গুরুদক্ষিণা/চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
উতঙ্ক পৌষ্যরাজার বাড়ীতে যাত্রা করিয়াছেন। তপোবনের কাছের মাঠটি ছাড়াইয়া উতঙ্ক নিবিড় বনের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। তখন দুপুর—বনের বড় শোভা হইয়াছে—গাছের ছায়ার মধ্যে মধ্যে রৌদ্র পড়িয়াছে—বোধ হয় যেন সব রশ্মিরূপী চোর আলোরেখার মই বাহিয়া অন্ধকার বনের ফুল চুরি করিতে নামিয়া আসিতেছে। গাছের গুঁড়ির কোটরে কোটরে পাখী মুখ বাহির করিয়া আছে—রাঙা ঠোঁট কালো ঠোঁট দেখিয়া মনে হয় যেন গাছেরি রাঙা কালো পাতা বাহির হইয়াছে। কোথাও এক এক বনস্পতি প্রকাণ্ড গুঁড়ির উপরে বড় বড় ডালপালার একেকটা গ্রাম ধরিয়া যেন দাঁড়াইয়া আছে। কোথাও সারি-সারি তালগাছ কোথায় উঁচু হইয়া উঠিয়া গিয়াছে—মাথায় মাথায়—পক্ষীর পাখনার মত পাতায় পাতায় মিলাইয়া কাঁধগুলির কাছে একটা ঘুরঘুটি অন্ধকার করিয়া রাখিয়াছে, কোথাও সাতসাতটি সুন্দর আঙুলের মত পাতা ধরিয়া তক্তকে চারা ছাতিমগাছটি বনের ফাঁকে আকাশের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে—বড় বড় লতা যেন গাছে গাছে পুল বাঁধিয়া দিয়াছে—কোথাও বা বনদেবতাগণের খেলার জন্য যেন দোলা তৈয়ার করিয়া রাখিয়াছে। উতঙ্ক দেখিলেন এক একটা বরাহ মাটি খুঁড়িতে খুঁড়িতে কোথায় যাইতেছে—কোথাও গর্ত্তের মধ্যে একেকটা শুইয়া পড়িয়া আছে। কখনো দেখিল দূরে গাছগাছড়ার আড়ালে প্রকাণ্ড দুটা বাঁকা শিং দেখা দিয়াছে, কখনো সাম্নে দিয়া হঠাৎ একটা বন্য হরিণ দৌড়াইয়া গেল। কখনো দেখিতে পাইল সম্মুখের একটি গাছের শাখায় বড় একটি মৌচাক—কালো পতঙ্গগুলি চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে।
ক্রমে ক্রমে উতঙ্ক একটি খোলা মাঠের উপর আসিয়া পড়িলেন। খরতর রৌদ্র দূরে যেন আগুনের শিখার মত ধূ ধূ কাঁপিতেছে; আকাশ ঘননীল। উতঙ্ক রৌদ্রের মধ্যে বাহির হইবার পূর্ব্বে, সেই বনটির প্রান্তে ছায়ায় একবার বসিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন।
কোথাও কিছু নাই হঠাৎ মাঠের মাঝখানে এক প্রকাণ্ড কালো বৃষ! কি আশ্চর্য্য! এ আসিল কোথা হইতে? এত বড় বৃষ পৃথিবীতে আছে বলিয়া তো উতঙ্ক জানিতেন না। ভাল করিয়া দেখিবার জন্য চক্ষু রগড়াইয়া লইলেন। রগড়াইয়া চোখ হইতে হাত সরাইয়া লইতেই—আরো আশ্চর্য্য! বৃষের পিঠে এক দীর্ঘাকার জ্যোতির্ম্ময় পুরুষ আরোহী হইয়া বসিয়া আছে। আশ্চর্য্যের উপর আশ্চর্য্য হইয়া উতঙ্ক উঠিয়া দাঁড়াইলেন!
তোমরা ভাবিতেছ উতঙ্ক এইবার ছুটিয়া পালাইবেন! কিন্তু তোমরা সেখানে থাকিলে তোমরাও নিশ্চয় তখন উতঙ্কের মত নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতে। ঐ যে বৃহৎ বৃষ—যাহার গলার কাছে ভাঁজে ভাঁজে পূষ্ট চর্ম্ম ঝুলিয়া পড়িয়াছে,—কপালের উপরে দুটি দীর্ঘ তীক্ষ্ণ শিং চক্চক্ করিতেছে;—প্রত্যেক প্রকাণ্ড পায়ের গোড়া কিছুদূর অতি কোমল শাদা রোমে ঢাকা—প্রকাণ্ড পুচ্ছটি সুগোল, শ্বেতবর্ণ—ক্রমে সরু হইয়া প্রায় মাটি পর্য্যন্ত নামিয়াছে;—পিঠের উপরে ককুদ নামক উচ্চ মাংসখণ্ডটি যেন তক্তক্ করিয়া কাঁপিতেছে এবং কালো কপাল হইতে যেন জ্যোতিঃ বাহির হইতেছে;—এবং ঐ যে তাহার উপরে খোলাগায়ে জ্যোতির্ম্ময় এক বলবান্ পুরুষ বসিয়া রহিয়াছে—উহাদের মধ্যে এম্নি একটি মনোহর শ্রী প্রকাশ পাইতেছিল যে তাহাই দেখিতে উতঙ্ক মুগ্ধ হইয়া নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন।
উতঙ্ক কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিতেই দেখিলেন বৃষটি যেস্থানে ছিল সেখান হইতে না চলিয়াও যেন নিমেষের মধ্যে তাঁহার গায়ের কাছে আসিয়া দাড়াইল। উতঙ্ক অত্যন্ত বিস্ময়ে উপরের দিকে মুখ তুলিয়া দেখিলেন দুটি বড় কালো শীতল জ্বলজ্বল চক্ষু তাঁর দিকে আগে হইতেই চাহিয়া আছে। অতি শীতল জল পান করিলে শরীর যেমন ঠাণ্ডা হইয়া যায় ঐ চোখদুটি দেখিয়া উতঙ্কের সর্ব্বশরীর সেইরূপ শান্ত শীতল হইয়া গেল! কিন্তু একটু মুখ ঘুরাইতেই উতঙ্ক দেখিলেন তাহার উপরে আর একখানি অতি উজ্জ্বল হাসিমাখা মুখে দুটি আনন্দিত চক্ষু তাঁর দিকে চাহিয়া আছে।
সেই মুখের দিকে চাহিতেই উতঙ্ক স্বপ্নে শোনার মত শুনিলেন “বৎস এই বৃষভের গোময় ভক্ষণ কর, তোমার গুরুও পূর্ব্বে ইহা করিয়াছিলেন।”
উতঙ্ক তৎক্ষণাৎ সেই বৃষভের গোময় ভক্ষণ করিবার জন্য নত হইলেন। মুখে দিতেই উতঙ্কের অমৃতের মত বোধ হইল।
কিন্তু খাইয়া মাথা তুলিতেই দেখেন বৃষ কিম্বা আরোহী কোথাও কিছু নাই! বিস্ময়ে উতঙ্ক নীচের দিকে চাহিয়া দেখিলেন গোময়ের চিহ্নও কিছুমাত্র নাই! মাঠ ভরিয়া রৌদ্র ধূ ধূ করিতেছে! নিকটে ছায়াময় নিবিড় বন, সেখান হইতে নানা পতঙ্গ পক্ষীর শব্দ শোনা যাইতেছে,—কাঠবিড়ালী তাহার ডোরা-আঁকা শরীরটি লইয়া বন হইতে এক একবার মাঠের দিকে ছুটিতেছে—খপ্ করিয়া থামিতেছে—একটু কিসের দিকে দৃষ্টি করিয়া আবার হঠাৎ বনে ফিরিয়া যাইতেছে।
উতঙ্কের মহা বিস্ময় লাগিয়া গেল। তিনি কহিলেন “তবে কি স্বপ্ন দেখিলাম! আমি কি বনের ছায়ায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম?—যাক্ যাক্—রাস্তায় বসিয়া স্বপ্ন দেখিলে ত চলিবে না। আমার যে দক্ষিণা আনিতে হইবে! পৌষ্যের বাড়ী এখনও কতদূর!”
ভাবিয়া উতঙ্ক দ্রুতবেগে চলিতে আরম্ভ করিলেন কিন্তু তবু বারবার তাঁর মনে হইতে লাগিল “কি দেখিলাম? কোন দেবতা আমাকে দেখা দিয়া গেলেন কি!” ভাবিতে ভাবিতে এক একবার তাঁহার চলিবার বেগ মন্দ হইয়া আসিল—আবার উতঙ্ক দক্ষিণার কথা মনে করিয়া দ্রুতবেগে চলিল।