গল্পগুচ্ছ/শাস্তি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

২৬e গল্পগুচ্ছ কিন্তু, যাহার বিশ্বাস নাই, যে ভীরু এ সৌন্দর্যরসাস্বাদনের জন্যও এক ইঞ্চি পরিমাণ অসম্ভবকে লঙ্ঘন করিতে পরাবুর্থ হয় তাহার কাছে কোনো-কিছুর আর তার পরে’ নাই, সমস্তই হঠাৎ অসময়ে এক অসমাপ্তিতে সমাপ্ত হইয় গেছে। ছেলেবেলায় সাত সমুদ্র পার হইয়া, মৃত্যুকে লঙ্ঘন করিয়া, গল্পের যেখানে যথার্থ বিরাম সেখানে স্নেহময় সুমিষ্ট স্বরে শুনিতাম— আমার কথাটি ফুরোল, নোটে গাছটি মুড়োল। এখন বয়স হইয়াছে, এখন গল্পের ঠিক মাঝখানটাতে হঠাৎ থামিয়া গিয়া একটা নিষ্ঠুর কঠিন কণ্ঠে শুনিতে পাই— আমার কথাটি ফুরোল না, নোটে গাছটি মুড়োল না। কেন রে নোটে মুড়োলি নে কেন। তোর গরুতে— দূর হউক গে, ওই নিরীহ প্রাণীটির নাম করিয়া কাজ নাই। আবার কে কোন দিক হইতে গায়ে পাতিয়া লইবে। আষাঢ় >> • * শাস্তি প্রথম পরিচ্ছেদ দুখিরাম রুই এবং ছিদাম রুই দুই ভাই সকালে যখন দা হাতে লইয়া জন খাটিতে বাহির হইল তখন তাহাদের দুই স্ত্রীর মধ্যে বকা বকি চেঁচামেচি চলিতেছে। কিন্তু, প্রকৃতির অন্যান্য নানাবিধ নিত্যকলরবের স্থায় এই কলহকোলাহলও পাড়ামুদ্ধ লোকের অভ্যাস হইয়া গেছে । তীব্র কণ্ঠস্বর শুনিবামাত্র লোকে পরস্পরকে বলে, “ওই রে, বাধিয়া গিয়াছে।” অর্থাৎ, যেমনটি আশা করা যায়ু ঠিক তেমনিটি ঘটিয়াছে, আজও স্বভাবের নিয়মের কোনোরূপ ব্যত্যয় হয় নাই। প্রভাতে পূর্বদিকে স্বর্য উঠিলে যেমন কেহ তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ নির্ণয়ের জন্তু কাহারও কোনরূপ কৌতুহলের উদ্রেক হয় না । * অবশু এই কোন্দল-আন্দোলন প্রতিবেশীদের অপেক্ষ দুই স্বামীকে বেশি ম্পর্শ করিত সন্দেহ নাই, কিন্তু সেটা তাহার কোনোরূপ অস্ববিধার মধ্যে গণ্য করিত না । তাহারা দুই ভাই যেন দীর্ঘ সংসারপথ একটা একাগাড়িতে করিয়া চলিয়াছে, দুই দিকের দুই স্প্রিংবিহীন চাকার অবিশ্রাম ছড় ছড়, খড় খড়, শব্দটাকে জীবনরথযাত্রার একটা বিধিবিহিত নিয়মের মধ্যেই ধরিয়া লইয়াছে। বরঞ্চ ধরে যে দিন কোনো শব্দমাত্র নাই, সমস্ত থমথম ছমছম করিতেছে, সে দিন একটা আসন্ন অনৈসর্গিক উপদ্রবের আশঙ্কা জন্মিত, সে দিন যে কখন কী হইবে তাহ কেহ হিসাব করিয়া বলিতে পারিত না । - আমাদের গল্পের ঘটনা ষে দিন আরম্ভ হইল সে দিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে দুই ভাই যখন জন খাটিয়া প্রাস্তদেহে ঘরে ফিরিয়া আসিল তখন দেখিল গুৰু গৃহ গমৃগম করিতেছে। ২৬২ গল্পগুচ্ছ বাহিরেও অত্যস্ত গুমট। দুই-প্রহরের সময় খুব এক-পশলা বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। এখনও চারি দিকে মেঘ জমিয়া আছে। বাতাসের লেশমাত্র নাই । বর্ষায় ঘরের চারি দিকে জঙ্গল এবং আগাছাগুলা অভ্যস্ত বাড়িয়া উঠিয়াছে, সেখান হইতে এবং জলমগ্ন পাটের থেত হইতে সিক্ত উদ্ভিজ্জের ঘন গন্ধবাষ্প চতুর্দিকে একটি নিশ্চল প্রাচীরের মতো জমাট হইয়া দাড়াইয়া আছে। গোয়ালের পশ্চাদবর্তী ডোবার মধ্য হইতে ভেক ডাকিতেছে এবং ঝিল্লিরবে সন্ধ্যার নিস্তব্ধ আকাশ একেবারে পরিপূর্ণ। অদূরে বর্ষার পদ্মা নবমেঘচ্ছায়ায় বড়ো স্থির ভয়ংকর ভাব ধারণ করিয়া চলিয়াছে । শস্তক্ষেত্রের অধিকাংশই ভাঙিয়া লোকালয়ের কাছাকাছি আসিয়া পড়িয়াছে। এমন-কি ভাঙনের ধারে দুই-চারিটা আম-কঁঠাল গাছের শিকড় বাহির হইয়া দেখা দিয়াছে, যেন তাহাদের নিরুপায় মুষ্টির প্রসারিত অঙ্গুলিগুলি শূন্যে একটা-কিছু অস্তিম অবলম্বন আঁকড়াইয়া ধরিবার চেষ্টা করিতেছে। দুখিরাম এবং ছিদাম সেদিন জমিদারের কাছারি-ঘরে কাজ করিতে গিয়াছিল । ও পারের চরে জলিধান পাকিয়াছে । বর্ষায় চর ভাসিয়া যাইবার পূর্বেই ধান কাটিয়া লইবার জন্য দেশের দরিদ্র লোক মাত্রেই কেহ বা নিজের খেতে কেহ বা পাট খাটিতে নিযুক্ত হইয়াছে ; কেবল, কাছারি হইতে পেয়াদা আসিয়া এই দুই ভাইকে জবৰ্দস্তি করিয়া ধরিয়া লইয়া গেল। কাছারি-ঘরে চাল ভেদ করিয়া স্থানে স্থানে জল পড়িতেছিল, তাহাই সারিয়া দিতে এবং গোটাকতক বীপ নির্মাণ করিতে তাহারা সমস্ত দিন খাটিয়াছে। বাড়ি আসিতে পায় নাই, কাছারি হইতেই কিঞ্চিং জলপান খাইয়াছে। মধ্যে মধ্যে বৃষ্টিতেও ভিজিতে হইয়াছে— উচিতমতো পাওনা মজুরি পায় নাই, এবং তাহার পরিবর্তে যে-সকল অন্যায় কটু কথা শুনিতে হইয়াছে সে তাহাদের পাওনার অনেক অতিরিক্ত । পথের কাদা এবং জল ভাঙিয়া সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া দুই ভাই দেখিল, ছোটো জা চন্দরা ভূমিতে অঞ্চল পাতিয়া চুপ করিয়া পড়িয়া আছে— আজিকার এই মেঘলা দিনের মতো সেও মধ্যাহ্নে প্রচুর অশ্র-বর্ষণপূর্বক সায়াহ্নের কাছাকাছি ক্ষাস্ত দিয়া অত্যন্ত গুমট করিয়া আছে; আর বড়ো জা শাস্তি ২৬৩ রাধা মুখটা মস্ত করিয়া দাওয়ায় বসিয়া ছিল ; তাহার দেড় বৎসরের ছোটো ছেলেটি কাদিতেছিল, দুই ভাই যখন প্রবেশ করিল দেখিল, উলঙ্গ শিশু প্রাঙ্গণের এক পার্শ্বে চিৎ হইয়া পড়িয়া ঘুমাইয়া আছে। ক্ষুধিত দুখিরাম আর কালবিলম্ব না করিয়া বলিল, “ভাত দে।” বড়োবউ বারুদের বস্তায় স্ফুলিঙ্গপাতের মতো এক মুহূর্তেই তীব্র কণ্ঠস্বর আকাশ পরিমাণ করিয়া বলিয়া উঠিল, “ভাত কোথায় যে ভাত দিব । তুই কি চাল দিয়া গিয়াছিলি । আমি কি নিজে রোজগার করিয়া আনিব ।” সারাদিনের প্রাস্তি ও লাঞ্ছনার পর অন্নহীন নিরানন্দ অন্ধকার ঘরে, প্ৰজলিত ক্ষুধানলে, গৃহিণীর রুক্ষ বচন, বিশেষত শেষ কথাটার গোপন কুৎসিত শ্লেষ দুখিরামের হঠাৎ কেমন একেবারেই অসহ হইয়া উঠিল। ক্রুদ্ধ ব্যাস্ত্রের স্থায় গম্ভীর গর্জনে বলিয়া উঠিল, "কী বললি ।” বলিয়া মুহূর্ডের মধ্যে দা লইয়া কিছু না ভাবিয়া একেবারে স্ত্রীর মাথায় বসাইয়া দিল । রাধা তাহার ছোটো জায়ের কোলের কাছে পড়িয়া গেল এবং মৃত্যু হইতে মুহূর্ত বিলম্ব হইল না । BBBS BBBB BB SB DD BBS BBB BBBB BBB DDDS ছিদাম তাহার মুখ চাপিয়া ধরিল । দুখিরাম দা ফেলিয়া মুখে হাত দিয়া হতবুদ্ধির মতো ভূমিতে বসিয়া পড়িল । ছেলেটা জাগিয়া উঠিয়া ভয়ে চীৎকার করিয়া কাদিতে লাগিল । বাহিরে তখন পরিপূর্ণ শাস্তি। রাখালবালক গোরু লইয়া গ্রামে ফিরিয়া আসিতেছে। পরপারের চরে যাহারা নূতনপক ধান কাটিতে গিয়াছিল তাহারা পাঁচ-সাতজনে এক-একটি ছোটো নৌকায় এ পারে ফিরিয়া পরিশ্রমের পুরস্কার দুই-চারি অঁাটি ধান মাথায় লইয়া প্রায় সকলেই নিজ নিজ ঘরে জাসিয়া পৌছিয়াছে। চক্রবর্তীদের বাড়ির রামলোচন খুড়ো গ্রামের ডাকঘরে চিঠি দিয় ঘরে ফিরিয়া নিশ্চিন্তমনে চুপচাপ তামাক খাইতেছিলেন। হঠাৎ মনে পড়িল, র্তাহার কোর্ফ প্রজা দুখির অনেক টাকা খাজনা বাকি ; আজ কিয়দংশ শোধ করিবে প্রতিশ্রুত হইয়াছিল। এতক্ষণে তাহারা বাড়ি ফিরিয়াছে স্থির করিয়ু, চাদরট। কাধে ফেলিয়, ছাতা লইয়া বাহির হইলেন । ২৬৪ গল্পগুচ্ছ কুরিদের বাড়িতে ঢুকিয় তাহার গা ছম্ ছন্ন করিয়া উঠিল। দেখিলেন, ঘরে প্রদীপ জ্বালা হয় নাই। অন্ধকার দাওয়ায় দুই-চারিট অন্ধকার মূর্তি অস্পষ্ট দেথা যাইতেছে। রহিয়া রহিয়া দাওয়ার এক কোণ হইতে একটা অক্ষুট রোদন উচ্ছসিত হইয়া উঠিতেছে— এবং ছেলেটা যত মা মা’ বলিয়া কাদিয়া উঠিতে চেষ্টা করিতেছে ছিদাম তাহার মুখ চাপিয়া ধরিতেছে। রামলোচন কিছু ভীত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “দুখি, আছিল নাকি।” দুখি এতক্ষণ প্রস্তরমূর্তির মতো নিশ্চল হইয়া বসিয়া ছিল, তাহার নাম ধরিয়া ডাকিবা মাত্র একেবারে অবোধ বালকের মতো উচ্ছ্বসিত হইয়া কাদিয়া উঠিল । ছিদাম তাড়াতাড়ি দাওয়া হইতে অঙ্গনে নামিয়া চক্রবর্তীর নিকটে আসিল। চক্রবর্তী জিজ্ঞাসা করিলেন, "মাগীরা বুঝি ঝগড়া করিয়া বসিয়া আছে ? আজ তো সমস্ত দিনই চীৎকার শুনিয়াছি।” এতক্ষণ ছিদাম কিংকর্তব্য কিছুই ভাবিয়া উঠিতে পারে নাই। নানা অসম্ভব গল্প তাহার মাথায় উঠতেছিল। আপাতত স্থির করিয়াছিল, রাত্রি কিঞ্চিং অধিক হইলে মৃতদেহ কোথাও সরাইয়া ফেলিবে । ইতিমধ্যে যে চক্রবর্তী আসিয়া উপস্থিত হইবে, এ সে মনেও করে নাই। ফসূ করিয়া কোনো উত্তর জোগাইল না। বলিয়া ফেলিল, “ই, আজ খুব ঝগড়া হইয়া গিয়াছে।” চক্রবর্তী দাওয়ার দিকে অগ্রসর হইবার উপক্রম করিয়া বলিল, “কিন্তু, সেজন্য দুখি কঁাদে কেন রে ।” ছিদাম দেখিল, আর রক্ষা হয় না ; হঠাৎ বলিয়া ফেলিল, “ঝগড়া করিয়া ছোটোবউ বড়োবউয়ের মাথায় এক দায়ের কোপ বসাইয়া দিয়াছে।” উপস্থিত বিপদ ছাড়া যে আর-কোনো বিপদ থাকিতে পারে, এ কথা সহজে মনে হয় না । ছিদাম তখন ভাবিতেছিল, ‘ভীষণ সত্যের হাত হইতে কী করিয়া রক্ষা পাইব । মিথ্যা ষে তদপেক্ষা ভীষণ হইতে পারে তাহ তাহার জ্ঞান হইল না। রামলোচনের প্রশ্ন শুনিবামাত্র তাহার মাথায় তৎক্ষণাৎ একটা উত্তর জোগাইল এবং তৎক্ষণাৎ বলিয়া ফেলিল । রামলোচন চমকিয়া উঠিয়া কহিল, "ম্যা ! বলিস কী ! মরে নাই তো ।” শাক্তি ఫిet ছিদাম কহিল, "মরিয়াছে।” বলিয়া চক্রবর্তীর পা জড়াইয়া ধরিল। চক্রবর্তী পালাষ্টবার পথ পায় না। ভাবিল, ‘রাম রাম ! সন্ধ্যাবেলায় এ কী বিপদেই পড়িলাম। আদালতে সাক্ষ্য দিতে দিতেই প্রাণ বাহির হইয়া পড়িবে। ছিদাম কিছুতেই তাহার পা ছাড়িল না ; কহিল, "দাদাঠাকুর, এখন আমার বউকে বাচাইবার কী উপায় করি।” মামলা-মোকদ্দমার পরামর্শে রামলোচন সমস্ত গ্রামের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন । তিনি একটু ভাবিয়া বলিলেন, “দেখ, ইহার এক উপায় আছে। তুই এখনই খানায় ছুটিয়া যা– বল্ গে, তোর বড়ো ভাই দুখি সন্ধ্যাবেলায় ঘরে আসিয়া ভাত চাহিয়াছিল, ভাত প্রস্তুত ছিল না বলিয়া স্ত্রীর মাথায়ু দা বসাইয়া দিয়াছে। আমি নিশ্চয় বলিতেছি, এ কথা বলিলে ছুড়িটা বাচিয়া যাইবে।” ছিদামের কণ্ঠ শুষ্ক হইয়া আসিল ; উঠিয়া কহিল, "ঠাকুর, বউ গেলে বউ পাইব, কিন্তু আমার ভাই ফাসি গেলে আর তো ভাই পাইব না।” কিন্তু, যখন নিজের স্ত্রীর নামে দোষারোপ করিয়াছিল তখন এ-সকল কথা ভাবে নাই । তাড়াতাড়িতে একটা কাজ করিয়া ফেলিয়াছে, এখন অলক্ষিতভাবে মন আপনার পক্ষে যুক্তি এবং প্রবোধ সঞ্চয় করিতেছে । চক্রবর্তীও কথাটা যুক্তিসংগত বোধ করিলেন ; কহিলেন, “তবে যেমনটি ঘটিয়াছে তাই বলিস, সকল দিক রক্ষণ করা অসম্ভব ।” বলিয়া রামলোচন অবিলম্বে প্রস্থান করিল এবং দেখিতে দেথিতে গ্রামে রাষ্ট্র হইল যে, কুরিদের বাড়ির চন্দরা রাগারাগি করিয়া তাহার বড়ো জায়ের মাথায় দা বসাইয়া দিয়াছে। বাধ ভাঙিলে যেমন জল আসে গ্রামের মধ্যে তেমনি স্থস্থঃ শব্দে পুলিস আসিয়া পড়িল ; অপরাধী এবং নিরপরাধী সকলেই বিষম উদবিগ্ন হইয়া উঠিল । দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ছিদাম ভাবিল, যে পথ কাটিয়া ফেলিয়াছে সেই পথেই চলিতে হইবে। সে চক্রবর্তীর কাছে নিজমুখে এক কথা বলিয়া ফেলিয়াছে, সে কথা গম্বুদ্ধ রাষ্ট্র হইয়া পড়িয়াছে, এখন আবার আর-একটা কিছু প্রকাশ হইয়া পড়িলে কী ২৬৬ গল্পগুচ্ছ জানি কী হইতে কী হইয়া পড়িবে সে নিজেই কিছু ভাবিয়া পাইল না । মনে করিল, কোনোমতে সে কথাটা রক্ষা করিয়া তাহার সহিত আর পাচটা গল্প জুড়িয়া স্ত্র কে রক্ষা করা ছাড়া আর কোনো পথ নাই । ছিদাম তাহার স্ত্রী চন্দরাকে অপরাধ নিজ স্কন্ধে লইবার জন্য অনুরোধ করিল। সে তো একেবারে বজ্ৰাহত হইয়া গেল। ছিদাম তাহাকে আশ্বাস দিয়া কহিল, “যাহা বলিতেছি তাই করু, তোর কোনো ভয় নাই, আমরা তোকে বঁাচাইয়া দিব ।” আশ্বাস দিল বটে কিন্তু গলা শুকাইল, মুখ পাংশুবর্ণ হইয়া গেল। চন্দরার বয়স সতেরো-আঠারোর অধিক হইবে না। মুখখানি হৃষ্টপুষ্ট গোলগাল ; শরীরটি অনতিদীর্ঘ, আঁটপাট ; সুস্থসবল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে এমন একটি সৌষ্ঠব আছে যে চলিতে-ফিরিতে নড়িতে-চড়িতে দেহের কোথাও যেন কিছু বাধে না । একখানি নূতন-তৈরি নৌকার মতো ; বেশ ছোটো এবং সুডোল, অত্যন্ত সহজে সরে এবং তাহার কোথাও কোনো গ্রন্থি শিথিল হইয়া যায় নাই। পৃথিবীর সকল বিষয়েই তাহার একটা কৌতুক এবং কৌতুহল আছে ; পাড়ায় গল্প করিতে যাইতে ভালোবাসে, এবং কুম্ভ কক্ষে ঘাটে যাইতে-আসিতে দুই অঙ্গুলি দিয়া ঘোমটা ঈষৎ ফাক করিয়া উজ্জল চঞ্চল ঘনকৃষ্ণ চোখ দুটি দিয়া পথের মধ্যে দর্শনযোগ্য যাহা-কিছু সমস্ত দেখিয়া काभ्रे ! বড়োবউ ছিল ঠিক ইহার উণ্টা ; অত্যন্ত এলোমেলো, ঢিলেঢালা, অগোছালো । মাথার কাপড়, কোলের শিশু, ঘরকল্পার কাজ কিছুই সে সামলাইতে পারিত না । হাতে বিশেষ একটা কিছু কাজও নাই, অথচ কোনো কালে যেন সে অবসর করিয়া উঠিতে পারে না । ছোটো জা তাহাকে অধিক কিছু কথা বলিত না, মৃদু স্বরে দুই-একটা তীক্ষু দংশন করিত, আর সে হাউ-হাউ দাউ-দাউ করিয়া রাগিয়া-মাগিয়া বকিয়া-ঝকিয়া সারা হইত এবং পাড়ামৃদ্ধ অস্থির করিয়া তুলিত । এই দুই জুড়ি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও স্বভাবের একটা আশ্চর্য ঐক্য ছিল । দুখিরাম মানুষটা কিছু বৃহদায়তনের— হাড়গুলা খুব চওড়া, নাসিকা খর্ব, দুটি চক্ষু এই দৃশুমান সংসারকে যেন ভালো করিয়া বোঝে না, অথচ ইহাকে শাস্তি ३७१ কোনোরূপ প্রশ্ন করিতেও চায় না । এমন নিরীহ অথচ ভীষণ, এমন সবল অথচ নিরুপায় মানুষ অতি দুর্লভ। আর ছিদামকে একখানি চকচকে কালো পাথরে কে যেন বহু স্বত্বে কুঁদিয়া গড়িয়া তুলিয়াছে। লেশমাত্র বাহুল্য-বজিত এবং কোথাও যেন কিছু টোল খায় নাই। প্রত্যেক অঙ্গটি বলের সহিত নৈপুণ্যের সহিত মিশিয়া অত্যস্ত সম্পূর্ণতা লাভ করিয়াছে। নদীর উচ্চ পাড় হইতে লাফাইয়া পডুক, লগি দিয়া নৌকা ঠেলুক, বশিগাছে চড়িয়া বাছিয়া বাছিয়া কঞ্চি কাটিয়া আহুক, সকল কাজেই তাহার একটি পরিমিত পারিপাট্য, একটি অবলীলাকৃত শোভা প্রকাশ পায়। বড়ো বড়ো কালো চুপ তেল দিয়া কপাল হইতে বত্বে আঁচড়াইয়া তুলিয়া কাধে আনিয়া ফেলিয়াছে— বেশভূষা সাজসজ্জায় বিলক্ষণ একটু যত্ব श्रॉ८छ् । অপরাপর গ্রামবধুদিগের সৌন্দর্যের প্রতি যদিও তাহার উদাসীন দৃষ্টি ছিল না, এবং তাহদের চক্ষে আপনাকে মনোরম করিয়া তুলিবার ইচ্ছাও তাহার যথেষ্ট ছিল— তবু ছিদাম তাহার যুবতী স্ত্রীকে একটু বিশেষ ভালোবাসিত। উভয়ে ঝগড়াও হইত, ভাবও হইত, কেহ কাহাকেও পরাস্ত করিতে পারিত না। আর-একটি কারণে উভয়ের মধ্যে বন্ধন কিছু হুদূঢ় ছিল। ছিদাম মনে করিত, চন্দরা যেরূপ চটুল চঞ্চল প্রকৃতির স্ত্রীলোক তাহাকে যথেষ্ট বিশ্বাস নাই ; আর চন্দরা মনে করিত, আমার স্বামীটির চতুর্দিকেই দৃষ্টি, তাহাকে কিছু কষাকষি করিয়া না বাধিলে কোনদিন হাতছাড়া হইতে আটক নাই । উপস্থিত ঘটনা ঘটিবার কিছুকাল পূর্বে হইতে স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে ভারি একটা গোলযোগ চলিতেছিল । চন্দরা দেখিয়াছিল, তাহার স্বামী কাজের ওজর করিয়া মাঝে মাঝে দূরে চলিয়া যায়, এমন-কি দুই-একদিন অতীত করিয়া জাসে, অথচ কিছু উপার্জন করিয়া আনে না। লক্ষণ মন দেখিয়া সেও কিছু বাড়াবাড়ি দেখাইতে লাগিল। যখন-তখন ঘাটে যাইতে আরম্ভ করিল এবং পাড়া পর্যটন করিয়া আসিয়া কাশী মজুমদারের মেজো ছেলেটির প্রচুর ব্যাখ্যা করিতে লাগিল । ছিদামের দিন এবং রাত্রিগুলির মধ্যে কে ধেন বিষ মিশাইয়া দিল । কাজে কর্মে কোথাও এক দণ্ড গিয়া স্বস্থির হইতে পারে না। একদিন ভাজকে "לג ২৬৮ গল্পগুচ্ছ আসিয়া ভারি ভৎসনা করিল। সে হাত নাড়িয়া ঝংকার দিয়া অনুপস্থিত মৃত পিতাকে সম্বোধন করিয়া বলিল, “ও মেয়ে ঝড়ের আগে ছোটে, উহাকে আমি সামলাইব ! আমি জানি, ও কোনদিন কী সর্বনাশ করিয়া বসিবে ।” চন্দরা পাশের ঘর হইতে আসিয়া আস্তে আস্তে কহিল, “কেন দিদি, তোমার এত ভয় কিসের ” এই তো দুই জায়ে বিষম দ্বন্দ্ব বাধিয়া গেল । ছিদাম চোখ পাকাইয়া বলিল, "এবার যদি কখনো শুনি তুই একলা ঘাটে গিয়াছিস, তোর হাড় গুড়াইয়া দিব ।” চন্দরা বলিল, “তাহা হইলে তো হাড় জুড়ায়।” বলিয়৷ তৎক্ষণাৎ বাহিরে যাইবার উপক্রম করিল। ছিদাম এক লম্ফে তাহার চুল ধরিয়া টানিয়া ঘরে পুরিয়া বাহির হইতে দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিল । কর্মস্থান হইতে সন্ধ্যাবেলায় ফিরিয়া আসিয়া দেখে ঘর খোলা, ঘরে কেহ নাই । চন্দর তিনটে গ্রাম ছাড়াইয়া একেবারে তাহার মামার বাড়ি গিয়া উপস্থিত হইয়াছে । ছিদাম সেখান হইতে বহু কষ্টে অনেক সাধ্যসাধনায় তাহাকে ঘরে ফিরাইয়া আনিল, কিন্তু এবার পরাস্ত মানিল । দেখিল, এক-অঞ্জলি পারদকে মুষ্টির মধ্যে শক্ত করিয়া ধরা যেমন দুঃসাধ্য এই মুষ্টিমেয় স্ত্রীটুকুকেও কঠিন করিয়া ধরিয়া রাখা তেমনি অসম্ভব— ও যেন দশ আঙুলের ফাক দিয়া বাহির হইয়া পড়ে । আর-কোনো জবৰ্দ্দস্তি করিল না, কিন্তু বড়ে অশাস্তিতে বাস করিতে লাগিল । তাহার এই চঞ্চল যুবতী স্ত্রীর প্রতি সদাশঙ্কিত ভালোবাসা উগ্র একটা বেদনার মতো বিষম টনটনে হইয়া উঠিল । এমন-কি, এক-একবার মনে হইত, এ যদি মরিয়া যায় তবে আমি নিশ্চিন্ত হইয়া একটুখানি শাস্তিলাভ করিতে পারি। মানুষের উপরে মাচুষের যতটা ঈর্ষ হয় যমের উপরে এতট। न:श् । এমন সময়ে ঘরে সেই বিপদ ঘটিল। চন্দরাকে যখন তাহার স্বামী খুন স্বীকার করিয়া লইতে কহিল সে স্তম্ভিত হইয়া চাহিয়া রহিল ; তাহার কালো দুটি চক্ষু কালো অগ্নির স্থায় শাস্তি ২৬৯ নীরবে তাহার স্বামীকে দগ্ধ করিতে লাগিল । তাহার সমস্ত শরীর মন যেন ক্রমেই সংকুচিত হইয়া স্বামীরাক্ষসের হাত হইতে বাহির হইয়া আসিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। তাহার সমস্ত অন্তরাত্মা একাস্ত বিমুখ হইয়া लैंॉफ़ाईल । ছিদাম আশ্বাস দিল, “তোমার কিছু ভয় নাই।” বলিয়া পুলিসের কাছে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কী বলিতে হইবে বারবার শিখাইয়া দিল । চন্দর সে-সমস্ত দীর্ঘ কাহিনী কিছুই শুনিল না, কাঠের মূর্তি হইয়া বসিয়া রহিল। সমস্ত কাজেই ছিদামের উপর দুখিরামের একমাত্র নির্ভর । ছিদাম যখন চন্দরার উপর দোষারোপ করিতে বলিল দুখি বলিল, “তাহা হইলে বউমার কী হইবে।” ছিদাম কহিল, “উহাকে অ।মি বঁাচাইয়া দিব।” বৃহৎকায় দুখিরাম নিশ্চিস্ত श्ल । তৃতীয় পরিচ্ছেদ ছিদাম তাহার স্ত্রীকে শিখাইয়া দিয়াছিল যে, “তুই বলিস, বড়ো জা আমাকে বঁটি লইয়া মারিতে আসিয়াছিল, আমি তাহাকে দা লইয়া ঠেকাইতে গিয়া হঠাৎ কেমন করিয়া লাগিয়া গিয়াছে।” এ-সমস্তই রামলোচনের রচিত । ইহার অমুকুলে যে যে অলংকার এবং প্রমাণ-প্রয়োগের আবশ্বক তাহাও সে বিস্তারিতভাবে ছিদামকে শিখাইয়াছিল । পুলিস আসিয়া তদন্ত করিতে লাগিল। চন্দরাই যে তাহার বড়ো জাকে খুন করিয়াছে গ্রামের সকল লোকের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে। সকল সাক্ষীর দ্বারাই সেইরূপ প্রমাণ হইল । পুলিশ যখন চন্দরাকে প্রশ্ন করিল চন্দরা কহিল, “ই, আমি খুন করিয়াছি।”

  • কেন খুন করিয়াছ।”
  • আমি তাহাকে দেখিতে পারিতাম না।”

“কোনো বচসা হইয়াছিল ?” “मा ।” “সে তোমাকে প্রথমে মায়িতে আসিয়াছিল ?” 는 গল্পগুচ্ছ “তোমার প্রতি কোনো অত্যাচার করিয়াছিল ?” " וה" এইরূপ উত্তর শুনিয়া সকলে অবাক হইয়া গেল । ছিদাম তো একেবারে অস্থির হইয়া উঠিল। কহিল, “উনি ঠিক কথা বলিতেছেন না । বড়োবউ প্রথমে—” দারোগ খুব এক তাড়া দিয়া তাহাকে থামাইয়া দিল । অবশেষে তাহাকে বিধিমতে জেরা করিয়া বার বার সেই একই উত্তর পাইল- বড়োবউয়ের দিক হইতে কোনোরূপ আক্রমণ চনারী কিছুতেই স্বীকার করিল भौ । এমন একগুঁয়ে মেয়েও তে দেখা যায় না । একেবারে প্রাণপণে ফাসিকাষ্ঠের দিকে ঝুঁকিয়ছে, কিছুতেই তাহাকে টানিয়া রাখা যায় না। এ কী নিদারুণ অভিমান । চন্দরা মনে মনে স্বামীকে বলিতেছে, ‘আমি তোমাকে ছাড়িয়া_আমার এই নবযৌবন লইয়া ফাসিকাঠকে বরণ করিলাম— আমার ইহজন্মের শেষবন্ধন তাহাব সহিত । বন্দিনী হইয়া চন্দরা, একটি নিরীহ ক্ষুদ্র চঞ্চল কৌতুকপ্রিয় গ্রামবধূ, চিরপরিচিত গ্রামের পথ দিয়া, বুথতলা দিয়া, হাটের মধ্য দিয়া, ঘাটের প্রাস্ত দিয়া, মজুমদারদের বাড়ির সম্মুখ দিয়া, পোস্টাপিস এবং ইস্কুল-ঘরের পাশ্ব দিয়া, সমস্ত পরিচিত লোকের চক্ষের উপর দিয়া, কলঙ্কের ছাপ লইয়া চিরকালের মতো গৃহ ছাড়িয়া চলিয়া গেল। এক-পাল ছেলে পিছন পিছন চলিল এবং গ্রামের মেয়েরা, তাহার সই-সাঙাতরা, কেহ ঘোমটার ফাক দিয়া, কেহ স্বারের প্রাস্ত হইতে, কেহ বা গাছের আড়ালে দাড়াইয়া, পুলিস-চালিত চন্দরাকে দেখিয়া লজ্জায় ঘৃণায় ভয়ে কণ্টকিত হইয়া উঠিল । § ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও চন্দরা দোষ স্বীকার করিল। এবং খুনের সময় বড়োবউ যে তাহার প্রতি কোনোরূপ অত্যাচার করিয়াছিল তাহ প্রকাশ रुझेल न! । কিন্তু, সেদিন ছিদাম সাক্ষ্যস্থলে আসিয়াই একেবারে কাদিয়া জোড়হন্তে কহিল, “দোহাই হুজুর, আমার স্ত্রীয় কোনো দোষ নাই ।” হাকিম ধমক দিয়া শাস্তি $ፃ » তাহার উচ্ছ্বাস নিবারণ করিয়া তাহাকে প্রশ্ন করিতে লাগিলেন, সে একে একে সত্য ঘটনা প্রকাশ করিল। হাকিম তাহার কথা বিশ্বাস করিলেন না। কারণ, প্রধান বিশ্বস্ত ভাসাক্ষী রামলোচন কহিল, “খুনের অনতিবিলম্বেই আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়াছিলাম। সাক্ষী ছিদাম আমার নিকট সমস্ত স্বীকার করিয়া আমার পা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, ‘বউকে কী করিয়া উদ্ধার করিব আমাকে যুক্তি দিন । আমি ভালো মন্দ কিছুই বলিলাম না। সাক্ষী আমাকে বলিল, ‘আমি যদি বলি, আমার বড়ো ভাই ভাত চাহিয়া ভাত পায় নাই বলিয়া রাগের মাথায় স্ত্রীকে মারিয়াছে, তাহা হইলে সে কি রক্ষা পাইবে ।’ আমি কহিলাম, 'খবৰ্দার তারামজাদা, আদালতে এক-বর্ণও মিথ্যা বলিস না— এতবড়ো মহাপাপ আর নাই।’ ” ইত্যাদি । রামলোচন প্রথমে চন্দরাকে রক্ষা করিবার উদ্দেশে অনেকগুলা গল্প বানাইয়া তুলিয়াছিল, কিন্তু যখন দেখিল চন্দরা নিজে বাকিয়া দাড়াইয়াছে তখন ভাবিল, ‘ওরে বাপ রে, শেষকালে কি মিথ্য সাক্ষ্যের দায়ে পড়িব । যেটুকু জানি সেইটুকু বলা ভালো।’ এই মনে করিয়া রামলোচন বাহা জানে তাহাই বলিল । বরঞ্চ তাহার চেয়েও কিছু বেশি বলিতে ছাড়িল না । ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সেশনে চালান দিলেন । ইতিমধ্যে চাষবাস হাটবাজার হাসিকান্না পৃথিবীর সমস্ত কাজ চলিতে লাগিল। এবং পূর্ব পূর্ব বৎসরের মতো নবীন ধান্তক্ষেত্রে শ্রাবণের অবিরল বৃষ্টিধারা বর্ধিত হইতে লাগিল । পুলিস আসামী এবং সাক্ষা লইয়া আদালতে হাজির ৷ সন্মুখবর্তী মুন্সেফুের কোর্টে বিস্তর লোক নিজ নিজ মোকদ্দমার অপেক্ষায় বসিয়া আছে। রন্ধনশালার পশ্চাদবর্তী একটি ডোবার অংশবিভাগ লইয়া কলিকাতা হইতে এক উকিল আসিয়াছে এবং তদুপলক্ষে বাণীর পক্ষে উনচল্লিশজন সাক্ষী উপস্থিত আছে। কত শত লোক আপন আপন কড়াগও হিসাবের চুলচেরা মীমাংসা করিবার জন্ত ব্যগ্র হইয়া আসিয়াছে, জগতে আপাতত তদপেক্ষা গুরুতর আর-কিছুই উপস্থিত নাই এইরূপ তাহাদের ধারণা। ছিদাম বাতায়ন হইতে এই অভ্যস্ত ব্যস্তসমস্ত প্রতিদিনের পৃথিবীর দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া २१२ গল্পগুচ্ছ আছে, সমস্তই স্বপ্নের মতো বোধ হইতেছে। কম্পাউণ্ডের বৃহৎ বটগাছ হইতে একটি কোকিল ডাকিতেছে- তাহাদের কোনোরূপ আইন-আদালত নাই। চন্দরা জজের কাছে কহিল, “ওগো সাহেব, এক কথা আর বারবার কত বার করিয়া বলিব ।” জজসাহেব তাহাকে বুঝাইয়া বলিলেন, “তুমি যে অপরাধ স্বীকার করিতেছ তাহার শাস্তি কী জান ?” চন্দরা কহিল, “না।” জজসাহেব কহিলেন, “তাহার শাস্তি ফাসি ।” চন্দরা কহিল, “ওগো, তোমার পায়ে পড়ি, তাই দাও-ন, সাহেব । তোমাদের যাহা খুশি করে, আমার তো আর সহ হয় না।” যখন ছিদামকে আদালতে উপস্থিত করিল চন্দরা মুখ ফিরাইল । জজ কছিলেন, “সাক্ষীর দিকে চাহিয়া বলে, এ তোমার কে হয় ।” চন্দর দুই হাতে মুখ ঢাকিয় কহিল, “ও আমার স্বামী হয়।” প্রশ্ন হইল, “ও তোমাকে ভালোবাসে না ?” উত্তর । উঃ, ভারি ভালোবাসে । প্রশ্ন। তুমি উহাকে ভালোবাস না ? উত্তর । খুব ভালোবাসি । ছিদামকে যখন প্রশ্ন হইল ছিদাম কহিল, “আমি খুন করিয়াছি।” প্রশ্ন । কেন । ছিদাম । ভাত চাহিয়াছিলাম, বড়োবউ ভাত দেয় নাই ।” দুখিরাম সাক্ষ্য দিতে আসিয়া, মূৰ্ছিত হইয়া পড়িল। মুছাতঙ্গের পর উত্তর করিল, ”সাহেব, খুন আমি করিয়াছি।”

  • কেন ।”
  • ভাত চাহিয়াছিলাম, ভাত দেয় নাই।”

বিস্তুর জেরা করিয়া এবং অন্যান্য সাক্ষ্য শুনিয়া জজসাহেব স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন, ঘরের স্ত্রীলোককে ফঁাসির অপমান হইতে বাচাইবার জন্য ইহার দুই ভাই অপরাধ স্বীকার করিতেছে। কিন্তু, চন্দরা পুলিস হইতে সেশন শাস্তি २१७ আদালত পর্যন্ত বরাবর এক কথা বলিয়া আসিতেছে, তাহার কথার তিলমাত্র নড়াচড় হয় নাই। দুইজন উকিল স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত হইয়া তাহাকে প্রাণদও হইতে রক্ষা করিবার জন্য বিস্তর চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু অবশেষে তাহার নিকট পরাস্ত মানিয়াছে.। বে দিন একরত্তি বয়সে একটি কালোকোলো ছোটোখাটো মেয়ে তাহার গোলগাল মুখটি লইয়া খেলার পুতুল ফেলিয়া বাপের ঘর হইতে শ্বশুরঘরে আসিব সে দিন রাত্রে শুভলগ্নের সময় আজিকার দিনের কথা কে কল্পনা করিঞ্জে পারিত। তাছার বাপ মরিবার সময় এই বলিয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছিল যে, ‘বাহা হউক, আমার মেয়েটির একটি সদগতি করিয়া গেলাম।" জেলখানায় ফাসির পূর্বে দয়ালু সিভিল সার্জন চন্দয়াকে জিজ্ঞাসা করিল, “কাহাকেও দেখিতে ইচ্ছা কর ?” চন্দরা কহিল, "একবার আমার মাকে দেখিতে চাই ।” ডাক্তার কহিল, “তোমার স্বামী তোমাকে দেখিতে চায়, তাহাকে কি ডাকিয়া আনিব ।” চন্দরা কহিল, "মরণ —” শ্রাবণ ১৩০০