎ তাহার মধ্যে গন্ধের অপেক্ষা বণের বাহার, ফলের অপেক্ষা পাতার বৈচিত্র্য ছিল না, এবং টবের মধ্যে অকিঞ্চিৎকর উদ্ভিজের পাশেব কাঠি অবলম্বন করিয়া কাগজে নিমিত লাটিন নামের জয়ধ্বজা উড়িত না। বেল জুই গোলাপ গন্ধরাজ করবী এবং রজনীগন্ধারই প্রাদাভাব কিছু বেশি। প্রকাণ্ড একটা বকুলগাছের তলা সাদা মাবল পাথর দিয়া বাঁধানো ছিল। সস্থ অবস্থায় তিনি নিজে দাঁড়াইয়া দইবেলা তাহা ধাইয়া সাফ করাইয়া রাখতেন। গ্রীষ্মকালে কাজের অবকাশে সন্ধ্যার সময় সেই তাঁহার বসিবার স্থান ছিল। সেখান হইতে গঙ্গা দেখা যাইত, কিন্তু গঙ্গা হইতে কুঠির পান্সির বাবরা তাঁহাকে দেখিতে পাইত না। অনেকদিন শয্যাগত থাকিয়া একদিন চৈত্রের শুক্লপক্ষ সন্ধ্যায় তিনি কহিলেন “ঘরে বন্ধ থাকিয়া আমার প্রাণ কেমন করিতেছে ; আজ একবার আমার সেই বাগানে গিয়া বসিব ।” আমি তাঁহাকে বহয় যত্নে ধরিয়া ধীরে ধীরে সেই বকুলতলের প্রস্তরবেদিকায় লইয়া গিয়া শয়ন করাইয়্য দিলাম। আমারই জানার উপরে তাঁহার মাথাটি তুলিয়া রাখিতে পারিতাম, কিন্তু জানি সেটাকে তিনি অদ্ভূত আচরণ বলিয়া গণ্য করবেন, তাই একটি বালিশ আনিয়া তাঁহার মাথার তলায় রাখিলাম। দৃষ্টি-একটি করিয়া প্রসফট বকুল ফল করিতে লাগিল এবং শাখাতরাল হইতে ৗনশীথে ૨છd: ছায়াকিত জ্যোৎসনা তাঁহার শীর্ণ মাখের উপর আসিয়া পড়িল। চারি দিক শান্ত নিস্তখ; সেই ঘনগন্ধপণ ছায়ান্ধকারে এক পাবে নীরবে বসিয়া তাঁহার মাখের দিকে চাহিয়া আমার চোখে জল আসিল । আমি ধীরে ধীরে কাছের গোড়ায় আসিয়া দই হস্তে তাঁহার একটা উত্তপ্ত শীণ হাত তুলিয়া লইলাম। তিনি তাহাতে কোনো আপত্তি করিলেন না। কিছু ক্ষণ এইরুপ চুপ করিয়া বসিয়া থাকিয়া আমার হদয় কেমন উদবেলিত হইয়া উঠিল ; আমি বলিয়া উঠিলাম, "তোমার ভালোবাসা আমি কোনো কালে ভুলিব না।” তখনি কঝিলাম, কথাটা বলিবার কোনো আবশ্যক ছিল না। আমার দী হাসিয়া উঠিলেন। সে হাসিতে লন্জা ছিল, সুখ ছিল এবং কিঞ্চিৎ অবিশ্বাস ছিল, এবং উহার মধ্যে অনেকটা পরিমাণে পরিহাসের তীব্রতাও ছিল। প্রতিবাদস্বরপে একটি কথামাত্র না বলিয়া কেবল তাঁহার সেই হাসির বারা জানাইলেন, “কোনো কালে ভুলিবে না, ইহা কখনো সম্ভব নহে এবং আমি তাহা প্রত্যাশাও করি না।” ঐ সমিষ্ট সতীক্ষ হাসির ভয়েই আমি কখনো আমার স্মীর সঙ্গে রীতিমত প্রেমালাপ করিতে সাহস করি নাই। অসাক্ষাতে যে-সকল কথা মনে উদয় হইত, তাঁহার সম্মখে গেলেই সেগলাকে নিতান্ত বাজে কথা বলিয়া বোধ হইত। ছাপার অক্ষরে যে-সব কথা পড়িলে দুই চক্ষ বাহিয়া দর-দর ধারায় জল পড়িতে থাকে সেইগলো মখে বলিতে গেলে কেন যে হাস্যের উদ্রেক করে, এ পর্যন্ত বুঝিতে পারিলাম না। বাদপ্রতিবাদ কথায় চলে কিন্তু হাসির উপরে তক চলে না, কাজেই চুপ করিয়া যাইতে হইল। জ্যোৎস্না উজ্জলতর হইয়া উঠিল, একটা কোকিল ক্ৰমাগতই কুহু কুহ ডাকিয়া অস্থির হইয়া গেল। আমি বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম, এমন জ্যোৎস্নারাত্রেও কি পিকবধ বধির হইয়া আছে। বহ চিকিৎসায় আমার স্ত্রীর রোগ-উপশমের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। ডাকার বলিল, “একবার বায় পরিবতন করিয়া দেখিলে ভালো হয়।” আমি সাঁকে লইয়া এলাহাবাদে গেলাম। এইখানে দক্ষিণাবাব হঠাৎ থমকিয়া চুপ করিলেন। সন্দিগ্ধভাবে আমার মাখের দিকে চাহিলেন, তাহার পর দুই হাতের মধ্যে মাথা রাখিয়া ভাবিতে লাগিলেন। আমিও চুপ করিয়া রহিলাম। কুলুঙ্গিতে কেরোসিন মিট মিট করিয়া জনলিতে লাগিল এবং নিস্তবধ ঘরে মশার ভন ভন শব্দ সম্পেষ্ট হইয়া উঠিল। হঠাৎ মৌন ভঙ্গ করিয়া দক্ষিণাবাব বলিতে আরম্ভ করিলেন— সেখানে হারান ডাক্তার আমার সাঁকে চিকিৎসা করিতে লাগিলেন। অবশেষে অনেককাল একভাবে কাটাইয়া ডাক্তারও বলিলেন, আমিও কঝিলাম এবং আমার স্মীও বঝিলেন যে, তাঁহার ব্যামো সারিবার নহে। তাঁহাকে চিররগণ হইয়াই কাটাইতে হইবে। তখন একদিন আমার স্মী আমাকে বলিলেন, “যখন ব্যামোও সারিবে না এবং শীঘ্ন আমার মরিবার আশাও নাই, তখন আর-কতদিন এই জীবনমতকে লইয়া কাটাইবে। তুমি আর-একটা বিবাহ করো।” ૨છ૭ গল্পগুচ্ছ এটা যেন কেবল একটা সযক্তি এবং সদবিবেচনার কথা—ইহার মধ্যে যে ভারি একটা মহত্ত্ব বীরত্ব বা অসামান্য কিছু আছে, এমন ভাব তাঁহার লেশমাত্র ছিল না। এইবার আমার হাসিবার পালা ছিল। কিন্তু, আমার কি তেমন করিয়া হাসিবার ক্ষমতা আছে। আমি উপন্যাসের প্রধান নায়কের ন্যায় গম্ভীর সমক্ষেভাবে বলিতে লাগিলাম, “যতদিন এই দেহে জীবন আছে--" তিনি বাধা দিয়া কহিলেন, “নাও নাও ! আর বলিতে হইবে না। তোমার কথা শনিয়া আমি আর বাঁচি না!" আমি পরাজয় স্বীকার না করিয়া বলিলাম, “এ জীবনে আর কাহাকেও ভালো পারিব না।") শনিয়া আমার দী ভারি হাসিয়া উঠিলেন। তখন আমাকে ক্ষান্ত হইতে হইল। জানি না, তখন নিজের কাছেও কখনো পাট স্বীকার করিয়াছি কি না কিন্তু এখন বুঝিতে পারিতেছি, এই আরোগ্য-আশা-হীন সেবাকায়ে আমি মনে মনে পরিশ্রান্ত হইয়া গিয়াছিলাম। এ কাযে যে ভঙ্গ দিব, এমন কল্পনাও আমার মনে ছিল না ; অথচ, চিরজীবন এই চিররগণকে লইয়া যাপন করিতে হইবে এ কাপনাও আমার নিকট পীড়াজনক হইয়াছিল। হায়, প্রথম-যৌবনকালে যখন সমখে তাকাইয়াছিলাম তখন প্রেমের কুহকে, সখের আশবাসে, সৌন্দর্যের মরীচিকায় সমস্ত ভবিষ্যৎ জীবন প্রফুল্ল দেখাইতেছিল। আজ হইতে শেষ পর্যন্ত কেবলই আশাহীন সদীর্ঘ সতৃষ্ণ মরুভূমি। আমার সেবার মধ্যে সেই আন্তরিক শ্রাপ্তি নিশ্চয় তিনি দেখিতে পাইয়াছিলেন। তখন জানিতাম না কিন্তু এখন সন্দেহমাত্র নাই যে,তিনি আমাকে যুক্তাক্ষরহীন । প্রথমভাগ শিশুশিক্ষার মতো অতি সহজে বঝিতেন; সেইজন্য যখন উপন্যাসের নায়ক সাজিয়া গভীরভাবে তাঁহার নিকট কবিত্ব ফলাইতে যাইতাম তিনি এমন সংগভীর স্নেহ অথচ অনিবাৰ্য কৌতুকের সহিত হাসিয়া উঠিতেন। আমার নিজের অগোচর অন্তরের কথাও অন্তযামীর ন্যায় তিনি সমস্তই জানিতেন এ কথা মনে করিলে আজও লক্ষজায় মরিয়া যাইতে ইচ্ছা করে। হারান ডাক্তার আমাদের স্বজাতীয়। তাঁহার বাড়িতে আমার প্রায়ই নিমন্ত্রণ থাকিত। কিছুদিন যাতায়াতের পর ডাক্তার তাঁহার মেয়েটির সঙ্গে আমার পরিচয় করাইয়া দিলেন। মেয়েটি অবিবাহিত ; তাহার বয়স পনেরো হইবে। ডাক্তার বলেন, তিনি মনের মতো পাত্র পান নাই বলিয়া বিবাহ দেন নাই। কিন্তু, বাহিরের লোকের কাছে গজেব শনিতাম— মেয়েটির কুলের দোষ ছিল। কিন্তু, আর কোনো দোষ ছিল না। যেমন সরপে তেমনি সুশিক্ষা। সেইজন্য মাঝে মাঝে এক-একদিন তাঁহার সহিত নানা কথার অালোচনা করিতে করিতে আমার বাড়ি ফিরিতে রাত হইত, আমার সন্ত্রীকে ঔষধ খাওয়াইবার সময় উত্তীণ হইয়া বাইত। তিনি জানিতেন আমি হারান ডাক্তারের বাড়ি গিয়াছি, কিন্তু বিলবের কারণ একদিনও আমাকে জিজ্ঞাসা করেন নাই। মরুভূমির মধ্যে আর-একবার মরীচিকা দেখিতে লাগিলাম। তৃষ্ণা যখন বকে পৰ্যন্ত তখন চোখের সামনে কালপরিপণ স্বচ্ছ জল ছলছল ঢলঢল করিতে লাগিল। তখন মনকে প্রাণপণে টানিয়া আর ফিরাইতে পারিলাম না। । নিশীথে রোগীর ঘর আমার কাছে বিগণ নিরানন্দ হইয়া উঠিল। তখন প্রায়ই শশ্রষা করিবার এবং ঔষধ খাওয়াইবার নিয়ম ভঙ্গ হইতে লাগিল । হারান ডাক্তার আমাকে প্রায় মাঝে মাঝে বলিতেন, যাহাদের রোগ আরোগ্য হইবার কোনো সম্ভাবনা নাই, তাহাদের পক্ষে মৃত্যুই ভালো ; কারণ, বাঁচিয়া তাহাদের নিজেরও সাখ নাই, অন্যেরও অসুখ। কথাটা সাধারণভাবে বলিতে দোষ নাই, তথাপি আমার সত্রীকে লক্ষ্য করিয়া এমন প্রসঙ্গ উত্থাপন করা তাঁহার উচিত হয় নাই। কিন্তু, মানুষের জীবনমৃত্যু সম্বন্ধে ডাক্তারদের মন এমন অসাড় যে, তাহারা ঠিক আমাদের মনের অবস্থা বুঝিতে পারে না। হঠাৎ একদিন পাশের ঘর হইতে শুনিতে পাইলাম, আমার স্মী হারানবাবকে বলিতেছেন, “ডাক্তার, কতকগলো মিথ্যা ঔষধ গিলাইয়া ডাক্তারখানার দেনা বাড়াইতেছ কেন। আমার প্রাণটাই যখন একটা ব্যামো, তখন এমন একটা ওষুধ দাও যাহাতে শীঘ্ন এই প্রাণটা যায়।” ডাক্তার বলিলেন, “ছি, এমন কথা বলিবেন না।” কথাটা শুনিয়া হঠাৎ আমার বক্ষে বড়ো আঘাত লাগিল। ডাক্তার চলিয়া গেলে আমার সন্ত্রীর ঘরে গিয়া তাঁহার শয্যাপ্রান্তে বসিলাম, তাঁহার কপালে ধীরে ধীরে হাত বলাইয়া দিতে লাগিলাম। তিনি কহিলেন, “এ ঘর বড়ো গরম, তুমি বাহিরে যাও । তোমার বেড়াইতে যাইবার সময় হইয়াছে। খানিকটা না বেড়াইয়া আসিলে আবার রাত্রে তোমার ক্ষধা হইবে না।” বেড়াইতে যাওয়ার অর্থ ডাক্তারের বাড়ি যাওয়া। আমিই তাঁহাকে বুঝাইয়াছিলাম, ক্ষমধাসঞ্চারের পক্ষে খানিকটা বেড়াইয়া আসা বিশেষ আবশ্যক। এখন নিশ্চয় বলিতে পারি, তিনি প্রতিদিনই আমার এই ছলনাটকু বুঝিতেন। আমি নিবোধ, মনে করিতাম তিনি নিবোধ। - এই বলিয়া দক্ষিণাচরণবাব অনেক ক্ষণ করতলে মাথা রাখিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। অবশেষে কহিলেন, “আমাকে একলাস জল আনিয়া দাও।” জল খাইয়া বলিতে লাগিলেন— একদিন ডান্তারবাবর কন্যা মনোরমা আমার স্মীকে দেখিতে আসিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। জানি না, কী কারণে তাঁহার সে প্রস্তাব আমার ভালো লাগিল না। কিন্তু, প্রতিবাদ করিবার কোনো হেতু ছিল না। তিনি একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমাদের বাসায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সেদিন আমার স্মীর বেদনা অন্য দিনের অপেক্ষা কিছর বাড়িয়া উঠিয়াছিল। যেদিন তাঁহার ব্যথা বাড়ে সেদিন তিনি অত্যন্ত স্থির নিন্তখ হইয়া থাকেন; কেবল মাঝে মাঝে মাটি বদ্ধ হইতে থাকে এবং মাখ নীল হইয়া আসে, তাহাতেই তাঁহার যক্ষ্মণা বুঝা যায়। ঘরে কোনো সাড়া ছিল না, আমি শয্যাপ্রান্তে চুপ করিয়া বসিয়া ছিলাম ; সেদিন আমাকে বেড়াইতে যাইতে অনুরোধ করেন এমন সামথ তাঁহার ছিল না, কিবা হয়তো বড়ো কটের সময় আমি কাছে থাকি এমন ইচ্ছা তাঁহার মনে মনে DDS BBB DBB DDDD BBDDBB BD DBBB BBBS DD S DD २७४ গল্পগুচ্ছ অন্ধকার এবং নিস্তৰধ। কেবল এক-একবার যন্ত্রণার কিঞ্চিৎ উপশমে আমার সন্ত্রীর গভীর দীর্ঘনিশ্বাস শনা যাইতেছিল। এমন সময়ে মনোরমা ঘরের প্রবেশদ্বারে দাঁড়াইলেন। বিপরীত দিক হইতে কেরোসিনের আলো আসিয়া তাঁহার মুখের উপর পড়িল। আলো-অাঁধারে লাগিয়া তিনি কিছু ক্ষণ ঘরের কিছই দেখিতে না পাইয়া বারের নিকট দাঁড়াইয়া ইতস্তত করিতে লাগিলেন । আমার সত্ৰী চমকিয়া আমার হাত ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ও কে "– তাঁহার সেই দবল অবস্থায় হঠাৎ অচেনা লোক দেখিয়া ভয় পাইয়া আমাকে দুই-তিনবার অসফটম্বরে প্রশ্ন করিলেন, “ও কে। ও কে গো।” আমার কেমন দরবধি হইল আমি প্রথমেই বলিয়া ফেলিলাম, "আমি চিনি না।" বলিবামাত্রই কে যেন আমাকে কশাঘাত করিল। পরের মহেতেই বলিলাম, “ওঃ, আমাদের ডাক্তারবাবর কন্যা।” সী একবার আমার মুখের দিকে চাহিলেন; আমি তাঁহার মথের দিকে চাহিতে পারিলাম না। পরক্ষণেই তিনি ক্ষীণস্বরে অভ্যাগতকে বলিলেন, “আপনি আসন।” আমাকে বলিলেন, “আলোটা ধরো।” মনোরমা ঘরে আসিয়া বসিলেন। তাঁহার সহিত রোগিণীর অপেস্বল্প আলাপ চলিতে লাগিল। এমন সময় ডাক্তারবাব আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি তাঁহার ডাক্তারখানা হইতে দই শিশি ওষুধ সঙ্গে আনিয়াছিলেন। সেই দটি শিশি বাহির করিয়া আমার স্মীকে বলিলেন, “এই নীল শিশিটা মালিস করিবার, আর এইটি খাইবার। দেখিবেন, দুইটাতে মিলাইবেন না, এ ওষুধটা ভারি বিষ।” & আমাকেও একবার সতক করিয়া দিয়া ঔষধ দটি শয্যাপাশববতী টেবিলে রাখিয়া দিলেন। বিদায় লইবার সময় ডাক্তার তাঁহার কন্যাকে ডাকিলেন। মনোরমা কহিলেন, “বাবা, আমি থাকি না কেন। সঙ্গে সীলোক কেহ নাই, ইহাকে সেবা করিবে কে।” আমার স্ত্রী ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন ; বলিলেন, “না, না, আপনি কস্ট করিবেন না। পরানো ঝি আছে, সে আমাকে মায়ের মতো যত্ন করে।” ডাক্তার হাসিয়া বলিলেন, “উনি মা-লক্ষয়ী, চিরকাল পরের সেবা করিয়া আসিয়াছেন, অন্যের সেবা সহিতে পারেন না।” কন্যাকে লইয়া ডাক্তার গমনের উদযোগ করিতেছেন এমন সময় আমার সী বলিলেন, “ডাক্তারবাব, ইনি এই বন্ধ ঘরে অনেক ক্ষণ বসিয়া আছেন, ইহাকে একবার বাহিরে বেড়াইয়া লইয়া আসিতে পারেন ?” ডাক্তারবাব আমাকে কহিলেন, “আসন-না, আপনাকে নদীর ধার হইয়া একবার বেড়াইয়া আনি।” আমি ঈষৎ আপত্তি দেখাইয়া অনতিবিলবে সম্মত হইলাম। ডাক্তারবাব যাইবার সময় দই শিশি ঔষধ সম্বন্ধে আবার আমার স্মীকে সতক’ করিয়া দিলেন। সেদিন ডাঙ্কারের বাড়িতেই আহার করিলাম। ফিরিয়া আসিতে রাত হইল। আসিয়া দেখি আমার পল্লী ছটফট করিতেছেন। অনতাপে বিশ্ব হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, নিশীথে **為 “তোমার কি ব্যথা বাড়িয়াছে।” তিনি উত্তর করিতে পারিলেন না, নীরবে আমার মুখের দিকে চাহিলেন । তখন তাহার কন্ঠরোধ হইয়াছে। আমি তৎক্ষণাৎ সেই রাত্রেই ডাক্তারকে ডাকাইয়া আনিলাম । ডাক্তার প্রথমটা আসিয়া অনেক ক্ষণ কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। অবশেষে জিজ্ঞাসা করিলেন, “সেই ব্যথাটা কি বাড়িয়া উঠিয়াছে। ঔষধটা একবার মালিস করিলে হয় না ?” বলিয়া শিশিটা টেবিল হইতে লইয়া দেখিলেন, সেটা খালি । আমার সন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কি ভুল করিয়া এই ওষুধটা খাইয়াছেন।” আমার সত্ৰী ঘাড় নাড়িয়া নীরবে জানাইলেন, “হাঁ।” ডাক্তার তৎক্ষণাং গাড়ি করিয়া তাঁহার বাড়ি হইতে পাপ আনিতে ছটিলেন। আমি অধমছিাঁতের ন্যায় আমার স্ত্রীর বিছানার উপর গিয়া পড়িলাম। তখন, মাতা তাহার পীড়িত শিশুকে যেমন করিয়া সাত্বনা করে তেমনি করিয়া তিনি আমার মাথা তাঁহার বক্ষের কাছে টানিয়া লইয়া দুই হতের পশে আমাকে তাঁহার মনের কথা বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন। কেবল তাঁহার সেই করণ পশের হইয়াছে, তুমি সখী হইবে, এবং সেই মনে করিয়া আমি সনখে মরিলাম।” ডাক্তার যখন ফিরিলেন, তখন জীবনের সঙ্গে সঙ্গে আমার স্ত্রীর সকল যন্ত্রণার অবসান হইয়াছে। 3...? o' দক্ষিণাচরণ আর-একবার জল খাইয়া বলিলেন, “উঃ, বড়ো গরম!" বলিয়া দ্রুত বাহির হইয়া বারকয়েক বারান্দায় পায়চারি করিয়া আসিয়া বসিলেন। বেশ বোঝা গেল, তিনি বলিতে চাহেন না কিন্তু আমি যেন জাদ করিয়া তাঁহার নিকট হইতে কথা কাড়িয়া লইতেছি। আবার আরম্ভ করিলেন— মনোরমাকে বিবাহ করিয়া দেশে ফিরিলাম । মনোরমা তাহার পিতার সম্মতিক্রমে আমাকে বিবাহ করিল; কিন্তু আমি যখন তাহাকে আদরের কথা বলিতাম, প্রেমালাপ করিয়া তাহার হদয় অধিকার করিবার চেষ্টা করিতাম, সে হাসিত না, গম্ভীর হইয়া থাকিত। তাহার মনের কোথায় কোনখানে কী খটকা जाणिज्ञा शिब्राझिल, आीघ्र रुकन्नम कीव्रज्ञा दकिय । এই সময় আমার মদ খাইবার নেশা অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল । একদিন প্রথম শরতের সন্ধ্যায় মনোরমাকে লইয়া আমাদের বরানগরের বাগানে বেড়াইতেছি। ছমছমে অন্ধকার হইয়া আসিয়াছে। পাখিদের বাসায় ডানা ঝাড়িবার শব্দটকুও নাই। কেবল বেড়াইবার পথের দুই ধারে ঘনছায়াবত ঝাউগাছ বাতাসে সশঙ্গে কাঁপতেছিল। শ্রান্তি বোধ করিতেই মনোরমা সেই বকুলতলার শত্র পাথরের বেদীর উপর আসিয়া নিজের দই বাহর উপর মাথা রাখিয়া শয়ন করিল। আমিও কাছে আসিয়া বসিলাম । షి રવિ o • গল্পগুচ্ছ সেখানে আরও ঘনীভূত; যতটুকু আকাশ দেখা যাইতেছে একেবারে তারায় আচ্ছন্ন ; (তরতলের ঝিল্লিধর্মনি যেন অনন্তগগনবক্ষচু্যত নিঃশব্দতার নিম্ন প্রান্তে একটি শব্দের সর পাড় বনিয়া দিতেছে) সেদিনও বৈকালে আমি কিছ মদ খাইয়াছিলাম, মনটা বেশ একটা তরলাবস্থায় ছিল। অন্ধকার যখন চোখে সহিয়া আসিল তখন বনচ্ছায়াতলে পান্ডুর বণে অঙ্কিত সেই শিথিল-অঞ্চল শ্রান্তকায় রমণীর আবছায়া মতিটি আমার মনে এক অনিবায আবেগের সঞ্চার করিল। মনে হইল, ও যেন একটি ছায়া, ওকে যেন কিছুতেই দই বাহ দিয়া ধরিতে পারিব না। এমন সময় অন্ধকার ঝাউগাছের শিখরদেশে যেন আগন ধরিয়া উঠিল; তাহার পরে কৃষ্ণপক্ষের জীণ প্রান্ত হলদেবণ চাঁদ ধীরে ধীরে গাছের মাথার উপরকার আকাশে আরোহণ করিল ; সাদা পাথরের উপর সাদা শাড়ি-পরা সেই শ্রাতশয়ান রমণীর মুখের উপর জ্যোৎসনা আসিয়া পড়িল । আমি আর থাকিতে পারিলাম না। আমাকে বিশ্বাস কর না, কিন্তু তোমাকে আমি ভালোবাসি। তোমাকে আমি কোনো কালে ভুলিতে পারিব না।" কথাটা বলিবামাত্র চমকিয়া উঠিলাম; মনে পড়িল, ঠিক এই কথাটা আর-একদিন আর-কাহাকেও বলিয়াছি। এবং সেই মহেতেই বকুলগাছের শাখার উপর দিয়া, ঝাউগাছের মাথার উপর দিয়া, কৃষ্ণপক্ষের পীতবণ ভাঙা চাঁদের নীচে দিয়া, গঙ্গার পব পার হইতে গঙ্গার সদর পশ্চিমপার পর্যন্ত হাহা—হাহা—হাহা করিয়া অতি দ্রুতবেগে একটা হাসি বহিয়া গেল। সেটা মৰ্মভেদী হাসি কি অভ্ৰভেদী হাহাকার, বলিতে পারি না। আমি তদন্ডেই পাথরের বেদীর উপর হইতে মাছিত হইয়া নীচে পড়িয়া গেলাম।) মছাভঙ্গে দেখিলাম, আমার ঘরে বিছানায় শুইয়া আছি। সত্ৰী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমার হঠাৎ এমন হুইল কেন।” আমি কাঁপিয়া উঠিয়া বলিলাম, “শুনিতে পাও নাই সমস্ত আকাশ ভরিয়া হাহা করিয়া একটা হাসি বহিয়া গেল ?" সত্ৰী হাসিয়া কহিলেন, “সে বুঝি হাসি ? সার বাঁধিয়া দীঘ একঝাঁক পাখি উড়িয়া গেল, তাহাদেরই পাখার শব্দ শনিয়াছিলাম। তুমি এত অপেই ভয় পাও?” দিনের বেলায় পাট বুঝিতে পারিলাম, পাখির ঝাঁক উড়িবার শব্দই বটে, এই সময়ে উত্তরদেশ হইতে হংসশ্রেণী নদীর চরে চরিবার জন্য আসিতেছে। কিন্তু সন্ধ্যা হইলে সে বিশ্বাস রাখিতে পারিতাম না। তখন মনে হইত, চারি দিকে সমস্ত অন্ধকার ভরিয়া ঘন হাসি জমা হইয়া রহিয়াছে, সামান্য একটা উপলক্ষে হঠাৎ আকাশ ভরিয়া অন্ধকার বিদীণ করিয়া ধৰনিত হইয়া উঠিবে। অবশেষে এমন হইল, সন্ধ্যার পর মনোরমার সহিত একটা কথা বলিতে আমার সাহস হইত না। তখন আমাদের বরানগরের বাড়ি ছাড়িয়া মনোরমাকে লইয়া বোটে করিয়া বাহির হইলাম। অগ্রহায়ণ মাসে নদীর বাতাসে সমস্ত ভয় চলিয়া গেল। কয়দিন বড়ো সখে ছিলাম। চারি দিকের সৌন্দযে আকৃষ্ট হইয়া মনোরমাও যেন তাহার হাদয়ের রন্ধ স্বার অনেক দিন পরে ধীরে ধীরে আমার নিকট খালিতে লাগিল। নিশীথে ኟጫ > গঙ্গা ছাড়াইয়া, খড়ে ছাড়াইয়া, অবশেষে পক্ষায় আসিয়া পৌছিলাম। ভয়ংকরী পদ্মা তখন হেমন্তের বিবরলীন ভুজঙ্গিনীর মতো কৃশনিজীবিভাবে সন্দীঘ শীতনিদ্রায় নিবিষ্ট ছিল। উত্তরপারে জনশন্য তৃণশন্য দিগন্তপ্রসারিত বালির চর ধন ধন করিতেছে, এবং দক্ষিণের উচ্চ পাড়ের উপর গ্রামের আমবাগানগুলি এই রাক্ষসী নদীর নিতান্ত মুখের কাছে জোড়হন্তে দাঁড়াইয়া কাঁপিতেছে; পদ্মা ঘামের ঘোরে এক-একবার পাশ ফিরিতেছে এবং বিদীণ তটভূমি ঝাপঝাপ করিয়া ভাঙিয়া ভাঙিয়া পড়িতেছে। এইখানে বেড়াইবার সুবিধা দেখিয়া বোট বধিলাম। একদিন আমরা দুইজনে বেড়াইতে বেড়াইতে বহু দরে চলিয়া গেলাম। সযান্তের সবণ"ছায়া মিলাইয়া যাইতেই শুক্লপক্ষের নিমল চন্দ্রালোক দেখিতে দেখিতে ফটিয়া উঠিল। সেই অন্তহীন শত্র বালির চরের উপর যখন অজস্র অবারিত উচ্ছসিত জ্যোৎসনা একেবারে আকাশের সীমান্ত পৰ্যন্ত প্রসারিত হইয়া গেল, তখন মনে হইল যেন জনশন্য চন্দ্রলোকের অসীম সবগুনরাজ্যের মধ্যে কেবল আমরা দুইজনে ভ্রমণ করিতেছি। একটি লাল শাল মনোরমার মাথার উপর হইতে নামিয়া তাহার মুখখানি বেস্টন করিয়া তাহার শরীরটি আচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে। নিস্তখতা যখন নিবিড় হইয়া আসিল, কেবল একটি সীমাহীন দিশাহীন শত্রতা এবং শন্যতা ছাড়া যখন আর কিছই রহিল না, তখন মনোরমা ধীরে ধীরে হাতটি বাহির করিয়া আমার হাত চাপিয়া ধরিল; অত্যন্ত কাছে আসিয়া সে যেন তাহার সমস্ত শরীরমন জীবনযৌবন আমার উপর বিন্যস্ত করিয়া নিতান্ত নির্ভর করিয়া দাঁড়াইল । পুলকিত উদবেলিত হাদয়ে মনে করিলাম, ঘরের মধ্যে কি যথেষ্ট ভালোবাসা যায়। এইরুপ অনাবত অবারিত অনন্ত আকাশ নহিলে কি দুটি মানুষকে কোথাও ধরে। তখন মনে হইল, আমাদের ঘর নাই, বার নাই, কোথাও ফিরিবার নাই, এমনি করিয়া হাতে হাতে ধরিয়া গম্যহীন পথে উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণে চন্দ্রালোকিত শুন্যতার উপর দিয়া অবারিতভাবে চলিয়া যাইব । - এইরপে চলিতে চলিতে এক জায়গায় আসিয়া দেখিলাম, সেই বালকোরাশির মাঝখানে অদরে একটি জলাশয়ের মতো হইয়াছে— পদ্মা সরিয়া যাওয়ার পর সেইখানে জল বাধিয়া আছে। সেই মরবালকাবেটিত নিস্তরঙ্গ নিযন্ত নিশ্চল জলটুকুর উপরে একটি সাদীঘ" জ্যোৎস্নার রেখা মছিাতভাবে পড়িয়া আছে। সেই জায়গাটাতে আসিয়া আমরা দুইজনে দাঁড়াইলাম—মনোরমা কী ভাবিয়া আমার মাখের দিকে চাহিল, তাহার মাথার উপর হইতে শালটা হঠাৎ খসিয়া পড়িল। আমি তাহার সেই জ্যোৎস্নাবিকশিত মুখখানি তুলিয়া ধরিয়া চুবন করিলাম। এমন সময় সেই জনমানবশন্যে নিঃসঙ্গ মরভূমির মধ্যে গম্ভীরুবরে কে তিনবার বলিয়া উঠিল, “ও কে। ও কে। ও কে।” আমি চমকিয়া উঠিলাম, আমার স্মীও কপিয়া উঠিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই আমরা দইজনেই বুঝিলাম, এই শব্দ মানষিক নহে, অমানষিকও নহে-চরবিহারী জলচর পাখির ডাক। হঠাৎ এত রাত্রে তাহাদের নিরাপদ নিভৃত নিবাসের কাছে লোকসমাগম দেখিয়া চকিত হইয়া উঠিয়াছে। সেই ভয়ের চমক খাইয়া আমরা দুইজনেই তাড়াতাড়ি বোটে ফিরিলাম। রাত্রে ૨૧ ૨ গল্পগুচ্ছ বিছানায় আসিয়া শুইলাম; শ্রাতশরীরে মনোরমা অবিলম্বে ঘামাইয়া পড়িল । তখন অন্ধকারে কে একজন আমার মশারির কাছে দাঁড়াইয়া সষতে মনোরমার দিকে একটিমাত্র দীঘ শীর্ণ অস্থিসার অঙ্গলি নির্দেশ করিয়া যেন আমার কানে কানে অত্যন্ত চুপিচুপি অসফটকণ্ঠে কেবলই জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, “ও কে। ও কে। ও কে গো ।” তাড়াতাড়ি উঠিয়া দেশলাই জালাইয়া বাতি ধরাইলাম। সেই মহেতেই ছায়ামতি মিলাইয়া গিয়া, আমার মশারি কপিাইয়া, বোট দলাইয়া, আমার সমস্ত ঘমান্ত শরীরের রক্ত হিম করিয়া দিয়া হাহা— হাহা— হাহা করিয়া একটি হাসি অন্ধকার রাত্রির ভিতর দিয়া বহিয়া চলিয়া গেল। পদ্মা পার হইল, পদ্মার চর পার হইল, তাহার পরবতী সমস্ত সন্ত দেশ গ্রাম নগর পার হইয়া গেল—যেন তাহা চিরকাল ধরিয়া দেশদেশান্তর লোকলোকান্তর পার হইয়া ক্লমশ ক্ষীণ ক্ষীণতর ক্ষীণতম হইয়া অসীম সদরে চলিয়া যাইতেছে; ক্ৰমে যেন তাহা জন্মমৃত্যুর দেশ ছাড়াইয়া গেল; ক্ৰমে তাহা যেন সচির অগ্রভাগের ন্যায় ক্ষীণতম হইয়া আসিল; এত ক্ষীণ শব্দ কখনও শনি নাই, কল্পনা করি নাই; আমার মাথার মধ্যে যেন অনন্ত আকাশ রহিয়াছে এবং সেই শব্দ যতই দরে যাইতেছে কিছুতেই আমার মস্তিকের সীমা ছাড়াইতে পারিতেছে না; অবশেষে যখন একান্ত অসহ্য হইয়া আসিল তখন ভাবিলাম, আলো নিবাইয়া না দিলে ঘুমাইতে পারিব না। যেমন আলো নিবাইয়া শুইলাম স্বর বলিয়া উঠিল, “ও কে, ও কে, ও কে গো।" আমার বকের রক্তের ঠিক সমান তালে ক্ৰমাগতই ধৰনিত হইতে লাগিল, “ও কে, ও কে, ও কে গো ; ও কে, ও কে, ও কে গো ।” সেই গভীর রাত্রে নিস্তবধ বোটের মধ্যে আমার গোলাকার ঘড়িটাও উপর হইতে তালে তালে বলিতে লাগিল, “ও কে, ও কে, ও কে গো। ও কে, ও কে, ও কে গো ।” বলিতে বলিতে দক্ষিণাবাব পাংশবেণ হইয়া আসিলেন, তাঁহার কণ্ঠ রন্ধ হইয়া আসিল। আমি তাঁহাকে পশ করিয়া কহিলাম, “একট, জল খান।” এমন সময় হঠাৎ আমার কেরোসিনের শিখাটা দপ দপ করিতে করিতে নিবিয়া গেল। হঠাৎ দেখিতে পাইলাম, বাহিরে আলো হইয়াছে। কাক ডাকিয়া উঠিল। দোয়েল শিশ দিতে লাগিল। আমার বাড়ির সম্মুখবতী পথে একটা মহিষের গাড়ির ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ জাগিয়া উঠিল। তখন দক্ষিণাবাবর মাখের ভাব একেবারে বদল হইয়া গেল। ভয়ের কিছুমাত্র চিহ্ন রহিল না। রাত্রির কুহকে, কাল্পনিক শঙ্কার মত্ততায় আমার কাছে যে এত কথা বলিয়া ফেলিয়াছেন সেজন্য যেন অত্যন্ত লঙ্গিজত এবং আমার উপর আন্তরিক ক্লদ্ধ হইয়া উঠিলেন। শিষ্টসম্ভাষণমাত্র না করিয়া অকস্মাৎ উঠিয়া দ্রুতবেগে চলিয়া গেলেন। সেইদিনই অধরাত্রে আবার আমার বারে আসিয়া ঘা পড়িল, “ডাক্তার ডাক্তার!” মাঘ ১৩ o১