গল্পগুচ্ছ/মধ্যবর্তিনী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


মধ্যবতিনী প্রথম পরিচ্ছেদ নিবারণের সংসার নিতান্তই সচরাচর রকমের, তাহাতে কাব্যরসের কোনো নামগন্ধ ছিল না। জীবনে উক্ত রসের যে কোনো আবশ্বক ছে এমন কথা তাহার মনে কখনো উদয় হয় নাই। যেমন পরিচিত পুরাতন চটিজোড়াটার মধ্যে পা দুটো দিব্য নিশ্চিন্তভাবে প্রবেশ করে, এই পুরাতন পৃথিবীটার মধ্যে নিবারণ সেইরূপ আপনার চিরাভ্যস্ত স্থানটি অধিকার করিয়া থাকে, সে সম্বন্ধে ভ্ৰমেও কোনোরূপ চিন্তা তর্ক বা তত্ত্বালোচনা করে না । নিবারণ প্রাতঃকালে উঠিয়া গলির ধারে গৃহদ্বারে খোলা গায়ে বসিয়া অত্যন্ত নিরুদবিগ্নভাবে ই কাটি লইয়া তামাক থাইতে থাকে। পথ দিয়া লোকজন যাতায়াত করে, গাড়িঘোড়া চলে, বৈষ্ণব-ভিখারি গান গাহে, পুরাতনবোতল-সংগ্রহকারী হাকিয়া চলিয়া যায় ; এই-সমস্ত চঞ্চল দৃশু মনকে লঘুভাবে ব্যাপৃত রাখে এবং যে দিন কাচা আম অথবা তপসি-মাছওয়াল আসে সে দিন অনেক দরদাম করিয়া কিঞ্চিং বিশেষরূপ রন্ধনের আয়োজন হয় । তাহার পর যথাসময়ে তেল মাথিয়া স্নান করিয়া আহারাস্তে দড়িতে ঝুলানো চাপকানটি পরিয়া, এক-ছিলিম তামাক পানের সহিত নি:শেষ-পূর্বক আরএকটি পান মুখে পুরিয়া আপিসে যাত্রা করে। আপিল হইতে ফিরিয়া আসিয়া সন্ধ্যাবেলাটা প্রতিবেশী রামলোচন ঘোষের বাড়িতে প্রশান্ত গম্ভীর ভাবে সন্ধ্যাযাপন করিয়া আহারান্তে রাত্রে শয়নগৃহে স্ত্রী হরম্বন্দরীর সহিত সাক্ষাৎ इम्न । সেখানে মিত্রদের ছেলের বিবাহে আইবড়-ভাত পাঠানে, নবনিযুক্ত 待 অবাধ্যতা, ছেচকিবিশেষে কোড়নবিশেষের উপযোগিতা সম্বন্ধে যে-সমস্ত সংক্ষিপ্ত সমালোচনা চলে তাহা এ-পর্যস্ত কোনো কবি ছন্দোবদ্ধ করেন নাই, এবং সেজন্য নিবারণের মনে কখনো ক্ষোভের উদয় হয় নাই । في 8 ২৩৬ গল্পগুচ্ছ ইতিমধ্যে ফাল্গুন মাসে হরমুন্দরীর সংকট পীড়া উপস্থিত হইল। জ্বর আর কিছুতেই ছাড়িতে চাহে না । ডাক্তার যতই কুইনাইন দেয় বাধাপ্রাপ্ত প্রবল স্রোতের ন্যায় জরও তত উর্ধের্ব চড়িতে থাকে। এমনি বিশ দিন, বাইশ দিন, চল্লিশ দিন পর্যস্ত ব্যাধি চলিল । নিবারণের আপিস বন্ধ ; রামলোচনের বৈকালিক সভায় বহুকাল আর সে যায় না ; কী যে করে তাহার ঠিক নাই। একবাব শয়নগৃহে গিয়া রোগীর অবস্থা জানিয়া আসে, একবার বাহিরের বারানায় বসিয়া চিন্তিতমুখে তামাক টানিতে থাকে। দুই বেলা ডাক্তার বৈদ্য পরিবর্তন করে এবং ধে যাহা বলে সেই ঔষধ পরীক্ষা করিয়া দেখিতে চাহে । ৯ ভালোবাসার এইরূপ অব্যবস্থিত শুশ্রুষা সত্ত্বে ও চল্লিশ দিনে হরসুন্দরী ব্যাধিমুক্ত হইল। কিন্তু, এমনি দুর্বল এবং শীর্ণ হইয়া গেল যে, শরীরটি যেন বহুদূর হইতে অতি ক্ষীণশ্বরে ‘আছি বলিয়া সাডা দিতেছে মাত্র । ৮.কুখন বসন্তকালে দক্ষিণের হাওয়া দিতে আরম্ভ করিয়াছে এবং উষ্ণ চন্দ্রালোকও সীমস্তিনীদের উন্মুক্ত শয়নকক্ষে নি:শব্দ পদসঞ্চারে بين أولاً প্রব্রুেশাধিকার লাভ করিয়াছে । হরসুন্দরীর ঘরের নীচেই প্রতিবেশীদের খিড়কির বাগান। সেটা ষে বিশেষ কিছু সুদৃপ্ত রমণীয় স্থান তাহ বলিতে পারি না। এক সময় কে একজন শখ করিয়া গোটাকতক ক্রোটন রোপণ করিয়াছিল, তার পরে আর সে দিকে বড়ো-একটা দৃকপাত করে নাই। শুষ্ক ডালের মাচার উপর কুষ্মাণ্ডলত উঠিয়াছে ; বুদ্ধ কুলগাছের তলায় বিষম জঙ্গল ; রান্নাঘরের পাশে প্রাচীর ভাঙিয়া কতকগুলো ইট জড়ো হইয়া আছে এবং তাহারই সহিত দগ্ধাবশিষ্ট পাথুরে কয়লা এবং ছাই দিন দিন রাশীকৃত হইয়া উঠিতেছে। কিন্তু, বাতায়নতলে শয়ন করিয়া এই বাগানের দিকে চাহিয়া হরসুন্দরী প্রতি মুহূর্তে যে একটি আনন্দরস পান করিতে লাগিল তাহার অকিঞ্চিংকর জীবনে এমন সে আর কখনো করে নাই। গ্রীষ্মকালে স্রোতোবেগ মন্দ হইয়া ক্ষুদ্র গ্রাম্যনদীটি যখন বালুশয্যার উপরে শীর্ণ হইয়া আসে তখন সে যেমন অত্যস্ত স্বচ্ছতা লাভ করে, তখন যেমন প্রভাতের স্বৰ্ষালোক তাহার তলদেশ পর্যন্ত কম্পিত হইতে থাকে, বায়ুস্পর্শ তাহার সর্বাঙ্গ পুলকিত করিয়া ry মধ্যবর্তিনী ২৩৭ তোলে, এবং আকাশের তারা তাহার স্ফটিকদর্পণের উপর মুখস্মৃতির ন্যায় অতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিবিম্বিত হয়, তেমনি হরসুন্দরীর ক্ষীণ জীবনতত্তর উপর আনন্দময়ী প্রকৃতির প্রত্যেক অঙ্গুলি যেন স্পর্শ করিতে লাগিল এবং অস্তরের মধ্যে যে একটি সংগীত উঠিতে লাগিল তাহার ঠিক ভাবটি সে সম্পূর্ণ বুঝিতে পারিল না । এমন সময় তাহার স্বামী যখন পাশে বসিয়া জিজ্ঞাসা করিত কেমন আছ’ তখন তাহার চোখে যেন জল উছলিয়া উঠিত। রোগশীর্ণ মুখে তাহার চোখ দুটি অত্যন্ত বড়ো দেখায়, সেই বড়ো বডে প্রেমাদ্র সস্তৃতজ্ঞ চোখ স্বামীর মুখের দিকে তুলিয়া শীর্ণহস্তে স্বামীর হস্ত ধরিয়া চুপ করিয়া পড়িয়া থাকিত, স্বামীর অস্তরেও যেন কোথা হইতে একটা নূতন অপরিচিত আনন্দরশ্মি প্রবেশলাভ করিত। এই ভাবে কিছু দিন যায়। একদিন রাত্রে ভাঙা প্রাচীরের উপরিবর্তী খর্ব অশথগাছের কম্পমান শাখাস্তরাল হইতে একখানি বৃহৎ চাদ উঠিতেছে এবং সন্ধ্যাবেলাকার গুমট ভাঙিয়া হঠাৎ একটা নিশাচর বাতাস জাগ্রত হইয়া উঠিয়াছে, এমন সময় নিবারণের চুলের মধ্যে অঙ্গুলি বুলাইতে বুলাইতে হরসুন্দরী কহিল, “আমাদের তো ছেলেপুলে কিছুই হইল না, তুমি আর-একটি বিবাহ করো।” হরমুন্দরী কিছুদিন হইতে এই কথা ভাবিতেছিল । মনে যখন একটা প্রবল আনন্দ একটা বৃহৎ প্রেমের সঞ্চার হয় তখন মানুষ মনে করে, “আমি সব করিতে পারি ? তখন হঠাৎ একটা আত্মবিসর্জনের ইচ্ছা বলবতী হইয়া উঠে । ৫ স্রোতের উচ্ছ্বাস যেমন কঠিন তটের উপর আপনাকে সবেগে মূৰ্ছিত করে তেমনি প্রেমের আবেগ, আনন্দের উচ্ছাস, একটা মহং ত্যাগ, একটা বৃহৎ দুঃখের উপর আপনাকে যেন নিক্ষেপ করিতে চাহে ।) সেইরূপ অবস্থায় অত্যন্ত পুলকিত চিত্তে একদিন হরমুনারী স্থির করিল, 'আমার স্বামীর জন্য আমি খুব বড়ো একটা কিছু করিব। কিন্তু হায়, যতখানি সাধ ততখানি সাধ্য কাহার আছে । হাতের কাছে কী আছে, কী দেওয়া যায়। ঐশ্বর্য নাই, বুদ্ধি নাই, ক্ষমতা নাই, শুধু একটা প্রাণ আছে, সেটাও যদি কোথাও দিবার থাকে এখনই দিয়া ফেলি, কিন্তু তাহারই বা মূল্য কী । ২৩৮ গল্পগুচ্ছ ‘আর, স্বামীকে যদি দুগ্ধফেনের মতো শুভ্র, নবনীর মতো কোমল, শিশুকন্দপের মতো স্বন্দর একটি স্নেহের পুত্তলি সন্তান দিতে পারিতাম। কিন্তু প্রাণপণে ইচ্ছা করিয়া মরিয়া গেলেও তো সে হইবে না।’ তখন মনে হইল, স্বামীর একটি বিবাহ দিতে হইবে। ভাবিল, স্ত্রীরা ইহাতে এত কাতর হয় কেন, এ কাজ তো কিছুই কঠিন নহে। স্বামীকে যে ভালোবাসে সপত্নীকে ভালোবাসা তাহার পক্ষে কী এমন অসাধ্য। মনে করিয়া বক্ষ স্ফীত হইয়া ऐंटैिछ । প্রস্তাবটা প্রথম যখন শুনিল নিবারণ হাসিয়া উড়াইমা দিল, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বারও কর্ণপাত করিল না । স্বামীর এই অসম্মতি, এই অনিচ্ছা দেখিয়া হরমুন্দরীর বিশ্বাস এবং সুখ যতই বাড়িয়া উঠিল তাহার প্রতিজ্ঞাও ততই দৃঢ় হইতে লাগিল । এ দিকে নিবারণ যত বারস্বার এই অনুরোধ শুনিল ততই ইহার অসম্ভাব্যতা তাহার মন হইতে দূর হইল এবং গৃহদ্বারে বসিয়া তামাক খাইতে খাইতে সস্তানপরিবৃত গৃহের স্বখময় চিত্র তাহার মনে উজ্জল হইয়। উঠিতে লাগিল । একদিন নিজেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া কহিল, “বুড়াবয়সে একটি কচি খুকীকে বিবাহ করিয়া আমি মানুষ করিতে পারিব না।” হরমুন্দরী কহিল, “সেজন্য তোমাকে ভাবিতে হইবে না । মামুষ করিবার ভার আমার উপর রহিল।” বলিতে বলিতে এই সন্তানহীনা রমণীর মনে একটি কিশোরবয়স্ক, মুকুমারী, লজ্জাশীল, মাতৃক্রোড হইতে সদ্যোবিচ্যুত, নববধূর মুখচ্ছবি উদয় হইল এবং হৃদয় স্নেহে বিগলি ত হইয় গেল । নিবারণ কহিল, “আমার আপিস আছে, কাজ আছে, তুমি আছ, কচি মেয়ের আবদার শুনিবার অবসর আমি পাইব না।” হরসুন্দরী বারবার করিয়া কহিল, তাহার জন্য কিছুমাত্র সময় নষ্ট করিতে হইবে না। এবং অবশেষে পরিহাস করিয়া কহিল, ”আচ্ছা গো, তখন দেখিব কোথায় বা তোমার কাজ থাকে, কোথায় বা আমি থাকি, আর কোথায় বা তুমি থাক।” নিবারণ সে কথার উত্তরমাত্র দেওয়া আবশ্যক মনে করিল না, শাস্তির মধ্যবর্তিনী ২৩৯ স্বরূপ হরমুন্দরীর কপোলে হাসিয়া তর্জনী-আঘাত করিল। এই তো গেল ভূমিকা । দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ একটি নোলক-পরা অশ্রুভর। ছোটোখাটো মেয়ের সহিত নিবারণের বিবাহ হইল, তাহার নাম শৈলবালা । নিবারণ ভাবিল, নামটি বড়ো মিষ্ট এবং মুখখানিও বেশ ঢলোঢ়লো। তাহার ভাবখান, তাহার চেহারাথানি, তাহার চলাফেরা একটু বিশেষ মনোযোগ করিয়া চাহিয়া দেখিতে ইচ্ছা করে, কিন্তু সে আর কিছুতেই হইয়া উঠে না । উলটিয়া এমন ভাব দেখাইতে হয় যে, "ওই তো একফোট মেয়ে, উহাকে লইয়া তো বিষম বিপদে পড়িলাম, কোনোমতে পাশ কাটাইয়া আমার বয়সোচিত কর্তব্যক্ষেত্রের মধ্যে গিয়া পড়িলে যেন পরিত্রাণ পাওয়া যায় ।” হরমুন্দরী নিবারণের এই বিষম-বিপদ গ্রস্ত ভাব দেখিয়া মনে-মনে বড়ো আমোদ বোধ করিত । এক-একদিন হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিত, “আহ, পালাও কোথায়। ওইটুকু মেয়ে, ও তো আর তোমাকে খাইয়া ফেলিবে ন; /* নিবারণ দ্বিগুণ শশব্যস্ত ভাব ধারণ করিয়া বলিত, “আরে, রোসে৷ রোসো, আমার একটু বিশেষ কাজ আছে।” বলিয়া যেন পালাইবার পথ পাইত না । হরমুন্দরী হাসিয়া দ্বার আটক করিয়া বলিত, “আজ ফাকি দিতে পরিবে না ।” অবশেষে নিবারণ নিতান্তই নিরুপায় হইয়া কাতরভাবে বসিয়া পড়িত । হরসুন্দরী তাহার কানের কাছে বলিত, “আহা, পরের মেয়েকে ঘরে আনিয়া আমন হতাশ্রদ্ধা করিতে নাই ।” এই বলিয়া শৈলবালাকে ধরিয়া নিবারণের বাম পাশে বসাইয়া দিত এবং জোর করিয়া ঘোমটা খুলিয়া ও চিবুক ধরিয়া তাহার আনত মুখ তুলিয়া নিবারণকে বলিত, “আহ, কেমন চাদের মতো মুখখানি দেখে দেখি * কোনোদিন বা উভয়কে ঘরে বসাইয়া কাজ আছে বলিয়া উঠিয়া যাইত 는 8하 গল্পগুচ্ছ এবং বাহির হইতে ঝনাং করিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিত। নিবারণ নিশ্চয় জানিত, দুটি কৌতুহলী চক্ষু কোনো-না-কোনো ছিদ্রে সংলগ্ন হইয়া আছে ; অতিশয় উদাসীনভাবে পাশ ফিরিয়া নিদ্রার উপক্রম করিত, শৈলবালা ঘোমটা টানিয়া গুটিমুটি মারিয়া মুখ ফিরাইয়া একটা কোণের মধ্যে মিলাইয়া থাকিত । অবশেষে হরমুন্দরী নিতান্ত না পারিয়া হাল ছাড়িয়া দিল, কিন্তু খুব বেশি দুঃখিত হইল না। হরমুন্দরী যখন হাল ছাড়িল তখন স্বয়ং নিবারণ হাল ধরিল। এ বড়ো কৌতুহল, এ বড়ো রহস্য । এক টুকরা হীরক পাইলে তাহাকে নানা ভাবে নানা দিকে ফিরাইয়া দেখিতে ইচ্ছা করে, আর এ একটি ক্ষুদ্র সুন্দর মাতুষের মন— বড়ে অপূর্ব। ইহাকে কত রকম করিয়া স্পর্শ করিয়া, সোহাগ করিয়া, অন্তরাল হইতে, সম্মুখ হইতে, পাশ্ব হইতে দেখিতে হয়। কখনো একবার কানের তুলে দোল দিয়া, কখনো ঘোমটা একটুখানি টানিয়া তুলিয়া, কখনো বিদ্যুতের মতো সহসা সচকিতে, কখনো নক্ষত্রের মতো দীর্ঘকাল একদৃষ্টে, নব নব সৌন্দর্যের সীমা আবিষ্কার করিতে হয়। ম্যাকমোরান কোম্পানির আপিসের হেডবাবু শ্ৰীযুক্ত নিবারণচন্দ্রের অদৃষ্টে এমন অভিজ্ঞতা ইতিপূর্বে হয় নাই। সে যখন প্রথম বিবাহ করিয়াছিল তখন বালক ছিল ; যখন যেীবন লাভ করিল তখন স্ত্রী তাহার নিকট চিরপরিচিত, বিবাহিত জীবন চিরাভ্যস্ত । হরমুন্দরীকে অবশ্যই সে ভালোবাসিত, কিন্তু কখনোই তাহার মনে ক্রমে ক্রমে প্রেমের সচেতন সঞ্চার হয় নাই । একেবারে পাক আম্রের মধ্যেই যে পতঙ্গ জন্মলাভ করিয়াছে, যাহাকে কোনো কালে রস অন্বেষণ করিতে হয় নাই, অল্পে অল্পে রসাস্বাদ করিতে হয় নাই, তাহাকে একবার বসন্তকালের বিকশিত পুষ্পবনের মধ্যে ছাড়িয়া দেওয়া হউক দেখি— বিকচোমুখ গোলাপের আধখোলা মুখটির কাছে ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহার কী আগ্রহ। একটুকু যে সৌরভ পায়, একটুকু যে মধুর আশ্বাদ লাভ করে, তাহাতে তাহার কী নেশা । নিবারণ প্রথমটা কখনো বা একটা গাউন-পরা কাচের পুতুল, কখনো বা মধ্যবর্তিনী २8x একশিশি এসেন্স, কখনো বা কিছু মিষ্টদ্রব্য কিনিয়া আনিয়া শৈলবালাকে গোপনে দিয়া যাইত। এমনি করিয়া একটুখানি ঘনিষ্ঠতার স্বত্রপাত হয় । অবশেষে কখন একদিন হরমুনারী গৃহকার্যের অবকাশে আসিয়া দ্বারের ছিদ্ৰ দিয়া দেখিল, নিবারণ এবং শৈলবালা বসিয়া কড়ি লইয়া দশ-পচিশ থেলিতেছে । বুড়া বয়সের এই খেলা বটে ! নিবারণ সকালে আহারাদি করিয়া যেন আপিসে বাহির হইল, কিন্তু আপিসে না গিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছে। এ প্রবঞ্চনার কী আবখ্যক ছিল । হঠাৎ একটা জলন্ত বজশলাকা দিয়া কে যেন হরমুন্দরীর চোখ খুলিয়া দিল, সেই তীব্রতাপে চোখের জল বাষ্প হইয়া শুকাইয়া গেল । হরমুন্দরী মনে-মনে কহিল, ‘আমিই তো উহাকে ঘরে আনিলাম, আমিই তো মিলন করাইয়া দিলাম, তবে আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার কেন— যেন আমি উহাদের সুথের কাটা ।” হরম্বন্দরী শৈলবালাকে গৃহকার্য শিথাইত। একদিন নিবারণ মুখ ফুটিয়া বলিল, “ছেলেমানুষ, উহাকে তুমি বড়ো বেশি পরিশ্রম করাইতেছ, উহার শরীর তেমন সবল নহে ।” বড়ো একটা তীব্র উত্তর হরমুন্দরীর মুখের কাছে আসিয়াছিল ; কিন্তু কিছু বলিল না, চুপ করিয়া গেল। সেই অবধি বউকে কোনো গৃহকার্ধে হাত দিতে দিত না ; রাধাবাড়া দেখাশুনা সমস্ত কাজ নিজে করিত । এমন হইল, শৈলবালা অার নড়িয়া বসিতে পারে না, হরমুন্দরী দাসীর মতো তাহার সেবা করে এবং স্বামী বিদূষকের মতো তাহার মনোরঞ্জন করে। সংসারের কাজ করা, পরের দিকে তাকানো যে জীবনের কর্তব্য এ শিক্ষাই তাহার হইল না। হরমুন্দরী যে নীরবে দাসীর মতো কাজ করিতে লাগিল তাহার মধ্যে ভারি একটা গর্ব আছে । তাহার মধ্যে নূ্যনতা এবং দীনতা নাই। সে কহিল, "তোমরা দুই শিশুতে মিলিয়া খেলা করো, সংসারের সমস্ত ভার আমি লইলাম ।’ 8& গল্পগুচ্ছ < Ab .//t. তৃতীয় পরিচ্ছেদ হায়, আজ কোথায় সে বল যে বলে হরমুন্দরী মনে করিয়াছিল স্বামীর জন্ত চিরজীবনকাল সে আপনার প্রেমের দাবির অর্ধেক অংশ অকাতরে ছাড়িয়া দিতে পারিবে । হঠাৎ একদিন পূর্ণিমার রাত্রে জীবনে যখন জোয়ার আসে, তখন দুই কুল প্লাবিত করিয়া মানুষ মনে করে, “আমার কোথাও সীমা নাই ।” তখন যে একটা বৃহৎ প্রতিজ্ঞা করিয়া বসে জীবনের সুদীর্ঘ ভাটার সময় সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতে তাহার সমস্ত প্রাণে টান পড়ে। হঠাৎ ঐশ্বর্ষের দিনে লেখনীর এক আঁচড়ে ষে দানপত্র লিখিয়া দেয় চিরদারিত্র্যের দিনে পলে পলে তিল তিল করিয়া তাহা শোধ করিতে হয়। তখন বুঝা যায়, মানুষ বড়ো দীন, হৃদয় বড়ো দুর্বল, তাহার ক্ষমতা অতি যৎসামান্ত । দীর্ঘ রোগাবসানে ক্ষীণ রক্তহীন পাণ্ডু কলেবরে হরমুন্দরী সে দিন শুক্ল দ্বিতীয়ার চাদের মতো একটি শীর্ণ রেখামাত্র ছিল ; সংসারে নিতান্ত লঘু হইয়া ভাসিতেছিল । মনে হইয়াছিল, "আমার যেন কিছুই না হইলেও চলে। ক্রমে শরীর বলী হইয়া উঠিল, রক্তের তেজ বাড়িতে লাগিল, তখন হরসুন্দরীর মনে কোথা হইতে একদল শরিক আসিয়া উপস্থিত হইল, তাহারা উচ্চৈঃস্বরে কহিল, ‘তুমি তো ত্যাগপত্র লিথিয়া বসিয়া আছ, কিন্তু আমাদের দাবি আমরা ছাড়িব না।’ হরমুন্দরী যে দিন প্রথম পরিষ্কাররূপে আপন অবস্থা বুঝিতে পারিল সে দিন নিবারণ ও শৈলবালাকে আপন শয়নগৃহ ছাড়িয়া দিয়া ভিন্ন গৃহে একাকিনী গিয়া শয়ন করিল। আট বৎসর বয়সে বাসররাত্রে যে শয্যায় প্রথম শয়ন করিয়াছিল, আজ সাতাশ বৎসর পরে, সেই শয্যা ত্যাগ করিল। প্রদীপ নিভাইয়া দিয়া এই সধবা রমণী যখন অসহ্য হৃদয়ভার লইয়া তাহার নূতন বৈধব্যশয্যার উপরে আসিয়া পডিল তখন গলির অপর প্রান্তে একজন শৌখিন যুব বেহাগ রাগিণীতে মালিনীর গান গাহিতেছিল ; আর-একজন বায়া-তবলায় সংগত করিতেছিল এবং শ্রোতৃবন্ধুগণ সমের কাছে হা-হা করিয়া চীৎকার করিয়া উঠিতেছিল। মধ্যবর্তিনী ९8७ তাহার সেই গান সেই নিস্তব্ধ ষ্ট্র্যোংস্কারাক্সে পার্থের ঘরে মন্দ শুনাইতেছিল না। তখন বালিকা শৈলবালার ঘুমে চোখ ঢুলিয়া পড়িতেছিল, আর নিবারণ তাহার কানের কাছে মুখ রাখিয়া ধীরে ধীরে ডাকিতেছিল, “नहे !” লোকটা ইতিমধ্যে বঙ্কিমবাবুর চক্ৰশেখর পড়িয়া ফেলিয়াছে এবং দুইএকজন আধুনিক কবির কাব্যও শৈলবালাকে পড়িয়া শুনাইয়াছে। নিবারণের জীবনের নিম্নস্তরে যে একটি যৌবন-উৎস বরাবর চাপা পড়িয়া ছিল আঘাত পাইয়া হঠাৎ বড়ো অসময়ে তাহা উচ্ছসিত হইয়া উঠিল । কেহই সেজন্য প্রস্তত ছিল না, এই হেতু অকস্মাৎ তাহার বুদ্ধিশুদ্ধি এবং ংসারের সমস্ত বন্দোবস্ত উল্টাপাল্ট হইয়া গেল । সে বেচার কোনোকালে জানিত না, মামুষের ভিতরে এমন-সকল উপদ্রবজনক পদার্থ থাকে, এমন সকল দুর্দাম দুরন্ত শক্তি যাহা সমস্ত হিসাব-কিতাব শৃঙ্খলা-সামঞ্জস্য একেবারে নয় ছয় করিয়া দেয় । কেবল নিবারণ নহে, হরসুন্দরীও একটা নূতন বেদনার পরিচয় পাইল । এ কিসের আকাজক্ষা, এ কিসের দুঃসহ যন্ত্রণা। মন এখন যাহা চায় কখনো তো তাহ চাহে ও নাই, কথনো তো তাহা পায়ও নাই । যখন ভদ্রভাবে নিবারণ নিয়মিত আপিসে যাইত, যখন নিদ্রার পূর্বে কিয়ুংকালের জন্য গয়লার হিসাব, প্রব্যের মহার্ঘতা এবং লৌকিকতার কর্তব্য সম্বন্ধে আলোচনা চলিত, তখন তো এই অস্তবিপ্লবের কোনো সূত্রপাতমাত্র ছিল না। ভালোবাসিত বটে, কিন্তু তাহার তো কোনো উজ্জ্বলতা, কোনো উত্তাপ ছিল না। সে ভালোবাসা অপ্রজলিত ইন্ধনের মতো ছিল মাত্র । আজ তাহার মনে হইল, জীবনের সফলতা হইতে যেন চিরকাল কে তাহাকে বঞ্চিত করিয়া আসিয়াছে । তাহার হৃদয় যেন চিরদিন উপবাসী হইয়া আছে । তাহার এই নারীজীবন বড়ো দারিদ্র্যেই কাটিয়াছে। সে কেবল হাটবাজার পানমসলা তরিতরকারির ঝঞ্চাট লইয়াই সাতাশটা অমূল্য বৎসর দাসীবৃত্তি করিয়া কাটাইল, আর আজ জীবনের মধ্যপথে আসিয়া দেখিল তাহারই শয়নকক্ষের পার্শ্বে এক গোপন মহামহৈশ্বৰ্ধভাণ্ডারের কুলুপ খুলিয়৷ একটি ক্ষুদ্র বালিকা একেবারে রাজরাজেশ্বরী হুইয়া বসিল । নারী দাসী ९88 গল্পগুচ্ছ বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে নারী রানীওঁ বটে। কিন্তু, ভাগাভাগি করিয়া একজন নারী হইল দাসী, আর-একজন নারী হইল রানী ; তাহাতে দাসীর গৌরব গেল, রানীর স্বথ রহিল না । কারণ, শৈলবালাও নারীজীবনের যথার্থ সুখের স্বাদ পাইল না। এত অবিশ্রাম আদর পাইল যে, ভালোবাসিবার আর মুহূর্ত অবসর রহিল না। সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হইয়া, সমুদ্রের মধ্যে আত্মবিসর্জন করিয়া, বোধ করি নদীর একটি মহৎ চরিতার্থতা আছে ; কিন্তু সমুদ্র যদি জোয়ারের টানে আকৃষ্ট হইয়া ক্রমাগতই নদীর উন্মুখীন হইয়া রহে তবে নদী কেবল নিজের মধ্যেই নিজে ক্ষীত হইতে থাকে সংসার তাহার সমস্ত আদর সোহাগ লইয়া দিবারাত্রি শৈলবালার দিকে অগ্রসর হইয়া রহিল, তাহাতে শৈলবালার আত্মাদর অতিশয় উত্তঙ্গ হইয়া উঠিতে লাগিল, সংসারের প্রতি তাহার ভালোবাসা পড়িতে পাইল না। সে জানিল, “আমার জন্যই সমস্ত এবং আমি কাহার জন্যও নহি । এ অবস্থায় যথেষ্ট অহংকার অাছে, কিন্তু পরিতৃপ্তি কিছুই নাই । চতুর্থ পরিচ্ছেদ এক দিন ঘনঘোর মেঘ করিয়া আসিয়াছে । এমনি অন্ধকার করিয়াছে যে, ঘরের মধ্যে কাজকর্ম করা অসাধ্য। বাহিরে ঝুপ ঝুপ করিয়া বৃষ্টি হইতেছে। কুলগাছের তলায় লতাগুন্মের জঙ্গল জলে প্রায় নিমগ্ন হইয়া গিয়াছে এবং প্রাচীরের পাশ্ববর্তী নালা দিয়া ঘোলা জলস্রোত কলকল শব্দে বহিয়া চলিয়াছে। হরমুন্দরী আপনার নূতন শয়নগৃহের নির্জন অন্ধকারে জানলার কাছে চুপ করিয়া বসিয়া আছে। এমন সময় নিবারণ চোরের মতো ধীরে ধীরে দ্বারের কাছে প্রবেশ করিল, ফিরিয়া যাইবে কি অগ্রসর হইবে ভাবিয়া পাইল না। হরমুন্দরী তাহা লক্ষ্য করিল কিন্তু একটি কথাও কহিল না । তখন নিবারণ হঠাৎ একেবারে তীরের মতো হরম্বপারীর পাশ্বে গিয়া এক নিশ্বাসে বলিয়া ফেলিল, “গোটাকতক গহনার আবশুক হইয়াছে । জান মধ্যবর্তিনী २8¢ তো অনেকগুলো দেন হইয়া পড়িয়াছে, পাওনাদার বড়োই অপমান করিতেছে- কিছু বন্ধক রাখিতে হইবে— শীঘ্রই ছাড়াইয়া লইতে পারিব।” হরমুন্দরী কোনো উত্তর দিল না, নিবারণ চোরের মতো দাড়াইয়া রহিল। অবশেষে পুনশ্চ কহিল, তবে কি আজ হইবে না।” হরমুন্দরী কহিল, “না।” ঘরে প্রবেশ করাও যেমন শক্ত ঘর হইতে অবিলম্বে বাহির হওয়াও তেমনি কঠিন। নিবারণ একটু এ দিকে ও দিকে চাহিয়া ইতস্তুত করিয়া বলিল, *তবে অন্যত্র চেষ্টা দেখিগে যাই ।” বলিয়া প্রস্থান করিল। ঋণ কোথায় এবং কোথায় গহন বন্ধক দিতে হইবে হরমুনারী তাই সমস্তই বুঝিল । বুঝিল, নববধূ পূর্বরাত্রে তাহার এই হতবুদ্ধি পোষা পুরুষটিকে অত্যন্ত ঝংকার দিয়া বলিয়াছিল, “দিদির সিন্দুক ভরা গহন, আর আমি বুঝি একখানি পরিতে পাই না।” নিবারণ চলিয়া গেলে ধীরে ধীরে উঠিয়া লোহার সিন্দুক খুলিয়া একে একে সমস্ত গহন বাহির করিল । শৈলবালাকে ডাকিয়া প্রথমে আপনার বিবাহের বেনারসি শাড়িখানি পরাইল, তাহার পর তাহার আপাদমস্তক এক-একথানি করিয়া গহনায় ভরিয়া দিল। ভালো করিয়া চুল বাধিয়া দিয়া প্রদীপ জালিয়। দেখিল, বালিকার মুখখানি বড়ো সুমিষ্ট, একটি সদ্য পক্ক স্বগন্ধ ফলের মতো নিটোল, রসপূর্ণ। শৈলবালা যখন ঝম্ ঝম্ শব্দ করিয়া চলিয়া গেল সেই শব্দ বহুক্ষণ ধরিয়া হরমুনারীর শিরার রক্তের মধ্যে ঝিম্ ঝিম্ করিয়া বাজিতে লাগিল। মনে মনে কহিল, ‘আজ আর কী লইয়া তোতে আমাতে তুলনা হইবে । কিন্তু এক সময়ে আমার ও তে। ওই বয়স ছিল, আমিও তো আমনি যৌবনের শেষ রেখা পর্যন্ত ভরিয়া উঠিয়াছিলাম, তবে আমাকে সে কথা কেহ জানায় নাই কেন । কখন সে দিন আসিল এবং কখন সে দিন গেল তাহা একবার সংবাদও পাইলাম না। কিন্তু, কী গর্বে, কী গৌরবে, কী তরঙ্গ তুলিয়া শৈলবালা চলিয়াছে । হরম্বন্দরী যখন কেবলমাত্র ঘরকরাই জানিত তখন এই গহনাগুলি তাহার কাছে কত দামি ছিল । তখন কি নির্বোধের মতে এ-সমস্ত এমন করিয়া এক মুহূর্তে হাতছাড়া করিতে পারিত। এখন ঘরকন্না ছাড়া আর-একটা বড়ো २8७ গল্পগুচ্ছ কিসের পরিচয় পাইয়াছে ; এখন গহনার দাম, ভবিষ্যতের হিসাব, সমস্ত তুচ্ছ হইয়া গিয়াছে । আর, শৈলবালা সোনামানিক ঝকৃমক্‌ করিয়া শয়নগৃহে চলিয়া গেল, একবার মুহূর্তের তরে ভাবিলও না হরমুন্দরী তাহাকে কতখানি দিল। সে জানিল, চতুদিক হইতে সমস্ত সেবা, সমস্ত সম্পদ, সমস্ত সৌভাগ্য স্বাভাবিক নিয়মে তাহার মধ্যে আসিয়া পরিসমাপ্ত হইবে ; কারণ, সে হইল শৈলবালা, সে হইল সই । পঞ্চম পরিচ্ছেদ এক-একজন লোক স্বপ্লাবস্থায় নিতীকভাবে অত্যস্ত সংকটের পথ দিয়া চলিয়া যায়, মুহূর্তমাত্র চিন্তা করে না। অনেক জাগ্ৰত মানুষেরও তেমনি চিরস্বপ্লাবস্থা উপস্থিত হয় ; কিছুমাত্র জ্ঞান থাকে না, বিপদের সংকীর্ণ পথ দিয়া নিশ্চিন্তমনে অগ্রসর হইতে থাকে, অবশেষে নিদারুণ সর্বনাশের মধ্যে গিয়া জাগ্রত হইয়া উঠে । আমাদের ম্যাকমোরান কোম্পানির হেড বাবুটিরও সেই দশা । শৈলবালা তাঙ্গর জীবনের মাঝখানে একটা প্রবল আবর্তের মতো ঘুরিতে লাগিল এবং বহু দূর হইতে বিবিধ মহার্ঘ পদার্থ আকৃষ্ট হইয় তাহার মধ্যে বিলুপ্ত হইতে লাগিল । কেবল যে নিবারণের মকুন্যত্ব এবং মাসিক বেতন, হরমুন্দরীর সুখসৌভাগ্য এবং বসনভূষণ, তাহা নহে ; সঙ্গে সঙ্গে ম্যাক্মোরান কোম্পানির ক্যাশ, তহবিলেও গোপনে টান পড়িল । তাহার মধ্য হইতেও দুটা-একটা করিয়া তোড়া অদৃশ্য হইতে লাগিল। নিবারণ স্থির করিত, 'আগামী মাসের বেতন হইতে আস্তে আস্তে শোধ করিয়া রাথিব ? কিন্তু, আগামী মাসের বেতনটি হাতে আসিবামাত্র সেই আবর্ত হইতে টান পড়ে এবং শেষ দু-আনিটি পর্যন্ত চকিতের মতো চিক্‌মিক্‌ করিয়া বিদ্যুৎবেগে অন্তহিত হয় । শেষে একদিন ধরা পড়িল । পুরুষানুক্রমের চাকুরি। সাহেব বড়ো ভালোবাসে— তহবিল পুরণ করিয়া দিবার জন্য দুইদিন মাত্র সময় দিল । কেমন করিয়া সে ক্রমে ক্রমে আড়াই হাজার টাকার তহবিল ভাঙিয়াছে মধ্যবর্তিনী Հ8Գ তাহা নিবারণ নিজেই বুঝিতে পারিল না। একেবারে পাগলের মতো হইয়া হরমুন্দরীর কাছে গেল, বলিল, “সর্বনাশ হইয়াছে।” হরমুন্দরী সমস্ত শুনিয়া একেবারে পাংশুবর্ণ হইয়া গেল । নিবারণ কহিল, "শীঘ্ৰ গহনাগুলো বহির করে ।” হরমুন্দরী কহিল, “সে তো আমি সমস্ত ছোটোবউকে দিয়াছি।” নিবারণ নিত্যস্ত শিশুর মতো অধীর হইয়া বলিতে লাগিল, "কেন দিলে ছোটোবউকে । কেন দিলে। কে তোমাকে দিতে বলিল ।” হরমুন্দরী তাহার প্রকৃত উত্তর না দিয়া কহিল, “তাহাতে ক্ষতি কী হইয়াছে। সে তো আর জলে পড়ে নাই ।” ভীরু নিবারণ কাতর স্বরে কহিল, “তবে যদি তুমি কোনো ছুতা করিয়া তাহার কাছ হইতে বাহির করিতে পার । কিন্তু, আমার মাথা খাও, বলিয়ে না যে, আমি চাহিতেছি কিম্বা কী জন্য চাহিতেছি ।” তখন হরমুন্দরী মর্মাস্তিক বিরক্তি ও ঘৃণা-ভরে বলিয়া উঠিল, “এই কি তোমার ছলছুতা করিবার, সোহাগ দেখাইবার সময় । চলে * বলিয়া স্বামীকে লইয়া ছোটোবউয়ের ঘরে প্রবেশ করিল। ছোটোবউ কিছু বুঝিল না । সে সকল কথাতেই বলিল, “সে আমি কী জানি ।” ংসারের কোনো চিস্তা যে তাহাকে কখনো ভাবিতে হইবে এমন কথা কি তাহার সহিত ছিল । সকলে আপনার ভাবনা ভাবিবে এবং সকলে মিলিয়া শৈলবালার আরাম চিন্তা করিবে, অকস্মাৎ ইহার ব্যতিক্রম হয়, এ কী ভয়ানক অন্যায়। তখন নিবারণ শৈলবালার পায়ে ধরিয়া কাদিয়া পড়িল ৷ শৈলবালা কেবলই বলিল, “সে আমি জানি না। আমার জিনিস আমি কেন দিব ।” নিবারণ দেখিল, ওই দুর্বল ক্ষুদ্র সুন্দর সুকুমারী বালিবfট লোহার সিন্দুকের অপেক্ষাও কঠিন। হরমুন্দরী সংকটের সময় স্বামীর এই দুর্বলতা দেখিয়া ঘৃণায় জর্জরিত হইয়া উঠিল। শৈলবালার চাবি বলপূর্বক কাড়িয়া লইতে গেল । শৈলবালা তৎক্ষণাং চাবির গোছা প্রাচীর লঙ্ঘন করিয়া পুষ্করিণীর মধ্যে ফেলিয়া দিল । $8b- গল্পগুচ্ছ হরহুন্দরী হতবুদ্ধি স্বামীকে কহিল, “তালা ভাঙিয়া ফেলো-না।” শৈলবালা প্রশাস্তমুখে বলিল, “তাহা হইলে আমি গলায় দড়ি দিয়া মরিব ।” নিবারণ কহিল, “আমি আবু-একটা চেষ্টা দেখিতেছি।” বলিয়া এলোথেলো বেশে বাহির হইয়া গেল । নিবারণ দুই ঘণ্টার মধ্যেই পৈতৃক বাড়ি আড়াই হাজার টাকায় বিক্রয় করিয়া আসিল । বহু কষ্টে হাতে বেড়িটা বঁচিল, কিন্তু চাকরি গেল । স্থাবর-জঙ্গমের মধ্যে রহিল কেবল দুটিমাত্র স্ত্রী। তাহার মধ্যে ক্লেশকাতর বালিকা স্ত্রীটি গর্ভবতী হইয়া নিতান্ত স্থাবর হইয়াই পড়িল । গলির মধ্যে একটি ছোটো স্যাংসেঁতে বাড়িতে এই ক্ষুদ্র পরিবার আশ্রয় গ্রহণ করিল। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ছোটোবউয়ের অসন্তোষ এবং অমুথের আর শেষ নাই । সে কিছুতেই বুঝিতে চায় না তাহার স্বামীর ক্ষমতা নাই। ক্ষমতা নাই যদি তো বিবাহ করিল কেন । উপরের তলায় কেবল দুটিমাত্র ঘর। একটি ঘরে নিবারণ ও শৈলবালার শয়নগৃহ আর-একটি ঘরে হরমুন্দরী থাকে ৷ শৈলবালা খুংখুৎ করিয়া বলে, “আমি দিনরাত্রি শোবার ঘরে কাটাইতে পারি না।” নিবারণ মিথ্য আশ্বাস দিয়া বলিত, “আমি আর-একটা ভালো বাড়ির সন্ধানে আছি, শীঘ্র বাড়ি বদল করিব।” শৈলবালা বলিত, “কেন, ওই তো পাশে আর-একটা ঘর আছে ।” শৈলবালা তাহার পূর্ব-প্রতিবেশিনীদের দিকে কখনো মুখ তুলিয়া চাহে নাই । নিবারণের বর্তমান দুরবস্থায় ব্যথিত হইয়া তাহার এক দিন দেখা করিতে আসিল ; শৈলবালা ঘরে খিল দিয়া বসিয়া রহিল, কিছুতেই দ্বার খুলিল না । তাহারা চলিয়া গেলে রাগিয়া, কাদিয়া, উপবাসী থাকিয়া, হিস্টরিয়া করিয়া পাড়া মাথায় করিল। এমনতরো উৎপাত প্রায় ঘটিতে লাগিল । মধ্যবর্তিনী ૨83ગ অবশেষে শৈলবালার শারীরিক সংকটের অবস্থায় গুরুতর পীড়া হইল, এমন কি গর্ভপাত হইবার উপক্রম হইল । নিবারণ হরসুন্দরীর দুই হাত ধরিয়া বলিল, “তুমি শৈলকে বাচাও।” হর সুন্দরী দিন নাই, রাত্রি নাই, শৈলবালার সেবা করিতে লাগিল । তিলমাত্র ক্রটি হইলে শৈল তাহাকে দুর্বাক্য বলিত, সে একটি উত্তরমাত্র করিত না ! শৈল কিছুতেই সাগু থাইতে চাহিত না, বাটিমৃদ্ধ ছুড়িয়া ফেলিত, জরের সময় কাচা আমের অম্বল দিয়া ভাত থাইতে চাহিত । না পাইলে রাগিয়া, কাদিয়া, অনৰ্থপাত করিত। হরমুন্দরী তাহাকে 'লক্ষ্মী আমার' 'বোন আমার’ ‘দিদি আমার বলিয়া শিশুর মতো ভুলাইতে চেষ্টা করিত। কিন্তু শৈলবালা বঁচিল না । সংসারের সমস্ত সোহাগ আদর লইয়া পরম অমুখ ও অসন্তোষে বালিকার ক্ষুদ্র অসম্পূর্ণ ব্যর্থ জীবন নষ্ট হইয়া গেল । সপ্তম পরিচ্ছেদ নিবারণের প্রথমে খুব একটা আঘাত লাগিল ; পরক্ষণেই দেখিল তাহার একটা মস্ত বাধন ছিড়িয়া গিয়াছে । শোকের মধ্যেও হঠাৎ তাহার একটা মুক্তির আনন্দ বোধ হইল । হঠাৎ মনে হইল এতদিন তাহার বুকের উপর একটা দুঃস্বপ্ন চাপিয়া ছিল । চৈতন্য হইয়া মুহূর্তের মধ্যে জীবন নিরতিশয় লঘু হইয়া গেল। মাধবীলতাটির মতো এই-যে কোমল জীবনপাশ ছিড়িয়া গেল এই কি তাহার আদরের শৈলবালা । হঠাৎ নিশ্বাস টানিয়া দেখিল, না, সে তাহার উদবন্ধনরজ্জ্ব । আর, তাহার চিরজীবনের সঙ্গিনী হরসুন্দরী ? দেখিল;সেই তো তাহার সমস্ত সংসার একাকিনী অধিকার করিয়া তাহার জীবনের সমস্ত সুখদুঃখের স্মৃতিমন্দিরের মাঝখানে বসিয়া আছে- কিন্তু তবু মধ্যে একটা বিচ্ছেদ । ঠিক যেন একটি ক্ষুদ্র উজ্জ্বল সুন্দর নিষ্ঠুর ছুরি অসিয়া একটি হৃৎপিণ্ডের দক্ষিণ এবং বাম অংশের মাঝখানে বেদনাপূর্ণ বিদারণরেখা টানিয়া দিয়া গেছে । २¢ ० গল্পগুচ্ছ একদিন গভীর রাত্রে সমস্ত শহর যখন নিদ্রিত নিবারণ ধীরে ধীরে হরমুন্দরীর নিভৃত শয়নকক্ষে প্রবেশ করিল। নীরবে সেই পুরাতন নিয়ম-মতো সেই পুরাতন শয্যার দক্ষিণ অংশ গ্রহণ করিয়া শয়ন করিল। কিন্তু, এবার তাহার সেই চির অধিকারের মধ্যে চোরের মতো প্রবেশ করিল। হরকুন্দরীও একটি কথা বলিল না, নিবারণও একটি কথা বলিল না । উহারা পূর্বে যেরূপ পাশাপাশি শয়ন করিত এখনও সেইরূপ পাশাপাশি শুইল ; কিন্তু ঠিক মাঝখানে একটি মুত বালিকা শুইয়া রহিল, তাহাকে কেই লঙ্ঘন করিতে পারিল না। জ্যৈষ্ঠ SW3e e