গল্পগুচ্ছ/সুভা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

/সুভ৷ মেয়েটির নাম যখন স্বভাষিণী রাখা হইয়াছিল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে। তাহার দুটি বড়ে বোনকে স্বকেশিনী ও স্বহাসিনী নাম দেওয়া হইয়াছিল, তাই মিলের অনুরোধে তাহার বাপ ছোটো মেয়েটির নাম সুভাষিণী রাখে । এখন সকলে তাহাকে সংক্ষেপে স্বভা বলে । দস্তুরমতো অনুসন্ধান ও অর্থব্যয়ে বড়ো দুটি মেয়ের বিবাহ হইয়া গেছে, এখন ছোটোটি পিতামাতার নীরব হৃদয়ভারের মতো বিরাজ করিতেছে । যে কথা কয় না সে যে অমুভব করে ইহ সকলের মনে হয় না, এইজন্ত তাহার সাক্ষাতেই সকলে তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দুশ্চিস্তা প্রকাশ করিত। সে যে বিধাতার অভিশাপস্বরূপে তাহার পিতৃগৃহে আসিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছে এ কথা সে শিশুকাল হইতে বুঝিয়া লইয়াছিল। তাহার ফল এই হইয়াছিল, সাধারণের দৃষ্টিপথ হইতে সে আপনাকে গোপন করিয়া রাখিতে সর্বদাই চেষ্টা করিত। মনে করিত, আমাকে সবাই ভুলিলে বাচি । কিন্তু, বেদনা কি কেহ কখনো ভোলে। পিতামাতার মনে সে সর্বদাই জাগরূক ছিল । বিশেষত, তাহার মা তাহাকে নিজের একটা ক্রটিশ্বরূপ দেখিতেন , কেননা, মাতা পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে নিজের অংশরূপে দেখেন– কন্যার কোনো অসম্পূর্ণতা দেখিলে সেটা যেন বিশেষরূপে নিজের লজ্জার কারণ বলিয়া মনে করেন। বরঞ্চ, কন্যার পিতা বাণীকণ্ঠ স্বভাকে তাহার অন্য মেয়েদের অপেক্ষা যেন একটু বেশি ভালোবাসিতেন ; কিন্তু মাতা তাহাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক জ্ঞান করিয়া তাহার প্রতি বড়ো বিরক্ত ছিলেন । “স্বভার কথা ছিল না, কিন্তু তাহার সুদীর্ঘপল্লববিশিষ্ট বড়ে বড়ে দুটি কালে চোখ ছিল— এবং তাহার ওষ্ঠাধর ভাবের আভাসমাত্রে কচি কিশলয়ের মতে কঁাপিয়া উঠিত।. কথায় আমরা যে ভাব প্রকাশ করি সেটা আমাদিগকে অনেকটা নিজের চেষ্টায় গড়িয়া লইতে হয়, কতকটা তর্জমা করার মতো ; সকল সময়ে ঠিক হয় না, ক্ষমতা-অভাবে অনেক সময়ে ভুলও হয় । কিন্তু, কালে চোখকে কিছু সুভা S・● তর্জমা করিতে হয় না— মন আপনি তাহার উপরে ছায়া ফেলে ; ভাব আপনি তাহার উপরে কখনো প্রসারিত কখনো মুদিত হয় ; কখনো উজ্জ্বলভাবে জলিয়া উঠে, কখনো মানভাবে নিবিয়া আসে ; কখনো অস্তমান চন্দ্রের মতো অনিমেষভাবে চাহিয়া থাকে, কখনো দ্রুত চঞ্চল বিদ্যুতের মতো দিগ্‌বিদিকে ঠিকরিয়া উঠে। মুখের ভাব বৈ আজন্মকাল যাহার অন্য ভাষা নাই তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতলম্পর্শ গভীর – অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতে, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ রঙ্গভূমি। এই বাক্যহীন মন্থয্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ত্ব আছে। এইজন্য সাধারণ বালকবালিকারা তাহাকে একপ্রকার ভয় করিত, তাহার সহিত খেলা করিত না । সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন । । २ V গ্রামের নাম চণ্ডীপুর। নদীটি বাংলাদেশের একটি ছোটো নদী, গৃহস্থঘরের মেয়েটির মতো ; বহুদূর পর্যন্ত তাহার প্রসার নহে ; নিরলসা তৰী নদীটি আপন কুল রক্ষা করিয়া কাজ করিয়া যায় ; দুই ধারের গ্রামের সকলেরই সঙ্গে তাহার ধেন একট-না-একটা সম্পর্ক আছে । দুই ধারে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াধন উচ্চ তট ; নিম্নতল দিয়া গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী আত্মবিশ্বত দ্রুত পদক্ষেপে প্রফুল্লহৃদয়ে আপনার অসংখ্য কল্যাণকার্যে চলিয়াছে। বাণীকণ্ঠের ঘর নদীর একেবারে উপরেই। তাহার বঁাখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর, টেক্তিশাল, খড়ের স্তুপ, তেঁতুলতলা, আম কঁঠাল এবং কলার বাগান নৌকাবাহী-মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই গার্হস্থ্য সচ্ছলতার মধ্যে বোবা মেয়েটি কাহারও নজরে পড়ে কি না জানি না, কিন্তু কাজকর্মে যখনি অবসর পায় তখনি সে এই নদীতীরে আসিয়া বসে। • • প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়। বেন তাহার হইয়া কথা কয়। নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর- সমস্ত মিশিয়া চারি দিকের চলাফেরা-আন্দোলন-কম্পনের সহিত এক হইয়া সমুদ্রের তরঙ্গরাশির স্তায় বালিকার চিরনিস্তব্ধ হৃদয়উপকূলের নিকটে জাসিয়া ভাঙিয়া ভাঙিয়া পড়ে। প্রকৃতির এই বিবিধ শৰ গল্পগুচ্ছ ولما ه چا এবং বিচিত্র গতি ইহাও বোবার ভাষা— বড়ো বড়ে চক্ষুপল্লববিশিষ্ট স্বভার যে ভাষা তাহারই একটা বিশ্বব্যাপী বিস্তার ; ঝিল্লিরবপূর্ণ তৃণভূমি হইতে শব্বাতীত নক্ষত্রলোক পর্যন্ত কেবল ইঙ্গিত, ভঙ্গী, সংগীত, ক্ৰন্দন এবং দীর্ঘনিশ্বাস । এবং মধ্যাহ্নে যখন মাঝিরা জেলেরা খাইতে যাইত, গৃহস্থের ঘুমাইত, পাখিরা ডাকিত না, খেয়া-নৌকা বন্ধ থাকিত, সজন জগৎ সমস্ত কাজকর্মের মাঝখানে সহসা থামিয়া গিয়া ভয়ানক বিজনমূর্তি ধারণ করিত, তখন কন্দ্র মহাকাশের তলে কেবল একটি বোবা প্রকৃতি এবং একটি বোবা মেয়ে মুখামুখি চুপ করিয়া বসিয়া থাকিত— একজন সুবিস্তীর্ণ রৌদ্রে, আর-একজন ক্ষুদ্র তরুচ্ছায়ায় । ৯ স্বভার যে গুটিকতক অন্তরঙ্গ বন্ধুর দল ছিল না তাহা নহে। গোয়ালের দুটি গাভী, তাহাদের নাম সর্বশী ও পাঙ্গুলি। সে নাম বালিকার মুখে তাহারা কখনো শুনে নাই, কিন্তু তাহার পদশব্দ তাহারা চিনিত— তাহার কথাহীন একটা করুণ সুর ছিল, তাহার মর্ম তাহারা ভাষার অপেক্ষা সহজে বুঝিত। স্বভা কখন তাহাদের আদর করিতেছে, কখন ভৎসনা করিতেছে, কথন মিনতি করিতেছে, তাহা তাহারা মানুষের অপেক্ষ ভালো বুঝিতে পারিত। স্বভা গোয়ালে ঢুকিয়া দুই বাহুর দ্বারা সর্বশীর গ্রীবা বেষ্টন করিয়া তাহার কানের কাছে আপনার গণ্ডদেশ ঘর্ষণ করিত এবং পাঙ্গুলি স্নিগ্ধদৃষ্টিতে তাহার প্রতি নিরীক্ষণ করিয়া তাহার গা চাটিত । বালিকা দিনের মধ্যে নিয়মিত তিনবার করিয়া গোয়ালঘরে যাইত, তাহা ছাড়া অনিয়মিত আগমনও ছিল ; গৃহে যে দিন কোনো কঠিন কথা শুনিত সে দিন সে অসময়ে তাহার এই মূক বন্ধুছুটির কাছে আসিত— তাহার সহিষ্ণুতাপরিপূর্ণ বিষাদশান্ত দৃষ্টিপাত হইতে তাহারা কী-একটা অন্ধ অনুমানশক্তির দ্বারা বালিকার মর্মবেদন যেন বুঝিতে পারিত, এবং স্বভার গা ঘেঁষিয়া আসিয়া অল্পে অল্পে তাহার বাস্থতে শিং ঘষিয়া ঘষিয়া তাহাকে নির্বাক্ ব্যাকুলতার সহিত সাত্ত্বনা দিতে চেষ্ট্র করিত। ইহারা ছাড়া ছাগল এবং বিড়ালশাবকও ছিল ; কিন্তু তাহদের সহিত স্বভার এরূপ সমকক্ষভাবের মৈত্রী ছিল না, তথাপি তাহারা যথেষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করিত। বিড়ালশিশুটি দিনে এবং রাত্রে যখন-তখন স্বভার গরম সুভা ২৬৭ কোলটি নি:সংকোচে অধিকার করিয়া মুখনিদ্রার আয়োজন করিত এবং স্বভা তাহার গ্রীব ও পৃষ্ঠে কোমল অঙ্গুলি বুলাইয়া দিলে যে তাহার নিত্রীকর্ষণের বিশেষ সহায়তা হয়, ইঙ্গিতে এরূপ অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিত । כS\ উন্নত শ্রেণীর জীবের মধ্যে স্বভার আরও একটি সঙ্গী জুটিয়াছিল। কিন্তু তাহার সহিত বালিকার ঠিক কিরূপ সম্পর্ক ছিল তাহ নির্ণয় করা কঠিন, কারণ, সে ভাষাবিশিষ্ট জীব ; সুতরাং উভয়ের মধ্যে সমভাষা ছিল না । গোসাইদের ছোটো ছেলেটি– তাহার নাম প্রতাপ । লোকটি নিতান্ত অকৰ্মণ্য । সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ব করিবে, বস্থ চেষ্টার পর বাপ মা সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন । অকৰ্মণ্য লোকের একটা সুবিধা এই যে, আত্মীয় লোকেরা তাহাদের উপরে বিরক্ত হয় বটে, কিন্তু প্রায় তাহার নিঃসম্পর্ক লোকদের প্রিয়পাত্র হয়- কারণ, কোনো কার্ষে আবদ্ধ না থাকাতে তাহারা সরকারি সম্পত্তি হইয়া দাড়ায় । শহরে যেমন একআধটা গৃহসম্পর্কহীন সরকারি বাগান থাকা আবশ্বক তেমনি গ্রামে দুইচারিট আকর্মণ্য সরকারি লোক থাকার বিশেষ প্রয়োজন । কাজে-কর্মে অামোদে-অবসরে যেখানে একটা লোক কম পড়ে সেখানেই তাহাদিগকে হাতের কাছে পাওয়া যায় । প্রতাপের প্রধান শখ— ছিপ ফেলিয়া মাছ ধরা। ইহাতে অনেকটা সময় সহজে কাটানো যায়। অপরাহ্লে নদীতীরে ইহাকে প্রায় এই কাজে নিযুক্ত দেখা যাইত। এবং এই উপলক্ষে স্বভার সহিত তাহার প্রায় সাক্ষাৎ হইত। যে-কোনো কাজেই নিযুক্ত থাক, একটা সঙ্গী পাইলে প্রতাপ থাকে ভালো । মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গীই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ– এইজন্য প্রতাপ স্বভার মর্যাদা বুঝিত। এইজন্য, সকলেই স্বভাকে স্বভা বলিত, প্রতাপ আরএকটু অতিরিক্ত আদর সংযোগ করিয়া স্বভাকে 'স্থ' বলিয়া ডাকিত । স্বভা তেঁতুলতলায় বসিয়া থাকিত এবং প্রতাপ অনতিদূরে মাটিতে ছিপ ফেলিয়া জলের দিকে চাহিয়া থাকিত। প্রতাপের একটি করিয়া পান বরাদ ছিল, স্বভা তাহা নিজে সাজিয়া আনিত । এবং বোধ করি অনেক ক্ষণ বসিয়া গল্পগুচ্ছ بیراه با বসিয়া চাহিয়া চাহিয়া ইচ্ছা করিত, প্রতাপের কোনো-একটা বিশেষ সাহায্য করিতে, একট-কোনো কাজে লাগিতে, কোনোমতে জানাইয়া দিতে যে এই পৃথিবীতে সেও একজন কম প্রয়োজনীয় লোক নহে। কিন্তু, কিছুই করিবার ছিল না । তখন সে মনে-মনে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করিত— মন্ত্রবলে সহসা এমন একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটাইতে ইচ্ছা করিত যাহা দেখিয়া প্রতাপ আশ্চর্য হইয়া যাইত, বলিত, “তাই তো, আমাদের স্থভির যে এত ক্ষমতা তাহ তো জানিতাম না ।” মনে করে, সুভ যদি জলকুমারী হইত ; আস্তে আস্তে জল হইতে উঠিয়া একটা সাপের মাথার মণি ঘাটে রাখিয়া যাইত ; প্রতাপ তাহার তুচ্ছ মাছ ধরা রাথিয়া সেই মানিক লইয়া জলে ডুব মারিত ; এবং পাতালে গিয়া দেখিত, রুপার অট্টালিকায় সোনার পালঙ্কে— কে বসিয়া ?— আমাদের বাণীকণ্ঠের ঘরের সেই বোবা মেয়ে সু— আমাদের স্ব সেই মণিদীপ্ত গভীর নিস্তব্ধ পাতালপুরীর একমাত্র রাজকন্যা । তাহা কি হইতে পারিত না । তাহা কি এতই অসম্ভব। আসলে কিছুই অসম্ভব নয়, কিন্তু তবুও স্ব প্রজাশূন্ত পাতালের রাজবংশে না জন্মিয়া বাণীকণ্ঠের ঘরে আসিয়া জন্মিয়াছে এবং গোসাইদের ছেলে প্রতাপকে কিছুতেই আশ্চর্য করিতে পারিতেছে না। 8 স্বভার বয়স ক্রমেই বাড়িয়া উঠিতেছে। ক্রমে সে যেন আপনাকে আপনি অনুভব করিতে পারিতেছে। যেন কোনো-একটা পূর্ণিমাতিথিতে কোনো-একটা সমুদ্র হইতে একটা জোয়ারের স্রোত আসিয়া তাহার অন্তরাত্মাকে এক নূতন অনির্বচনীয় চেতনাশক্তিতে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিতেছে। সে আপনাকে আপনি দেখিতেছে, ভাবিতেছে, প্রশ্ন করিতেছে, এবং বুঝিতে পারিতেছে না । গভীর পূর্ণিমারাত্রে সে এক-একদিন ধীরে শয়নগৃহের দ্বার খুলিয়া ভয়ে ভয়ে মুখ বাড়াইয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখে, পূর্ণিমাপ্রকৃতিও স্বভার মতো একাকিনী স্থপ্ত জগতের উপর জাগিয়া বসিয়া— যৌবনের রহস্তে পুলকে বিষাদে অসীম নির্জনতার একেবারে শেষ সীমা পর্যস্ত, এমন-কি তাহা অতিক্রম সুভা * করিয়াও থমথম করিতেছে, একটি কথা কহিতে পারিতেছে না। এই নিস্তব্ধ ব্যাকুল প্রকৃতির প্রাস্তে একটি নিস্তন্ধ ব্যাকুল বালিকা দাড়াইয়া । এ দিকে কন্যাভারগ্রস্ত পিতামাতা চিন্তিত হইয়া উঠিয়াছেন । লোকেও নিন্দ আরম্ভ করিয়াছে। এমন-কি, এক-ঘরে করিবে এমন জনরবও শুনা যায়। বাণীকণ্ঠের সচ্ছল অবস্থা, দুই বেলাই মাছভাত খায়, এজন্য তাহার শত্রু ছিল । স্ত্রীপুরুষে বিস্তর পরামর্শ হইল। কিছুদিনের মতো বাণী বিদেশে গেল। অবশেষে ফিরিয়া আসিন্ধা কহিল, “চলে, কলিকাতায় চলে ।” বিদেশধাত্রার উদযোগ হইতে লাগিল। কুয়াশা ঢাকা প্রভাতের মতো স্বভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাম্পে একেবারে ভরিয়া গেল। একটা অনির্দিষ্ট আশঙ্কা-বশে সে কিছুদিন হইতে ক্রমাগত নির্বাক জন্তুর মতো তাহার বাপমায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত— ডাগর চক্ষু মেলিয়া তাহদের মুখের দিকে চাহিয়া কী-একটা বুঝিতে চেষ্টা করিত, কিন্তু তাহারা কিছু বুঝাইয়া বলিতেন না । ইতিমধ্যে একদিন অপরাহ্লে জলে ছিপ ফেলিয়া প্রতাপ হাসিয়া কহিল, “কী রে স্থ, তোর নাকি বর পাওয়া গেছে, তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস ? দেথিস, আমাদের ভুলিস্ নে ৷” বলিয়া আবার মাছের দিকে মনোযোগ করিল। মর্মবিদ্ধ হরিণী ব্যাধের দিকে যেমন করিয়া তাকায়, নীরবে বলিতে থাকে ‘আমি তোমার কাছে কী দোষ করিয়াছিলাম, স্বভা তেমনি করিয়া প্রতাপের দিকে চাহিল ; সে দিন গাছের তলায় আর বসিল না । বাণীকণ্ঠ নিদ্রা হইতে উঠিয়া শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিলেন, স্বভা তাহার পায়ের কাছে বলিয়া র্তাহার মুখের দিকে চাহিয়া কাদিতে লাগিল। অবশেষে তাহাকে সাম্বন৷ দিতে গিয়া বাণী কণ্ঠের শুষ্ক কপোলে অশ্র গড়াইয় পড়িল । কাল কলিকাতায় যাইবার দিন স্থির হইয়াছে। স্বভা গোয়ালঘরে তাহার বাল্যসর্থীদের কাছে বিদায় লইতে গেল, তাহাদিগকে স্বহস্তে খাওয়াইয়া, গলা ধরিয়া একবার দুই চোখে যত পারে কথা ভরিয়া তাহাদের মুখের দিকে চাহিল— দুই নেত্রপল্লব হইতে টপ টপ করিয়া অশ্রজল পড়িতে লাগিল । S》 গল্পগুচ্ছ সেদিন শুক্লদ্বাদশীর রাত্রি। স্বভা শয়নগৃহ হইতে বাহির হইয় তাহার সেই চিরপরিচিত নদীতটে শম্পশয্যায় লুটাইয়া পড়িল— যেন ধরণীকে, এই প্রকাও মুক মানবমাতাকে দুই বাহুতে ধরিয়া বলিতে চাহে, “তুমি আমাকে বাইতে দিয়ে না, মা । আমার মতো দুটি বাহু বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাথো ? কলিকাতার এক বাসায় মুভার মা একদিন স্বভাকে খুব করিয়া সাজাইয়া দিলেন। আঁটিয়া চুল বাধিয়া, খোপায় জরির ফিতা দিয়া, অলংকারে আচ্ছন্ন করিয়া তাহার স্বাভাবিক শ্ৰী যথাসাধ্য বিলুপ্ত করিয়া দিলেন । স্বভার দুই চক্ষু দিয়া অশ্রু পড়িতেছে ; পাছে চোখ ফুলিয়া খারাপ দেখিতে হয় এজন্ত তাহার মাতা তাঁহাকে বিস্তর ভৎসনা করিলেন, কিন্তু অশ্রুজল ভৎসিনা মানিল না। বন্ধুসঙ্গে বর স্বয়ং কনে দেখিতে আসিলেন– কন্যার মা-বাপ চিস্তিত, শঙ্কিত, শশব্যস্ত হইয়া উঠিলেন ; যেন দেবতা স্বয়ং নিজের বলির পশু বাছিয়া লইতে আসিয়াছেন । মা নেপথ্য হইতে বিস্তর তর্জন গর্জন শাসন করিয়া বালিকার অশ্রস্রোত দ্বিগুণ বাড়াইয়া পরীক্ষকের সম্মুখে পাঠাইলেন। পরীক্ষক অনেকক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন, “মন্দ নহে।" বিশেষত, বালিকার ক্রনন দেখিয়া বুঝিলেন ইহার হৃদয় আছে, এবং হিসাব করিয়া দেখিলেন, "যে হৃদয় আজ বাপ-মায়ের বিচ্ছেদসম্ভাবনায় ব্যথিত হইয়া উঠিয়াছে সেই হৃদয় আজ বাদে কাল আমারই ব্যবহারে লাগিতে পরিবে । শুক্তির মুক্তার স্তায় বালিকার অশ্রজল কেবল বালিকার মূল্য বাড়াইয়া দিল, তাহার হইয়া আর-কোনো কথা বলিল না । পঞ্জিকা মিলাইয়া খুব একটা শুভলগ্নে বিবাহ হইয়া গেল । বোবা মেয়েকে পরের হস্তে সমর্পণ করিয়া বাপ মা দেশে চলিয়া গেলতাহাদের জাতি ও পরকাল রক্ষণ হইল । বর পশ্চিমে কাজ করে । বিবাহের অনতিবিলম্বে স্ত্রীকে পশ্চিমে লইয়া গেল । সপ্তাহখানেকের মধ্যে সকলেই বুঝিল, নববধূ বোবা । তা কেহ বুঝিল সুভ २> > না সেটা তাহার দোষ নহে । সে কাহাকেও প্রতারণা করে নাই । তাহার ছুটি চক্ষু সকল কথাই বলিয়াছিল, কিন্তু কেহ তাহা বুঝিতে পারে নাই। সে চারি দিকে চায়— ভাষা পায় না— যাহারা বোবার ভাষা বুঝিত সেই আজন্মপরিচিত মুখগুলি দেখিতে পায় না— বালিকার চিরনীরব হৃদয়ের মধ্যে একটা অসীম অব্যক্ত ক্ৰন্দন বাজিতে লাগিল— অন্তৰ্যামী ছাড়া আর-কেহ তাহা শুনিতে পাইল না । এবার তাহার স্বামী চক্ষু এবং কর্ণেন্দ্রিয়ের দ্বারা পূীক্ষা করিয়া এৰু ভাষাবিশিষ্ট কন্যা বিবাহ করিয়া আনিল । মাঘ ১২৯৯