গল্পস্বল্প/মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য

উইকিসংকলন থেকে
Jump to navigation Jump to search


গল্পস্বল্প।

 

 

মনুষ্য জীবনের উদেশ্য।

আমরা সকলেই জানি মনুষ্য পশু হইতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু ভাবিয়া দেখ—কিসে? পশুরও শরীর আছে, মনুষ্যেরও শরীর আছে; মনুষ্যের আকার পশু হইতে ভিন্ন বটে, কিন্তু আকারের প্রভেদেই যে, কেহ শ্রেষ্ঠ হয় তাহা নহে। পশুদিগেরও সকলের ভিন্ন ভিন্ন আকার। মনুষ্যের ন্যায় পশুদিগেরও ক্ষুধা, তৃষ্ণ, ক্রোধ, দ্বেষ, স্নেহ, ভালবাসা আছে, এমন কি জন্তুদিগের মধ্যে বুদ্ধিরও পরিচয় পাওয়া যায়। তবে মানুষকে পশু অপেক্ষ শ্রেষ্ঠ বলা যায় কেন? মানুষের এমন কতকগুলি গুণ আছে যাহা পশুতে পাওয়া যায় না—সেই গুণেই মানুষ বড়। পশুর যদিও বুদ্ধি আছে, কিন্তু মানুষের ন্যায় উচ্চ বুদ্ধি নাই, চিন্তা-শক্তি নাই, মানুষের মত ধর্ম্মভাব নাই। চিন্তাবলে, বুদ্ধিবলে মানুষ ভাল হইতে মন্দের প্রভেদ বুঝিতেছে, কল কৌশল উদ্ভাবন করিতেছে, পৃথিবীতে বসিয়া সূর্যের সংবাদ আনিতেছে। ধর্মের ভাব আছে বলিয়া মানুষ ঈশ্বরানুরাগী হইতেছে, কুপ্রবৃত্তিকে দমন করিতেছে এবং সমস্ত জগৎবাসীকে সেই এক জগৎপিতার সন্তান জ্ঞানে পরোপকারে রত হইতেছে, অন্তের মঙ্গলে নিজের মঙ্গল জ্ঞান করিয়া নিঃস্বার্থতার কাছে স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতেছে। এই সকল গুণের জন্যই মানুষ পশু হইতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু যাহার এ সকল গুণ বিকশিত হয় নাই, যে অজ্ঞান,—যাহার ধর্ম্মভাব নাই, পশুর সহিত তাহার বিশেষ প্রভেদ নাই। সুতরাং কেবল মানুষের শরীর হইলেই মানুষ হওয়া যায় না; জ্ঞান ধর্ম্মে যে উন্নতি লাভ করিয়াছে সেই প্রকৃত মনুষ্য। আহার বিহার করিয়া পশুর মত জীবন ধারণ করাই মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য নহে, মনুষ্যত্ব লাভ করিতে চেষ্টা করাই মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য। ޗ

 তুমি যদি মনুষ্য হইতে চাও তবে জ্ঞানের অনুশীলন কর; ক্ষমা, করুণা, সত্যানুরাগ প্রভৃতি মনুষ্যের অন্তর নিহিত সদগুণ সকলের বিকাশ ও ক্রোধ দ্বেষ লোভ প্রভৃতি পাশব প্রবৃত্তি সকলের ন্যায্য দমন দ্বারা যথার্থ মনুষ্য হও। ঈশ্বর, যিনি আমদের পিতা মাতা সৃষ্টিকর্ত্তা, ইহাই তাহার আদেশ, ইহাই তাঁহার প্রিয় কার্য্য। আমাদের মঙ্গলের জন্যই তিনি আমাদিগকে তাহার এই আজ্ঞা পালন করিতে বলেন। তাহার এই আজ্ঞার নামই ধর্ম্মনীতি। মনুষ্য অভিজ্ঞতা দ্বারা দেখিতে পায় এই নীতি যাহারা পালন করিয়া চলেন তাহারা যথার্থ বড় লোক, তাহারাই মহাত্মা; আর যদ্বারা ইহা অমান্য করিয়া চলে তাহারা মনুষ্য নামের অযোগ্য।

 অন্যায় কর্ম্ম করিতে যাহার সঙ্কোচ নাই, সহস্রবার ঈশ্বরের নাম গ্রহণ করিলেও সে ঈশ্বরানুরাগী নহে। যে ঈশ্বরের প্রিয় কার্য সাধন করে সেই যথার্থ সাধক। ঈশ্বর তোমাকে মানুষ করিয়া গড়িয়াছেন, তাহার প্রিয় কার্য সাধন দ্বারা, অর্থাৎ শুভ কার্যের অনুষ্ঠান এবং অন্যায়াচরণ পরিত্যাগ পূর্বক তাহার প্রতি অনুরাগী হইয়া তোমার জীবনের উদ্দেশ্য সফল কর। ইহাতেই তুমি যথার্থ সুখ শান্তি লাভ করিবে।