গল্পগুচ্ছ/রীতিমতো নভেল

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রীতিমতো নভেল প্রথম পরিচ্ছেদ ‘আল্লা হো আকবর’ শবে রণভূমি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। এক দিকে তিন লক্ষ যবনসেনা, অন্য দিকে তিন সহস্র আর্যসৈন্য । বন্যার মধ্যে একাকী অশ্বখবৃক্ষের মতো হিন্দুবীরগণ সমস্ত রাত্রি এবং সমস্ত দিন যুদ্ধ করিয়া অটল দাড়াইয়া ছিল, কিন্তু এইবার ভাঙিয়া পড়িবে তাহার লক্ষণ দেখা যাইতেছে। এবং সেইসঙ্গে ভারতের জয়ধ্বজ ভূমিসাং হইবে এবং আজিকার ওই অস্তাচলবর্তী সহস্ররশ্মির সহিত হিন্দুস্থানের গৌরবস্থর্য চিরদিনের মতে অস্তমিত হইবে । ‘হর হর বোম্ বোম্‌ ! পাঠক, বলিতে পার কে ওই দৃপ্ত যুবা পয়ত্রিশজন মাত্র অনুচর লইয়া মুক্ত অসি হস্তে অশ্বারোহণে ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর করনিক্ষিপ্ত দীপ্ত বজ্রের ন্যায় শত্রুসৈন্যের উপরে আসিয়া পতিত হইল ? বলিতে পার কাহার প্রতাপে এই অগণিত যবনসৈন্য প্রচণ্ড বাত্যাহত অরণ্যানীর ন্যায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল ? কাহার বজ্ৰমজিত ‘হর হর বোম বোম’ শব্দে তিনলক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের ‘আল্লা হে আকবর’ ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল ? কাহার উষ্ঠত অসির সম্মুখে ব্যাস্ত্ৰ-আক্রান্ত মেধযুথের স্তায় শত্রুসৈন্য মুহূর্তের মধ্যে উর্ধ্বশ্বাসে পলায়নপর হইল ? বলিতে পার সেদিনকার আর্যস্থানের সূর্যদেব সহস্ররক্তকরস্পশে কাহার রক্তাক্ত তরবারিকে আশীৰ্বাদ করিয়া অস্তাচলে বিশ্রাম করিতে গেলেন ? বলিতে পার কি পাঠক । ইনিই সেই ললিতসিংহ । কাঞ্চীর সেনাপতি। ভারত-ইতিহাসের ধ্রুবনক্ষত্র । দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ আজ কাঞ্চীনগরে কিসের এত উৎসব। পাঠক, জান কি। হর্ম্যশিখরে জয়ধ্বজ। কেন এত চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। কেবল কি বায়ুভরে না আনন্দভরে । স্বারে দ্বারে কদলীতরু ও মঙ্গলঘট, গৃহে গৃহে শঙ্খধ্বনি, পথে পথে দীপমালা। রীতিমতো নভেল )\లిపి পুরপ্রাচীরের উপর লোকে লোকারণ্য । নগরের , লোক কাহার জন্ত এমন উংস্থক হইয়া প্রতীক্ষা করিতেছে। সহসা পুরুষকণ্ঠের জয়ধ্বনি এবং বামাকণ্ঠের হুলুধ্বনি একত্র মিশ্রিত হইয়া অভ্র ভেদ করিয়া নির্নিমেষ নক্ষত্ৰলোকের দিকে উখিত হইল। নক্ষত্ৰশ্রেণী বায়ুব্যাহত দীপমালার স্কায় কঁাপিতে লাগিল । ওই-ষে প্ৰমত্ত তুরঙ্গমের উপর আরোহণ করিয়া বীরবর পুরস্কারে প্রবেশ করিতেছেন, উহাকে চিনিয়াছ কি । উনিই আমাদের সেই পূর্বপরিচিত ললিতসিংহ, কাঞ্চীর সেনাপতি । শত্রু নিধন করিয়া দ্বীয় প্রভু কাঞ্চীরাজপদতলে শত্রুরক্তাঙ্কিত খড়গ উপহার দিতে আসিয়াছেন । তাই এত উৎসব। কিন্তু, এত-যে জয়ধ্বনি, সেনাপতির সে দিকে কৰ্ণপাত নাই ; গবাক্ষ হইতে পুরললনাগণ এত-যে পুষ্পবৃষ্টি করিতেছেন, সে দিকে তাহার দৃকপাত নাই। অরণ্যপথ দিয়া যখন তৃষ্ণাতুর পথিক সরোবরের দিকে ধাবিত হয় তখন শুষ্ক পত্ররাশি তাহার মাথার উপর ঝরিতে থাকিলে তিনি কি ভ্ৰক্ষেপ করেন । অধীরচিত্ত ললিতসিংহের নিকট এই অজস্র সম্মান সেই শুষ্ক পত্রের ন্যায় নীরস লঘু ও অকিঞ্চিৎকর বলিয়া বোধ হইল । অবশেষে অশ্ব যখন অস্তঃপুরপ্রাসাদের সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইল তখন মুহূর্তের জন্য সেনাপতি র্তাহার বলগা আকর্ষণ করিলেন ; অশ্ব মুহূর্তের জন্য শুদ্ধ হইল ; মুহূর্তের জন্য ললিতসিংহ একবার প্রাসাদবাতায়নে তৃষিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন ; মুহূর্তের জন্য দেখিতে পাইলেন, দুইটি লজ্জানত নেত্র একবার চকিতের মতো তাহার মুখের উপর পড়িল এবং দুইটি অনিন্দিত বাস্থ হইতে একটি পুষ্পমালা খসিয়া তাহার সম্মুখে ভূতলে পতিত হইল। তৎক্ষণাৎ অশ্ব হইতে নামিয়া সেই মালা কিরীটচুড়ায় তুলিয়া লইলেন এবং আর-একবার কৃতাৰ্থ দৃষ্টিতে উর্ধ্বে চাহিলেন। তখন দ্বার রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে, দীপ নির্বাপিত। তৃতীয় পরিচ্ছেদ সহস্ৰ শত্রুর নিকট যে অবিচলিত দুইটি চকিত হরিণনেত্রের নিকট সে পরাভূত। সেনাপতি বহুকাল ধৈর্যকে পাষাণদুর্গের মতো হৃদয়ে রক্ষা করিয়া আসিয়াছেন, গতকল্য সন্ধ্যাকালে দুটি কালো চোখের সলঙ্গ সসন্ত্রম দৃষ্ট সেই দুর্গের ভিত্তিতে গিয়া আঘাত করিয়াছে এবং এতকালের ধৈর্ধ মুহূর্ডে ভূমিলাং ኃ ዓ• গল্পগুচ্ছ হইয়া গেছে। কিন্তু, ছি ছি, সেনাপতি, তাই বলিয়া কি সন্ধ্যার অন্ধকারে চোরের মতো রাজাস্তঃপুরের উদ্যানপ্রাচীর লঙ্ঘন করিতে হয় । তুমিই না ভুবনবিজয়ী বীরপুরুষ ! কিন্তু, যে উপন্যাস লেখে তাহার কোথাও বাধা নাই ; দ্বারীরা দ্বাররোধ করে না, অসুর্যম্পশুরূপা রমণীরাও আপত্তি প্রকাশ করে না, অতএব এই সুরম্য বসস্তসন্ধ্যায় দক্ষিণবায়ুীজিত রাজাস্তঃপুরের নিভৃত উদ্যানে একবার প্রবেশ করা যাক। হে পাঠিকা, তোমরাও আইস, এবং পাঠকগণ, ইচ্ছা করিলে তোমরাও অনুবতী হইতে পার— আমি অভয়দান করিতেছি । একবার চাহিয়া দেখো, বকুলতলের তৃণশয্যায় সন্ধ্যাতারার প্রতিমার মতো ওই রমণী কে। হে পাঠক, হে পাঠিকা, তোমরা উহাকে জান কি। আমন রূপ কোথাও দেখিয়াছ ? রূপের কি কখনো বর্ণনা করা যায়। ভাষা কি কখনো কোনো মতবলে এমন জীবন যৌবন এবং লাবণ্যে ভরিয়া উঠিতে পারে। হে পাঠক, তোমার যদি দ্বিতীয় পক্ষের বিবাহ হয় তবে স্ত্রীর মুখ স্মরণ করে। হে রূপসী পাঠিক, যে যুবতীকে দেখিয়া তুমি সঙ্গিনীকে বলিয়াছ 'ইহাকে কী এমন ভালো দেখিতে, ভাই। হউক সুন্দরী, কিন্তু ভাই, তেমন শ্ৰী নাই – তাহার মুখ মনে করে, ওই তরুতলবতিনী রাজকুমারীর সহিত তাহার কিঞ্চিং সাদৃশু উপলব্ধি করিবে। পাঠক এবং পাঠিকা, এবার চিনিলে কি । উনিই রাজকন্ত বিদ্যুন্মালা । রাজকুমারী কোলের উপর ফুল রাখিয়া নতমুখে মালা গাঁথিতেছেন, সহচরী কেহই নাই। গথিতে গাঁথিতে এক-একবার অঙ্গুলি আপনার সুকুমার কার্যে শৈথিল করিতেছে ; উদাসীন দৃষ্টি কোন এক অতিদুরবর্তী চিস্তারাজ্যে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইতেছে। রাজকুমারী কী ভাবিতেছেন । কিন্তু, হে পাঠক, সে প্রশ্নের উত্তর আমি দিব না। কুমারীর নিভৃত হৃদয়মন্দিরের মধ্যে আজি এই নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় কোন মর্তদেবতার আরতি হইতেছে, অপবিত্র কৌতুহল লইয়া সেখানে প্রবেশ করিতে পারিব না। ওই দেখো, একটি দীর্ঘনিশ্বাস পূজার স্বগন্ধি ধূপধুমের ন্যায় সন্ধ্যার বাতাসে মিশাইয়া গেল এবং দুইফোটা অশ্রুঞ্জল দুটি স্বকোমল কুমুমকোরকের মতো অজ্ঞাত দেবতার চরণের উদ্দেশে খসিয়া পড়িল । রীতিমতো নভেল ১৭১ এমন সময় পশ্চাৎ হইতে একটি পুরুষের কণ্ঠ গভীর আবেগ-ভরে কম্পিত রুদ্ধ স্বরে বলিয়া উঠিল, “রাজকুমারী !” রাজকন্যা সহসা ভয়ে চীৎকার করিয়া উঠিলেন। চারি দিক হইতে প্রহরী ছুটিয়া আসিয়া অপরাধীকে বন্দী করিল। রাজকন্যা তখন পুনরায় সসংজ্ঞ হইয়া দেখিলেন, সেনাপতি বন্দী হইয়াছেন । চতুর্থ পরিচ্ছেদ এ অপরাধে প্রাণদওই বিধান । কিন্তু পূর্বোপকার স্মরণ করিয়া রাজা র্তাহাকে নির্বাসিত করিয়া দিলেন । সেনাপতি মনে-মনে কছিলেন, “দেবী, তোমার নেত্রও যখন প্রতারণা করিতে পারে তখন সত্য পৃথিবীতে কোথাও নাই । আজ হইতে আমি মানবের শত্রু।” একটি বৃহৎ দম্যদলের অধিপতি হইয়া ললিতসিংহ অরণ্যে বাস করিতে লাগিলেন । হে পাঠক, তোমার আমার মতো লোক এইরূপ ঘটনায় কী করিত । নিশ্চয় যেখানে নির্বাসিত হইত সেখানে আর-একটা চাকরির চেষ্টা দেখিত, কিম্ব একটা নূতন খবরের কাগজ বাহির করিত। কিছু কষ্ট হইত সন্দেহ নাই— সে অন্নাভাবে । কিন্তু, সেনাপতির মতো মহৎ লোক, যাহারা উপন্যাসে সুলভ এবং পৃথিবীতে দুর্লভ, তাহারা চাকরিও করে না, খবরের কাগজও চালায় না। তাহারা যখন সুখে থাকে তখন এক নিশ্বাসে নিখিল জগতের উপকার করে এবং মনোবাঞ্ছা তিলমাত্র ব্যর্থ হইলেই আরক্তলোচনে বলে, “রাক্ষসী পৃথিবী, পিশাচ সমাজ, তোদের বুকে পা দিয়া আমি ইহার প্রতিশোধ লইব ।” বলিয়া তৎক্ষণাং দস্থ্যব্যবসায় আরম্ভ করে। এইরূপ ইংরাজি কাব্যে পড়া যায় এবং অবশ্যই এ প্রথা রাজপুতদের মধ্যে প্রচলিত ছিল । দস্থ্যর উপদ্রবে দেশের লোক ত্রস্ত হইয়া উঠিল । কিন্তু, এই অসামান্য দস্থ্যরা অনাথের সহায়, দরিত্রের বন্ধু, দুর্বলের আশ্রয় ; কেবল, ধনী উচ্চকুলজাত সন্ত্রান্ত ব্যক্তি এবং রাজকর্মচারীদের পক্ষে কালাস্তক যম । ঘোর অরণ্য, স্বর্য অস্তপ্রায় । কিন্তু, বনচ্ছায়ায় অকালরাত্রির আবির্ভাব হইয়াছে। তরুণ যুবক অপরিচিত পথে একাকী চলিতেছে। মুকুমার শরীর >१२ গল্পগুচ্ছ পথশ্রমে ক্লাস্ত, কিন্তু তথাপি অধ্যবসায়ের বিরাম নাই । কটিদেশে যে তরবারি বন্ধ রহিয়াছে, তাহারই ভার দুঃসহ বোধ হইতেছে । অরণ্যে লেশমাত্র শব্দ হইলেই ভয়প্রবণ হৃদয় হরিণের মতো চকিত হইয়া উঠিতেছে। কিন্তু, তথাপি এই আসন্ন রাত্রি এবং অজ্ঞাত অরণ্যের মধ্যে দৃঢ় সংকল্পের সহিত অগ্রসর হইতেছে। দস্থ্যরা আসিয়া দস্থ্যপতিকে সংবাদ দিল, “মহারাজ, বৃহৎ শিকার মিলিয়াছে। মাথায় মুকুট, রাজবেশ, কটিদেশে তরবারি।” দস্থ্যপতি কহিলেন, “তবে এ শিকার আমার ! তোরা এখানেই থাক।” পথিক চলিতে চলিতে সহসা একবার শুষ্ক পত্রের খসখস্ শব্দ শুনিতে পাইল । উৎকণ্ঠিত হইয়া চারি দিকে চাহিয়া দেখিল । সহসা বুকের মাঝখানে তীর আসিয়া বিধিল, পান্থ ’মা’ বলিয়া ভূতলে পড়িয়া গেল । দস্থ্যপতি নিকটে আসিয়া জামু পাতিয়া নত হইয়া আহতের মুখের দিকে নিরীক্ষণ করিলেন। ভূতলশায়ী পথিক দস্থ্যর হাত ধরিয়া কেবল একবার মৃদুস্বরে কহিল, “ললিত !” মুহূর্তে দস্থ্যর হৃদয় যেন সহস্র খণ্ডে ভাঙিয়া এক চীৎকারশব্দ বাহির হইল, “রাজকুমারী !” দস্যরা আসিয়া দেখিল, শিকার এবং শিকারী উভয়েই অস্তিম আলিঙ্গনে বদ্ধ হইয়া মৃত পড়িয়া আছে । রাজকুমারী একদিন সন্ধ্যাকালে তাহার অন্তঃপুরের উস্তানে অজ্ঞানে ললিতের উপর রাজদও নিক্ষেপ করিয়াছিলেন, ললিত আর-একদিন সন্ধ্যাকালে অরণ্যের মধ্যে অজ্ঞানে রাজকন্যার প্রতি শর নিক্ষেপ করিল। সংসারের বাহিরে যদি কোথাও মিলন হইয়া থাকে তো জাজ উভয়ের অপরাধ উভয়ে kৰাধ করি মার্জনা করিয়াছে । ভাদ্র-আশ্বিন ১২৯৯