গল্পগুচ্ছ/সমস্যাপূরণ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সমস্তাপূরণ প্রথম পরিচ্ছেদ বিীকড়াকোটার কৃষ্ণগোপাল সরকার জ্যেষ্ঠপুত্রের প্রতি জমিদারি এবং সংসারের ভার দিয়া কাশী চলিয়া গেলেন। দেশের যত অনাথ দরিদ্র লোক র্তাহার জন্য হাহাকার করিয়া কঁাদিতে লাগিল। এমন বদান্ততা, এমন ধর্মনিষ্ঠত কলিযুগে দেখা যায় না, এই কথা সকলেই বলিতে লাগিল । তাহার পুত্র বিপিনবিহারী আজকালকার একজন স্বশিক্ষিত বি.এ. । দাড়ি রাখেন, চশমা পরেন, কাহারও সহিত বড়ো একটা মিশেন না। অতিশয় সচ্চরিত্র- এমন-কি, তামাকটি পর্যস্ত খান না, তাস পর্যস্ত খেলেন না। অত্যন্ত ভালোমানুষের মতো চেহারা, কিন্তু লোকটা ভারি কড়াক্কড় । তাহার প্রজার শীঘ্রই তাহা অনুভব করিতে পারিল। বুড় কর্তার কাছে রক্ষা ছিল, কিন্তু ইহার কাছে কোনো ছুতায় দেনা খাজনার এক পয়সা রেয়াত পাইবার প্রত্যাশা নাই । নির্দিষ্ট সময়েরও এক দিন এদিক-ওদিক হইতে পায় না । বিপিনবিহারী হাতে কাজ লইয়াই দেখিলেন, তাহার বাপ বিস্তর ব্রাহ্মণকে জমি বিনা খাজনায় ছাড়িয়া দিয়াছেন এবং খাজনা যে কত লোককে কমি দিয়াছেন তাহার আর সংখ্যা নাই । তাহার কাছে কেহ একটা কিছু প্রার্থন করিলে তিনি তাহ পূর্ণ না করিয়া থাকিতে পারিতেন না—সেটা তাহার একটা দুর্বলতা ছিল । বিপিনবিহারী কহিলেন, “এ কখনোই হইতে পারে না ; অর্ধেক জমিদারি আমি লাখেরাজ ছাড়িয়া দিতে পারি না।’ তাহার মনে নিম্নলিখিত দুই যুক্তির উদয় হইল। প্রথমত, বে-সকল অকৰ্মণ্য লোক ঘরে বসিয়া এইসব জমির উপস্বত্ব ভোগ করিয়া স্ফীত হইতেছে তাহারা অধিকাংশই অপদার্থ এবং দয়ার অযোগ্য এরূপ দানে দেশে কেবল আলস্যের প্রশ্রয় দেওয়া হয়। সমস্তাপুরণ €e দ্বিতীয়ত, তাহার পিতৃ-পিতামহের সময়ের অপেক্ষ এখন জীবিকা অত্যস্ত দুর্লভ এবং দ্বমূল্য হইয়া পড়িয়াছে। অভাব অনেক বাড়িয়া গিয়াছেণ এখন একজন ভদ্রলোকের আত্মসন্ত্রম রক্ষা করিয়া চলিতে পূর্বাপেক্ষা চারগুণ, খরচ পড়ে। অতএব, র্তাহার পিতা যেরূপ নিশ্চিন্তমনে ছুই হস্তে সমস্ত বিলাইয়া ছড়াইয়া গিয়াছেন এখন আর তাহা করিলে চলিবে না, বরঞ্চ সেগুলি কুড়াইয়া বাড়াইয়! আবার ঘরে আনিবার চেষ্টা করা কর্তব্য । কর্তব্যৰুদ্ধি তাহাকে যাহা বলিল তিনি তাহাই করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি একটা প্রিন্সিপল্‌ ধরিয়া চলিতে লাগিলেন। ঘর হইতে যাহা বাহির হইয়াছিল আবার তাহা অল্পে অল্পে ঘরে ফিরিতে লাগিল । পিতার অতি অল্প দানই তিনি বহাল রাখিলেন, এবং যাহা রাখিলেন তাহাও যাহাতে চিরস্থায়ী দানের স্বরূপে গণ্য না হয় এমন উপায় করিলেন । কৃষ্ণগোপাল কাশীতে থাকিয়া পত্ৰযোগে প্রজাদিগের ক্রনান শুনিতে পাইলেন– এমন-কি, কেহ কেহ তাহার নিকটে গিয়াও র্কাদিয়া পড়িল । কৃষ্ণগোপাল বিপিনবিহারীকে পত্র লিথিলেন যে কাজটা গর্হিত হইতেছে । বিপিনবিহারী উত্তরে লিখিলেন যে, পূর্বে যেমন দান করা যাইত তেমনি পাওনা নানা প্রকারের ছিল। তখন জমিদার এবং প্রজা উভয় পক্ষের মধ্যেই দান-প্রতিদান ছিল। সম্প্রতি নূতন নুতন আইন হইয়া স্থায্য খাজনা ছাড়া অঙ্ক পাচ রকম পাওনা একেবারে বন্ধ হইয়াছে এবং কেবলমাত্র খাজনা আদায় করা ছাড়া জমিদারের অন্যান্য গৌরবজনক অধিকারও উঠিয়া গিয়াছে— অতএব এখনকার দিনে যদি আমি আমার ন্যায্য পাওনার দিকে কঠিন দৃষ্টি না রাখি তবে আর থাকে কী । এখন প্রজাও আমাকে অতিরিক্ত কিছু দিবে না, আমিও তাহাকে অতিরিক্ত কিছু দিব না— এখন আমাদের মধ্যে কেবলমাত্র দেনাপাওনার সম্পর্ক। দানখয়রাত করিতে গেলে ফতুর হইতে হইৰে, বিষয়ুরক্ষা এবং কুলসম্রম-রক্ষা করা দুরূহ হইয়া পড়িবে।’ কৃষ্ণগোপাল সময়ের এতাধিক পরিবর্তনে অত্যন্ত চিপ্তিত হইয়া উঠিতেন এবং ভাবিতেন, ‘এখনকার ছেলেরা এখনকার কালের উপযোগী কাজ করিতেছে, আমাদের সে কালের নিয়ম এখন খাটিবে না। আমি দূরে বসিয়া ৩০২) গল্পগুচ্ছ ইহাতে হস্তক্ষেপ করিতে গেলে তাহারা বলিয়ে, তবে তোমার বিষয় তুমি ফিরিয়া লও, আমরা ইহা রাথিতে পারিব না। কাজ কী বাপু, এ কয়টা দিন কোনোমতে হরিনাম করিয়া কাটাইয়া দিতে পারিলে বাচি ।” দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ এই ভাবে কাজ চলিতে লাগিল । অনেক মকদ্দমা-মামলা হাঙ্গামাফেসাদ করিয়া বিপিনবিহারী সমস্তই প্রায় এক-প্রকার মনের মতো গুছাইয়া লইলেন । অনেক প্রজাই ভয়ক্রমে বস্ত্যতা স্বীকার করিল, কেবল মির্জাবিবির পুত্র অছিমন্দি বিশ্বাস কিছুতেই বাগ মানিল না । বিপিনবিহারীর আক্রোশও তাহার উপরে সব চেয়ে বেশি। ব্রাহ্মণের ব্ৰহ্মত্রর একট। অর্থ বোঝা যায়, কিন্তু এই মুসলমান-সন্তান যে কী হিসাবে এতটা জমি নিষ্কর ও স্বল্প করে উপভোগ করে বুঝা যায় না। একটা সামান্য যবন বিধবার ছেলে গ্রামের ছাত্রবৃত্তি স্কুলে দুই ছত্র লিখিতে পড়িতে শিথিয়াছে, কিন্তু আপনার সৌভাগ্যগর্বে সে যেন কাহাকেও গ্রাহ করে না । বিপিন পুরাতন কর্মচারীদের কাছে জানিতে পারিলেন, কর্তার আমল হইতে বাস্তবিক ইহারা বহুকাল অনুগ্রহ পাইয়া আসিতেছে। কিন্তু, এ অনুগ্রহের কোনো বিশেষ কারণ তাহারা নির্ণয় করিতে পারে না। বোধ করি, অনাথা বিধবা নিজ দুঃখ জানাইয়া কর্তার দয়া উদ্রেক করিয়াছিল। কিন্তু, বিপিনের নিকট এই অনুগ্রহ সর্বাপেক্ষ অযোগ্য বলিয়া প্রতিভাত হইল। বিশেষত ইহাদের পূর্বেকার দরিদ্র অবস্থা বিপিন দেখেন নাই, এখন ইহাদের সচ্ছলতার বাড়াবাড়ি এবং অপর্যাপ্ত দম্ভ দেখিয়া বিপিনের মনে হইত, ইতারা যেন তাহার দয়াদুর্বল সরল পিতাকে ঠকাইয়া তাহাদের বিষয়ের এক ংশ চুরি করিয়া লইয়াছে। অছিমদিও উদ্ধত প্রকৃতির যুবক । সে বলিল, প্রাণ যাইবে তবু আমার অধিকারের এক তিল ছাড়িয়া দিব না। উভয় পক্ষে ভারি যুদ্ধ বাধিয়} छेटेिल । আছিমদির বিধবা মাতা ছেলেকে বার বার করিয়া বুঝাইল, জমিদারের সমস্তাপূরণ ●●● সহিত কাজিয়া করিয়া কাজ নাই, এত দিন যাহার অনুগ্রহে জীবন কাটিল উীহার অনুগ্রহের পরে নির্ভর করাই কর্তব্য— জমিদারের প্রার্থনা-মতো কিছু ছাড়িয়া দেওয়া যাক । অছিমদ্ধি কহিল, “ম, তুমি এ-সকল বিষয় কিছুই বোঝ না।” মকদ্দমায় আছিমদি একে একে হারিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু যতই হার হইতে লাগিল ততই তাহার জিদ বাড়িয়া উঠিল । তাহার সর্বশ্বের জন্য সে সৰ্বম্বই পণ করিয়া বসিল । মির্জাবিবি একদিন বৈকালে বাগানের তরিতরকারি কিঞ্চিৎ উপহার লইয়া গোপনে বিপিনবাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিল। বৃন্ধা যেন তাহার সকরুণ মাতৃদৃষ্টির দ্বারা সস্নেহে বিপিনের সর্বাঙ্গে হাত বুলাইয়া কহিল, “তুমি আমার বাপ, আল্লা তোমার ভালো করুন। বাব, অছিমকে তুমি নষ্ট করিয়ো না, ইহাতে তোমার ধর্ম হইবে না। তাহাকে আমি তোমার হস্তেই সমর্পণ করিলাম – তাহাকে নিতান্তই অবশু প্রতিপাল্য একটি অর্কমণ্য ছোটো ভাইয়ের মতো গ্রহণ করো— সে তোমার অসীম ঐশ্বর্ষের ক্ষুদ্র এক কণা পাইয়াছে বলিয়া ক্ষুণ্ণ হইয়ে না, বাপ ।” অধিক বয়সের স্বাভাবিক প্ৰগলভতা-বশত বুড়ি তাহার সহিত ঘরকন্না পাতাইতে আসিয়াছে দেখিয়া বিপিন ভারি বিরক্ত হইয়া উঠিল। কহিল, “তুমি মেয়েমানুষ, এ-সমস্ত কথা বোঝ না। যদি কিছু জানাইবার থাকে তোমার ছেলেকে পাঠাইয়া দিয়ে ।” মির্জাবিবি নিজের ছেলে এবং পরের ছেলে উভয়ের কাছেই শুনিল, সে এ বিষয়ের কিছুই বোঝে না । আল্লার নাম স্মরণ করিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে বিধবা ঘরে ফিরিয়া গেল । তৃতীয় পরিচ্ছেদ মকদম ফৌজদারি হইতে দেওয়ানি, দেওয়ানি হইতে জেলা-আদালত, জেলা-আদালত হইতে হাইকোর্ট পর্যস্ত চলিল । বৎসর দেড়েক এমনি করিয়া कप्लिब cशण । अश्बिकि दथन cननांद्र भटश चांक% निभध्र_श्हेबारह उथन আপিল-আদালতে তাহার আংশিক জয় সাব্যস্ত হইল । গল্পগুচ্ছ 8• ט কিন্তু, ডাঙার বাঘের মুখ হইতে বেটুকু বাচিল জলের কুমির তাহার প্রতি আক্রমণ করিল। মহাজন সময় বুঝিয়া ডিক্ৰীজারি করিল। অছিমদির যথাসর্বস্ব নিলাম হইবার দিন স্থির হইল । সে দিন সোমবার, হাটের দিন। ছোটো একটা নদীর ধারে হাট । বর্ষাকালে নদী পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। কতক নৌকায় এবং কতক ভাঙায় কেনা বেচা চলিতেছে, কলরবের অস্ত নাই। পণ্যদ্রব্যের মধ্যে এই আষাঢ় মাসে কাঠালের আমদানিই সব চেয়ে বেশি, ইলিশ মাছও যথেষ্ট। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে ; অনেক বিক্রেতা বৃষ্টির আশঙ্কায় বঁাশ পুতিয়া তাহার উপর একটা কাপড় থাটাইয়া দিয়াছে। অছিমদিও হাট করিতে আসিয়াছে— কিন্তু, তাহার হাতে একটি পয়সাও নাই, এবং তাহাকে আজকাল কেহ ধারেও বিক্রয় করে না। সে একটি কাটারি এবং একটি পিতলের থালা হাতে করিয়া আসিয়াছে, বন্ধক রাথিয়া ধার কৱিবে । বিপিনবাবু বিকালের দিকে হাওয়া থাইতে বাহির হইয়াছেন, সঙ্গে দুই-তিনজন লাঠি হস্তে পাইক চলিয়াছে। কলরবে আকৃষ্ট হইয়া তিনি একবার হাট দেখিতে ইচ্ছুক হইলেন। হাটের মধ্যে প্রবেশ করিয়া দ্বারা কলুকে কৌতুহলবশত তাহার আয়ব্যয় সম্বন্ধে প্রশ্ন করিতেছিলেন, এমন সময় আছিমদি কাটারি তুলিয়া বাঘের মতো গর্জন করিয়া বিপিনবাবুর প্রতি ছুটিয়া আসিল । হাটের লোক তাহাকে অর্ধপথে ধরিয়া তৎক্ষণাৎ নিরস্ত্র করিয়া ফেলিল— অবিলম্বে তাহাকে পুলিসের হস্তে অর্পণ করা হইল এবং আবার হাটে যেমন কেনা বেচা চলিতেছিল চলিতে লাগিল । বিপিনবাবু এই ঘটনায় মনে মনে যে খুশি হন নাই তাহা বলা যায় না। আমরা যাহাকে শিকার করিতে চাহি সে যে আমাদিগকে থাবা মারিতে আসিবে এরূপ বজাতি এবং বে-আদবি অসহ । যাহা হউক, বেটা যেরূপ বদমায়েস সেইরূপ তাহার উচিত শাস্তি হইবে। বিপিনের অন্তঃপুরের মেয়েরা আজিকার ঘটনা শুনিয়া কণ্টকিত হইয়া উঠিলেন। সকলেই বলিলেন, ‘মা গো, কোথাকার বজ্জাত হারামজাদা বেটা ।” সমস্যাপূরণ "లిe(t তাহার উচিত শাস্তির সম্ভাবনায় তাহারা অনেকটা সাত্বনা লাভ করিলেন। এ দিকে সেই সন্ধ্যাবেলায় বিধবার অন্নহীন পুত্রহীন গৃহ মৃত্যুর অপেক্ষাও অন্ধকার হইয়া গেল। এই ব্যাপারটা সকলেই ভুলিয়া গেল, জাহান্নাদি করিল, শয়ন করিল, নিদ্রা দিল— কেবল একটি বৃদ্ধার কাছে পৃথিবীর সমস্ত ঘটনার মধ্যে এইটাই সর্বাপেক্ষ বৃহৎ হইয়া উঠিল, অথচ ইহার সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য সমস্ত পৃথিবীতে আর কেহই নাই, কেবল দীপহীন কুটিরপ্রাস্তে কয়েকখানি জীর্ণ অস্থি এবং একটি হতাশ্বাস ভীত হৃদয় । চতুর্থ পরিচ্ছেদ ইতিমধ্যে দিন তিনেক অতিবাহিত হইয়া গেছে। কাল ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট বিচারের দিন নির্দিষ্ট হইয়াছে। বিপিনকেও সাক্ষ্য দিতে যাহত হইবে । ইতিপূর্বে জমিদারকে কখনো সাক্ষ্যমঞ্চে দাড়াইতে হয় নাই, কিন্তু বিপিনের ইহাতে কোনো আপত্তি নাই । পরদিন যথাসময়ে পাগড়ি পরিয়া ঘড়ির চেন ঝুলাইয়া পান্ধি চড়িয়া মহাসমারোহে বিপিনবাবু কাছারিতে গিয়া উপস্থিত হইলেন। এজলাসে আজ আর লোক ধরে না । এতবড়ে হুজুক আদালতে অনেক দিন ঘটে নাই। যখন মকদম উঠিতে আর বড়ো বিলম্ব নাই, এমন সময় একজন বৰ্কন্দাজ আসিয়া বিপিনবাবুর কানে কানে কী একটা কথা বলিয়া দিল— তিনি তটস্থ হইয়া "আবশ্বক আছে’ বলিয়া বাহিরে চলিয়া আসিলেন । বাহিরে আসিয়া দেখিলেন, কিছু দূরে এক বটতলায় তাহার বৃদ্ধ পিতা দাড়াইয়া আছেন। খালি পা, গায়ে একখানি নামাবলি, হাতে হরিনামের মালা, কুশ শরীরটি যেন স্নিগ্ধ জ্যোতির্ময় ৷ ললাট হইতে একটি শাস্ত করুণ বিশ্বে বিকীর্ণ হইতেছে। বিপিন চাপকান জোব্বা এবং জাট প্যান্ট লুন লইয়া কষ্টে তাহাকে প্ৰণাম করিলেন। মাথার পাগড়িটি নাসাপ্লাস্তে নামিয়া আসিল, ঘড়িটি জেব হইতে বাহির হইয়া পড়িল । সেগুলি শশব্যন্তে সারিয়া লইয়া পিতাকে নিকটবর্তী উকিলের বাসায় প্রবেশ করিতে অনুরোধ করিলেন। 'L ෆH গল্পগুচ্ছ কৃষ্ণগোপাল কছিলেন, “না, আমার বাহা বক্তব্য আমি এইখানেই বলিয়া जहै |” . বিপিনের অহচরগণ কৌতুহলী লোকদিগকে দূরে ঠেলিয়া রাখিল। কৃষ্ণগোপাল কহিলেন, “আছিম মাহাতে খালাস পায় সেই চেষ্টা করিতে হইবে এবং উহার যে সম্পত্তি কাড়িয়া লইয়াছ তাহ ফিরাইয়া দিবে।” বিপিন বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “এইজন্যই আপনি কাশী হইতে এত দূরে আসিয়াছেন ? উহাদের পরে আপনার এত অধিক অনুগ্রহ কেন ।” কৃষ্ণগোপাল কহিলেন, “সে কথা শুনিয়া তোমার লাভ কী হইবে, বাপু ।” বিপিন ছাড়িলেন না ; কহিলেন, “অযোগ্যতা বিচার করিয়া কত লোকের কত দান ফিরাইয়া লইয়াছি, তাহার মধ্যে কত ব্রাহ্মণও ছিল, আপনি তাহার কিছুতে হস্তক্ষেপ করেন নাই,— আর এই মুসলমান-সন্তানের জন্য আপনার এত দূর পর্যন্ত অধ্যবসায়! আজ এত কাণ্ড করিয়া অবশেষে যদি আছিমকে থালাস দিতে এবং সমস্ত ফিরাইয়া দিতে হয় তো লোকের কাছে কী বলিব ।” কৃষ্ণগোপাল কিয়ংক্ষণ চুপ করিয়া রছিলেন। অবশেষে দ্রুতকম্পিত অঙ্গুলিতে মালা ফিরাইতে ফিরাইতে কিঞ্চিং কম্পিত স্বরে কহিলেন, “লোকের কাছে যদি সমস্ত খুলিয়া বলা আবগুক মনে কর তো বলিয়ে, অছিমদিন তোমার তাই হয়, আমার পুত্র।” বিপিন চমকিয়া উঠিয়া কহিলেন, “ববনীর গর্ভে ?” কৃষ্ণগোপাল কহিলেন, "হুঁ, বাপু ।” বিপিন অনেক ক্ষণ স্তন্ধভাবে থাকিয়া কহিলেন, “সে-সব কথা পরে হইবে, এখন আপনি ঘরে চলুন।" কৃষ্ণগোপাল কহিলেন, “না, আমি তো আর গৃহে প্রবেশ করিব না। আমি এখনই এখান হইতে ফিরিয়া চলিলাম। এখন তোমার ধর্মে যাহা উচিত বোধ হয় করিয়ো।” বলিয়া আশীৰ্বাদ করিয়া অঞ্জনিরোধ-পূর্বক কম্পিতকলেবরে ফিরিয়া চলিলেন । বিপিন কী বলিবে কী করিৰে ভাবিয়া পাইল না। চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। কিন্তু, এটুকু তাহার মনে উদয় হইল, সে কালের ধর্মনিষ্ঠা এইরূপই সমস্তাপুরণ එ O අ বটে। শিক্ষা এবং চরিত্রে আপনাকে আপনার পিতার চেয়ে ঢের শ্রেষ্ঠ বোধ হইল। স্থির করিলেন, একটা প্রিন্সিপল না থাকার এই ফল। *; আদালতে যখন ফিরিলেন, দেখিলেন শীর্ণ ক্লিষ্ট শুষ্ক শ্বেত-ওষ্ঠাধর দীপ্তনেত্র অছিম দুই পাহারাওয়ালার হস্তে বন্দী হইয়া একখানি মলিন চীর পরিয়া বাহিরে দাড়াইয়া রহিয়াছে । সে বিপিনের ভ্রাতা ! ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের সহিত বিপিনের বন্ধুত্ব ছিল । মকদ্দমা একপ্রকার গোলমাল করিয়া ফাসিয়া গেল। এবং অছিমও অল্প দিনের মধ্যে পূর্বাবস্থা ফিরিয়া পাইল। কিন্তু তাহার কারণ সেও বুঝিতে পারিল না, অন্য লোকেও আশ্চর্য হইয়া গেল । মকদ্দমার সময় কৃষ্ণগোপাল আসিয়াছিলেন সে কথা রাষ্ট্র হইতে বিলম্ব হইল না । সকলেই নানা কথা কানাকানি করিতে লাগিল । স্বল্পবুদ্ধি উকিলেরা ব্যাপারটা সমস্তই অনুমান করিয়া লইল। রামভারণ উকিলকে কৃষ্ণগোপাল নিজের খরচে লেখাপড় শিখাইয়া মানুষ করিয়াছিলেন। সে বরাবরই সন্দেহ করিত, কিন্তু এত দিনে সম্পূর্ণ বুঝিতে পারিল যে, ভালো করিয়া অনুসন্ধান করিলে সকল সাধুই ধরা পড়ে। যিনি যত মালা জপুন, পৃথিবীতে আমার মতোই সব বেটা। সংসারে সাধু অসাধুর মধ্যে প্রভেদ এই যে, সাধুরা কপট আর অসাধুরা অকপট । বাহা হউক, কৃষ্ণগোপালের জগদবিখ্যাত দয়া ধর্ম মহত্ব সমস্তই ৰে কাপট্য ইহাই স্থির করিয়া রামতারণের যেন এতদিনকার একটা দুর্বোধ সমস্তার পূরণ হইল এবং কী যুক্তি-অনুসারে জানি না, তাহাতে কৃতজ্ঞতার বোঝাও যেন স্কন্ধ হইতে লঘু হইয়া গেল। জ্ঞারি আরাম পাইল । অগ্রহায়ণ ১৩০ •