গল্পগুচ্ছ/মুক্তির উপায়

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মুক্তির উপায় ফকিরর্চাদ বাল্যকাল হইতেই গম্ভীর প্রকৃতি। বৃদ্ধসমাজে তাহাকে কখনোই বেমানান দেখাইত না । ঠাণ্ডা জল, হিম, এবং হাস্যপরিহাস তাহার একেবারে সহ হইত না । একে গম্ভীর, তাহাতে বৎসরের মধ্যে অধিকাংশ সময়েই মুখমণ্ডলের চারি দিকে কালো পশমের গলাবন্ধ জডাইয়া থাকাতে তাহাকে ভয়ংকর উচুদরের লোক বলিয়া বোধ হইত। ইহার উপরে, অতি অল্প বয়সেই তাহার ওষ্ঠাধর এবং গণ্ডস্থল প্রচুর গোফদাড়িতে আচ্ছন্ন হওয়াতে সমস্ত মুখের মধ্যে হাস্তবিকাশের স্থান আর তিলমাত্র অবশিষ্ট রহিল না । স্ত্রী হৈমবতীর বয়স অল্প এবং তাহার মন পার্থিব বিষয়ে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট। সে বঙ্কিমবাবুর নভেল পড়িতে চায় এবং স্বামীকে ঠিক দেবতার ভাবে পূজা করিয়া তাহার তৃপ্তি হয় না। সে একটুখানি হাসিখুশি ভালোবাসে ; এবং বিকচোমুখ পুষ্প যেমন বাযুর আন্দোলন এবং প্রভাতের আলোকের জন্য ব্যাকুল হয়, সেও তেমনি এই নবযৌবনের সময় স্বামীর নিকট হইতে আদর এবং হাস্যামোদ যথাপরিমাণে প্রত্যাশা করিয়া থাকে । কিন্তু, স্বামী তাহাকে অবসর পাইলেই ভাগবত পড়ায়, সন্ধ্যাবেলায় ভগবদগীতা শুনায়, এবং তাহার আধ্যাত্মিক উন্নতির উদ্দেশে মাঝে মাঝে শারীরিক শাসন করিতেও ক্রটি করে না । যেদিন হৈমবতীর বালিশের নীচে হইতে ‘কৃষ্ণকাস্তের উইল’ বাহির হয় সেদিন উক্ত লঘুপ্রকৃতি যুবতীকে সমস্ত রাত্রি অশ্রুপাত করাইয়। তবে ফকির ক্ষাস্ত হয় । একে নভেল পাঠ, তাহাতে আবার পতিদেবকে প্রতারণা ! যাহা হউক, অবিশ্রাস্ত আদেশ অমুদেশ উপদেশ ধর্মনীতি এবং দগুনীতির দ্বারা অবশেষে হৈমবতীর মুখের হাসি, মনের মুখ এবং যৌবনের আবেগ একেবারে নিষ্কর্ষণ করিয়া ফেলিতে স্বামীদেবতা সম্পূর্ণ কৃতকার্য হইয়াছিলেন। কিন্তু, অনাসক্ত লোকের পক্ষে সংসারে বিস্তর বিস্ত্র । পরে পরে ফকিরের এক ছেলে এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করিয়া সংসারবন্ধন বাড়িয়া গেল। পিতার মুক্তির উপায় Seo তাড়নায় এতবড়ো গম্ভীরপ্রকৃতি ফকিরকেও আপিসে আপিসে কর্মের উমেদারিতে বাহির হইতে হইল, কিন্তু কৰ্ম জুটিবার কোনো সম্ভাবনা দেখা গেল না । তখন সে মনে করিল, ‘বুদ্ধদেবের মতো আমি সংসার ত্যাগ করিব।” এই ভাবিয়া একদিন গভীর রাত্রে ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয় গেল । & মধ্যে আর-একটি ইতিহাস বলা আবশ্বক । নবগ্রামবাসী ষষ্ঠীচরণের এক ছেলে । নাম মাখনলাল । বিবাহের অনতিবিলম্বে সন্তানাদি না হওয়াতে পিতার অনুরোধে এবং নূতনত্বের প্রলোভনে আর-একটি বিবাহ করে । এই বিবাহের পর হইতে যথাক্রমে তাহার উভয় স্ত্রীর গর্ভে সাতটি কস্তা এবং একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করিল। মাখন লোকটা নিতান্ত শৌখিন এবং চপল প্রকৃতি, কোনোপ্রকার গুরুতর কর্তব্যের দ্বারা আবদ্ধ হইতে নিতান্ত নারাজ । একে তো ছেলেপুলের ভার, তাহার পরে যখন দুই কর্ণধার দুই কর্ণে বিকা মারিতে লাগিল, তখন নিতান্ত অসহ্য হইয়া সেও একদিন গভীর রাত্রে ডুব মারিল । বহুকাল তাহার আর সাক্ষাং নাই । কখনো কখনো শুনা যায়, এক বিবাহে কিরূপ সুখ তাহাই পরীক্ষা করিবার জন্য সে কাশীতে গিয়া গোপনে আর-একটি বিবাহ করিয়াছে ; শুনা যায়, হতভাগ্য কথঞ্চিং শাস্তি লাভ করিয়াছে । কেবল দেশের কাছাকাছি আসিবার জন্য মাঝে মাঝে তাহার মন উতলা হয়, ধরা পড়িবার ভয়ে আসিতে পারে না । ළු কিছুদিন ঘুরিতে ঘুরিতে উদাসীন ফকিরা নবগ্রামে আসিয়া উপস্থিত। পথপাৰ্শ্ববর্তী এক বটবৃক্ষতলে বসিয়া নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিল, “আহা, বৈরাগ্যমেবাভয়ম। দারাপুত্র ধনজন কেউ কারও নয়। কা তব কাস্ত কন্তে পুত্র । বলিয়া এক গান জুড়িয়া দিল – So 8 গল্পগুচ্ছ “শোন রে শোন, অবোধ মন । শোন সাধুর উক্তি, কিসে মুক্তি সেই স্বযুক্তি কর গ্রহণ। ভবের শুক্তি ভেঙে মুক্তি-মুক্ত কর অন্বেষণ । ওরে ও ভোলা মন, ভোলা মন রে ।” সহসা গান বন্ধ হইয়া গেল । *ও কে ও ! বাব দেখছি! সন্ধান পেয়েছেন বুঝি ! তবেই তো সর্বনাশ । আবার তো সংসারের অন্ধকূপে টেনে নিয়ে যাবেন । পালাতে হল ।” 8 ফকির তাড়াতাড়ি নিকটবর্তী এক গৃহে প্রবেশ করিল। বুদ্ধ গৃহস্বামী চুপচাপ বসিয়া তামাক টানিতেছিল। ফকিরকে ঘরে ঢুকিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কে হে তুমি।” ফকির । বাবা, আমি সন্ন্যাসী । বুদ্ধ। সন্ন্যাসী ! দেখি দেখি বাবা, আলোতে এসো দেখি । এই বলিয়া আলোতে টানিয়া লইয়া ফকিরের মুখের পরে ঝুকিয়া বুড়ামাহ্য বহু কষ্টে যেমন করিয়া পুথি পড়ে তেমনি করিয়া ফকিরের মুখ নিরীক্ষণ করিয়া বিড বিড় করিয়া বকিতে লাগিল— “এই তো আমার সেই মাখনলাল দেখছি । সেই নাক, সেই চোখ, কেবল কপালট বদলেছে, আর সেই চাদমুখ গোফে দাড়িতে একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।” বলিয়া বৃদ্ধ সক্ষেহে ফকিরের শ্মশ্রল মুখে দুই-একবার হাত বুলাইয়া লইল, এবং প্রকাশ্যে কহিল, “বাবা মাখন ।” বলা বাহুল্য বৃত্ত্বের নাম ষষ্ঠীচরণ। ফকির। (সবিস্ময়ে ) মাখন ! আমার নাম তো মাখন নয়। পূর্বে আমার নাম যাই থাক, এখন আমার নাম চিদানন্দস্বামী । ইচ্ছা হয় তো পরমানন্দও বলতে পার । ষষ্ঠ । বাবা, তা এখন আপনাকে চিড়েই বল আর পরমান্নই বল, মুক্তির উপায় Se (t তুই যে আমার মাখন, বাবা, সে তো আমি ভুলতে পারব না। বাবা, তুই কোন দুঃখে সংলার ছেড়ে গেলি। তোর কিসের অভাব। দুই স্ত্রী ; বড়োটিকে না ভালোবাসিস, ছোটোটি আছে। ছেলেপিলের দুঃখও নেই। শত্রুর মুখে ছাঁই দিয়ে সাতটি কন্যে, একটি ছেলে। আর, আমি বুড়ো বাপ, কদিনই বা বঁচিব, তোর সংসার তোরই থাকবে । ফকির একেবারে অঁাংকিয়া উঠিয়া কহিল, “কী সর্বনাশ । শুনলেও যে ভয় হয় ।” এতক্ষণে প্রকৃত ব্যাপারটা বোধগম্য হইল। ভাবিল, ‘মন্স কী, দিন-জুই বৃদ্ধের পুত্রভাবেই এখানে লুকাইয়া থাকা যাক, তাহার পরে সন্ধানে অকৃতকার্য হইয়া বাপ চলিয়া গেলেই এখান হইতে পলায়ন করিব ।’ ফকিরকে নিরুত্তর দেখিয়া বৃদ্ধের মনে আর সংশয় রহিল না। কেষ্ট৷ চাকরকে ডাকিয়া বলিল, “ওরে ও কেষ্ট, তুই সকলকে খবর দিয়ে আয় গে, আমার মাখন ফিরে এসেছে।” & দেখিতে দেখিতে লোকে লোকারণ্য। পাড়ার লোকে অধিকাংশই বলিল, সেই বটে । কেহ বা সন্দেহ প্রকাশ করিল। কিন্তু, বিশ্বাস করিবার জন্যই লোকে এত ব্যগ্র যে সন্দিগ্ধ লোকদের উপরে সকলে হাড়ে চটিয়া গেল। যেন তাহারা ইচ্ছাপূর্বক কেবল রসভঙ্গ করিতে আসিয়াছে ; যেন তাহারা পাড়ার চৌদ্দ অক্ষরের পয়ারকে সতেরো অক্ষর করিয়া বসিয়া আছে, কোনোমতে তাহাদিগকে সংক্ষেপ করিতে পারিলেই তবে পাড়ামৃদ্ধ লোক আরাম পায়। তাহারা ভূতও বিশ্বাস করে না, ওঝাও বিশ্বাস করে না, আশ্চর্য গল্প শুনিয়া যখন সকলের তাক লাগিয়া গিয়াছে তখন তাহার প্রশ্ন উত্থাপন করে । একপ্রকার নাস্তিক বলিলেই হয় । কিন্তু, ভূত অবিশ্বাস করিলে ততটা ক্ষতি নাই, তাই বলিয়া বুড়া বাপের হার ছেলেকে অবিশ্বাস করা যে নিতান্ত হৃদয়হীনতার কাজ । যাহা হউক, সকলের নিকট হইতে তাড়ন থাইয়া সংশয়ীর দল থামিয়া গেল । ফকিরের অতি ভীষণ অটল গাম্ভীর্যের প্রতি ভ্ৰক্ষেপমাত্র না করিয়া পাড়ার eve গল্পগুচ্ছ লোকেরা তাহাকে ঘিরিয়া বসিয়া বলিতে লাগিল, “আরে আরে, আমাদের সেই মাখন আজ ঋষি হয়েছেন, তপিন্ধী হয়েছেন— চিরটা কাল ইয়াকি দিয়ে কাটালে, আজ হঠাৎ মহামুনি জামদগ্নি হয়ে বসেছেন।” কথা উন্নতচেতা ফকিরের অত্যন্ত খারাপ লাগিল, কিন্তু নিরুপায়ে সহ করিতে হইল। একজন গায়ের উপর আসিয়া পড়িয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ওরে মাখন, তুই কুচ কুচে কালো ছিলি, রঙটা এমন ফর্শ করলি কী করে।” ফকির উত্তর দিল, “যোগ অভ্যাস ক’রে ।” সকলেই বলিল, “যোগের কী আশ্চর্য প্রভাব ।” একজন উত্তর করিল, “আশ্চর্য আর কী । শাস্ত্রে আছে, ভীম যখন হকুমানের লেজ ধরে তুলতে গেলেন কিছুতেই তুলতে পারলেন না। সে কী ক’রে হল । সে তো যোগবলে ।” এ কথা সকলকেই স্বীকার করিতে হইল। হেনকালে ষষ্ঠীচরণ আসিয়া ফকিরকে বলিল, “বাবা, একবার বাডির ভিতরে যেতে হচ্ছে ।” এ সম্ভাবনাটা ফকিরের মাথায় উদয় হয় নাই— হঠাৎ বজ্রাঘাতের মতো মস্তিষ্কে প্রবেশ করিল। অনেক ক্ষণ চুপ করিয়া, পাডার লোকের বিস্তর অন্যায় পবিহাস পরিপাক কৃরিয়া অবশেষে বলিল, “বাবা, আমি সন্ন্যাসী হয়েছি, আমি অন্তঃপুরে ঢুকতে পারব না।” ষষ্ঠীচরণ পাড়ার লোকদের সম্বোধন করিয়া বলিল, “তা হলে আপনাদের একবার গা তুলতে হচ্ছে। বউমাদের এইখানেই নিয়ে আসি । তারা বড়ো ব্যাকুল হয়ে আছেন ।” সকলে উঠিয়া গেল। ফকির ভাবিল, এইবেলা এখান হইতে এক দৌড় মারি । কিন্তু রাস্তায় বাহির হইলেই পাডার লোক কুকুরের মতো তাহার পশ্চাতে ছুটিবে, ইহাই কল্পনা করিয়া তাহাকে নিস্তদ্ধভাবে বসিয়া থাকিতে श्ल । যেমনি মাখনলালের দুই স্ত্রী প্রবেশ করিল, ফকির অমনি নতশিরে তাহাদিগকে প্রণাম করিয়া কহিল, “ম, আমি তোমাদের সস্তান ।” অমনি ফকিরের নাকের সম্মুখে একটা বালা-পরা হাত খড়গের মতো মুক্তির উপায় e থেলিয়া গেল এবং একটি কাংগুধিনিন্দিত কণ্ঠে বাজিয়া উঠিল, "ওরে ও পোডাকপালে মিনসে, তুই মা বললি কাকে ৷” অমনি আর-একটি কণ্ঠ আরও দুই স্বর উচ্চে পাড়া কাপাইয়া ঝংকার দিয়া উঠিল, “চোখের মাথা থেয়ে বসেছিস । তোর মরণ হয় না ।” নিজের স্ত্রীর নিকট হইতে এরূপ চলিত বাংলা শোনা অভ্যাস ছিল না, স্বতরাং একান্ত কাতর হইয় ফকির জোড়হস্তে কহিল, “আপনারা ভুল বুঝছেন। আমি এই আলোতে দাড়াচ্ছি, আমাকে একটু ঠাউরে দেখুন।” প্রথম ও দ্বিতীয় পরে পরে কহিল, “ঢের দেখেছি । দেখে দেখে চোখ ক্ষয়ে গেছে । তুমি কচি থোকা নও, আজ নূতন জন্মাও নি। তোমার দুধের দাত অনেক দিন ভেঙেছে । তোমার কি বয়সের গাছ পাথর আছে । তোমায় যম ভুলেছে বলে কি আমবা ভুলব ।” এরূপ একতরফ দাম্পত্য আলাপ কতক্ষণ চলিত বলা যায় না— কারণ, ফকির একেবারে বাকশক্তিরহিত হইয়া নতশিরে দাড়াইয়া ছিল। এমন সময় অত্যন্ত কোলাহল শুনিয়া এবং পথে লোক জমিতে দেখিয়া ষষ্ঠীচরণ প্রবেশ করিল। বলিল, “এতদিন আমার ঘর নিস্তব্ধ ছিল, একেবারে টুশক ছিল না। আজ মনে হচ্ছে বটে, আমার মাখন ফিরে এসেছে ।” ফকির করজোড় কহিল, "মশায়, আপনার পুত্রবধূদের হাত থেকে আমাকে বুক্ষে করুন ।” ষষ্ঠ । বাবা, অনেক দিন পরে এসেছ, তাই প্রথমটা একটু সহ বোধ হচ্ছে । তা, মা, তোমরা এখন যাও । বাবা মাখন তো এখন এখানেই রইলেন, ওঁকে আর কিছুতেই যেতে দিচ্ছি নে । ললনায় বিদায় হইলে ফকির ষষ্ঠীচরণকে বলিল, “মশায়, আপনার পুত্র কেন যে সংসার ত্যাগ করে গেছেন, তা আমি সম্পূর্ণ অনুভব করতে পারছি । মশায়, আমার প্রণাম জানবেন, আমি চললেম ।” বৃদ্ধ এমনি উচ্চৈঃস্বরে ক্ৰন্দন উত্থাপন করিল যে, পাড়ার লোক মনে করিল মাখন তাহার বাপকে মারিয়াছে। তাহার হা-ই করিয়া ছুটিমা আসিল । সকলে আসিয়া ফকিরকে জানাইয়া দিল, এমন ভণ্ডতপন্ধীগিরি 切* × oხz গল্পগুচ্ছ এখানে খাটিবে না। ভুলোমান্বষের ছেলের মতো কাল কাটাইতে হইবে। একজন বলিল, “ইনি তো পরমহংস নন, পরম বক।” গাম্ভীর্য গোফদাড়ি এবং গলাবন্ধের জোরে ফকিরকে এমন-সকল কুৎসিত কথা কখনো শুনিতে হয় নাই । যাহা হউক, লোকটা পাছে আবার পালায়, পাড়ার লোকেরা অত্যস্ত সতর্ক রহিল। স্বয়ং জমিদার ষষ্ঠীচরণের পৃক্ষ অবলম্বন করিলেন । Wう ফকির দেখিল এমনি কডা পাহারা যে, মৃত্যু না হইলে ইহার ঘরের বাহির করিবে না। একাকী ঘরে বসিয়া গান গাহিতে লাগিল— শোন সাধুর উক্তি, কিসে মুক্তি সেই স্বযুক্তি কর গ্রহণ । বলা বাহুল্য গানটার আধ্যাত্মিক অর্থ ` ক্ষীণ হইয়া আসিয়াছে । এমন করিয়াও কোনোমতে দিন কাটিত । কিন্তু, মাথনের আগমনসংবাদ পাইয়া দুই স্ত্রীর সম্পর্কের একঝাক শ্বালা ও শুশলী আসিয়া উপস্থিত হইল । তাহারা আসিয়াই প্রথমত ফকিরের গোফদাড়ি ধরিয়া টানিতে লাগিল— তাহারা বলিল, এ তো সত্যকার গোফদাড়ি নয়, ছদ্মবেশ করিবার জন্য আঠা দিয়া জুড়িয়া আসিয়াছে । নাসিকার নিম্নবর্তী গুম্ফ ধরিয়া টানাটানি করিলে ফকিরের ন্যায় অত্যস্ত মহৎ লোকেরও মাহাত্ম্য রক্ষা করা দুষ্কর হইয়া উঠে । ইহা ছাড়া কানের উপর উপদ্রবও ছিল— প্রথমত মলিয়া, দ্বিতীয়ত এমন-সকল ভাষা প্রয়োগ করিয়া যাহাতে কান ন মলিলেও কান লাল হইয়া উঠে । ইহার পর ফকিরকে তাহারা এমন-সকল গান ফরমাশ করিতে লাগিল আধুনিক বড়ো বড়ো নূতন পণ্ডিতেরা যাহার কোনোরূপ আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করিতে হার মানেন"। আবার, নিদ্রাকালে তাহারা ফকিরের স্বল্পাবশিষ্ট গণ্ডস্থলে চুনকালি মাখাইয়া দিল ; আহারকালে কমুরের পরিবর্তে কচু, ভাবের জলের পরিবর্তে হকার জল, দুধের পরিবর্তে পিঠালি-গোলার আয়োজন করিল ; মুক্তির উপায় S తిపి পিড়ার নীচে সুপারি রাখিয়া তাহাকে আছাড় খাওয়াইল, লেজ বানাইল এবং সহস্র প্রচলিত উপায়ে ফকিরের অভ্ৰভেদী গাম্ভীর্ষ ভূমিসাৎ করিয়া দিল। ফকির রাগিয়া ফুলিয়া-ফাপিয়া বাকিয়া-ইকির (কছুতেই উপদ্রবকারীদের মনে ভীতির সঞ্চার করিতে পারিল না । কেবল সর্বসাধারণের নিকট অধিকতর হাস্তাস্পদ হইতে লাগিল। ইহার উপরে আবার অন্তরাল হইতে একটি মিষ্ট কণ্ঠের উচ্চহাস্য মাঝে মাঝে কর্ণগোচর হইত ; সেটা যেন পরিচিত বলিয়া ঠেকিত এবং মন দ্বিগুণ অধৈর্য হইয়া উঠিত । পরিচিত কণ্ঠ পাঠকের অপরিচিত নহে। এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, ষষ্ঠীচরণ কোনো-এক সম্পর্কে হৈমবতীর মামা । বিবাহের পর শাশুড়ির দ্বারা নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া পিতৃমাতৃহীন হৈমবতী মাঝে মাঝে কোনো-নাকোনো কুটুম্ববাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করিত । অনেক দিন পরে সে মামার বাড়ি 1 ᏑᏉ < *్కువ క" আসিয়া ੇ হইতে ီ|ိ অভিনয় নিরীক্ষণ করিতেছে। তৎকালে হৈমবতীর স্বাভাবিক সুদথ্রিয়তার সঙ্গে প্রতিহিংসপ্রবৃত্তির উদ্রেক হইয়াছিল কিনা চরিত্রতত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিতেরা স্থির করিবেন ; আমরা বলিতে অক্ষম । ঠাট্টার সম্পৰ্কীয় লোকেরা মাঝে মাঝে বিশ্রাম করিত, কিন্তু স্নেহের সম্পৰ্কীয় লোকদের হাত হইতৃে,পুরিত্রাণ পাওয়া কঠিন । সাত মেয়ে এবং এক ছেলে তাহাকে এক ছাড়ে না। বাপের স্নেহ অধিকার করিবার জন্য তাহাদের মা তাহাদিগকে অনুক্ষণ নিযুক্ত রাখিয়াছিল। দুই মাতার মধ্যে আবার রেষারেষি ছিল, উভয়েরই চেষ্টা যাহাতে নিজের সস্তানই অধিক আদর পায় । উভয়েই নিজ নিজ সস্তানদিগকে সর্বদাই উত্তেজিত করিতে লাগিল— দুই দলে মিলিয়া পিতার গলা জড়াইয়া ধরা, কোলে বসা, মুখচুম্বন করা প্রভৃতি প্রবল স্নেহব্যক্তিকার্যে পরস্পরকে জিতিবার চেষ্টা করিতে লাগিল । বলা বাহুল্য, ফকির লোকটা অত্যন্ত নির্লিপ্তস্বভাব, নহিলে নিজের সস্তানদের অকাতরে ফেলিয়ু আসিতে পারিত না । শিশুরা ভক্তি করিতে জানে না, তাহারা সাধুত্বের নিকট অভিভূত হইতে শিখে নাই, এইজন্স ফকির শিশুজাতির প্রতি তিলমাত্র অসুরক্ত ছিলেন না ; তাহাদিগকে তিনি SS o গল্পগুচ্ছ কীটপতঙ্গের স্থায় দেহ হইতে দূরে রাখিতে ইচ্ছা করিতেন। সম্প্রতি তিনি অহরহ শিশু পঙ্গপালে আচ্ছন্ন হইয়া বর্জইস অক্ষরের ছোটোবড়ো নোটের দ্বারা আদ্যোপাস্ত সমাকীর্ণ ঐতিহাসিক প্রবন্ধেব ন্যায় শোভমান হইলেন। তাহাদের মধ্যে বয়সের বিস্তর তারতম্য ছিল এবং তাহারা সকলেই কিছু তাহার সহিত বয়ঃপ্রাপ্ত সভ্যজনোচিত ব্যবহার করিত না , শুদ্ধশুচি ফকিরের চক্ষে অনেক সময় অশ্রুর সঞ্চার হইত এবং তাহা আনন্দাশ্র নহে । পরের ছেলেরা যখন নানা সুরে তাহাকে ‘বাবা বাবা’ করিয়া ডাকিয়া আদর করিত তখন র্তাহার সাংঘাতিক পাশব শক্তি প্রয়োগ করিবার একান্ত ইচ্ছা হইত, কিন্তু ভয়ে পারিতেন না। মুখ চক্ষু বিকৃত করিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতেন । 이 অবশেষে ফকির মহা চেঁচামেচি করিয়া বলিতে লাগিল, “আমি যাবই, দেখি আমাকে কে আটক করিতে পারে।” তখন গ্রামের লোক এক উকিল আনিয়া উপস্থিত করিল । উকিল আসিয়া কহিল, “জানেন আপনার দুই স্ত্রী ?” ফকির । আজ্ঞে, এখানে এসে প্রথম জানলুম। উকিল। আর, আপনার সাত মেয়ে, এক ছেলে, তার মধ্যে দুটি মেয়ে বিবাহযোগ্য । । , ফকির । আজ্ঞে, আপনি আমার চেয়ে ঢের বেশি জানেন, দেখতে পাচ্ছি । উকিল । আপনার এই বৃহৎ পরিবারের ভরণপোষণের ভার আপনি যদি না নেন, তবে আপনার অনাথিনী দুই স্ত্রী আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করবেন, পূর্বে হতে বলে রাখলুম। ফকির সব. চেয়ে আদালতকে ভয় করিত। তাহার জানা ছিল, উকিলের জেরা করিবার সময় মহাপুরুষদিগের মানমর্যাদা গাম্ভীর্যকে খাতির করে না, প্রকাশুে অপমান করে, এবং খবরের কাগজে তাহার রিপোর্ট বাহির মুক্তির উপায় >> 。 হয়। ফকির অশ্রুসিক্তলোচনে উকিলকে বিস্তারিত আত্মপরিচয় দিতে চেষ্টা করিল— উকিল তাহার চাতুরীর, তাহার উপস্থিতবুদ্ধির, তাহার মিথ্যা গল্প রচনার অসাধারণ ক্ষমতার ভূয়োভূঃ প্রশংসা করিতে লাগিল। শুনিয়া ফকিরের আপন হস্তপদ দংশন কীিতে ইচ্ছা করিতে লাগিল। ষষ্ঠীচরণ ফকিরকে পুনশ্চ পলায়নোন্তত দেখিয়া শোকে অধীর হইয়া পড়িল । পাড়ার লোকে তাহাকে চারি দিকে ঘিরিয়া অজস্র গালি দিল, এবং উকিল তাহাকে এমন শাসাইল যে তাহার মুখে আর কথা রহিল না। ইহার উপর যখন আটজন বালকবালিকা গাঢ় স্নেহে তাহাকে চারি দিকে আলিঙ্গন করিয়া ধরিয়া তাহার শ্বাসরোধ করিবার উপক্রম করিল, তখন অন্তরালস্থিত হৈমবতী হাসিবে কি কাদিবে ভাবিয়া পাইল না । ফকির অন্য উপায় না দেখিয়া ইতিমধ্যে নিজের পিতাকে একখানা চিঠি লিথিয়া সমস্ত অবস্থা নিবেদন করিয়াছিল । সেই পত্র পাইয়া ফকিরের পিতা হরিচরণবাবু আসিয়া উপস্থিত। পাড়ার লোক, জমিদার এবং উকিল কিছুতেই দখল ছাড়ে না । এ লোকটি যে ফকির নহে, মাখন, তাহারা তাহার সহস্ৰ অকাট্য প্রমাণ প্রয়োগ করিল— এমন কি, যে ধাত্রী মাখনকে মানুষ করিয়াছিল সেই বুড়িকে আনিয়া হাজির করিল। সে কম্পিত হস্তে ফকিরের চিবুক তুলিয়া ধরিয়া মুখ নিরীক্ষণ করিয়া তাহার দাড়ির উপরে দরুবিগলিত ধারায় অশ্রুপাত করিতে লাগিল । যখন দেখিল তাহাতেও ফকির রাশ মানে না, তখন ঘোমটা টানিয়া দুই স্ত্রী আসিয়া উপস্থিত হইল। পাড়ার লোকেরা শশব্যস্ত হইয়া ঘরের বাহিরে চলিয়া গেল। কেবল দুই বাপ, ফকির এবং শিশুরা ঘরে রহিল। দুই স্ত্রী হাত নাড়িয়া নাড়িয়া ফকিরকে জিজ্ঞাসা করিল, “কোন চুলোয়, যমের কোন দুয়োরে ষাবার ইচ্ছে হয়েছে ।” ফকির তাহা নিদিষ্ট করিয়া বলিতে পারিল না, সুতরাং নিরুত্তর হইয়া বুহিল। কিন্তু ভাবে যেরূপ প্রকাশ পাইল তাহাতে যমের কোনো বিশেষ স্বারের প্রতি তাহার ষে বিশেষ পক্ষপাত আছে এরূপ বোধ হইল না ; আপাতত যে-কোনো একটা দ্বার পাইলেই সে বঁাচে, কেবল একবার বাহির Σ Σ & গল্পগুচ্ছ श्हें उ *ांद्रिzलहे श्छ । তখন আর-একটি রমণীমূর্তি গৃহে প্রবেশ করিয়া ফকিরকে প্রণাম করিল। ফকির প্রথমে অবাক, তাহার পরে আনন্দে উৎফুল্প হইয়া উঠিয়া বলিল, “এ যে হৈমবর্তী ”ি নিজের অথবা পরের স্ত্রীকে দেখিয়া এত প্রেম তাহার চক্ষে ইতিপূর্বে কখনো প্রকাশ পায় নাই। মনে হইল, মূর্তিমতী মুক্তি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত। আর-একটি লোক মুখের উপর শাল মুড়ি দিয়া অস্তরাল হইতে দেখিতেছিল। তাহার নাম মাখনলাল। একটি অপরিচিত নিরীহ ব্যক্তিকে নিজপদে অভিষিক্ত দেখিয়া সে এতক্ষণ পরম মুখামুভব করিতেছিল ; অবশেষে হৈমবতীকে উপস্থিত দেখিয়া বুঝিতে পারিল, উক্ত নিরপরাধী ব্যক্তি তাহার নিজের উীপতি ; তখন দয়াপরত হইয়া ধরে ঢুকিয়া বলিল, “ন, আপনার লোককে এমন বিপদে ফেলা মহাপাতক।” দুই স্ত্রীর প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কছিল, “এ আমারই দড়ি, আমারই কলসী।” মাখনলালের এই অসাধারণ মহত্ত্ব ও বীরত্বে পাড়ার লোক আশ্চর্য ठ्हेग्न ८शल। চৈত্র ১২৯৮