গুরুদক্ষিণা/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
মাঠের মধ্যে একটিও মানুষ কিম্বা গরু নাই। অত্যন্ত প্রখর রৌদ্র। কিন্তু সেই রৌদ্রের চোখে ধূলা উড়াইয়া প্রবল হাওয়া উঠিয়াছে। দূরে চাহিয়া দেখ, বনের ডালপালাগুলা মাতিয়া যেন পাগল হাতীর মত এ ওর গায়ে শুঁড় মারিয়া বড় যুদ্ধ করিতেছে, তাহাদের প্রবল নিশ্বাসের মত একটা সাঁ সাঁ শব্দ শুনা যাইতেছে। মাঠের উপরে ধূলিরাশি একদল পাগল ভূতের মত জড়ো হইয়া শাদা হইয়া ছুটিয়া আসিতেছে—কখনো বা ঘুরিয়া ঘুরিয়া একটা দীর্ঘ স্তম্ভের মত হইয়া উঠিতেছে। প্রবল পাগল বায়ু সবেমাত্র ছুটিয়াছে, এখনো আকাশে তেমন মেঘ জমে নাই। কেবল ঐ গাছের নীচে নীচে আকাশের প্রান্তভাগ মলিন হইয়া রহিয়াছে। এই ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করিয়া উপুড় হইয়া আত্মরক্ষা করিতে করিতে পাখীর ডানার মত উড়ন্ত উত্তরীয় লইয়া ওই কে অগ্রসর হইতেছে?—ওই আমাদের পরিচিত সেই উতঙ্ক। কুণ্ডল লইয়া আশ্রমে ফিরিতেছেন।
উতঙ্ক মাঠ হইতে সরিয়া একটি গাছের আড়ালে আসিয়া বসিলেন। সাবধান, উতঙ্ক তোমার কুণ্ডল দুটি সাবধান করিয়া রাখ—এ সেই মাঠ যেখানে সেই অলৌকিক বৃষভ তোমাকে গোময় ভক্ষণ করাইয়াছিল —এখানে অলৌকিক ঘটনা সকল ঘটিয়া থাকে। বোধ হয়, উতঙ্ক তাই ভাবিয়া সতর্ক হইয়া বসিলেন। ভাবিলেন, “দেখিব, কাল যে ব্যাপারটা দেখিলাম—তার অর্থ কি।”
অনেকক্ষণ ঐ ধূলা-ওড়া মাঠের দিকে উতঙ্ক চাহিয়া রহিলেন।—কিছুই না! কিন্তু পিছন ফিরিয়া বনের ![]()
আবার সেই নেংটি-পরা মুড়ামাথা মূর্ত্তি আকাশের উপরে ফুটিয়া উঠিল। দিকে চাহিতেই উতঙ্ক আরেক অপূর্ব্ব দৃশ্য দেখিতে পাইলেন।
দেখিলেন এক মাথামুড়ানো, নেংটি-পরা, কদাকার, দীর্ঘ ক্ষপণক মাটি হইতে দুই তিন হাত উঁচু শূন্যের উপর দিয়া চলিয়া আসিতেছে। তাহার দাড়ি-গোঁপ-কামানো মুখ, গালের চামড়া গুলি শিথিল, কপালে ভীষণ কালো তিন চারিটি রেখা, বারবার মুখ বিকৃত করিয়া, নুইয়া পড়িয়া দুই পাশে শূন্যের উপর হাত চাপিতে চাপিতে ক্ষপণক অগ্রসর হইতেছে—বোধ হয় যেন ধূলি-উড়ান হাওয়াটার উপরে বিরক্ত হইয়া সেইটাকেই দুই হাত দিয়া ঠেলিয়া রাখিতে চেষ্টা করিতেছে।
উতঙ্ক ভাবিলেন ‘একি কাণ্ড!’ কিন্তু তখনি ক্ষপণক অদৃশ্য হইল। সেই অদ্ভুত মূর্ত্তি এবং তাহার অদ্ভুত ছায়াবাজী দেখিয়া উতঙ্কের বড়ই হাসি পাইল। বিস্ময় বাড়িতে বাড়িতে আবার সেই নেংটি-পরা, মুড়ামাথা-মূর্ত্তি আকাশের উপরে ফুটিয়া উঠিল। উতঙ্ক নিমেষ ফেলিতেই আবার মূর্ত্তি অদৃশ্য।
উতঙ্ক আপনা আপনি হাসিয়া উঠিলেন। ভাবিলেন “এবারে ক্ষপণক ঠিক মাথার উপরে আসিয়া দাঁড়াইবে—আমি একবার দাঁড়াইয়া পড়ি—নেংটি-পরা বাজীকর মহাশয়কে এবার বন্দী করিতে হইবে।” হাসিতে হাসিতে এই কথা ভাবিয়া মুহূর্ত্তমধ্যে উতঙ্ক দাঁড়াইয়া উঠিলেন। কিন্তু কোথায় ক্ষপণক, কোথায় কে? একটি বিদ্যুৎ-চমকানো কালের মধ্যে উতঙ্ক দেখিলেন তেজস্বী তক্ষক পাঁচ হাত দূরে শূন্যতল হইতে অকস্মাৎ আবির্ভূত হইয়া তাহার পদতলে পড়িল এবং পদতল হইতে কুণ্ডলের কৌটাটি লইয়া পাতালে প্রবেশ করিল।
দুষ্ট তক্ষকের চাতুরী বুঝিতে পারিয়া উতঙ্ক হঠাৎ হতাশ হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তখনি আবার মন স্থির করিয়া ইন্দ্রের স্তব করিতে লাগিলেন। কহিলেন “হে বজ্রধারী বলবান ইন্দ্র, তোমার বজ্র পাথর বিদীর্ণ করিতে পারে, পৃথিবী ভস্ম করিয়া ফেলিতে পারে—তোমার বজ্র অগ্নিময় নাগিনীবেষ্টিত এক দ্রুতগামী রথে চড়িয়া ভীষণ শব্দে স্বর্গ মর্ত্ত্য পাতাল ভ্রমণ করিয়া থাকে—তুমি এই দীন ব্রাহ্মণের সহায় হও।
“হে ইন্দ্র! তোমার মেঘ তাপিতকে ছায়া দান করে, তৃষ্ণার্ত্তকে জলদান করে, এবং প্রজাগণকে প্রচুর শস্য দান করিয়া থাকে,—তুমি এই ব্রহ্মচারীর সহায় হও।”
আকাশের দিকে চাহিয়া, জোড় হাত করিয়া উতঙ্ক এইরূপ স্তব করিতে লাগিলেন; অমনি আকাশের কোল হইতে, দেখিতে দেখিতে একখানি মেঘ উতঙ্কের ঠিক মাথার উর্দ্ধে আসিয়া দাঁড়াইল। কিছুকাল পরেই উতঙ্ক দেখিতে পাইলেন, মেঘটির নীচে যেন একটি কোমল বর্ষা নামিয়াছে, একটি রামধনু ফুটিয়াছে, এদিক হইতে ওদিকে কখনো উজ্জ্বল বিজুলিছটা তক্ তক্ করিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে—উতঙ্কের বোধ হইল যেন ঐ কালো মেঘের মধ্যে বসিয়া বারবার কে স্নেহে হাস্য করিয়া তাহাকে আশ্বাস দিতেছে! উতঙ্ক একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলেন। ঝম্ঝম্ শব্দে বৃষ্টি করিয়া মেঘখানি নীচে নামিয়া আসিল। অবশেষে উতঙ্ককে জড়াইয়া লইয়া বিদ্যুতের আঘাতে মাটি ফাটাইয়া, মাটির মধ্যে প্রবেশ করিতে লাগিল। সেই অন্ধকার ভিজা মেঘের মধ্যে রামধনুর বেষ্টনের মধ্যে বসিয়া উতঙ্ক রসাতলের দিকে নামিয়া চলিলেন। পৃথিবীর গর্ভে প্রবেশ করিতে করিতে কত সুগন্ধি গাছের শিকড়, কত বিচিত্র কীট, উতঙ্ক তাহার মেঘরথের চারিদিকে লম্বমান দেখিতে পাইলেন। মেঘের মধ্যে বসিয়া উতঙ্ক সুখকর শীতলতা অনুভব করিতে করিতে হঠাৎ একটা জায়গায় আসিয়া তল পাইলেন।