গল্পগুচ্ছ/সম্পাদক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সম্পাদক আমার স্ত্রী-বর্তমানে প্রভা সম্বন্ধে আমার কোনো চিন্তা ছিল না । তখন প্রভা অপেক্ষা প্রভার মাতাকে লইয়া কিছু অধিক ব্যস্ত ছিলাম। তখন কেবল প্রভার খেলাটুকু হাসিটুকু দেখিয়া, তাহার আধো আধো কথা শুনিয়া, এবং আদরটুকু লইয়াই তৃপ্ত থাকিতাম ; যতক্ষণ ভালো লাগিত নাড়াচাড়া করিতাম, কান্না আরম্ভ করিলেই তাহার মার কোলে সমপর্ণ করিয়া সত্বর অব্যাহত লইতাম । তাহাকে যে বহু চিস্তা ও চেষ্টায় মানুষ করিয়া তুলিতে হইবে এ কথা আমার মনে আসে নাই। অবশেষে অকালে আমার স্ত্রীর মৃত্যু হইলে একদিন মায়ের কোল হইতে খসিয়া মেয়েটি আমার কোলের কাছে আসিয়া পড়িল, তাছাকে বুকে টানিয়া লইলাম । - কিন্তু মাতৃহীনা দুহিতাকে দ্বিগুণ স্নেহে পালন করা আমার কর্তব্য এটা আমি বেশি চিন্তা করিয়াছিলাম না পত্নীহীন পিতাকে পরম যত্নে রক্ষা করা তাহার কর্তব্য এইটে সে বেশি অনুভব করিয়াছিল, আমি ঠিক বুঝিতে পারি না। কিন্তু ছয় বৎসর বয়স হইতেই সে গিন্নিপনা আরম্ভ করিয়াছিল। বেশ দেখা গেল, ওইটুকু মেয়ে তাহার বাবার একমাত্র অভিভাবক হইবার চেষ্টা করিতেছে । আমি মনে মনে হাসিয়া তাহার হস্তে আত্মসমর্পণ করিলাম। দেখিলাম, যতই আমি অকৰ্মণ্য অসহায় হই ততই তাহার লাগে ভালো ; দেখিলাম, আমি নিজে কাপড়টা ছাতাটা পাড়িয়া লইলে সে এমন ভাব ধারণ করে যেন তাহার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হইতেছে। বাবার মতো এতবড়ো পুতুল সে ইতিপূর্বে কখনো পায় নাই, এইজন্য বাবাকে খাওয়াইয়া পরাইয়া বিছানায় গুয়াইয়া সে সমস্ত দিন বড়ো আনন্দে অাছে। কেবল ধারাপাত এবং পদ্যপাঠ প্রথমভাগ অধ্যাপনের সময় আমার পিতৃত্বকে কিঞ্চিৎ সচেতন করিয়া তুলিতে হইত। १७० গল্পগুচ্ছ কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবন হইত মেয়েটিকে সৎপাত্রে বিবাহ দিতে হইলে অনেক অর্থের আবশ্যক— আমার এত টাকা কোথায় । মেয়েকে তো সাধ্যমতো লেখাপড়া শিখাইতেছি, কিন্তু একটা পরিপূর্ণ মুখের হাতে পড়িলে তাহার কী দশা হইবে। উপার্জনে মন দেওয়া গেল। গবর্মেণ্ট-আপিসে চাকরি করিবার বয়স গেছে, অন্ত আপিসে প্রবেশ করিবারও ক্ষমতা নাই। অনেক ভাবিয়া বই লিখিতে লাগিলাম। বঁাশের নল ফুটা করিলে তাহাতে তেল রাখা যায় না, জল রাখা যায় না, তাহার ধারণাশক্তি মূলেই থাকে না ; তাহাতে সংসারের কোনো কাজই হয় না, কিন্তু ফু দিলে বিনা খরচে বাশি বাজে ভালো । আমি স্থির জানিতাম, সংসারের কোনো কাজেই যে হতভাগ্যের বুদ্ধি খেলে না, সে নিশ্চয়ই ভালো বই লিখিবে । সেই সাহসে একথানা প্রহসন লিখিলাম, লোকে ভালো বলিল এবং রঙ্গভূমিতে অভিনয় হইয় গেল । সহসা যশের আস্বাদ পাইয় এমনি বিপদ হইল, প্রহসন আর কিছুতেই ছাডিতে পারি না। সমস্ত দিন ব্যাকুল চিস্তান্বিত মুখে প্রহসন লিখিতে লাগিলাম । প্রভা আসিয়া আদর করিয়া স্নেহ-সহাস্তে জিজ্ঞাসা করিল, “বাবা, নাইতে যাবে না ?” আমি হুংকার দিয়া উঠিলাম, “এখন যা, এখন যা, এখন বিরক্ত করিস নে ৷” বালিকার মুখখানি বোধ করি একটি ফুৎকারে নির্বাপিত প্রদীপের মতো অন্ধকার হইয়া গিয়াছিল ; কখন সে অভিমানবিস্ফারিত-হৃদয়ে নীরবে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল আমি জানিতেও পারি নাই। দাসীকে তাড়াইয়া দিই, চাকরকে মারিতে যাই, ভিক্ষুক স্বর করিয়া ভিক্ষ করিতে আসিলে তাহাকে লাঠি লইয়া তাড়া করি। পথপার্থেই আমার ঘর হওয়াতে যখন কোনো নিরীহ পাস্থ জানলার বাহির হইতে আমাকে পথ জিজ্ঞাসা করে, আমি তাহাকে জাহান্নম-নামক একটা অস্থানে যাইতে অঙ্গুরোধ করি — হায়, কেহই বুঝিত না, আমি খুব একটা মজার প্রহসন লিখিতেছি । সম্পাদক సిరి কিন্তু যতটা মজা এবং যতটা যশ হইতেছিল সে পরিমাণে টাকা কিছুই হয় নাই। তখন টাকার কথা মনেও ছিল না । এ দিকে প্রভার যোগ্য পাত্রগুলি অন্য ভদ্রলোকদের কন্যাদায় মোচন করিবার জন্য গোকুলে বাড়িতে লাগিল, আমার তাহাতে থেয়াল ছিল না। পেটের জালা না ধরিলে চৈতন্য হইত না, কিন্তু এমন সময় একটা সুযোগ জুটিয়া গেল। জাহিরগ্রামের এক জমিদার একখানি কাগজ বাহির করিয়া আমাকে তাহার বেতনভোগী সম্পাদক হইবার জন্য অনুরোধ করিয়া পাঠাইয়াছেন । কাজটা স্বীকার করিলাম । দিনকতক এমনি প্রতাপের সহিত লিখিতে লাগিলাম যে, পথে বাহির হইলে লোকে আমাকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেখাইত, এবং আপনাকে মধ্যাহৃতপনের মতে দুর্নিরীক্ষ্য বলিয়া বোধ হইত । জাহিরগ্রামের পাশ্বে আহিরগ্রাম । দুই গ্রামের জমিদারে ভারি দলাদলি । পূর্বে কথায় কথায় লাঠালাঠি হইত। এখন উভয় পক্ষে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট মুচলেকা দিয়া লাঠি বন্ধ করিয়াছে এবং কৃষ্ণের জীব আমাকে পূর্ববর্তী খুনি লাঠিয়ালদের স্থানে নিযুক্ত করিয়াছে। সকলেই বলিতেছে, আমি পদমর্যাদা রক্ষা করিয়াছি । আমার লেখার জালায় আহিরগ্রাম আর মাথা তুলিতে পারে না । তাহাদের জাতিকুল পূর্বপুরুষের ইতিহাস সমস্ত আদ্যোপাস্ত মসীলিপ্ত করিয়া দিয়াছি । এই সময়টা ছিলাম ভালো । বেশ মোটাসোটা হইয়া উঠিলাম। মুখ সর্বদা প্রসন্ন হান্তময় ছিল । আহিরগ্রামের পিতৃপুরুষদের প্রতি লক্ষ করিয়া এক একটা মর্মান্তিক বাক্যশেল ছাড়িতাম, আর সমস্ত জাহিরগ্রাম হাসিতে হাসিতে পাকা ফুটির মতো বিদীর্ণ হইয়া যাইত। বড়ো আনন্দে ছিলাম । অবশেষে আহিরগ্রামও একখানা কাগজ বাহির করিল । সে কোনো কথা ঢাকিয়া বলিত না । এমনি উৎসাহের সহিত অবিমিশ্র প্রচলিত ভাষায় গাল পাড়িত যে, ছাপার অক্ষরগুলা পর্যন্ত যেন চক্ষের সমক্ষে চীৎকার করিতে থাকিত। এইজন্য দুই গ্রামের লোকেই তাহার কথা খুব স্পষ্ট বুঝিতে পারিত । ఫిలిసి গল্পগুচ্ছ কিন্তু আমি চিরাভ্যাসবশত এমনি মজা করিয়া এত কূটকৌশল-সহকারে বিপক্ষদিগকে আক্রমণ করিতাম যে, শত্রু মিত্র কেহই বুঝিতে পারিত না আমার কথার মর্মট কী । তাহার ফল হইল এই, জিত হইলেও সকলে মনে করিত আমার হার হইল। দায়ে পড়িয়া মুরুচি সম্বন্ধে একটি উপদেশ লিখিলাম। দেখিলাম ভারি ভুল করিয়াছি; কারণ, যথার্থ ভালো জিনিসকে যেমন বিদ্রুপ করিবার সুবিধা এমন উপহাস্ত বিষয়কে নহে। হমুবংশীয়েরা মকুবংশীয়দের যেমন সহজে বিদ্রুপ করিতে পারে মকুবংশীয়ের হুমুবংশীয়দিগকে বিদ্রুপ করিয়া কখনো তেমন কৃতকার্য হইতে পারে না । সুতরাং সুরুচিকে তাহারা দন্তোন্মীলন করিয়া দেশছাড়া করিল। আমার প্রভু আমার প্রতি আর তেমন সমাদর করেন না। সভাস্থলেও আমার কোনো সম্মান নাই। পথে বাহির হইলে লোকে গায়ে পডিয়া আলাপ করিতে আসে না। এমন কি আমাকে দেখিয়া কেহ কেহ হাসিতে আরম্ভ করিয়াছে। ইতিমধ্যে আমার প্রহসনগুলার কথাও লোকে সম্পূর্ণ ভুলিয়া গিয়াছে। হঠাৎ বোধ হইল, আমি যেন একটা দেশালায়ের কাঠি ; মিনিটখানেক জলিয়া একেবারে শেষ পর্যন্ত পুড়িয়া গিয়াছি । মন এমনি নিরুৎসাহ হইয়া গেল, মাথা খুড়িয়া মরিলে এক লাইন লেখা বাহির হয় না । মনে হইতে লাগিল, বাচিয়া কোনো সুখ নাই । প্রভ আমাকে এখন ভয় করে । বিনা আহানে সহসা কাছে আসিতে সাহস করে না। সে বুঝিতে পারিয়াছে, মজার কথা লিখিতে পারে এমন বাবার চেয়ে মাটির পুতুল ঢের ভালো সঙ্গী। একদিন দেখা গেল আমাদের অাহিরগ্রামপ্রকাশ জমিদারকে ছাড়িয়া আমাকে লইয়া পডিয়াছে। গোটাকতক অত্যন্ত কুৎসিত কথা লিখিয়াছে। আমার পরিচিত বন্ধুবান্ধবেরা একে একে সকলেই সেই কাগজখানা লইয়া হাসিতে হাসিতে আমাকে শুনাইয়া গেল। কেহ কেহ বলিল, ইহার বিষয়টা যেমনই হউক, ভাষার বাহাদুরি অাছে। অর্থাৎ, গালি যে দিয়াছে তাহা ভাষা দেখিলেই পরিষ্কার বুঝা যায়। সমস্ত দিন ধরিয়া বিশজনের কাছে সম্পাদক "లిలి ওই এক কথা শুনিলাম। আমার বাসার সম্মুখে একটু বাগানের মতো ছিল। সন্ধ্যাবেলায় নিতাস্ত পীড়িতচিত্তে সেইখানে একাকী বেড়াইতেছিলাম। পাখিরা নীড়ে ফিরিয়া আসিয়া যখন কলরব বন্ধ করিয়া স্বচ্ছন্দে সন্ধ্যার শাস্তির মধ্যে আত্মসমর্পণ করিল তখন বেশ বুঝিতে পারিলাম পাখিদের মধ্যে রসিক লেখকের দল নাই, এবং সুরুচি লইয়া তর্ক হয় না । মনের মধ্যে কেবলই ভাবিতেছি কী উত্তর দেওয়া বায় । ভদ্রতার একটা বিশেষ অস্থবিধা এই যে, সকল স্থানের লোকে তাহাকে বুঝিতে পারে না । অভদ্রতার ভাষা অপেক্ষাকৃত পরিচিত, তাই ভাবিতেছিলাম সেই রকম ভাবের একটা মুখের মতো জবাব লিখিতে হইবে। কিছুতেই হার মানিতে পারিব না । এমন সময়ে সেই সন্ধ্যার অন্ধকারে একটি পরিচিত ক্ষুদ্র কণ্ঠের স্বর শুনিতে পাইলাম এবং তাহার পরেই আমার করতলে একটি কোমল উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করিলাম। এত উদবেজিত অন্যমনস্ক ছিলাম যে, সেই মুহূর্তে সেই স্বর ও সেই স্পর্শ জানিয়াও জানিতে পারিলাম না। কিন্তু এক মুহূর্ত পরেই সেই স্বর ধীরে ধীরে আমার কর্ণে জাগ্রত, সেই সুধাস্পৰ্শ আমার করতলে সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল । বালিকা একবার আস্তে আস্তে কাছে আসিয়া মৃদুস্বরে ডাকিয়াছিল, “বাবা।” কোনো উত্তর না পাইয়া আমার দক্ষিণ হস্ত তুলিয়া ধরিয়া একবার আপনার কোমল কপোলে বুলাইয়া আবার ধীরে ধীরে গৃহে ফিরিয়া যাইতেছে। বহুদিন প্রভা আমাকে এমন করিয়া ডাকে নাই এবং স্বেচ্ছাক্রমে আসিয়া আমাকে এতটুকু আদর করে নাই। তাই আজ সেই স্নেহম্পর্শে আমার হৃদয় সহসা অত্যস্ত ব্যাকুল হইয়া উঠিল । কিছুক্ষণ পরে ঘরে ফিরিয়া গিয়া দেখিলাম প্রভা বিছানায় শুইয়া আছে। শরীর ক্লিষ্টচ্ছবি, নয়ন ঈষৎ নিমৗলিত ; দিনশেষের ঝরিয়া-পড়। ফুলের মতো পড়িয়া আছে । মাথায় হাত দিয়া দেখি অত্যস্ত উষ্ণ ; উত্তপ্ত নিশ্বাস পড়িতেছে ; কপালের শির দপ, দপ, করিতেছে। * বুঝিতে পারিলাম, বালিকা আসন্ন রোগের তাপে কাতর হইয়া পিপাসিত ২৩৪ গল্পগুচ্ছ হৃদয়ে একবার পিতার স্নেহ পিতার আদর লইতে গিয়াছিল, পিতা তখন জাহিরপ্রকাশের জন্য খুব একটা কড়া জবাব কল্পনা করিতেছিল। পাশে আসিয়া বসিলাম । বালিকা কোনো কথা না বলিয় তাহার দুই জরতপ্ত করতলের মধ্যে আমার হস্ত টানিয়া লইয়া তাহার উপরে কপোল রাখিয়া চুপ করিয়া শুইয়া রহিল । জাহিরগ্রাম এবং আহিরগ্রামের যত কাগজ ছিল সমস্ত পুড়াইয়া ফেলিলাম। কোনো জবাব লেখা হইল না । হার মানিয়া এত স্থখ কখনো হয় নাই । বালিকার যখন মাতা মরিয়াছিল তখন তাহাকে কোলে টানিয়া লইয়াছিলাম, আজ তাহার বিমাতার অস্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপন করিয়া আবার তাহাকে বুকে তুলিয়া লইয়া ঘরে চলিয়া গেলাম। বৈশাখ У Ф. о о