গুরুদক্ষিণা/তৃতীয় পরিচ্ছেদ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
উতঙ্ক গুরুপত্নীর কাছে গিয়া উপস্থিত হইলেন। গুরুপত্নী তখন কুটীরের কাছে একটি অশোক গাছের ছায়ায় বসিয়া কুশ বুনিয়া আসন তৈয়ার করিতেছিলেন ―একটি গর্ভিনী হরিণী তাঁর কাছে শুইয়া পড়িয়াছিল। উচ্চ সুরে টিট্টিভ পক্ষী “টিট্টিউ টিট্টিউ” এইরূপ শব্দ করিয়া কাছে কাছে উড়িয়া পড়িতেছিল। অশোকগাছটির আলবালে কতকগুলি ছোট ছোট পাখী নিশ্চিন্তমনে উড়িয়া উড়িয়া আসিয়া জল খাইতেছিল। সেখানকার পশুপক্ষীর মুখের ভাব দেখিলে মনে হয় যেন তাহারা মানুষের সঙ্গে কথাবার্ত্তা বলিবার নানারকম ইঙ্গিত জানে।
উতঙ্ক গুরুপত্নীর পায়ে মাথা রাখিয়া প্রণাম করিলেন। উঠিয়া বলিতে লাগিলেন “মা আমার ব্রহ্মচর্য্যের কাল শেষ হইল। গুরুদেবের করুণায় আমি ব্রহ্মচারী হইয়াছি—আমি বললাভ করিয়াছি—এখন আমাকে গৃহে ফিরিয়া যাইতে হইবে—জননি, কি দক্ষিণা দিব আদেশ করুন,—গুরুদেব আপনার কাছেই জিজ্ঞাসা করিতে বলিয়াছেন।”
গুরুপত্নী তাড়াতাড়ি আসন বোনা রাখিয়া দিয়া বলিলেন “বৎস, তুমি চলিয়া যাইবে?” ঋষিপত্নীর চক্ষু জলে ভরিয়া আসিল।
ঋষিপত্নী বলিতে লাগিলেন “আচ্ছা, যাও বৎস, আশীর্ব্বাদ করি। একে একে কত পুত্র এইরূপে আমাকে স্নেহে বাঁধিয়া অবশেষে বন্ধন ছিঁড়িয়া চলিয়া গিয়াছে—কিন্তু সেজন্য আমি দুঃখ করি না—তাহারা আশ্রমমধ্যে শ্রেষ্ঠ গৃহাশ্রমে গিয়া পৃথিবীর মঙ্গল কার্য্য করিতেছে! এই বনের মধ্যে চিরজীবন কাহাকে ধরিয়া রাখিব? কিন্তু, বৎস, আমার হৃদয়ের স্নেহ এবং আশীর্ব্বাদ চিরদিন তোমাদিগকে ঘিরিয়া থাকিবে।
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া আবার বলিলেন “সৌম্য, তোমাকে কি দক্ষিণা আনিতে বলিব? আমাদের কিসেরি বা অভাব? কিন্তু নিয়ম পালন না করিলেও ত নয়!” আবার কিছুকাল চুপ করিয়া কি যেন স্মরণ করিয়া ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন “তেজস্বিন্, একটি কথা মনে পড়িল। রাজা পৌষ্যের শুভশুক্লা নামে রাণী জগতে বিখ্যাত হইয়াছেন। সেই সতীকে দেবতারা অবধি বন্দনা করিয়া যায়। তপোবনের ঋষিগণ তাঁহার নাম গান করিয়া থাকেন। সেই সতীর উদার হৃদয়ের স্নেহ কঠিন পাথর পর্য্যন্ত অনুভব করিয়া থাকে। অশুচি কোন লোক তাঁহার সম্মুখে গেলে তাঁহাকে দেখিতে পায় না। তাঁহার সোনার কুণ্ডল দুটিকে স্বয়ং নাগরাজ তক্ষক পর্য্যন্ত তাঁহার রসাতলের ভাণ্ডারে লইয়া গিয়া গোপন করিয়া রাখিতে ইচ্ছা করেন। আমার বড়ই ইচ্ছা হয় একবার সেই সতীর কুণ্ডলের স্পর্শ অনুভব করি। একবার সেই কুণ্ডল পরিয়া তপস্বী ব্রাহ্মণগণকে পরিবেষণ করিয়া ভোজন করাই। আমার পূর্ণিমার ব্রত তাহা হইলেই সফল হইবে, কল্যাণে পূর্ণ হইবে। বৎস, তোমাদের কল্যাণের জন্যই ঐ ব্রত আমি আরম্ভ করিয়াছি। আর তিনদিন পরেই সেই ব্রত-নিমন্ত্রণ; বৎস, শুভশুক্লার কুণ্ডল পরিয়া আমি ঐ নিমন্ত্রণে ব্রাহ্মণগণকে পরিবেশন করিব—তুমি ঐ কুণ্ডল আনিয়া দাও। তুমি ব্রহ্মচারী হইয়াছ—সেই সতীর কুণ্ডল তুমিই আনিতে পারিবে।”
উতঙ্ক অত্যন্ত আহ্লাদিত হইয়া উঠিলেন। ঋষিপত্নীর পায়ে নমস্কার করিয়া আনন্দে চলিয়া গেলেন—আজই দক্ষিণা আনিতে যাইবেন।
উতঙ্ক চলিয়া গেলে ঋষিপত্নী স্থির হইয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন “বৎস উতঙ্ককে দক্ষিণা আনিতে পাঠাইলাম—একাকী কত দূরপথ যাইবে! কিন্তু তাহাতে কি ভয়? গৃহাশ্রমে প্রবেশ করিবে তার পূর্ব্বে সতীর মহিমা একবার দেখিয়া লউক্। ব্রহ্মচারীর আবার কোথায় ভয়?” এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে উতঙ্কের গভীর ভক্তি এবং নানাগুণের কথা ঋষিপত্নীর মনে পড়িতে লাগিল এবং যতই কেন মনকে প্রবোধ দিন্ না মন ব্যাকুল হইল—জননীর চোখ কেবলি জলে ভরিয়া আসিতে লাগিল।
এই সময়ে অন্যান্য শিষ্যগণ ভিক্ষার চালডাল লইয়া ফিরিয়া আসিল—কিন্তু কি আশ্চর্য্য! অন্যদিনের মত আজ আর তাহারা গোলমাল করিতেছে না। ঋষিপত্নী বালকগুলিকে এইরূপ বিষণ্ণ দেখিয়া তাড়াতাড়ি তাহাদের কাছে গিয়া তাহাদের দুঃখিতভাবের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন—সকলেই কাঁদো-কাঁদো স্বরে বলিল—“উতঙ্ক চলিয়া যাইবে!” তখন ঋষিপত্নী তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিতে দিতে তাহাদের সঙ্গে রান্নার দিকে অগ্রসর হইলেন।