বিষয়বস্তুতে চলুন

গুরুদক্ষিণা

উইকিসংকলন থেকে

গুরুদক্ষিণা

গুরুদক্ষিণা

সতীশচন্দ্র রায় প্রণীত

তৃতীয় সংস্করণ


১৯২২

মূল্য আট আনা। 

 প্রাপ্তিস্থান:—

১। ইণ্ডিয়ান পাব্‌লিশিং হাউস

 ২২।১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

২। ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড—এলাহাবাদ।

প্রকাশক

শ্রীঅপূর্ব্বকৃষ্ণ বসু

ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড্‌—এলাহাবাদ।

নিউ আর্টিষ্টিক প্রেস

১এ, রামকিষণ দাসের লেন, কলিকাতা।

শ্রীশরৎশশী রায় দ্বারা মুদ্রিত।

ভূমিকা

 জীবনে যে ভাগ্যবান্ পুরুষ সফলতা লাভ করিতে পারিয়াছে, মৃত্যুতে তাহার পরিচয় উজ্জ্বলতর হইয়া উঠে। তাহাকে যেমন হারাই, তেমনি লাভও করি। মৃত্যু তাহার চারিদিকে যে অবকাশ রচনা করিয়া দেয়, তাহাতে তাহার চরিত্র, তাহার কীর্ত্তি, মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবপ্রতিমার মত সম্পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।

 কিন্তু যে জীবন দৈবশক্তি লইয়া পৃথিবীতে আসিয়াছিল, অথচ অমরতালাভের পূর্ব্বেই মৃত্যু যাহাকে অকালে আক্রমণ করিয়াছে, সে আপনার পরিচয় আপনি রাখিয়া যাইতে পারিল না। যাহারা তাহাকে চিনিয়াছিল, তাহার বর্ত্তমান অসম্পূর্ণ আরম্ভের মধ্যে ভাবী সফল পরিণাম পাঠ করিতে পারিয়াছিল, যাহারা তাহার বিকাশের জন্য অপেক্ষা করিয়া ছিল, তাহাদের বিচ্ছেদবেদনার মধ্যে একটা বেদনা এই যে, আমার শোককে সকলের সামগ্রী করিতে পারিলাম না। মৃত্যু কেবল ক্ষতিই রাখিয়া গেল।

 সতীশচন্দ্র সাধারণের কাছে পরিচিত নহে। সে তাহার যে অল্প-কয়টি লেখা রাখিয়া গেছে, তাহার মধ্যে প্রতিভার প্রমাণ এমন নিঃসংশয় হইয়া উঠে নাই যে, অসঙ্কোচে তাহা পাঠকদের কৌতূহলী দৃষ্টির সম্মুখে আত্মমহিমা প্রকাশ করিতে পারে। কেহ বা তাহার মধ্যে গৌরবের আভাস দেখিতেও পারেন, কেহ বা না-ও দেখিতে পারেন, তাহা লইয়া জোর করিয়া আজ কিছু বলিবার পথ নাই।

 কিন্তু লেখার সঙ্গে সঙ্গে যে ব্যক্তি লেখকটিকেও কাছে দেখিবার উপযুক্ত সুযোগ পাইয়াছে, সে ব্যক্তি কখনো সন্দেহমাত্র করিতে পারে না যে, সতীশ বঙ্গসাহিত্যে যে প্রদীপটি জ্বালাইয়া যাইতে পারিল না, তাহা জ্বলিলে নিভিত না।

 আপনার দেয় সে দিয়া যাইতে সময় পায় নাই, তাহার প্রাপ্য তাহাকে এখন কে দিবে? কিন্তু আমার কাছে সে যখন আপনার পরিচয় দিয়া গেছে, তখন তাহার অকৃতার্থ মহত্ত্বের উদ্দেশে সকলের সমক্ষে শোকসন্তপ্তচিত্তে আমার শ্রদ্ধার সাক্ষ্য না দিয়া আমি থাকিতে পারিলাম না। তাহার অনুপম হৃদয়মাধুর্য্য, তাহার অকৃত্রিম কল্পনাশক্তির মহার্ঘতা, জগতে কেবল আমার একলার মুখের কথার উপরেই আত্মপ্রমাণের ভার দিয়া গেল, এ আক্ষেপ আমার কিছুতেই দূর হইবে না। তাহার চরিত্রের মহত্ত্ব কেবল আমারি স্মৃতির সামগ্রী করিয়া রাখিব, সকলকে তাহার ভাগ দিতে পারিব না, ইহা আমার পক্ষে দুঃসহ।

 সতীশ যখন প্রথম আমার কাছে আসিয়াছিল, সে অধিকদিনের কথা নহে। তখন সে কিশোর বয়স্ক—কলেজে পড়িতেছে—সঙ্কোচে-সম্ভ্রমে বিনম্র-মুখে অল্পই কথা।

 কিছুদিন আলাপ করিয়া দেখিলাম, সাহিত্যের হাওয়াতে পক্ষবিস্তার করিয়া-দিয়া সতীশের মন একেবারে উধাও হইয়া উড়িয়াছে। এ বয়সে অনেক লোকের সঙ্গে আমার আলাপ হইয়াছে, কিন্তু এমন সহজ অন্তরঙ্গতার সহিত সাহিত্যের মধ্যে আপনার সমস্ত অন্তঃকরণকে প্রেরণ করিবার ক্ষমতা আমি অন্যত্র দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় না।

 সাহিত্যের মধ্যে ব্রাউনিং তখন সতীশকে বিশেষভাবে আবিষ্ট করিয়া ধরিয়াছিল। খেলাচ্ছলে ব্রাউনিং পড়িবার জো নাই। যে লোক ব্রাউনিংকে লইয়া ব্যাপৃত থাকে, সে হয় ফ্যাশানের খাতিরে, নয়, সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগবশতই এ কাজ করে। আমাদের দেশে ব্রাউনিঙের ফ্যাশান্ বা ব্রাউনিঙের দল প্রবর্ত্তিত হয় নাই, সুতরাং ব্রাউনিং পড়িতে যে অনুরাগের বল আবশ্যক হয়, তাহা বালক সতীশেরও প্রচুর পরিমাণে ছিল। বস্তুত সতীশ সাহিত্যের মধ্যে প্রবেশ ও সঞ্চরণ করিবার স্বাভাবিক অধিকার লইয়া আসিয়াছিল।

 যে সময়ে সতীশের সহিত আমার আলাপের সূত্রপাত হইয়াছিল, সেই সময়ে বোলপুর ষ্টেশনে আমার পিতৃদেবের স্থাপিত “শান্তিনিকেতন” নামক আশ্রমে আমি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলাম। ভারতবর্ষে প্রাচীনকালে দ্বিজবংশীয় বালকগণ যে-ভাবে, যে-প্রণালীতে শিক্ষালাভ করিয়া মানুষ হইত, এই বিদ্যালয়ে সেই ভাব, সেই প্রণালী অবলম্বন করিয়া বর্ত্তমানপ্রচলিত পাঠ্যবিষয়গুলিকে শিক্ষা দিব, এই আমার ইচ্ছা ছিল। গুরুশিষ্যের মধ্যে আমাদের দেশে যে আধ্যাত্মিক সম্বন্ধ ছিল, সেই সম্বন্ধের মধ্যে থাকিয়া ছাত্রগণ ব্রহ্মচর্য্যপালনপূর্ব্বক শুদ্ধশুচি-সংযত শ্রদ্ধাবান্ হইয়া মনুষ্যত্বলাভ করিবে, এই আমার সঙ্কল্প ছিল।

 বলা বাহুল্য, এখনকার দিনে এ কল্পনা সম্পূর্ণভাবে কাজে খাটানো সহজ নহে। এমন অধ্যাপক পাওয়াই কঠিন যাঁহারা অধ্যাপনকার্য্যকে যথার্থ ধর্ম্মব্রতস্বরূপে গ্রহণ করিতে পারেন। অথচ বিদ্যাকে পণ্যদ্রব্য করিলেই গুরুশিষ্যের সহজ সম্বন্ধ নষ্ট হইয়া যায়—ও তাহাতে এরূপ বিদ্যালয়ের আদর্শ ভিত্তিহীন হইয়া পড়ে।

 এই কথা লইয়া একদিন খেদ করিতেছিলাম—তখন সতীশ আমার ঘরের এক কোণে চুপ করিয়া বসিয়াছিল। সে হঠাৎ লজ্জায় কুণ্ঠিত হইয়া বিনীতস্বরে কহিল—“আমি বোলপুর ব্রহ্মবিদ্যালয়ে শিক্ষাদানকে জীবনের ব্রত বলিয়া গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু আমি কি এ কাজের যোগ্য?”

 তখনো সতীশের কলেজের পড়া সাঙ্গ হয় নাই। সে আর কিছুর জন্যই অপেক্ষা করিল না, বিদ্যালয়ের কাজে আত্মসমর্পণ করিল।

 ভাবী সাংসারিক উন্নতির সমস্ত আশা ও উপায় এইরূপে বিসর্জ্জন করাতে সতীশ তাহার আত্মীয়বন্ধুদের কাছ হইতে কিরূপ বাধা পাইয়াছিল, তাহা পাঠকগণ কল্পনা করিতে পারিবেন। এই সংগ্রামে সতীশের হৃদয় অনেকদিন অনেক গুরুতর আঘাত সহিয়াছিল, কিন্তু পরাস্ত হয় নাই।

 কল্পনাক্ষেত্র হইতে কর্ম্মক্ষেত্রে নামিয়া আসিলেই অনেকের কাছে সঙ্কল্পের গৌরব চলিয়া যায়। প্রতিদিনের খণ্ডতা অসম্পূর্ণতার মধ্যে তাহারা বৃহৎকে, দূরকে, সমগ্রকে দেখিতে পায় না—প্রাত্যহিক চেষ্টার মধ্যে যে সমস্ত ভাঙাচোরা, জোড়াতাড়া, বিরোধ, বিকার, অসামঞ্জস্য অনিবার্য্য তাহাতে পরিপূর্ণ পরিণামের মহত্ত্বচ্ছবি আচ্ছন্ন হইয়া যায়। যে সকল কাজের শেষ ফলটিকে লাভ করা দূরে থাক্, চক্ষেও দেখিবার আশা করা যায় না, যাহার মানসী মূর্ত্তির সহিত কর্ম্মরূপের প্রভেদ অত্যন্ত অধিক, তাহার জন্য জীবন উৎসর্গ করা, তাহার প্রতিদিনের স্তূপাকার বোঝা কাঁধে লইয়া পথ খুঁজিতে খুঁজিতে চলা সহজ নহে—যাহারা উৎসাহের জন্য বাহিরের দিকে তাকায়, এ কাজ তাহাদের নহে—কাজও করিতে হইবে নিজের শক্তিতে, তাহার বেতনও জোগাইতে হইবে নিজের মনের ভিতর হইতে—নিজের মধ্যে এরূপ সহজ সম্পদের ভাণ্ডার সকলের নাই।

 বিধাতার বরে সতীশ অকৃত্রিম কল্পনাসম্পদ্ লাভ করিয়াছিল। তাহার প্রমাণ এই যে, সে ক্ষুদ্রের ভিতর বৃহৎকে, প্রতিদিনের মধ্যে চিরন্তনকে সহজে দেখিতে পাইত। যে ব্যক্তি ভিখারী শিবের কেবল বাঘছাল এবং ভস্মলেপটুকুই দেখিতে পায়, সে তাঁহাকে দীন বলিয়া অবজ্ঞা করিয়া ফিরিয়া যায়—সংসারে শিব তাঁহার ভক্তদিগকে ঐশ্বর্য্যের ছটা বিস্তার করিয়া আহ্বান করেন না—বাহ্যদৈন্যকে ভেদ করিয়া যে লোক এই ভিক্ষুকের রজতগিরিসন্নিভ নির্ম্মল ঈশ্বরমূর্ত্তি দেখিতে পান, তিনিই শিবকে লাভ করেন—ভুজঙ্গবেষ্টনকে তিনি বিভীষিকা বলিয়া গণ্য করেন না এবং এই পরমকাঙালের রিক্তভিক্ষাপাত্রে আপনার সর্ব্বস্ব সমর্পণ করাকেই চরমলাভ বলিয়া জ্ঞান করেন।

 সতীশ প্রতিদিনের ধূলিভস্মের অন্তরালে, কর্ম্মচেষ্টার সহস্র দীনতার মধ্যে শিবের শিবমূর্ত্তি দেখিতে পাইত, তাহার সেই তৃতীয় নেত্র ছিল। সেইজন্য এত অল্পবয়সে, এই শিশু অনুষ্ঠানের সমস্ত দুর্ব্বলতা-অপূর্ণতা—সমস্ত দীনতার মধ্যে তাহার উৎসাহউদ্যম অক্ষুণ্ণ ছিল, তাহার অন্তঃকরণ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় নাই। বোলপুরের এই প্রান্তরের মধ্যে গুটিকয়েক বালককে প্রত্যহ পড়াইয়া যাওয়ার মধ্যে কোনো উত্তেজনার বিষয় ছিল না, লোকচক্ষুর বাহিরে, সমস্ত খ্যাতিপ্রতিপত্তি ও আত্মনামঘোষণার মদমত্ততা হইতে বহুদূরে একটি নির্দ্দিষ্ট কর্ম্মপ্রণালীর সঙ্কীর্ণতার মধ্য দিয়া আপন তরুণ জীবনতরী যে শক্তিতে সতীশ প্রতিদিন বাহিয়া চলিয়াছিল, তাহা খেয়ালের জোর নয়, প্রবৃত্তির বেগ নয়, ক্ষণিক উৎসাহের উদ্দীপনা নয়—তাহা তাহার মহান্ আত্মার স্বতঃস্ফূর্ত্ত আত্মপরিতৃপ্ত শক্তি।

 বোলপুর ব্রহ্মবিদ্যালয়ের সম্বন্ধেই সতীশকে আমি নিকটে পাইয়াছিলাম, তাহার অন্তরাত্মার সহিত আমার যথার্থ পরিচয় ঘটিতেছিল। এই বিদ্যালয়ের কল্পনা আমার মনের মধ্যে যে কি ভাবের ভিত্তি অবলম্বন করিয়া উঠিয়াছে, তাহা ব্যক্ত করিয়া না বলিলে এ রচনা অসম্পূর্ণ থাকিবে। কয়েক বৎসর পূর্ব্বে আমার কোনো বন্ধুকে আমি এই বিদ্যালয়সম্বন্ধে যে পত্র লিখিয়াছিলাম, এখানে তাহার কিয়দংশ উদ্ধৃত করা যাইতে পারে:—

 “মাঝে মাঝে আমি কল্পনা করি, পূর্ব্বকালে ঋষিরা যেমন তপোবনে কুটীর রচনা করিয়া পত্নী, বালকবালিকা ও শিষ্যদের লইয়া অধ্যয়ন-অধ্যাপনে নিযুক্ত থাকিতেন, তেমনি আমাদের দেশের জ্ঞানপিপাসু জ্ঞানীরা যদি এই প্রান্তরের মধ্যে তপোবন রচনা করেন, তাঁহারা জীবিকাযুদ্ধ ও নগরের সংক্ষোভ হইতে দূরে থাকিয়া আপন-আপন বিশেষ জ্ঞানচর্চ্চায় রত থাকেন তবে বঙ্গদেশ কৃতার্থ হয়। অবশ্য, অশনবসনের প্রয়োজনকে খর্ব্ব করিয়া জীবনের ভারকে লঘু করিতে হইবে। উপকরণের দাসত্ব হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া সর্ব্বপ্রকার বেষ্টনহীন নির্ম্মল আসনের উপর তপোনিরত মনকে প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। যেমন শাস্ত্রে কাশীকে বলে পৃথিবীর বাহিরে, তেম্‌নি সমস্ত ভারতবর্ষের মধ্যে এই একটুখানি স্থান থাকিবে,—যাহা রাজা ও সমাজের সকল প্রকার বন্ধনপীড়নের বাহিরে। ইংরাজ রাজা হউক, বা রুশ রাজা হউক্ এই তপোবনের সমাধি কেহ ভঙ্গ করিতে পারিবে না। এখানে আমরা খণ্ডকালের অতীত;—আমরা সুদূর ভূতকাল হইতে সুদূর ভবিষ্যৎকাল পর্য্যন্ত ব্যাপ্ত করিয়া বাস করি; সনাতন যাজ্ঞবল্ক্য এবং অনাগত যুগান্তর আমাদের সমসাময়িক; কে আমাদের ষ্টেট্‌সেক্রেটারি, কে আমাদের ভাইস্‌রয়—কে কোন্ আইন করিল, এবং কে সে আইন্‌ উল্টাইয়া দিল, আমরা সে খবর রাখি না। আকাশ তাহার গ্রহতারকা-মেঘরৌদ্রে এবং প্রান্তর তাহার তৃণ-গুল্মে ও ঋতুপর্য্যায়ে আমাদের প্রাত্যহিক খবরের কাগজ। আমাদের তপোবনবাসীদের—জন্মমৃত্যুবিবাহের অনুষ্ঠানপরম্পরা, এখানকার নিভৃতশান্তি ও সরল সৌন্দর্য্যের চিরন্তন সমারোহে সম্পন্ন হইতে থাকে। আমাদের বালকেরা হোমধেনু চরাইয়া আসিয়া পড়া লইতে বসে, এবং বালিকারা গোদোহনকার্য্য সারিয়া কুটীর প্রাঙ্গণে, গৃহকার্য্যে শুচিস্নাত কল্যাণমন্ত্রী মাতৃদেবীর সহিত যোগ দেয়।

 “জানি, আলোকের সঙ্গে ছায়া আসে, স্বর্গোদ্যানেও সয়তানের গুপ্তসঞ্চার হইয়া থাকে, কিন্তু তাই বলিয়াই কি আলোককে রোধ করিয়া রাখিব, এবং স্বর্গের আশা একেবারেই পরিত্যাগ করিতে হইবে? যদি বৈদিককালে তপোবন থাকে, যদি বৌদ্ধযুগে ‘নালন্দা’ অসম্ভব না হয়, তবে আমাদের কালেই কি সয়তানের একাধিপত্য হইবে এবং মঙ্গলময় উচ্চ আদর্শমাত্রই ‘মিলেনিয়ামে’র দুরাশা বলিয়া পরিহসিত হইতে থাকিবে? আমি আমার এই কল্পনাকে নিভৃতে পোষণ করিয়া প্রতিদিন সঙ্কল্প-আকারে পরিণত করিয়া তুলিতেছি। ইহাই আমাদের একমাত্র মুক্তি, আমাদের স্বাধীনতা; ইহাই আমাদের সর্ব্বপ্রকার অবমাননা হইতে নিষ্কৃতির একমাত্র উপায়। নহিলে আমরা আশ্রয় লইব কোথায়, আমরা বাঁচিব কি করিয়া? আমাদের মাথা তুলিবার স্থান ত নাই-ই, মাথা রাখিবারও স্থান প্রতাহ সঙ্কীর্ণ হইয়া আসিতেছে। প্রবল য়ুরোপ বন্যার মত আসিয়া আমাদের সমস্তই পলে পলে তিলে তিলে অধিকার করিয়া লইল। এখন নিরাসক্ত চিত্ত, নিষ্কাম কর্ম্ম, নিঃস্বার্থ জ্ঞান এবং নির্ব্বিকার অধ্যাত্মক্ষেত্রে আমাদিগকে আশ্রয় লইতে হইবে। সেখানে সৈনিকদের সহিত আমাদের বিরোধ নাই, বণিকদের সহিত আমাদের প্রতিযোগিতা নাই, রাজপুরুষদের সহিত আমাদের সংঘর্ষ নাই—সেখানে আমরা সকল আক্রমণের বাহিরে, সকল অগৌরবের উচ্চে।”

 আমার এই চিঠি পড়িয়া অনেকের মনে অনেক বিতর্ক উঠিতে পারে, তাহা আমি জানি। তাঁহারা বলিবেন, “বর্ত্তমানকাল যদি আমাদিগকে আক্রমণ করিয়া থাকে, তবে অতীতকালের মধ্যে পলায়ন করিয়া আমরা বাঁচিব, ইহা কাপুরুষের কথা।”

 এ প্রবন্ধে কেবলমাত্র প্রসঙ্গক্রমে এরূপ প্রশ্নের সদুত্তর দেওয়া চলে না। সংক্ষেপে এইটুকু বলিব, ভারতবর্ষের নিত্যপদার্থটি যে কি, বাহির হইতে প্রবল আঘাত খাইয়া তবে তাহা আবিষ্কার করিতে পারিতেছি। এমন অবস্থায় সেই নিত্য আদর্শের দিকে আমাদের অন্তরের একান্ত যে একটা আকর্ষণ জন্মে, তাহাকে উপেক্ষা করে কাহার সাধ্য!

 আর একটিমাত্র কথা আছে। আমি যে তপোবনের আদর্শকে, অতীতকাল হইতে সঞ্চয় করিয়া মনের মধ্যে দাঁড় করাইতেছি, সে তপোবনে সমস্ত ভারতবর্ষ আশ্রয় লইতে পারে না—ত্রিশকোটি তপস্বী কোনো দেশে হওয়া সম্ভবপর নহে, হইলেও বিপদ্ আছে। এ কথা সত্য বটে। কিন্তু সকল দেশের আদর্শই সে দেশের তপস্বীর দলই রক্ষা করিয়া থাকেন। ইংরাজেরা যাহাকে স্বাধীনতা বলিয়া জানেন, তাহার সাধনা ইংলণ্ডের শ্রেষ্ঠ কয়েকজনেই, করিয়া থাকেন, বাকি অধিকাংশ‍ই আপন-আপন কর্ম্মে লিপ্ত। অথচ কয়েকজনের সাধনাই সমস্ত দেশকে সিদ্ধি দান করে। ভারতবর্ষও আপন শ্রেষ্ঠ সন্তানের মুক্তিতেই মুক্তিলাভ করিবে—কয়েকটি তপোবন সমস্ত দেশের অন্তরের দাসত্বরজ্জু মোচন করিয়া দিবে।

 যাহাই হৌক, আমার সঙ্কল্পটিকে এতক্ষণ কেবলমাত্র কল্পনার দিক্ হইতে দেখা গেল। বলা বাহুল্য, কাজের দিক্ হইতে যাহা প্রকাশ পাইতেছে, তাহা এরূপ মনোরম এবং সুষমাবিশিষ্ট নহে। কোথায় তপস্বী, কোথায় তপস্বীর শিষ্যদল,—কোথায় সার্থকব্রহ্মজ্ঞানের অপরিমেয় শান্তি, কোথায় একনিষ্ঠব্রহ্মচর্য্যের সৌম্যনির্ম্মলজ্যোতিঃপ্রভা? তবু ভারতবর্ষের আহ্বানকে কেবল বাণীরূপে নহে, কর্ম্ম-আকারে কোথাও বন্ধ করিতেই হইবে। বোলপুরের প্রান্তরের প্রান্তে সেই চেষ্টাকে আমি স্থান দিয়াছি। এখনো ইহা রূপান্তরিত বাক্যমাত্র, ইহা আহ্বান।

 সতীশ, অনাঘ্রাত পুষ্পরাশির ন্যায়, তাহার তরুণ হৃদয়ের সমস্ত শ্রদ্ধা বহন করিয়া এই নিভৃত শান্তিনিকেতনের আশ্রমে আসিয়া আমার সহিত মিলিত হইল। কলেজ হইতে বাহির হইয়া জীবনযাত্রার আরম্ভকালেই সে যে ত্যাগস্বীকার করিয়াছিল, তাহা লইয়া একদিনের জন্যও সে অহঙ্কার অনুভব করে নাই—সে প্রতিদিন নম্রমধুর প্রফুল্লভাবে আপনার কাজ করিয়া যাইত, সে যে কি করিয়াছিল, তাহা সে জানিত না।

 এই শান্তিনিকেতন-আশ্রমে চারিদিকে অবারিত তরঙ্গায়িত মাঠ—এ মাঠে লাঙলের আঁচড় পড়ে নাই। মাঝে মাঝে এক এক জায়গায় খর্ব্বায়তন বুনো খেজুর, বুনো জাম, দুই একটা কাঁটাগুল্ম, এবং উয়ের ঢিপিতে মিলিয়া একএকটা ঝোপ বাঁধিয়াছে। অদূরে ছায়াময় ভুবনভাঙা-গ্রামের প্রান্তে একটি বৃহৎ বাঁধের জলরেখা দূর হইতে ইস্পাতের ছুরির মত ঝলকিয়া উঠিতেছে এবং তাহার দক্ষিণ পাড়ির উপর প্রাচীন তালগাছের সার কোনো ভগ্ন দৈত্যপুরীর স্তম্ভশ্রেণীর মত দাঁড়াইয়া আছে। মাঠের মাঝে মাঝে বর্ষার জলধারায় বেলেমাটি ক্ষইয়া গিয়া নুড়িবিছানো কঙ্করস্তূপের মধ্যে বহুতর গুহাগহ্বর ও বর্ষাস্রোতের বালুবিকীর্ণ জলতলরেখা রচনা করিয়াছে। জনশূন্য মাঠের ভিতর দিয়া একটি রক্তবর্ণ পথ দিগন্তবর্ত্তী গ্রামের দিকে চলিয়া গেছে—সেই পথ দিয়া পল্লীর লোকেরা বৃহস্পতিবার-রবিবারে বোলপুরসহরে হাট করিতে যায়, সাঁওতালনারীরা উলুখড়ের আঁটি বাঁধিয়া বিক্রয় করিতে চলে এবং ভারমন্থর গোরুর-গাড়ি নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নের রৌদ্রে আর্ত্তশব্দে ধূলা উড়াইয়া যাতায়াত করে। এই জনহীন তরুশূন্য মাঠের সর্ব্বোচ ভূখণ্ডে দূর হইতে ঋজুদীর্ঘ একসারি শালবৃক্ষের পল্লবজালের অবকাশপথ দিয়া একটি লৌহমন্দিরের চূড়া ও একটি দোতলা কোঠার ছাদের অংশ চোখে পড়ে—এইখানেই আমলকী ও আম্রবনের মধ্যে মধুক ও শালতরুর তলে শান্তিনিকেতন আশ্রম।

 এই আশ্রমের এক প্রান্তে বিদ্যালয়ের মৃণ্ময়কুটীরে সতীশ আশ্রয় লইয়াছিল। সম্মুখের শালতরুশ্রেণীতলে যে কঙ্করখচিত পথ আছে, সেই পথে কতদিন সূর্য্য্যাস্তকালে তাহার সহিত ধর্ম্ম, সমাজ সাহিত্যসম্বন্ধে আলোচনা করিতে করিতে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনীভূত হইয়া আসিয়াছে, এবং জনশূন্য প্রান্তরের নিবিড় নিস্তব্ধতার উর্দ্ধদেশে আকাশের সমস্ত তারা উন্মীলিত হইয়াছে। এখানকার এই উন্মুক্ত আকাশ ও দিগন্ত প্রসারিত প্রান্তরের মাঝখানে আমি তাহার উদ্ঘাটিত উন্মুখহৃদয়ের অন্তর্দ্দেশে দৃষ্টিক্ষেপ করিবার অবকাশ পাইয়াছিলাম। এই নবীন হৃদয়টি তখন প্রকৃতির সমস্ত ঋতুপরম্পরার রসস্পর্শে, সাহিত্যের বিচিত্র ভাবান্দোলনের অভিঘাতে ও কল্যাণসাগরে আপনাকে সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিবার আনন্দে অহরহ স্পন্দিত হইতেছিল।

 এই সময়ে সতীশ ব্রহ্মবিদ্যালয়ের বালকদের জন্য উতঙ্কের উপাখ্যান অবলম্বন করিয়া “গুরুদক্ষিণা” নামক কথাটি রচনা করিয়াছিল। এই ক্ষুদ্র কথাগ্রন্থটির মধ্যে সতীশ তাহার ভক্তিনিবেদিত তরুণ হৃদয়ের সমস্ত অসমাপ্ত আশা ও আনন্দ রাখিয়া গেছে—ইহা শ্রদ্ধার রসে সুপরিণত ও নবজীবনের উৎসাহে সমুজ্জল—ইহার মধ্যে পূজাপুষ্পের সুকুমার শুভ্রতা অতি কোমলভাবে অম্লান রহিয়াছে। এই গ্রন্থটুকুকে সে শিল্পীর মত রচনা করে নাই—এই আশ্রমের আকাশ, বাতাস, ছায়াও সতীশের সদ্য-উদ্বোধিত প্রফুল্লনবীনহৃদয়ে মিলিয়া গানের মত করিয়া ইহাকে ধ্বনিত করিয়া তুলিয়াছে।

 গ্রন্থসমালোচনা করিতে বসিয়া গ্রন্থের কথা অতি অল্পই বলিলাম, এমন অনেকে মনে করিতে পারেন। বস্তুত তাহা নহে। সতীশের জীবনের যে অংশটুকু আমি জানি, সেই অংশের পরিচয়এবং গ্রন্থের আলোচনা, একই কথা। এই বুঝিয়া পাঠকগণ যখন “গুরুদক্ষিণা” পাঠ করিবেন, তখনই তাঁহারা এই গদ্যকাব্যটির সৌন্দর্য্য সম্পূর্ণরূপে ধারণা করিতে পারিবেন। গ্রন্থে যাহা আছে, গ্রন্থই তাহার পরিচয় দিবে, গ্রন্থের বাহিরে যাহা ছিল, তাহাই আমি বিবৃত করিলাম।

 সতীশের জীবনের শেষ রচনাটি মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্ব্বে একখানি পত্রের সহিত আমার নিকট প্রেরিত হইয়াছিল। সেই পত্রে অন্যান্য কথার মধ্যে তাহার ভাবী জীবনের আশা, তাহার বর্ত্তমান জীবনের সাধনার কথা সে লিখিয়াছিল—সে সব কথা এখন ব্যর্থ হইয়াছে—সেগুলি কেবল আমারি নিকটে সত্য—অতএব সেই কথাকয়টি কেবল আমি রাখিলাম—তাহার পত্রের অবশিষ্ট অংশ ও তাহার কবিতাটি এইখানে প্রকাশ করিতেছি।

 সতীশের শেষ রচনাটি ‘তাজমহল’ নামক একটি কবিতা। কিছুদিন হইল, সে পশ্চিমে বেড়াইতে গিয়াছিল। আগ্রার তাজমহল-সমাধির মধ্যে সে মম্‌তাজের অকালমৃত্যুর সৌন্দর্য্য দেখিয়াছিল! অসমাপ্তির মাঝখানে হঠাৎ সমাপ্তি—ইহারও একটা গৌরব আছে। ইহা যেন একটা নিঃশেষবিহীনতা রাখিয়া যায়। পৃথিবীতে সকল সমাপনের মধ্যেই জরা এবং বিকারের লক্ষণ দেখা দেয়, সম্পূর্ণতা আমাদের কাছে ক্ষুদ্র সসীমতারই প্রমাণ দিয়া থাকে। অতুল সৌন্দর্য্যসম্পদ্‌ও আমাদের কাছে মায়া বলিয়া প্রতিভাত হয়; কারণ, আমরা তাহার বিকৃতি, তাহার শেষ দেখিতে পাই।

 মম্‌তাজের সৌন্দর্য্য এবং প্রেম অপরিতৃপ্তির মাঝখানে শেষ হইয়াই অশেষ হইয়া উঠিয়াছে—তাজমহলের সুষমাসৌষ্ঠবের মধ্যে কবি সতীশ সেই অনন্তের সৌন্দর্য্য অনুভব করিয়া তাহার জীবনের শেষ কবিতা লিখিয়াছিল।

 সতীশের তরুণ জীবন ও সম্মুখবর্ত্তী উজ্জ্বল লক্ষ্য, নবপরিস্ফুট আশা ও পরিপূর্ণ আত্মবিসর্জ্জনের মাঝখানে অকস্মাৎ ১৩১০ সালের মাঘী পূর্ণিমার দিনে ২১ বৎসর বয়সে সমাপ্ত হইয়াছে। এই সমাপ্তির মধ্যে আমরা শেষ দেখিব না, এই মৃত্যুর মধ্যে আমরা অমরতাই লক্ষ্য করিব। সে যাত্রাপথের একটি বাঁকের মধ্যে অদৃশ্য হইয়াছে, কিন্তু জানি, তাহার পাথেয় পরিপূর্ণ—সে দরিদ্রের মত রিক্তহস্তে জীর্ণশক্তি লইয়া যায় নাই।

পত্র।

ব্রহ্মবিদ্যালয়,

বোলপুর।

* * * *

 আমি এই চিঠিতে ‘তাজমহল’ বলিয়া একটি কবিতা পাঠাইতেছি। এটা এখানে আসিয়া লিখিয়াছি।

 দেখিয়াছি, তাজমহল দুটি ভাবে মনকে ক্ষুব্ধ করে। দিনের আলোকে, মলিন নরনারীর মধ্যে, ধূলা, শুষ্ক যমুনা, রেলের চীৎকার, ইংরাজের মূর্ত্তিমান্ কর্ম্মবেগ রেলগাড়ির দৌড়ের মধ্যে, কালের পরিহাসপূর্ণ লীলার মধ্যে—তাজমহলটাকে বড়ই বাহুল্য বলিয়া মনে হয়। সমস্ত মানুষের সঙ্গে সহানুভূতির রসে এই মর্ম্মরের রঙীন্ লতাপাতা উপচিত নয়। সমস্ত সংসারের সঙ্গে সমভূমিতে না দাঁড়াইয়া কবরটি যেন একটা উচ্চ জমির উপর দাঁড়াইয়াছে। ইহার Harmonious সৌষ্ঠব, ইহার নিষ্কলঙ্ক শুভ্রতা, ইহার বিরল চিত্রবিলাস—সমস্ত লইয়া যেন আমাদিগকে বাহিরে ঠেলিয়া রাখিতে চায়। বিশেষত বুদ্ধগয়ায় পূজার ভাবে আচ্ছন্ন নরনারীর ভক্তিপূর্ণ লীলায় তরঙ্গায়িত অশোক- রেলিংএর চিত্রমালা আগে দেখিয়া আসিয়াছিলাম বলিয়া তাজমহলের বিলাসের ভাবটাতে এত ব্যথা পাইয়াছিলাম। মনে হয়, চারিদিক্ হইতে সমস্ত বাজার, সমস্ত সমস্ত লোক উঠাইয়া দিয়া একটি নির্জ্জন প্রান্তরের মধ্যে রাখিয়া দিলেই তাজমহলের ক্ষান্ত-উৎসার উৎসমুখগুলির রুদ্ধ শোকের প্রতি কতকটা সম্মান করা হয়।

 এটা বড় নিষ্ঠুর ভাব। কিন্তু রাত্রে স্বপ্নের মধ্যে তাজের Perfect harmonyটি যখন মনকে জড়াইয়া ধরে, তখন তাজকে আর নির্জীবভাবে পার্থিবভাবে দেখিবার জো নাই। তখন তাজকে বাহুল্যবর্জ্জিত একটি নিগূঢ় গীতের মত করিয়া অনুভব করিতে ইচ্ছা হয়। বিশেষত আমি যখন দূরে আছি, তখন সেই ভাবেই তাজকে বেশি মনে পড়ে। আমি সেই ভাবটিই আমার কবিতাটিতে প্রকাশ করিয়াছি।

* * * *

 এই গেল আমার মনের কথাটা—এখন কবিতার সৌষ্ঠব কতদূর হইয়াছে, সে সম্বন্ধে আপনার কথার অপেক্ষায় রহিলাম। এবার দিল্লী, আগ্রা, গয়া, কাশী প্রভৃতি স্থান দেখিয়া মনে আরও অনেক ভাব উঠিয়াছে—বাস্তবিক ৮ দিনের মধ্যে যেন খানিকটা বাড়িয়া উঠিয়াছি।  * * *

 বুদ্ধগয়ায় যখন অশোক-রেলিং দেখিলাম—রাঙা পাথরে যক্ষ আঁক্ষা, যক্ষী আঁকা—বাড়ীটি গাছপালায় ঢাকা, নির্জ্জন—চারিদিকে স্তূপ—“একজন জাপানী penitent জাপান হইতে প্রেরিত বুদ্ধের কাছে থাকে—তিব্বত হইতে, সিমলা হইতে গরীব-দুঃখী আসিয়া বাস করিতেছে—বর্ম্মা হইতে কতকগুলি ঘণ্টা উপহার পাঠাইয়াছে—তখন, মনে হইল, ভারতবর্ষের একটি ছায়াঢাকা গ্রামের মধ্যে একটি করুণার উৎস আছে—কক্ষে কলস লইয়া সমস্ত এসিয়া-সুন্দরী সেখানে তৃষ্ণা মিটাইতে আসিয়াছে। মন্দিরের মধ্যে সোনার পাতে ঢাকা বৌদ্ধমূর্ত্তি দেখিয়া হৃদয় এমন ভাবে নড়িয়া উঠিল যে, তেমন হৃৎকম্প আমি পূর্ব্বে কখনো অনুভব করি নাই।

 কিন্তু বুদ্ধদেব আজ স্তম্ভিত। আপনি যে হিমালয়সম্বন্ধে লিখিয়াছেন, সেইরূপ আজ—“সে প্রচণ্ড গতি অবসান।” এই প্রচণ্ড করুণার উৎসটির স্তম্ভিত গাম্ভীর্য্যের নাড়া প্রাণে অনুভব করিয়াছি। অদ্যকার পৃথিবীর সহিত মিল নাই; চতুর্দ্দিকে নূতন রাগিণী উঠিয়াছে—তাই বুদ্ধদেবও যেন ধরণীর বক্ষ-কোটরে প্রবেশ করিয়াছেন। আপনি যে “মন্দির” লিখিয়াছেন—“রচিয়াছিনু দেউল একখানি”—তাহাতে আপনি এই বুদ্ধদেবকে বাহির হইয়া আসিতে ডাক দিয়াছেন—বিশ্বের কর্ম্মের মধ্যে, আনন্দকোলাহলের মধ্যে তাঁহাকে সার্থক হইতে আহ্বান করিয়াছেন—তাহা যেদিন হইবে, সেদিন সত্যসত্যই পৃথিবীতে নূতন আলো আবির্ভূত হইবে। আমি ঐ গানের অর্থ ভালরূপেই বুঝিয়াছি। কারণ, উহার আগের পর্দ্দা হইতে যে গান উঠিতেছে, তার সুর শুনিয়া এবার আমাকে অশ্রুতে অন্ধ হইয়া আসিতে হইয়াছে। আমার মনে হইয়াছে, যেন পৃথিবী অর্থাৎ সমস্ত মনুষ্যসাধারণের হৃদয় একটি নারী এবং দিব্যসংবাদবাহী মহাপুরুষগণ ঐ নারীর প্রাণের প্রিয়। পুরুষ আসিয়া নারীকে যখন ভালবাসে, তখন নারী এক অপূর্ব্ব আনন্দে কাঁপিয়া উঠে। বুদ্ধদেবের ভালবাসার ডাকে অশোক প্রমুখ নারীহৃদয় আনন্দে মাতিয়া উঠিয়াছিল—কল্যাণকর্ম্মে উৎসব বিস্তার করিয়া, কলাকাণ্ডে মঙ্গলভূষা পরিয়া ঐ নারী পুরুষটিকে হৃদয়ের মধ্যে বরিয়া লইয়াছিল।

 কিন্তু কালের লীলায় ক্রমে সেই আনন্দমিলনের উৎসব থামিয়া গেল। আজ যেন বুদ্ধগয়ার পাহাড়গুলির মধ্যে শুষ্ক নৈরঞ্জনা ও মাহীর তীরে ছায়াঢাকা গ্রামটিতে পা ছড়াইয়া সেই নারী অন্ধের মত, অবচনার মত মন্দিরবক্ষকোটরে সেই পুরুষের ছবি লইয়া বসিয়া আছে। আজও তার অবসন্ন হস্ত বর্ম্মা এবং তিব্বত হইতে সমাগত কাঙালীর মুখে অন্ন তুলিয়া দিতেছে—কিন্তু—“সে প্রচণ্ড গতি অবসান!” ফন্তুর মধ্যে যে অপরিচ্ছন্ন নরনারী কাপড় ধুইতেছে, তাদের সঙ্গে ঐ নারীর হৃদয়ের কোনো যোগ আছে। ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট—কে যে সাহেব বিনা অপরাধে তাঁর এক চাপরাশি ছাড়াইয়া দিতে হুকুম করিতেছে, তার হৃদয়ে উহার কোনো প্রেরণা সঞ্চারিত হয়? তা ছাড়া, আমরা যে স্বচ্ছন্দমনে নানা বাজে কল্পনা লইয়া বেড়াইতেছি এবং সাহেবের রেলের তলে পড়িয়া মারা যাইতেছি, আমাদের সঙ্গেই বা তাহার কোথায় যোগ? স্তম্ভিত প্রকাণ্ড পাথরের বুদ্ধমূর্ত্তিগুলি এবং অল্প একটুকুন্ অশোকের রেলিং এখনো যা বজায় আছে—তার আনন্দহিল্লোলিত ভক্তিভঙ্গিসুন্দর ছবিগুলি দেখিয়া আমার হৃদয় এইরকম একটা দুঃখের ভাবেই নাড়া পাইয়াছে! এই স্তম্ভিত পাথর মনের মধ্যে এমন একটি অবসাদের মেঘ ঘনাইয়া আনে যে, চোখের জলে আর কিছুই দেখা যায় না—আর উঠিয়া চলিবার সামর্থ্য যেন থাকে না।

* * * * * *

বোলপুর
১৩১১ সাল

 শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মুখবন্ধ

 হে কল্যাণীয় শিষ্যগণ, আজ সন্ধ্যায় তোমাদিকে অনেক দিন আগেকার একটি শিষ্যের অদ্ভুত গল্প শুনাইব,—তোমরা স্থির হইয়া বোস।

 আমরা ঘরের মধ্যে এই যে দীপ জ্বালিয়াছি কিছুকালের জন্য এটা ভুলিয়া যাও। বাহিরে চারিদিকের মাঠের উপর, অনন্তআকাশের উপর যে জ্যোৎস্নার বৃষ্টি হইতেছে তাই একবার ভাবিয়া দেখ। মাঠের কোনো প্রান্তে বনের রেখা এখন অস্পষ্ট, নিবিড় কৃষ্ণবর্ণ—উপমা দিয়া বলিতে পারি—যেন কোন প্রকাণ্ড অজগর সাপ এই নূতন বসন্তের আরম্ভ পৃথিবীর বিবর হইতে উঠিয়া মাঠের হাওয়ার মধ্যে, জ্যোৎস্নার মধ্যে গা ঢালিয়া দিয়া শুইয়া পড়িয়াছে।

 আজ রাত্রে আমরা একত্র হইয়া বসিয়াছি বলিয়া রাত্রির কথাই বলিলাম—দিন হইলে হয়তো দিনের কথাই বলিতাম। কিন্তু, না—রাত্রির বর্ণনা করার আরও উদ্দেশ্য আছে। রাত্রিই গল্প বলিবার ও শুনিবার প্রকৃত সময়। রাত্রে সব অস্পষ্ট বলিয়া এই সময়ে অসম্ভবকে সম্ভব মনে হয়। অস্পষ্টতায় সমস্ত দূরের জিনিষ যেন কাছে আনিয়া দেয়। দিনের বেলায় তারা দেখিবার কথা তোমরা কি মনে ভাবিতে পারিতে? অথচ দেখ,—বাজিকরে কালো যষ্টিখানি টবের উপর বুলাইয়া লইলে যেমন টব ভরিয়া ফুল ফুটিয়া উঠে তেমনি রাত্রি তাহার ছায়া আকাশের উপর বুলাইয়া লইতেই আকাশ ভরিয়া কত শত তারা ফুটিয়া উঠিল।

 তোমরা হয়ত গল্পের জন্য ইতিমধ্যে কেহ কেহ ব্যস্ত হইয়া উঠিতেছ, ভাবিতেছ গল্পের কথাটা আমি ভুলিয়া গিয়াছি। কিন্তু ভুলি নাই। এতক্ষণ রাত্রির বর্ণনা করিয়া তোমাদের মনকে আমি তারায়-চাঁদে শোভিত আকাশের মধ্যে, রাত্রির অন্ধকারের মধ্যে বাহির করিয়া লইয়া গেছি। এখন কল্পনায় আমি যেদিকে যাইব, তোমাদের মনও আমার পিছে পিছে সেই দিকেই যাইবে।

 কোথায় যাই? যাইব পুরাতন ভারতবর্ষেরতপোবনের মধ্যে। দিনে হইলে ভারতবর্ষের মধ্যে তোমাদের মন কি কোথাও সেই শত শত বছর পূর্ব্বের তপোবনকে খুঁজিয়া পাইত? দিনে হইলে ভারতবর্ষে আজ কি দেখিতে পাইতাম? দেখিতাম, সহর, রেলগাড়ি, কলকারখানা, দেখিতাম হিংস্র জন্তুভরা বন, শুষ্ক নদী, শক্ত পাহাড়, পোড়া মরুভূমি—আরও হয়তো কত কিছু। সে তপোবন এখন আর নাই।

 কিন্তু এখন রাত্রি—এখন জ্যোৎস্নার আলো পড়িয়াছে, ঘুমের নীরবতা আসিয়াছে—এখন মন উড়িয়া উড়িয়া গিয়া যেখানে যাহা ইচ্ছা কল্পনা করিতে পারে। চল তবে আমরা সকল ভুলিয়া একবার সেই পুরাতন ভারতবর্ষের বনে ঋষির আশ্রম দেখিয়া আসি। তোমরা ব্রহ্মচারী, শিষ্য, তোমরা একবার সেকালের শিষ্যব্রহ্মচারীর চলাফেরা ভাবভঙ্গী দেখিয়া আসিবে এখন।


এই লেখাটি ১ জানুয়ারি ১৯৩১ সালের পূর্বে প্রকাশিত এবং বিশ্বব্যাপী পাবলিক ডোমেইনের অন্তর্ভুক্ত, কারণ উক্ত লেখকের মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে অথবা লেখাটি ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে ।